#সুইটবার্ড
#কলমে_মায়াবিনী_ঐন্দিলা
#পর্ব-১
দুঃখের তিমির রজনী শেষে, প্রকৃতির কঠিন তান্ডবের নিনাদ যখন শান্ত হলো, তখন ধরণীর বুকে নেমে এলো এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি। সেই স্নিগ্ধ জলধারা নিমিষেই তপ্ত প্রকৃতিকে করে তুলল সতেজ ও প্রাণবন্ত।
চলতি গ্রীষ্মের প্রখর উত্তাপ যখন শেষের পথে, তখন অম্বরের কোণে কোণে কালবৈশাখীর মেঘ জমিয়ে প্রকৃতি যেন এক নতুন আহবানের বার্তা দেয়। ধরণীর এই রূপবদল আর লীলাখেলায় মেতে উঠেছে সমগ্র বাহ্যজগৎ।
শহরের আনাচে-কানাচে, পূর্ব গগনে উঁকি দেওয়া রক্তিম আলোকখণ্ড যেন এক মায়াবী চাদরের মতো সময়ের সাথে সাথে নিজের পরিধি বাড়িয়ে চলেছে।
সিলেটের মালনিছড়া—মনোরম চা বাগানের জন্য এই জনপদ দেশজুড়ে সমাদৃত। এখানকার সুবাসিত চা পাতা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হয়, যা এই অঞ্চলকে করে তুলেছে এক অনন্য পর্যটন কেন্দ্র। মালনিছড়ার ঠিক পূর্ব প্রান্তের শেষ সীমান্তে, সবুজের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুদিন সময়ের এক ঐতিহ্যবাহী বাড়ি।
দূর থেকে দেখলে এটিকে কোনো রাজপ্রাসাদ বলেই ভ্রম হয়। নব্বইয়ের দশকের এই পুরোনো স্থাপত্যে আজ লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া; ঠিক যেন প্রাচীন ইটের ভাঁজে ভাঁজে নতুনের নান্দনিক আভিজাত্য খেলা করছে।
এই অবিরাম বৃষ্টি আর কর্দমাক্ত পথকে উপেক্ষা করে, ভোরের আরামের ঘুমকে বিসর্জন দিয়ে মালনিছড়া থেকে কুমারগাঁওয়ের SUST (শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়)
ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে এক তরুণী। আজ তার প্রথম বর্ষের প্রথম দিনের ক্লাস। মেয়েটির পুরো নাম "তিতলী খান আবিরা"। সদ্য এইচএসসি পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য তথা গোল্ডেন এ+ অর্জন করে সে আজ কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিভাগে পা রেখেছে।
নিজের মেধা আর অদম্য পরিশ্রমকে পুঁজি করে দেশের সেরা প্রযুক্তি বিদ্যাপীঠে পড়ালেখা করা এবং ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার এক আকাশছোঁয়া স্বপ্ন তার চোখে। আর এই লালিত স্বপ্নই তাকে প্রতিদিন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি জোগায়।
অতীতের ছায়া ও বেঁচে থাকার লড়াই
তবে আবিরার এই হাসিখুশি অবয়বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর শূন্যতা। আজ তার মা-বাবা কেউই এই পৃথিবীতে বেঁচে নেই। দীর্ঘ ১০ বছর আগে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তারা চিরতরে বিদায় নেন।
সেই থেকে আবিরার জীবনের মোড় শুরু,এক আবছায়াময় ও অন্ধকারচ্ছন্ন জীবনের নিগূঢ় প্রহর গোনা। মা-বাবার মৃত্যুর পর জীবনের প্রবাহমান সময়ে তাকে বারবার অশুভ ঝটিকার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
অতীতের সেই কালো অধ্যায়ের ঠিক সাত বছর পর, এক কলঙ্কিত ষড়যন্ত্র আবিরার দিকে একমুখী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, যা তার জীবন ও যৌবনকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ভাগ্যবিধাতা হয়তো তার জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিলেন।
এক অলৌকিক ইশারায় সেবার বেঁচে যায় আবিরা; বেঁচে যায় তার এক পবিত্র সত্তা, রক্ষা পায় তার নিরূপিত জীবন। কীভাবে সে সেই ঘোর বিপদ থেকে মুক্ত হয়েছিল, তা আজ তার স্মৃতিতে খুব একটা স্পষ্ট নয়। সময়ের নিষ্ঠুর নিয়মে কিছু ঘটনা সে ভুলে যেতে শিখেছে ঠিকই, কিন্তু নিয়তির ললাট থেকে তো সেই দাগ মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।
তার বাবা এমির খান ও মা অধরা মিরা খান ভালোবেসে একে অপরের হাত ধরেছিলেন। কিন্তু দুই পরিবারের তীব্র রাজনৈতিক শত্রুতা আর বংশগত শত্রুতার কারণে কেউ তাদের এই পবিত্র বন্ধন মেনে নেয়নি।
প্রতিকূল সমাজ আর পরিবারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে, এমির খান ও অধরা খান নিজেদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে সিলেটে চলে আসেন। শূন্য থেকে শুরু করে নিজের সততা ও অদম্য প্রচেষ্টায় এমির খান গড়ে তোলেন 'AK Group'। তবে নিয়তি ছিল নিষ্ঠুর।
নিজের আকস্মিক মৃত্যুর আভাস হয়তো তিনি আগেই পেয়েছিলেন, তাই মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি একমাত্র কন্যা আবিরার নামে উইল করে যান।
বাবা-মায়ের আকস্মিক প্রস্থানের পর আবিরার সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে দূর সম্পর্কের চাচা রহমান আহমেদ ও চাচি আরিশা বেগমের কাঁধে। বর্তমানে আবিরা যে প্রাসাদোপম বাড়িতে থাকে, তা মূলত তার চাচারই পিতৃভিটা।
নিজেদের কোনো সন্তান না থাকায়, তাঁরা আবিরাকে নিজেদের সন্তানের মতোই পরম স্নেহ ও আদরে আগলে রেখে বড় করেছেন। তাঁদের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আবিরার ভেতরের ক্ষতগুলোকে কিছুটা হলেও উপশম করেছে।
নতুন দিগন্ত ও দুঃস্বপ্নের রাত
মাসখানেক আগে শখের বশে কেনা নিজের স্কুটিটির সাহায্যে মাত্র ৩০ মিনিটেই যানজটহীন সকালে SUST ক্যাম্পাসে পৌঁছে যায় আবিরা। প্রথম দিন হওয়ায় নতুন এই বিশাল ক্যাম্পাসে CSE ডিপার্টমেন্ট খুঁজে পেতে তার বেশ বেগ পেতে হলো।
অবশেষে কয়েকজন সহৃদয় শিক্ষার্থীর সহায়তায় সে IICT বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলায় নিজের গন্তব্য খুঁজে পায়। প্রথম দিনের ক্লাসে প্রথাগত পড়াশোনা তেমন হয়নি, শিক্ষকরা মূলত সবার পরিচিতি পর্ব নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর আবিরা যখন বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে এলো, তখন তার মনটা কেমন যেন বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেল।
আজকের এই শুভ দিনেও মনটা তার ভালো নেই। প্রতিদিনের মতো গত রাতেও সে এক ভয়ঙ্কর ও লোমহর্ষক স্বপ্ন দেখেছে। প্রতি রাতের এই দুঃস্বপ্নগুলো আবিরার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, যার কারণে তাকে নিয়মিত ঘুমের ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই মানসিক যন্ত্রণা এখন তার নিত্যসঙ্গী।
গত রাতের স্বপ্নে সে দেখেছিল—একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন, ধোঁয়াটে এবং রক্তাক্ত ঘর। যার চতুর্মাত্রিক দেওয়ালে টাঙানো ছিল বিকৃত ও ভয়ঙ্কর কিছু জানোয়ারের অবয়ব।
ঘরের বাইরে থেকে ভেসে আসছিল একদল শিয়ালের বিকট ও অশুভ চিৎকার, যা শুনে মনে হচ্ছিল বাড়িটি কোনো গভীর ও নির্জন অরণ্যের মাঝে অবস্থিত। হঠাৎ করেই পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে মানুষের আত্মা কাঁপানো আর্তনাদ।
ভয়ে ও আতঙ্কে আবিরা ঘরের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে কাঁপছিল। তার নিজের হৃদস্পন্দনের প্রতিটি বিট যেন কানে এসে হাতুড়ির মতো আঘাত করছিল।
সে চিৎকার করে কাউকে ডাকতে চেয়েছিল, কিন্তু এক অদৃশ্য, অবোধ্য এবং আসুরিক শক্তি যেন তার গলা টিপে ধরেছিল—মুখ থেকে কোনো শব্দ বেরোচ্ছিল না। নিরুপায় আবিরা কেবল কেঁদেই যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল চোখের জল আজ বুঝি শেষ হবে না। ঠিক তখনই আবদ্ধ ঘরের ভারী দরজাটা সশব্দে খুলে গেল।
কালো আবায়া পরিহিত এক রহস্যময় অবয়ব রুমে প্রবেশ করে আবিরার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। লোকটির ডান হাতের দিকে নজর পড়তেই আবিরার বুক কেঁপে উঠল—তার হাতে ছিল একটি বিশালাকার সিরিঞ্জ, যার ভেতরে টলটল করছে এক অদ্ভুত সবুজ রঙের তরল পদার্থ।
লোকটি যখন সিরিঞ্জটি উঁচিয়ে আবিরার দিকে এগোতে থাকল, তখন আবিরা তার শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে এক চূড়ান্ত চিৎকার দেওয়ার জন্য বুক ভরে শ্বাস নিল, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই…
চলবে......
(যেহেতু আমার প্রথম লেখা গল্প এটি। সেহেতু ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টি স্বরূপ দেখবেন 🙏)