ফন্ট সাইজ:
থিম:
যদি বলতে ইচ্ছে হয়

২য় পর্ব

লেখক: মোনালিসা মেহরোজ

#যদি_বলতে_ইচ্ছে_হয়

#মোনালিসা_মেহরোজ 
#পার্ট_২
দরজার কাছে এসেই থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম আমি। শ্বাস-প্রশ্বাস তখন ট্রেনের বেগে ছুটে চলেছে। হাত-পা অবশ হয়ে এলো, ভেতরটা কাঁপতে লাগলো তীব্র বেগে। আমি দরজার কাছ থেকে দ্রুত সরে দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখবুঁজে নিলাম। বুকে হাত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলাম। চোখের কোণে অশ্রুরা ভির করলো। নোনাজল গড়িয়ে পরলো গাল বেয়ে। 
ঘরের ভেতরের দৃশ্যখানা হুট করেই আমার হৃদয়টা কেঁপে তুললো৷ আজ পাঁচ'টা বছর ধরে যেই পুরুষের স্পর্শ আমি আমার গায়ে মেখেছি, আজ সেই পুরুষের ছোঁয়া অন্য কোন নারীর অঙ্গে। সেই পুরুষের ঘোরলাগা চাহুনি আজ অন্য কারো দেহে৷ তার ঠোঁট স্পর্শ করে আছে সৌমি নামক মেয়েটির ঠোঁটের ভাজ। কথাটা ভাবতে ভাবতেই বুকটা ভার হয়ে এলো আমার। অনুভূতিগুলো দুমড়ে-মুচড়ে গেলো। 
আমি আর দাঁড়ালাম না। দ্রুত চলে এলাম উপরের তলায়। চিলেকোঠার ঘরখানা ফাঁকায় পরে থাকে সবসময়। এখানে ছোট্ট-খাট্টো একখানা বিছানা পাতা আছে। মাঝারি সাইজের পরিত্যক্ত আলমারিসহ ছোট্ট একটা ওয়াশরূম। ওহ হ্যাঁ, বিছানার কোল ঘেষে একটা টেবিলও আছে। 
আমি মনে মনে ঠিক করলাম। আজ থেকে এখানেই থাকবো কয়েকদিন। কেননা ওই ঘরে যাওয়ার মতো রূচি অথবা অধিকার—কোনটাই নেই আমার। 
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ঠোঁট ভেঙে কান্না আসতে চাইছে বারংবার। পৃথিবীতে আমার মা ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই। বাবার পেনশনের টাকায় মায়ের একলা জীবন চলে যায়। তাতে যদি আমার বোঝা মায়ের উপর পরে তাহলে তা কিভাবে সইবে মা? আমার দ্বায়িত্ব নিতে তিনি অস্বীকার করবেন না কোনদিনও, তবে মেয়ের সংসার ভাঙার কষ্টটা ঠিক হজম করতে পরবেন না। 
কত আশা নিয়ে মা'কে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছিলাম এই বিয়ের জন্য। মা হাজারবার বলেছিলো ভেবেচিন্তে সব করতে। আমি করেছিলাম, তবে ফল পেলাম না। 
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলো। কানে এশার আজান ভেসে এলো। আমি চোখমুছে উঠে দাঁড়ালাম। ওযু করে নামাজে বসে কাঁদলাম কতক্ষণ, আল্লাহর কাছে সাহায্য ভিক্ষা চাইলাম। মনটা হালকা হলো বোধহয়! 
নামাজ শেষে উঠে দাঁড়ালাম। জায়নামাজ গুছিয়ে পায়ে পায়ে নিচে নেমে এলাম। রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। রান্নাঘর হতে সকল খাবার একে একে টেবিলে গুছিয়ে নিতেই শাশুড়ীমা এসে হাজির হলেন। মুখ বাঁকিয়ে আমার দিকে একপলক তাকিয়ে দেখতে লাগলেন খাবারগুলো। এরমধ্যেই সেখানে হাজির হলেন শশুড়সহ আমার স্বামী নিলয় ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী সৌমি। 
আমি তাকালাম সেদিকে একবার। দু'জনকে পাশাপাশি খুব একটা খারাপ লাগছে না। আমার থেকে কি সৌমি বেশি সুন্দর? হুট করেই কথাটা মাথায় আসলো। আমি খুঁতিয়ে দেখলাম সৌমিকে। ছোট্ট ছোট্ট কাঁধ পর্যন্ত চুল, হলুদ ফর্সা গায়ের রং। নাকে জ্বলজ্বল করছে ছোট্ট একটা সোনার দুল। হাত ভর্তি চুড়ি, লম্বা কানের দুলে খুব একটা খারাপ না। তবে আমার থেকে তো বেশি সুন্দর নয়। পুরুষরা না-কি সৌন্দর্যের পূজারী, তাহলে আমার ক্ষেত্রে বিপরীতটাই হলো কেনো? না-কি শুধু একটা খুঁত আমার সংসারটা নষ্ট করলো,যেই খুঁত আমার কখনো ছিলোই না। 
সৌমি তো আগে থেকেই নিলয়কে পছন্দ করতো৷ আর নিলয়ও তো সঙ্গ দিতো তাতে। তাহলে এখানে আমার খুঁতটাই বড় হলো? না-কি সুযোগ নিলো সে? 
হুট করেই আমার নজর গেলো সৌমির গায়ের মেরুন রঙের শাড়ীটার দিকে, কপালে ভাজ পরলো আমার৷ শাড়ীটা কেমন চেনা চেনা লাগছে। হ্যাঁ, চিনি আমি। ওটাতো আমার শাড়ী। প্রথম বিবাহ বার্ষিকিতে নিলয় আমাকে উপহার দিয়েছিলো। যেটা আমি স্বযত্নে আলমারিতে রেখেছিলাম। সেটা ওর গায়ে কেনো? কেনো সে এটা ছুঁয়েছে? 
আমার বুকটা ধক করে উঠলো। দু'পা এগিয়ে যেতেই সৌমি ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকালো। আমি রোবটের ন্যায় হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলাম শাড়ীখানা। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম----
—এ..এটা তুমি কোথায় পেয়েছো? 
সে নির্বিকার কন্ঠে উত্তর করলো----
—আলমারিতে। 
আমি ঘাড় ঘুড়িয়ে একপলক নিলয়ের দিকে তাকালাম। যে শূন্য দৃষ্টিতে আমার পানে একপলক তাকিয়ে চেয়ারে বসলো। 
—এটাতো আমার। তুমি কেনো পরলে? এটা আমাকে প্রথম বিবাহ বার্ষিকিতে উপহার দিয়েছিলো সে, এটা আমি যত্নে রেখেছিলাম। তুমি কেনো গায়ে জড়ালে? 
—যার স্বামীই নেই তার আবার স্বামীর দেওয়া উপহার! হাহ...। 
তাচ্ছিল্য হাসলেন শাশুড়ী। আমি ভাষা হারিয়ে ফেললাম। দু"পা এগিয়ে এসে দাঁড়ালাম নিলয়ের অভিমুখে। 
—তুমি বারণ করো নি? 
সে আমার দিকে তাকিয়ে নিগুঢ় কন্ঠে উত্তর করলো----
—প্রয়োজন মনে করি নি। একটা শাড়ী'ই তো, সমস্যা কি? তোমার তো আরো আছেই। 
আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কাঁপা গলায় ফের আওড়ালাম----
—ওটা তুমি আমায় দিয়েছিলে। 
—তাতে কি? আমি তো আরো অনেক কিছুই দিয়েছিলাম। সেখান থেকে যদি সৌমি একটা নেয় তাতে তো তোমার কম পরবে না। তাই না? 
আমি কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললাম। চোখ দিয়ে নিঃশব্দে কয়েক ফোঁটা পানি ঝরলো। শাড়ীটা অন্যের গায়ে দেখার চেয়ে বেশি ব্যাথা অনুভব করলাম নিলয়ের কথায়। তার কাছে যে আমি এতোটা গুরুত্বহীন হয়ে পরেছি তা ভাবতেই নিশ্বাস আঁটকে আসছে। আর হবো নাই-বা কেনো? নতুন স্ত্রী তার, যাকে বিয়ে করতে একটাবারও মনে হয় নি আমার কথা—সেখানে এমন ভাবনা কি করে ভাবি আমি? 
—দেখেছিস এই মুখপুরির মনে হিংসা কতটা? মেয়েটা সদ্য বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই তোকে এভাবে ওর বিরুদ্ধে উস্কে দিতে চাইছে, যেনো তুই ওর উপর দয়া-মায়া করে সৌমির থেকে শাড়ীটা নিয়ে ওর হাতে তুলে দিস। সামান্য শাড়ীর লোভ সামলাতে পারছে না ছোটলোক কোথাকার।
—মা...।
—এই খবরদার, খবরদার আমাকে মা বলে ডাকবি না। কতবার বলেছি এতো ন্যাকামি না করতে। কানে কথা যায় না? 
আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। অপমানে-লজ্জায়, কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। তবুও করার মতো কিছু পেলাম না। আমি চোখের পানি মুছে ফেললাম। তাকিয়ে দেখলাম নিলয় আর সৌমি ইতিমধ্যে পাশাপাশি বসে খাবারে হাত রেখেছে। ক্লান্ত হাসলাম তা দেখে। 
বিয়ের পরের তিনটি বছর সুখেই কেটেছিলো আমার। শশুড়-শাশুড়ী পছন্দ না করলেও নিলয়ের চোখের মনি ছিলাম আমি। আজ যেভাবে পুরুষটি সৌমিকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে, আগে আমাকে দিতো৷ তবে ধীরে ধীরে সবটা পাল্টে গেলো। তিনটি বছর ভালো কাটলেও একইভাবে কাটলো না পরের দিনগুলো। আগে যেই নিলয় আমার অপমানের প্রতিবাদ করতো, আমাকে আগলে নিতো সবকিছুর থেকে—পরে সেই নিলয় একেবারে নিশ্চুপ হয়ে যায়। রাতে ফিরে, খাবার খেয়ে শুয়ে পরে। আমি খেলাম কি-না তাতে তার কোন আগ্রহ ছিলো না। 
মাঝেমধ্যে কারো সাথে ফোনে ফিসফিস করে কথা বলতো, আমি জিজ্ঞেস করলে পুরো দমে এড়িয়ে যেতো। তবুও মেনে নিয়েছি নিজের নিয়তি ভেবে। সবকিছু সহ্য করে গেছি। তবে গত একবছর আগে একটা এক্সিডেন্টর পর যখন জানতে পারলাম সন্তান না হওয়ার ব্যাপারটা, তখন সে আমাকে আরো এড়িয়ে যেতে শুরু করে। আমার দিকে ফিরেও তাকায় না একবার। আমি সেটাও মেনে নিলাম। শশুড়-শাশুড়ী তো তখন দিন পেয়েছিলেন, আমাকে যখন-তখন খোঁটা দেওয়া, অপমান তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা তাদের কাছে নিত্য দিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। নিলয়ও কিছু বলতো না। আমি প্রতিবাদ করে তাকে কিছু বললেই বলতো মা-বাবা তো ঠিকই বলছে, ভুল কি? 
আমি চুপ থাকতাম। ঠিক আজকের মতো। ঘাড় ঘুড়িয়ে আবারো একপলক তাকালাম প্রিয় স্বামীর পানে। যাকে আজও নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসি। অথচ তার কাছে আজ আমি ফেলনা। 
দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করলাম। ধীরে ধীরে উপরের সেই চিলেকোঠার ঘরটায় ফিরে এলাম। আজ আর খাওয়া হবে না। খাবারের প্রতি তীব্র অনিহা জন্মলো, সাথে অভিমানে বুকটা ভারী হয়ে উঠলো। আমি যে চলে এলাম, কেউ তো আমাকে খাবার খাওয়ার জন্য একটা বারও আটকালো না। কেউ বললো না খেয়ে যাও। নিলয়ও বললো না! আমার কান্না পেলো। ভিষন কষ্ট হচ্ছে। অথচ আমি নিরুপায়। কিছু করার নেই আমার। 
আমি লম্বা শ্বাস টানলাম। খুব সন্তপর্ণে আবারো নিচে নেমে ফিরে এলাম সেই ঘরটায়, যেখানে এতো বছর যাবৎ নিলয়ের সাথে কাটিয়েছেন আমি। সকলে খাবার টেবিলে ব্যস্ত৷ এটাই সুযোগ সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার। আমি দেরি করলাম না। বিরস মুখে নিজের প্রয়োজনীয় সকল কিছু ঘুছিয়ে নিলাম। শাড়ী নিলাম কয়েকটা, যা আমি পড়ি। এছাড়াও সালোয়ার-কামিজ যা ছিলো তা গুছিয়ে নিলাম। তবে গহনায় আর হাত দিলাম না। এসবে আমার আর কোন অধিকার নেয়৷ যেখানে স্বামীটায় অন্য কারো। পরণের কাপড়গুলো লাগবে বিধায় নিয়ে নিলাম। 
আমি সবকিছু গুছিয়ে তাকালাম পুরো ঘরটার পানে। আচমকা বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো আমার। পাঁচ'টা বছর যেখানে কাটিয়েছি আজ তা ছেড়ে একেবারে বের হচ্ছি। এখানে আজ থেকে আমার নিলয়ের সাথে অন্য কেউ থাকবে। ঘরটাকে আমি আমার মতো সাজিয়েছিলাম, এবার হয়তো সৌমি তার নিজের মতো করে সাজাবে। আমি স্পর্শ করলাম বিছানাটা। শিরশির করে উঠলো হৃদয়টা। জানালা দিয়ে বাহিরে তাকালাম৷ দমকা হাওয়া ছুঁয়ে দিলো আমায়। 
আমার ঠোঁট ভেঙে এলো। সকলের সামনে স্বাভাবিক থাকলেও ভেতরে ভেতরে আমি যে কতটা ভেঙে গেছি তা বোধহয় আমিই জানি। আমি চোখ মুছে নিলাম। পুনরায় আলমারি খুলে নিজের মহা মূল্যবান কিছু সম্পদ গুছিয়ে নিলাম। আমার সম্পদ বলতে কিছু পড়াশোনায় অর্জিত সার্টিফিকেট। তুখোড় মেধাবী ছাত্রী ছিলাম আমি। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিলো একটু বেশিই। তাই এবাড়ি এসেও পড়াশোনা আর ছাড়তে পারি নি। শাশুড়ীর হাজারখানেক কটু কথা শুনেও পড়াশোনাটা শেষ করেছি। এবার হয়তো এসবি আমার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন হবে! 
আমি মৃদু হাসলাম কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে। অতঃপর সবকিছু গুছিয়ে নিলাম। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালাম আয়নার সামনে। শূন্য দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম নিজের ফ্যাকাসে মুখের দিকে। তখনি মানসপটে হাজারখানে স্মৃতি এসে উঁকি দিলো। আমি যখন আয়নার সামনে নিজেকে পরিপাটি করতে ব্যস্ত থাকতাম। তখন নিলয় নামক পুরুষটি বিছানায় শুয়ে খুব মনোযোগ সহকারে দেখতো আমায়। যখন আমার রূপের প্রশংসা করতো, তখন আমি লজ্জায় লাল নীল হয়ে যেতাম। কথাগুলো ভাবতেই আচমকা কেঁপে উঠল হৃদয়খানা। 
ঠিক তখনি আয়নায় ভেসে উঠলো কারো প্রতিচ্ছবি। দরজার কাছে কেউ দাঁড়িয়ে। আমি নড়লাম না। ধরা খেয়েছি ভেবেও তড়িঘড়ি করলাম না। বরং অনেক্ক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। চেনা মুখখানা আজ বড্ড অচেনা লাগছে। আমি শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খানিকবাদে ফিসফিস করে সুধালাম----
—এতোটা বদলে গেলে কেনো? ভালোবাসতাম তো। 
চলবে.......
Follow.....
( মন্তব্য করবেন প্লিজ🤎)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন