ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের শেষ পঙ্গক্তি তুমি

১০ম পর্ব

লেখক: মোনালিসা মেহরোজ

#প্রেমের_শেষ_পঙক্তি_তুমি #পার্ট_১০ 

#মোনালিসা_মেহরোজ
সকাল সকাল সূর্যের আলোর মৃদু ছোঁয়ায় ঘুম ভেঙে যায় ইয়াশের। জানালার ফাঁক গলিয়ে রোদের উষ্ণতা মুখে আছড়ে পরতেই আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে ইয়াশ৷ মাথাটা ঝিমঝিম করছে তার, চোখমুখ কুঁচকে নিয়ে হাত দিয়ে সড়ালো গায়ে জড়ানো দু'দুটো চাদর। অবশ্য সাড়ানোর সময় সে একটু অবাক'ই হলো। একসাথে দু'টো চাদর তো সে পরে না, তাহলে! সদ্য ঘুম থেকে উঠার দরুন সেসব আর ভাবতে গেলো না যুবক। প্রতিদিনের ন্যায় হাত দিয়ে চাদর সড়িয়ে নিচে নামতে গিয়েই খেয়াল করলো সে পুরোপুরি উলঙ্গ অবস্থায় শুয়ে আছে। 
আঁতকে উঠল ইয়াশ। তার চোখজোড়া বড়বড় আকার ধারণ করলো, মনে হলো এই বুঝি কোটর হতো বেড়িয়ে আসবে। তরিঘরি করে পুনরায় চাদর দিয়ে মুড়ে নিলো নিজেকে। গালে চাপর মারতে মারতে বলল---
—তওবা তওবা, আস্তাগফিরুল্লাহ। একি! আমার সম্মান লুট করলো কে? আমি তো এভাবে শুয়ে থাকি না। কোন ছিনাল খুললো আমার কাপড়?
ইয়াশ তব্দা খেয়ে গেলো। মাথায় হাত দিয়ে টেনে ধরলো চুল। দাঁতে দাঁত চাপতে লাগলো সে। ধীরে ধীরে মনে করতে লাগলো কালকের ঘটা ঘটনাগুলো। নেশা করা এবং গায়ে জ্বর আসার ফলে কালকের ঘটনা বুঝতে বেশ খানিকটা সময় লাগলো ইয়াশের। কপালে ভাজ ফেলে চাদরটা সড়ালে লক্ষ করলো বিছানার এক কোণে কুঁচকে পরে আছে টাওয়াল। ইরার কথা মাথায় আসতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো ইয়াশের। ইয়াশ নিজের চুল খামচে ধরলো। চোখজোড়া শক্ত করে বন্ধ করে নিয়ে চুপচাপ থাকলো খানিকক্ষণ। 
বেশ কিছুটা সময় নিয়ে ইয়াশ চোখজোড়া খুলে তাকালো পাশে৷ বেডসাইড টেবিলে এখনো রাখা আছে কালকে রাতে জলপট্টি দেওয়ার পাত্র ও কাপড়। ইয়াশের চোখ সেদিকে স্থির হয়ে গেলো। মনে করতে লাগলো রমণীর হরিণীর ন্যায় টানাটানা চোখজোড়া। যা কালকে রাতে ইয়াশের ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছিলো, ভয়ার্ত নয়নে ইয়াশের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য কেমন ছটফট করছিলো। ইয়াশ চুপ করে বসে রইলো। তার মুখের ভাবভঙ্গি বোঝা দায়। 
ইয়াশ আবারো একবার তাকালো নিজের শরীরের পানে। কি মনে করে জানি বাঁকা হাসি খেলে গেলো তার সিগারেটে পোড়া কালচে ঠোঁট জোড়ায়। বসা হতে উঠে এগিয়ে গেলো ওয়াশরুমের দিকে। 
--------------------
সকাল সকাল ড্রয়িংরুম ভরে গেছে কায়সার পরিবারের সকল সদস্যে। ইসহাক কায়সার সহ তার দু'ভাই সোফায় বসে খবরের কাগজে মত্ত। মাঝে মাঝে একে অপরের পানে তাকিয়ে খোশগল্প করছেন। কোয়েল সোফায় বসে পিহুর সাথে টুকটাক কথা বলছে। ইউভান নিচে নামে নি এখনো৷ 
অনামিকা বেগমসহ মিতালি বেগম রান্নাঘরে সকালের নাস্তার ব্যাবস্থা করছেন। ব্যাবস্থা বললে ভুল হবে, ইরা রান্নাসহ সকল কাজ করছে আর অনামিকা বেগম পাশ থেকে সব দেখে চলেছেন। মিতালি বেগম বসে বসে আপেল চিবুচ্ছেন। 
ইরা ইয়াশের রুম থেকে বেড়িয়ে নিজের ঘরে গিয়ে অযু করে ফজরের নামাজ আদায় করে। অতঃপর নিচে এসে ঢোকে রান্নাঘরে। আর তখন থেকেই সে এখানে। 
অন্যদিকে অভি, বারবার রান্নাঘরে আসতেও চেয়েও আসতে পারছে না। সকাল থেকে ড্রয়িংরুম ও রান্নাঘরের আশেপাশে ঘুরঘুর করেও দেখা পাচ্ছে না ইরার। কাল রাতের পর থেকে ইরার মুখটা দেখতে না পেয়ে হৃদয়খানি ছটফট করছে তার। একি বাড়িতে থেকেও যদি না দেখা পায় তাহলে থেকে কি লাভ? অভি তো এখানে এসেছেই ইরার জন্য। 
অভি মন খারাপ করে সোফায় ধপ করে বসে পরলো৷ মাথার চুলের ভাজে হাত বুলিয়ে গায়ে জড়ানো টি-শার্টখানা টেনে ঠিক করলো। অভিকে এমন ছটফট করতে দেখে কপাল কুঁচকে নিলো কোয়েল৷ 
—অভি! কোন সমস্যা? তখন থেকে দেখছি ছটফট করছো।" 
অভি কোয়েলের দিকে তাকায়। উপস্থিত সকলের দৃষ্টি এখন তার দিকেই। অভি মলিন হেঁসে বলো,,
—না, ঠিক আছি।
—খিদে পেয়েছে মনে হয়। দাঁড়াও তোমার আন্টিকে বলি।
অভি বাঁধা দিলো না। এই সুযোগে রান্নাঘরের সকলে বেড়িয়ে আসবে ভেবে চুপ রইলো অভি। ইসহাক কায়সার নিজের স্ত্রীকে ডাকলেন। অনামিকা বেগম তরিঘরি করে এসে দাঁড়ালেন সামনে। অভি কিছুই বললো না, শুধু দেখে গেলো সবটা। 
—হয়েছে তোমাদের? হলে খেতে দাও।
—এই হয়েই এসেছে, আর একটু। 
—হুম।
অনামিকা বেগম ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। অভি উঠে চুপচাপ এগিয়ে গেলো রান্নাঘরের দিকে। দরজার কাছে আসতেই নজরে পরে কাজে ব্যাস্তরত ইরাকে। পাশেই হাতে আপেল নিয়ে বসে আছেন মিতালি বেগম। অভি সামান্য কেশে দৃষ্টি আকর্ষণ করলো তাদের। মিতালি বেগমসহ ইরাও তাকালো অভির পানে। ইরা অভিকে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলো। 
—আন্টি, বড় আন্টি আপনাকে ডাকছে।
—কি করতে?
—দেখুন না!
মিতালি বেগম অলস ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন। ইরার দিকে একপলক তাকিয়ে পা বাড়ালেন বাহিরের দিকে। অভি মিতালি বেগমকে যেতে দেখে ভেতরে পা রাখলো। বাঁকা নজরে ইরার দিকে একবার তাকিয়ে এগিয়ে গেলো ফ্রিজের পানে। ফ্রিজ খুলে পানির বোতল বের করে পান করতে করতে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো ইরার পিছনে৷ ইরা অভিকে খেয়াল করে কপালে ভাজ ফেললো। গম্ভীর কন্ঠে বললো---
—কি চাই?
—তোমাকে?
—কি?
ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে অভির দিকে তাকালো ইরা৷ হাতে ধরা গরম খুন্তি এনে ধরলো অভির সামনে। মুখে হালকা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুললো৷ ইরার এমন ব্যাবহারে বড়বড় চোখ করে শুকনো ঢোক গিললো অভি। এদিক-ওদিক নজর ঘুড়াতে লাগলো। এক হাত নিয়ে মাথার পিছন দিকটা চুলকাতে চুলকাতে বোকা বোকা হাসি ছুঁড়লো। 
—ইয়ে...মানে, ইরাবতী....। 
—হ্যাঁ বলুন, কি? শুনতে পাই নি ঠিক।
—ইয়ে..মা...মানে.....!
—হ্যাঁ বলুন শুনছি।
ইরা গরম খুন্তি অভির চোখের সামনে এনে ঘুড়াতে লাগলো। তার মুখে পৈশাচিক হাসি লেপ্টানো। ইরার এমন অদ্ভুত ব্যাবহারে কলিজা শুকিয়ে এলো অভির। ভাবলো, সত্যি সত্যিই কি তাকে ছ্যাঁকা দিবে না-কি? ইরাকে দেখে তো সিরিয়াস মনে হচ্ছে। যদি সত্যি সত্যি দিয়ে দেয় তখন? 
অভি ইরার পানে একবার তাকিয়ে এক-পা এক-পা করে পিছিয়ে যেতে লাগলো। মুখটা তার শুকিয়ে গেছে ভয়ে। ইরা তা লক্ষ করে বাঁকা হেঁসে সেও সামনে এগুতে লাগলো। এক সময় হঠাৎ করেই পিছন ফিরে রান্নাঘর থেকে দৌড়ে পালালো অভি৷ অভির এমন কান্ডে উচ্চস্বরে হেঁসে দিলো ইরা৷ কোমড়ে হাত ভর করে আপন মনে হাসির ঝংকার তুলতে লাগলো। আজ কতদিন পর সে প্রাণ খুলে হাসছে তা যেনো মনেই পরে না৷ ইরার মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করতে লাগলো। 
পিছন হতে ইরার হাসির শব্দ কানে পৌঁছাতেই থমকে গেলো অভির পা। সে কান খাড়া করে শুনতে লাগলো ইরার হাসির ঝংকার। তার মন প্রফুল্লচিত্তে লাফিয়ে উঠলো৷ অভির ঠোঁটের কোনে প্রশান্তির হাসি খেলে গেলো৷ ধীরে ধীরে পিছন ফিরে এসে দাঁড়ালো রান্নাঘরের দরজার সামনে। অতঃপর মোহনীয় দৃষ্টি তাক করলো ইরার হাস্যজ্জল মুখপানে।এই প্রথম ইরার এমন প্রাণ খোলা হাসি দেখলো অভি। পরিচয় হওয়ার পর থেকে যখনি দেখেছে তখনি লক্ষ করেছে ইরার মুখের বিষন্নতা। কখনো একটুখানি চঞ্চলতা অথবা আনন্দ দেখে নি সে৷ হাসি তো দূরের কথা। 
অভি ইরার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখমুখ ভরে উঠলো তীব্র মুগ্ধতায়। এভাবে যে ইরার হাসি দেখতে পারবে এ যে তার ভাবনাতীত। অভির মনে বসন্তের কোকিলরা গান গাইতে লাগলো, স্নিগ্ধ ফুলের সুভাস যেনো ঝরে পরতে লাগলো ইরার হাসি থেকে। 
হাসির মাঝখানেই ইরার নজর হঠাৎ করে দরজার দিকে গেলো। অভিকে এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফুটো হয়ে যাওয়া বেলুনের ন্যায় ফুস হয়ে গেলো ইরার হাসি। ইরা হাসি থামিয়ে চুপ করে এক হাত অপর হাতের সাথে কচলাতে লাগলো। বাঁকা নজরে একবার তাকালো অভির পানে। অভির গাঢ় চাহুনি বেশ অস্বস্তিতে ফেললো ইরাকে। অভি তা বুঝতে পেরে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেঁসে বললো----
—এভাবে আমার সামনে হেঁসো না, অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক করে পোটল তুললে বাচ্চা-কাচ্চাদের মুখ দেখতে পারবো না। বেশি বেশি বাচ্চা-কাচ্চা পয়দা করে ফুটবল টিম বানানোর বড্ড শখ আমার। আমার এই ইচ্ছে অথবা স্বাধীনতা, এভাবে হরণ করতে পারো না তুমি।
অভি চলে গেলো। ইরা বড়বড় চোখ করে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। কি বলে গেলো সে? ফুটবল টিম? ইরা মাথায় হাত দিলো। 
---------------
অনামিকা বেগম ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিলে একে একে সকলে সেখানে উপস্থিত হলো। কিছুসময়ের মধ্যে সকলে হাত রাখলো খাবারে। অতঃপর আপন মনে উপভোগ করতে লাগলো খাবারের সাধ। রোজকার ন্যায় আজও অনামিকা বেগম ও ইরা সকলকে খাবার বেড়ে দিয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। 
ইউভান ও ইয়াশও এসে বসলো খানিকবাদে। ইরা ইয়াশের দিকে একপলক তাকালো। ভাবলো জ্বর পুরোপুরি কমেছে কি-না তা কি জিজ্ঞেস করবে? তবে সকলের উপস্থিতিতে আর তা হয়ে উঠলো না। ইরা এগিয়ে গিয়ে ইউভানকে খাবার বেড়ে দিলো। ইউভান মুচকি হেঁসে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলো। পরিবর্তে ইরাও হাসি ছুড়লো। ইরা ইউভানকে খাবার দিয়ে ধীর হস্তে ইয়াশের প্লেটে খাবার বাড়লো। ইয়াশ কিছুই বললো না। গম্ভীর মুখে মাথা নিচু করে হাত রাখলো প্লেটে। 
ইরা ইয়াশকে খাবার দিয়ে তার পিছনেই মাথা নিচু করে দাঁড়ালো। 
—ইরা, তরকারিটা দে তো।
পিহুর ডাকে ইরা পা বাড়াতে চাইলো। তবে তার আগেই অনামিকা বেগম ইরাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলেন মেয়ের পানে। বাঁকা নজরে একবার তাকিয়ে দেখলেন ইরার মুখশ্রী। ইরা মাথা নিচু করে নিলো। তার চোখ ছলছল করে উঠলো অনামিকা বেগমের এরুপ আচরনে। সে বেশ বুঝতে পারলো বড়মার এমন ব্যবহারের কারন। সে যে তার মেয়ের কাছে ইরার মতো অপয়া মেয়েকে যেতে দিতে চায় না তা তো পানির ন্যায় পরিস্কার। 
তাই ইরাও আর আগ বাড়িয়ে কিছু করতে গেলো না। বরং চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো সেথায়। আর এর সবটাই তীক্ষ্ণ নজরে খেয়াল করলে ইউভান। তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো অজানা ব্যাথায়। অভি অনামিকা বেগমের এরুপ আচরন খেয়াল করলেও তা সে স্বাভাবিকভাবেই নিলো। কেননা অভি জানে না অনামিকা বেগমের নিষেধাজ্ঞা। 
খাওয়া শেষ হলে সবার দিকে একবার নজর বুলিয়ে উঠে দাঁড়ালো ইয়াশ। টিস্যু পেপারে হাত মুছতে মুছতে পেছনে দিকে ঘুড়ে দাঁড়ালে মুখোমুখি হয় ইরার। ইরা মাথা নিচু করে পিছনে সরে যেতে নিলে ইয়াশ নিজের মুখটা দ্রুতগতিতে ইরার কানের কাছে এগিয়ে নিয়ে আসে। এক ভ্রু তীরের ন্যায় উঁচিয়ে ফিসফিস করে বলে----
—তুই কি কাল রাতে জ্বরের সুযোগ নিয়ে আমার ৭২ লাখ দেখে নিয়েছিস? ভোলাভালা আমিটার এভাবে ইজ্জত হরণ করলি তুই! আমি না-হয় মদের নেশায় তোর সাথে ওমনটা করেছিলাম। কিন্তুু তুই, ছ্যাঁহ।
তব্দা খেয়ে যায় ইরা। আচমকা এমন কথা তার কর্ণগোচর হতেই থমকে যায় মস্তিষ্ক। চোয়াল আপনা-আপনি'ই হাঁ হয়ে গেলো৷ চোখজোড়া বড়বড় করে তাকায় ইয়াশের মুখপানে। ইয়াশ কথাটা শেষ করে আগের ন্যায় গম্ভীর মুখশ্রী নিয়ে গটগট করে পা বাড়ায় উপরের দিকে। পিছনে ফিরে তাকায় না একবারও। যেনো কিছুই হয় নি। 
ইরা এখনও স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে। তার মুখে তীব্র অবিশ্বাস্যের ছাপ। ইয়াশের মতো গম্ভীর, একরোখা জেদি পুরুষ যে এভাবে লাগাম ছাড়া কথা বলতে পারে ভেবেই ইরা হাজার ভোল্টের শখ খেলো। ইরাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকে নিলো পিহু। 
—কি রে? ওভাবে থমকে আছিস কেনো?
ইরা নিজেকে সামলে নিলো। অনেক কষ্টে ঠোঁটের কোণায় এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে বললো,
—ক...কিছু না তো!
ইরার কথায় পিহু 'ওও' বলে আবারো খাবারে মনোযোগ দেয়। অন্যদিকে অভি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ইয়াশের চলে যাওয়ার দিকে একবার তাকালো। অতঃপর নজর ঘুড়িয়ে তাকায় ইরার অস্থির মুখপানে।
---------------- 
খাওয়া দাওয়া শেষ করে ইসহাক কায়সার, নিহান কায়সার ও মুবিন কায়সার ব্যাবসার দিকটা সামলাতে অফিসে গেলেন। যাওয়ার আগে ইয়াশকেও বললেন একবার যেতে। যত তারাতাড়ি সম্ভব সবকিছু ইয়াশকে বুঝিয়ে দিয়ে তিন ভাই অবসর গ্রহন করবেন বলে ঠিক করলেন। তাই ইয়াশকে একটু একটু করে সবটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। ইয়াশ মাঝেমধ্যে অফিসে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে তদারকি করে আসে। বেশি সময় অফিসে পাড় করে না সে৷ 
অনামিকা বেগম ও মিতালি বেগম সকালের আহার সম্পূর্ণ করে নিজ নিজ ঘরে গেলেন বিশ্রাম নিতে।কোয়েল বেড়িয়ে গেলো বন্ধুবান্ধবদের সাথে৷ ইউভান পিহুকে নিয়ে উপরে গেলো। পিহুর শরীরটা ভালো না। গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে শরীরে নানান জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে৷ ডাক্তারের পরামর্শে রুটিন অনুযায়ী চলছে সে। ইউভানেরও চাকরির ছুটি শেষ হয়ে এলো প্রায়। আর বেশিদিন থাকতে পারবে না পিহুর সাথে। তাই যে ক'টা দিন আছে প্রিয়তমার সাথেই কাটাচ্ছে। 
ইরা ডাইনিং টেবিল পরিস্কার করে এগিয়ে গেলো রান্নাঘরের দিকে। এখনো খাবার খায় নি সে। ভাবলো আর কিছু সময় পর খাবে৷ 
বসার ঘরে হাত পা ছড়িয়ে সোফায় শুয়ে আছে অভি। নজর পুরোপুরি আবদ্ধ ফোনের স্কিনে। ইরা রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে এসে উপস্থিত হলো বসার ঘরে। অভির দিকে একপলক তাকিয়ে পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে। অভি শোয়া হতে উঠে বসে ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকায় ইরার দিকে৷ ইরাকে উপরে যেতে দেখে গলা উঁচিয়ে ডাক দিলো৷ 
—ইরাবতী, ওয়েট।
অভির ডাকে থেমে যায় ইরা। পিছন ফিরে কপাল কুঁচকে বলে---
—কি?
—এদিকে এসো।
—কেনো?
—আরে এসো না!
ইরা ঠোঁট উল্টে ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ায় অভির সামনে। অভির সামনাসামনি আসতেই ইরার এক হাত হেঁচকা টান মেরে পাশে বসালো অভি। চমকে উঠলো ইরা। টাল সামলাতে না পেরে ধপ করে বসে পরলো সোফায়৷ কপালে ভাজ ফেলে প্রশ্ন বোধক চাহুনি নিক্ষেপ করলো অভির পানে। অভি সেদিকে একবার তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে পাশ থেকে বের করে আনলো ফাস্ট-এইড বক্স। ইরার দিকে না তাকিয়ে'ই বক্সটা খুলে ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস বের করে আনলো। ইরা ভ্যাবলার মতো সেদিকে তাকিয়ে।
অভি ইরার থেকে কোনরূপ পারমিশন ছাড়া'ই ইরার আঘাতপ্রাপ্ত হাত টেনে নিজের হাতের মধ্যে নিলো। অভির এমন কাজে তীব্র অস্বস্তি জেঁকে ধরলো ইরাকে। সে বুঝতে পারলো অভি কি করতে চাইছে। ইরা মৃদুভাবে নিজের হাত সরাতে চেষ্টা করলো। মাথা নিচু করে মিনমিনে আওয়াজে বললো---
—কি করছেন কি? ছাড়ুন প্লিজ।
—চুপচাপ বসে থাকো।
ইরা অভির কঠোর মুখশ্রীতে তাকালো। অভির হাত খুব নিপুণ ভাবে ইরার ব্যান্ডেজে মোড়ানো হাতটায় নিজের কাজ করতে লাগলো। ছোট্ট একটা কেঁচি দিয়ে কাটতে লাগলো শুভ্ররাঙা ব্যান্ডেজখানা। ইরা সেদিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বললো---
—ছাড়ুন, কেউ দেখে ফেললে ভুল বুঝবে। আমি পরে করে নিবো।
অভি এবার সরাসরি ইরার ভয়ার্ত মুখপানে তাকালো। অভি বেশ বুঝতে পারছে ইরার ভয় কোথায়। কেউ যদি এভাবে দেখে ফেলে তাহলে ইরাকে কটুক্তি করতে ছাড়বে না। অভিকে কেউ কিছুই বলবে না৷ উল্টো সবটা ইরার উপরেই যাবে। তবুও অভি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে নড়লো না। অনড় থাকলো নিজ কাজে। শীতল গলায় বললো---
—কেউ দেখবে না। দেখলে তা আমি বুঝে নিবো। এখন চুপচাপ থাকো, কাজ করতে দাও আমায়।
অভি ইরার ব্যান্ডেজ খুলে ফেললো৷ ইরা চোখ বন্ধ করে নিলো। কোণ বেয়ে একফোঁটা অশ্রু গালে এসে থামলো। অভি এবার পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ইরার থেঁতলে যাওয়া জায়গাটাই। অভির চোখ স্থির হয়ে গেলো। বুকের বাম পাশটায় চিনচিনে ব্যাথায় মুষরে গেলো৷ কাঁপা কাঁপা হাতটা আলতো করে ক্ষতস্থানে রাখলো। ইরা তা অনুভব করতেই কেঁপে উঠলো। ক্ষতটা বেশ গভীর। ছুঁড়ির আঘাতের সাথে সাথে মেঝেতে হাতের সংঘাত। ডাক্তার দেখানো উচিত ছিলো, তবে তা কি হবে? কে ডাক্তার দেখাবে তাকে? 
অভি তুলো'তে তরল পদার্থ নিয়ে কাটা স্থানটা পরিস্কার করতে লাগলো। চারিদিকে নিরবতায় মোড়ানো৷ ইরার চোখ বন্ধ, অভির চোখ আবদ্ধ ইরার হাতে। 
ঠিক সেই সময়'ই সিঁড়ির উপর থেকে কিছু ভাঙার আওয়াজ আসে। কাচের টুকরো গুলো যেনো মেঝেতে আছড়ে পরছে। পুরো বাড়ি সেই শব্দ কেঁপে উঠলো। আচমকা এমন শব্দে চমকে উঠে ইরা। অভির নজরও সেদিকে যায়। ইরা অভির হাত থেকে নিজের হাত আলাদা করে ছটফটে পায়ে দৌড় লাগায় উপরের দিকে। মনে মনে আশংকা সৃষ্টি হলো, কার কোন ক্ষতি হলো না তো? 
ইরার পিছন পিছন অভিও পা বাড়ায়। সিঁড়ির উপরে আসতেই নজরে পরে ভাঙা ফ্লাওয়ার ভাস, যা ভেঙে গুড়িয়ে আছে। বিভিন্ন টুকরো গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেঝেতে৷ ইরা সামনে তাকালো, ঘাড় ঘুড়িয়ে আশেপাশে দেখতে লাগলো কারো উপস্থিতি আছে কি-না। তবে কেউ নেই। করিডোরের এপাশ-ওপাশ পুরোপুরি ফাঁকা, একদম নিরব। ইরা কপাল কুঁচকে তাকালো অভির পানে। অভির কপালেও ভাজ পরেছে। 
ইরা-অভির ভাবনার মাঝেই সেখানে তরিঘরি করে উপস্থিত হলেন অনামিকা বেগম। মেঝেতে কাচের টুকরো গুলো দেখে আঁতকে উঠলেন তিনি। মুখে হাত দিয়ে বললেন---
—একি? আমার পছন্দের ফ্লাওয়ার ভাসটা কে ভাঙলো?
অভি ইরাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বললো---
—জানি না আন্টি। আমি ইরা নিচে বসে ছিলাম। উপর থেকে আওয়াজ হলো তাই আসলাম। এসে দেখি এসব এভাবে পরে আছে।
অনামিকা বেগম কপাল কুঁচকে নিলেন। 
—কিন্তু এটা কে করলো?
—কি জানি?
অনামিকা বেগম অভির দিকে একপলক তাকিয়ে 'ওহ' বলে উঠলেন। অতঃপর মাথা নিচু করে থাকা ইরাকে বললেন--
—এগুলো পরিস্কার কর।
কথাটা শেষ করে অনামিকা বেগম যেভাবে এসেছিলেন ঠিক সেভাবেই চলে গেলেন। ইরা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঝাড়ু এনে মেঝে পরিস্কার করতে হাত লাগালো। তবে অভি ঝাড়ুটা খপ করে কেড়ে নিলো ইরার হাত থেকে৷ কড়া দৃষ্টি আবদ্ধ করলো ইরার মুখপানে।
—নিচে গিয়ে বসো। আমি এগুলো পরিস্কার করে আসছি। কাঁটা হাতে এসব করতে হবে না, যাও।
—কিন্তু.....।
অভির কড়া দৃষ্টিতে মাথা নুইয়ে নিলো ইরা। ধীর পায়ে ত্যাগ করলো সেই স্থান। অভি ধীর হস্তে কাচের টুকরো গুলো পরিস্কার করতে লাগলো। ইরা সিঁড়ির নিচ থেকে মাথা উঁচিয়ে একবার তাকালো অভির পানে। তার চোখদুটোতে ইরার জন্য মায়ার সাগর সৃষ্টি হয়েছে। অভির কড়া চোখের পিছনে ছিলো ইরার জন্য একরাশ যত্ন। চোখজোড়া ছলছল করে উঠলো ইরার। অজানা ব্যাথায় বুকটা ভার হয়ে এলো। কন্ঠ স্বর রোধ হয়ে এলো তার। 
ইরা ধপ করে সোফায় বসে পরলো। মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখজোড়া বন্ধ করে ফেললো। মলিন হেঁসে আওড়ালো---
—ফুল থাকতে কাঁটার প্রতি মানুষের এতো ঝোঁক কেনো?
চলবে..........
( সকলে একটু ভালে রেসপন্স করো তো। এতো কম কেনো রেসপন্স? ভিউজ তো ঠিকই ভালো আসছে।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন