ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি শিউলি ফুলের ঘ্রান

৫ম পর্ব

লেখক: মোনালিসা মেহরোজ

#তুমি_শিউলি_ফুলের_ঘ্রাণ (৫)

#মোনালিসা_মেহরোজ✍️
সাথী আসার পর থেকে পুরোটা দিন বেশ ভালোই কেটেছে মিরার। প্রথমদিকে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে একটু ইতস্ততবোধ করলেও সাথীর নিষ্পাপ মেলামেশায় বেশ মুগ্ধ মিরা। মেয়েটা কেমন এটুকু সময়ের মধ্যেই বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছে তার সাথে।আয়ানকে নিয়েও তার হাসি-ঠাট্টার শেষ নেই। মিরারও বেশ সুবিধে হয়েছে। আয়ানকে একা হাতে আর সামলাতে হচ্ছে না। সাথীই বেশিরভাগ সময় দেখছে তাকে। সকাল থেকেই সাথী নানান কথায় মত্ত রেখেছে পুরো অ্যাপার্টমেন্ট।
মিরা ছেলের জন্য নরম ভাত মাখিয়ে তাতে তরকারি থেকে সামান্য আলু তুলে নিয়ে এসে বসলো সোফায়। রাতের খাবার তৈরি। সাথী আয়ানকে নিয়ে নিচে ফ্লোরে বসে আছে। ছেলেটা ইতিমধ্যেই টুকটাক বসতে শিখেছে। বেশিক্ষণ বসে থাকতে না পারলেও কিছুক্ষণ থাকছে। সাথে মিরা বাড়তি খাবারও যোগ করেছে তার রুটিনে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দিনে এক-দু'বার সেরেল্যাক খাওয়ায়। সাথে বাঙালি মা বলে কথা। আর যাই হোক, ছোট থেকে শিশুদের ভাতের প্রতি টান সৃষ্টি করতে বেশ পটু বাঙালি মায়েরা। তাই তো নরম ভাত মাখিয়ে মাঝেমাঝে ছেলেকে খাওয়ায়। সাথে লাল আলু আর টুকটাক সবজি। আয়ানও বেশ আয়েশ করেই খায় তা।
সামনের সপ্তাহেই আট মাসে পা দেবে শিশুটি। ছয় মাসে পা দেওয়ার পর থেকেই মিরা ছেলেকে বাড়তি খাবার দিতে শুরু করেছিলো।
আয়ান এতক্ষণ যাবৎ খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছিলো বেশ। সাথী তার পাশেই বসে দু'হাত বাড়িয়ে বটগাছের মতো আগলে রেখেছে তাকে। যেনো বাচ্চাটা অসাবধানতাবশত শক্ত মেঝেতে পড়ে গিয়ে ব্যথা না পায়। তবে এ পর্যায়ে মাকে দেখতেই আয়ানের মন খেলা থেকে সরে গেলো। আচমকা ঠোঁট উল্টে কেঁদে দিলো শিশুটি। সাথী বেশ ভরকে গেলো। তড়িৎ তাকে কোলে তুলে নিলো।
—এই না না। আয়ান বাবা কাঁদে কেনো? কে মেরেছে শুনি! একদম কাঁদে না, লক্ষ্মী বাচ্চা।
—আ......উম.....মা।
সাথী কোলে তুলে দোলাতে থাকে আয়ানকে। তবে কে শোনে কার কথা! একনাগাড়ে কেঁদেই চলেছে সে। মিরা তপ্ত শ্বাস ফেলে হাত বাড়িয়ে দেয় ছেলের পানে।
—দাও, আমায় দাও। খিদে পেয়েছে বোধহয়।
সাথী আর কথা বাড়ায় না। মিরার হাতে আয়ানকে তুলে দেয়। মিরা ছেলেকে কোলে নিয়ে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়। আয়ানের কান্না তখনো পুরোপুরি থামেনি। ছোট্ট মুখটা কেমন কুঁচকে আছে কান্নায়।মিরা আলতো হাতে ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়।
—এই তো বাবা, মাম্মা এখানে। কাঁদে না। খিদে পেয়েছে? এই যে মাম্মা তোমার জন্য ভাত মেখে এনেছে।
আয়ান মায়ের কণ্ঠ শুনে ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকে। সাথী মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মা-ছেলের পানে। মিরা আলতো হাতে ছেলের মুখে ছোট্ট ছোট্ট লোকমা তুলে দিতে থাকে। প্রথমদিকে খেতে না চাইলেও পরে মুখ কুঁচকে সবটা হজম করছে। সাথী তা দেখে মৃদু হাসে।
—তা, তোমার ব্যাপারে তো বললে না!
ছেলের মুখে খাবার তুলে দিতে দিতেই কথাখানা বললো মিরা। সাথীর হাসিহাসি মুখটা কেমন মলিন হয়ে এলো। বুক চিরে বেরিয়ে এলো দীর্ঘ নিশ্বাস। ওড়নার আঁচল শক্ত হাতে পেঁচিয়ে মাথা নুইয়ে নিলো। মিরা সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলো তা। বুঝতে পারলো ঢের, হয়তো মেয়েটা অস্বস্তি অনুভব করছে। মিরা মৃদু হাসে।
—অস্বস্তিকর কিছু থাকলে থাক। বলতে হবে না।
সাথী তৎক্ষণাৎ মাথা ঝাঁকায়। মলিন মুখে বল---
—তেমন কিছু না ভাবি।
মিরা হাসে। সাথী লম্বা শ্বাস টেনে আওড়ায়---
—গত চার বছর থেকে আমার মা তূর্য ভাইয়ের এখানে কাজ করতেন। আসলে তূর্য ভাইয়া বেশিরভাগ সময়ই কাজের জন্য বাইরে থাকতেন। কখনো চট্টগ্রাম ছুটতেন, কখনো সিলেট। বুঝতেই পারছেন, এতো বড় একজন অফিসার।
মিরা চুপচাপ শুনতে থাকে। ছেলের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার গতি তার থেমে যায়নি। মনোযোগটা ছেলের পানেও আবার সাথীর কথায়ও স্থির হলো।সাথী ফের বললো----
—মা কাজ করতেন বলতে, তূর্য ভাইয়া যখন অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন তখন তার দেখাশোনা করতেন। তিনি কিন্তু মা'কে বেশ সম্মান করতেন। চারটি বছর মা'র কেটেছিলো এই অ্যাপার্টমেন্টে। আমিও এখানে আসা-যাওয়া করতাম মাঝেমধ্যে। সেই সুবাদেই ওনাকে ভাইয়া ডাকি। আমাকেও বেশ স্নেহ করেন ভাইয়া। পড়াশোনার সব খরচ তো ওনিই বহন করেন।
সাথী এক মুহূর্ত থামলো। মলিন হেসে তাকালো মিরার পানে। ফের বললো---
—আর বলে রাখি, আমি পড়াশোনার জন্য হোস্টেলে থাকতাম। সাত বছর আগে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তারপর মা'কে তালাক দেন। মা আমাকে নিয়ে শহরে আসেন। একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম বস্তিমতো এলাকায়। তবে বেশিরভাগ সময়ই বাড়িওয়ালার থেকে অপমান-তুচ্ছতাচ্ছিল্য সহ্য করতে হতো টাকা দিতে না পারার জন্য।
সাথীর কণ্ঠ কেমন মলিন হয়ে এলো। মিরার দৃষ্টিও স্থির হলো তার পানে। এক ভ্রু কুঁচকে শ্রবণ করতে লাগলো মেয়েটার কথা। 
—মা যখন এই কাজটা পান, তখন আমাদের একটু অভাব কমেছিলো। ভার্সিটি চলাকালীন আমি হোস্টেলে থাকতাম। মা একা ভাড়া বাড়িতে থাকতো জানার পর তূর্য ভাই সেখান থেকে এখানে চলে আসতে বলেন মা'কে। প্রথমে মা না করলেও অ্যাপার্টমেন্ট যেহেতু ফাঁকা পড়ে থাকতো বেশিরভাগ সময়, তাই মা না করেনি। এখানেই থাকতেন আর দেখাশোনা করতেন তূর্য ভাইয়ের। কিন্তু একদিন......
মেয়েটার গলা ধরে আসে। চোখে পানি টলমল করছে। এতক্ষণ যাবৎ একদৃষ্টে তার পানে তাকিয়ে কথা শুনছিলো মিরা। আয়ান নিজেও চুপচাপ বড় বড় আঁখিপল্লব মেলে অবলোকন করছে চারপাশ।বড়দের এই ভারী কথোপকথনের কিছুই হয়তো সে বুঝতে পারছে না, অথচ পরিবেশের পরিবর্তনটা ঠিকই টের পাচ্ছে। খানিক বাদে সাথী নিজেকে সামলালো। মৃদু হেসে বললো----
—গত ন'মাস আগে মা মারা যান। কেউ মা'কে খুন করে ছু*রি দিয়ে। মায়ের ডেডবডি পাওয়া যায় অ্যাপার্টমেন্ট থেকে অনেকটা দূরে এক হাইওয়েতে। তখন তূর্য ভাইয়া ঢাকার বাইরে ছিলেন। এ খবর পাওয়ার পর তিনি ছুটে আসেন।
সাথী মাথা নত করে নিলো।
—আর তারপর থেকেই আমি একা। ভার্সিটি শেষ করার পর একটা ফ্ল্যাটে থাকি। তূর্য ভাইয়া সেটার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
মিরার হাত থেমে যায় এক মুহূর্তের জন্য। শিশুটার ছোট্ট মুখে খাবার লেগে আছে। মিরা নিজের আঁচল দিয়ে আলতো করে মুছে দেয় তা। তারপর ধীর গলায় প্রশ্ন করে---
—আর ওই কেস? তোমার মায়ের খু*নি ধরা পড়েছে?
ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সাথী। দু'দিকে মাথা নাড়লো সে। ফর্সা মুখশ্রী ইতিমধ্যেই লাল বর্ণ ধারণ করেছে। কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টা চালানোর ফলে কেমন হাঁপাচ্ছে মেয়েটা।
মিরা আর কোনো প্রশ্ন করে না। চিনচিনে ব্যথা হয় বুকের ভেতরটায়। মেয়েটার কষ্টটা অনুভব করার চেষ্টা করে শুধু।
—আমার মনে হয় তোমার একা থাকা প্রয়োজন। একটু ফ্রেশ হয়ে এসো, যাও।
সাথী মাথা নাড়ায়। চুপচাপ এগিয়ে যায় নিজের ঘরের পানে। আর মিরা সেখানেই থ হয়ে বসে থাকে। বয়সে মেয়েটা তার চেয়ে খানিক ছোটই হবে। অথচ এতটুকু বয়সে এতো এতো স্ট্রাগল কী করে করছে সে?মিরা তপ্ত শ্বাস ফেলে। পৃথিবী কত বৈচিত্র্যময়, তাই না?
আমরা ভাবি, আমারই হয়তো পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি দুঃখী, একা, নিঃসঙ্গ। অথচ চারদিকে একবার নজর বুলালেই বোঝা যায়—আমাদের থেকেও একা মানুষ এই পৃথিবীতে আছে। কেউ হয়তো হাসছে, কথা বলছে, স্বাভাবিকভাবে জীবন কাটাচ্ছে। অথচ বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে এমন কিছু ক্ষত, যার খবর পৃথিবীর কেউ জানে না।
মিরা ধীরে ধীরে আয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। শিশুটাও মায়ের কোলে নিশ্চিন্তে বসে আছে।
-----------------------
ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে তন্ময় আপনমনে গান গাইতে গাইতে এসে থামলো লিফটের সামনে। রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার কাছাকাছি। তূর্যের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই অবশ্য ফিরেছে। ওদিকের কাজ আপাতত শেষ। তূর্যের পরবর্তী একটা মিশন নিয়ে কাজ থাকায় সে একটু রাত করেই ফিরবে।
লিফটে চড়ে সোজা নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টের দরজার সামনে এসে থামলো তন্ময়। তবে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে না গিয়ে নক করলো তূর্যেরটায়। শিষ বাজাতে লাগলো ফুরফুরে মেজাজে।
—ও টুনির মা, তোমার টুনিরে বোঝাও না.....
বলতে বলতে বেশ কয়েকবার কলিং বেল চাপলো তন্ময়। ভাবি বলে চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে আর নিজের বিপদ আনতে চাইলো না। আগের দিনের অভিজ্ঞতা তার এখনো বেশ মনে আছে।
তন্মধ্যে মিরার জায়গায় ফট করে দরজা খুলে দিলো অন্য এক নারী। চোখমুখ তার কুঁচকে আছে বিরক্তিতে। তন্ময় নারীটিকে দেখে থমকে যায়। অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে পড়ে যুবক।
সাথীও নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে থাকে তার পানে।
—কি চাই....?
সাথীর প্রশ্নে তন্ময় নিজেকে সামলে খানিক গম্ভীর হলো। রমণীটিকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে করতে আওড়ালো---
—কখন এলে?
—জেনে কী করবেন?
তন্ময় কথা বাড়ায় না। ভ্রু কুঁচকে তার পানে একপলক তাকিয়ে সুধায়---
—ভাবি কোথায়?
সাথী ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে।
—আয়ান বাবুকে ঘুম পাড়াচ্ছেন।
তন্ময় কথা বাড়ায় না। নিজে থেকেই এগিয়ে যায় কিচেনের পানে। সাথীও আসে তার পিছুপিছু। এই মেয়েটাকে সে চিনে অনেকদিন ধরে। তূর্যের সঙ্গী হওয়ায় সাথীর ব্যাপারে সবকিছু তার প্রায় মুখস্থ। তবে সে যে আজ আসবে, তা তন্ময় জানতো না। মাঝেমাঝে এসে ঘুরে যায় এক-দু'বার। তখন তন্ময়ই তাকে আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতো। তবে মেয়েটা কেন জানি তাকে দেখলেই এড়িয়ে চলে। তন্ময়কে দেখলেই কপালে সরু ভাঁজ ফুটে ওঠে তার। তবে তন্ময় জানে না কেনো!
—কি এসব?
পেছন হতে সাথীর ডাকে ঘুরে তাকায় তন্ময়। বাজারের ব্যাগখানা রেখে অন্য একটা ব্যাগ এনে রাখলো টেবিলে। বললো----
—বাজার আছে।
—ও...। আর এটাতে?
টেবিলের উপরে রাখা ব্যাগটা নড়াচড়া করতে করতে সুধালো সাথী। তন্ময় তার পানে তাকিয়ে ছোট করে বললো---
—আয়ানের জন্য কিছু খেলনা।
-------------------------
রাত তখন প্রায় এগারোটার কাছাকাছি।
রাতের খাবার এখানেই শেষ করেছে তন্ময়। সাথে এটাও বলে দিয়েছে, আজ থেকে আর কষ্ট করে নিজে রান্না করে খাবে না। তিনবেলা মিরার হাতের রান্না খেয়ে নিজেকে ধন্য করে যাবে। মিরা তা শুনে হেঁসে দিয়েছিলো। লোকটা বেশ হাসাতে পারে অপরজনকে। তার সাথে থাকলে সেকেন্ডের মধ্যে খারাপ মনও ভালো হয়ে যাবে। এটা লোকটার বিশেষ গুন বলা চলে। 
সাথীও খাবার শেষে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। এতটা পথ জার্নি করে আসায় আবার সারাদিন এভাবে আড্ডার মাঝে থাকায় এখন বেশ ক্লান্ত বোধ করছিলো সে। তাই আর জাগতে পারেনি মিরার সাথে।
আয়ানকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে রুমের দরজা খুলে রেখে সোফায় এসে বসলো মিরা। হালকা আলোয় চোখ রাখলো বইয়ের পাতায়।
রাত জেগে গল্প-উপন্যাস পড়ার আলাদা একটা টান আছে তার। তারওপর সোশ্যাল মিডিয়ায় হালকা-পাতলা লেখালেখিও করে থাকে শখের বশে।
তূর্য এখনো ফিরে নি। আর মিরা মূলত তার অপেক্ষার প্রহরই গুনছে। ফিরলে রাতের খাবারটা আর একবার গরম করে দিয়ে দেবে তূর্যকে। সেও এখনো খায়নি অবশ্য। এক ধ্যানে বই পড়তে পড়তে মিরা একবার নজর বুলালো ঘড়ির পানে।
রাত বারোটা বাজতে চললো প্রায়। আর লোকটা এখনো ফিরলো না। মিরা তপ্ত শ্বাস ফেলে। চোখ বুজে আসে সারাদিনের ক্লান্তিতে।বইখানা পাশে রেখে মাথা এলিয়ে দেয় সোফায়। চোখ লেগে আসে সেকেন্ডের ব্যবধানে।
বসার ঘর তখন একদম নিরব-নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। চারদিকে থমথমে পরিবেশ। জনমানব থেকে বেশ দূরেই অবস্থিত এই অ্যাপার্টমেন্টটা। শহরের ব্যস্ত রাস্তার কোলাহল এদিকে আসে খুব কমই। নিশ্চিন্তে থাকার মতো একটা জায়গা।
মিরার পরিবেশটা বেশ ভালো লাগে। সময়ের কাঁটা ঘুরতে থাকে। রাত বাড়তে থাকে সেই তালে। এরমধ্যেই আপনা-আপনি খুলে যায় অ্যাপার্টমেন্টের দরজাটা। ভেতরে প্রবেশ করে দীর্ঘদেহী এক মানব। দৃঢ় কদমে এসে থামে ছোট্ট বসার ঘরটাতে।
নজরে পড়ে এলোমেলো ভঙ্গিতে সোফায় শুয়ে থাকা স্নিগ্ধ এক রমণীকে। মানবটির চোখ স্থির হয়ে আসে কেমন! একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মিরার পানে। রমণীর পরণের হালকা রঙের একটা থ্রি-পিস। মাথার চুলগুলো খোলা থাকার দরুন ফ্লোরে পর্যন্ত তার বিস্তার ঘটেছে। 
স্বাভাবিক নিশ্বাসের তালে ছুটে চলেছে রমণীর কোমল বুক। হয়তোবা কোনো গভীর স্বপ্নে বিভোর সে। তূর্যের দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে কিছুক্ষণ। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে জিভ দ্বারা অধর ভেজায়।
—মিরা!
ছোট্ট করে ডাকলো তূর্য। আর এক ডাকেই মিরা কেমন ছটফট করে চোখ মেলে তাকায়। ঘুমের ঘোরে ঘেমে ওঠা মুখটা কেমন বিমূঢ়। সামনে তূর্যকে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খানিক স্বস্তি পায়। সাথে ভ্রুও কুঁচকে যায় তার। পুরুষটি কী করে ভেতরে ঢুকলো?
সে তো দরজা খুলে দেয়নি। বোকা রমণী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রশ্ন ছুঁড়লো------
—আপনি কিভাবে এলেন? দরজা কে খুললো?
তূর্য ভ্রু কুঞ্চিত করে বুকে হাত বাঁধলো। জিভ দ্বারা গাল ঠেলে আওড়ালো----
—আকাশ থেকে টপকে পড়িনি নিশ্চয়ই?
ভরকায় মিরা। স্রেফ একটা প্রশ্নই করেছে সে। তাই বলে এরূপ ত্যাড়া জবাব দেওয়ার কী আছে? আশ্চর্য!
মিরা এসবই ভাবছিলো। এরমধ্যেই তূর্য নিজের ঘরের পানে যেতে যেতে সুধায়----
—এতোগুলো রুম থাকতে, রূমে নরম বিছানা থাকতে সোফায় ঘুমাচ্ছিলেন কেনো? আপনার স্বামীকে কি এতটাই মিসকিন মনে হয় যে তার স্ত্রীকে বসার ঘরে রাত কাটাতে হবে? হু!
এ পর্যায়ে থমকায় মিরা। তীব্র অবিশ্বাস্যে স্থির হয়ে যায় তার চোখের পলক। হৃদপিণ্ড ছুটছে তখন বেগতিক তালে। সবকিছু কেমন অবিশ্বাস্য লাগছে তার কাছে। কত সহজে লোকটা তাকে স্ত্রী বলে সম্বোধন করছে!
কত সহজে নিজেকে দাবি করছে স্বামী বলে!
কিন্তু সবকিছু কি এতই সহজ? মিরা ভেবে পায় না। তার এখন কী বলা উচিত তাও বুঝে উঠতে পারে না ঠিক। তবে রমণী নিজেকে আটকায় না। লম্বা শ্বাস টেনে খানিক ধাতস্থ করে নিজেকে। মাথা নুইয়ে ঠোঁট কামড়ে মিনমিনে আওয়াজে বলে----
—আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বুঝতে পারিনি কখন চোখ লেগে গেছে। তাই আরকি....!
তূর্য পা থামায় হুট করেই। মিরা মাথা তোলে না। পুরুষটি কেমন সময় নিয়ে পিছু ফিরে তাকায়। অদ্ভুত দৃষ্টিতে পরখ করে মিরাকে।
তবে সেই দৃষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।
ঠোঁট কামড়ে নিজের চোখ ফিরিয়ে সে গটগট পায়ে এগিয়ে যায় নিজের ঘরের পানে।
তূর্য গেলে মিরা মাথা তুলে তাকায়।চুপচাপ এগিয়ে যায় কিচেনের পানে।
----------------------------
—আপনাকে থ্যাঙ্কস বলার ছিলো।
মিরার হঠাৎ এমন কথায় তূর্য চোখ তুলে তাকায়। সদ্য ফ্রেশ হয়ে ডিনারের জন্য বসেছিলো টেবিলে। তন্মধ্যে মিরার এহেন কথায় খানিক কপাল কুঁচকে যায় তার।
সুধায়----
—কিসের জন্য?
মিরা মিষ্টি হাসে। উত্তর করে----
—সাথীকে এখানে ডাকার জন্য।
তূর্য বোঝে তার কথা। তপ্ত শ্বাস ফেলে খাবারের প্রথম লোকমাটা মুখে পুরতে গিয়েও আর মুখে তোলে না। হাত নামিয়ে নেয় আস্তে করে। অন্যদিকে তার এহেন কাজে মিরার ভ্রু কুঁচকে যায়।
—কি হয়েছে? 
রমণীর কথায় তার পানে মুখ তুলে চায় তূর্য।
নরম গলায় আওড়ায়---
—আপনি খেয়েছেন?
মিরা থমকে গেলো এক মুহূর্তের জন্য। তার মস্তিষ্কে চট করে হানা দিলো আরহামের সাথে কাটানো সময়গুলো। রাতের পর রাত যখন পুরুষটির অপেক্ষায় সে বসে থাকতো, তখন সে বাড়ি ফিরে নিজে খেলেও কখনো তাকে একবার মুখ তুলে বলেনি—খেয়েছে কি না।
অথচ আজ! স্রেফ দু'টি শব্দ। আপনি খেয়েছেন?আচমকাই মিরার বুক কেঁপে ওঠে।
না চাইতেও অশ্রুকণা ভিড় করে তার আঁখিতে।
তূর্য ততক্ষণে নিজ হাতে অন্য একটা প্লেটেও খাবার বাড়তে শুরু করেছে নিঃশব্দে।
নরম হাতে খাবার বেড়ে প্লেটটা স্ত্রী'র দিকে বাড়িয়ে দিলো পুরুষটি।ফের বললো----
—আসুন, একসাথে খাই।
মিরা কথা বলতে পারে না। কণ্ঠ কেমন রুদ্ধ হয়ে আসে। দলা পাকিয়ে যায় হাজারটি বাক্য।
যা প্রকাশ করার সাধ্য তার নেই। শুধু দু'চোখ ভরে তাকিয়ে থাকে সামনের মানুষটার দিকে।
চলবে..............
( নোট: শুনুন, আপনারা পড়েন বলেই আমি লিখি। এতো এতো ভিউজ হওয়া শর্তে রেসপন্সের এই হাল কেনো বলুন তো? আপনাদের রেসপন্স দেখে মাঝেমাঝে লিখতে ইচ্ছে করে না। 
এই পর্বটাতে ১.৫ কে রিয়্যাক্ট তুলে ফেলুন। চাইলে এটা মাত্র কয়েক ঘন্টায় তোলা সম্ভব। আলসেমি না করে রেসপন্স করুন। তাহলে আমিও আলসেমি না করে রোজ লেখার চেষ্টা করবো। আর হ্যাঁ, কালকেও আসবে, যদি দেখি ভালো রেসপন্স করেছেন তবে 😣)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন