#অপ্রত্যাশিত_অনুরাগ
#মায়িশা_নুরাইন
#পর্ব_২৯
(কপি করা নিষেধ)
--- " ওই মেয়ে এখানে কি করছে? "
--- " এভাবে বলছো কেন? আমিই আসতে বলেছি ওকে। "
--- " আগেরবার আমার মেয়ের সাহায্য করেছে, তাই দাওয়াত দিয়েছিলে। আমিও মেনে নিয়েছিলাম। তারপর এখন আবার এসব আদিক্ষেতার কি প্রয়োজন? "
রাশেদুল খানের কথা শুনে মাহমুদা বেগম যাস্ট হা হয়ে তাকিয়ে থাকে। কি পরিমাণ বিতৃষ্ণা হলে কারও নামে এভাবে কথা বলতে পারে।
নাওরা একটু আগে এই রুমেই ছিলো। রাশেদুল খান আসতেই সে সালাম দেয়। তবে তিনি নাওরাকে সম্পূর্ণ ইগনোর করেন৷ নাওরা মাথা নিচু করে বেরিয়ে যেতেই তিনি এভাবে রা'গ প্রকাশ করেন।
যেই লোকটা তার সর্বস্ব শেষ করে দিয়ে চলে গেলো। তার কথা এখনো মনে রেখে অন্যকে নিয়ে কটু কথা বলছে।
🌿
নাওরা রুম থেকে বের হতে পারে নি,,হটাৎ রাশেদ খানের এমন রা'গ দেখে সে থমকে যায়। সে বুঝতে পারে তাকে নিয়েই কথা হচ্ছে। তাকে থমকে দাঁড়াতে দেখে মেহরিন এগিয়ে আসে। মেহরিন নিজেও ভিতরের কথাবার্তা শুনতে পেয়েছে। শ্বশুরের কথা শুনে বুঝাই যাচ্ছে,,তিনি ইচ্ছে করেই এভাবে শুনিয়ে রা'গ দেখাচ্ছেন।
--- " তুমি কিছু মনে করো না। অফিসে হয়তো কিছু হয়েছে,, তাই বাবা এভাবে রে'গে আছেন। "
নাওরা মাথা নাড়ায়। মেহরিন যে তাকে স্বান্তনা দিচ্ছে,, সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারে। তাই কিছু না বলে চলে যায়৷ বেশ অনেকক্ষণ তারা বাসায় এসেছে। এখন চলে যাওয়াই ভালো হবে। সে তার শ্বশুরেরে অপেক্ষা করছিলো। তিনি আসলে কথা বলে চলে যাবে। তবে এখন তো মনে হচ্ছে, তাদের আসাটা ওনার একদমই পছন্দ হয় নি।
🌿
নাওরার আজ মিষ্টির সাথে বেশ ভাব হয়েছে। মেয়েটা দেখতে যেমন কিউট,, কথাও অনেক কিউটভাবে বলে। সাথে একটু দুষ্টুও। নাওরা যেহেতু মাহরুর সাথেই থেকেছে,,বলা যায় ছোট থেকে মাহরুকে বেশিরভাগ সেই পেলেছে। মাহরুকে নিজে থেকেই বেশি সময় নিজের কাছে রাখতো,, যাতে মামীর কষ্ট কম হয়।
তাই মাহরুকে পালতে গিয়ে,,বাচ্চাদের সাথে মিলে থাকার অনেক টেকনিকই তার জানা আছে। তাই তো সহজেই মিষ্টির সাথে তার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।
🌿
দুপুরে না খাইয়ে তো তাদের যেতে দিবেই না। সেজন্য খাবারের সময় নাহিলও তাদের সাথেই বসেছিলো। সাফিয়া তো লজ্জায় একদমই মাথা তুলে তাকাতে পারে নি।
এমনকি নাহিলের দেওয়া সেই মেসেজটারও রিপ্লে দেয় নি। খুবই লজ্জা লাগছিলো তার। পাশাপাশি ভীতু স্বভাবের হওয়ায়, কে তাকে কিভাবে দেখবে,,এসবে তার বেশ সংকোচ আছে। সেজন্য ভাবনায় আছে, আদও নাহিলের সাথে তার কথা বলা ঠিক হবে কি না!
সাফিয়ার বয়স কম। সাথে অনেকটা বোকা স্বভাবের মেয়ে। তবে এই একটা ক্ষেত্রে সে বেশ সাবধানী আছে। কারণ ছোট থেকে সে নাওরাকে দেখে বড় হয়েছে। নাওরা কখনো এসব প্রেম-ভালোবাসাকে পাত্তা দেয় নি। তবে বিয়ে করেছে সেটা অন্য ব্যপার। যদিও ইচ্ছাকৃত ছিলো না সেটা।
🌿
নাওরা সেই কখন থেকে থম মেরে বসে আছে। সে চেয়েছিলো রাশেদ খানের সাথে একটু কথা বলতে। কিন্তু এখন আর সাহস করতে পারছে না। নাফসানকেও আর দেখতে পায় নি। নিজেই খুঁজতে যায় নি আর। সাফিয়া ইলার সাথে বসে আছে।
নাওরাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে মাহমুদা বেগম এগিয়ে আসেন। তিনি নাওরার পাশে বসে বলেন,,
--- " এভাবে বসে আছো কেন? কিছু বলতে চাও? "
নাওরা কিছুটা সংকোচ নিয়েই বলে,,
--- " আমি একটু ওনার বাবার সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম। আমি জানি,... হয়তো ওনার আমাকে পছন্দ হয় নি। তবে বুঝতে পারছিলাম, আমার বাবার সাথে কোন সমস্যা হয়েছিলো। একটু যদি.. জানতে পারতাম,,,,"
মাহমুদা বেগম কিছুক্ষণ থেমে কিসব চিন্তা করে হটাৎ নাওরার হাত ধরে তুলে বলে,,
--- " আসো আমার সাথে। "
নাওরা বাধ্য মেয়ের মতো ওনার সাথে যেতে থাকে। তিনি সোজা তাদের রুমে গিয়ে নাওরার হাত ছাড়েন। রাশেদুল খান তখন বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলেন। তারা যেতেই তিনি চোখ খুলে উঠে বসেন। তবে কিছুই বলেন না।
নাওরা এবার সালাম দিতেই তিনি গম্ভীরমুখে সালামের উত্তর দেন। নাওরা সাহস করে বলেই ফেলে,,,
--- " আ-আমি দুঃখিত আঙ্কেল, আমি তখন আপনার কথা শুনে নিয়েছিলাম। আ-আপনি বোধহয় তখন আমার বাবার বিষয়ে কোন কথা বলছিলেন। "
রাশেদুল খান কিছু বলতে নিবেন,,তখনই নাফসান হুট করে এসে তাদের কথায় ব্যাঘাত ঘটায়।
--- " বাবা, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। আমি আসছি এখনি। একটু অপেক্ষা করো। "
--- " কিন্তু, আমি একটু....."
--- " একদম চুপ থাকো। "
বলেই তাদের সামনে থেকে নাওরাকে টেনে রুম থেকে বের করে নিয়ে যায়। নাওরাকে ধ'মকে টেনে এনে তাকে রেডী হয়ে নিতে বলে। বেশ দেরী হয়ে গেছে। আজকে তাদের নাহিল এগিয়ে দিয়ে আসবে৷ নাওরার মনটা খারাপ হয়ে যায়। সে তো বাড়ির বউ এখন। যদি এ বাড়িতে তার বাবাকে নিয়ে কোন সমস্যা থাকে, তাহলে তো তার জেনে রাখা উচিত। অবশ্যই তার বাবার যেখানে সম্মান নেই, সেখানে সে সুখে থাকতে পারবে না।
নাওরা কোন কথা ছাড়াই চুপচাপ তৈরি হয়ে সাফিয়াকে নিয়ে একাই বেরিয়ে যায়। নাফসানের সাথে কোন কথা বলে না। নাফসান সাথে সাথেই নাহিলকে তাদের সাথে পাঠায়। যেন আগে-পিছে থেকে তাদের ঠিক মতো বাড়ি পৌছে দিতে পারে।
🌿
--- " বাবা, আমার কিছু কথা বলার ছিলো। "
--- " হুম, বলো। "
--- " জাহিদ আঙ্কেল যে টাকা সরিয়েছে, এটা তোমায় কে বলেছিলো? "
--- " শাহেদ। "
--- " আর তুমি ওই লোকটার কথা বিশ্বাস করে নিয়েছো? যেই লোকটা তোমার এত বড় সর্বনাশ করে গেলো, তাকেই তুমি বিশ্বাস করে নিলে? "
রাশেদ খান নিশ্চুপ হয়ে থাকেন। নাফসান আবারও বলে,,
--- " আচ্ছা মানলাম। তোমার ভাই, তাই বিশ্বাস করেছিলে। প্রমাণ খুঁজেছিলে তখন? "
--- " আমায় জাহিদের ব্যাংক একাউন্ট দেখানো হয়েছিলো,, যেখানে টাকাগুলো ট্রান্সফার করা হয়েছে। "
--- " একাউন্টটা ওনার নামে থাকলেও সেটা ওনি ব্যবহার করতেন না। "
রাশেদ খান চমকে উঠেন।
--- " জাহিদ আঙ্কেলকে ফাসানোর জন্য শাহেদ খান এসব করেছিলেন। মানছি তুমি সঠিক বিচার করেছিলে। তোমার মতে জাদিদ ইসলাম প্রতারক, তুমিও শাস্তি দিয়েছো। তবে তোমার আরেকটু বিচক্ষণ হওয়া উচিত ছিলো। নিজের ভাইয়ের কথা বিশ্বাস করে একটা নির্দোষ মানুষের সাথে তুমি অবিচার করেছো। "
--- " কিন্তু শাহেদ তো আমায় সব প্রমাণ দেখিয়েছে। কয়েক ধাপে ধাপে টাকা ট্রান্সফার হয়েছিলো। সবগুলোই জাহিদের একাউন্টে গিয়েছিলো। এমনকি জাহিদকে আমি জমি কিনতে যেতেও দেখেছি। টাকা না পেলে সে জমি কিনতে যাবে কিভাবে। তার কাছে তো অত টাকা ছিলো না। "
--- " না বাবা, তুৃমি ভুল ছিলে। হয়তো তোমাকে প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, ওনাকে এসব জমিজমার ক্রয়ের জায়গায়। তবে ওনি গিয়েছিলেন নাওরার মামার সাথে শেয়ারে জমি কিনতে। এতে দুজন শেয়ারে থেকে কিনতো। যেহেতু দুজন অনেক আপন ছিলো, তাই ওনার বিশ্বাস ছিলো, দুজনের সেভিংস একত্র করে একটা জমি কিনে রাখতে পারবে। এতে দুই পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে। "
রাশেদ খান শূন্য দৃষ্টিতে নাফসানের দিকে তাকিয়ে থাকে। তিনি কিনা এই সহজ সরল লোকটাকে কতটা অপমান করেছিলেন। এমনকি চাকরি থেকেও বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু মাত্র তার জা'নোয়ার ভাইটার কথা শুনে।
--- " বাবা, শাহেদ খান কোথায় আছে? তুমি তো জানো বলো? তুমি চাও না, একজন খু'নি শাস্তি পাক। বাবা, তোমার ভাই একজন খু'নি। সে শুধু নাওরার বাবা-মায়ের খুন করেন নি,,তাদের সাথে আরও একটা নিষ্পাপ বাচ্চাও ছিলো। যে তখনো পৃথিবীর আলোটাও দেখতে পারে নি। কত বড় পাপী লোক এই শাহেদ খান। তুমি বুঝতে পারছো বাবা? "
--- " জ-জাহিদের খু'ন হয়েছিলো? তা-তারা তো এ'ক্সিডেন্টে মা'রা গিয়েছিলো। "
--- " না বাবা। এটা একটা পরিকল্পিত খু'ন ছিলো। কারণ জাহিদ আঙ্কেল ওই শ'য়তান লোকটার সকল কুকীর্তি জেনে ফেলেছিলেন। সেই সময়টাতে ওনার চাকরী চলে যাওয়ায় ওনার মানসিক পরিস্থিতিও ভালো ছিলো না। তাই তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি সবাইকে সব বলে দিবেন। তাই তো তার মুখ বন্ধের ব্যবস্হা করা হয়েছিলো, এই জ'গন্য ওয়েতে। "
রাশেদুল খানের কিছুই বলার মতো পরিস্হিতি নেই। তিনি একসাথে এত কিছু জেনে যেন পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। নিজের বিচার ব্যবস্হার উপর ওনার যে আস্হাটা ছিলো, সেটা এক নিমিষেই ধুলোয় মিশে যায়। তার একটা ছোট্ট ভুলে কত বড় বিপদ হয়ে গেলো। আজ যদি জাহিদ বেঁচে থাকতো, তাহলে হয়তো তাকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সকল বিপদ থেকে দূরে রাখতে পারতো। হয়তো ওনার নিজেরও এত বড় ক্ষতি হতো না। আর নাওরা মেয়েটাও এতিম হতো না।
বাবাকে এমন পরিস্হিতিতে রেখেই নাফসান বেরিয়ে যায়। মাঝে মাঝে আত্ম উপলব্ধি দরকার। এতে নিজের সকল ভুল গুলো সংশোধন করে নতুন করে সব ঠিক করা যায়।
তখন বাবার এমন রে'গে যাওয়ার বিষয়টা মেহরিন তাকে জানিয়েছিলো। নাফসানও খেয়াল করেছিলো নাওরার কতটা মন খারাপ হয়েছে। তবে নাওরা যদি তখন বাবার সাথে লথা বলতে যেতো,, তাহলে হয়তো বাবা ভুল বুঝে উল্টো নাওরাকেই অনেক কথাই শুনিয়ে দিতে পারতো।
তাই তো নাওরাকে এসব থেকে সেইফ করে নাহিলের সাথে পাঠিয়ে দেয়। আর নিজে এসে বাবার কাছে সব খোলাসা করে। এসব বিষয় জানতে তারও অনেক দিন সময় লেগে গিয়েছে। ধীরে ধীরে সব খুঁজে বের করে বাবার সামনে আজ উপস্হাপন করলো।
নয়তো যে অনেক দেরী হয়ে যেতে পারতো। কারণ এতদিন ধরে শাহেদ খানের ট্রেস খুঁজে না পাওয়ার একটাই কারণ ছিলো। কারণ যে ওই লোকটা তারই বাবার আশ্রয়স্হলে ছিলো। আর সেই আশ্রয়ে থেকেই কিনা আবারও বাবার উপরেই কু'ড়াল মারতে যাচ্ছে। এরই আগে তো ওনার খেলা শেষ করতে হবে।
একসময় তার বাবা যেই ভুলটা করেছিলেন, সেটার তো আর পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া যাবে না। এর আগেই শাহেদ খানের খেলা শেষ করতে হবে। আড়ালে থেকে তাদের অনেক বিপদই তো করলো।
শুধু তাই নয়, ইলার উপর অ্যা'টাকটাও ওই লোকটাই করেছিলো,, যাতে এসবের মাঝে বাবা ব্যস্ত থাকেন। আর তিনি নিজের মতো কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।
লোকটাকে আর কোন সুযোগ দেওয়া যাবে না। আশা করা যায়, বাবা সব সত্যি জানার পর নাফসানের সহযোগিতাই করবেন।
এতকিছুর পর নাফসানের আর তার বিয়ের কথাটা বাবাকে জানানোই হয় নি। আপাতত বাবা এত কিছু হজম করে নিক। তারপর নাহয় বাকী সব জানানো যাবে।
তার থেকেও বড় কাজ হলো নাওরার মান ভাঙানো। একেতে কিছু না বলেই বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। তার উপর বাবার কিছু কথাও শুনেছে। নিশ্চয়ই অনেক মন খারাপ হয়েছে। সুযোগ বুঝে আগে তার অবুঝ বউটার মান ভাঙাতে হবে। বড্ড বেশি অবুঝ বউ তার,,,,,,,
চলবে.....
(তাড়াহুড়ো করে লিখেছি। আজকে বাড়িতে আসছি। কোনরকমে এইটুকু লিখেছি। এর বেশী লিখা সম্ভব না।
সবাই গঠনমূলক মন্তব্য করবেন প্লিজ। ❤️)