#প্রেমের_শেষ_পঙক্তি_তুমি #পার্ট_৫
#মোনালিসা_মেহরোজ
সন্ধ্যা সারে সাতটা,
কায়সার ম্যানশনটা আলোই ঝলমলে হয়ে উঠেছে। সকলের মুখে হাসির ফোয়ারা বইছে। বসার ঘরে সকলের উপস্থিতি আজ একটু অন্যরকম। পিহুকে মাঝখানে বসিয়ে অনামিকা বেগম মেয়ের পাশে বসে পরেছেন৷ পিহুর অন্যপাশে বসেছেন অভিরাজের মা সূচনা খান। পিহুর মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করছেন মন ভরে।
আভিরাজরা এসেছে অনেক্ক্ষণ। ইসহাক কায়সার, নিহান কায়সার ও মুবিন কায়সার মিলে আলভি খানকে ঘিরে আড্ডায় মত্ত। অনেকদিন পর আজ বিশেষ দিন উপলক্ষে সকলের একসাথে হওয়া। আনন্দ করবে না?
ইউভান তাদের পাশে বসে সকলের কথা একমনে শুনে চলেছে৷ অভিরাজের মা নানান উপদেশ দিতে ব্যাস্ত। ইউভানও চুপচাপ তা গ্রহন করছে। সে এতিম ছেলে, পরিবার বলতে শুধু পিহুই আছে, তাই নিজের পরিবার না থাকায় এই কায়সার পরিবার'ই তার সব।
এই বিশেষ দিনেও নিজের কাছের কোন আপনজন এখানে উপস্থিত নেই কয়াসার পরিবার ছাড়া। থাকলে তো আসতো? পৃথিবীতে ইউভান তো একা, বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে তাই জেনে এসেছে। ছোট্ট বেলার স্মৃতিও অস্পষ্ট। এতিমখানায় মানুষ হওয়ার পর কপাল করে একটা চাকরি পেয়েছিলো। অতঃপর পিহুর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তা পবিত্র বন্ধনে রূপ নেয়। আর আজ সে বাবা হতে চলেছে।
অন্যদিকে,
কোয়েল অভিরাজের গা ঘেঁসে সোফায় বসে আছে। ঠোঁটে লাল টুকটুকে লিপস্টিক মাখানো। গায়ে ছোট্ট ছোট্ট ওয়েস্টার্ন ড্রেস। যা তার শরীরের প্রতিটি ভাজকে সুস্পষ্ট করে তুলেছে৷ খানিকসময় পর পর অভিরাজের দিকে তাকিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে হেঁসে উঠছে কোয়েল৷ তার চেহারা অভিরাজকে দেখার পর থেকে অন্যরকম এক উজ্জ্বলতায় ছেয়ে গেছে। অভি কোয়েলের এমন কান্ডে মনে মনে বেশ বিরক্ত। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না বড়দের জন্য৷ কোয়েলের পানে তাকাচ্ছেও না একবার৷ মুখটা ঘুড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করছে বাড়ির আনাচকানাচে।
অভিরাজের চোখ চারদিকে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। আসার পর থেকে ইরাকে একটা বারের জন্যও দেখতে পায়নি সে। মনটা বড্ড জ্বলছে তার।অস্থির নয়নে খুঁজে চলেছে বহু কাঙ্খিত সেই মানবীটিকে। তবে কোথায়?কোথায় সে? তার অস্তিত্ব কোথায় বিরাজ করছে এখন? অভি জানে না।
অভির চঞ্চল দৃষ্টি একটা বারের জন্য ইরাকে দেখার আসায় চাতক পাখির ন্যায় ছটফট করতে লাগলো। তবে প্রিয় সেই নারীটির দেখা পাওয়া, আর দিনের বেলায় আকাশে চাঁদের উদয় হওয়া; সমান বলে মনে হয় অভির কাছে৷ তৃষ্ণার্থ হৃদয়টা মরুভূমির ন্যায় খাঁ খাঁ করছে অভির। অভি আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। ভাবলো, হয়তো ইরা রান্নাঘরে আছে। তার প্রিয় জায়গা যে ওটাই। জীবনের অর্ধেকটা সময় তো ওখানেই পাড় করেছে সে। এখনও নিশ্চয়ই সেখানেই থাকবে! বাড়িতে মেহমান এসেছে সেই উপলক্ষে রান্নার দ্বায়িত্ব তো তার উপরেই পরবে।
খানিকক্ষণ আগে নাস্তার সাথে শরবত পান করলেও অভি সেটা নিয়ে ভাবলো না। তৃষ্ণা না পেলেও মিথ্যার আশ্রয় নিলো। অভি অনামিকা বেগমের উদ্দেশ্য বললো---
—আন্টি,তৃষ্ণা পেয়েছে খুব। পানি কোথায়, রান্না ঘরে?
অনামিকা বেগম চট করে অভির পানে তাকালেন। অতঃপর কোয়েলকে বললেন---
—কি রে কোয়েল! অভিকে পানি খাওয়া?
কোয়েল উঠতে নিলে অভি চট করে বললো---
—তোমাকে উঠতে হবে না। আমি'ই যাচ্ছি।
অভি দ্রুত বসা থেকে উঠে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে অনামিকা বেগমের পানে তাকিয়ে বললো---
—টেবিলে রাখা পানি গরম হয়ে গেছে মেইবি। আমি রান্নাঘরে যাচ্ছি, ফ্রিজের ঠান্ডা পানি খেতে।
অভি এ বাড়িতে আগেও অনেকবার এসেছে। তাই এ বাড়ির আনাচকানাচে তার চেনা। অভি ধীর পায়ে রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। নজরে পরলো কাজে ব্যাস্তরত ইরাকে। একা হাতে রান্না করছে সে। পরনের ওড়নাটা এলোমেলো, মাথার চুলগুলো ঘেমে লেপ্টে আছে কপালে-গলায়। ফর্সা মুখশ্রী আগুনের তাপে লাল হয়ে গেছে।
ইরার পুরো ধ্যান রান্নায় আবদ্ধ। আর এইদিকে অভির ধ্যান আবদ্ধ হলো প্রিয় ইরাবতীর মাঝে। ইরা নিখুঁতহাতে সকল কাজ এক এক করে করতে লাগলো। তার মুখে বিরক্তির ছিটেফোঁটাও ছিলো না। উল্টো অদ্ভুত এক তৃপ্তি নিয়ে কাজে ডুবে আছে সে। আর তা মন্রমুগ্ধের ন্যায় অনুভব করছে অভি। ইরার প্রতিটি ধাপ, তার শরীরের অঙ্গভঙ্গি সবকিছু যেনো নিখুঁত পরিক্রমায় পর্যবেক্ষণে মনোযোগী হয়ে পরলো অভি। তার চোখের পলক পড়া সেখানেই থমকে গেলো। শুধু নিঃশব্দে দরজায় হেলান দিয়ে অবলোকন করতে লাগলো ইরার মুখশ্রী।
হঠাৎ করেই ইরার হাত থেমে গেলো। কপাল কুঁচকে এলো তার। মনে হলো তাকে কেউ আড়াল হতে দেখছে। খুব দৃঢ়ভাবে চোখ ফেলে রেখেছে তার পানে। ইরা চট করে পিছনে ফিরে চাইলো। দরজার কাছে অভিকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খানিক অপ্রস্তুত হয়ে পরলো ইরা৷ অভির ঘোর লাগা চাহুনি এখনো ইরার পানেই নিবদ্ধ। ইরা চট করে নিজের দিকে ফিরলো। অতঃপর চোখজোড়া বন্ধ করে ঘুড়ে দাঁড়ালো। ইরা দাঁতে দাঁত চেপে বললো---
—অসভ্য লোক একটা। বিনা অনুমতিতে এভাবে কারো উপর চোখ ফেলে রাখতে নেই তা জানেন না?"
ইরা দ্রুত হাতে নিজের ওড়না ঠিক করলো। তার মুখে তীব্র বিরক্তি, সাথে লজ্জায় গাল লাল হয়ে এলো। ইশশ,কেউ তাকে এভাবে দেখছে! এই অবস্থায়?
ইরার কথায় ধ্যান ভাঙে অভির। দরজা হতে ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করে। গা ছাড়া ভাব নিয়ে নিজ হাতে ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করে তা পান করে। অতঃপর ইরার সামনে এসে দাঁড়ায়। দু'হাত পকেটে গুঁজে বিনা দ্বিধায় শীতল কন্ঠে বলে---
—সো হেয়াট? অন্য কারো জিনিস দেখছি আমি? আমি আমার প্রপার্টিতে নজর দিয়েছি, তাতে কার কি যায়-আসে?
অভির গা ছাড়া ভাব নিয়ে এমন কথা বলায় বেশ চটে যায় ইরা। কোমড়ে হাত রেখে শক্ত দৃষ্টিতে তাকায় অভির গভীর সমুদ্রের ন্যায় চোখের দিকে। কপাল কুঁচকে বলে---
—প্রপার্টি? কে? কার? আমি কবে থেকে আপনার প্রপার্টি হলাম শুনি?
অভি এক-পা এক-পা করে এগিয়ে এলো ইরার সামনে৷ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরখ করতে লাগলো ইরার বিরক্তিকর মুখশ্রী। ইরা অভির এমন খুঁতিয়ে দেখায় কপাল কুঁচকে নিলো। মুখ ফুটে কিছু বললো না। শুকনো ঢোক গিলে চুপ করে রইলো।
অভি আর এক-পা বাড়ালো। এবার সে ইরার এতোটা কাছে দাঁড়িয়েছে যে অভির তপ্ত নিশ্বাস ইরার মুখশ্রীতে আছড়ে পরছে। দু'টি দেহের মধ্যে তেমন কোন ফাঁক নেই। অভির এতোটা কাছে দাঁড়ানো'ই বেশ অস্বস্তিতে পরে গেলো ইরা। মাথা নিচু করে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো পরনের কাপর। অভি ইরার অস্বস্তিমাখা মুখে হারিয়ে গেলো আবারো। ইরা অভির কাছ থেকে দূরে সরতে দ্রুত কদমে পিছিয়ে যেতে লাগলো। তবে হঠাৎ করেই হোঁচট খেয়ে পরে যেতে নিলো ইরা। অভির মস্তিষ্ক এক ঝটকায় সচল হয়ে উঠলো। দ্রুত হাতে খপ করে ইরার কোমড় চেপে ধরল। ইরা পরে গেলো না, অভির বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে পরলো।
ইরা থমকে গেলো। তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে প্রায়। অভির শীতল স্পর্শ তার পুরো কায়াকে আচ্ছন্ন করে ফেললো। ইরা এক দৃষ্টিতে অবাক লোচনে অভির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। ইরার এমন চাহুনিতে দুষ্টমি খেলে গেলো অভির চোখমুখে। ঠোঁট কামড়ে ধরে বাঁকা হাসলো। এক ভ্রু তীরের ন্যায় উঁচিয়ে হাতের বাঁধন শক্ত করলো। ইরার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো----
—এভাবে থাকতে ভালো লাগছে?
ইরা উত্তর করলো না। অভি হেঁসে আবারো বললো---
—লাগলে বলো। আমি সারাক্ষণ এভাবে তোমায় আমার সাথে চেপে রাখবো৷ আমার কোন প্রবলেম নেই এতে। আমি তো বেশ এনজয় করছি এটা। মনে হচ্ছে আস্ত একটা তুলোর বস্তা নিজের সাথে চেপে রেখেছি। কি নরম তুলতুলে, আহা।
কথাটা বলে ইরার উদ্দেশ্য ফ্লায়িং কিস ছোড়ে অভি।ঠোঁট কামড়ে হেঁসে তাকিয়ে থাকে ইরার পানে। অভির কথায় ইরার কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বেড়িয়ে গেলো। বিরক্তি আর অস্বস্তি ঝেঁকে ধরলো তাকে। দাঁতে দাঁত চেপে অভির বুকে ধাক্কা দিয়ে আলগা করতে চাইলে নিজেকে৷ দাঁতে দাঁত চেপে বললো---
—অসভ্য,নির্লজ্জ, বেয়াদপ লোক একটা। ছাড়ুন......।
—কি হচ্ছে এখানে?
ইরা কথাটা শেষ করতে পারে নি। তার আগেই দরজার কাছ থেকে কারো গম্ভীর কন্ঠ স্বরে চমকে সেদিকে তাকায় ইরা। অভিও চোখ ঘুড়িয়ে পিছনে তাকায়। পকেটে হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশ। তার চোখমুখ একদম শীতল। কোন অনুভূতির ছাপ নেই সেখানে৷ ইরা-অভির পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইয়াশ।
ইরা ইয়াশকে দেখেই ছিটকে দূরে সরো গেলো অভির কাছ হতে। দু'হাত কচলাতে কচলাতে বাঁকা নজরে একবার তাকালো ইয়াশের পানে। তার নিশ্বাস ভাড়ি হয়ে এলো। ভয়ে কাঁপতে লাগলো শরীর। এ দৃশ্য নিয়ে যে কি কি হতে পারে তা ভাবতেই শিউরে উঠছে ইরার কায়া। বাড়িতে এটা জানাননি হলে আজকেই শেষ দিন। রাতের আঁধারে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে একটা-বারও ভাববে না কেউ।
অভি ইয়াশকে দেখেও তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। উল্টো হাসিমুখে এগিয়ে এলো ইয়াশের সামনে। ঠোঁটের কোণায় হাসির রেখা টেনেই বললো---
—তেমন কিছু না ব্রো। তোমার কি খবর? আসার পর থেকে মিসিং হয়ে আছো।
ইয়াশ কোন কথা বলে না। ফ্রিজ থেকে পানির বোতল নিয়ে এসে দাঁড়ালো অভির মুখোমুখি। চোখে চোখ রেখে শীতল কন্ঠে বললো---
—আমার কথা ছাড়,তোদের কথা বল! কি চলছিলো এখানে? রসের আলাপ নাকি?
ইয়াশ এক ঢোক পানি পান করে। অভি একপলক তাকায় ইরার পানে। কপাল কুঁচকে বলে---
—মানে?
হাসলো ইয়াশ। ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্য স্বরে বললো---
—মানে! এখানে হবে নাকি হোটেল ভাড়া করে দিবো? লাগলে বল আমি বিল মিটিয়ে.....।
আচমকা ইয়াশের কলার টেনে ধরলো অভি। ইরার সম্পর্কে এমন বাজে ইঙ্গিত তার মস্তিষ্ক ধপ করে আগুন জ্বলিয়ে দিলো। দাঁতে দাঁত পিষে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ইয়াশের পানে। ইয়াশ এবার শক্ত দৃষ্টিতে অভির হাতের দিকে তাকালো।
অন্যদিকে ইরা,
ইয়াশের কথায় স্তব্ধ হয়ে গেলো সে। মুখ দিয়ে কোনরূপ টু শব্দ অবদি বের করতে পারলো না। তার কন্ঠ স্বর রোধ হয়ে এলো। কান্নারা দলা পাকিয়ে গলায় এসে যুদ্ধ শুরু করে দিলো। ইরা হাতের মুঠোই শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো পরনের কাপর। মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরলো ঠোঁট। যাতে কান্নারা না বের হয়। ইরার চোখ বেয়ে টুপ করে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরলো। ইয়াশ কিভাবে এতো বড় একটা কথা বলতে পারলো তাকে? তার কি বিবেকে বাঁধলো না একটুও? একটা বারের জন্য বুক কাঁপলো না?
—মুখটা সামলে কথা বললে খুশি হবো, ইয়াশ ব্রো। আসলে অযথা কথা আর নোংরা মস্তিষ্ক থেকে বের হওয়া আবর্জনা, মোটেও পছন্দ নয় আমার।
অভি ধীরে-সুস্থে ইয়াশের কলার ছেড়ে দিলো। অতঃপর সুন্দর করে ঠিক করে দিলো এলোমেলো হয়ে যাওয়া কলারখানা। ইয়াশ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। অভির কথায় ইয়াশ শীতল দৃষ্টিপানে তাকালো তার মুখভাজে।
—মিথ্যা কি বলেছি আমি? যা সত্যি, তাই তো বললাম। আমার মনে হলো তোদের এখানে বড্ড প্রবলেম হচ্ছে, তাই একটা অফার করলাম।
অভি হাসলো। ইয়াশের চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বললো---
—হোটেল লাগবে না ব্রো। ওখানে নষ্টারা যায়। আমার ইরাবতীর মতো পবিত্র ফুল ওখানে গেলে মুহূর্তেই প্রাণ হারাবে। দরকার পরলে তার জন্য রাজপুত্র সেজে রাজপ্রাসাদ নির্মান করবো। যেখানে প্রহরী থাকবে না৷ আমি ব্যাতীত দ্বিতীয় কোন পুরুষ থাকবে না৷ যাতে আমার ইরাবতী সাচ্ছন্দ্যে নিশ্বাস নিতে পারে।
—রিয়েলি? আর ইউ শিউর যে তোর ইরাবতী পবিত্র? তাকে কেউ ছোঁয় নি?
এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো অভির মস্তিষ্ক। অভি একবার তাকালো মাথা নিচু করে থাকা ইরার পানে। সে বেশ বুঝলো তার মনের অবস্থা। অভি ধীরে একটা নিশ্বাস ছাড়লো। ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তাকালো ইয়াশের তীক্ষ্ণ মুখপানে।
—আমি তার দেহের কথা বলি নি, বলেছি মন অথবা আত্মার কথা। জীবনে চলতে গেলে ইরাবতীর মতো ফুলকে অনেক বাঁধা পেরুতে হয়। হাজারো মানুষের কটুক্তি, বাজে নজর, সাথে নোংরা স্পর্শের শিকার হতে হয়। সেখানে যদি কোনদিন এমন কিছু ঘটে থাকে তাতে তাকে অপবিত্র বলা যাবে না মোটেও। বরং সে আরো শক্তিশালী আত্মা হয়ে ওঠে। জীবনের এই মুহূর্তোগুলো তাকে আরো বেশি করে শিক্ষা দেবে,সতর্ক করবে। ভবিষ্যতে নিজেকে রক্ষা করার ফাঁদ তৈরি করতে পারবে নিজে থকেই। তাই এসব বাহ্যিক বিষয়ে মোটেও মাথা ঘামায় না আমি।
বরং তার আত্মাকে উপলব্ধি করতে চাই। যার মন যতো সুন্দর, সে ততো পবিত্র। রুপ তো একসময় ঝড়ে যাবে, কিন্তু মনটা তো থাকবেই! আর আমার সেটাই চায়।
ইয়াশ খানিকক্ষণ থমকে রইলো। তার মুখের ভাব বোঝা গেলো না। কিছুসময় অভির চোখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ডুব দিলো গভীর ভাবনায়। অতঃপর ইরার পানে একবার তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বললো----
—এই কথাগুলো আমাকে না, ওকে বল। অনুভূতি কি! সেটা আমাকে না, ওকে বোঝা। আর সর্বশেষে, কাউকে নিয়ে খেলতে না কর ওকে৷
ইয়াশ কথাগুলো বলে ধীর পায়ে ত্যাগ করলো রান্নাঘর৷ ইরা অবাক নয়নে ইয়াশের কথাগুলো শ্রবন করলো। ইয়াশের আজকের কথাগুলো কেমন অদ্ভুত ঠেকলো তার কাছে! ইরা ধরতে পারলো না ইয়াশের কথার মানে। অভির কথার সাথে তার কথাগুলোর কি কোন যোগ সুত্র আছে!বুঝলো না ইরা।
অভি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। ঘুরে তাকালো ইরার দিকে। এক-পা এগিয়ে এসে মুখোমুখি হলো তার। মাথা নিচু করে বললো---
—সরি।
আর কোন কথা হলো না, কোন শব্দ হলো না। অভি অসহায় দৃষ্টিতে একবার ইরার নেতিয়ে যাওয়া মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে বেড়িয়ে গেলো রান্নাঘর থেকে। অন্যদিকে ইরা মলিন হেঁসে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।
------------
রাত প্রায় সারে বারোটা। প্রকৃতি নিঃসন্দেহে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেছে। আকাশে থালার ন্যায় একখানা বিশাল চাঁদের উদয় হয়েছে। ইরা নিজের ঘরের বারান্দার চেয়ারে বসে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে নিষ্প্রাণ চোখে সেদিকে তাকিয়ে। তার চোখের পলক পরছে না। অথচ কোণ বেয়ে অশ্রুরা গড়িয়ে পরছে। গায়ে জড়ানো শুভ্র রঙের ওড়নায় চাঁদের আলোয় ঝলমলে হয়ে উঠেছে। কোমল মুখশ্রীতে চাঁদের নরম আলো এক অপার্থিব সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। ইরা গভীর ভাবনায় ডুবে।
বাড়ির সকলে নিজেদের মতো রাতের খাবার শেষ করে ঘরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে পাড়ি জমিয়েছে ঘুমের দেশে। সকলের খাওয়া শেষ হলেও ইরার ভাগ্যে আজ আর ভাত জোটেনি। এটা সকালে পেট পুড়ে খাওয়ার শাস্তিসরূপ অনামিকা বেগমের কঠোর আদেশ। যা ইরা মানতে বাধ্য।
সেই সকালে ভার্সিটি যাওয়ার সময় ইউভানের জোড়াজুড়িতে খেয়েছিলো। তারপর সারাটাদিন পেরিয়ে গেলো, মধ্যরাত হয়ে এলো প্রায়। এখনো তার পেটে কিছুই পরে নি। বড্ড খিদে পেয়েছে, এখন না-হয় পানি খেয়ে কাটিয়ে দেবে। কিন্তু সকালে? সকালে কি খাবার জুটবে তার কপালে?
ইরা ভাবলো,,
আজ যদি মা বেঁচে থাকতো? অথবা ভাই? তাহলে তাকে আর এই অবহেলা সহ্য করতে হতো না। বাবাও তাকে দু'হাতে আগলে রাখতেন। এ বাড়ির অন্যান্য মেয়েদের মতো তাকেও সকলে স্নেহ করতো। বড়মা, ছোটমা তাকে এভাবে কাজের লোকের মতো খাটাতে পারতো না। কিন্তুু হায়, তার তো সেই ভাগ্যটা নেই। খোদা তাকে সব দিয়েও কিছুই দেননি। মা দিয়েছিলেন, কেড়ে নিয়েছেন, বড় ভাই দিয়েছিলেন; তাকেও কেড়ে নিয়েছেন। এতো বড় পরিবার থাকতেও সে এখন অনাথ। মা-ভাইয়ের চলে যাওয়ার দায়ভার বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে। অপরাধ না করেও অপরাধী হয়ে তার শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে।
ইরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। আকাশের পানে চেয়ে মলিন কণ্ঠে বললো,,
—কেড়েই নিবে যখন তখন দেওয়ার কি দরকার ছিলো? আমাকে দোষী বানানোর এতো তাড়া কিসের, খোদা? সেদিন মৃত্যুটা আমার দিলেও পারতে, অথচ কি খেলায় না খেলছো আমার সাথে!
ইরার বিড়বিড়ানির মাঝেই ঘরের দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হলো। ইরার মস্তিষ্ক চট করে সজাগ হয়ে এলো। এতো রাতে কে আসতে পারে ভেবেই কপালে ভাজ পরলো ইরার। আজ তো ইয়াশ বাড়ির বাহিরেও যায় নি। আর গেলেও মেইন গেটে শব্দ হবে। তা না তার ঘরের দরজায় কে টোকা দিচ্ছে?
ইরা ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করলো। আগেপিছে বেশি ভাবলো না। হাত উঁচিয়ে ঘরের দরজা খুলে সামনে তাকালো। আশ্চর্য! এখানে তো কেউ নেই। ইরা আশেপাশে তাকালো, তবে কেউ নেই। কুঁচকানো কপাল আরো কুঁচকে গেলো। মনের ভুল ভেবে দরজা বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনি চোখ গেলে নিচের দিকে। মেঝেতে একটা পার্সেল রাখা। ইরা এবার অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলো। ঘরের বাহিরে পা রেখে লম্বা করিডোর দিয়ে এপাশে-ওপাশে তাকালো। নাহ, কেউ নেই তো! তাহলে এটা কে রেখে গেলো? আর এর ভেতরেই আছেই বা কি?
ইরা ভাবতে ভাবতেই সেই পার্সেলটা হাতে তুলে নিলো। ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে দরজা আঁটকে দিয়ে গিয়ে বসলো বিছানায়। হাতে পার্সেলটি তুলে মনে একরাশ আশংকা নিয়ে আস্তে আস্তে তা খুলে ফেললো। আর যা দেখলো তাতে ইরার চোখ বড়বড় হয়ে এলো। পার্সেলটির ভেতরে স্বযত্নে রাখা আছে বিরিয়ানি প্যাকেট। যার গন্ধ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পরলো পুরো রুম জুড়ে।
ইরা থমকে গেলো। অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলো হাতের সেই প্যাকেটটির পানে। তার এখন খিদে কম, আশ্চর্য বেশি হচ্ছে। কে দিয়ে গেলো এটা? এ বাড়িতে এমন কে আছে যে তাকে রাতের আঁধার এভাবে লুকিয়ে খাবার দিয়ে যাবে?
ইরা এবার পার্সেলটা ভালো করে খেয়াল করলো। নজরে পরলো ছোট্ট একটা চিরকুট। ইরা কাঁপা কাঁপা হাতে তা মেলে ধরলো। আর যা দেখলো তাতে এবার সে বোকা বনে গেলো। একটা মানুষ কতটা পাঁজি হলে এমন একটা চিঠি লিখে? হুমকি দিয়ে বলছে খেতে, অথচ চিরকুটে এমন কিছু লিখেছে যে খাওয়ার রুচি নিমিষেই উধাও হয়ে যাবে।
ইরা ভ্যাবলার মতো চিরকুটটি সামনে ধরে বসে রইলো। চিরকুটে বেশ গুছিয়ে রীতিমতো হুমকি দেওয়া হয়েছে। নিখুঁত হাতে লেখা---
—তারাতাড়ি খেয়ে নাও। না হলে যেই ছোট্ট প্রাণটাকে সবার আগে কোলে নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করে রেখেছো, তাকে তোমার কোলে দেওয়া হবে না। এছাড়াও কাল সারাদিন কোন খাবার পাবে না তুমি, করলার জুস আর টিকটিকির মাংস ছাড়া। তাই যদি উগান্ডা যেতে না চাও, তাহলে আমাজন জঙ্গল থেকে আনা কুমিরের মাংস দিয়ে তৈরি এই স্পেশাল বিরিয়ানিটা খেয়ে নাও। আশা রাখছি, বিরিয়ানিতে দেওয়া অ্যানাকোন্ডা নামক কিউট প্রাণিটির মাংসের সাধ সারাজীবন তোমার মুখে লেগে থাকবে। তাই চেটেপুটে খেও, কেমন? আর আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলো না। উম্মাহ...বিদায়।
চলবে.......
(কেমন লাগলো জানাবেন🤎🤎🤎)