#দীঘির_জলে_কার_ছায়া
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_২
|কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্ক-প্রাপ্তমনস্কদের জন্যে|
অনিরূপ ভ্রু বাঁকিয়ে বললো-‘বিয়ে করবে। না করে যাবেটা কোথায়? তুমি করবে, তোমার ঘাড়ও করবে।নামটা কী যেন? আশা? নাহ, আশাবরি।’
আশার পেছনে পেছনে বারান্দা থেকে ফিরে এসে অনিরূপ পাঞ্জাবি ঠিক করে সোফায় বসলো। সামনেই আশা বসা। সুন্দর মুখ রক্তিম, অপমানে লাল। অনিরূপ আশার দিকে তাকালে, আশা মুখ ঝাঁমটা দিয়ে সরিয়ে ফেললো। এ লোকগুলোকে আশার বি ষাক্ত মনে হচ্ছে। যাবেটা কখন এরা? অনিরূপ তির্যক হেসে আশার দিকে তাকিয়ে আছে। আশা অনিরূপের এমন তাকানোতে চূড়ান্ত বিরক্ত হচ্ছে, বারবার-বারবার ভ্রু কুচকে নিচ্ছে। অনিরূপ যেন এতে ভীষণ মজা পাচ্ছে। আশা বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকানো-অনিরূপকে ভেতরে ভেতরে আত্মতৃপ্তি দিচ্ছে ভীষণ।
বিয়ের কিছু কথা বাড়িতেই সাড়া হলো। বাকি কথা যে যার ঘরে বড়দের সঙ্গে আলাপ করে জানাবেন-সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। ওয়াহিদা আরা সোফা থেকে পার্স হাতে উঠে দাঁড়ালেন। শাড়ির আঁচল মাটিতে ছুয়ে আছে তার, কথা বলার ধরন রাজকীয়। হালকা হেসে বললেন-‘আজ আসি, বেয়াই। বিয়ের কেনাকাটা-আত্মীয় স্বজনের লিস্টটা আজ থেকেই শুরু করতে হবে। আমি অনির বিয়েতে আর দেরি করতে চাইছি না।’
রহমান সাহেব মৃদু হেসে সায় দিলেন-‘ঠিক আছে। আমিও আমার দিকটা আজ থেকেই দেখে নিচ্ছি। ‘
ওয়াহিদা রহমানের সঙ্গে কথা বলে সামনে এগুতে লাগলেন। আশা এখনও সোফায় এভাবেই বসে, মূর্তির মতো। মাঝেমধ্যে রাগান্বিত চোখে অনিরূপকে দেখছে, আবার চোখ সরিয়ে নিচ্ছে চোখাচোখি হওয়ার ভয়ে। এই মুহূর্তে শাড়িটা গা থেকে আশার ছিঁড়ে ফেলতে মন চাইছে। অনিরূপ অরূপের সাথে হাঁটতে হাঁটতে পেছনে আশার দিকে একবার তাকালো। অনিচ্ছায় দুজনের চোখে চোখ পড়লো। অনিরূপ ঠোঁট জিহ্বা দিয়ে লিক করে ভ্রু নাড়িয়ে হাসলো। আবারও দুষ্টু ইঙ্গিত-অভদ্রতা। আশা তেলেবেগুণে জ্বলে শাড়ির আঁচল মাথা থেকে ফেলে সোফা থেকে উঠে রেগে হনহনিয়েনিজের ঘরে চলে গেলো। অনিরূপ আশার যাওয়ার দিকে চেয়ে ভ্রু নাড়লো। একবার আশার ঘরের দরজার দিকে চেয়ে দেখে, অরুপের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো-‘আশার ছবি লাগবে একটা, যা নিয়ে আয়।’
অরুপ আচমকা এমন কথা শুনে অবাক হয়ে অনিরুপের দিকে তাকালো। হা হয়ে বললো-‘ছবি তো আছে আমাদের কাছে, কনে দেখারটা।’
অনিরূপ বললো-‘ভালো ছবি চাই আমার, একা একটা ছবি, শাড়ি পরে।’
অরূপ অনিরুপের দিকে হা হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে হো হো করে হেসে উঠে বললো-‘মেয়ে দেখতে এসেই ফিদা ভাই? এখানে আসার পর থেকে অদ্ভুত আচরণ করছো।’
অনিরূপ গাড়ি অব্দি চলে এসেছে। গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে এক পা বটে দরজায় ঠেসে অরূপের দিকে ভ্রু বাঁকিয়ে তাকাল।আদেশ লেগে আছে চোখেমুখে। অরুপ ভাইয়ের ইশারা বুঝল নিমিষেই। সঙ্গেসঙ্গে দৌড়ে ছুটল নিধির কাছে।
নিধি তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। রহমান-ওয়াহিদা আরও কিছুটা উঠোনের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছেন। অরূপ তাদের দিকে একবার তাকিয়ে নিধির দিকে ফিরল। নিধি ভদ্রতা নিয়ে বললো-‘কিছু বলবেন?’
অরূপ নিধির দিকে ঝুঁকে আশপাশ দেখে তারপর ফিসফিস করে বললো-‘ভাবির ছবি চাইছে ভাই। শাড়ি পড়া-একা একটা ছবি। দেওয়া যাবে?’
নিধি মাথা তুলে অনিরুপের দিকে তাকাল। অনিরূপ চোখে সানগ্লাস পরে গাড়িতে ড্রাইভিং সিটে ঢুকছে। নিধি হালকা হাসলো। আশাকে পাত্রের ভীষণ পছন্দ হয়েছে, কথাটা ভেবে ভেতর থেকে স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এলো। হালকা হেসে নিধি বললো-‘আমি ভেতর থেকে নিয়ে আসছি।’
নিধি আশার ঘরে গিয়ে ড্রয়ার খুঁজে ভালো শাড়ি পরা ছবি বের করলো। আশা বিছানায় বসে নিধির এত খোঁজাখুঁজি দেখে জিজ্ঞেস করলো-‘কী করছো আপা? কী খুঁজো?’
নিধি ছবি হাতে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো-‘পাত্রকে তোর ছবি দিচ্ছি’
আশা থমকে গেলো এ কথা শুন। দৌঁড়ে নিধির পেছনে পেছন আসতে আসতে বললো-‘আপা, দাড়াও দিয়ো না ছবি; আপা।’
নিধি কানে শোনেনি আশার কথা,ততক্ষণে উঠোনের সামনে চলে এসেছে। আশা থমকে যাওয়া মুখে নিধির অরুপকে ছবি দেওয়া দেখলো। আশা হতাশ ভঙ্গিতে দরজায় মাথাটা ঠেসে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো নিধি-অরুপের দিকে।
ছবি পেয়ে অরূপ নিধির প্রতি কৃতজ্ঞতার চোখে তাকিয়ে বললো—‘থ্যাংক ইউ, আসি এবার-বাই।’
অরূপ গাড়ির দিকে ছুটছে। নিধি-রহমান পাত্রপক্ষকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ঘরে আসলো। ঘরে ঢুকে দুজনেই দেখে-আশার মুখটা অন্ধকার, থমথমে। নিধি-রহমান দুজনেই একে অপরের দিকে তাকায়।
___________
অনিরূপের সামনে কয়েকটা মেয়ের ছবি এনে তুলে ধরলো অরূপ। অনিরূপ মেয়েদের ছবিগুলো দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। ল্যাপটপের শ্যাটার নামিয়ে অরূপের দিকে চেয়ে বললো-‘মানে?’
অরূপ হতাশ শ্বাস ফেলে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো-‘মানেটা হচ্ছে-তুমি, দ্য গ্রেট অনিরূপ শেখ জয় রিজেক্ট হয়েছে মেয়েপক্ষের থেকে। আজ মায়ের কাছে কল এসেছে, কনেকে নাকি তুমি কী বলেছো, সেজন্যে কনে বিয়ে করবে না বলে মানা করে দিয়েছে।’
অনিরূপ অরূপের দিকে চেয়ে থাকলো। মনেমনে আশার বাচ্চামো কান্ডের জন্যে একচোট হাসলো। মেয়েটা কী ভেবেছে? অনিরূপ থেকে পাড় পেয়ে যাবে? এত সহজে? সবকিছু এত আছান লাগে আশার কাছে? পোউর আশা!
অনিরূপ হালকা আওয়াজে বললো-‘সঙ্গে কী আর কিছু বলেছে?’
অরূপ ভ্রু কুচকে তাকাল। বললো-‘বলেছে তুমি হচ্ছো চূড়ান্ত অভদ্র। সে কোন অভদ্র ছেলেকে কখনোই বিয়ে করবে না।’
অনিরূপ ভ্রু বাঁকিয়ে তাকালো। তারপর শব্দ করে হেসে ফেললো। এটাও বলেছে? আহা, কী বেচারা। অনিরূপ মাথা দুদিকে ঝাকিয়ে হতাশ গলায় বললো-‘আহারে, বড্ড বেচারি সাজলো তোর ভাবি।’
অনিরূপের কণ্ঠে উপহাশ। যেন সে এই সবকিছুতেই ভীষণ মজা পাচ্ছে। অরূপ ভাইয়ের দিকে চেয়ে আছে, সে অবশ্য এতটা অবাক হচ্ছে না। ভাই এমনি তার, সেটা সে জানে। সে কেন, পুরো শেখ বাড়ি জানে এটা। অনিরূপ অভদ্র, একরোখা, দুধে ধোয়া তুলসী পাতা নয়।
অরূপের হাতে এখনও কনেদের ছবিগুলো। অনিরূপ কিছুক্ষণ মেয়েদের ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে ল্যাপটপের স্যাটার আবারও তুলে নিলো। অরূপকে বললো-‘ছবিগুলোর দরকার নেই আর। তোর ভাই ওই অতি ভদ্র রমনিকেই বিয়ে করছে, এবং করবে।’
অরূপ বিস্মিত হলো। অনিরূপের ঠোঁটের হাসি কেমন যেন অন্যরকম দেখাচ্ছে। একদম আলাদা-ভিন্ন। অরূপ ভ্রূ বাকালো-‘কী পাকাচ্ছো তুমি তোমার মাথায় বলোতো ভাইয়া? উল্টাসিধা করতে চাইছ কিছু?’
অনিরূপ ল্যাপটপের দিকে চেয়ে ধিমে আওয়াজে বলে-‘আজ থেকে যা হবে, সব উলটাই তো হবে। সিধা থাকার দিন শেষ।’
________
শেখ বাড়িতে রীতিমত হইচই শুরু হয়ে গেছে। অনিরূপকে, শেখ বাড়ির ছেলেকে পাত্রী বিয়ে করবে না বলেছে, অভদ্র বলে গালি দিয়েছে কথাগুলো ওয়াহিদা রীতিমত মানতেই পারছেন না। ডাইনিং টেবিলে ওয়াহিদা এটা নিয়েই আলাপ করছেন অনিরূপের বাবা উমায়েদের সঙ্গে। উমায়েদ সব শুনে শান্ত স্বরে বললেন-‘খামোকা মেয়ের উপর রাগ করো না ওয়াহিদা। তোমার ছেলেকে তুমি চেনো, কখনোই ধোয়া তুলসী পাতা ছিলো না সে। হয়তো মেয়ের সঙ্গে কোন অভদ্রতা করেছে, মেয়ে রিজেক্ট করে দিয়েছে। বিয়ের আগে আসল রূপ দেখালে, মেয়ে তো রিজেক্ট করবেই। এটাই ন্যাচারাল।’
ওয়াহিদা উমায়েদের কথায় আরও ক্ষেপে গেলেন। কাঁটা গায়ে যেন তার নুনের ছিটা পরলো। ওয়াহিদা বললেন-‘তুমি শুধু আমার ছেলেদের দোষই দেখো সবসময় উমায়েদ।’
উমায়েদ বললেন-‘আমি ফ্যাক্ট দেখছি, কার সত্যি দোষ আছে সেটা দেখছি। তুমি এটা নিয়ে ভেজাল করো না। মেয়ে হাতে আরও আছে। আমি কবির সাবকে বলে আরও মেয়ের ছবি আনবো?’
ওয়াহিদা এতক্ষণ রাগারাগী করে হাপিয়ে গেছেন। লম্বা শ্বাস ফেলে বললেন-‘আনো এখন, কী আর করার।’
অনিরূপ তখন মাত্র খেতে বসেছে। অরূপ এদের কথা এতক্ষণ শুনে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে ছিল তাদের দিকে। সে এসবের মধ্যে নীরব শ্রোতা স্রেফ। অনিরূপ চেয়ারে বসতেই অরূপ জোরেজোরে বললো-‘ভাই মা মেয়ে দেখবে আরো। তোমার জন্যে মেয়ের বন্যা বইয়ে দিবে মা বলেছে।’
অনিরূপ ভ্রু কুঁচকে ওয়াহিদার দিকে তাকাল। অনিরূপের মন খারাপ ভীষণ-মনেমনে কথাটা ভেবে ওয়াহিদা অনিরূপকে সামলাতে বললেন-‘মন খারাপ করবি না অনি। আমার কাছে এর থেকেও সুন্দর মেয়ের ছবি আছে। আমি তোকে দেখাচ্ছি।’
অনিরূপ ভ্রু বাকালো,, বললো-‘কার জন্য?’
‘তোর জন্যে-‘ ওয়াহিদার উত্তর।
অনিরুপ খেতে খেতে বেশ স্বাভাবিক গলায়ই বললো-‘আমি বিয়ে করলে ওই মেয়েকেই বিয়ে করছি মা। মেয়ে দেখো না আর।’
ওয়াহিদা বললেন-‘কিন্তু মেয়ে তো বিয়েতে মানা করলো।’
অনিরুপ হালকা হেসে মায়ের দিকে তাকাল। মৃদু হেসে বললো-‘কিন্তু আমি কী ওকে ছাড়ছি?’
#চলবে
#দীঘির_জলে_কার_ছায়া
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_৩
অনিরূপ মিথ্যা বলেনি- সে সত্যিই আশার পিছু ছাড়েনি। বরং জড়িয়ে নিয়েছিল আশাকে নিজের সঙ্গে আস্টেপিস্টে। আশা বিয়েতে রাজি ছিলো না-পুরো ব্যাপারটা অনিরূপের কাছে মারাত্মক অ পমানের ছিল। তাই অনিরূপ একটা খেলা খেললো, একটা গেইম।
রহমান সাহেব গত বছর চড়া সুদে গ্রামের মোড়লের থেকে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন ধানের বীজ কেনার জন্যে। সেই ত্রিশ হাজার টাকার সুদ এক বছরে এসে জমেছে, প্রায় এক লাখ টাকার কাছাকাছি। টাকা পরিশোধ করার সময়ের পূর্বেই-আজ মোড়ল পুলিশ নিয়ে যখন আসল রহমান সাহেবের বাড়ি, মাথায় রীতিমত বাজ পড়লো রহমান সাহেবের।
মোড়লের হাতে হিসাবের কাগজ, পুলিশের হাতে হ্যান্ডকাফ। সব দেখে রহমান সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন। প্রতিবাদ করে বললেন-‘টাকা ফেরত দেওয়ার তো আরও ২ মাস সময় বাকি আছে মোড়ল সাহেব। আমাকে সময় দিন দয়া করে।’
মোড়ল বিশ্রী হেসে পানের পিক মাটিতে ফেলে নখ দিয়ে দাঁত খুঁচিয়ে বলল-‘ মাইয়ার বিয়া তো দিতে গেসিলা, টাকা না থাকলে বিয়ার সাহস কেমনে করো, রহমান? মাইয়ার বিয়া তো ভাইঙ্গা দিলা, এখন ওই বিয়ার টাকা আমারে দাও। বাকি টাকার হিসাবও আজ করবা, নাইলে- দেখো তো কারে নিয়া আসছি।’
মোড়ল পুলিশের দিকে হাসিহাসি মুখে তাকালো। নিধি বাড়ি নেই, পড়াতে গেছে বাচ্চাদের। আশা উঠোনে এত চিৎকার শুনে ঘর থেকে দৌড়ে বাইরে আসলো। মোড়ল আর রহমানের মধ্যে তুমুল দ্বন্ধ দেখে আশা হতভম্ব। কিছুই বুঝতে পারলো না প্রথমে। এগিয়ে এসে পুলিশকে জিজ্ঞেস করল-‘এসব কী হচ্ছে স্যার?’
পুলিশ এমাদ গা ছাড়া ভাবে হেসে বললো-‘তোমার আব্বা সুদে টাকা ধার নিয়েছে।টাকা তো ফেরত দিচ্ছেই না, উল্টো মেয়ের বিয়ে দিতে টাকা খরচ করছে।মোড়ল সাহেব তার টাকা চাইছেন এখন।আমি আইনের লোক হিসেবে মোড়লকে সামান্য সাহায্য করছি শুধু।’
এমাদ বিশ্রী হেসে আশার দিকে তাকিয়ে বললো। আশা তাজ্জব হয়ে বললো—‘আইনের লোক হয়ে সুদের টাকা চাইতে এসেছেন আপনি? লজ্জা করে না আপনার?’
এমাদ কিছু বলার আগে মোড়ল তেড়ে আসলো আশার দিকে, রেগে হিসহিসিয়ে বললো-‘ওর লজ্জা কেনো করবে? টাকা দেওয়ার আগে তোমার আব্বারে বলা হয়নাই এটা সুদের ধার? বলা হয়নাই, জিকাও তোমার আব্বারে। সে তো জেনেই সুদের টাকা নিসে। এখন টাকা ফেরত দিবে, এখন আমগো লজ্জা খুঁজো বাপ-বেটি। মা স্তানি চলে এখানে?’
আশা রহমানের দিকে তাকাল। রহমান লজ্জায় মাথা নিচু করে আছেন। মেয়ের বারবার-বারবার বারণ করা সত্ত্বেও সুদের আশ্রয় নিয়েছেন রহমান। মেয়েকে কী বলে এখন থামাবেন? আশা মনেমনে যে তার উপর ব্যথিত হয়েছে, সেটা রহমান বুঝেন। আশা সত্যি হতাশ হলো ভীষণ। মুসলিম হয়ে সুদের টাকা ধার নেওয়া হারাম, অথচ সেটা তার আব্বা কত সহজে করে বসে আছে। আশা ভ্রু কুঁচকে ফেলল। রহমানের দিকে দৃষ্টি তাক করে বললো-‘আব্বা? তুমি আবার সুদের টাকা কেন নিয়েছো? গ্রামে কী আর কেউই ছিলো না? সুদ নেওয়া হারাম, আব্বা-কতবার বলবো এটা।’
রহমান লজ্জিত ভঙ্গিতে মেয়ের দিকে চেয়ে বললো-‘আর কেউ টাকা দিতে চায়নাই। তাই বাধ্য হয়ে-‘
আশা চোখ বুজে ফেলল অপমানে-রাগে। রহমানকে আর কিছুই বলার নেই আশার। মোড়ল সাহেব বললেন-‘বাপ বেটির আলাপ শেষ হইলে আমার টাকা ফেরত দাও এহন। আমি টাকা নিয়ে যাইগা।’
আশা এগিয়ে এলো দু কদম। স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-‘কতো টাকা বাকি আপনার?’
মোড়ল হাতের হিসাবের খাতা দেখে বললো-‘ত্রিশ হাজার দেওয়া হয়েছে- আর সত্তর হাজার বাকি।’
আশা মাথা ঝুকালো। এতগুলো টাকা? যতটুকু ধার নিয়েছিল, সেগুলো তো দেওয়া শেষ। এখন বাকি শুধু শোষণের সুদের টাকা। আশা পুলিশের দিকে এগুলো। বললো-‘আমাদের হাতে এখন আমার বিয়ের ৫০ হাজার আছে। এগুলো নিন, আমরা বাকি ২০ পরে দিব। আমাদের সময় দিন প্লিজ।’
রহমান সাহেব মেয়ের কথা শুনে অবাক হলেন। সঙ্গেসঙ্গে বলে উঠলেন-‘আশা ওগুলো তোর আম্মার গয়না বেচার টাকা। এগুলো দিলে তোর বিয়ে কিভাবে দিবো আমি? আমাকে সময় দিন মোড়ল সাব। আমি সব টাকা দিয়া দিব, আমাকে মাত্র-মাত্র ৭ মাস সময় দিন। দয়া করুন।’
মোড়ল এসব শুনলো না। রহমান সাবের এত কাকুতি-মিনতি সব একটুও কানে নিলো না। বলা চলে-কানে নিতে চায়নি বা সাহস হয়নি। উপরে যে মানুষটা আছে, সে মানুষটারই হাতের পুতুল সেজে নাচছে ওরা শুধু। যা বলা হয়েছে, যা দেখানো হয়েছে-সেসব একে একে ঘটছে এই ক্ষেত্রে। এখানে মোড়ল, পুলিশ সবাই একেকজন অভিনেতা, রহমান আর আশা রিয়েল্যাটি শো এর একেকটা ক্যারেক্টার শুধুমাত্র।
মোড়ল এবার সরাসরি পুলিশকে বললো-‘আপনি ওরে হ্যান্ডকাফ পরাইবেন? নাকি আমি আমার কাজ হাসিল করবো?’
এমাদ রহমানের সাহবের হাতে হ্যান্ডকাফ পরাতে গেলে আশা চিৎকার করে বলে-‘সুদের টাকার উপর আইনের কোন সাজা নেই। আপনি আমার আব্বাকে হ্যান্ডকাফ কোন আইনের ভিত্তিতে পড়াবেন?’’
এমাদ কিছু বলার আগে মোড়ল বললো-‘মোড়লের আইনের ভিত্তিতে পড়াইবো। আইন নাই তো কী হইলো, বানানো যাইবো না? যাইবো তো, আমরা বানাই নিমু। তুমি চিন্তা করিও না, আশা মা।’
আশা ফ্যালফ্যাল চোখে নিজের বাবার হাতে হ্যান্ডকাফ পড়াতে দেখে। মোড়লের পাঞ্জাবির পকেটে একটা ছোট মাইক্রোফোন। মাইক্রোফোনে অনিরূপ সবার কথোপকথন শুনে, বুঝে আর হাসে। আশা, তার পোউর আশা।
অতঃপর আশার শত চেষ্টা পরও রহমান সাহেবকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। রহমান সাহেব সদরের থানাতে যাবেন। আশা তাই তড়িগড়ি করে ঘরে ঢুকে বোরকা পরে চাবি দিয়ে ঘর তালা দিয়ে বাইরে আসে। আশা শহরে যাবে, আইনের অপরাধের একটা বিহিত করা লাগবে। এভাবে অন্যায়ভাবে রহমান সাহবেকে জেলে পাঠাতে পারেনা কোনো আইন। আশা চাবি পাশের বাড়িতে দিয়ে আসে নিধির জন্যে। নিধি এলে বলে দিতে বলে-আজকের ঘটনার কথা।
সবকিছু সামলে আশা তারপর একটা সিএনজি ভাড়া করে সদরের দিকে এগোয়।
________________
আশা থানার বেঞ্চে থতমত খেয়ে বসে আছে। মাথাটা ভনভন করছে ভীষণ। নিধি বারবার বাড়ি থেকে কল দিচ্ছে। অস্থির হয়ে গেছে নিধি। দু বোন একা কিভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে বুঝতে পারছে না। টাকা না দিলে এরা ছাড়বে না রহমান সাহেবকে। সুদের টাকার হিসাব লুকিয়ে ফেলা হয়েছে, এখন হিসাবের খাতায় যোগ হয়েছে- রহমান ধার হিসেবে এক লক্ষ টাকাই নিয়েছেন। কী বিশ্রী হিসাব, কী নোং রা খেলা। কত সুন্দর নিরপরাধ মানুষকে অপরাধের কাটগড়ায় ঝুলিয়ে ফেলা হলো।
আশার হাতে ফোন। শেষবার নিধির সঙ্গে কথা হয়েছে। নিধি সাফসাফ বলে দিয়েছে-কেইস করার কথা, উকিল ভাড়া করার কথা। কিন্তু আশা জানে, এসব কিছুই বৃথা। উকিল,সে রহমানের মতো গরিব একটা পরিবারের কেইস কেন লড়বে? কেইস আদালতে উঠাতেও প্রচুর টাকা চাই। ওতো টাকা দিয়ে কেইস লড়ে আদৌ সফলতার হার খুব কম। তাছাড়া, আশা কোথা থেকে পাবে এত টাকা? আশা আর কোন উপায় দেখছে না। বাড়ি থেকে আসার সময় নিজের বিয়ের জন্যে জমানো টাকা ব্যাগে করে এনেছিল, আরও ২০ হাজার টাকা জোগাড়ের জন্যে এনেছিল নিজের গলার চেইন। এটা এখন বিক্রি করতে হবে। আশা তখন থানা থেকে বের হচ্ছিল, মাঝপথে ইমাদ চা খেতে খেতে আসার সামনে এসে দাঁড়ালো। আশা ইমাদ কে দেখে ভ্রূ বাঁকিয়ে চাইলো। ইমাদ বিশ্রী ভঙ্গিতে আশাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে ঠোঁট কামড়ে তাকায়। আশা আচমকা পথ আটকানোতে বিরক্ত হয়। তবুও পুলিশের লোক দেখে ভদ্রতা বজায় রেখে বলে-‘কিছু বলবেন?’
ইমাদ একহাতে আশার হাত ধরার জন্যে হাত বাড়ায়, আশা বুঝতে পেরে সঙ্গেসঙ্গে হাত সরিয়ে নিলো। ইমাদ হালকা হেসে বললো-‘টাকা দরকার? ম্যানেজ হয়ে যাবে। শুধু-‘
‘শুধু?’ -আশার সরাসরি প্রশ্ন।
ইমাদ আঙুল দিয়ে নিজের ঠোঁট ছুইয়ে নোংরা হেসে বললো-‘আমার কটেজ সামনেই, একরাত কটেজে দেখা করো। টাকার হিসাব মিলে যাবে।’
আশার রাগে-অপমানে গা রি-রি করে উঠলো। শক্ত এক থাপ্পড় বসাতে ইচ্ছা হল পুলিশরুপি জা নো য়ার ইমাদের গালে। কিন্তু আশা হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে আটকালো। পুলিশকে চ ড় মারা মানে, রহমান সাহেবের কেইস আরও জটিল করে ফেলা। আশা বুদ্ধিমান, সেটা কখনও করবে না। আশা নিজের রাগ সংবরণ করে। মুখ অপমানে আবারও লাল হয়ে গেছে। আশা শান্ত থাকার চেষ্টা করে হাফ ছাড়ে।
কঠোর কণ্ঠে বলে দেয়--‘আপনার প্রস্তাব আমার লাগবে না। টাকা আমি জোগাড় করে নিতে পারব।’
আশা কথাটা বলে দ্রুত টাকার ব্যাগ হাতে বেরিয়ে যায় থানা থেকে।
আশা থানা থেকে বেরিয়ে যেতেই একজন কনস্টেবল সবার থেকে লুকিয়ে অনিরূপকে কল লাগায়-
‘স্যার, ম্যাম বোধহয় আজ টাকা জোগাড় করে ফেলবেন।’
‘কিভাবে?এতগুলো টাকা?’
অনিরুপের বিস্মিত কণ্ঠ।
‘উনার বিয়ের জন্যে জমানো টাকা আর চেইন বিক্রি করবেন।’
অনিরূপ কিছুক্ষন চুপ থাকে, তারপর হালকা হাসলো। মেয়েটার মধ্যে দম আছে বলতে হবে। ভাঙবে তবু মচকাবে না? বিয়ের টাকা দিয়ে অনিরুপের হক মারতে চাইছে? অনিরূপের ঝাঁক-ঝমক করে বউ ঘরে তোলার ইচ্ছাকে দমন করতে চাইছে? রুড আশা!
কিন্তু অনিরূপকে বিয়ের টাকা আশা কেন খরচ করবে? আশা সেটা করলে দ্য গ্রেট অনিরূপের গায়ে লাগবে না ব্যাপারটা? অবশ্যই লাগবে। অনরূপ তাই হালকা হেসে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল-‘টাকা ছিনতাই করাও।’
‘ছিনতাই?’ কনস্টেবলের অবাক প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ।’-অনিরূপের শান্ত উত্তর।
কনস্টেবল বললো-‘এতগুলো টাকা হারিয়ে গেলে ম্যাম মুর্ছা যাবেন স্যার।’
‘হারবে না টাকা। ম্যামের হাসবেন্ডের কাছেই টাকা জমা থাকবে, সময় হলে পেয়েও যাবে। এখন যা বলে দিয়েছি করো।’
‘ঠিক আছে স্যার। আমি লোক লাগাচ্ছি।’
অনিরূপ কল কাটতে গেলে- কনস্টেবল হঠাৎ কিছু একটা বলার জন্যে উশখুশ করে উঠে-‘স্যার, একটা কথা বলব?’
‘কী?’
‘স্যার, ইমাদ স্যার-‘
কনস্টেবল থামে। সতর্ক দৃষ্টিতে আশপাশ একবার দেখে তারপর মোবাইল আবার কানে রেখে ফিসফিস করে বলে-‘ইমাদ স্যার ম্যামকে কু-ইঙ্গিত দিয়েছেন আজ।’
সঙ্গেসঙ্গে অনিরূপের হাসিহাসি মুখ বদলে যায়, ভ্রু কুঁচকে যায়। হাতের ফাইল টেবিলে রেখে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেয় ফোনে,তীর্যক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে-‘কী ইঙ্গিত দিয়েছে?’
কনস্টেবল লাল দিয়ে গলা ভেজানোর চেষ্টা করে। অনিরূপকে বলা উচিত হবে? এরপর যদি কোনই ধ্বংসলীলা চালায়? অনিরূপের রাগ সম্বন্ধে কে না জানে।
‘বলো কী বলেছে?’
অনিরূপ আবারো ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করে।
কনস্টেবল থামে, শুকনো গলায় বলে-‘ম্যামের টাকা তিনি দিবেন যদি ম্যাম একরাত-‘
কনস্টেবলের আর কিছু বলা লাগলো না। অনিরূপ টেবিলে জোরে এক থাবা দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। রাগে কপালের নীল রগ ফুলে উঠেছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, তারই পোষা কুকুর কিভাবে নিজের মালকিনের দিকে হাত বাড়াচ্ছে!
অনিরূপ নিজের রাগ দমিয়ে রাখে। জোরেজরে নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেকে শান্ত করে, তারপর মুখচোখ লাল করে অনিরুপ শুধু এটুকুই বললো-
‘ইমাদ যেন কখন থানা থেকে বেরোয়?’
#চলবে