ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের দহন

১১তম পর্ব

লেখক: ফাহমিদা মিমি

#প্রণয়ের_দহন

#ফাহমিদা_মিমি

#পর্ব_১১

(অনুমতি ছাড়া কপি করা নিষেধ 🚫)

--------------------

কাউসার রহমানদের বাসায় ফেরার পর হৃদিকা আর কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলেই দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে ঢুকে পড়ে। রুমে ঢুকেই সে দেখে, রানিয়া পড়ায় মনোযোগ দিয়ে বসে আছে। হৃদিকা কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা খাটের ওপর নিজের ফোন খুঁজতে শুরু করে। খাটে না পেয়ে সাইড টেবিলসহ রুমের এদিক-সেদিক সব জায়গায় অস্থিরভাবে খোঁজাখুঁজি করতে থাকে।

শেষে না পেয়ে রানিয়াকে জিজ্ঞেস করে,

—“আমার ফোনটা কোথায়, রানি? দেখ না, বিছানায় রেখে গিয়েছিলাম, এখন পাচ্ছি না। তুই দেখেছিস?”

রানিয়া মাথা তুলে তাকিয়ে দেখে হৃদিকা যেন পাগলের মতো কিছু খুঁজছে। কপাল কুঁচকে, একটু বিরক্ত স্বরে সে বলে,

—“এই নাও, আমার কাছে ছিল। একটু দরকার ছিল, তাই নিয়েছিলাম।”

হৃদিকা এমনভাবে তাকায়, যেন তার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে। সে কোনো কথা না বলে প্রায় ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে রানিয়ার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নেয়। হৃদিকার এমন আচরণে রানিয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে, তারপর বিরক্ত হয়ে বলে,

—“এমন করছো যেন কী করে ফেলেছি! ফোনটাই তো নিয়েছি, তোমার কিডনি তো নেইনি!”

রানিয়া রাগে মুখ ঘুরিয়ে আবার পড়ায় মন দেয়। আর হৃদিকা তাড়াতাড়ি ফোন চেক করে দেখে,৫০টা মিসড কল, আর তার আগে ২০টা মেসেজ। হাসপাতালের ওয়াশরুমের ঘটনাটা মনে পড়তেই সে ঢোক গিলে।

ফোনটা হাত থেকে খাটের পাশের সাইড টেবিলে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই আবার একটি মেসেজ আসে। মেসেজের রিংটোন বাজতেই তার হাত কাঁপতে শুরু করে।মেসেজে লেখা,

—“রাতে কল দিমু। কল দেওয়ার পর রিসিভ না হইলে তোর বাসায় চইলা আসমু।”

মেসেজটা দেখে হৃদিকা আবার একবার রানিয়ার দিকে তাকায়। তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা রেখে দেয়। নিজের ভেতরের অস্থিরতা লুকিয়ে সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে ওঠা, তার ওপর সম্রাটের এই মেসেজ,সব মিলিয়ে জ্বরের মধ্যেও শরীরটা যেন আরও কাঁপতে থাকে। তবুও নিজেকে শক্ত করে কিছুক্ষণ বসে থেকে বিশ্রাম নেয়, তারপর ধীরে ধীরে ফ্রেশ হয়ে আসে।

।

।

।

।

এদিকে সম্রাট তার বাবার পার্টি অফিসে বসে আছে। তার পাশে ছেলেপেলেরা,কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। ঘরের এক কোণে জুম্মন আর রিয়েল বেশ কিছুক্ষণ ধরে ফিসফিস করে কী যেন আলোচনা করছে।

তাদের সেই চাপা ফিসফিসানি সম্রাটের কানে যেতেই সে কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে ধমকে ওঠে,

—“কি শুরু করছোস তোরা? এমন সাপের মতো ফিসফিস করতাছোস কেন?”

সম্রাটের ধমক খেয়ে রিয়েল এগিয়ে আসে সামনে। জুম্মনকে পেছনে রেখে একটু হাসিমুখে বলে,

—“আরে ভাইজান, আপনার লগে লগেই জুম্মনও নিজেরটা বুইঝা লইতাছে।”

সম্রাট কপাল কুঁচকে তাকাতেই রিয়েল মাথা নেড়ে আবার বলে,

—“বুঝেন নাই নিশ্চয়ই। আরে ভাই, জুম্মনও প্রেমে পড়ছে। প্রতিদিন ওই মাইয়াটারে ফলো করে!”

সম্রাট এবার জুম্মনের দিকে একবার তাকিয়ে আবার রিয়েলের দিকে ফিরে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করে,

—“কে মাইয়াটা?”

জুম্মন তখন রাগে রিয়েলের দিকে তাকিয়ে আছে, আর রিয়েল ভেলকির মতো হেসে উত্তর দেয়,

—“ভাই, ওই যে ভাবির বান্ধবী… কী জানি নাম…”

একটু থেমে মাথা চুলকাতে চুলকাতে হঠাৎ মনে পড়তেই বলে ওঠে,

—“ওহ হ্যাঁ, মনে পড়ছে লোবা!”

সম্রাট ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে বলে,

—“লোবা না চুবা! যা-ই হোক, জুম্মন যেন ওই মাইয়ার থেকে দূরে থাকে,সেই দায়িত্ব আইজকা থেইকা তোর।”

এরপর ফোনটা নামিয়ে সম্রাট হঠাৎই ঘরের সবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,

—“আমার আগে যদি কেউ নিজেরটা ঠিক করতে যাস, সবাইরে চত্বরে তপ্ত রোদের মধ্যে দাঁড় করায়া রাখমু খলি গায়ে!”

তার কড়া হুঁশিয়ারিতে ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই থমথমে হয়ে ওঠে। রিয়েল জুম্মনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হাসি আটকে রাখার চেষ্টা করে, আর জুম্মন মাথা নিচু করে দাঁত কটমট করতে থাকে,সব রাগ জমে আছে রিয়েলের ওপর।

এরই মধ্যে সম্রাট উঠে দাঁড়ায়। চোখে কালো চশমা পরে, ফোন পকেটে রেখে পেছনে হাত গুঁজে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করে। ঠিক তখনই জুম্মন সুযোগ বুঝে রিয়েলকে চেপে ধরে পিঠে কনুই মারতে যাবে, এমন সময় সম্রাট হঠাৎ পিছন ফিরে তাকায়। চশমা নাকের ডগায় নামিয়ে তার উপর দিয়ে জুম্মনের দিকে তাকিয়ে বলে,

—“কিরে কসাই, তোরে কি এখন দাওয়াত দিয়া আনতে হইবো?”

সম্রাটের কথায় জুম্মন তড়িঘড়ি করে রিয়েলকে ছেড়ে দেয়। কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে ঢোক গিলে সামনে হাঁটা ধরে, যাওয়ার আগে একপলক রিয়েলের দিকে তাকিয়ে নেয়। আর রিয়েল ভেতরে ভেতরে ভীষণ খুশি,আজ সে জুম্মনকে ভালোই জব্দ করতে পেরেছে, তাও আবার তাদের প্রাণপ্রিয় ভাইয়ের সামনে।

শেষমেশ রিয়েলও তাড়াতাড়ি সম্রাটের পেছনে ছুটে যায়। কারণ জুম্মন ড্রাইভিং জানে না, আর সম্রাট পারলেও নিজে গাড়ি চালাবে না,তাই এই দায়িত্বটা রিয়েলেরই।

।

।

।

।

সকাল সকাল তৈরি হয়ে নিচে নেমে আসে হৃদিকা। নাস্তার টেবিলে তখন বসে আছেন কাউসার রহমান, রানিয়া আর সাহিদা বেগম। হৃদিকাকে এভাবে সাজগোজ করা অবস্থায় দেখে সাহিদা বেগম কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন,

—“কলেজে যাবি? শরীর তো এখনো ঠিক হয়নি।”

মায়ের কথা শুনে হৃদিকা শুকনো ঢোক গিলে সামনে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলে,

—“আ… আসলে মা, আমরা বান্ধবীরা সবাই লোবার বাসায় যাব। আজ লোবার জন্মদিন,ওকে সারপ্রাইজ দেব।”

কাউসার রহমান কিছুটা বিস্মিত হয়ে বলেন,

—“এখন কেন?আরো পরে যেতে পারবে না?”

হৃদিকা আড়চোখে একবার বাবার দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে ফেলে,

—“আব্বু, সবাই এ…”

হৃদিকা কথা শেষ করার আগেই সাহিদা বেগম কাউসার রহমানের দিকে তাকিয়ে একটু উঁচু স্বরে বলেন,

—“একটা দিনেরই তো ব্যাপার, যাক না। আজকে ছাড় দাও। আর হৃদি, কোথাও যাবি আগে বললি না কেন?”

মায়ের দিকে তাকিয়ে হৃদিকা ধীরে উত্তর দেয়,

—“আসলে রাতে ঘুমানোর আগে বলেছে, তাই আর বলা হয়নি। তোমরা তখন ঘুমিয়ে ছিলে।”

এরপর আর কেউ কথাটা বাড়ায় না। সবাই চুপচাপ নাস্তা শেষ করে নেয়। কাউসার রহমানের কাজ থাকায় ঠিক হয়, রানিয়াকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে হৃদিকা তারপর নিজের গন্তব্যে যাবে।

বাড়ির গেট পেরোতেই হৃদিকার চোখে পড়ে, রাস্তায় আজ অস্বাভাবিক ভিড়। যেখানে প্রতিদিন পাঁচ-ছয়জন শ্রমিক দেখা যেত, আজ সেখানে যেন শতাধিক লোক কাজ করছে। দৃশ্যটা দেখে হৃদিকা কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, আর রানিয়া খুশি রাস্তা যত দ্রুত ঠিক হবে, ততই তার সুবিধা; অন্তত এইটুকু পথ আর হাঁটতে হবে না।

দু-বোন গল্প করতে করতে কলেজে পৌঁছে যায়। রানিয়া রিকশা থেকে নেমে সরাসরি কলেজের গেটের দিকে হাঁটা দেয়। আর হৃদিকা রিকশাওয়ালাকে বলে একটি পার্কের সামনে যেতে।

রিকশায় বসে থাকতে থাকতে হৃদিকার মনে নানা চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। বাসা থেকে সে মিথ্যা বলে বেরিয়েছে,যদি কেউ বুঝে ফেলত! তবে কেউ বুঝতে পারেনি, এটাই তার স্বস্তি। এমনকি তার পরনের কাপড়টাও কারও নজরে পড়েনি। এই ভাবনাতেই হঠাৎ করে গত রাতের ঘটনাগুলো মনে পড়ে যায় তার, আর অজান্তেই তার ভেতরে অস্বস্তির এক শীতল স্রোত বয়ে যায়।

।

।

।

।

রাত প্রায় একটা ছুঁইছুঁই। ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে খাটের পাশে বসে ছিল হৃদিকা; প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ফোনটি ভাইব্রেট করে ওঠে। স্ক্রিনে তাকাতেই তার গলা শুকিয়ে আসে। ফোন রিসিভ করে একবার রানিয়ার দিকে তাকায় সে। “হ্যালো” বলার আগেই ওপাশ থেকে সম্রাট ধমকে ওঠে,

—“কি হইছে তোমার? ফোন তুলতে এত দেরি কেন? আমি না কইছিলাম, আমার কল যেন সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ হয়!”

ধমকে হৃদিকা কিঞ্চিৎ চমকে ওঠে। রানিয়ার নড়াচড়া দেখে আস্তে করে উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে বৈরি আবহাওয়া বইছে। গলা পরিষ্কার করে ধীরে বলে,

—

“আ... আমার চোখ লেগে এসেছিলো ঘুমে। আর পাশে আমার ছোট বোন ঘুমাচ্ছে,কোনোভাবে জেগে গেলে আর এগুলো জানলে সমস্যা হয়ে যাবে।”

সম্রাটের ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। সে নিজের রুমে দোলনায় হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ে, তারপর বলে,

—“আচ্ছা, হলুদিয়া,তোমারে দেখতে এত মায়াবতী লাগে কেন?তুমি কোন দুঃখে আমার সামনে পড়ছিলা?”

‘হলুদিয়া’ শব্দটা শুনেই হৃদিকার মনে পড়ে সেই চিঠি আর পার্সেলের কথা,চিঠিতে লেখা ছিল ‘প্রিয় হলুদিয়া’। বুঝতে দেরি হয় না, সেগুলো সম্রাটই পাঠিয়েছিল।

ভাবনার ভেতর থেকেই সে প্রশ্ন করে,

—“তাহলে আপনিই সেই ব্যক্তি, যিনি আমাকে পার্সেল পাঠিয়েছিলেন?”

কিছুক্ষণ নীরব থেকে সম্রাট স্বীকার করে নেয়। তারপর সরাসরি বলে,

—“শোনো, কাল আমার সঙ্গে দেখা করবা। কেমন করে করবা জানি না,সারাদিনের জন্য সময় নিয়ে আসবা। আর হ্যাঁ, অবশ্যই আমার দেওয়া হলুদ জামা পরে আসবা। সকাল দশটায় পার্কের সামনে থাকবা।”

হৃদিকাকে সুযোগ না দিয়েই সম্রাট কলটা কেটে দেয়,এদিকে পায়তারা করতে থাকে কিভাবে কি করবে।বাসায় কি বলে বের হবে,সে কিছুই বুঝতে পারছিলো না তবে লোবাকে জানিয়ে দেয়, সে কালকে তার নাম বলে একটু বের হবে।

রিকশা থামার হালকা ঝাঁকুনিতে হৃদিকার ভাবনা ভাঙে। নামতে গিয়ে হঠাৎ পা মুচকে যায়; পড়ে যেতে নিলে কেউ তার হাত ধরে ফেলে। চমকে তাকিয়ে দেখে,শ্যামবর্ণের পুরুষ শুভ্র সাদা পাঞ্জাবি পরা, কপালে লেপ্টে থাকা বাবরি চুল। সে তাকিয়েই থাকে, ঠিক তখনই ধমকের স্বর,—“এই মেয়ে, দেইখা নামবা না রিকশা থেইকা?চোখ কি উড়নার নিচে নিয়া ঘুরো?”

সম্রাট তাকে একহাতে ধরে, রিকশাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে নির্জন পার্কের ভেতরে নিয়ে যায়। পার্কটি নতুন; চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু প্রেমিকযুগল আর কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবীর আড্ডা। সেসব দেখে হৃদিকার ঠোঁটে অজান্তেই একচিলতে হাসি ফুটে ওঠে।

সম্রাট তাকে পার্কের ভেতরের ছোট রেস্টুরেন্টে নিয়ে যায়। চেয়ার টেনে বসিয়ে নিজেও পাশে বসে কফি অর্ডার করে। হৃদিকার দিকে তাকিয়ে থাকে,হলুদ জামার সঙ্গে সাদা উড়না আর সাদা পায়জামায় সে যেন আলাদা এক মায়া ছড়াচ্ছে। রোদের আলোয় তার মুখ লালচে, কাজলটানা সবুজাভ চোখ অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।

সম্রাটের ডাকে তার ধ্যান ভাঙে,

—“তুমি ব্যথা পাইছো, হৃদ? এমন তাড়াহুড়া কেউ করে? আস্তেধীরে কাজ করবা না?”

হৃদিকা মাথা নেড়ে ‘না’ জানায়। ব্যথা পাওয়ার আগেই তো সম্রাট তাকে ধরে ফেলেছিল।এসময় তার চোখ পড়ে রেস্টুরেন্টের এক কোণের বুকশেলফে,সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন বইয়ে। বইটি আনতে উঠতেই সম্রাট হাত ধরে বলে,

—“কই যাও তুমি?”

হৃদিকা ইশারায় বলে,

—“ওখান থেকে একটা বই আনতে… নিয়ে আসি?”

সম্রাট নিজেই আনতে চাইলে হৃদিকা তাকে বসতে বলে। নিজে গিয়ে বই নিয়ে এসে পাতায় চোখ বুলাতে থাকে। কফি এসে গেলেও সে বইয়েই ডুবে থাকে। চেয়ারে পা তুলে বসে পড়তেই তার পায়ের নুপুর চোখে পড়ে সম্রাটের। সে জিজ্ঞেস করে,

—“তোমার নুপুর পরতে ভালো লাগে?”

বইয়ে মন দেওয়া হৃদিকা ছোট করে জবাব দেয়,

—“হুম।”

সম্রাট আঙুল দিয়ে নুপুরে ঝুনঝুন শব্দ তোলে। ঠিক তখনই হৃদিকার ফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে নাম দেখে সে হালকা নড়ে বসে। কল রিসিভ করতেই ওপাশে সাহিদা বেগম,

—“কখন ফিরবি বাসায়?”

অপ্রস্তুত হয়ে হৃদিকা বলে,

—“মাত্রই তো আসলাম, আম্মু…”

কিছুক্ষণ পর সাহিদা বেগম তাকে দ্রুত ফিরতে বলেন,নইলে কাউসার রহমান রাগ করবেন। বাবার নাম শুনেই হৃদিকা চুপসে যায়। সম্রাট জিজ্ঞেস করে,

—“বাসায় যেতে বলছে?”

হৃদিকা মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ জানায়। সঙ্গে সঙ্গে সম্রাট তার হাত ধরে বেরিয়ে আসে।বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে, তার কিছুক্ষণ পরই ঝুম বৃষ্টি। তারা এক ছাউনির নিচে দাঁড়ায়। আরেকজন লোক থাকায় সম্রাট হৃদিকাকে আড়াল করে দাঁড় করায়।হৃদিকা বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় আবার সামনে এনে দাঁড় করায় সম্রাট।

লোকটি সম্রাটকে চিনতেই বলে,

—“ভাই, আপনি কি আমাদের মন্ত্রীর ছেলে সম্রাট ভাই না?”

সম্রাট কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদিকে বাতাসে হৃদিকার উড়না আর জামা উড়তে থাকলে সম্রাট তা ঠিক করে হাঁটু পর্যন্ত পেঁচিয়ে দেয়। ঠান্ডায় কাঁপতে দেখে তাকে বুকের কাছে টেনে নেয়। হৃদিকা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে,যে মানুষটা এত নির্মম হতে পারে, সে-ই এমন যত্নশীল কেন?আর তারসাথেই বা এমন করছে কেনো?সম্রাটের ধমকিতে তো চলে এসেছে কিন্তু সে কিছু বুঝতে পারছে না সম্রাটের কাহিনি।

পরক্ষণেই আশেপাশে মানুষ আছে মনে পড়তেই সে সম্রাটকে সরিয়ে দিয়ে বলে,

—“দূরে থাকুন, প্লিজ… এটা ঠিক না। আপনি তো পরপুরুষ, তাই না?”

এই কথাতেই যেন সম্রাটের ভেতরে আগুন জ্বলে ওঠে। সে এক ঝটকায় হৃদিকার হাত ধরে বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে আসে।

রাস্তায় এসে দেখা হয় জুম্মন আর সনেটের সঙ্গে,তারা বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। হৃদিকা অবাক হয়ে বলে,

—“ওরাও এসেছে? তাহলে ভেতরে নেননি কেন? এরা তো ভিজে গেছে!”

সম্রাট কোনো উত্তর না দিয়ে সনেটের কাছে বাইকের চাবি চায়। সনেট আপত্তি জানায়,

—“ওকে ভিজাচ্ছিস কেনো?বাড়ি গেলে কি জবাব দিবে?”

সম্রাট চোয়াল শক্ত করে কড়া গলায় বলে,

—“এটা পুরাপুরি আমার ইচ্ছা। বেশি দয়া দেখানের দরকার নাই। বাসায় কিছু কইলে ওরে আমার বাড়ি নিয়া যাইতে সুবিধা হইবো। চুপচাপ জুম্মনের সাথে ওর বাইকে ওঠ।”

সনেট চুপ করে যায়। হৃদিকা ভিজে কাঁপতে থাকে, তবুও সম্রাট তাকে জোর করেই বাইকে তোলে। তারপর বৃষ্টির মধ্যেই তাকে নিয়ে দূরের এক রাস্তা ধরে চলে যায়।

অনেকক্ষণ পর, বিকেলের দিকে আজিমপুর বাজারের কাছে এসে থামে। বৃষ্টি তখনো থামেনি। জুম্মনকে ইশারা করে রিকশা আনতে বলে। হৃদিকাকে রিকশায় বসিয়ে ঝুঁকে বলে,

—“আমার পছন্দ না,আমার ওপর দিয়া কেউ কথা বলুক। আমারে নিজের পুরুষ ভাবা শুরু করো এখন থেইকা,আর এখন এটা ছিল তোমার জন্য সামান্য শাস্তি। আর হ্যাঁ, বাসায় কেউ কিছু কইলেই আমারে কল দিবা,পালকি নিয়া তোমার বাড়ির সামনে হাজির হমু।”

রিকশা চলে যায়। হৃদিকা স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে,একই মানুষ, অথচ দুই রকম রূপ!আর সম্রাটের সব কথা মাথায় ঢুকতেই হৃদিকার বুঝতে বাকি নেই সম্রাট কি চাইছে।কিন্তু হৃদিকার সম্রাটকে পছন্দ ন শুধুমাত্র তার স্বভাবের জন্য, মারামারি-হানাহানি আর সবথেকে বড় কথা রাজনীতি। হৃদিকার সবচেয়ে ঘৃণা হয় রাজনৈতিক দলগুলোকে দেখলে।

বাড়িতে ঢুকতেই সাহিদা বেগম চেঁচিয়ে ওঠেন,

—“এত দেরি করলি কে....”

কথা শেষ করার আগেই মেয়ের ভেজা অবস্থা দেখে থেমে যান। তারপর রাগে বলেন,

—“শান্তি দিবি না আমাকে? একজন কলেজ থেকে ভিজে এসেছে দুপুরে বিকেলেই জ্বরে ভোগছে,আর তোর তো জ্বর এখনো সাড়েনি, তাও বৃষ্টিতে ভিজে এলি! আবার জ্বর এলে হাসপাতালের বেডে একা ফেলে আসব। বান্ধবীর বাসায় গিয়ে ভিজলি কী করে?”

হৃদিকা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,

—“আ… আসলে আম্মু, ওরা সবাই মিলে জোর করে ভিজিয়েছে… আমি ইচ্ছে করে করিনি।”

কিছুক্ষণ বকাঝকা করে সাহিদা বেগম তাকে ভেজা কাপড় বদলাতে বলেন। হৃদিকাও ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত নিজের রুমে চলে যায়।

চলবে_

[ভুলত্রুটি মার্জনা করবেন,গল্প এলোমেলো হয়েছে। আর প্লিজ আপনারা একটু রেসপন্স কইরেন ভালো লাগে,অসুস্থ শরীর নিয়েও লিখি কিন্তু আপনারা একটু রিয়েক্ট কমেন্ট ও করতে পারেন না।বেশি বেশি রেসপন্স করবেন।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন