ফন্ট সাইজ:
থিম:
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

chapter 1

লেখক: সুমি চৌধুরী

নিজের প্রিয় মানুষ মামাতো ভাই শুভ্রের বিয়ের খবরটা শোনার পর থেকেই রিদিকার বুক ফেটে কান্না আসছে। প্রিয় মানুষ বললে হয়তো কমই বলা হবে। যখন থেকে রিদিকা ভালোবাসার মানে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই তার সমস্ত আবেগ আর অনুভূতির কেন্দ্রে কেবল ওই একটা মানুষই বিচরণ করেছে। যদিও তাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের দেয়াল নেই। কোনো প্রেমের লেনদেন নেই তবু শুভ্রকে সে মনে-প্রাণে নিজের করে নিয়েছে।।রিদিকার এই পাহাড়সমান ভালোবাসার খবর শুভ্র জানে না। আর জানলেও হয়তো সে রিদিকাকে খুব একটা গুরুত্ব দেবে না। কারণ রিদিকা লক্ষ্য করেছে শুভ্র তাকে সবসময় এড়িয়ে চলে। তাদের মধ্যে কথা হয় না বললেই চলে আর যদি কখনো সামান্য বাক্যালাপ হতোও তবে তা কবে হয়েছে সেটা মনে করার জন্য রিদিকাকে এখন স্মৃতি হাতড়াতে হবে। শুভ্র মানুষটা বড্ড গম্ভীর আর চুপচাপ। ভিড়ের চেয়ে নির্জনতা আর একাকীত্বই তার বেশি পছন্দ। আর শুভ্রের এই মৌনতাটুকুই রিদিকার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। কারণ রিদিকা নিজেও শান্ত স্বভাবের মেয়ে। নিজের ভেতরের এই নীরবতা সে শুভ্রের মধ্যেও খুঁজে পায়। এই মিলটাই হয়তো তাকে শুভ্রের প্রতি আরও বেশি আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।

শুভ্র যখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়তো ঠিক তখন থেকেই সে রিদিকার মনের গহীন কোণে নিজের ঘর তৈরি করে নিয়েছিল। সেই ভালো লাগা থেকেই জন্ম নিয়েছে আজকের এই গভীর অনুরাগ। রিদিকা মনে মনে ভেবেছিল একদিন সব সাহস জমিয়ে নিজের মনের কথাটা শুভ্রকে বলবে। কিন্তু তার আগেই যে সবটা তছনছ হয়ে যাবে শুভ্রর বিয়ে ঠিক হয়ে যাবে তা সে দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেনি। সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার জায়গাটা অন্যখানে। যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে তার সাথে শুভ্রর আগে থেকেই পরিচয় ছিল। তাদের মধ্যে কি কোনো গভীর সম্পর্ক ছিল রিদিকা জানে না। তবে মামির মুখে শুনেছে মেয়েটি শুভ্রের খুব পরিচিত।
রিদিকার পুরো নাম তাসনিন রিদিকা। চারপাশের মানুষ তাকে ভালোবেসে 'রিদি' বলেই ডাকে। এবার সে ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পা রেখেছে। রিদিকার ছোট এক ভাই আছে নাম তার ইমন যে এখন ক্লাস এইটে পড়ছে। রিদির বাবা ইকবাল এহসান আর মা রাবেয়া এহসান। এই নিয়েই তাদের সাজানো ছোট্ট পরিবার।
আর শুভ্রের পুরো নাম সাইফান শুভ্র চৌধুরী। পড়াশোনা শেষ করার পর সে এখন তাদের পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব সামলাচ্ছে। অত্যন্ত গম্ভীর আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এই যুবকের পৃথিবীটা বেশ ছোট। তার বাবা সোহান চৌধুরী মা সাহেরা চৌধুরী আর আদরের ছোট বোন শুভ্রা চৌধুরী। এই চারজন নিয়েই তাদের ছিমছাম আর সুখী পরিবার।
__________________
বিকেলের তপ্ত রোদটা ফিকে হয়ে আসছে রিদি একা ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। নিচতলা থেকে বড়দের হাসাহাসি আর শুভ্রের বিয়ের আলোচনার চলছে। সেই শব্দগুলো কানে আসতেই রিদির পুরো শরীরে যেন এক অদ্ভুত অস্বস্তি জেঁকে বসল। মনটা ছটফট করছে বুকটা ফেটে কান্না আসছে তবুও চোখে জল নেই। একরাশ বিরক্তি আর অভিমান নিয়ে অনেকক্ষণ ছাদে কাটিয়ে রিদি খুব ধীর পায়ে নিচে নেমে এল।
বসার ঘরে পা রাখতেই দেখল সোফায় বসে আছে সেই মানুষটা যাকে দেখা মাত্রই রিদির হৃদস্পন্দন আবারও এলোমেলো হয়ে গেল। শুভ্র। সে বরাবরের মতোই চুপচাপ। ফোনের স্ক্রিনে নিবিষ্ট মনে কিছু একটা করছে যেন বাইরের পৃথিবীর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। পাশেই রিদির বাবা ইকবাল এহসান এবং মামা সোহান চৌধুরীসহ আত্মীয়-স্বজনরা বিয়ের খুঁটিনাটি নিয়ে প্রাণবন্ত আড্ডায় মেতে আছেন। কিন্তু শুভ্রর সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই সে যেন তার নিজের তৈরি করা এক নিস্তব্ধ গণ্ডির ভেতরে বন্দি হয়ে আছে। ঠিক তখনই রিদির কানের কাছে কেউ একজন 'বউ' বলে সজোরে চিৎকার করে উঠল। আচমকা এই শব্দে রিদি একদম আঁতকে উঠল। বুকটা ধক করে উঠল তার। তড়িঘড়ি করে পেছনে তাকিয়ে দেখল শুভ্রা দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রা রিদির চমকে যাওয়া দেখে বেশ মজা পেল। সে দুষ্টুমিভরা হাসিতে ভ্রু নাচিয়ে বলল।
"কিরে এত ভয় পেলি কেন কোন জগতে ছিলি শুনি।"
রিদি নিজের বুকের ওপর হাত রেখে কয়েকটা লম্বা লম্বা শ্বাস নিল। যেন ধকপকানিটা থামানোর চেষ্টা করছে। সে কিছুটা অভিযোগের সুরে বলল।
"উফ পুরো ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি আমাকে।"
শুভ্রা বেশ ভাব দেখিয়ে উত্তর দিল। তার চোখেমুখে দুষ্টুমির ছাপ স্পষ্ট।
"আরে আমি তো ভয় দেখানোর জন্যই বলেছি। আমি কি আর তোকে আনন্দ দেওয়ার জন্য বলেছি নাকি। যাই হোক কোথায় ছিলি এতক্ষণ সারা বাড়ি খুঁজেও তোকে পাওয়া যাচ্ছিল না।"
রিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ম্লান গলায় বলল।
"এমনি একটু ছাদে গিয়েছিলাম।"
ঠিক সেই মুহূর্তেই শুভ্র সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চলন-বলন সব কিছুতেই এক ধরনের গাম্ভীর্য মিশে আছে। সে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে নিজের মা সাহেরা চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বেশ গম্ভীর গলায় বলল।
"আম্মু আমার রুমে এক কাপ কফি পাঠাও তো।"
শুভ্রা গিয়ে আড্ডায় জমে উঠল। বাড়িতে ধীরে ধীরে অতিথিদের আনাগোনা বাড়ছে। আর মাত্র তিনদিন পর বিয়ে তাই তিনদিন আগেই রিদিরা শুভ্রদের বাড়ি চলে এসেছে। সাহেরা চৌধুরী তাড়াহুড়ো করে কফি বানিয়ে সোজা রিদির হাতে ধরিয়ে দিলেন। তারপর ব্যস্ত গলায় বললেন।
"যা তো মা তোর শুভ্র ভাইয়ের রুমে কফিটা দিয়ে আয়। রান্নাঘরে আমি দুধ বসিয়ে এসেছি। বাকিরা যে যার কাজে ব্যস্ত তুই একটু দিয়ে আয় তো। দেরি করিস না নাহলে ছেলেটা আমার এখনই রেগে আগুন হয়ে যাবে।"
কথাটা বলেই সাহেরা চৌধুরী উত্তরের অপেক্ষা না করে সোজা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন। রিদি যেন আকাশ থেকে পড়ল। এখন তাকে শুভ্রের রুমে যেতে হবে। ভাবতেই রিদির হৃদপিণ্ড যেন লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। সে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করল। তারপর ট্রের ওপর কফির কাপ নিয়ে খুব সাবধানে ধীরে ধীরে শুভ্রের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজায় মৃদু করাঘাত করে হালকা গলায় বলল।
"ভাইয়া আসব।"
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। রিদি গলাটা একটু চড়িয়ে আবারও বলল।
"ভাইয়া শুনতে পাচ্ছেন আপনার কফি এনেছি।"
তবুও ভেতর থেকে কোনো উত্তর এল না। রিদি এবার দরজার আড়াল থেকে একটু উঁকি দিয়ে দেখল রুমটা একদম ফাঁকা। শুভ্রকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। রিদি আর কিছু না ভেবে ধীর পায়ে ট্রে নিয়ে রুমের ভেতরে প্রবেশ করল। শুভ্রের রুমটা একদম ওর মতোই গোছানো আর শান্ত।
রিদি কফির ট্রে-টা টেবিলের এক কোণে নামিয়ে রেখে দ্রুত রুম থেকে বের হওয়ার উপক্রম করল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ভেজা মেঝেতে শব্দ হওয়ায় সে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। রিদি আড়চোখে তাকাতেই দেখল ওয়াশরুমের দরজা খুলে শুভ্র বেরিয়ে আসছে।
শুভ্র মাত্রই শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে। তার সুঠাম আর পেশীবহুল শ্যামবর্নের শরীরটা সিক্ত অবস্থায় যেন আরও বেশি পৌরুষদীপ্ত হয়ে উঠেছে। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা পানির কণাগুলো ঘরের আলোয় মুক্তোর মতো ঝিকঝিক করছে। তার সুঠাম বুক আর চওড়া কাঁধ বেয়ে পানির রেখা গড়িয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। জিম করা শরীরের প্রতিটি পেশী যেন পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্যের মতো নিখুঁত দেখাচ্ছে। ভিজে যাওয়া চুলগুলো কপালের ওপর লেপ্টে আছে আর সেখান থেকে টপটপ করে পানি চুইয়ে পড়ছে তার তীক্ষ্ণ নাক আর ঠোঁটের ওপর। শুভ্রের এই বুনো আর আকর্ষণীয় রূপ দেখে রিদি যেন নিজের হুঁশ হারিয়ে ফেলল। সে লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে অপলক দৃষ্টিতে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে রইল।
শুভ্র খুব শান্ত পায়ে এগিয়ে এসে রিদির ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। রিদির নাকে শুভ্রের গায়ের সাবান আর শ্যাম্পুর একটা মাতাল করা ঘ্রাণ আছড়ে পড়ল। শুভ সরাসরি রিদির সামনে তুড়ি বাজিয়ে শান্ত গলায় বলল।
"আমি মানুষ খাওয়ার কোনো মেনু কার্ড না যে আমার দিকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে হবে। হোয়াট ইজ রং উইথ ইউ।"
রিদিকা একদম থতমত খেয়ে গেল। লজ্জায় তার কান-মুখ ঝাঁঝা করে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে মাথা নিচু করে আমতা আমতা করে বলল।
"অই আসলে ভাইয়া আমি আপনার কফিটা দিতে এসেছিলাম।"
শুভ্র টেবিলের দিকে তাকাল। যেখানে কফির কাপ থেকে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। তারপর আবার রিদির দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলল।
"ঠিক আছে যা।"
রিদি সাথে সাথে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু দুই পা এগোতেই হঠাৎ ওর পা মুচড়ে গেল। রিদি ভারসাম্য হারিয়ে মেঝের দিকে আছাড় খেতে নিতে লাগল। শুভ্র রিদিকে পড়ে যেতে দেখে এগিয়ে এসে মুহূর্তে বিদ্যুতের মতো ছোঁ মেরে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল।
রিদি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। শুভ্রর ভেজা চুলের হিমশীতল পানি টপটপ করে রিদির ঠোঁটে আর গালে এসে বিঁধছে। রিদি শিউরে উঠে চোখ খুলল। ও দেখল শুভ্র ওকে খুব শক্ত করে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে ধরে আছে। শুভ্র কেমন অদ্ভুত এক নেশা ধরানো চোখে ওর দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। শুভ্রের ভেজা শরীরের সেই পুরুষালি ঘ্রাণ আর বরফশীতল হাতের স্পর্শে রিদির দম আটকে এল। হঠাৎ শুভ্র রিদিকে এক ঝটকায় সোজা করে দাঁড় করিয়ে কর্কশ গলায় ধমক দিল।
"হোয়াট আর ইউ ডুইং।দিন দুপুরে কি কানা হয়ে যাচ্ছিস। দেখে চলতে পারিস না। ইউ আর সো কেয়ারলেস।"
রিদি অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল।
"আসলে ভাইয়া স।"
রিদিকে কথা শেষ করতে দিল না শুভ্র। আবারো রাগী গলায় ধমক দিয়ে উঠল।
"জাস্ট গেট আউট। বের হো এখান থেকে।"
শুভ্রের রুক্ষ মেজাজ দেখে রিদি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ানোর সাহস পেল না। সে প্রায় দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শুভ্র একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলের দিকে এগিয়ে এল। ধোঁয়া ওঠা কফির কাপটা হাতে নিয়ে সবে কয়েক চুমুক দিয়েছে ঠিক তখনই টেবিলে রাখা ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল। শুভ্র নির্লিপ্ত মুখে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে ফুটে ওঠা নামটা দেখামাত্রই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল কপালে ফুটে উঠল বিরক্তির ভাঁজ। সে এক ঝটকায় ফোনটা রিজেক্ট করে ছুড়ে মারার মতো করে টেবিলে রাখল। মেজাজটা যেন মুহূর্তেই তিতকুটে হয়ে গেছে। শুভ্র আর ঘরে থাকল না কফির কাপ হাতে নিয়ে গটগট করে ব্যালকনির দিকে চলে এল। ব্যালকনির রেলিংয়ে শক্ত মুঠোয় হাত রেখে বাইরের দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করল।
"হোয়াট আ রাবিশ। এই মেয়েটা কি আমাকে এক মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে দেবে না।"
#অসম্ভব_রকম_ভালোবাসি_তোমায়
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী 
#সূচনা_পর্ব
————
#অসম্ভব_রকম_ভালোবাসি_তোমায়
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী 
#পর্ব ২ 
পরের দিন সকালে পুরো বাড়ি আত্মীয়-স্বজনে ঠাসা। কাল গায়ে হলুদ আর মাত্র দুদিন পর বিয়ে। কাজিনরা সবাই চলে আসায় বাড়ি এখন রীতিমতো রণক্ষেত্র। আজকে চৌধুরী বাড়ির সবাই শপিংয়ে যাবে। রিদি মনের ভেতর একরাশ কষ্ট চেপে রেখে কোনোমতে রেডি হয়েছে। যদিও তার যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই কিন্তু তার কাজিনরা নাছোড়বান্দা।
সবাই নিচে রেডি হয়ে অপেক্ষা করছে। কিন্তু আসল মানুষটার খবর নেই। সেই যে সকালে খেয়ে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে রেখেছে শুভ্র আর বের হওয়ার নাম নেই। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে সোহান চৌধুরী শুভ্রের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। দরজায় সজোরে করাঘাত করে বললেন।
"শুভ দরজা খোল। আমরা সবাই নিচে দাঁড়িয়ে আছি। আর নেহা মা-ও বারবার কল করছে তুই মেয়েটার কলও ধরছিস না। সমস্যা কী তোর।"
সোহান চৌধুরীর কথা শেষ হতে না হতেই খট করে দরজা খুলে গেল। শুভ্র একদম ফিটফাট হয়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে এল। তার এমন গাম্ভীর্যপূর্ণ উপস্থিতি দেখে সোহান চৌধুরী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বাড়ি থেকে সবাই এক এক করে বের হলো। শুভ্র তার গাড়িতে উঠে বসতেই সব কাজিনরা হুরমুর করে পেছনের সিটে উঠে পড়ল। কিন্তু রিদি একপাশে মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিদিকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার খালাতো বোন পাখি বলে উঠল।
"কিরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন উঠবি না।"
রিদি কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে চুপচাপ গাড়ির পেছনে উঠতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে শুভ্র গাড়ির স্টিয়ারিংটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। সে রাগে দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ গলায় গর্জে উঠল।
"আমাকে কি তোদের সবার ড্রাইভার মনে হয় যে তোরা সব নবাবজাদির মতো পেছনে বসবি আর আমি ড্রাইভারের মতো গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাব। আর ইউ অল আউট অফ ইয়োর মাইন্ড।"
শুভ্রের সেই কর্কশ কণ্ঠস্বরে রিদি শিউরে উঠল। তার বুক ধক করে উঠল। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে শুভ্রা রিদির দিকে তপ্ত চোখে তাকিয়ে বলল।
"রিদি তুই গিয়ে সামনে বোস। তাছাড়া পেছনে অলরেডি চারজন বসে পড়েছি এমনিতেই এখানে কাচুমাচু হচ্ছে। এখন পাঁচজন বসলে সমস্যা হবে।"
রিদির বুক ধুকপুক করে উঠল। সামনে বসা তাও আবার শুভ্রের ঠিক পাশের সিটে। রিদি যেন নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে সে নড়তেও ভুলে গেল। রিদিকে ওভাবে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শুভ্র স্টিয়ারিংয়ে এক হাত দিয়ে চাপ দিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল।
"ওভাবে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে না থেকে গাড়িতে উঠবি নাকি আমি স্টার্ট দিয়ে চলে যাব। ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম।"
রিদি চমকে উঠে কোনো রকমে বুকের পাথর সরিয়ে সাহস সঞ্চয় করল। সে কাঁপা কাঁপা হাতে সামনের দরজা খুলে শুভ্রের পাশের সিটে গিয়ে বসল। বসার সাথে সাথেই শুভ্রের শরীরের সেই তীব্র পারফিউমের ঘ্রাণ আর আভিজাত্য রিদির স্নায়ু অবশ করে দিল। শুভ্র এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সে সাথে সাথে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিল। তার দুহাত স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে চেপে বসে আছে দৃষ্টি একদম সামনের রাস্তায় নিবদ্ধ। পুরো গাড়িতে এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে কেবল ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ আর রিদির দ্রুতগামী হৃদস্পন্দন শোনা যাচ্ছে এমন মনে হচ্ছে। শুভ্র অত্যন্ত ধীর স্থির অথচ এক অদ্ভুত গতিতে গাড়ি চালাতে লাগল।
গাড়ি সোজা শপিং মলের সামনে এসে থামল। যার সাথে শুভ্রের বিয়ে ঠিক হয়েছে সেই সুরাইয়া নেহা আর তার পরিবারের সবাই শপিং মলের সামনে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল। চৌধুরী বাড়ির বড়রা নেহার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলতে শুরু করলেন। শুভ্রের গাড়ি থেকে সবাই নামল রিদিও নামল। শুভ্র গাড়ি থেকে নামামাত্রই নেহা দূর থেকে তাকে দেখে এক প্রকার দৌড়ে এল। সে সবার সামনেই শুভ্রকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল।
"ও ডিয়ার মিস ইউ সুইটহার্ট।"
এই দৃশ্য দেখে রিদির মনে হলো কেউ যেন এক ঝটকায় তার বুকে ছুরি চালিয়ে দিয়েছে। বুকটা চিরে এক অসহ্য যন্ত্রণা দলা পাকিয়ে এল। যে মানুষটাকে সে নিজের অজান্তেই মনে ঠাঁই দিয়েছে তাকে অন্য কারো বাহুবলীতে দেখে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইল।
শুভ্র বিরক্ত হয়ে নেহাকে ছাড়িয়ে বিরক্তি গলায় বলল।
"ক্যান উই জাস্ট গো ইনসাইড। এখানে দাঁড়িয়ে এসব ড্রামা করার কোনো মানে হয় না। আই ডোন্ট লাইক ইট।"
নেহা শুভ্রের বাহু আঁকড়ে ধরে কিছুটা অধিকার ফলানোর সুরেই অভিযোগ করল।
"তুমি কাল আমার ফোন ধরোনি কেন কতবার কল করেছি তোমাকে।"
শুভ্র নেহার দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। শুভ্রর চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। সে একদম শীতল গলায় বলল।
"এসব ফালতু প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি প্রস্তুত নই।"
নেহা একটু গাল ফুলিয়ে আদুরে গলায় বলল।
"আচ্ছা ঠিক আছে উত্তর দিতে হবে না তোমাকে। চলো ভেতরে যাই।"
বলেই নেহা এক প্রকার জোর করেই শুভ্রের হাত টেনে ধরে শপিং মলের ভেতরে নিয়ে গেল। শুভ্র প্রচণ্ড বিরক্ত হচ্ছে কারো এভাবে গায়ে পড়া বা শরীর স্পর্শ করা সে একদমই সহ্য করতে পারে না। কিন্তু সামনে বড়রা থাকায় সে নিজেকে শান্ত রাখল এবং কোনোমতে বিরক্তি চেপে ভেতরে ঢুকল।
সবাই ভেতরে প্রবেশ করলেও রিদি তখনও প্রবেশপথের কাছে জড়োসড়ো হয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার ভেতরে এক অদৃশ্য ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তখন শুভ্রা খেয়াল করল রিদি পিছিয়ে আছে। সে এগিয়ে এসে রিদির হাত ধরে টান দিয়ে বলল।
"চল আমাদের সাথে।"
---
ভেতরে সবাই যার যার পছন্দের জিনিস কেনায় মত্ত। নেহা এক মুহূর্তের জন্যও শুভ্রকে চোখের আড়াল হতে দিচ্ছে না। সে এটা পছন্দ করছে ওটা ট্রায়াল দিচ্ছে আর বারবার শুভ্রকে দেখিয়ে মতামত চাইছে। শুভ্র কোনো আগ্রহ ছাড়াই শুধু যান্ত্রিকভাবে মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছে। তার পুরো মনটাই যেন অন্য কোথাও পড়ে আছে।
সবাই দুহাতে কেনাকাটা করলেও রিদি একপাশে মূর্তির মতো নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার এই নির্লিপ্ততা সাহেরা চৌধুরীর নজর এড়াল না। তিনি রিদির কাছে এসে মায়াভরা স্বরে বললেন।
"রিদি তুই ওভাবে চুপচাপ কেন। সবাই তো যার যা মন চাইছে কিনছে। তুইও দেখ তোর কোনটা ভালো লাগে সেটাই নে।"
রিদি কোনোমতে ঠোঁটে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল।
"না না মামি তোমরা কেনাকাটা করো। আমার বাসায় পরার মতো অনেক কাপড় আছে আর নতুন কিছুর প্রয়োজন নেই।"
রিদির এমন অস্বাভাবিক কথা শুনে তার মা রাবেয়া এহসান কপালে ভাঁজ ফেলে বেশ অবাক হয়ে বললেন।
"সেকি কিছু লাগবে না মানে। শপিংয়ে এলে তো তুই আগে পুরো শপিং মল মাথায় তুলতিস। হাজারটা বায়নাক্কা করতিস আর আজ বলছিস কিছুই লাগবে না। তোর হয়েছেটা কী সত্যি করে বল তো।"
রিদি সাথে সাথে উত্তর দিল। তার গলায় জোর করে আনা এক ধরনের অস্বাভাবিকতা ছিল।
"আরে না আম্মু সত্যি আমার অনেক কিছু আছে। তাছাড়া এখন কিনলে ওগুলো তো আলমারিতেই পড়ে থাকবে নষ্ট হবে। তোমরা কেনো তো।"
বলেই রিদি আর সেখানে দাঁড়াল না। সে একটু দূরে গিয়ে একটা পিলারের আড়ালে একা দাঁড়াল। কিচ্ছু ভালো লাগছে না তার এই আলোকোজ্জ্বল শপিং মল হাসাহাসি মানুষের ভিড় সবই যেন বিষের মতো লাগছে। বুকের ভেতরটা যেন কেউ নিংড়ে ধরছে তীব্র এক যন্ত্রণা হচ্ছে। রিদি কাঁচের দেয়ালের ওপাশে বাইরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। সে মনে মনে ভাবল।
"আচ্ছা ভালোবাসা এত কষ্টের কেন। সবাই তো বলে মন থেকে কাউকে ভালোবাসলে নাকি তাকে পাওয়া যায়। আমি তো শুভ্রকে নিজের অস্তিত্ব দিয়ে ভালোবেসেছিলাম। তবে তাকে পেলাম না কেন? কেন সে আজ অন্য কারো হয়ে যাচ্ছে।"
রিদির টলমলে চোখ থেকে দুফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে দ্রুত হাত দিয়ে সেই নোনাজল মুছে ফেলল যাতে কেউ টের না পায়। নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর এক ব্যর্থ চেষ্টা করে সে কাওকে কিছু না বলে ধীরপায়ে ভিড় ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ করেই রিদির চোখ আটকে গেল ওপরের দিকে ঝোলানো একটি অপূর্ব শাড়ির ওপর। শাড়িটির নিখুঁত কারুকাজ আর রাজকীয় আভিজাত্য দেখে রিদি যেন সম্মোহিত হয়ে গেল। শাড়িটা দেখা মাত্রই তার মনে হলো এটি যেন তারই জন্য তৈরি। কিন্তু পরক্ষণেই একরাশ বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করল। সে তো একটু আগেই সবাইকে বুক ফুলিয়ে বলেছে তার কিছু লাগবে না। এখন নিজে থেকে চাইলে সবাই কী ভাববে লোক হাসাহাসি হবে না। কিন্তু শাড়িটার দিক থেকে চোখ সরানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ল। রিদি এক বিষণ্ণ আর করুণ চাহনি নিয়ে শাড়িটির দিকে তাকিয়ে রইল।
এদিকে শুভ্র নেহার ওপর মনে মনে ফুঁসছে। নেহা সবার সামনে বারবার তার গায়ের ওপর ঢলে পড়ছে যা শুভ্রের আভিজাত্যে চরমভাবে আঘাত করছে। হঠাৎই শুভ্রর ফোনটা বেজে ওঠল। ফোনটা বেজে উঠতেই সে যেন মুক্তির নিশ্বাস ফেলল। সে এক প্রকার জোর করেই নেহাকে সরিয়ে দিয়ে কথা বলতে বলতে কিছুটা সামনে এগিয়ে এল। ফোনের কথা শেষ করে শুভ্র যেই ঘুরে দাঁড়াতে যাবে অমনি তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো একটু দূরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা রিদির ওপর। সে খেয়াল করল রিদি ওপরের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। শুভ্র রিদির দৃষ্টি অনুসরণ করে সেই শাড়িটি দেখল। রিদির চোখের সেই তৃষ্ণা শুভ্রের চোখ এড়ালো না।
রিদিকে ওভাবে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে শপিং মলের একজন কর্মচারী এগিয়ে এসে বিনীত স্বরে বলল।
"ম্যাম আপনার কি শাড়িটি পছন্দ হয়েছে আপনি বললে আমি ওটা নামিয়ে দেখাতে পারি।"
রিদি যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল।
"না না ভাইয়া আমি এমনিই দেখছিলাম। তবে হ্যাঁ শাড়িটা আসলেই খুব সুন্দর।"
কথাটা বলেই রিদি অপরাধীর মতো দ্রুতপায়ে সেখান থেকে সরে গেল। রিদি চলে যেতেই শুভ্র সেখানে এসে দাঁড়াল। তার চেহারায় এক অদ্ভুত কাঠিন্য। সে সরাসরি কর্মচারীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় আদেশ দিল।
"প্যাক দিস শাড়ি। ডু ইট ফাস্ট।"

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে chapter 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন