# রাজকন্যারা এখন নির্বাসনে (ছোট গল্প)
লেখনীতে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা
পৌষ মাসের নিদারুণ শীতেও মাথার ওপর থাকা ফ্যানটা ঘুরছে নিঃসংকোচ। দক্ষিণের মস্ত জানালাটাও খোলা। বিশাল সাদা রেশমী পর্দাগুলো শুভ্র কুয়াশায় মাখামাখি হচ্ছে। ঘরময় হিম শীতল ভাব। জানালার এককোনায় গুটিসুটি হয়ে বসে আছে ত্রপা। হিম শীতল ঘরে বসেও দরদর করে ঘামছে সে। চোখদুটো অস্থির চড়ুই পাখির মতোই এদিক-ওদিক ছুটছে। এই আধুনিকায়ন শহরের কোনো কিছুই যেন শান্তি দিচ্ছে না তাকে। আচ্ছা? ঔপন্যাসিকদের লেখা সেই খোলা, তারাময় আকাশটা কি আদৌ ছিল? আদৌ কোনও মুক্ত পাখি আকাশে উড়ত? হয়ত না। ওগুলো হয়ত শুধুই ঔপন্যাসিকের কল্পনা। ত্রপা জনালা দিয়ে গলা বের করে উপরের দিকে তাকাল। নাহ্, কোনও তারাময় আকাশ দেখা যাচ্ছে না। আকাশটা ঢেকে আছে বহুতল ভবনের ছাদ আর ওভারব্রিজের স্টিলের পাতে। ত্রপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোলের ওপর রাখা মেডিক্যাল রিপোর্টটা বুকে চেপে ধরে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসল। মনটাকে কি ভীষণ ক্লান্ত লাগছে তার। এর আগেও দু-দুবার কাজটা করেছে সে। কই? তখন তো এতোটা ভাবতে হয় নি। এতোটা দুর্বল লাগে নি। এক-দু সপ্তাহ মুখে বালিশ চেপে কেঁদে কেটেই মেনে নিয়েছে সব। আজকাল সব মায়েরাই এমনটা করছে। ত্রপা তো একা করছে না। তাহলে এত অস্থিরতা কেন? ত্রপা ফাইল খুলে আলট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টটাতে চোখ বুলায়। আজ বিকেলেই মেডিক্যাল রিপোর্ট এসেছে তার। সেই সাথে এসেছে এবোরশন ফর্ম। ২০৬০ সালের দিনগুলোতে এমনটাই স্বাভাবিক। আলট্রাসনোগ্রাফিতে কন্যা সন্তানের সন্ধান মিললেই নিজ দায়িত্বে এবোরশন ফর্ম পাঠিয়ে দেয় হসপিটাল কতৃপক্ষ। এটাই এখন অলিখিত নিয়ম। মেয়েদের জন্মানো চলবে না। নব জন্মিত শিশু কোনও নরপশু দ্বারা লাঞ্চিত হলে রাষ্ট্র তার দায় নিবে না। দায় নিবে না বাপ- ভাইও। তাহলে একা মায়ের এতো কিসের দায়? কিন্তু ত্রপার মন মানছে না। ছোটবেলায় দাদীর কাছে শুনেছিল সে, দাদীরা নাকি বিশাল আকাশের নিচে প্রাণখুলে হাসত। দাদাভাইয়ের হাত ধরে রাতের রাস্তায় হাঁটত। বন্ধুরা মিলে দূর-দূরান্তে ঘুরতে যেত। কিশোরীরা দু'কাঁধে বিনুনি ঝুলিয়ে স্কুলে যেত। সত্যিই কি যেত? ত্রপার বিশ্বাস হয় না। সবই কেমন অবিশ্বাস্যকর মনে হয়। আস্ত একটা মেয়ে মানুষ হয়ে দাদিমা এসব করত? সত্যিই করত? পুরুষদের ক্ষুধার শিকার হতে হত না তাকে? এ-ও কি সম্ভব? এটা কি শুধুই কল্পনা নয়? অবশ্যই কল্পনা। যেখানে
তিনদিনের বাচ্চা মেয়ে হসপিটালের বিছানাতেই ধর্ষিতা হয়ে প্রাণ হারায় সেখানে এসব গল্প অবশ্যই কল্পনা। ২০৬০ সালের এই যুগে নারী মুক্তি কেবলই রূপকথার গল্প। ত্রপার ভাবনার মাঝেই গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এলো একটি বছর চারেকের বাচ্চা ছেলে। ত্রপার কাছাকাছি এসে আধো আধো গলায় ডাকল,
----" মা।"
ছেলের ডাকে ফিরে তাকাল ত্রপা। ছেলের বড় বড় কৌতূহলী চোখদুটোতে তাকিয়ে মুহূর্তেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল সে। আচ্ছা? তার এই বাচ্চা ছেলেটাও কি একসময় এই নরপশুদের প্রতিনিধিত্ব করবে? মায়ের তলপেটে লাথি দেবে? ত্রপা আৎকে উঠে। ছেলেটা বিনাবাক্যে মায়ের ওম মাখানো কোলে গুটিসুটি হয়ে বসে। ছোট্ট পাতলা ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে হাসে। মায়ের বুকের সাথে সিটিয়ে গিয়ে বলে,
----" মা গয়পো শুনবো। "
ত্রপার হঠাৎ করেই মনে হয়, না। নরপশু নয়। তার ছেলেটা নারীমুক্তির কর্ণধার হবে। হাজারও নরপশুর মধ্যে তার ছেলেটা হবে নর, সত্যিকারের নর। ত্রপা মেডিক্যাল রিপোর্টটা ছুঁড়ে ফেলে ছেলের কপালে চুমু আঁকে। আদুরে গলায় গল্প টানে,
----" অনেক অনেক বছর আগে, সব বাবাদের রাজ্যেই একটা করে রাজকন্যা থাকত। রাজকন্যারা খিলখিল করে হাসত। তাদেরকে...."
ত্রপার গল্পের মাঝেই জড়ানো শব্দে প্রশ্ন ছুঁড়ল তার ছেলে,
----" লাজকন্নেরা এখন কোতায় মা?"
ত্রপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
----" রাজকন্যারা এখন নির্বাসনে, বাবা। রাজকন্যাদের রাজ্যে দুষ্টুদের পদচারণ। রাজপুত্ররাও আজ মৃত্যু ঘুমে নিমজ্জিত। কিন্তু একদিন তারা জাগবে। দুষ্টুদের নিধন করবে। আবারও খিলখিলিয়ে উঠবে রাজকন্যাদের অন্দরমহল। তুমি রাজপুত্র হবে বাবা?"
ত্রপার চার বছরের ছেলে গম্ভীর মুখে মায়ের দিকে তাকায়। বলে,
----" রাতপুততো হব। দুস্তদের মাবব।"
ত্রপা হাসে। চোখে-মুখে ফুটে ওঠে এক ঝলক আশা। রাজকন্যাদের বাড়ি ফেরার আশা।