#সুইটবার্ড
#মায়াবিনী_ঐন্দিলা
#পর্ব_৪
জুন মাসের শুরুতেই ডেনমার্কের প্রকৃতি যেন এক নতুন রূপ ধারণ করে। গ্রীষ্মের আগমনে তাপমাত্রার পারদ তখন ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের দিকে ছুঁইছুঁই। মিষ্টি রোদের আমেজ চারপাশে, অথচ সেই একই শহরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা বহুতল প্রাসাদসম ‘ব্লাডি হাউস’-এর ভেতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তিন তলার পুরো ফ্লোর জুড়ে গড়ে তোলা রাজকীয় আলিশান রুম। ঘরের চার দেয়াল ডার্ক থিমে সাজানো—কালো আর ধূসর রঙের এক অদ্ভুত ও মারকাটারি মেলবন্ধন। চারপাশের সমস্ত আসবাবপত্র অফ-ব্ল্যাক।
রুমের দুইপাশের দেয়ালে সুসজ্জিতভাবে সাজানো রয়েছে বিশ্বের বিরল ও মারাত্মক সব আগ্নেয়াস্ত্র আর রিভলভার। তার পাশেই সারিবদ্ধভাবে রাখা চোখধাঁধানো ভিনটেজ ও দামী ওয়াইনের কাঁচের বোতল।
রুমটির মাঝখানে থাকা সাতটি এয়ার কন্ডিশনার টানা ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে চলায় পুরো কক্ষটি যেন এক হিমশীতল বরফঘরের রূপ নিয়েছে।
কক্ষের ঠিক কেন্দ্রস্থলে থাকা বিশালাকার কিং সাইজ বেডের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে এভান। চোখ দুটি বন্ধ থাকলেও তার নাসারন্ধ্রের ঘন নিঃশ্বাস আর টানটান চোয়াল বলে দিচ্ছে, ভেতরের আগ্নেয়গিরি যেকোনো মুহূর্তে ফেটে পড়তে পারে।
তার চওড়া, দানবীয় পিঠের ঠিক মাঝখান দিয়ে লম্বালম্বি জড়িয়ে আছে একটি সাদা ব্যান্ডেজ—যা তাজা রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। অথচ তার চেহারায় ব্যথার কোনো ছাপ নেই; যেন এই মারাত্মক আঘাতটি তার কাছে এক সামান্য মশার কামড় ছাড়া আর কিছুই নয়।
হঠাৎ কক্ষের প্রবেশদ্বারে শব্দ হলো। আধুনিক পাঁচ ধাপের বায়োমেট্রিক ও ডিজিটাল টেকনোলজির দরজার লক খুলে ভেতরে প্রবেশ করল একজন। জেকব—এভানের ডান হাত, তার অন্ধকার সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছায়া। এভানের গ্যাংস্টার জীবনের প্রথম দিন থেকে প্রতিটি রক্তক্ষয়ী পদক্ষেপে জেকবই ছিল তার একমাত্র অনুগত সঙ্গী। ঘরের নিঃশব্দ ও থমথমে পরিবেশ সামলে জেকব ধীরপায়ে এভানের বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। এভানের অনুপস্থিতিতে এই সাম্রাজ্য পরিচালনার সমস্ত দায়ভার 'জেকব দানিয়াল' নিজের কাঁধে তুলে নেয়—একদম নিজের গর্ভজাত ভাইয়ের মতো।
পিঠের তাজা ক্ষতটির দিকে তাকিয়ে নীরবতা ভাঙল জেকব। বিশ্বস্ত সূত্রে সে জেনেছে, সুইডেনের শীর্ষ ডন ‘অঙ্কন নোহ’-এর এক গোপন দল অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই আক্রমণ চালিয়েছিল। কড়া নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে তারা এভানের পিঠে ছুরি বসিয়ে দেয়। তবে এভানের ক্ষিপ্র ক্যারাটে টেকনিক আর আত্মরক্ষার কৌশলের কাছে তারা পরাস্ত হয়।
"বস, এখন কেমন বোধ করছেন?" অত্যন্ত শান্ত গলায় শুধাল জেকব।
চোখ না খুলেই গম্ভীর ও ভারী গলায় এভান উত্তর দিল, "তুমি কি আমাকে দুর্বল ভাবছ, জেকব?"
"কখনোই না, বস। তবে নোহ এবার আপনাকে শুধুই ভয় দেখাতে পাঠায়নি, তার উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি আপনাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া।"
কথাটি শোনামাত্রই এভান এক ঝটকায় চোখ দুটি মেলল।
রক্তজবার মতো লাল হয়ে উঠেছে তার চোখের চাউনি। তার চোখ জোড়ার বিরল সবুজ ও বাদামী মিশ্রিত মণি দুটোতে লালচে ভাব ফুটে ওঠায় তাকে কোনো হিংস্র পশুর মতো দেখাচ্ছে।
এক হাত বেডের ওপর ভর দিয়ে সে সোজা হয়ে বসল। জেকব তাকে ধরে সাহায্য করতে গেলে এভান হাত উঠিয়ে তাকে থামিয়ে দিল।
"কাল আমরা ইতালি যাচ্ছি," এভানের কণ্ঠে এক হিমশীতল সিদ্ধান্ত। "রোমে ইতালিয়ান মাফিয়া প্রধান অভের ছেলের জমকালো ওয়েডিং সেরিমনি। ওখানে আমাকে উপস্থিত থাকতেই হবে। কারণ, নোহ-ও সেখানে উপস্থিত থাকবে।"
"কিন্তু বস, আপনার শরীরের এই আঘাত নিয়ে—"
কথা শেষ করতে দিল না এভান।
শক্ত গলায় কেটে দিয়ে বলল, "আই এম ফিলিং বেটার। নোহ-এর সামনাসামনি দাঁড়িয়ে তার চোখের দিকে তাকাতে হবে আমার। ওহ্, বাই দ্য ওয়ে... যে ১২ জন শুটারকে ও পাঠিয়েছিল, তাদের 'বিশেষ উপহার' বানিয়ে নোহ-এর ঠিকানায় পার্সেল করেছ তো?"
জেকবের ঠোঁটের কোণে এক নিষ্ঠুর হাসির রেখা ফুটে উঠল, "হ্যাঁ বস, সেই কাজ বহু আগেই শেষ। নোহ তার উপহার পেয়ে গেছে।"
ক্রোধে এভানের মুখের সুগঠিত জো-লাইন স্ফটিকের মতো শক্ত হয়ে উঠেছে। অথচ তার বাম গালের গাঢ় টোলটি তার পুরুষালী সৌন্দর্যে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করে। আপাতদৃষ্টিতে তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এই বিধ্বংসী চেহারার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক হৃদয়হীন মাফিয়া বস।
নিজেকে কিছুটা শান্ত করে এভান আদেশ দিল, "আজ রাতেই আমার প্রাইভেট জেট রেডি রাখবে। গেম এখন কেবল শুরু।”
বাংলাদেশ:
গতকাল থেকেই আবিরার চাচা-চাচি বিশেষ কাজে ঢাকার বাইরে। বিশালাকার বাড়িটিতে এখন শুধু আবিরা আর তার দেখভালের জন্য বিশ্বস্ত দুজন কেয়ারটেকার ও সিকিউরিটি গার্ড রয়েছে। বিকেল থেকেই আকাশ ভেঙে নেমেছে কালবৈশাখীর রুদ্র রূপ। বর্ষণের শব্দে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছে। মাগরিবের নামাজের পর ঘুম ভাঙতেই আবিরা দেখল ঘরের আলো নেই, জেনারেটর চলছে। কিন্তু যে হারে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে, জেনারেটরও বেশিক্ষণ টিকবে বলে মনে হচ্ছে না।
একটু খটকা লাগায় আবিরা হাতে একটা টর্চ নিয়ে পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখল—ঝড়ের পানি কোথাও ঘরে ঢুকছে কি না। সব ঠিকঠাক দেখে নিজের ঘরে ফিরে যখন টেবিল থেকে মোবাইলটা হাতে নিল, তখন তার চোখ ছানাবড়া! মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে চাচার ১২টি মিসড কল!
উৎকণ্ঠা নিয়ে দ্রুত কল ব্যাক করতেই অপর প্রান্ত থেকে চাচার শঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে এলো, "মামনি! কোথায় ছিলে তুমি? এতগুলো কল দিলাম, ধরছ না কেন? আমি তো চিন্তায় মরেই যাচ্ছিলাম!"
আবিরা নিজেকে সামলে নিয়ে নরম গলায় বলল, "আরে ছোট বাবাই, ভয় পেয়ো না। আমি একটু গভীর ঘুমে ছিলাম, তাই রিংটোন শুনতে পাইনি।"
ষগভীর শ্বাস ফেলার শব্দ পাওয়া গেল অন্যপাশ থেকে, "যাক বাবা! আমরা পরশুদিনই ফিরে আসব। নিজের খেয়াল রেখো, কেমন?"
"ঠিক আছে ছোট বাবাই, তোমরা সাবধানে এসো। আল্লাহ হাফেজ।"
ফোনটা রেখে আবিরা তার ঘরের বিশাল বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ঝাপসা বৃষ্টির ছাঁট এসে তার মুখে-চোখে লাগছে, অথচ তার মনটা পড়ে আছে অন্য কোথাও। আজ বিকেলে ঘটে যাওয়া সেই অদ্ভুত ঘটনাটি তার মস্তিষ্ককে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে।
বিগত ১০ বছর ধরে সে জেনে এসেছে, তার বাবা-মা এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর। কিন্তু আজ—পুরো ১০ বছর পর—একজন অচেনা লোক কলেজের সামনে তাকে দাঁড় করিয়ে এমন কিছু তথ্য দিয়ে গেল, যা শুনে আবিরার পায়ের নিচের মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম! লোকটা দাবি করেছে, তার মা-বাবার মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, ওটা ছিল এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড!
কে ছিল সেই লোকটা? সে কী করে এত কথা জানে? তার কথাগুলো কি সত্যি, নাকি এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে? কারা ছিল সেই ধূর্ত অপরাধী, যারা তাদের পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল?
ভাবতে ভাবতে আবিরার মাথা ভারী হয়ে ওঠে। পুরো জীবনটাই যেন এক জট পাকানো রহস্যের গোলকধাঁধা।
হঠাৎই তার হাতের মোবাইলটি ‘টুন টুন’ শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল অচেনা একটা নম্বর থেকে আসা দুটি পর পর টেক্সট মেসেজ।
উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রথম মেসেজটি ওপেন করল সে:
"Baby girl, are you ready?"
দ্বিতীয় মেসেজটি পড়া মাত্রই আবিরার গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেল:
"Only one week."
ঝড়ের কারণে ঘরের তাপমাত্রা যেখানে বেশ ঠাণ্ডা, সেখানে আবিরার কপালে জমতে শুরু করল ঠাণ্ডা ঘামের বিন্দু। বুকটা ধক করে উঠল তার। কেন জীবনটা এত জটিল? মা-বাবা চলে যাওয়ার পর থেকেই বাস্তবতার নির্মম সব রূপ দেখেছে সে, তবে আজ যেন এক অজানা আতঙ্কের মুখোমুখি দাঁড়াল।
নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ পেতে ধীরেসুস্থে নম্বরটিকে ব্লকে ফেলে দিল সে। তারপর ফোনটা রাগ আর আতঙ্কের মিশ্রণে বিছানায় ছুড়ে মারল। বিখ্যাত 'AK Group'-এর সিংহভাগ শেয়ার ও সম্পত্তির মালিক এখন আবিরা। বর্তমানে তার চাচাই সিলেটে এর নতুন প্রজেক্টগুলো সামলাচ্ছেন। পড়াশোনার কারণে আবিরা যদি কলেজের ক্লাসে আটকে না থাকত, তবে হয়তো সেও এখন চাচার সাথে সিলেটে থাকত—আর আজকের এই রহস্যময় লোক বা মেসেজের সম্মুখীন হতে হতো না।
চিন্তার জট ছাড়াতে আবিরা বইপড়ার টেবিলে এসে বসল। কিছুদিন আগে কেনা কিছু নতুন বই টেবিলে সাজানো রয়েছে, যা কেনার পর আর খুলে দেখার সুযোগ হয়নি। সে একমনে বইয়ের পাতা উল্টে নতুন কাগজের ঘ্রাণ নিতে লাগল—যদি এই মনমাতানো সুবাস তার ভেতরের ঝড়টাকে কিছুটা শান্ত করতে পারে!
...বইপড়ার টেবিলে এসে বসল আবিরা। কিছুদিন আগে কেনা কিছু নতুন বই টেবিলে সাজানো রয়েছে, যা কেনার পর আর খুলে দেখার সুযোগ হয়নি। সে একমনে বইয়ের পাতা উল্টে নতুন কাগজের চমৎকার ঘ্রাণ নিতে লাগল—যদি এই মনমাতানো সুবাস তার ভেতরের ঝড়টাকে কিছুটা শান্ত করতে পারে!
তবে এই থমথমে ও রহস্যময় থ্রিলার পরিস্থিতির মাঝেও আবিরার স্বভাবসুলভ দুষ্টুমিটা পুরোপুরি দমে যায়নি। টেবিলের ওপর রাখা 'অ্যাডভান্সড মেকানিক্স' আর ভারী মোটা টেক্সটবুকগুলোর দিকে তাকিয়ে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বিড়বিড় করে বলে উঠল, "অচেনা ধমকি মেসেজ পাঠায় ‘Baby girl, are you ready?’—আরে ভাই! আগে বলো কিসের রেডি? কাল সকালে আমার কলেজ অনেক কিছু আছে! তার ওপর এই মশার কামড় আর কারেন্ট যাওয়ার যন্ত্রণা! মাফিয়াদের হুমকি দেওয়ার টাইমিংটাও একদম জঘন্য!"
একটু হেসে নিজের ভয়টাকে হালকা করার চেষ্টা করল সে। বারান্দার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে টেবিলে রাখা একটা চকোলেট মুখে পুরে দিল। ‘যা-ই হোক, হুমকি দিয়ে লাভ নেই, কলেজের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ না করা পর্যন্ত আমি কোথাও যাচ্ছি না!’—নিজের মনেই ভেবে মুখ টিপে হাসল সে।
তবে আবিরার অগোচরেই, তার শান্ত জীবনের প্রতিটি ছায়ায় জমা হচ্ছিল এক অদৃশ্য কালো মেঘ।
হাজার মাইল দূরে ডেনমার্কের ‘ব্লাডি হাউস’-এ দাঁড়িয়ে থাকা এভানের বরফশীতল চাহনি আর বাংলাদেশে আবিরার বারান্দায় আছড়ে পড়া কালবৈশাখী ঝড়—সব যেন এক অলিখিত সুতোয় বাঁধা পড়ে যাচ্ছিল।
বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে আবিরার বারান্দার কাঁচের গ্রিল বেয়ে, আর ঠিক সেই মুহূর্তে হাজার মাইল দূরে প্রাইভেট জেটের ককপিটে বসে এভান গ্লাসে ওয়াইন ঢালতে ঢালতে চোখ দুটি ছোট করে তাকাল।সুইডেন আর বাংলাদেশ—এই দুই প্রান্তের রক্তক্ষয়ী সমীকরণ মেলাতে কাউন্টডাউন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে জানান দিচ্ছে—‘আর মাত্র এক সপ্তাহ’।
(গল্পতে কোন ভুল ত্রুটি থাকলে ক্ষমার দৃষ্টি স্বরূপ দেখবেন 🙂 🙏। আর ভাল লাগলে কমেন্টে জানবেন👍)