ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের শেষ পঙ্গক্তি তুমি

১৩তম পর্ব

লেখক: মোনালিসা মেহরোজ

#প্রেমের_শেষ_পঙক্তি_তুমি #পার্ট_১৩ 

#মোনালিসা_মেহরোজ
ইরা ধীর পায়ে শিকদার বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ালো। ততক্ষণে উঠান ভরে গেছে মানুষের ভীরে। সকলে ঘুম থেকে উঠে সকালের খাবার-দাবার শেষে এখানে এসে বসেছে। চারিদিকে আত্মীয় স্বজনদের ভীর। তবে এখানকার কেউই ইরার অপরিচিত নয়। কাল রাতে তারা এসেছিলো আর আজ সকাল সকাল মেঘলা বেগমের বাড়ির লোকজন এসেছে। যাদের সাথে ইরার পরিচয় অনেক আগেই হয়েছিলো। ইরা সকলের দৃষ্টি সীমানার আড়ালে দাঁড়িয়ে সবটা লক্ষ করতে লাগলো। 
চারিদিক খোশগল্পে মেতে উঠেছে। বাহিরে প্যান্ডেলের লোকজন এসেছে গায়ে হলুদের স্টেজ সাজাতে। কাল গায়ে হলুদ, পরেরদিন বিয়ে। অনুষ্ঠানের সকল আয়োজন বাহিরের বাগানে করা হচ্ছে। শিকদার বাড়ির বিশাল আকৃতির বাগান নতুন রূপে সাজতে শুরু করেছে। 
হলুদের আরো একদিন দেরি থাকলেও আসিফ আলম দেরি করেন নি আয়োজনে। পরবর্তীতে যেনো কোন সমস্যা দেখা না দেয় তাই তিনি আগেভাগেই সবটা প্রস্তুত করছেন। নিজের একমাত্র মেয়ের বিয়েতে কোনরূপ খামতি তিনি রাখতে চান না। তাই এতো আয়োজন।
ইরা উঠানে এসে আশেপাশে তাকালো। চারিদিকে সুক্ষ্ম নজর বুলিয়ে খুঁজে চলেছে তার ভরসাস্থল পিহু অথবা ইউভানকে। এর মাঝেই সেখানে উপস্থিত হন অনামিকা বেগম। ইরাকে দেখেই বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে তাকান তার দিকে। চাপা কন্ঠে বলেন---
—এতো সময় কোথায় ছিলি তুই? নিজেকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলিস, শুনি?
ইরা মাথা নিচু করে মিনমিনে আওয়াজে বলে---
—ধান ক্ষেতের দিকে।
অনামিকা বেগম ক্রুদ্ধ নয়নে ইরার দিকে তাকান। অতঃপর আশেপাশে নজর বুলিয়ে ইরার হাত ধরে গটগট করে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলেন----
—সকলের জন্য দুপুরের খাবারের আয়োজন করতে হবে, সাথে আয় কাজ আছে।
ইরা অনামিকা বেগমের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটতে লাগলো। তার বলতে ইচ্ছে করলো—বড়মা, আমি সকালের খাবার খাইনি এখনো, ক্ষিদে পেয়েছে।' তবে ইরা তা বললো না। এমনিতেই তার উপর অনামিকা বেগম চড়াও হয়ে আছেন। এখন খেতে চাইলে বাড়ি ভর্তি আত্মীয়-স্বজনদের তোয়াক্কা না করে নির্ঘাত কথা শুনিয়ে দেবেন। তাই ইরা চুপ করে গেলো। 
ইরাকে নিয়ে অনামিকা বেগম রান্নাঘরে পা রাখলেন। অতঃপর দেখিয়ে দিলেন অপরিচ্ছন্ন থালাবাসনগুলো-কে। ইরা অনামিকা বেগমের দিকে একবার তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেদিকে পা বাড়ায়। এখন তার এই-সবগুলো থালাবাসন মেঁজে নিতে হবে। 
ইরা থালাবাসন গুলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে থালায় হাত ছোঁয়াতেই তৎক্ষনাৎ বাধ সাধলেন মেঘলা বেগম। ছটপটে পায়ে ইরার সামনে এসে ইরার হাত থেকে বাসন কেড়ে নিলেন। অতঃপর অবাক নয়নে তাকালেন ইরার পানে। কপাল কুঁচকে বললেন----
—একি ইরা, তুমি এসবে কেনো হাত রাখছো?
ইরার জবাব দেওয়ার আগেই অনামিকা বেগম সবজি কাটতে কাটতে বললেন---
—ভাবি ওকে করতে দাও। থালাবাটি গুলো পরিস্কার করে নিক বরং, তুমি এদিকে এসো।
মেঘলা বেগম ইরার হাত ধরে ধীর পায়ে অনামিকা বেগমের সামনে এসে দাঁড়ালেন। অতঃপর শীতল কন্ঠে বললেন---
—কি বলছো আপা? ইরা কেনো এসব করতে যাবে? সে আমাদের বাড়ির আত্মীয়, তাকে দিয়ে কেন কাজ করাবো আমি?
—ওর অভ্যেস আছে ভাবি, বাড়িতে করে। এখানেও পারবে।
মেঘলা বেগম হাসেন। 
—সে তোমাদের বাড়ির মেয়ে, আপা। আমার বাড়ির অতিথি। তাই ওখানে কি করে না করে তা দিয়ে আমার কোন কাজ নেই। এখানে এসব করবে না ব্যাস। আমার সংসারে আমি অতিথি দিয়ে কাজ করাই না। 
—ভাবি!
অনামিকা বেগমের দৃষ্টিতে বেশ রাগের আভাস ফুটে উঠলো। তিনি অপমান বোধ করলেন মেঘলা বেগমের কথায়। মেঘলা বেগম তা দেখে হাসলেন। ইরা অনামিকা বেগমের দিকে একবার তাকালো। অতঃপর মিনমিনে আওয়াজে বললো---
—খালামুনি, আমি পারবো করতে। করি না প্লিজ?
মেঘলা বেগম উত্তর করলেন না। ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে গেলেন। অতঃপর আলতো হাতে একটা থালায় খাবার বাড়লেন। থালাটা এনে টেবিলে দিয়ে ইরাকে সেখানে বসালেন তিনি। ইরার গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে বললেন---
—তোমাকে কিছু করতে হবে না। এখন খাবারটা শেষ করো আম্মু, আমি দেখেছি তুমি এখনো কিছুই খাওনি। তাই তারাতাড়ি খেয়ে নাও।
ইরার চোখ ছলছল করে উঠলো। মাথা নিচু করে তাকিয়ে রইলো খাবারের পানে। কেউ যে তার খাওয়া না খাওয়া, সুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রেখেছে তার ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে ইরার। ইরা মেঘলা বেগমের চোখের দিকে একবার তাকালো— যেখানে একরাশ স্নেহ, মায়া খেলা করছে। 
ইরা আলতো হাতে মেঘলা বেগমকে জড়িয়ে ধরলো। ইরার এমন কান্ডে ঠোঁট জোড়া প্রসারিত করে হাসলেন মেঘলা বেগম। আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে খেতে বলে সামনের দিকে পা বাড়ালেন তিনি।
পাশ থেকে অনামিকা বেগম এসব দেখে চোয়াল দ্বয় শক্ত করে নিলেন। ইরার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ধরলেন তিনি। ফিসফিস করে নিজ মনে আওড়ালেন---
—তোর ডানা আমি পরে কাটবো।
মেঘলা বেগম চলে যেতেই সেখানে উপস্থিত হলো নেহা৷ চারিদিকে নজর বুলিয়ে বাঁকা হেঁসে তাকালো ইরার দিকে। অতঃপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো তার সামনে। নেহার ঠোঁটের কোণায় শয়তানি হাসি দেখে কপাল কুঁচকে নিলো ইরা। নজর ঘুড়িয়ে অনামিকা বেগমের পানে তাকলে তিনিও তাচ্ছিল্য হেঁসে ইরার দিয়ে এগিয়ে আসেন। ইরার কপালের ভাজ গাঢ় হয়, তবে কোন প্রশ্ন করলো না সে। 
-------------------- 
সময় তখন সকাল সারে এগারোটা। 
শিকদার বাড়ি থেকে খানিকদূরে, ফসলি জমির পাশে বাঁশের তৈরি ছোট্ট একটা মাচানে বসে আছে ইরা। তার চোখ ভর্তি পানি, গাল লাল টুকটুকে হয়ে গেছে কান্না করার ফলে৷ মাঝে মাঝে হেঁচকি তুলে কাঁদছে। হৃদয়টা যেনো ছিঁড়ে যাচ্ছে তীব্র অপমানে। নিজের পুরনো ক্ষতগুলো যে এভাবে কেউ আলগা করে দিবে তা কি ইরা ভেবেছিলো?হঠাৎ করে যে পুরনো কাসন্দি ঘাটা হবে তা তো ইরার কল্পনাতীত। 
মা-ভাইয়ের চলে যাওয়ার পিছনে সে দায়ী, এ কথার দোহাই দিয়ে তো কম কষ্ট কেউ দেয় নি তাকে। কি পেয়েছে সে? ছোট্ট বেলা থেকে কি দিয়ছে তাকে? শুধু মাত্র অপমান, একবুক যন্ত্রণা আর তাচ্ছিল্য ছাড়া। সেও তো মানুষ, তারও তো একটা হৃদয় আছে। তাহলে সকলে তার সাথে এমনটা কেনো করে? কেনো বোঝে না তাকে? 
অনামিকা বেগমের সামনে নেহা তার ক্ষতগুলো এক লহমায় তাজা করে দিলো। গায়ে হাত তুলতে পর্যন্ত দ্বিধাবোধ করলো না, অথচ বড়মা! সে নিশ্চুপ! তার মনে কি ইরার জন্য এক বিন্দুও মায়া নেই? তারও তো সন্তান আছে। তাহলে! ইরা ভেবো পেলো না। 
সে শুকনো ঢোক গিলে জিভ দ্বারা ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো। কাঁপা ঠোঁট জোড়া কান্নায় ভেঙে আসছে বারংবার। ইরা হাত উঁচিয়ে গাল মুছে চোখজোড়া বন্ধ করে চুপ করে গেলো কিছুসময়। মনে করতে লাগলো আবছা কিছু অবয়ব, কল্পনায় আঁকা কিছু স্মৃতি। যা তার অবচেতন মন গড়ে তুলেছে। 
ইরা ভাবলো—আজ যদি ভাই থাকতো? ইশশ, কতই না ভালো হতো। ইরাকে তাহলে নিশ্চয়ই আর এসব কিছু সহ্য করতে হতো না! তার ভাই-তো তাকে ভালোবাসতো, তার জন্যই তো আজ সে নেই। তাকে বাঁচাতেই তো সে নিজের প্রাণ ত্যাগ করেছিলো। তাহলে ভাই নিশ্চয়ই ইরাকে এসব যন্ত্রণা, অপমান, তাচ্ছিল্য সহ্য করতো দিতো না! 
নিজের বোনকে দিনের পর দিন এভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতো না সে। বাবাও হয়তো তাকে এতোটা দূরে রাখতো না নিজের থেকে। সেও হয়তো ভালেবাসতো, মাথায় হাত বুলিয়ে বুকে জড়িয়ে নিতো। মা বলে ডাকতো, এক'দু বেলা নিজের হাতে খাইয়ে দিতো আদর করে। 
ইরা নিজের নিরস প্রাণহীন দেহটা মাচানে হেলে ফেললো। পুরনো ব্যাথা গুলো যেনো নতুন করে শেষ করে দিচ্ছে তাকে। অনামিকা বেগম ও নেহার কথাগুলো কানে বাজছে এখনো। যা তার মনটাকে আরো বেশি করে বিষন্ন করে তুলছে। চারিদকের মৃদু হাওয়া তার শরীর স্পর্শ করছে, অথচ মনটা হাহাকার করে উঠেছে। মরুভূমির ন্যায় শুকনো অনুভূতি হচ্ছে সেথায়। 
ইরা দু'হাতে নিজের কান চেপে আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকায় অদূরের মাঠে। যেখানে কৃষকদের মেলা বসেছে। খানিক দূরে দূরে অনেক কৃষক ধানের আগাছা পরিষ্কার করতে ব্যাস্ত, কেউ আবার জমিতে পানি দেওয়ার সুশ্রী পথ। রাখালরা মাঠের সরু পথ দিয়ে গরু-ছাগল নিয়ে যাচ্ছে। সূর্যের তেজ ধীরে ধীরে বাড়ছে। ইরা সেদিকে অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। 
ঠিক তখনি দূর হতে ইউভানের গলা ভেসে আসলো। ইরা চমকে ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকালো পিছনের দিকে। হ্যাঁ, ইউভান'ই আসছে। তার হাতে কি জানি ধরা। ইরা বুঝতে পারলো না ঠিক। 
ইউভান চেঁচাতে চেঁচাতে ইরার সামনে এসে দাঁড়ালো। ইরা কপাল কুঁচকে তাকালো ইউভানের হাতের দিকে। ইউভান মুচকি হেঁসে একটা আইসক্রিম ইরার হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বললো---
—এই নাও, এটা তোমার জন্য। গ্রামগঞ্জেই তৈরি, একেবারে মালাই দেওয়া।
ইরা আইসক্রিমটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার মুখে আচমকাই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। আইসক্রিমে ঠোঁট ছুঁইয়ে চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো ইরা৷ মুখে প্রশান্তির হাসি এঁকে বললো----
—বহুবছর পর।
—তা কেমন সাধ বলো?
ইউভান নিজের আইসক্রিমে দাঁত বসাতে বসাতে বললো। এই মধ্যেই তীব্র ঠান্ডায় দাঁত শিরশির করে উঠলো ইউভানের। আইসক্রিম মুখ হতে বের করে 'আহ' করে উঠলো। ইরা তা দেখে ফিক করে হেঁসে উঠলো। এতো সময় যাবৎ হৃদয়টা বিষন্নতায় মোড়ানো থাকলেও ইউভানের সংস্পর্শে তা এক লহমায় উধাও হয়ে গেলো। ইরার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি লেপ্টে গেলো। 
ইরা আইসক্রিম মুখে পুরতে পুরতে বললো---
—সাধ দারুন। তবে আপনি কি তা গ্রহণ করতে পারছেন তো?
ইউভান কপাল কুঁচকে বললো---
—কেনো? সাধ পাবো না কেনো?
—না মানে..আপনার দাঁতের ডাক্তার দেখানো উচিত, ভাইয়া। বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন তো, তাই শরীরের নানান অর্গান দুর্বল হয়ে পরছে। যেমন.... দাঁত।
ইউাভান বাঁকা নজরে ইরার দিকে তাকালো। সামান্য দাঁত শিরশির করাই তাকে বুড়োর তকমা লাগিয়ে দিলো? এটা কি ঠিক?
ইউভান মুখ বাঁকিয়ে বললো---
—এভাবে বলো না ইরাবতী, শেষমেশ বউ ছেড়ে চলে যাবে। তোমার বোনটা তো আবার খুবই সেনসিটিভ না?
ইরা হাসলো, সাথে ইউভানও মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুললো ঠোঁটের কোণে। এর মধ্যেই হঠাৎ করে ইউভানের নজর গেলো সেই রুপালী চেইনটার দিকে, যা কালকে সে দেখেছিলো। রোদের আলোই ইরার গলায় তা ভিষন ঝলমলে হয়ে উঠেছে। চকচক করে জানান দিচ্ছে তার উপস্থিতি। ইউভান ইরার সরল মুখপানে তাকালো। যে এই মুহূর্তে বাচ্চাদের ন্যায় ঠোঁটের কোণায় আইসক্রিম লাগিয়ে বসে আছে। ইউভান অন্যমনস্ক হয়ে বললো---
—ইহান কায়সারের সাথে কি হয়েছিলো, ইরা?
ইরা চুপ করে গেলো। হাসিমুখটা মুহূর্তেই হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়ে সেথায় একরাশ বিষন্নতা ফুটে উঠলো। ইরার চোখ আবারো ছলছল করে উঠলো। ইউভানের দিকে তাকিয়ে মলিন হাসলো। ইরা কাঁপা গলায় বললো---
—পা...পাহাড়ের খা*দে তলিয়ে গেছে।
—কি করে?
ইউভানের কণ্ঠে সবটা জানার তীব্র আহ্বান। ইরা মলিন হেঁসে ঠোঁট কামড়ে ধরলো।আকাশের পানে তাকিয়ে বললো----
—অ....আমাকে বাঁচাতে গিয়ে, তাই শুনেছিলাম আপির মুখ থেকে।
—তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে মানে?
—আমি তখন অনেক ছোট্ট ছিলাম। মা ছিলো না, বাবা এমনকি পরিবারের কোন সদস্যই আমাকে দেখতো না৷ ভাইয়া নিজেই আগলে রাখতো আমাকে। তখন বয়স ঠিক কত ছিলো জানিনা, আমার কিছু মনেও নেই। শোনা কথা আর-কি।
তখন নাকি সকলে মিলে পাহাড় দেখতে গিয়েছিলাম আমরা। একটা রিসোর্টেও উঠেছিলাম। বিকেলের রৌদ্রময় আবহাওয়ায় আমাকে নিয়ে ভাইয়া পাহাড়ের ঢালের কাছে ঘুড়তে যায়। সেখানে সকলেই ছিলো। আমি না-কি হাঁটতে হাঁটতে বেখেয়ালিভাবে খাদের কাছে এগিয়ে যাই, আর তখনি পরে যেতে নিলে ভাইয়া আমাকে বাঁচিয়ে নেয়। কিন্তু নিজে টাল সামলাতে না পেরে ভাইয়া খাদে....।"
ইরা ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। তার চোখে দিয়ে আবারো জলের বর্ষন নামতে লাগলো। হাত দিয়ে মুখ চেপে অন্যদিকে ঘুড়ে বসলো ইরা। পরিস্থিতি হঠাৎ করেই গম্ভীরতায় ছেঁয়ে গেলো। 
ইউভান ইরার কান্নারত মুখশ্রীর পানে তাকালো। তবে কোন কথা নয়, কোন শব্দ নয়। শুধু মাথায় নরম হাতের স্পর্শ একে ইউভান ধীর পায়ে পিছনে ফিরে হাঁটা দিলো। পিছনে ফেলে গেলো ক্রন্দনরত ইরাকে।
------------------- 
ইরা বেশ খানিকটা সময় পর আস্তে আস্তে শিকদার বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। প্রতিটি পদক্ষেপে ইরার বুকের হাহাকার বাড়ছে বই কমছে না। অনামিকা বেগম আর নেহার মুখোমুখি হতে সে চায় না, মনে করতে চায় না সকলের সেই ঘটনাটা। কেননা তা মনে হলেই ইরার অবচেতন মন সবকিছুর দোষী নিজকেই করছে। ঘৃণা জন্মাচ্ছে নিজের প্রতি। সবকিছুর জন্য নিজেকে তীব্র ভাবে দায়ী করতে ইচ্ছে করছে। তবে ইরা তা চায় না, এতোটা কঠিন শাস্তি সে গ্রহণ করতে রাজি নয়। 
ইরা এসবি ভাবতে ভাবতে শিকদার বাড়ির মূল ফটক পেড়িয়ে ভেতরে পা রাখে। বাগানে কাজ করছে— ক্যাটারিং সার্ভিসের কর্মীরা ।বাড়িসহ পুরো বাগানের এড়িয়া ডেকোরেশন করতে ব্যাস্ত তারা। ইরা সেদিকে একবার তাকিয়ে ধীর পায়ে উঠানে এসে থামে। নজরে পরে কায়সার পরিবার সহ মেঘলা বেগমের মায়ের পরিবার সেখানে উপস্থিত। ইসহাক কায়সার, নিহান কায়সার ও মুবিন কায়সার উঠানে চেয়ার ফেলে বসে আছেন৷ 
ইরা একবার বাবার দিকে তাকালো। অতঃপর মাথা নিচু করে সামনের দিকে পা বাড়ালো। ঠিক তখনি নিলার মামি ইরাকে দেখে কপাল ভাজ ফেলে বলেন---
—ইরা না? 
ইরা সুমনা বেগমকে চেনে। তাই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। ইরার সম্মতি পেয়ে সুমনা বেগম হাসিমুখে ইরাকে কাছে ডাকেন।ইরা সৌজনমূলক হেঁসে এগিয়ে যায় সেদিকে। 
ইরা কাছে যেতেই সুমনা বেগম ইরার গালে হাত রেখে বলে---
—মাশাল্লাহ, নিহান ভাই আপনার মেয়েটা তো একদম পুতুলের মতো সুন্দর। কতদিন বাদে দেখলাম।
সুমনা বেগম ইরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে তার কথায় নিহান কায়সার চুপ করে রইলেন। চোখ তুলে তাকালেনও না একবার। তার মুখে শুধু অজানা এক তাচ্ছিল্য। পাশে ইসহাক কায়সার কুটিল হেঁসে ইরার বিষন্ন মুখের দিকে তাকালেন।
নিহান কায়সারের কেন সাড়াশব্দ না পেয়ে কপাল কুঁচকে নিলেন সুমনা বেগম। তবে কিছুই বললেন না। নিরবে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন শুধু। তিনি জানেন ইরার ভাগ্য, তাই আর কথা বাড়ালেন না। ইরার দিকে ফিরে মুচকি হেঁসে ত্যাগ করলেন সেই স্থান। 
অন্যদিকে ইরা বড্ড কষ্ট পেলো বাবার এরূপ আচরনে। সবসময় এড়িয়ে গেলেও আজ বাহিরের মানুষের সামনে এই অবহেলাটা বড্ড যন্ত্রণা দিলো ইরাকে। সে নিঃশব্দে মাথা নিচু করে পা বাড়ালো ঘরের দিকে। মনে মনে আওড়ালো---
—তুই ভুল ইরা, তুই ভুল। তুই মোমের মতো নরম হয়ে আলো বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলিস, তবে ওরা আলো নয়—তোর ধংস চায়।
ইরা সিঁড়ির কোণ বেয়ে মাথা নিচু করে দ্রুত পায়ে উপরের দিকে যেতে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই কারো সাথে ধাক্কা খেলো তার মাথা, ইরা চোখ বন্ধ করে 'আহ' করে উঠলো। আচমকা এমন সংঘর্ষে পরে যেতে নিলে ইরা নিজেকে সামলাতে কাঠের তৈরি সিঁড়ির রেলিং এক হাত দিয়ে ধরে ফেললো। ফলে পরে যাওয়া হতে বেঁচে গেলো সে। উঠানের অনেকেই ইরার দিকে তাকিয়ে। অনামিকা বেগম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইরার দিকে। 
 ইরা আলতো করে চোখ খুলে সামনের দিকে তাকালো। ইয়াশ দাঁড়িয়ে আছে, প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে। তার মুখের ভাব চিরাচরিত গম্ভীর। যেখানে অনুভূতির ছাপ অস্পষ্ট। 
ইয়াশের সাথেই ধাক্কা খেয়েছে বুঝতে পেরে মাথা নিচু করে নিলো ইরা। ইয়াশ ইরাকে দেখে বিরক্তিকর চাহুনি নিয়ে ধপাধপ পা ফেলে নিচের দিকে চলে গেলো৷ যাওয়ার আগে বিরবির করে আওড়ালো---
—স্টুপিড একটা।
ইরা সেদিকে একবার তাকিয়ে হাসলো। অতঃপর আবারো হাঁটা ধরলো উপরের দিকে৷ 
চলবে........
(রিচেক দেওয়া হয় নি, ভুল হলে দোষ নাই🤥🤥। আর যাদের মনে হচ্ছে গল্পটা এগুচ্ছে না তারা আর একটু অপেক্ষা করো।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন