#দীঘির_জলে_কার_ছায়া
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_৬ (প্রথম অংশ)
|এডাল্ট এলার্ট-কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্ক-প্রাপ্তমনস্কদের জন্যে|
কাজী অফিসের সামনে অনিরূপ দাঁড়িয়ে আছে, গলায় সাদা গোলাপের সুন্দর এক মালা। বন্ধুদের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছে। আজ অনিরূপ খুশি, জয়ী। তার বহু আকাঙ্ক্ষিত একটা গেইম; একটা খেলা সে জিতে গেছে-অবশেষে। খানিক দূরেই আশা লাল জামদানি গায়ে, মালা গলায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। অনিরুপের হাসি বরাবরই মারাত্মক-কিন্তু আজ আশার ওই হাসির দিকে তাকালে শ-বার মরে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে।না চাইতেও আশা নিজেই নিজের জীবনের কাল ডেকে এনেছে, স্বয়ং সর্বনা শের অপর নাম অনিরূপকে ডেকে এনেছে। অনিরূপের বন্ধুরা আশার দিকে চেয়ে অনিরূপকে খোঁচাচ্ছে, আজ অনিরূপ সব মজাতেও হালকা হেসে সায় দিচ্ছে। খুব ফুরফুরে মেজাজে আছে সে আপাতত।
আশা ওদের দিকে চেয়ে হালকা হাসার ভান করে গলার মালা খুলে হাতে নিলো। মালাটা গলায় যেন ফাঁ সের মতো লাগছিল। অনিরূপ বন্ধুদের বিদায় দিয়ে আশার দিকে এগিয়ে এলো। আশা ফাঁকা ঢোক গিলে অনিরূপের দিকে তাকাল। অনিরূপ আশার সামনে এসে পকেটে হাত ঢুকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আশাকে কিছুক্ষণ দেখে তারপর হালকা হেসে আশার দিকে চেয়ে বললো-‘এরপর?’
আশা নীরব থাকলো কিছুসময়-তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে চেয়ে বললো-‘আমার আব্বাকে ফিরিয়ে আনা।’
অনিরূপ আবারও মজা করে বসলো। পুরনো কথা ভুলে যাওয়ার ভান করে বললো-‘আব্বা? কার আব্বা? আমি কাউকে ফিরিয়ে আনার কথা দেইনি।
আশার বুক ছ্যাত করে উঠলো। অনিরূপ কী ডাবল গেইম খেলতে চাইছে আশার সঙ্গে। আশা ভ্রূ কুঁচকে বিরক্ত হয়ে বললো-‘মানে? আপনি কথা দিয়েছিলেন আমাকে।’
আশা ক্ষীপ্ত হয়ে যাচ্ছে। লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলছে ও। উপরে উপরে রাগ দেখালেও, ভেতরে ভেতরে আশা ভয় পেয়ে যাচ্ছে। আশা অনিরুপের ওয়াদার উপর ভরসা করে বিয়ে করেছে, এখন এতদূর এসে ফিরে যাওয়ার আর কোন পথ নেই। অনিরূপ আশাকে এখন ঠকালে?
অনিরূপ আশার এহেন দুর্দশা দেখে হেসে ফেলল শব্দ করে। হাসতে হাসতে আশার চুলে হাত রেখে বললো-‘কুল, আসো। আমরা থানায় যাব এখন।’
আবারও আশার পরিস্থিতি নিয়ে, আশার দুর্ভাগ্য নিয়ে কী জঘন্য মজা করলো অনিরূপ। আশা কিছুক্ষম অনিরূপের দিকে চেয়ে থাকলো। তারপর অনিরূপের হাতটা জোর করে মাথার উপর থেকে সরিয়ে ফেলল। অনিরূপ ভ্রূ কুঁচকে একবার নিজের সরিয়ে দেওয়া হাতের দিকে আরেকবার আশার দিকে তাকাল। আশা চুপচাপ কোনো কথা না বলে অনিরূপের গাড়িতে উঠে বসলো। অনিরূপ ছোট্ট করে এক নিশ্বাস ফেলে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো।
অনিরুপ গাড়ি চালাচ্ছে, আশা চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে আছে। গাড়ির স্পিড বড্ড বেশি, এক্সিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আশার সেদিকে মন নেই। সে ভাবছে- অনেককিছু। আশার পানি পিপাসা পাচ্ছে। ও কিছুক্ষণ পর অনিরূপের দিকে চেয়েবললো-‘গাড়িতে পানি আছে?’
অনিরূপ আশার দিকে একপল চেয়ে গাড়ির পেছনের সিটব্যাগ থেকে পানির বোতল এগিয়ে দিল। আশা অর্ধেক বোতল পানি একবারে শেষ করে ফেলল। পানির বোতলে শেষ চুমুক দিবে, সেইসময় গাড়ি হঠাৎ ব্রেইক কষলো। আশা পানির বোতল নিয়ে সামনে ছিটকে পড়লো। কিছুটা পানি আশার গলাসহ গায়ের শাড়িতে পরে গেলো। আশা একবার অনিরূপের দিকে বিরক্ত চোখে চেয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে গলা মুছতে গেলে অনিরূপ আশার হাত আটকে দিল। আশা অনিরুপের দিকে চায়, অনিরূপের ওই নীলাভ চোখ কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেছে। ওই নির্লজ্জ চোখ আশার ঠোঁট থেকে গলায় ঘুরাঘুরি করছে। অনিরুপ গাড়ির ইঞ্জিন অফ করার সঙ্গেসঙ্গে আশার ধ্যান ফেরে। আশা অনিরূপের উদ্দেশ্য বুঝে- চমকে উঠে অনিরূপের হাত সরিয়ে নিতে চাইলে, অনিরূপ আশার হাত ধরে হেচকা টান দিয়ে নিজের ঠিক মুখোমুখি এনে আচমকা আশার গলার মাঝখানে লম্বা সময় নিয়ে চুমু বসায়। শুষে নেয় গলায় লেগে থাকা পানিটুকু। আশা ছটফট করে উঠে, বারবার অনিরুপের বুকে ধাক্কা দিতে থাকে। তবে অনিরূপের দানব শরীর নিজের থেক একফোঁটাও সরাতে পারে না, যতক্ষণ না অনিরূপ নিজে থেকে সরে আসলো। অনিরূপ সরে আসলে, আশা হাঁপাতে হাঁপাতে অনিরুপের দিকে চাইল। ধীরে ধীরে আশার অসহায় চোখে রাগের ফুলকি ধ্বসে পড়লো। ওই রাগি চোখে অনিরুপ আবারও নিজের ধ্বংস দেখতে পেয়ে হাসলো। অনিরূপ নিজের ঠোঁট লিক করে তির্যক হেসে বললো-‘ ওহ্ ম্যাই আশা, ইওর নেক টেস্ট ইস ড্যাম স্যুইট। আই থিঙ্ক আ’ম অ্যাডিক্টেড টু ইওর নেক।’
অনিরূপের চোখ আশার গলার দিকে এখনও ঘুরছে। ব্যস, অনিরূপের এই সামান্য কথা আশার রাগে ঘি ঢালতে যথেষ্ট। আশা ক্ষেপে গিয়ে তেরে আসে অনিরূপের দিকে-‘‘নির্লজ্জ লোক,আপনি ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন।’
ক্ষিপ্ত আশা অভদ্র অনিরুপকে হাত বাড়িয়ে চড় মারতে হাত উঠায়, অনিরুপ হাত ধরে ফেলে সঙ্গেসঙ্গে। আশা কাঁপতে থাকে, যেন চোখ দিয়েই ভস্ম করে দিবে অনিরূপকে, অনিরূপের ওই নেশালো ঠোঁটকে। অনিরুপ আশার চড় মারতে উদ্যত হওয়া ডান হাতের উল্টোপিঠে চুমু খায়,আশা থমকে যায় সঙ্গেসঙ্গে। অনিরূপ ফিসফিস করে হাস্কি আওয়াজে বলে-‘তোমাকে ছুঁবো না, এমন কোনো ওয়াদা করেছি বলে আমার মনে পড়ছে না। স্ত্রী তুমি আমার, হক আছে আমার। হক এখনি পুরোপুরি বুঝে নেইনি, নিব। সময় হোক আগে, নিব অবশ্যই।’
আশা অনিরূপের থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করছে অনবরত-, অনিরুপ একপর্যায়ে নিজেই আশার হাত ছেড়ে দিল। আশা সিটে বসে আবার। অনিরুপ স্টার্ট করে গাড়ি। আশা রাগে নিজের আঙুল নিজেই কামড়ে ধরে, চিবোয় আঙুল। অনিরুপ হেসে হেসে গাড়ি চালাচ্ছে। আশার এই অবস্থা দেখে সবচেয়ে বেশ মজা পাচ্ছে অনিরুপ। ভালোই লাগছে মেয়েটাকে তড়পাতে দেখতে।
আশার চোখে পানি জমে গেছে। অনিরুপের নোংরা স্পর্শ ও মানতে পারছে না। ইচ্ছে করছে-কুটিকুটি করে ফেলতে ওই ঠোঁটগুলো।আশা আঙুল চিবুতে চিবুতে আশা বিড়বিড় করে বললো-‘তার স্পর্শ করা জায়গা পোকায় খাক, জ্ব লেপু ড়ে যাক।’
আশার চোখ টলটলে, কিন্তু চোখ বেয়ে ওগুলো গড়িয়ে পড়বে না। আশা পড়তে দিবে না কখনো। শুধু রহমান সাহেব একবার ছাড়া পান, আশা এই সবকিছু শেষ করবে। রাগ সামলানোর জন্যে এখনও আঙুল চিবিয়ে যাচ্ছে ও। অনিরুপ কিছুক্ষণ পর সামনে তাকিয়েই আশার আঙুল মুখ থেকে টেনে আনে। আশা ক্ষীপ্ত হয়ে অনিরুপের দিকে তাকায়। বললো ও-‘চুপচাপ গাড়ি চালাতে পারেন না? আমার উপর এত নজর কেন? আপনি প্লিজ সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালান, আমি অস্বস্তি বোধ করছি।’
অনিরূপ ওসব কথা গায়েই মাখলো না। বরং নিজের মতো করে বললো-‘কামড়ানোর সময় এলে আমিই কামড়ে দিব, নিজে থেকে এই কাজ করা লাগবে না। ওটা আমার সেক্টর।’
আশা থামে, জোরেজোরে শ্বাস ফেলে নিজের রাগ সংবরণ করার চেষ্টা করে অনিরূপের দিকে ফিরে সরাসরি স্পষ্ট গলায় বলে ফেললো-‘আমি সময় চাই, এই বিয়ে আমার জন্যে একটা সওদা জাস্ট। একটা সওদা করে আমার থেকে শারীরিক কিছু কিছু আশা করলে বোকামি করবেন। মনে রাখবেন, আমি মন থেকে আপনার স্ত্রী হইনি।’
অনিরূপ ভ্রু বাঁকাল, হাসলো-যেন উপহাস করলো আশাকে। এমন মজার কথা যেন সে কখনোই শুনেই নি। অনিরূপ হেসে হেসেই বললো-‘মন? ওটা আবার পাওয়া লাগে নাকি? অনিরূপ কারো মন পাওয়ার আশা করেনা।’
আশা স্তব্ধ হয়ে অনিরূপের দিকে চেয়ে থাকে। অনিরুপের নীলাভ চোখগুলো হাসছে, ওর ওই নেশালো ঠোঁটও হাসছে। অনিরূপের প্রতি আরেকবারের ন্যায় ঘৃণা জন্মাল আশার। মানুষটা সাক্ষাৎ শ য়তান-একটা জ ঘন্য নোং রা মানুষ।
আশা নীরবে অন্যপাশে মুখ সরিয়ে ফেলে তাকিয়ে থাকে।যার মন নেই, তার কাছে অন্যের মনের মূল্যও কী করে থাকবে? পোউর আশা সেটা বুঝতে পারলো না কেন? আশা নিজের উপরই হেসে উঠে। বারবার, বারবার এই অনিরূপ আশাকে বোকা বানাচ্ছে, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে মানুষ চেনায় আশা ঠিক কতটা বোকা, অদক্ষ।
অনিরূপ কিছুসময় পর সন্দেহজনকভাবে হেসে জিজ্ঞেস করলো-‘থানায় একজনকে আমি তোমার সামনে পেটাব। দ্য গ্রেট অনিরুপের স্ত্রী হিসেবে, আমি চাই তুমি আমাকে চেয়ার্স অ্যাপ করবে। করবে তো?’
#চলবে
------
#দীঘির_জলে_কার_ছায়া
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব__৭
|কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্ক-প্রাপ্তমনস্কদের জন্যে|
অনিরূপ গাড়ি থেকে নামার পরপর থানা গেইটের সামনে দায়িত্বরত কনস্টেবল অফিসারের অগোচরে ফিসফিস করে সালাম করলো তাকে। অনিরূপ এসব দেখেও না, সে শার্টের সামনের দুটো বোতাম খুলে হেঁটে এসে আশার দিকের দরজা খুলে দেয়। আশা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়, অনিরূপ আশার দিকে ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে মৃদ্যু হেসে শোধায়-‘হোল্ড মাই হ্যান্ড, ম্যাই লেডি।’
আশা কিছুক্ষণ অনিরূপের দিকে চেয়ে থাকে, তারপর অনিরূপকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ছটফট পায়ে এগিয়ে যায় থানার গেইটের দিকে। অনিরূপ বাড়িয়ে দেওয়া হাত মুষ্টিবদ্ধ করে, চোখ বুজে মাথা নিচু করে অপমানটুকু হজম করে ফেলে জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস নিলো। তারপর আশার পিছু পিছু এগিয়ে যায়।
আশা সরাসরি ইমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়, হাঁপাতে হাঁপাতে বলে-‘আমি আব্বার সঙ্গে দেখা করবো।’
ইমাদ হাতের ফাইল বেহুদা দেখতে দেখতে গা ছাড়া ভাবে বললো-‘টাকা আনো আগে, যাও।’
আশা কিছু বলবে, তার আগেই পেছন থেকে অনিরূপ রাজকীয়ভাবে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো-‘ এই যে টাকা।’
ইমাদ আশাকে পাশ কাটিয়ে সামনে তাকায়, অনিরূপকে দেখে ইমাদ চোখ বড়বড় করে চায়, মাথায় যেন বাজ পড়ে। সঙ্গেসঙ্গে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট করে অনিরূপকে-‘স্যার আপনি আমার থানায়?’
অনিরূপ হালকা হাসে। ইমাদের সামনে এসে দাঁড়ালে ইমাদ কনস্টেবলের দিকে ইশারা করে। একজন কনস্টেবল এসে চেয়ার এগিয়ে দেয় অনিরূপের দিকে। অনিরূপ এবারেও হালকা হেসে, তারপর পায়ের উপর পা তুলে চেয়ারে বসে। ইমাদ এখনো দাঁড়িয়ে। অনিরূপ বললো-‘বসো।’
ইমাদের কপালে ঘাম জমে গেছে ভয়ে-আতঙ্কে। অনিরূপ এখানে কেনো? অনিরূপ শেখ জয়? কী দরকার তার থানায়? অনিরূপের বসার কথা শুনে ইমাদ বসতে চইল চেয়ারে। বসতে যাবে, তার আগেই অনিরূপ বলে উঠে-‘তুমি না। আমার বৌকে বসতে বলেছি।’
ইমাদ অপমানিত হয়ে আবারও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।’বউ’? কে বৌ? ইমাদ আশেপাশে তাকিয়ে অনিরূপের বৌকে খুঁজে। তার মাথাতেও আসেনি, আশার মতো সাধারণ কেউ দ্য গ্রেট অনিরূপ শেখ জয়ের বৌ হতে পারে। অনিরূপার কথা শুনে আশা চেয়ারে বসলো। সঙ্গেসঙ্গে ইমাদের ভ্রু কুঁচকে গেল। আশা চেয়ারে বসে ভ্রু নাড়িয়ে ইমাদের দিকে চেয়ে রইলো। ইমাদ এবার বুঝে, আশা আর কেউ না, অনিরূপ স্যারের বৌ। ইমাদ নিচু আওয়াজে গলা কেশে না চাইতেও বলে-‘আসলামুয়ায়কুম ম্যাডাম।’
ইমাদ ভয়ে মরা মাছের ন্যায় ভেতরে ভেতরে ছটফট করছে। আশাকে সে কুপ্রস্তাব দিয়েছে? অনিরুপ যদি কোনভাবে সেটা জেনে যায়? না, না। জানবে কেন?সেসময় তো শুধু আশা ও ইমাদের মধ্যে কথা চলছিল। আশেপাশে তো কেউই ছিলো না। কথা লিক হওয়ার চান্স নেই। অনিরুপ স্যার জানবেই না কিছু। ইমাদ নিজেই নিজেকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে বারবার। ইমাদ দাঁড়িয়ে থেকেই বললো-‘স্যার, ম্যাডাম। কী খাবেন বলুন। আমি এক্ষুনি আনাচ্ছি। প্রথমবার আমার থানায় এলেন।’
অনিরুপ হালকা হাসল।সহসা স্বাভাবিক ভাবেই বললো-‘চা আনাও। শ্বশুর মশাইয়ের সঙ্গে আজ একসঙ্গে চা খাওয়া যাক। কী বলো বৌ?’
অনিরূপ বারবার আশাকে ‘বৌ’ বলে ডাকছে, আদর-আহ্লাদ উপচে পড়ছে আজ। আশা মহা বিরক্ত অনিরূপের উপর। তবে আশা কী জানে? অনিরূপ আজ ভীষণ খুশি? ‘বৌ’ কথাটা বলার সময় অনিরুপের ভীষণ মজা লাগছে আজ? শান্তি অনুভব করছে সে ভীষণ?এই যে আশা অনিরূপের উপর চূড়ান্ত বিরক্ত- এই বিরক্তিবতি আশাকে দেখে অনিরূপের বুকের ধারকান বেড়ে যায়, লোভ লাগে পাশে থাকা ‘বৌ আশাকে’ ছুয়ে দিতে। এসব তো পোউর আশা জানলোই না।
অনিরূপের আকাশ-কুসুম ভাবনায় মত্ত। তবে- আশার চোখে মুখে বিষণ্ণতা। আশা মিহি স্বরে ‘হ্যা’ বলেছিল। শ্বশুর মশাইর সঙ্গে চা খাবে? আহা, কী মায়া? এই মায়া আগে কোথায় ছিল? যখন মিথ্যা মামলায় আশার বাবাকে ফাঁসিয়েছিল অনিরূপ। আশার এত ভোগান্তির পেছনে তো অনিরূপই দায়ি। আশা কী এসব কিছু কখনোই জানবে না?
অনিরুপ হাসলো, অবশ্যই জানবে। অনিরূপ নিজের কৃতকর্ম আশাকে নিজের জবানে বলব একদিন।
ইমাদ একসঙ্গে তিনকাপ চা পাঠাতে বললো। তারপর অনিরূপের দিকে চেয়ে বললো-‘স্যার, ম্যাডামের বাবার জামিন করা লাগবে। তাহলে উনি ছাড়া পাবেন।’
অনিরুপ কথাটা শোনার সংহেসঙ্গে আগুন চোখে তাকালো ইমাদের দিকে। ইমাদ ওই তাকানো দেখে ভয়ে দু কদম পিছিয়ে গিয়ে বললো-‘স্যার এটা রু ল স।’
অনিরূপ কিছু বলবে, তার আগে আশা হালকা আওয়াজে বলে উঠে-‘টাকাগুলো দিয়ে দিন উনাকে। আমি কোনো ঝামেলা বাড়াতে চাইনা।’
আশার কথা শুনে ইমাদ রুমাল দিয়ে ঘাম মুছে কপালের। অনিরূপ আশার দিকে চায়, তারপর আশার কাবিনের টাকার চেক ছিঁড়ে ইমাদের হাতে দিল। বললো-‘মোড়লের হাতে পৌঁছে যেন টাকাটা।’
ইমাদ সঙ্গেসঙ্গে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বললো- ‘‘অবশ্যই স্যার। আমি এক্ষুনি পৌঁছে দিচ্ছি।’
টাকাগুলো এখন ইমাদের হাতে। আশা ওই টাকাগুলোর দিকে চেয়ে কড়া কণ্ঠে বললো-‘আব্বাকে কয়েদমুক্ত করুণ , এক্ষুনি।’.
আশার গলার ধ্বনি তীব্র, কন্ঠে তেজ। ইমাদ সঙ্গেসঙ্গে নিজে গেলো রহমান সাহেবকে লকআপ থেকে ছাড়াতে।
রহমান সাহেব ছাড়া পেয়ে বেরিয়ে এলেন লকাপ থেকে। আশা এতদিন পর আব্বাকে দেখে দৌঁড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে। জড়িয়ে ধরেই শক্ত মানুষিকতার আশা নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলো না, ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে-‘আব্বা, তুমি আর কক্ষণো টাকা সুদ নিবে না। এবারেই শেষ। বুঝো না কেন তুমি, আমাদের দু বোনের জীবনে তুমি ছাড়া আর কেউই নেই আব্বা, কেউই নেই।’
রহমান সাহেবও ক্লান্ত হেসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে রাখেন। আশা বাবার পিঠের ফতুয়া খামছে ধরে ইমাদের দিকে চায়। ও হাপাচ্ছে ভীষণ। ইমাদের চোখে অসহায়ত্ব-বিষণ্ণতা। রহমান শাহবেব আশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। ক্লান্তি গলায় শোধালেন-‘কাঁদে না আম্মা। থামো এখন।আমি আসছি না? আসছি তো ফিরে।’
রহমান সাহেব হঠাৎ এবার অনিরূপের দিকে চান। অনিরূপকে এখানে দেখে তিনি অবাক হয়েছেন, আশার সঙ্গে অনিরূপ কী করছে?রহমান অনিরূপকে দেখে এবার আশার দিকে তাকান। আশা বাবার প্রশ্নবোধক চোখের দৃষ্টি বুঝে, ঠোঁট জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে গিলে জানাল-‘ওনার সাহায্যে পুলিশ তোমাকে ছেড়েছে।’
রহমান সাহেব আর কিছু বললেন না। আশা বাবার বুক থেকে সরে দাঁড়ায়। রহমাম সাহেবার ময়লাযুক্ত ফতুয়ায় হাত বুলিয়ে, আবার মুখের খোঁচা দাঁড়ি ছুয়ে কান্নামাখা গলায় বলে-‘ময়লা লেগে আছে পুরো গায়ে। বাড়ি গিয়েই গোসল করবে আব্বা।’
‘করবো আম্মা।’
অনিরূপ আশা-রহমান সাহেবার দিকে চেয়ে থাকে অপলক। বাবা-মেয়ের দৃশ্য দেখে অনিরূপ হালকা হাসে। তার আর আশার মেয়ে বাচ্চা হলে অনিরূপও নিশ্চয়ই এভাবেই আদর করবে নিজের মেয়েকে। তবে এটাতে পার্থক্য আছে। তবে অনিরুপ রহমান সাহেবের মতো কখনোই এতটা অসহায় হবে না।
অনিরুপ এবার ইমাদের দিকে চায়। ইমাদও ফাঁকা ঢোক গিলে অনিরূপের দিকে চায়। অনিরুপ ধীর পায়ে ইমাদের দিকে দু কদম এগিয়ে এসে, একটা বিকট থা প্পড় বসায় ইমাদের গালে। থা প্পড় মারার শব্দে আশা চমকে উঠে পেছনে তাকাল। ইমাদ গালে হাত দিয়ে থম হয়ে বসে আছে। অনিরূপের চোখে-মুখে হিংস্রতা। অদ্ভুত এক প্রতিশোধ। ইমাদের থাপ্পরের আওয়াজ শুনে কনস্টেবলরা সবাই ভয়ে সেটিয়ে গিয়ে দূরে সরে যায়। ইমাদ অনিরূপের দিকে শান্ত চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করে-‘থাপ্পরটা কিসের জন্যে?’
আশা এগিয়ে যায় অনিরুপের দিকে। অনিরূপ আশাকে পাশ কাটিয়ে দু কদম এগিয়ে আসে। ইমাদের কলার খামছে ধরে আঙুলের ফাঁকে, কানের কাছে ফিসফিস করে শোধায়-‘এত কেবল শুরু। বাকিটা এখনও তোমার কপাল নাচছে। আমার বৌ ওটা, অনিরূপের বৌ। আমার বৌর দিকে আঙুল বা চোখ তোলা মানুষকে অনিরূপ ছেড়ে দেয় না কখনোই। শুরুটা থা প্পড় দিয়েই করলাম ই মা দ।’
থাপ্পড়টা কেবল শুরু? ইমাদ সবার সামনে এমন ঘোর অপমানে রেগে চোখ লাল করে অনিরূপের দিকে তাকাল। আশার সঙ্গে তার যে গোপন কথা হয়েছে, সেগুলো কে পাচার করেছে? সর্ষের মধ্যে যেমন ভূত থাকে, তাহলে নিশ্চয় থানার মধ্যেই মেইন কালপ্রিট আছে। সে তো দেখে নিবে সবাইকে। ইমাদ চুপ করে অনিরূপের সামনে থেকে বেরিয়ে থানার বাইরে চলে গেলো। আশা চুপচাপ এতোক্ষণ অনিরূপকে দেখছিল। অনিরূপ তার হাত টিস্যু দিয়ে পরিষ্কার করে মৃদু হেসে আশার দিকে চেয়ে বললো-‘চেয়ার্স অ্যাপ তো করলেই না বৌ, উল্টো আটকাতে এলে। ভেরি ব্যাড।’
আশা অনিরূপের দিকে চেয়ে বললো-‘পুলিশের গায়ে হাত তোলা অনুচিত। ওরা আইনের রক্ষক।’
অনিরূপ আশার দিকে চেয়ে হালকা হেসে বললো-‘সাথে আইনের ভক্ষকও। তোমার দেখি খুব মায়া জন্মেছে ওই ইমাদের বাচ্চার জন্যে। শোনো, যত মায়া আছে আমাকে দেখাও। আর কাউকে না।মায়া দেখানোর জন্যে আস্ত বরকে কী কখনও চোখে পড়ে না তোমার?’
আশা মুখ ঝাঁমটি দিলো। ন্যাকামি শুরু হয়েছে তার? অসহ্যকর একটা পুরুষ! অনিরূপ বুকে হাত চেপে আশার দিকে চেয়ে থাকল।
___________________
রহমান সাহবকে বাড়ি আনা হয়েছে আজ প্রায় দুদিন। রহমান সাহেব এখন বেশ সুস্থ। ধানের কাজ আবার শুরু করেছেন। আশার টাকা ছিনতাই হওয়ার বিষয়ে উনি এখনো জানেন না। তাই আসার পর থেকে আশাকে গালাগালি করছেন- বিয়ের জন্যে জমানো এতোগুলো টাকা কেন দিয়ে দিল। আশা-নিধি চুপ করে এসব শুনছে। মূলত, এসব রহমানের মুখের কথা, ভেতরে ভেতরে মেয়েদের প্রতি তিনি দারুণ সন্তষ্ট।
মেয়েরা তার মুক্তির জন্যে এত কস্ট করেছে, যা একজন ছেলে হয়েও কেউ করবে না। তার মেয়েরাই তার ছেলের অভাব পূরণ করেছে।
আশা-অনিরুপের বিয়ের কথা একমাত্র নিধি জানে। নিধি প্রথমে এটা নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করলেও পরবর্তীতে বুঝতে পারে, আশা তার জায়গায় ঠিক। এমন একটা পরিস্থিতিতে আশা বিপাকে ছিল।তাই আর কথা বাড়ায় না সে।
আশার ফোন নেই। তাই দেখা যায়, অনিরুপ নিধির ফোনে কল করে আশাকে চায়। আপাতত, আশা তার ছোট বেডরুমের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কলে অনিরূপ। অনিরূপ আজ ভীষণ রেগে। দুদিন হয়ে গেলো। তাদের ঝাঁকঝমক করে বিয়ের কথা আশা প্রায় ভুলতে বসেছে। অনিরূপ রেগে চিৎকার করছে ভীষণ।আশা মিছামিছি শান্ত করার চেষ্টা করছে অনিরূপকে। তার মাথায় চলছে আরেকটা পরিকল্পনা। যেসব সে অনিরূপকে বলতে চায়না। অনিরূপ একপর্যায় রেগে বলে উঠলো- ‘তুমি এবার বাড়াবাড়ি করছো বৌ। আমাকে বাধ্য করো না, শ্বশুর মশাইকে সব বলে দেওয়ার জন্য। কালকের মধ্যে আমার ‘হ্যাঁ’ চাই উত্তর।’
-‘বলে দিন। আমাকে সবার চোখে মেইন কালপ্রিট করে যদি আপনার খুশি মেলে তবে তাই করুন।’
আশা তারপর নিজে আর কিছু না বলে কল কেটে দেয়। অতঃপর অনিরূপের কল আসে, একটার পর একটা। সারারাত ধরে। আশা ফোন পাশে রেখে চুপচাপ জানালার দিকে চেয়ে থাকে। একটা সময়, এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরে চোখ থেকে। জীবন তাকে এই কোন পরিস্থিতিতে এনে ফেলেছে? ধিক্কার!
—‘আশা…’
রহমান ডাকতে ডাকতে আশার রুমে ঢুকলেন। আশা সঙ্গেসঙ্গে চোখের জল মুছে পেছন ফিরলো। রহমান সাহেব আজ অস্থির-অশান্ত। তিনি ঘরে ঢুকেই শুরুতেই প্রশ্ন করে বসলেন-‘ তুমি নাকি অনুরূপকে বিয়ে করতে চাও।’
আশা থমথমে মুখে রহমানের দিকে চেয়ে থাকে। রহমান সাহেব উত্তর না পেয়ে প্রায় ধমকে উঠেন-‘উত্তর দিচ্ছো না কেন?’
আশা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো-‘তোমাকে কে বলেছে এ কথা?’
রহমান উত্তর দিলেন-‘অনিরুপ কল করেছে আমায়।’
আশা কিছুক্ষণ সময় নিলো। আশপাশ ভেবে, সবকিছু বুঝেশুনে দেখে ও। তারপর বুদ্ধিমান আশা বাঁকা হেসে মাথা নড়লো-‘হ্যাঁ, আমি চাইছি।’
#চলবে