#অবাধ্য_হৃদয়ের_প্রণয়াসক্তি
#পর্বঃ৩
#রওনোক_জাহান_হায়াত
[শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত। এবং অনুমতি ব্যতীত কপি করার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ🚫।]
জায়ানের শিশুসুলভ আবদার শ্রবণ হতেই তিতির কয়েক মুহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়। একবার চতুর্দিকে নিজের অ্যাম্বার-বাদামি নরয়দ্বয় বুলিয়ে নেয়। তানজিলা বেগম ছাড়া বাকি সবাই নিজেদের ব্রেকফাস্ট নিয়ে ব্যস্ত। মহিলার মুখাবয়ব দেখে বুঝায় যাচ্ছে তিনি অপেক্ষায় আছেন তিতিরের না বলার জন্য। তিতির তার দিক থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে এনে পুনরায় নিজের মনোযোগ নিবদ্ধ করল জায়ানের পানে। জায়ানের নিষ্পাপ চাহনির কাছে আত্মসমর্পণ করে তিতির স্নেহ মাখা স্বরে বলল,
–”আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি খাইয়ে দেবো।”
তিতিরের উত্তর শুনে জায়ানের চক্ষুদ্বয়ে দীপ্তিময় আভা ছড়িয়ে পড়ল। মনের আনন্দে সে হাত তালি দিতে শুরু করে। আরমান আর হাবিব চৌধুরী একবার ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি দেয়। অতঃপর আবারো নিজেদের খাবারের দিকে মনোনিবেশ করে। এদিকে রাগে সাপের মতো ফুঁসে উঠে তানজিলা বেগম। জায়ান আর তিতিরের পানে এমন ভাবে তাকায় যেন ওরা দুনিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্টতম প্রাণী। তিতির তার দিকে একবারও ঘুরে তাকালো না। বরং ধীরে ভঙ্গিতে জায়ানের পাশে বসে পড়ল। প্লেটে থাকা পরোটা একটা একটা করে অংশ ছিঁড়ে খাইয়ে দিতে লাগে জায়ানকে।
হাবিব চৌধুরী এতোক্ষণ নিশ্চুপ ভঙ্গিতে সবটা পর্যবেক্ষণ করলেও এবার কিঞ্চিৎ নড়েচড়ে বসলেন। নিজের গলা খাঁকারি দিয়ে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেন। আর তাই হলো। সবাই তার দিকে তাকাল। তিনি বেশ শান্ত, স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
–”কারা যেনো বলেছিল আমার ছেলেকে সামলানো কারো পক্ষে সম্ভব না! কিন্তু তো এখন দেখছি আমার ছেলেটা ভদ্র, নম্র ছেলের মতো নিজের খাবার খাচ্ছে। তার কারণে টেবিলের একটা জিনিসও এদিক-সেদিক হয় নি। তবে কি তারা চোখ থাকতেও অন্ধ?”
ভদ্রলোকের কথাগুলো শুনে আরমান কেশে উঠে। অবশ্য কেশে উঠেছে বললেও ভুল হবে। নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করতে মিছে কাশির পন্থা অবলম্বন করল আর কি। এদিকে তানজিলা বেগমের রাগ এবার সপ্তমে। অগ্নিকাণ্ডের পুলকির ন্যায় তার অন্তর দাউ দাউ করে উঠল। হাবিব চৌধুরী যে পরোক্ষভাবে কথাগুলো তাকেই বলেছেন তা বুঝতে মহিলার চার সেকেন্ডের বেশি সময় লাগল না। এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। সোজা উঠে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললেন,
–”আমার খাওয়া শেষ। আমি নিজে রুম গেলাম। প্রয়োজন ছাড়া কেউ আমাকে ডিস্টার্ব করবে না।”
কথাটুকু বলে আর একমুহূর্তও দাঁড়ালেন না। হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন তিনি। তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে জায়ান বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিলো। যাক, আপদ বিদায় হয়েছে। ইতোমধ্যেই আরমানেরও খাওয়া শেষ হয়ে যায়। সে নিজের হাত পরিষ্কার করে উঠে দাঁড়িয়ে তিতিরের পানে তাকায়। আর শান্ত কন্ঠে বলে,
–”ভাবী, ভাইয়ার খেয়াল রেখো।”
–”জ্বি, অবশ্যই।”
তিতির মৃদু স্বরে উত্তর দেয়। তারপর আরমান তার ভাই আর বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় একবারও কোহিনূরের পানে তাকানোর প্রয়োজনবোধ করে না। কিচেন রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কোহিনূর মলিন দৃষ্টে তার যাওয়ার পানে চেয়ে থাকে। অন্তঃকরণে তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভূত হতেই রমণী নিজের শাড়ির আঁচল খামচে ধরে। লোকটার অবহেলা সে মোটেও সহ্য করতে পারে না। অথচ গত একটা বছর ধরে আরমান তাকে অনবরত অবহেলার দুয়ারে ঠেলে দিচ্ছে। বাহির থেকে তাদের দেখলে মনে হবে পারফেক্ট হাসবেন্ড-ওয়াইফ। অথচ রুমের চার দেয়ালের মাঝে তাদের সম্পর্কটা এখন কেবল টিকে আছে তাদের চার বছরের মেয়ে ঝিলিকের জন্য। ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো কোহিনূর। নয়নদ্বয়ের অলক্ষিত অশ্রুকণা মুছে দ্রুত কিচেনে চলে গেলো।
হাবিব চৌধুরী তখনো বসে বসে দেখছেন তিতির আর জায়ানকে। অন্তরে প্রশান্তির স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি নিজের চশমা ঠিক করতে করতে উঠে দাঁড়ালেন। আর তিতিরকে উদ্দেশ্য করে ডেকে উঠলেন,
–”তিতির মা!”
তিতির সহসাই উত্তর দেয়,
–”জ্বি, আঙ্কেল?”
–”নিজের খাওয়া শেষ হলে একবার স্টাডি রুমে যেও। তোমার সাথে দরকারী কিছু কথা আছে।”
তিতির হালকা মাথা দুলিয়ে বলে–”আচ্ছা।”
অতঃপর হাবিব চৌধুরী ধীরলয়ে প্রস্থান করলেন। কোহিনূর কিচেনে দুপুর আর রাতের জন্যে কি কি রান্না হবে, তার জোগাড়-যন্ত্র করছে। ডাইনিং রুমে এখন মানুষ বলতে কেবল জায়ান আর তিতির’ই বসে আসে। জায়ানকে খাওয়ানোর মাঝে মাঝে তিতির’ও দু'এক টুকরো পরোটা নিজের মুখ তুলে নিচ্ছে। তিতির জায়ানের মুখের সামনে আরেক টুকরো পরোটা ধরতেই ছেলেটা টুপ করে তা মুখে পুড়ে নেয়। তবে এবার সে আরেকখান বিস্ময়কর কান্ড ঘটিয়ে ফেলে। যাতে চমকে উঠে তিতির হিসহিস করে বলে উঠে,
–”আউউ! আঙ্গুলে কামড় দিলেন কেনো?”
প্রত্যুত্তরে জায়ান নিজের বত্রিশ-পাটি দাঁত দেখিয়ে হাসে। তিতির কিছুক্ষণ ভুরু উপর-নিচ করে তার পানে চেয়ে থাকে। বুঝতে পারে পাগলুটা ওর সাথে ফাজলামি করছে। তিতিরও বা কম কিসে? সেও জায়ানের সামনে আরেক টুকরো পরোটা ধরে। যখনই ছেলেটা মুখ বাড়িয়ে তা খেতে যাবে, তক্ষুনি তিতির তড়িৎবেগে পরোটার অংশটি নিজের মুখে পুড়ে নেয়। ‘থ' হয়ে যায় জায়ান। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি মেলে থাকায় তিতিরের মুখের দিকে। আর ভ্রু কুঁচকে,ঠোঁট উল্টে বলে,
–”এটা কি হলো, তিতির বউ?”
তিতির নিজের ঠোঁট বাকিয়ে বলে,
–”শোধ-বোধ চুকিয়ে নিলাম।”
জায়ান বিমূঢ় কন্ঠে আওড়ালো,
–”শোধ-বোধ? সেটা আবার কি?”
তিতির আর আগ বাড়িয়ে ব্যাখ্যা দিল না। নির্লিপ্ত গলায় বলে,
–”আমার মাথা! এখন তাড়াতাড়ি খাবারটা শেষ করুন। আপনাকে আবার ঔষুধ খেতে হবে।”
ঔষুধের নাম কর্ণকুহরে পৌছাতেই জায়ানের মুখটা কুচকে গেল। সে নিজের মাথা এধার-ওধার দুলিয়ে আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,
–”না না, আমি ঔষুধ খাবো না। ওগুলো খেতে আমার ভালো লাগে না।”
তিতির শান্ত কন্ঠে বলে,
–”আপনাকে খেতে হবে। নাহলে কিভাবে সুস্থ হবেন আপনি?”
–”না না না। ঔষুধ খাবো না। আমি ঔষুধ খাবো না। ওগুলো খেলে আমার ভালো লাগে না। ঘুম পায় অনেক। পাগল পাগল লাগে।”
একপ্রকার জেদ ধরে বসে জায়ান। একই শব্দের বারবার অনুরণন করতে শুরু করে। তিতির বুঝে উঠতে পারছে না এখন কি বলে জায়ানকে শান্ত করবে সে? জায়ান তখনই উঠে দাঁড়ায়। কিছু না বলে ছুটে চলে যায় দোতলায়। তিতির পেছনে থেকে বেশ কয়েকবার ডাকেও তাকে। কিন্তু জায়ানের সেদিকে কোনো হেলদোল নেয়।
.
.
.
চার দেয়ালে আবৃত রুমটি সম্পূর্ণ অন্ধকারে নিমজ্জিত। কালো বর্ণের ভারী পর্দা গুলি টেনে রাখার কারণে সূর্যের কিরণ ঘরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ। রুমের বা-পাশের আলমারির পাশ ঘেঁষে কর্ণারে ঘাপটি মেরে জড়সড় হয়ে বসে আছে জায়ান। দু'হাতে শক্ত করে পেচিয়ে ধরেছে তার হাঁটু। তাগড়া যুবকের সুঠামদেহ থরথর করে কাঁপছে ভয়ে। সেই মুহুর্তেই রুমের দরজা ক্যাটক্যাট শব্দ তুলে খুলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে জায়ানের সর্বাঙ্গে কাঁপন ধরানো শীতল স্রোত বয়ে যায়। ভীতসন্ত্রস্ত পুরুষ ভাবে হয়তো তানজিলা বেগম এসেছে। তাই সে ভয়ে আরো কাচুমাচু হয়ে বসে। নিজের হাঁটু এতটাই শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে যেন মনে হচ্ছে সে নিজেকে সবকিছু থেকে আড়াল করতে চাইছে। ক্ষীণ পদধ্বনি তার কর্ণাটকে ভেসে আসতেই জায়ানের অন্তর ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠে। মাথা তুলে না তাকিয়েই শিশুসুলভ ভীতু স্বরে বিড়বিড় করে বলতে লাগে,
–”স্টেপ মাম্মা! প্লিজ ডোন্ট হার্ট মি। আমি… আমি আর কখনো নিচে খেতে যাবো না। প্লিজ আমাকে মে'রে না।”
আপনমনে অনুনয় করতে লাগে জায়ান। তখনই দু'খান হাত এসে আলতো তার কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দেয়। তাতে কুঁকড়ে যায় জায়ান। তবুও মাথা তুলে দৃষ্টি মেলে তাকানোর বিন্দুমাত্র সাহসটুকুও সে পায় না। তখনই তার কর্ণগোচর হলো সেই মিষ্টি কোমল কন্ঠস্বর,
–”আধীর, আমি তিতির। তাকান আমার দিকে।”
তিতিরের কণ্ঠস্বর শ্রবণেন্দ্রিয়ে পৌঁছাতে জায়ান তড়িৎ গতিতে নিজের মুখ তুলে তাকালো সম্মুখে। তার তিতির বউকে দেখা মাত্রই জায়ানের রুহ যেন পুনরায় তার দেহে ফিরে এলো। সে কোনো কিছু না ভেবেই নিজের হাতের বাঁধন খুলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তিতিরকে। নিজের ক্রন্দনরত মুখখানা লুকিয়ে ফেলে তিতিরের কন্ঠসন্ধিতে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তিতির যেন বরফ খন্ডের ন্যায় জমে যায়। প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার যৎকিঞ্চিৎ শক্তিটুকু ক্ষণিকের ব্যবধানে হারিয়ে ফেলে সে। মূর্তিবৎ হয়ে নিষ্পলক দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় সফেদ দেয়ালে।
এদিকে জায়ান তিতিরকে আষ্টেপৃষ্ঠে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে ধরেছে। যেন হাতের বাঁধন একটু আলগা করলেই তিতির হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। জায়ান অস্ফুট স্বরে থেমে থেমে বলতে লাগে,
–”তিতির বউ, আমায়…ছেড়ে যেও না। স্টেপ মাম্মা এলে…আমায় বকবে, মা'রবে।”
জায়ানের অস্ফুট স্বরে বলা কথাগুলো তিতিরের কর্ণাটকে পৌঁছাতেই তরণী নিজের সম্বিৎ ফিরে পায়। ফোঁস করে ছাড়ল সে। তরুণী স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের হস্তদ্বয় রাখে জায়ানের পিঠে। শ্লথগতিতে হাত বুলিয়ে জায়ানকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে তিতির সুমিষ্ট স্বরে বলে,
–”আমি তো আপনার সাথেই আছি। আপনি ভয় কেন পাচ্ছেন? আমি যতক্ষণ আপনার সাথে আছি কেউ আপনাকে আঘাত করতে পারবে না।”
জায়ান জোরে জোরে ‘না’ সূচক নিজের গর্ডান নেড়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে,
–”স্টেপ মাম্মা… খুব প.. পঁচা, তিতির বউ। ভাইকে কত্ত ভালোবাসে, কিন্তু আমাকে একটুও ভালোবাসে না। আমাকে সবসময় বকে, মা'রে। আমার খুব কষ্ট হয়, তিতির বউ। স্টেপ মাম্মা আধীরকে একটুও ভালোবাসে না।”
বলেই ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠে জায়ান। ছেলেটার কান্নার তীব্র শব্দগুলো না চাইতেই তিতিরের বক্ষের গভীরে গিয়ে বিঁধছে। কিভাবে ছেলেটাকে শান্ত করবে বুঝে উঠতে পারছে না তরুণী । ওর এই কান্নাও তিতির সহ্য করতে পারছে না। বুকের ভেতরটা কেমন চিনচিন ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠছে। নিজের হাত অনবরত বুলিয়ে চলেছে জায়ানের পিঠে। একটা শুষ্ক ঢোক গিলে তিতির পুনরায় একই কন্ঠে বলে,
–”আমি এসে গেছি না! আর কেউ আপনাকে কষ্ট দেবে না। আমি… আমি ভালোবাসবো আপনাকে, কেমন? এবার কান্না থামান, প্লিজ। নাহলে কিন্তু আমিও এখন কান্না করবো।”
কিয়ৎক্ষণ পর, জায়ান তিতিরের কন্ঠসন্ধি থেকে নিজের মুখ তুলে অশ্রুসিক্ত নিষ্পাপ নয়নে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তিতিরের ওই অ্যাম্বার-বাদামি অক্ষিপটে। নিজের পুরুষালী কম্পিত হস্ত এনে রাখে তিতিরের ডান গালে। আর ফিসফিসিয়ে আওড়ালো,
–”তুমি সত্যিই আমার সাথে থাকবে তো? মাম্মা আর অরিনের মতন হারিয়ে যাবে না তো?”
তিতির নিজের মাথা নেড়ে বলল,
–”একদমই না। আমি সবসময় আপনার সাথে থাকবো। যেমন চাঁদ সবসময় পৃথিবীর পাশে থাকে।”
–”প্রমিস?”
–”প্রমিস।”
জায়ানের নিজের মুখখানা তিতিরের মুখের কিঞ্চিৎ নৈকট্যে নিয়ে গিয়ে উচ্ছ্বাসে কাঁপা কন্ঠে আবারো আওড়ায়,
–”পিঙ্কি প্রমিস?”
এবার হেসে ফেলে তিতির। আর জায়ানের কনিষ্ঠ আঙুলের সঙ্গে নিজেকে নাজুক, কোমল কনিষ্ঠ আঙুল জড়িয়ে বলে,
–”পিঙ্কি-মিঙ্কি প্রমিস।”
বেশ কিছুক্ষণ পর। তিতির জানালার পর্দাগুলো সরিয়ে দিতেই তেজস্বী সূর্যের উষ্ণ কিরণ রুমে ছড়িয়ে পরলো। একটু আগের অন্ধকারে নিমজ্জিত রুমখান মুহুর্তেই ঔজ্জ্বল্যে ভরে উঠে। জায়ান বিছানায় বসে আছে। কান্নাকাটির পর্ব কিছুক্ষণ আগেই ইতি টেনেছে। জায়ানের দু’হাতের মাঝে একটা মাঝারি আকৃতির বান্নি স্টাফ্ট টয়। ওটাকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গাল ফুলিয়ে বসে আছে সে। কারণ এতো বরণ করার পরেও তিতির তাকে জোর করে ঔষুধ খাইয়ে দিয়েছে।
তিতির জানালার ধার থেকে সরে এসে জায়ানের সম্মুখে উপস্থিত হয়। ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতেই জায়ানের রাগ মুহুর্তেই মিলিয়ে গেলো। নিষ্পাপ চাহনিতে তাকালো তার তিতির বউয়ের পানে। আর আদুরে গলায় বলল,
–”তুমি না… অনেক ভালো, তিতির বউ।”
–”তাই বুঝি?”
–”হুম। স্টেপ মাম্মার মতো আমাকে বকুনি দাও না, মা’রো না।”
তিতির প্রত্যুত্তরে কেবল কয়েকটি মুহুর্ত নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল ছেলেটার মায়াভরা বদনের পানে। অতঃপর ধীরলয়ে, কোমল স্বরে বলল,
–” আচ্ছা, তাহলে আমি এখন কিছু বললে আপনি সেটা করবেন?”
জায়ান সঙ্গে সঙ্গে নিজের মাথা নাড়ে। তিতির মৃদু স্বরে বলে,
–”আমি একটু আপনার পাপার সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছি। তাই, আমি যতক্ষণ পর্যন্ত না রুমে ফিরে আসছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি এই ঘরের বাহিরে যাবেন, কেমন?”
–”ওকে ওকে। কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে এসো।”
তিতির উত্তরে কিছু বলল না। কেবল নিজের চোখের পলক ফেলে জায়ানকে আশ্বস্ত করল। অতঃপর ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
.
.
.
নিরবিলি পরিবেশে একযুগ ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে “চৌধুরী কুঞ্জ”। আধুনিকতার আভিজাত্যে মোড়ানো দোতলা বারান্দা বিশিষ্ট অট্টালিকার শীর্ষে সূর্য তীর্যকভাবে কিরণ দিয়ে বাড়িটিকে আরো রাজকীয় রূপ দিচ্ছে। তবে বাহ্যিক সৌন্দর্য দিয়ে সবকিছু বিচার করা নিছক বোকামী মাত্র। অট্টালিকার অন্দরে শায়িত আছে অজানা বহু রহস্য। যা কখনো উদ্ঘাটন হবে কিনা তা সবারই অজানা।
মিনিট পাঁচেক হলো তিতির স্টাডি রুমের একটা চেয়ারে বসে আছে। তার সম্মুখে মেহগনি কাঠের পালিশ করা টেবিলের অপরপ্রান্তে অবস্থান করছেন হাবিব চৌধুরী। চশমায় আবৃত দৃষ্টিদ্বয় স্থির রয়েছে তার সামনে থাকা একটি হিসেবের খাতার। কিয়ৎক্ষণ অতিবাহিত হতেই তিনি খাতাটি বন্ধ করে মনোযোগ স্থির করলেন তিতিরের পানে। মেয়েটির পরনে তার প্রয়াত স্ত্রী আয়েশা চৌধুরীর শাড়ি। ভারী মানিয়েছে ওকে। তিনি ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লেন। অতঃপর তিতিরের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন,
–”কেন ডেকেছি জানো?”
তিতির শান্ত স্বরে অকপট উত্তর দেয়,
–”না।”
নিজের চশমাটা খুলে ভদ্রলোক টেবিলের উপর রাখলেন। তারপর আবারো জিজ্ঞেস করলেন,
–”জায়ানের জন্য তোমাকেই কেনো বেছে নিয়েছি, তা জানতে চাইবে না?”
প্রশ্নটুকু তরুণীর কর্ণাটকে ঠাস করে আছড়ে পড়ল। নড়েচড়ে ঋজু ভঙ্গিতে বসে কৌতুহলী নয়নে দৃষ্টিপাত করল হাবিব চৌধুরীর মুখের পানে। ভদ্রলোকের মুখাবয়ব নির্বিকার। তার মস্তিষ্কে কি চলছে তা তিতির নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় শক্তি খাটিয়েও বুঝতে অক্ষম হয়। হাবিব চৌধুরী কয়েক মুহুর্তে নিশ্চুপ রয়ে অতঃপর মুখ খুললেন।
–”গতবছর, এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় তুমি একটা গাড়ির সামনে এক্সিডেন্ট হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলে। পরবর্তীতে সেই গাড়ির ড্রাইভার তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। এর জন্য তোমার বাবা তোমায় নানানরকম গালিগালাজ করে তোমাদের এলাকার রাস্তাতেই তোমাকে মে'রেছিল। মনে পড়ে কিছু?”
থমকে যায় তিতির। চক্ষুদ্বয় বিস্ময়ে প্রসারিত হয়ে উঠে। হ্যাঁ, গতবছর এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় দেরী হয়ে যাওয়ায় তিতির তাড়াহুড়ো করে কোচিং থেকে বাড়ি ফিরছিল। তখনই অসতর্কতার কারণে একটা গাড়ির সঙ্গে ওর প্রায় এক্সিডেন্ট হয়ে যাওয়া উপক্রম হয়। কিন্তু সময় মতন গাড়িটির ড্রাইভার ব্রেক কসায়, ও যাত্রায় তিতির প্রাণে বেঁচে যায়। পরে সেই গাড়িতেই লিফ্ট নিয়ে ও নিজের বাসায় ফিরে যায়। গাড়িটি ওদের এপার্টমেন্টের বিল্ডিংয়ের সামনে থামতেই তিতির গাড়ি থেকে নেমে যায় তাড়াহুড়ো করে। সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা খায় ওর বাবা আশহাদ রহমানের সাথে। আশহাদ রহমানের তখন নেশায় এমনিতেই টাল হয়ে ছিলেন। তারমধ্যে মেয়েকে একটা অপরিচিত লোকের গাড়ি থেকে নামতে দেখে নেশাগ্রস্ত লোকটির মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আর রাস্তাতেই তিতিরকে নানানরকম গালিগালাজ করে চড়-থাপ্পাড় বসিয়ে দেয় ওর গালে।
কিন্তু এই ঘটনা হাবিব চৌধুরী জানলো কিভাবে?
প্রশ্নটা অন্তরে দমিয়ে না রেখে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করে উঠে তিতির,
–”আপনি কিভাবে এই ঘটনার কথা জানলেন?”
হাবিব চৌধুরী হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
–”কারণ আমি গাড়ির পেছনের সিটে বসে ছিলাম।”
তিতির আরেক দফা হতভম্ব হয়ে যায়। নিভুনিভু
দৃষ্টিতে পরখ করে হাবিব চৌধুরীর মুখাবয়ব। আস্তে আস্তে মনে পড়ে আসলেই তো সেদিন ইনিই ছিলো গাড়িতের পেছনের সিটে। তাইতো গতকাল থেকে তিতিরের মনের হচ্ছিল ও ভদ্রলোককে কোথাও দেখেছে। কিন্তু শরণ করতে পারছিল না। হাবিব চৌধুরী তিতিরের দৃষ্টি দেখে বুঝতে পারলেন যে ও তাকে চিনতে পেরেছে। তাই তিনি নিজের কথা আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন,
–”তুমি সেদিন ভয় পেয়েছিলে। ড্রাইভার টুকটাক যে ক'টা কথা জিজ্ঞেস করছিল তুমি সন্তর্পণে তার উত্তর দিয়েছিলে। ব্যস, ভালো লেগেছিল তোমাকে। তারপর আমি তোমার ও তোমার পরিবার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেই। আর জানতে পারি তোমার বাবি জুয়া খেলে, নেশা করে, আর তার অনেক ঋণও আছে… তুমি তখন সতেরো বছরের ছিলে। তাই গত একটা বছর অপেক্ষা করেছিলাম তোমার ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার।”
এতক্ষণ ধরে তিতির নিজেকে শান্ত রেখে সব কথা শুনলেও এই মুহূর্তে আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারল না। রক্ত যেন মাথায় চড়ে বসলো ওর । হাবিব চৌধুরীর পরবর্তী কথাগুলো ওর আত্মসম্মানে যেন সজারুকাঁটার মতন বিধল। তরণী ধপ করে উঠে দাঁড়াতেই ভদ্রলোকের ভ্রুকুটি ঈষৎ কুঞ্চিত হয়ে উঠে। কিছু বলার জন্য নিজের মুখ খুলতে গেলে তরুণী তাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দেয়। কিঞ্চিৎ চাপা তীক্ষ্ণ স্বরে বলে,
–”আপনি কি আমার উপর করুণা দেখাচ্ছেন?”
হাবিব চৌধুরীও সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। মেয়েটাকে শান্ত করার প্রয়াসে বলে উঠলেন,
–” তিতির মা, তুমি আমাকে ভুল বুঝছো. . .”
–”অবশ্যই না। আমার বাবা আমার গায়ে হাত তুলছিল। এটা দেখে আপনার আমার প্রতি দয়া হলো আর আপনি আমাকে আপনার ছেলের বউ বানানোর জন্য আমার বাবাকে টাকার লোভ দেখালেন! তাও আবার আপনার মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেকে…”
বাক্যটি সম্পূর্ণ করতে গিয়েও তরুণী থেমে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল জায়ানের সেই নিষ্পাপ মায়া ভরা মুখখানি। যা তিতিরের বাক্যগুলোকে মাঝপথেই থামিয়ে দিতে বাধ্য করল। না, সে জায়ানকে দোষারোপ করবে না। এখানে তো জায়ানের কোনো দোষ নেই। ও বেচারা তো তিতিরের মতোই এই খেলার একটা গুটি মাত্র। ভাবনাটুকু মস্তিষ্কের মধ্যে ধামাচাপা রেখে তিতির একটা লম্বা শ্বাস টানলো। তারপর সংযত, শীতল কন্ঠে বলল,
–”আপনি… আপনাকে আমার কিছু বলার নেই। দয়া হয়েছে আমার উপর। তাই দয়া দেখেছেন। তবে, আমিও একটা কথা বলে দিচ্ছি আপনাকে, শশুর আব্বু… আধীর সুস্থ হোক কিংবা আজীবন এমন অসুস্থ হয়ে থাকুক, তাতে এখন আর আমার কিচ্ছু যায়-আসে না। বিয়ে যখন হয়েছে, তখন ইহকালে আমি আমার স্বামীর হাত ছাড়ছি না।”
নিজের কথাটুকু সমাপ্ত করে তিতির আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। দ্রুত পায়ে স্টাডি রুম থেকে প্রস্থান করলো। যতক্ষণ পর্যন্ত না তিতিরের শীর্ণকায় অবয়ব মিলিয়ে গেল করিডোরে ততক্ষণ পর্যন্ত হাবিব চৌধুরী ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। পরক্ষণেই তার অধর কোণে ফুটে উঠল একটা স্বস্তির হাসি। তিনি নিজের চশমাটা আবারও পড়ে নিজে নিজে বিড়বিড় করলেন,
–”থেকে যাও, তিতির। আমার ছেলেটার ঢাল হয়ে চিরকাল ও সাথে থেকে যাও। আজ তুমি হয়তো পুরো সত্যিটা শুনলে না। কিন্তু যেদিন তুমি পুরো সত্যিটা জানতে পারবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সেদিন আমার প্রতি তোমার এই রাগটা কমে যাবে।”
.
.
.
জায়ান বিছানায় বসে তিতিরের জন্য অপেক্ষা করছে। এতোক্ষণ হয়ে গেছে অথচ তিতিরের ফিরে আসার কোনো নাম’গন্ধ নেই। গত তিন বছর ধরে জায়ান একা একা থেকেছে বহুবার। তাকে তো মাঝেমধ্যে ঘরের মধ্যে আটকেও রাখা হতো। তখন ছেলেটা ভয়ে রুমের এক কোণে বসে কান্না করত। কিন্তু আজ ও বেশ বিরক্ত হচ্ছে। একদিনে তিতিরের সাথে ওর যেই আত্মার টান তৈরি হয়েছে তা আর কারোর সাথে কখনো হয় নি। তাই তো এখন তিতিরকে ছাড়া থাকতে বেশ বিরক্ত লাগছে। এদিকে ঔষুধের প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে। মাথা আস্তে আস্তে ভার ভার লাগতে শুরু করেছে জায়ানের।
তখনই জায়ানের শ্রবণে ভেসে আসে দরজা খোলার ক্ষীণ শব্দ। মুহূর্তেই বিদ্যুতের গতিতে সে দরজার দিকে দৃষ্টিপাত করে। আর দেখতে পায় একটি মেয়েকে। জায়ান অস্ফুট স্বরে বলে উঠে,
–”তুমি!”
#চলবে…?
[কোনো ভুল-ত্রুটি হলে মার্জনা করবেন। সবাই রেসপন্স করবেন। আর সবাই একই রকমের কমেন্ট করবেন না প্লিজ। সবার প্রায় একই রকম কমেন্ট–”নাইস”, “নেক্সট পার্ট”, “ অনেক সুন্দর হয়েছে”, “অসাধারণ”... এই কমেন্টগুলো বাদে কি অন্য কমেন্ট করা যায় না? পর্ব তো কম বড় করে দেই না! পর্ব পড়ে কি বুঝলেন, আপনার কি মনে হলো, পরবর্তীতে কি হবে বলে মনে হয়– এই নিয়েও তো মন্তব্য করতে পারেন!]