#প্রণয়ের_দহন
#ফাহমিদা_মিমি
#পর্ব_১৫
( অনুমতি ছাড়া কপি করা নিষেধ 🚫)
---------------------
সেদিনের ঘটনার পর কেটে গেছে কয়েকটি দিন। কাউসার রহমানের কথামতো কারিমা বেগম আর ইমন সেদিনই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তারপর থেকেই বাড়িটা যেন এক অদ্ভুত নীরবতায় ঢেকে ছিল। হৃদিকাও আর কারও সঙ্গে তেমন কথা বলত না। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতো না। আগের চঞ্চল মেয়েটা যেন হঠাৎ করেই অনেকটা চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল।
তবে সময় কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে কয়েকদিন কেটে গেল, আর চলে এলো লোবার গায়ে হলুদের দিন। লোবার বিয়েতে কে কী পরবে, কেমন সাজবে, এমনকি নাচের পরিকল্পনাও মাহিমা আগেই করে রেখেছিল।
আজ লোবার গায়ে হলুদ। সকাল থেকেই লোবাদের বাড়ি যেন উৎসবের রঙে সেজে উঠেছে। উঠানের চারপাশে হলুদ আর গাঁদা ফুলের সাজসজ্জা, কোথাও রঙিন কাপড়, কোথাও ছোট ছোট আলোর ঝলকানি। বাড়ির মেয়েরা সকাল থেকেই ব্যস্ত। কেউ ফুল সাজাচ্ছে, কেউ মেহেদি পরছে, আবার কেউ গানের তালে তালে নাচের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হৃদিকাও আজ অনেক দিন পর নিজের মন খারাপটাকে একটু পাশে সরিয়ে রেখেছে। লোবার গায়ে হলুদ বলে কথা!আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে সে নীল রঙের একটি সুন্দর ঘাগরা পরে আয়নার সামনে চুল ঠিক করছিল। ঠিক তখনই মাহিমার ফোন আসে।
—“হৃদি! তুই এখনও তৈরি হোসনি? সবাই চলে গেছে। লোবার হলুদ কিন্তু শুরু হয়ে যাবে!”
আয়নার দিকে তাকিয়েই হৃদিকা বলল,
—“এই তো, হয়ে গেছে। আর একটু ওয়েট কর।”
মাহিমা তখন পাড়ার মোড়ে গাড়ি নিয়ে প্রায় আধঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছে। বিরক্ত মুখে সে বলল,
—“তোর ওই ‘আর একটু’ মানেই আধঘণ্টা। তাড়াতাড়ি আয়, নয়তো আমি সোজা বাড়ি চলে যাব!”
হৃদিকা মুচকি হেসে বলল,
—“তুই না থাকলে আমার জীবনটা শান্তিতে কাটত, মাহি।”
—“আর তুই না থাকলেও আমার জীবনটা শান্তিতে থাকত!”
মাহিমা আর হৃদিকা দুজনেই হেসে উঠল। ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে রানিয়ার কণ্ঠ শোনা গেল,
—“তুই কি আজ লোবা আপুর গায়ে হলুদে যাবি, নাকি এখানেই সাজুগুজু করে ঘুমিয়ে পড়বি, আপু?”
রানিয়ার কথা শুনে হৃদিকা আর মাহিমা আবারও হেসে ফেলল। এরপর মাহিমা ফোন কেটে দিল।দরজা খুলে হৃদিকা বলল,
—“আহা! তুই তো দেখি এখনই আমার ওপর রাগ দেখাচ্ছিস!”
রানিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—“আমার রাগ হবেই না? সেই কখন থেকে রেডি হয়ে বসে আছি, আর তোর নামগন্ধও নেই!”
হৃদিকা রানিয়ার হাত ধরে টেনে বলল,
—“চল, বনু। বেশি কথা বলিস না। আজ লোবার সঙ্গে তোকেও হলুদের রঙে রাঙিয়ে দেব।”
দুজন একসঙ্গে নিচে নেমে এল। সাহিদা বেগমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। গেট পেরিয়ে সামান্য এগোতেই মোড়ের পাশে সাদা একটি গাড়ি তাদের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেল।
গাড়িতে উঠতেই মাহিমা হৃদিকাকে খোঁচা মেরে বলল,
—“বাব্বাহ! বিয়েটা মনে হয় তোরই হচ্ছে, তাই না? এমনভাবে সেজেছিস বলেই এত দেরি!”
হৃদিকা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—“বেশি কথা বললে কিন্তু এখনই নেমে যাব।”
আসলে হৃদিকা মোটেও খুব বেশি সাজগোজ করেনি। তার গায়ের ফর্সা রঙ, ঠোঁটে হালকা মেরুন লিপস্টিক আর চোখে টানা কাজল,এই সামান্য সাজেই তাকে ভীষণ মিষ্টি লাগছিল। আর মাহিমাও ইচ্ছে করেই তাকে রাগানোর জন্য এসব কথা বলছিল।
মাহিমা হেসে বলল,
—“থাক, মেরি মা! বস, তোকে কোথাও যেতে হবে না।”
মাহিমার কথায় হৃদিকা দাঁত বের করে হেসে তার দিকে তাকাল। তারপর তাদের গাড়িটি ছুটে চলল লোবাদের বাড়ির দিকে।
__________
লোবাদের বাড়িতে পৌঁছাতে হৃদিকাদের প্রায় দশ মিনিট সময় লাগল। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই উৎসবের আমেজে মনটা ভরে গেল। একপাশে মেয়েরা দল বেঁধে গান ধরেছে, অন্যপাশে কয়েকজন ছোট বাচ্চা আনন্দে দৌড়াদৌড়ি করছে। লোবার ছোট বোন তোবা হাতে ফুলের ঝুড়ি নিয়ে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। আর লোবার মা রহিমা বেগমসহ বাড়ির অন্যান্য নারীরা অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত।
কিছুক্ষণ পর লোবাকে সাজিয়ে স্টেজে নিয়ে বসানো হলো। হৃদিকা গিয়ে তার পাশে বসতেই লোবা একটু ঝুঁকে কানে কানে বলল,
—“হৃদি, আমার কিন্তু খুব নার্ভাস লাগছে।”
লোবার কথা শুনে হৃদিকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। এর মধ্যেই মাহিমা ফিসফিস করে জানতে চাইল,
—“কেন?”
লোবা মৃদু হেসে বলল,
—“সবকিছু বদলে যাবে না? আজ পর্যন্ত যেভাবে ছিলাম, কাল থেকে তো আর সেভাবে থাকব না।”
কথাটা শুনে হৃদিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বন্ধুর হাতটা শক্ত করে ধরে শান্ত কণ্ঠে বলল,
—“জীবনে কিছু পরিবর্তন ভয় দেখায়, আবার কিছু পরিবর্তন আমাদের নতুন সুখের কাছে নিয়ে যায়। তুই শুধু ভালো থাকিস। তাহলেই হলো।”
হৃদিকার কথায় লোবার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। তিন বান্ধবীই কিছুক্ষণ মন খারাপ করে বসে রইল। হৃদিকা আর কিছু না বলে লোবাকে জড়িয়ে ধরল।ঠিক তখনই চারপাশে হইচই শুরু হয়ে গেল।
—“হলুদ দাও! হলুদ দাও!”
মাহিমাই সবার আগে লোবার গালে অল্প একটু হলুদ মাখিয়ে দিল। এরপর হৃদিকা, মাহিমাসহ একে একে সবাই লোবার গাল, কপাল আর হাতে হলুদ লাগাতে শুরু করল।
প্রথমে লোবার চোখেমুখে কান্না কান্না ভাব থাকলেও কিছুক্ষণ পরেই সেই বিষণ্ণতা মিলিয়ে গেল। সেও হাসতে হাসতে সবার হাতে হলুদ মাখাতে শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যেই বদলে গেল পুরো বাড়ির পরিবেশ। কান্নার আবেশ সরিয়ে চারপাশ ভরে উঠল হাসি আর আনন্দে।
এরই মধ্যে মাহিমা দৌড়ে এসে হৃদিকার গালে হলুদ মাখিয়ে দিল। হৃদিকা চমকে উঠে চিৎকার করে বলল,
—“মাহি! আমার কিন্তু হলুদে অ্যালার্জি আছে!”
মাহিমা হেসে বলল,
—“আজ একটু মাখালে কিছু হবে না। আজ যে লোবার হলুদের দিন!”
মাহিমার এমন কাণ্ডে হৃদিকা আর চুপ করে বসে থাকল না। এক মুঠো হলুদ হাতে নিয়ে সে মাহিমার পেছনে ছুটতে শুরু করল।দুই বান্ধবীর এই কাণ্ড দেখে লোবাসহ বাড়ির সবাই হেসে উঠল। মুহূর্তেই পুরো বাড়িটা যেন হাসি, আনন্দ আর হলুদের রঙে আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই বাড়ির সামনের গেট দিয়ে কয়েকজন নতুন অতিথি প্রবেশ করল। তাদের মধ্যে একজনকে দেখেই হৃদিকার পা যেন হঠাৎ থেমে গেল। লোবা আর মাহিমার হাসির শব্দও মুহূর্তেই তার কানে অস্পষ্ট হয়ে এলো। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি পরিচিত, খুব বেশিই পরিচিত।
হৃদিকার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। খুব আস্তে করে তার ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এলো,
—“স...সম্রাট...!”
পরক্ষণেই সে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। শুকনো ঢোক গিলল হৃদিকা। ঠিক তখনই মাহিমা তাকে ধাক্কা দিতেই হৃদিকা চোখ মেলে সোজা মেইন গেটের দিকে তাকাল।
কিন্তু সেখানে লোবার বাবা আর কয়েকজন ছেলেপেলে ছাড়া আর কেউ নেই। দূর থেকে যাকে সম্রাট বলে মনে হয়েছিল, ছেলেটি দেখতে অনেকটা একই রকম হলেও আসলে সে অন্য কেউ।
হৃদিকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,
—“কী যে ভাবি!”
লোবা তার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—“কী হলো?”
হৃদিকা জোর করে হাসল।
—“কিছু না।”
অন্যদিকে, লোবার বাড়ির মেইন গেটের ডান পাশে বাগানবিলাসের নিচে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল সম্রাট। হঠাৎ সামনের দিকে চোখ পড়তেই সে থমকে গেল।নীল রঙের ঘাগরা পরা হৃদিকা। খোলা চুলে তাকে যেন অন্যরকম লাগছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য মুগ্ধ হয়ে সেদিকেই তাকিয়ে রইল সম্রাট।
ওপাশ থেকে ফোনে থাকা ব্যক্তি কয়েকবার ‘হ্যালো, হ্যালো’ বললেও সম্রাটের কোনো সাড়া পেল না। একপর্যায়ে সে নিজেই কল কেটে দিল।তখন হৃদিকা সম্রাটকেই দেখেছিল,সম্রাটের ফোনে কল আসায় গেটের সামনে থেকে সরে গিয়ে একপাশে দাঁড়িয়েছিলো।
সম্রাটের চোখ এবার হৃদিকার আশপাশে ঘুরতেই মাহিমাকেও দেখতে পেল। হৃদিকার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল সে। ঠিক তখনই রিয়েল এসে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—“ভাই, এবার জুম্মনের কী হইবো? বেচারা প্রেম করার আগেই মাইয়া ফুড়ুৎ!”
কথা শুনে জুম্মন রিয়েলের দিকে চোখ রাঙিয়ে দাঁত কটমট করে বলল,
—“রিয়েল, আইজকা তোরে খাইছি!”
রিয়েলের কথা শুনে সম্রাটও হেসে উঠল। এর মধ্যেই জুম্মন সামনে আসতেই সম্রাট তাল মিলিয়ে মজার ছলে বলতে শুরু করল,
“ফাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায়।
বন্ধু যখন বউ লইয়া, আমার চোখের সামনে দিয়া,
বন্ধু যখন বউ লইয়া, আমার চোখের সামনে দিয়া,
রঙ্গ কইরা হাইট্টা যায়, ফাইট্টা যায়,
বুকটা ফাইট্টা যায়!”
সম্রাট এবার জুম্মনের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
—“ওরে পছন্দ হইলে এখনো সময় আছে। কইতে পারস, ওর বাপের লগে কথা কইয়া তোর লগে বিয়ার ব্যবস্থা করতে পারি।”
জুম্মন হেসে ফেলল। তারপর স্টেজের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
—“ভাই, ওয় আমার ভালোলাগা ছিল। কিন্তু ওয় ওর ভালোবাসার মানুষটাকে বিয়ে করতেছে। এতেই খুশি আমি। আর কিছু লাগবে না।”
সম্রাট মুচকি হেসে জুম্মনকে বগলদাবা দিয়ে ধরে বলল,
—“ওরে মজনু রে!”
তাদের কথাবার্তার মাঝেই হঠাৎ সম্রাটের চোখ গিয়ে আটকাল হৃদিকার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছেলের ওপর। ছেলেটি বাঁকা চাহনিতে এক ধরনের মাদকতা নিয়ে হৃদিকার দিকে তাকিয়ে আছে।
সম্রাট আবার হৃদিকার দিকে তাকাল। তার চোখে পড়ল, হৃদিকা অস্বস্তিতে মাহিমার দিকে আরও সেঁটে দাঁড়াচ্ছে।
দৃশ্যটা দেখেই মুহূর্তে সম্রাটের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, কপাল আর হাতের রগ ফুলে উঠল। রাগে সে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে নিতেই সনেট এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।
—“চল, এমপি তোর সাথে কথা বলতে চাচ্ছে।”
সম্রাট একবার সেদিকে তাকাল। যেতে না চাইলেও শেষ পর্যন্ত সনেটের সঙ্গে চলে গেল।এদিকে জুম্মন রিয়েলকে বগলদাবা করে তার পিঠে একের পর এক কনুই মারতে লাগল।
__________
হলুদের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই পুরো বাড়িটা আবারও নাচ-গান আর হৈ-হুল্লোড়ে মুখর হয়ে উঠল। এরই মধ্যে মাহিমা নিজের ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে এসেছে। সে জানত, লোবার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে তার বাবা অথবা ভাইয়ের মধ্যে কেউ না কেউ আসবেই।
এদিকে মাহিমারও নাচতে ভীষণ ইচ্ছে করছিল। তাই সে আবার হৃদিকার হাত ধরে টেনে বলল,
—“চল, একটু নাচ করি!”
হৃদিকা হেসে বলল,
—“চল!”
লোবার কয়েকজন কাজিনও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। সবাই নাচের জন্য পাশাপাশি দাঁড়াতেই চারপাশে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল।গানের তালে তালে সবাই নাচতে শুরু করল। শুধু স্টেজেই নয়, নিচে থাকা অতিথিরাও হৃদিকা আর মাহিমার নাচের তালে তালে আনন্দে মেতে উঠল।
এরমধ্যে হৃদিকাকে স্টেজে একা রেখেই মাহিমার ইশারায় সবাই নেমে পরে,মাহিমা দ্রুত গিয়ে একটা গান লাগাতে বলে ডিজে কে। হৃদিকা প্রথমে না করলেও লোবার জন্য একা নাচতে ইচ্ছে প্রকাশ করে।হৃদিকার নাচ দেখে সম্রাট মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
—“বাহ্!আনারকলি।আর কতোভাবে আমায় পাগল করবে শুনি।এভাবে আমায় মুগ্ধ করতে থাকলে,একদিন আমি তোমায় কিতন্যাপ করতে বাধ্য হবো,সুইটহার্ট...!!”
সম্রাট বুকে হাত দিয়ে কথাগুলো বলে,ঠিক তখনই হৃদিকাকে নিয়ে কটূক্তি করে সেই ছেলেটি তার পাশে থাকা আরেকজনকে বলল,
—“উফফ! এই মেয়েটাকে কী যে লাগছে না! একদিন হলেও ওর সঙ্গে প্রেম করতে চাই। আর ওর পিঠের ওই তিলটা... উফফ!”
কথাগুলো বলার সময় ছেলেটি নানা রকম অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল। আর তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সম্রাট।সম্রাট এতক্ষণ নীরবে হৃদিকার নাচ উপভোগ করছিল। কিন্তু প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য কানে যেতেই তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল।
ঘাড়ের পেশি শক্ত হয়ে উঠল, বদলে গেল চোখের দৃষ্টি। কয়েক মুহূর্ত স্থির থেকে ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত মুচকি হাসি ফুটিয়ে সে সেখান থেকে সরে গেল।
অন্যদিকে হাসি, হলুদের রঙ আর গানের শব্দে পুরো বাড়িটা যেন আনন্দে ভেসে যাচ্ছিল। অথচ সেই বাড়িরই এক কোণে কালো পাঞ্জাবি পরা একজন দাঁড়িয়ে নীরবে হৃদিকার পুরো নাচ উপভোগ করছিল। অন্য সবার মতো সেও হাততালি দিচ্ছিল, তবে তার দৃষ্টির কেন্দ্রে ছিল শুধু হৃদিকা।
অনুষ্ঠান শেষে মাহিমা হৃদিকাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে গেল। হৃদিকা জানতেও পারল না, এতক্ষণ সে যাকে চোখের ভুল ভেবেছিল, সত্যিই সে-ই ছিল সম্রাট। তার চোখ তাকে একটুও ভুল দেখায়নি।
অন্যদিকে, হৃদিকাকে নিয়ে কটূক্তি করা ছেলেটির নাম শাওন। অনুষ্ঠান শেষে শাওন তার সঙ্গের ছেলেটিকে নিয়ে লোবার বাড়ি থেকে বের হতেই বাইরে থাকা কয়েকজন লোক তাকে থামিয়ে একটি কালো গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর তার চোখ ও হাত-পা বেঁধে তাকে গাড়ির ভেতর আটকে রাখা হয়।কী হতে চলেছে, সে সম্পর্কে শাওন তখনও কিছুই বুঝতে পারছিল না। শুধু অজানা এক আতঙ্ক ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে ধরছিল।
__________
কিছুক্ষণ পর গাড়িটি একটি নির্জন বাড়ির সামনে এসে থামল। শাওনকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে একটি চেয়ারে বসানো হলো। চোখের বাঁধন খুলতেই তার দৃষ্টি গিয়ে আটকাল সামনে বসে থাকা সম্রাটের ওপর।
সম্রাট পায়ের ওপর পা তুলে শান্তভাবে সিগার টানছিল। অথচ তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল সম্পূর্ণ শাওনের দিকে। সেই দৃষ্টিতে এমন এক শীতলতা ছিল, যা মুহূর্তেই শাওনের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরিয়ে দিতে সক্ষম।
কপাল কুঁচকে শাওন বলল,
—“হোয়াট রাবিশ! আমাকে এখানে এনেছেন কেন? বলুন!”
সম্রাট ধীরে ধীরে সিগারটি নিচে ফেলে পায়ের নিচে পিষে দিল। তারপর কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে কান চুলকাতে চুলকাতে বিরক্ত স্বরে বলল,
—“আহ্! শুদ্ধ কথা কইবি না একদম। গা জ্বলে আমার।”
শাওন সম্রাটকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে ঠান্ডা গলায় বলল,
—“কিসের জন্য আমাকে নিয়ে এসেছেন? আমাকে জিম্মি করে আমার ড্যাডের কাছ থেকে টাকা হাতাতে চাইছেন? নো ওয়ে,তোমার আশা পূরণ হবে না কখনোই।”
শাওনের কথা শুনে পাশে থাকা রিয়েল, জুম্মনসহ সবাই হেসে উঠল। রিয়েল মাথা নেড়ে বলল,
—“আরে রামভুদাই! তুই কারে কী কইতাছোস? চিনস এরে কেডা? আমাগো মন্ত্রী সাহেবের একমাত্র পোলা সম্রাট ভাই। তার বাপ-দাদার সম্পত্তি বাদই দে, নিজের সম্পত্তিরই অভাব নাই। বোকাচন্দ্র!”
শাওন এবার আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে হেসে বলল,
—“ওহ, আচ্ছা! ভালোই হলো পরিচয়টা দিয়ে দিলে। বিচারটাও ভালোভাবেই হবে তাহলে। চেহারাটাও চিনে রাখলাম তোমাদের।”
সম্রাট এতক্ষণ নীরবে কথাগুলো শুনছিল। এবার ধীরে ধীরে উঠে পাশের ঘরের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে ইমনের সামনে দাঁড়াল। তার মুখে তখনও সেই রহস্যময় মুচকি হাসি।
শাওনের কথার জবাবে শান্ত অথচ ভয়ংকর স্বরে বলল,
—“তোর জবান থাকলে তো কইবি সবারে, আর চোখ থাকলে তো আমাগো দেখাবি।”
কথাটা বলেই সম্রাট শাওনের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তেই ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল। শাওন বুঝতে পারল, এতক্ষণ যেটাকে সে নিছক হুমকি ভেবেছিল, পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়ংকর।সম্রাট এবার গ্লাভস পরা হাতেই জুম্মনকে ডাকল,
—“জুম্মন, আমার জিনিসটা দে।”
জুম্মন তাড়াতাড়ি সম্রাটের হাতে প্রয়োজনীয় জিনিসটি তুলে দিল। সম্রাট সেটি হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে শাওনের দিকে এগিয়ে গেল।শাওন এবার প্রথমবারের মতো সত্যিকারের ভয় পেল। তার মুখের আগের ঔদ্ধত্য মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল।
সম্রাট তার সামনে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল,
—“এই জিভ দিয়া তুই আমার ভালোবাসারে বাজে মন্তব্য করছিলি না? মনে রাখিস, আমার ভালোবাসার মানুষকে অসম্মান করার ফল খুব বেশি ভালো হয় না।”
সম্রাটের কণ্ঠে কোনো চিৎকার ছিল না, ছিল না উত্তেজনাও। বরং তার সেই অস্বাভাবিক শান্ত স্বরটাই যেন ঘরের সবাইকে আরও নীরব করে দিল।রিয়েল মুখ ফিরিয়ে নিল। আর জুম্মনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।ঘরের ভেতর তখন শুধু শাওনের আতঙ্কিত নিঃশ্বাস আর সম্রাটের ঠান্ডা দৃষ্টি।
সম্রাটের কথার পর ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল। শাওন তখনও নিজের ঔদ্ধত্য ধরে রাখার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সম্রাটের চোখের দৃষ্টি দেখে তার সেই সাহস ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগল।
সম্রাট শাওনের দিকে এগিয়ে গেল। এরপর যা ঘটল, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউ। সম্রাটের হাতে থাকা এসিডটা ছুরে মারে শাওনের চোখের দিকে,ঘরের ভেতর হঠাৎ শাওনের আতঙ্কিত চিৎকারে পরিবেশ কেঁপে উঠল। রিয়েল মুখ ফিরিয়ে নিল, আর জুম্মনও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করল সনেট। পরিস্থিতি দেখে কপাল কুঁচকে বিরক্ত দৃষ্টিতে সম্রাটের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুই আঙ্কেলের মান-সম্মান সব শেষ করে শান্তি হবি, সম্রাট?”
এরপর সনেট শাওনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আর এটা কী করেছিস? চিনিস ওটা কে? আজ যেই এমপির সঙ্গে কথা বললি, তার ছোট ছেলে শাওন। তুই কেলেঙ্কারি না করলে হয়ই না, তাই না?”
সম্রাট নির্বিকার দৃষ্টিতে সনেটের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমি সম্মান কিন্না দিছি আমার বাপেরে, আবার আমিই ডুবামু। ওর সাহস হয় কেমনে হৃদের দিকে কুনজর দেয়, আবার বাজে মন্তব্যও করে? আর ওয় কোন এমপির পোলা না, মন্ত্রীর পোলা। আমার দেইখা লাভ নাই।”
সম্রাটের কথায় সনেট আর কিছু বলল না। সে শান্ত চোখে শাওনের দিকে তাকাল। সে জানে, হৃদিকাকে নিয়ে কেউ কটু কথা বললে সম্রাট কখনোই তা মেনে নেবে না। এখন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেও কোনো লাভ হবে না। তাই সনেট চুপচাপ একপাশে সরে দাঁড়িয়ে রইল।
সম্রাট এবার জুম্মনের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিল,
—“ওরে রাস্তায় ফেলে আয়। ঠিক ওর বাড়ি থাইকা দশ গজ দূরে।”
সম্রাটের নির্দেশ পেয়ে জুম্মন বাকিদের নিয়ে শাওনকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে গেল।কিছুক্ষণ পর শাওনকে তার বাড়ির কাছেই রেখে আসা হলো। সে তখন সম্পূর্ণ অচেতন।
কিন্তু গল্প সেখানেই শেষ হলো না।জুম্মনরা চলে যাওয়ার মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই একটি কালো গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে এল কালো পোশাকে পুরো শরীর ঢাকা এক ব্যক্তি। মুখে নেক মাস্ক, মাথায় টুপি। লোকটি একাই এগিয়ে গিয়ে অচেতন শাওনকে গাড়িতে তুলে নিল।
কিছুক্ষণ পর...
শাওনের জ্ঞান ফিরতেই সে নিজেকে একটি অচেনা জায়গায় আবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পেল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কালো পোশাকের লোকটির কণ্ঠে তখন অদ্ভুত এক শীতলতা।
সে ধীরে ধীরে বলল,
—“আফসোস... তোকে সে ছেড়ে দিলেও আমি পারব না। কখনোই না।”
বলেই এলোপাতাড়ি কুপিয়ে চলে লোকটি,এতে শাওন কিছুক্ষণ ছটফট করে নিস্তেজ হয়ে পরে। লোকটি হাঁপাতে হাঁপাতে র'ক্তমাখা হাতেই সিগারেট ধরায় তারপর একটু ফুঁকে আবার পায়ে পিষে ফেলে। শাওনের দেহাবশেষ টুকরো টুকরো করে ফেলা,সবগুলো একটা বড় কালো বস্তায় ভরে নিয়ে যায়। আর মাথাটা আলাদা করে নিয়ে যায়, রাস্তায় বের হতেই কয়েকটা নেড়ী কুকুরকে বস্তা থেকে কয়েক টুকরো মাংস খুলে ঢিল মেরে খেতে দেয়,আর কুকুরগুলো একে অপরের থেকে কেড়ে নিয়ে খেতে লাগে।
লোকটি চিড়িয়াখানার সামনে গিয়ে কাউকে কল করতেই গেইট খুলে দেওয়া হয়,তারপর বাঘ আর সিংহের খাছায় ভাগ করে মাংস দিয়ে দেয়, আর বাঘকে শাওনের মাথাটা খেতে দেয়।
বাঘকে খেতে দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে,একপর্যায়ে কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
—“আচ্ছা স্যার, একটা কথা জিগাই... আজ এমন ভয়ানক কাজ করলেন কেন?”
কালো পোশাকের লোকটি কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরে ধীরে বলল,
—“সে নাকি তাকে বাজে কথা বলেছে, বিল্লাল। যার দিকে তাকালেও আমার কলিজা কেঁপে ওঠে... আর সে সেই মানুষটাকে নিয়ে বাজে কথা বলে?”
কথাগুলো বলার সময় লোকটির কণ্ঠে অদ্ভুত এক উন্মাদনা ফুটে উঠল।বিল্লাল স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। এর আগে এমন ভয়ংকর কিছু সে কখনো দেখেনি। আজকের ঘটনার রহস্য তার মাথায় কিছুতেই ঢুকছিল না।
চলবে_
[ আপনাদের অনেক অপেক্ষা করাতে হয়েছে এই #প্রনয়ের_দহন গল্পটার জন্য। আশা করি আপনাদের রেসপন্স পাবো,আর রেসপন্স কম পেলে আমি গল্পটা এখানেই স্থগিত রেখে নতুন গল্প আনবো তারপর সে-ই গল্প শেষ না হওয়া অবধী আমি এই গল্পটা দিবো না।এখন আপনারা ভেবে দেখেন গল্প পড়ে রেসপন্স করবেন কিনা।
বেশি বেশি রেসপন্স করবেন, রিয়েক্ট কমেন্ট করবেন গল্পে কোনো রকমের ভুলত্রুটি হলে মার্জনা করবেন। ]