ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের শেষ পঙ্গক্তি তুমি

৭ম পর্ব

লেখক: মোনালিসা মেহরোজ

#প্রেমের_শেষ_পঙক্তি_তুমি #পার্ট_৭ 

#মোনালিসা_মেহরোজ
কেটে গিয়েছে তিন-তিনটে দিন। ইরার জীবন আগের মতোই চলছে। কখনো নিষ্ঠুরতা বেশি, কখনো আবার একটুখানি উদারতা। তবুও কোন অভিযোগ নেই ইরার। কখনো মুখ ফুটে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা তো দূর, কারনও জানতে চায় না অত্যাচারের। কেননা এটা তার পরিবার। তার আপনজন সবাই। তারা যদি তার সাথে এমন আচরনে আনন্দ পেয়ে থাকে! তাহলে তাই হোক। ইরা কেনো তাদের থেকে এভাবে আনন্দ কেড়ে নিবে? 
ইরা আগে যাও একটু কথা বলতো, এখন তা পুরোপুরি নিভে গেছে। সারাদিনে মুখ ফুটে একটা কথা বের হয় কি-না সন্দেহ। সেই ভোরবেলা উঠে কাজ শুরু করে দেয়। সারাদিন বাড়ির খুঁটিনাঁটি কাজ করতে করতে কেটে যায়। আবার রাত্রি বেলা আকাশের তারা-দের সাথে একটুখানি ভাব জমাতে ব্যাস্ত হয়ে পরে। কখনো খোঁজে মা'কে, কখনো ভাইকে। বাবাকে ডাকলে অপমানিত হতে হয়। তবুও ডাকে, বাবা ডাকটা বড্ড প্রিয় কি-না! 
ইরা জানে, বাবা তাকে কখনো নিজের মেয়ে বলে মেনে নিবে না। কখনো বুকে আগলে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে না। তার জন্যই তো সব হারিয়েছেন তিনি। স্ত্রীসহ বড় সন্তান তো ইরার জন্যই পৃথিবী ছেড়েছে। তাহলে কেনো সেই অপয়া মেয়েকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দিবেন তিনি? কেনো দিবেন? 
নিহান কায়সার দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বারান্দায় বসে বাগানের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। যেখানে নানান রঙের ফুলের মেলা বসেছে৷ মৌমাছিরা ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে মধু সংগ্রহের আশায়। গাছের পুরনো পাতা গুচ্ছগুলো নিঃশব্দে ঝরে পরছে, ঝাঁকে ঝাঁকে উদয় হচ্ছে সবুজ রঙা কচি পাতার বহর৷ কদম ফুলের মিষ্টি গন্ধ নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিচ্ছে।
গোধূলির আকাশে লাল রঙের লালিমা ছাড়িয়ে গেছে। পশ্চিম আকাশে ঢলে পরছে সূর্য। কি এক অপরূপ দৃশ্য তা! নিহান কায়সার এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষণ। অতঃপর ধীর পায়ে বসা হতে উঠে ঘরে প্রবেশ করেন। বিছানায় আধশোয়া হয়ে একটা বই হাতে তুলে নিলেন তিনি। চোখে চশমা লাগিয়ে ডুব দিলেন বইয়ের পাতায়। 
------------------------
ইরা ব্যাস্ত রান্নাঘরে রাতের খাবারের আয়োজনে। মুখটা বরাবরই ন্যায় বিষন্নতায় মোড়ানো। চোখ আবদ্ধ হাতের কাজে। আগুনের তাপে ফর্সা মুখশ্রী লাল হয়ে এসেছে। কপাল বেয়ে ঝড়ে পরছে তপ্ত ঘাম। গায়ে জড়ানো সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজের পিছন দিকটা ঘামে ভিজে জুবুথুবু হয়ে লেপ্টে আছে তার পিঠে। 
ধীর হস্তে মাছ কেটে মসলা-পাতি মাখিয়ে চুলায় বসালো রমণী। সবজি কেটে রেখেছে একপাশে। মিতালি বেগম পাশে দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন সবকিছুর৷ অনামিকা বেগম অনুপস্থিত। 
রান্নার কাজের মধ্যেই সেখানে উপস্থিত হলো ইউভান৷ ইরা সেদিকে একবার তাকিয়ে বললো----
—কিছু লাগবে, ভাইয়া?
ইউভান একটু ইতস্তত বোধ করলো। এমনিতেই সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে আবার রান্না করতে বসেছে ইরা। এখন আবার সুপ বানাতে বলে প্রেশার দিতে কেমন যেনো লাগছে তার ! মিতালি বেগমকে বললে তিনিও নিশ্চয়ই ইরাকে দিয়েই খাটাবেন! নিজে তো আর করবেন না। অন্যদিকে পিহু, সকাল থেকে বেশ কয়েকবার বমি করেছে। কিছু মুখে তুলতে পারছে না গন্ধে। দুপুরে খেতে এসে সব বের করে দিয়েছে বমি করে। এখন নাকি তার আবার খিদে পেয়েছে! তাই উপায়ন্তর না পেয়ে ইউভান নিচে ছুটে এলো। 
ইউভান ইরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বললো----
—কিছু না।
অতঃপর নিজেই রান্নাঘরে ঢুকে সুপ বানানোর প্রস্তুতি নিতে লাগলো। কপাল কুঁচকে নিলো ইরা। মিতালি বেগম অবাক নয়নে চেয়ে বললেন----
—এমা, কি করছো তুমি?
—সুপ বানাবো। পিহুর খিদে পেয়েছে তাই ভাবলাম পাতলা কিছু খেতে দিতে। এমনতিই বমি করছে, খেতে পারছে না কিছু।
মিতালি বেগম কোমড়ে হাত দিয়ে অবাক নয়নে চেয়ে বললেন----
—তা তুমি কেনো করছো?বললেই তো তৈরি করা হতো।
—কে করতো শুনি?
—কেনো? ইরা করবে!
ইউভান হাসলো। মিতালি বেগমের পানে তাকিয়ে বললো----
—মেয়েটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখেছেন, শরীরের কি অবস্থা তার? এমনিতেই সারাদিন বসার মতো ফুরসত পায় না একটু। তার ওপর আমি চাই না পিহুর জন্য ওকে খাটতে হোক। আমি আছি আমি করে দিবো।
মিতালি বেগম মুখ বাঁকালেন। ইরা মলিন হেঁসে হাত বাড়িয়ে ইউভানের হাত থেকে ছুরিটা নিয়ে নিলো। ইউভানকে ঠেলে বাহিরে পাঠিয়ে দিতে দিতে বললো----
—কি যে বলেন, ভাইয়া! সারাদিন যখন এতো কাজ করতে পারি তাহলে এই সামান্য কাজ করতে পারবো না? এটার জন্য আবার আপনাকে বুঝি কষ্ট করতে হবে? যান বলছি, তৈরি হলে এসে নিয়ে যাবেন।
ইরা ইউভানকে দরজার বাহিরে পাঠিয়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই ভেসে এলো অনামিকা বেগমের শীতল কন্ঠ স্বর। তিনি এদিকে আসতে আসতে ইরার দিকে তাকিয়ে বললেন----
—লাগবে না। সুপটা আমি বানিয়ে দিচ্ছি।
ইরা মাথা নিচু করে অনামিকা বেগমকে বললো----
—তোমাকে কষ্ট করতে হবে না, বড়মা। আমি করছি।
—কোন প্রয়োজন নেই। আমি করছি।
অনামিকা বেগমের এমন আচরনে কপালে কয়েক দস্তর ভাজ পরে ইউভানের। সে বুঝতে পারলো না যে আজ সূর্য কোন দিকে উদয় হয়েছে। ইরা থাকতে আজ নিজ থেকে তিনি কি করে রান্না করার কথা বলছেন? নাকি কোন রহস্য আছে এর পিছনে? ইউভান বুকে দু'হাত ভাজ করে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার পূর্ণ দৃষ্টি আবদ্ধ হলো অনামিকা বেগমের পানে। 
মিতালি বেগম এসব দেখে বিরক্তিকর স্বরে বললেন---
—আরে ভাবি, করুক না। আজ হঠাৎ এমন কেনো করছো শুনি? কাজের লোক থাকতে তোমায় কেনো খাঁটতে হবে?
অনামিকা বেগম তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টিতে দেখলেন ইরার মুখশ্রী। অতঃপর ঠাট্টা মেশানো কন্ঠে বললন---
—আমি চাই না এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ওর মতো অপয়া মেয়ের ছায়া আমার মেয়ের উপরে পরুক। এ সময় কোন অঘটন ঘটুক তা মোটেও প্রত্যাশা করছি না। ওর হাতের রান্না আমি আমার মেয়েকে খেতে দিতে চাই না। 
খানিকক্ষণ থেমে রইলেন তিনি। অতঃপর ইরার দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বললেন----
—আজ থেকে আমার মেয়ের আশেপাশেও দেখতে চাই না তোকে। যতদিন পর্যন্ত ভালোই ভালোই সবটা মিটছে ততদিন পর্যন্ত পিহুর গা ঘেষবি না বলে দিলাম। তোর কালো ছায়া ওর থেকে দূরে রাখবি।
ইরার চোখ টলটল করে উঠলো। তীব্র অপমানে গা রি রি করে উঠলো তার। অন্যদিন ইউভান থাকলে কোন কথা শোনায় না তাকে, জামাইয়ের সামনে সবসময় ভদ্রতা বজায় রাখতেন তিনি। অথচ আজ? ইউভানের সামনে ইরাকে এতোগুলো কথা শুনিয়ে দিলেন? এভাবে ছোট করলেন ইরাকে? 
ইরার শরীর কেঁপে উঠলো অনামিকা বেগমের থেকে এমন বানী শোনায়। সে অনুভব করলো তার হৃদয়ের ব্যাথা। বুকে যেনো কেউ ছুরি চালিয়ে দিলো। ক্ষতবিক্ষত করলো হৃদপিণ্ডটা। ইরা কান্না আটকে নিলো। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরার ফলে রক্ত বেড়িয়ে এলো সেখান হতে। হাতের ছুরিটা শক্ত করে ধরতেই হাত কেটে লাল রঙা তরল পদার্থের দেখা মিললো। তবে ইরা বরাবরে'ই ন্যায় শরীরের ব্যাথা অনুভব করতে ব্যর্থ হলো। হৃদয়ের যন্ত্রণার কাছে হাতের সামান্য আঘাত তার কাছে কিছুই মনে হলো না। 
পাশ থেকে ইউভানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো৷ হাতের মুঠোই শক্ত করে চেপে ধরে তাকিয়ে রইলো অনামিকা বেগমের তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টিতে। তার বুকে হালকা চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হলো। মস্তিষ্ক রাগে রি রি করে উঠলো। দপ করে আগুন জ্বলার ন্যায় জ্বলে উঠলো চোখজোড়া। 
এটা যদি আজ নিজের পরিবার হতো তাহলে নির্ঘাত কিছু একটা করে বসতো ইউভান। তবে পারলো না, কেননা এই পরিবারটা তার নয়; তার স্ত্রীর পরিবার। এখন যদি জামাই হয়ে কিছু বলতে যায় তাহলেই খারাপ। 
ইউভান নিজেকে শান্ত করলো। ইরার দিকে একপলক তাকিয়ে নজর দিলো অনামিকা বেগমের পানে। অতন্ত্য শীতল কন্ঠে বললো---
—ইরা, সুপ তৈরি করো।
অনামিকা বেগম কপাল কুঁচকে নিলেন। মিতালি বেগমের দিকে একবার প্রশ্ন বোধক চাহুনি নিয়ে তাকালেন ইউভানের দিকে। 
—ওকে কেনো বলছো? বললাম তো আমি করে দিবো।
—ইরা'ই করবে, আর শুনুন।
ইউভান এবার সরাসরি অনামিকা বেগমের মুখপানে তাকালো। চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বললো---
—কালো ছায়া ওকে বলবেন না, প্লিজ। বরং আমার মনে হয় ওর জীবনে আপনারা কালো ছায়া হয়ে এসেছেন। যারা ইরাকে এক সেকেন্ড শান্তি দেন না। কথায় কথায় অপমান তাচ্ছিল্য ছাড়া কিছু দিতে জানেন না৷ পরিবারের সদস্য হয়েও ইরাবতিকে এভাবে কাজের লোকের মতো থাকতে হয়। সারাদিন আপনাদের কাজ করে, সাথে আপনাদের গালমন্দ, কটুক্তি তো আছেই। 
এতো কিছু সহ্য করার পরেও তাকে কালো ছায়া বলেন কিভাবে? আপনাদের একটুও মায়া হয় না? মনে হয় না যে সেও একজন মানুষ, আপনাদের বাড়ির মেয়ে?
—ইউভান! তুমি কার সাথে কথা বলছো ভুলে যাচ্ছো? তুমি এবাড়ির জামাই। মুখটা সামলে কথা বলো।
ইউভান হাসলো। অনামিকা বেগমের থেকে চোখ ফিরিয়ে মাথা নিচু করে বললো---
—জানি তো। তাই তো সামান্য কথা বললাম। না হলে...!
—ইউভান...!
অনামিকা বেগমের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। নিজের জামাই যে ইরার জন্য তার সাথে এভাবে উঁচু গলায় কথা বলবে এ যে তার ভাবনাতীত। 
ইউভান আর কোন কথা বললো না। অনামিকা বেগম, মিতালি বেগম চোখে একরাশ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো ইউভানের পানে। ইউভান সেদিকে পাত্তা দিলো না। সে এক-পা এগিয়ে এসে ইরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ইরা ফুঁপিয়ে উঠলো। ইউভান চোখজোড়া শক্ত করে বন্ধ করে নিলো। মাথায় রাখা হাত শক্ত করে মুঠো করে নিয়ে গটগট পায়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে উঠে গেলো। 
নিচে অনামিকা বেগম একবার তাকালো ইরার ক্রন্দনরত মুখের পানে। না, ঠিক কাঁদে নি সে। শুধু অপমানে চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়ছে। শব্দ করে কান্না করার মতো ভাগ্য তো তার নেয়। অনামিকা বেগম তাচ্ছিল্যভরা নয়নে ইরার দিকে তাকিয়ে গটগট করে ত্যাগ করলো সেই স্থান। মিতালি বেগমও তার পিছু নিলো। 
সকলে যেতেই ইরা ধপ করে মেঝেতে বসে পরলো৷ তার চোখ বেয়ে টুপটুপ করে পানি ঝড়ছে। ঠোঁট কামড়ে ধরে কাটা হাত উঠিয়ে এনে ধরলো চোখের সামনে। লাল রঙা রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে সেথা হতে। ইরা তাচ্ছিল্য হাসলো। তার চোখের কোণায় নিজেকে নিয়ে ধিক্কারের রেখা ফুটে উঠলো। 
ইরা কাটা হাতটি শক্ত করে মুঠো করলো। অতঃপর জোড়ে একটা আঘাত করলো মেঝেতে। আঘাতপ্রাপ্ত জায়গাটা থেতলে গেলো। সাদা রঙা ফ্লোর রক্তের দাগে লাল হয়ে উঠলো। ইরা সেদিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলো।
-----------------
পরেরদিন....
সকাল সাড়ে ন'টার কাছাকাছি। ইরা দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে নিচে নামছে। হাতে বই, উদ্দেশ্য ভার্সিটি পৌঁছানো। আরো সকালে বের হতে চাইলেও পারে নি কাজের চাপে। সকালের সব কাজ শেষ করে তবে বের হচ্ছে। অনামিকা বেগমের থেকে পারমিশন নিয়েছে অবশ্য। সেদিন অভির কথা ফেরাতে পারেননি অনামিকা বেগম। তাই ইরা ভার্সিটি যাওয়ার কথা বললে আর না করেননি। তবে খুব ভালোভাবে 'হ্যাঁ' বলেছেন এমনও নয়। 
শর্ত ছিলো বাড়ির সকল কাজ শেষ করে যেতে পারলে যা। ইরা তাই ঝটপট করে সবটা শেষ করে তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো। হাতের ঘরিটার দিকে তাকিয়ে দেখলো সময় কম। ইরা বসার ঘরে এসে থেমে গেলো। ভাবলো কয়েকটা টাকা হলে রিক্সায় যেতে পারবে। এখন যদি হেঁটে যেতে চায় তাহলে বড্ড লেট হয়ে যাবে। 
ইরা মনের মধ্যে একরাশ আশংকা নিয়ে ধীরে ধীরে পা বাড়ালো বাবার রুমের দিকে। নিচ তলার এক কোণের ঘরে থাকেন তিনি। শুধু তিনি'ই নন।ইসহাক কায়সার, অনামিকা বেগমও নিচের ঘরেই থাকেন। কোমড়ে ব্যাথা থাকায় সিঁড়ি ডিঙিয়ে যখন তখন উপরে যেতে বড্ড বেগ পোহাতে হয় তাদের। তাই নিচের তালা দেওয়া ঘরগুলো পরিস্কার করে সেখানেই থেকে আসছেন বছরের পর বছর। 
ইরা ধীর পায়ে এসে থামলো নিহান কায়সারের ঘরের সামনে। দরজা হালকা ভিড়িয়ে দেওয়া। ইরা কাঁপা হাতে দরজায় টোকা দিলো। ঘরের ভেতর থেকে নিহান কায়সার বললেন----
—কে?
ইরা কাঁপা গলায় বললো----
—আ...আমি, ইরা।
চোয়াল দ্বয় শক্ত হয়ে এলো নিহান কায়সারের। ইরাকে নিজের আশেপাশে মোটে সহ্য করতে পারেন না তিনি। সবসময় দুরত্ব বজায় রেখে চলেন। কথা বলেন না বছরে একবার, তার মুখের দিকেও তাকাতে পারেন না ঘৃণায়। আর সেই ইরা আজ তার ঘরের দরজায় টোকা দেওয়ায় বেশ রাগান্বিত হলেন তিনি। কঠোর গলায় বললেন---
—কি চাই? ওই অপয়া মুখ নিয়ে এখানে কেনো এসেছিস তুই?কেনো এসেছিস বল? 
ইরা থমকে গেলো বাবার শক্ত গলায়। তার মুখ দিয়ে কথা বের হলো না। হঠাৎ করেই যে বিনা কারনে তিনি এভাবে রেগে যাবেন তা ভাবতে পারে নি ইরা। সে জানে বাবা তাকে সহ্য করতে পারে না। তাই বলে কোন কারন ছাড়া এমন শক্ত গলা মোটেও আশা করে নি সে। নিজের মেয়েকে কেউ এভাবে অপয়া বলতে পারে? 
পারে বোধহয়! এই তো বললো নিহান কায়সার। নিজের রক্তকে অপয়া বললো। নিজের অস্তিত্বকে অপমান কারলো। 
ইরা কোন উওর করলো না। যেভাবে এসেছিলো ঠিক সেভাবেই পিছন ফিরে হাঁটা ধরলো সামনের দিকে। কায়সার বাড়ির মূল ফটকে এসে দাঁড়াতেই মুখোমুখি হলো ইয়াশের সাথে। ইরা চোখ তুলে তাকালো না। নিস্তব্ধ ইরা নিজের নিস্তেজ দেহটাকে টেনে পা বাড়ালো কংক্রিটের লম্বা সরু রাস্তায়। পিছন থেকে ইয়াশ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। ইরার নিস্তেজ হয়ে যাওয়া মুখ তাকে অদ্ভুত যন্ত্রণা অনুভব করালো। ইয়াশ নড়াচড়া করলো না। তার চোখে অদ্ভুত শূন্যতার দেখা মিললো। 
----------------- 
ভার্সিটির গেট পেড়িয়ে ইরা ভেতরে প্রবেশ করলো। অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। এতোক্ষণে একটা ক্লাস শেষ। ইরা ভাবলো না তা নিয়ে। বরং পরের ঘন্টা থেকে ক্লাস করবে বলে ঠিক করলো। মলিন মুখ নিয়ে ক্যাম্পাসে পা রাখলো সে। 
তবে ভেতরে পা রাখতেই মুখোমুখি হলো অভির। যে গেটের সামনেই বাইকে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে। আশেপাশে তার বন্ধুরা হাসাহাসি করছে সাথে সিগারেট ফুঁকছে। ইরাকে আসতেই দেখেই চট করে উঠে দাঁড়ালো অভি। 
মাথার চুলে একবার হাত বুলিয়ে মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে গেলো ইরার পানে। তার হৃদয় ইরার দেখা পেয়েই পুলকিত হলো। তৃপ্তির হাসি হাসলো সে। ইরার মুখোমুখি এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। অভিকে সামনে পথ আঁটকে দাঁড়াতে দেখে হাঁটা থামিয়ে দিলো ইরা। রোদের তাপে তার চোখমুখ কুঁচকানো, মাথা নিচু করা। 
অভি খেয়াল করলো, ইরার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সবসময়'ই চুপচাপ আর বিষন্নতায় ছেয়ে থাকলেও আজ যেনো একটু বেশিই অন্যরকম লাগলো। অভি ইরাকে খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে দেখতে লাগলো। হাতের দিকে নজর যেতেই বুকটা ধক করে উঠলো অভির। চোখমুখে তীব্র অস্থিরতা খেলা করতে লাগলো। শুকনো ঢোক গিয়ে কাঁপা কাঁপা হাত তুলে তাক করলো ইরার শুভ্র রঙা ব্যান্ডেজে মোড়ানো হাতের দিকে। কন্ঠ স্বর রোধ হয়ে এলে অভির। কাঁপা কাঁপা ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে বললো---
—কি...কি হয়েছে হাতে? ব্যান্ডেজ করা কেনো?
ইরা মাথা তুলে তাকালো অভির অস্থির মুখপানে। ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বললো----
—সামান্য কেটেছে।
অতঃপর সামনের দিকে পা বাড়িয়ে বললো----
—আমি যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
ইরা চলে গেলো। অন্যদিকে অভি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। ইরার বিষন্ন চেহারা, তার চোখের সেই শূন্যতা আর হাতের কাটা দাগটা অভির হৃদয়ে ঝড় তুলে দিলো। অভি শুকনো ঢোক গিলে চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো। 
চলবে..........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন