ফন্ট সাইজ:
থিম:
তকদির

১ম পর্ব

লেখক: Ariyan Ahmed Tasin

তকদির

লেখক: Ariyan Ahmed Tasin 


একটি দীর্ঘ পারিবারিক, আবেগঘন ও রহস্যময় উপন্যাস
শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো বাড়িটাকে দূর থেকে দেখলে মনে হতো, বাড়িটা যেন শুধু ইট-পাথর দিয়ে তৈরি কোনো স্থাপনা নয়—তার নিজেরও একটা ইতিহাস আছে, একটা গোপন জীবন আছে। বাড়িটির নাম ছিল “মেহরাব মঞ্জিল”। বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই দুই পাশে পুরোনো কদমগাছ, মাঝখানে পাথরের রাস্তা, আর রাস্তার শেষ মাথায় তিনতলা বিশাল বাড়ি। বাড়ির দেয়ালে সময়ের ছাপ পড়েছে, কিন্তু তার আভিজাত্য একটুও কমেনি। এই বাড়ির মালিক ছিলেন শহরের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মির্জা সাইফুল ইসলাম। মানুষটি কঠোর, হিসেবি এবং সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অটল। ব্যবসার জগতে তার নাম শুনলে অনেকেই সাবধান হয়ে যেত। কিন্তু পরিবারের কাছে তার আরেকটি পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের পরিবারের জন্য পৃথিবীর যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।
মির্জা পরিবারের সবচেয়ে বড় ছেলে আদনান মির্জা বাবার ব্যবসার দায়িত্ব সামলাত। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। শান্ত স্বভাব, কম কথা বলা, নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকা—এসবের কারণে পরিবারের ছোটরা তাকে একটু ভয়ই পেত। আদনানের চোখে সবসময় একটা অদ্ভুত স্থিরতা ছিল। সে সহজে রাগ দেখাত না, সহজে হাসতও না। কিন্তু তার কাছের মানুষরা জানত, তার নীরবতার আড়ালে অনেক যত্ন লুকিয়ে থাকে।
আদনানের ছোট ভাই আরমান ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। হাসি-ঠাট্টা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, বাড়ির সবাইকে বিরক্ত করা—এসবেই তার আনন্দ। ছোট বোন মেহরিন ছিল পরিবারের প্রাণ। আর ছিল দাদি নূরজাহান বেগম, যিনি পুরো পরিবারের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শেষ কথা বলতেন। বাড়িতে আরও ছিলেন চাচা রাশেদ, চাচি সামিরা, তাদের ছেলে রাফি, মেয়ে রাইসা এবং অসংখ্য আত্মীয়স্বজন। এত বড় পরিবারে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ঘটনা ঘটত।
কিন্তু সেই পরিবারের সবচেয়ে অদ্ভুত মানুষ ছিলেন আদনানের বাবা সাইফুল ইসলাম। তিনি নিজের অতীত নিয়ে কখনো কথা বলতেন না। বিশেষ করে আদনানের জন্মের আগের কয়েকটি বছর সম্পর্কে বাড়ির কেউ কিছু জানত না।
আর সেই অজানা অতীতই একদিন বদলে দিতে চলেছিল পুরো মির্জা পরিবারের ভাগ্য।
অন্যদিকে শহরের পুরোনো এক মহল্লায় থাকত নওশীন রহমান। সবাই তাকে নীশা বলে ডাকত। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। বাবা আবদুল কাদের ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক। মা শায়লা বেগম দীর্ঘদিন ধরে সংসার সামলেছেন। নীশার ছোট ভাই নাবিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। তাদের সংসারে অর্থের প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু ভালোবাসার কোনো অভাব ছিল না।
নীশা খুব সাধারণ জীবনযাপন করত। তার স্বপ্ন ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানো। ছোটবেলা থেকেই সে মানুষের আচরণ খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করত। কে সত্যি কথা বলছে, কে অভিনয় করছে—এসব বোঝার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার। তবে নিজের ভাগ্য নিয়ে তার বিশ্বাস ছিল খুব কম।
সে প্রায়ই বাবাকে বলত, “বাবা, মানুষ কি সত্যিই নিজের ভাগ্য বদলাতে পারে?”
আবদুল কাদের হাসতেন। বলতেন, “মানুষ নিজের চেষ্টা দিয়ে পথ তৈরি করে। কিন্তু সেই পথে কখন কে এসে দাঁড়াবে, সেটা সবসময় মানুষের হাতে থাকে না।”
নীশা তখন বুঝত না, বাবার সেই কথাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে দাঁড়াবে।
এক সকালে নীশার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটল, যার সঙ্গে মির্জা পরিবারের কোনো সম্পর্ক থাকার কথা ছিল না। অথচ সেই ঘটনাই তাদের দুজনের জীবনকে একই সুতোয় বেঁধে দিল।
নীশার বাবা হঠাৎ একটি পুরোনো কাঠের বাক্স বের করলেন। বাক্সটি তিনি বহু বছর ধরে আলমারির ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন। নীশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এটা কী?”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “এটা তোমার মায়ের বিয়ের আগের জিনিস। অনেক বছর ধরে রেখেছিলাম। আজ মনে হলো তোমার জানা দরকার।”
বাক্স খুলতেই ভেতর থেকে বের হলো কয়েকটি পুরোনো চিঠি, একটি ছবি এবং একটি ছোট রুপালি লকেট।
নীশা ছবিটা হাতে নিয়ে থমকে গেল।
ছবিতে তার মা ছিলেন। কিন্তু মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণটিকে সে চিনতে পারল না।
“এই লোকটা কে?”
বাবার মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
“ওর কথা আর কখনো জিজ্ঞেস করবে না।”
“কিন্তু কেন?”
“কারণ কিছু সত্য জানলে মানুষের জীবন সহজ হয় না, কঠিন হয়ে যায়।”
সেদিন নীশা আর কোনো প্রশ্ন করেনি। কিন্তু তার কৌতূহল থামল না।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর সে আবার বাক্সটি খুলল। চিঠিগুলোর একটি খুলতেই তার চোখে পড়ল একটি নাম—“সাইফুল।”
নীশার বুক ধক করে উঠল।
মির্জা সাইফুল ইসলাম?
সেই নামটা সে সংবাদপত্রে বহুবার দেখেছে।
চিঠির নিচে লেখা ছিল—“যদি কখনো আমাদের সন্তান পৃথিবীতে আসে, তাকে সত্যিটা জানিও।”
নীশার হাত কাঁপতে শুরু করল।
সন্তান?
কোন সন্তান?
তার মা কি সাইফুল ইসলামকে চিনতেন?
আর যদি চিনতেন, তাহলে কীভাবে?
পরদিন নীশা বাবাকে প্রশ্ন করল। কিন্তু আবদুল কাদের এবারও কিছু বললেন না। শুধু বললেন, “তোমার জীবনে কিছু জিনিস এমন আছে, যেগুলো তোমার জন্মের আগেই ঠিক হয়ে গেছে।”
নীশা উত্তর দিল, “তাহলে আমার তকদিরে কী লেখা আছে?”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সেটা সময়ই বলবে।”
ঠিক সেই সময় মির্জা মঞ্জিলে অন্যরকম আলোচনা চলছিল।
দাদি নূরজাহান সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আদনানের বিয়ে এবার করতেই হবে।
আদনান স্পষ্টভাবে বলল, “আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।”
দাদি কঠিন গলায় বললেন, “তোর ইচ্ছার ওপর সবকিছু চলবে না।”
“আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্তটা অন্তত আমি নিতে চাই।”
“জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত মানুষ সবসময় নিজে নিতে পারে না, আদনান।”
আদনান চুপ করে গেল।
কথাটা তার কানে অদ্ভুত লাগল।
কেন যেন মনে হলো দাদি শুধু বিয়ের কথা বলছেন না। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।
কয়েকদিন পর আদনানের সঙ্গে নীশার দেখা হলো।
সেটাও ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক।
একটি প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে নীশা তার বাবার সঙ্গে গিয়েছিল। সেখানে মির্জা পরিবারের সবাই উপস্থিত ছিল। নীশা প্রথমবার আদনানকে দেখল।
তার প্রথম ধারণা ছিল—লোকটি অসম্ভব গম্ভীর।
আদনানও নীশাকে দেখে কয়েক সেকেন্ড থেমে গেল। কেন থামল, সে নিজেও জানত না।
নীশা চোখ সরিয়ে নিল।
আদনানও কিছু বলল না।
কিন্তু তাদের সেই নীরব দেখা যেন কোথাও গিয়ে আটকে রইল।
অনুষ্ঠানের শেষে নীশা বাইরে বের হচ্ছিল। হঠাৎ তার হাত থেকে কয়েকটি কাগজ মাটিতে পড়ে গেল।
আদনান নিচু হয়ে কাগজগুলো তুলে দিল।
“আপনার কাগজ।”
“ধন্যবাদ।”
“আপনি কি নীশা রহমান?”
নীশা অবাক হয়ে তাকাল।
“আপনি আমার নাম জানেন?”
“আপনার বাবাকে চিনি।”
নীশা আর কিছু বলল না।
আদনান কাগজগুলো তার হাতে দিয়ে চলে গেল।
কিন্তু যাওয়ার সময় তার চোখ পড়ল নীশার গলায় ঝোলানো লকেটটির দিকে।
সে হঠাৎ থেমে গেল।
“এই লকেটটা কোথায় পেয়েছেন?”
নীশা অবাক।
“আমার মায়ের কাছ থেকে।”
আদনানের মুখের ভাব বদলে গেল।
“আপনার মা?”
“জি।”
“তার নাম?”
“শায়লা রহমান।”
আদনান কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
তার চোখে তখন এমন এক বিস্ময়, যা নীশা আগে কখনো দেখেনি।
“কিছু হয়েছে?”
“না।”
সে চলে গেল।
কিন্তু বাড়ি ফিরে আদনান সরাসরি বাবার ঘরে ঢুকল।
“বাবা, শায়লা রহমান নামে কাউকে আপনি চিনতেন?”
সাইফুল ইসলাম চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
“এই নাম কোথায় শুনেছ?”
“আজ একজনের কাছ থেকে।”
“কে?”
“নীশা রহমান।”
নামটি শুনেই সাইফুলের মুখ সাদা হয়ে গেল।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “ও মেয়েটার কাছ থেকে দূরে থাকবে।”
“কেন?”
“আমি যা বলছি, তাই কর।”
“আপনি তাকে চেনেন?”
“না।”
আদনান বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
“আপনি মিথ্যা বলছেন।”
সাইফুল রেগে গেলেন।
“আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলবে না!”
আদনান ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু তার সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।
সেদিন রাতেই দাদি তাকে নিজের ঘরে ডাকলেন।
“তুই নীশাকে দেখেছিস?”
আদনান চমকে গেল।
“আপনি জানেন?”
“জানি।”
“ও কে?”
দাদি দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “তোর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হতে পারে।”
আদনান অবাক।
“মানে?”
“সব উত্তর এখনই জানতে চাইস না।”
“কিন্তু আমি সত্য জানতে চাই।”
দাদি তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সত্য জানলে তোর বাবার সঙ্গে তোর সম্পর্ক বদলে যেতে পারে।”
আদনানের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ তৈরি হলো।
“কী সত্য?”
দাদি উত্তর দিলেন না।
এরপর শুরু হলো এমন এক সম্পর্ক, যেটার শুরুতে ভালোবাসা ছিল না, ছিল কেবল সন্দেহ।
নীশা আদনানকে পছন্দ করত না। তার মনে হতো, এই মানুষটা অহংকারী এবং অতিরিক্ত গম্ভীর।
আদনানেরও মনে হতো নীশা অকারণে অনেক প্রশ্ন করে।
কিন্তু পরিস্থিতি তাদের বারবার কাছাকাছি আনতে লাগল।
একদিন নীশার বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে আদনান নিজে হাসপাতালে ছুটে গেল। নীশা অবাক হয়ে বলল, “আপনি এখানে কেন?”
“আপনার বাবা আমার বাবার পরিচিত।”
“শুধু তাই?”
আদনান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “সবকিছুর উত্তর এখন দিতে পারব না।”
নীশা রাগ করে বলল, “আপনারা সবাই এমন কেন? কিছু একটা জানেন, কিন্তু বলেন না।”
আদনান শান্ত গলায় বলল, “কারণ কখনো কখনো সত্য মানুষকে রক্ষা করার জন্যও লুকিয়ে রাখতে হয়।”
“আমি দুর্বল নই।”
“আমি জানি।”
সেই প্রথম নীশা আদনানের চোখে নিজের জন্য সত্যিকারের সম্মান দেখল।
সময়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বদলাতে লাগল। ঝগড়া হলো, ভুল বোঝাবুঝি হলো, আবার একে অপরের পাশে দাঁড়ানোও হলো। আদনান ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, নীশা তার জীবনের এমন একজন মানুষ হয়ে উঠছে যার উপস্থিতি সে অস্বীকার করতে পারছে না।
একদিন আদনান নীশাকে বলল, “তুমি কি ভাগ্যে বিশ্বাস করো?”
নীশা হেসে বলল, “আগে করতাম না। এখন জানি না।”
“কেন?”
“কারণ মনে হচ্ছে আমার জীবনে যা ঘটছে, তার কোনোটাই আমি পরিকল্পনা করিনি।”
আদনান মৃদু হেসে বলল, “হয়তো তকদির আমাদের চেয়ে বেশি জানে।”
নীশা তাকিয়ে রইল।
“তাহলে তকদির যদি আমাদের আলাদা করে?”
আদনান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তাহলে আমি তকদিরের সঙ্গে লড়ব।”
কথাটা নীশার মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
কিন্তু তাদের সামনে সবচেয়ে বড় সত্য তখনও অপেক্ষা করছিল।
এক রাতে নূরজাহান বেগম আদনানকে একটি পুরোনো ডায়েরি দিলেন।
“এটা পড়।”
আদনান ডায়েরি খুলে প্রথম পাতাতেই বাবার নাম দেখতে পেল।
তারপর শায়লা রহমানের নাম।
তারপর আরেকটি নাম—“মারিয়া।”
ডায়েরির পাতায় লেখা ছিল, বহু বছর আগে সাইফুল ইসলাম এবং শায়লা রহমানের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য সেই সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। শায়লা অন্যত্র বিয়ে করেন। পরে জানা যায়, তার একটি সন্তান জন্মেছিল।
আদনানের হাত থেমে গেল।
“সন্তানটা কে?”
দাদি ধীরে ধীরে বললেন, “নীশা।”
আদনান যেন কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল।
“মানে?”
“তোর বাবা নীশার জন্মদাতা বাবা।”
ঘরটা হঠাৎ তার কাছে অচেনা মনে হলো।
“তাহলে… নীশা আমার…”
দাদি দ্রুত বললেন, “না। তুই আর নীশা রক্তের ভাইবোন নও।”
আদনান স্তব্ধ।
দাদি বললেন, “তোর জন্মের বহু বছর আগের ঘটনা। কিন্তু তোর বাবা এই সত্য এতদিন লুকিয়ে রেখেছে।”
আদনানের মনে হলো তার জীবনের সবকিছু এক মুহূর্তে বদলে গেছে।
সে নীশাকে সত্যটা জানাতে চাইল। কিন্তু তার আগেই আরেকটি সত্য সামনে এল।
ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল—“শায়লার সন্তানকে মির্জা পরিবারের সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বাদ দিতে হবে, নইলে পরিবার ভেঙে যাবে।”
আদনান বুঝল, এত বছর ধরে কেন এত কিছু গোপন রাখা হয়েছে।
নীশা শুধু একজন মেয়ে নয়—সে মির্জা পরিবারের অতীতের জীবন্ত প্রমাণ।
এদিকে রাশেদ চাচা বিষয়টি জেনে গেলেন। তিনি ভয় পেলেন, নীশা যদি সত্য প্রকাশ করে, তাহলে পরিবারের সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে বড় সমস্যা হবে।
তিনি নীশাকে মির্জা পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করলেন।
নীশার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ উঠল।
আদনান প্রথমে বিভ্রান্ত হলেও পরে বুঝতে পারল, সবকিছুর পেছনে চাচার হাত আছে।
সে পরিবারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “যে মেয়েটাকে আপনারা এতদিন বাইরের মানুষ ভাবছেন, সে এই পরিবারের অতীতের অংশ। তার সঙ্গে অন্যায় হলে আমি চুপ থাকব না।”
রাশেদ বললেন, “তুমি কি নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে যাবে?”
আদনান উত্তর দিল, “অন্যায় যদি পরিবার করে, তাহলে সত্যের পাশে দাঁড়ানোই পরিবারের প্রতি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”
সাইফুল ইসলাম এতদিনের নীরবতা ভেঙে সব স্বীকার করলেন।
তিনি নীশার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি তোমার বাবা। এই সত্যটা তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখে আমি ভুল করেছি।”
নীশার চোখে পানি চলে এল।
সে বলল, “বাবা শব্দটা এত বছর পরে শুনে কেন এত অচেনা লাগছে?”
সাইফুল কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।
আদনান দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
নীশা তার দিকে তাকাল।
“তুমি আগে থেকেই জানতে?”
আদনান মাথা নাড়ল।
“কিছুটা।”
“তাহলে আমাকে বলোনি কেন?”
“কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
“কিসের?”
আদনান ধীরে বলল, “তোমাকে হারানোর।”
নীশা চোখ নামিয়ে ফেলল।
“কিন্তু সত্যি তো এটাই, আমরা যতটা ভেবেছিলাম ততটা অপরিচিত নই।”
আদনান বলল, “হয়তো। কিন্তু আমি তোমাকে তোমার অতীতের জন্য নয়, তুমি যে মানুষ তার জন্য সম্মান করি।”
নীশা কিছু বলল না।
কয়েকদিন পর মির্জা পরিবারে বড় পরিবর্তন এল। সাইফুল ইসলাম নীশাকে নিজের মেয়ে হিসেবে স্বীকার করলেন। সম্পত্তির হিসাব নতুন করে করা হলো। রাশেদ নিজের ভুল স্বীকার করলেন। পরিবারের সবাই ধীরে ধীরে নীশাকে আপন করে নিল।
কিন্তু নীশা তখনও একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল।
তার নিজের জীবনের তকদির কি আগে থেকেই লেখা ছিল?
এক সন্ধ্যায় সে বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। আদনান পাশে এসে দাঁড়াল।
“কী ভাবছ?”
“ভাবছি, এত কিছু যদি আগে থেকেই ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের এত কষ্ট কেন পেতে হলো?”
আদনান বলল, “হয়তো কষ্টটা আমাদের শাস্তি ছিল না। পথের অংশ ছিল।”
নীশা মৃদু হেসে বলল, “তুমি এখন অনেক দার্শনিক হয়ে গেছ।”
“তোমার কারণে।”
“আমার কারণে?”
“হ্যাঁ। তুমি আমাকে শিখিয়েছ, সব উত্তর হিসেব করে পাওয়া যায় না। কিছু উত্তর সময় দেয়।”
নীশা চুপ করে রইল।
আদনান বলল, “আমি একটা কথা বলতে চাই।”
“কী?”
“তোমাকে প্রথম দেখার দিন থেকেই মনে হয়েছিল, তোমাকে আমি আগে কোথাও দেখেছি।”
নীশা হাসল।
“সেটা সম্ভব নয়।”
“হয়তো চোখে নয়, তকদিরে দেখেছিলাম।”
নীশা এবার হেসে ফেলল।
তাদের গল্পের শেষ তখনও আসেনি। কারণ জীবনের মতো ভালোবাসারও কোনো নির্দিষ্ট শেষ থাকে না।
মির্জা পরিবারের বিশাল বাড়িতে আবার হাসি ফিরল। আরমান আগের মতোই সবাইকে বিরক্ত করতে শুরু করল। মেহরিন নীশাকে নিয়ে নতুন নতুন পরিকল্পনা করতে লাগল। নূরজাহান বেগম প্রায়ই বলতেন, “আমি জানতাম, এই মেয়েটা একদিন আমাদের বাড়িতে আসবেই।”
একদিন নীশা দাদির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এত আগে থেকে কীভাবে জানতেন?”
দাদি হেসে বললেন, “সবকিছু জানতাম না। শুধু বিশ্বাস ছিল।”
“কিসের বিশ্বাস?”
“তকদিরের।”
নীশা জানালার বাইরে তাকাল।
জীবনে কত মানুষ আসে, কত মানুষ চলে যায়। কেউ আসে নিজের ইচ্ছায়, কেউ আসে পরিস্থিতির কারণে, আবার কেউ এমনভাবে আসে যেন তাকে আসার জন্য বহু বছর আগে থেকেই কোনো অদৃশ্য শক্তি পথ তৈরি করে রেখেছিল।
নীশা বুঝতে পারল, তকদির মানে শুধু ভাগ্য নয়।
তকদির মানে কখনো এমন কিছু হারানো, যা হারানোর কথা ছিল না। কখনো এমন কাউকে পাওয়া, যাকে পাওয়ার আশা ছিল না। কখনো সত্যের জন্য অপেক্ষা করা। কখনো নিজের ভয়কে জয় করা।
আর কখনো কখনো তকদির এমন দুজন মানুষকে একই পথে এনে দাঁড় করায়, যারা প্রথমে একে অপরকে চিনতই না।
আদনান আর নীশার গল্পও তেমনই ছিল।
তাদের গল্পের শুরু হয়েছিল সন্দেহ দিয়ে, মাঝখানে এসেছিল গোপন সত্য, আর শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিল বিশ্বাসের ওপর।
কয়েক মাস পর মির্জা মঞ্জিলের আঙিনায় আবার বড় আয়োজন হলো। পরিবারের সবাই ব্যস্ত। বাড়ির আলো জ্বলছে, হাসির শব্দ চারদিকে। নীশা সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
আদনান কাছে এসে বলল, “কী হলো?”
“কিছু না।”
“তাহলে এত চুপ কেন?”
নীশা মৃদু হেসে বলল, “ভাবছি, আমার জীবনটা যদি অন্যরকম হতো?”
“কেমন?”
“হয়তো আমি তোমার সঙ্গে কোনোদিন দেখা করতাম না।”
আদনান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তাহলে আমি তকদিরকে দোষ দিতাম।”
“আর এখন?”
“এখন তকদিরকে ধন্যবাদ দিই।”
নীশা হাসল।
দূর থেকে নূরজাহান বেগম তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার চোখে শান্তির ছাপ।
তিনি ধীরে বললেন, “কিছু সম্পর্ক মানুষ তৈরি করে না। কিছু সম্পর্ক সময় তৈরি করে, সত্য তৈরি করে, আর শেষ পর্যন্ত তকদির এসে সিলমোহর দিয়ে দেয়।”
সেদিন রাতে মির্জা মঞ্জিলের সব আলো জ্বলছিল। কিন্তু সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো ছিল মানুষের মুখে ফিরে আসা শান্তির।
অতীত বদলানো যায় না। ভুল মুছে ফেলা যায় না। হারিয়ে যাওয়া সময় ফিরিয়ে আনা যায় না। কিন্তু মানুষ চাইলে আগামীকালকে নতুন করে সাজাতে পারে।
নীশা তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্যকে গ্রহণ করেছিল।
আদনান শিখেছিল, ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে কাছে পাওয়া নয়—তার সত্যকে, তার অতীতকে, তার ভয়কে এবং তার অসম্পূর্ণতাকেও সম্মান করা।
আর সাইফুল ইসলাম বুঝেছিলেন, যে সত্য মানুষ যতই লুকিয়ে রাখুক, একদিন না একদিন তার নিজের পথ খুঁজে নেয়।
তাই হয়তো তকদিরকে কেউ পুরোপুরি বুঝতে পারে না।
কারণ তকদির কখনো সরল রাস্তা নয়।
কখনো সেটা দীর্ঘ অপেক্ষা।
কখনো ভুল মানুষ।
কখনো ভুল সিদ্ধান্ত।
কখনো ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক।
আবার কখনো সেই ভাঙা পথের শেষে দাঁড়িয়ে থাকে এমন একজন মানুষ, যার জন্য পুরো পথটাকেই অর্থপূর্ণ মনে হয়।
আদনান আর নীশার গল্পও সেখানেই শেষ হয়নি।
বরং সেখান থেকেই তাদের নতুন জীবনের শুরু।
কারণ কিছু গল্পের শেষ হয় না।
শুধু একটা অধ্যায় শেষ হয়, আর নতুন অধ্যায়ের প্রথম পাতায় লেখা থাকে একটি শব্দ—
তকদির।
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন