ফন্ট সাইজ:
থিম:
দীঘির জলে কার ছায়া

২৬+২৭

লেখক: অবন্তিকা তৃপ্তি

#দীঘির_জলে_কার_ছায়া

#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_২৬
জালানার ওপাশে নিম গাছের ডালে দুটো চড়ুই পাখি বসেছে! বাইরে বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে গাছের পাতার নিচে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টায় রত দুটো চড়ুই! পাতার নিচে আশ্রয় নিলো ওরা, দুজন দুজনের গায়ের সঙ্গে মিশে বৃষ্টি দেখছে! নিধি জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে বিবশ নয়নে এসব দেখছে! ক্ষণে ক্ষণে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে! মনে পরে যাচ্ছে, তার বিয়ের শুরুর দিকের কথা! তাদের সংসার এমন চড়ুই পাখির ন্যায় ছিল! টাকা পয়সার অভাব ছিল না, দুজনের চড়ুইপাখির সংসারটা আরামেই চলত! কিন্তু…কিন্তু একদল অসৎ সঙ্গে সোহাগ কেমন বদলে যেতে লাগল হঠাৎ! যে নিধির গায়ে সে ফুলের টোকা দিতেও হাত কাপাকপি করতো, সেই নিধির গালে একদিন নেশার ঘোরে চড় মেরে বসে সে! শুরুটা এখন থেকেই ছিলো! পরিচিত স্বামীর এমন অপরিচিত রূপে থমকে যায় নিধি! ও সেদিন সারারাত কাঁদতেই ভুলে যায়, পরে সোহাগ মাফ চায়! ভালোবাসা লোভী বেচারা নিধি, মেনে নিলো সোহাগকে! কিন্তু কিছুতেই সেই চড়ের কথা ভুলাতে পারল না নিজেকে!
তারপর..তারপর একের পর এক অত্যাচার! মদ খেয়ে মাতলামো! গায়ে হাত তোলা, ভালোবাসার দোহায় দিয়ে আবার ক্ষমা চাওয়া! এরকমটা বারবার দেখতে দেখতে একপর্যায়ে সংসারে বিতৃষ্ণা লেগে যায় নিধির! ও তবুও ওই সংসারের মাটি খামছে পরে ছিল!শেষ একটা আশা দেখেছিল! সোহাগকে রিহাবে দিতে চেয়েছিল! কিন্তু পুরুষ ইগো অত্যাধিক থাকায় সোহাগ রিহাবে যেতে চায়নি! ওইদিন হয় নিধির শেষ দিন সংসারে! সোহাগ নেশার ঘোরে, মারাত্মক রেগে চাপাতি দিয়ে আ/ঘাত করে বসে নিধিকে! তারপর এক ভয়ঙ্কর আত্মচিৎকার শোনা যায়! নিধি যন্ত্রণায় মাটিতে পড়ে কাতরাতে থাকে, তাতেও ওই মাতাল লোকের দয়া হয়না! ও নিধির পাশে বসে হিসহিসিয়ে ধমকাতে থাকে ওকে, চুপ হতে বলে বারবার। পরবর্তীতে নিধির গগনবিদারী চিৎকারে পাড়া প্রতেবেশি শুনে, ওরা দ্রুত এসে নিধিকে ধরে হাসপাতাল নিয়ে যায়। 
ওইদিনের পর; নিধি নিজের সংসারের সকল মায়া ত্যাগ করে! এক সপ্তাহের মাথায় তালাকের দাবি আদালতে তোলে! নরম স্বভাবের নিধি হুট করে কেমন বড় হয়ে উঠে, কঠোর হয়ে যায়! তারপর..তারপর সব শেষ! নিধির নামের আগে বসে যায় ‘ডিভোর্সি’ নামক বড্ড বিশ্রী ট্যাগটা!
পুরনো এসব কথা ভাবতে ভাবতে দু চোখ ছাপিয়ে জল গরিয়ে পড়ল নিধির.! নিধিরও বড্ড লোভ! ভালোবাসা পাওয়ার লোভ! একটা সাজানো সংসারের লোভ! কিন্তু ওই যে! ভয়, আতঙ্ক! তাই এতটা আলাপ আসা সত্ত্বেও নিধি ফিরিয়ে দিয়েছে সবকে! তারপর হঠাৎ একদিন অরূপের সঙ্গে দেখা! ছেলেটাকে প্রথম দেখায় নিধির তেমন কিছু মনে না হলেও, ধীরে ধীরে নিধি বুঝে- ছেলেটা ভদ্র! ভীষণ আগলে রাখতে জানে সবাইকে। নারীকে সম্মান করে ভীষণ! নিধিকে যখন দেখে, মায়া নিয়ে দেখত! নিধি বুঝে, অরূপ দুর্বল নিধির প্রতি! কিন্তু নিধি ওকে প্রশ্রয় দিবে না! 
নিধির কালো অতীতের ছায়া ওই ভালো পুরুষের উপর পড়তে দিবে না নিধি! ওই মানুষটা আরো ভালো কাউকে ডিজার্ভ করে, নিধিকে না! নিধি ভালো মেয়ে নয়। স্বামীকে যে মেয়ে তালাক দেয়, সে কোনোদিন ভালো মেয়ে হতে পারে না। 
কান্নায় নিধির ভেতরটা ফেটে পরে! ও দুহাতে নিজের মাথার চুল খামচে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ে! তারপর আচমকা ডুকরে শব্দ করে কেঁদে উঠে! তার জীবনটা এমন কেন হল, কেন হলো এমন? এতটা বিশ্রী কেন তার জীবনের পথগুলো? 
__________
আব্দুর রহমান সাহেব আজ দ্রুত বাড়ি ফিরেছেন! আজ আশার জামাইর বাড়ির লোক আসবে! কত কাজ আছে বাড়িতে! আব্দুর রহমান দ্রুত বাড়ি ঢুকে ডাকেন মেয়েকে-
‘নিধি? মা, এদিকে আয়! মা?’
নিধি বাবার গলা পেয়ে দু চোখ মুছে স্বাভাবিক হয়ে উঠে দাঁড়ায়! উঠোনে এসে দেখে, আব্দুর রহমানের হাতে বাজার! উনি ফটকে বাজারের ব্যাগটা রেখে গামছা দিয়ে ঘাম মুছে বললেন-‘আশা আসতেসে! ওর জামাই বাড়ির লোক নিয়ে! চোটজলদি রান্না বসিয়ে ফেল, ও বাড়ির করিমের বউরে ডেকে নিয়ে আয়, সাহায্য করবে নে তোকে।’
নিধি চমকে উঠে। আশা আসছে। ওই মানুষটাও আসবে? কেন? কেন আসবে? নিধির জীবনে কী শান্তি দিবে না কখনো এই মানুষগুলো? নিধি কম্পিত স্বরে জিজ্ঞেস করল-‘আব্বা, আজকে ওরা আসছে কেন? বিশেষ কিছু আছে আজ?’
আব্দুর রহমান উঠে দাঁড়ালেন! বললেন-‘জানিনা রে মা! আশা বললো ওর শ্বশুরবাড়ির লোক আসতে চাইছে এখানে! কুটুম বাড়ির মানুষ, অযত্ন না হয় যেন।’
নিধি মাথা নাড়ল! আব্দুর রহমান গামছা হাতে পুকুরের দিকে চলে গেলেন। গরম পড়েছে ভীষণ, একটা ডুব দিয়ে আসা যাক।
_________________
ফটিকের ঘরে আশার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বসে আছে! আশা অনিরূপের পাশে বসেছিল এতোক্ষণ! নাস্ত পানির কাজ শেষ করে, উমায়েদ কথা তুললেন-
‘ভাইসাব. একটা আবদার নিয়ে এসেছি আজ আমরা! আপনি আমাদের আবদার রাখবেন সেই আশায় নিজের বউ-বাচ্চাদের নিয়ে এসেছি।’
আব্দুর রহমান হাসার চেষ্টা করে বললেন-‘এভাবে বলে লজ্জা দিবেন না বেয়াই! আবদার না, আমার কাছে দাবি করুন।’
উমায়েদ হাসলেন! অরূপের দিকে চেয়ে দেখে তারপর বললেন-‘আমার ছেলে অরূপ! চিনেন তো আপনি ওকে! দু বছর হয়েছে ডাক্তারি পাশ পিজি করেছে। এখন আমাদের হাসপাতালেই বসে! ওর জন্যে আপনার বড় মেয়ে নিধির হাত চাইতে এসেছি আমি।’
আব্দুর রহমান বড়বড় চোখে তাকালেন, বিস্মিত হয়ে পড়লেন ভীষণ। তিনি অবাক চোখে অরূপকে একবার দেখে নিয়ে বললেন-‘এটা কিভাবে সম্ভব বেয়াই! নিধি সম্পর্কে আশার বড়..!’
উমায়েদ কথা কাটলেন, বললেন-‘এটা তেমন সমস্যা না আজকাল! এমন তো কতই হয়! আমার আপন ভাই তো এমন করেই বিয়ে হয়েছে! ছেলের বড্ড পছন্দ আপনার পরিবার, আপনার মেয়ে!এখন ছেলেচাইছে, তাই আমরা পরিবারের মানুষ হয়ে সম্পর্কটা আগানোর দায়িত্ব পালন করছি শুধু।’
আব্দুর রহমান কথা বলতে ভুলে গেলেন যেন! এবার তিনি কী করে মানা করবেন? নিধি এখন বিয়েই করতে রাজি না। এখন ওদের মানা করে ছোট মেয়ের সংসারে অশান্তি আনবেন কী করে? একপ্রকার নাস্তানাবুদ অবস্থায় পড়ে গেলেন তিনি! অরূপ হয়তো সেটা বুঝল! ও আশাকে ইশারা করল! আশা এবার কথা বললো-‘আমি আপাকে তৈরি করে আনছি! আপনার বসুন।’
আশা ভেতরে গেলো! আশাকে ভেতরে আসতে দেখে নিধি পর্দার আড়াল থেকে সরে গেলো! আশা নিধির ঘরে গেল! নিধি ও ঘরে বসে আছে চুপচাপ! আশা যেতেই নিধি বিছানা থেজে উঠে আশার হাত চেপে ধরে ওকে বিছানায় বসিয়ে দরজা আটকে দিল! আশা বিছানায় বসে আছে! নিধি আসার পাশে বসলো। অধৈর্য্য ভঙ্গিতে বললো-‘ওরা কেন এসেছে আজ?সত্যি করে বল আশা।’
আশা শোনে! তারপর নিধির দিকে চেয়ে নির্লিপ্ত গলায় জানালো-‘তোমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে! অরূপ ভাইয়া তোমাকে বিয়ে করতে চায়।’
নিধি অবাক হয়না! ও সেটা জানতো।! নিধি রেগে গিয়ে উঠে দাঁড়াল, ধমকে উঠল আশাকে, -‘ওই, ছেলেমানুষি পেয়েছিস বিয়েকে? যাকে পেলাম তাকে বিয়ে করে ফেললাম? ওই লোক পাগলামি করছে করুক! তুই কেন নিজে এটাতে সামিল হবি? বুঝিস কিছু তুই?’
আশা বোনের ধমক হজম করে নিলো! ও চুপচাপ উঠে দাঁড়িয়ে নিধির হাতটা ধরলো, নরম গলায় বললো-‘আপা, জীবনটা আরেকবার গুছিয়ে নাও না। এভাবে আর কত? এ কতো, বলো তো? আমি জানি তুমি চাও অরূপ ভাইয়াকে! নাহলে তুমি এভাবে পালিয়ে আসতে না! কেন নিজের সঙ্গে অবিচার করছো আপা?
নিধি থতমত খেয়ে গেল, হাতটা আশার থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-‘পাগল তুই? উনার সঙ্গে আমার কোনদিক থেকে যায়?’
‘সবদিক থেকে যায়, যাওয়ালেই যায়—-‘ 
অরূপ দরজার সামনে থেকে ভারিক্কি গলায় বলে উঠল! নিধি আঁতকে উঠলো! আশা অরূপকে দেখল, আবার বোনকেও দেখল! নিধি পেছনে ফিরল না, একবারের জন্যেও দেখল না অরূপকে! আশা অরূপকে দেখে আস্তে করে পাশ কাটিয়ে রুম থেকে চলে গেলো। নিধি তখনও ওভাবেই দাঁড়িয়ে! অরূপ দরজা হালকা ভিড়িয়ে এগিয়ে গেল। নিধি অরূপের দিকে পিঠ করে আছে। অরূপ বলা শুরু করল-‘আমি আপনাকে ভিক্ষা চাইছি নিধি! আপনাকে স্বার্থপরের মতো নিজের এলোমেলো লাইফে চাইছি, নিজেকে সুখী করতে চাইছি! আমি আপনার উপর করুণা করতেই পারিনা, সেই দুঃসাহস নেই আমার! আমি আপনাকে ভালোবাসি, আপনি আমার অনুভূতির ভিন্ন কোন মানে বের করতে পারেন না।আমি আপনাকে আমার ভালোবাসার উপর আঙুল তুলতে দিব না।’
অরূপ থামে! নিধির পিঠটা কাঁপছ! কাঁদছে বোধহয়! অরূপ আবারও বলা শুরু করে-‘বিয়েটা করে ফেলি, নিধি!
বাকিটা পথ আপনার সঙ্গে একসঙ্গে কাটানোর লোভ জেগেছে আমার! লোভটাকে সংবরণ করতে পারছি না আমি! চেষ্টাও করিনি কখনো! আপনি একবার হ্যাঁ করুন নিধি, আমি কথা দিচ্ছি পুরনো সব ব্যথা ভুলিয়ে দিব আপনার, নতুন করে রাঙিয়ে দিব আপনাকে! রঙের কৌটা নিয়ে আপনার সকল কালো ব্যথার পেছনে ছুটে বেড়াব! একবার শুধু হ্যাঁ করুন, প্লিজ নিধি!’
নিধি দুহাতে মুখ চেপে ধরে! তার ভেতরটা হাহাকারে ভরে উঠছে! বুকটা জ্বলে যাচ্ছে! অরূপ দেখল সব! নিধিকে সময় দিতে চাইল! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আস্তে করে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে! অরুপ চলে গেছে, নিধি টের পায়! ও ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে! চোখ ছাপিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে! তার জীবনটা এই কোন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়ে গেছো? কাউকে ভালোবাসতে, কাউকে ভরসা করতে নিধির এতো ভয়, এত আতঙ্ক? 
অরূপ চলে গেলে, আশা ভেতরে ঢুকলো! নিধি আশাকে দেখতে পেয়েই দৌড়ে গিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আশাকে! আশার কাঁধে মুখটা গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠে। আশা হাঁপ ছাড়ে, আলতো করে বোনের পিঠে হাত বুলায়! ধীর কণ্ঠে বলে-‘তুমি ঠকবে না আপা! বিশ্বাস করো একবার! একবার বিশ্বাস করা শিখো, আপা!’
নিধি থামে, আশাকে ছেড়ে দুহাতে চোখ মুছে ফিচেল গলায় বলে উঠে-‘আমি বিশ্বাস করতে চাইছি! আরো একবার নিজেকে ঠকানোর সুযোগ দিতে চাইছি কাউকে, আশা।আমি কী ভুল করে বসলাম আবার?’
আশা খুশিতে হেসে উঠে শব্দ করে! নিধির দুহাত ধরে উচ্ছসিত কন্ঠ শুধায়-‘না আপা, তুমি ভুল করোনি। তুমি সঠিক, সঠিক তুমি।’
_________________
অরূপ জেদ ধরেছে! আজকে আকদ করে ফেলবে ও! নিধি চিকিৎসা কন্টিনিউ করা উচিত! অরুপ চায়, নিধির বেস্ট ট্রিটমেন্ট হোক! যা শহরে ওর স্বামীর বাসায় সম্ভব শুধু! অরূপের কথা কেউই ফেলতে পারে না! 
তারপর আচমকা নিধি-অরূপের ওইদিনেই, ওই জায়গায় বিয়ে হয়ে যায়! কাজী ডেকে ঐদিন আকদ হয় দুজনের! নিধি পাথরের মতো অরূপের পাশে বসে ধরা গলায় তিনবার ‘কবুল’ উচ্চারণ করে! অরূপ সারাটাক্ষণ নিজের শখের নারীর দিকে বড্ড আকাঙক্ষা নিয়ে তাকিয়ে ছিল! চোখের পলক ফেলতেও ভয় করছিল- যদি এই নাছোড়বান্দা মেয়ে ওর স্বপ্ন হয়! রিস্ক নিতে চায়না অরূপ! 
বিয়ে পড়ানো শেষ হয়েছে! আব্দুর রহমান যতটুকু পারেন, প্রতিবেশি, কাছের কজন আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত করেছেন! এটুকু সময়ে কজন পাড়ার ভাবীরা মিলে মেহমানদারীর আয়োজন করেছেন! নিধি নিজের রুমে বসে আছে সাধারণ একটা লাল শাড়ি পরে! পাশেই আশা,ভাত মাখিয়ে খাইছে দিচ্ছে বোনকে! একটু পরেই বেরুবে ওরা! 
আশা নিধিকে খাওয়াতে খাওয়াতে হাসতে হাসতে বললো-‘মনে আছে আপা? আমার বিয়ের দিন তুমি এভাবে আমাকে খাইয়ে দিচ্ছিলে? তারপর কী বলেছিল? তোর বরও তোকে খাইয়ে দিবে! তোমার কথা সত্যি আছে।! আমি মাঝেমধ্যে রাতে না খেয়ে ঘুমালে, সে জোর করে ঘুম থেকে টেনে তুলে বকেঝকে খাইয়ে দেয় রোজ!’
নিধি চুপ করে শুনছে বোনের কথা! আশা বিয়েতে রাজি ছিল না! অথচ এই বিয়ে নিয়ে আশা এখন কতটা সুখী। নিধিও চায়, ওই সঙ্গে এমন কিছুই হোক! নিধি যে সংসারের আঁশ সারাজীবন দেখে এসেছে সেই সংসারের গল্পটা যেন ওরও হোক! 
আশার পাশে বসে আছে, ওর পাড়ার এক বয়স্ক দাদী! তিনি চশমার আগা ঠিক করো আশাকে আগাগোড়া দেখে বললেন-‘ওই নাতিন! তোর শরীর তো বিয়াত্তা মইলার লাকান হইয়া গেসে রে।স্বামী কী রোজ আদর-টাদর করে নাকি রে?’
আশা থতমত খেয়ে দাদীর দিকে চাইল! নিধি ছোট বোনের সম্পর্কে এমন কথায় নিজেও অস্বতিতে পড়ে গেলো! আশা ছোট স্বরে বললো-‘মুখটার লাগাম টানো দাদি! লজ্জা-শরম খেয়ে বসে আছো!’
দাদি ফিক করে হাসলেন, ‘মজা করি রে নাতিন! কতদিন পরে তোরে দেখলাম! দুটো কথা বলতে ইচ্ছা করতাসে।’
আশা হাসল! দাদি বললেন-‘তা বিয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলো! বাচ্চা নিবি কবে? তোর জামাই আশা-টাশা করে না তোর কাছে?’
আশা থমকে গেলো! হু, করে তো।অনিরূপ সেদিন রাতে আশাকে জরিয়ে ধরে বড্ড কাতর স্বরে একটা বাচ্চার আবদার করেছিল! আশা লজ্জায় ফিরিয়ে দিয়েছিল মানুষটাকে! সবে ওদের মধ্যে সব ঠিক হয়েছে! আরও কটা দিন যাক! দুজন দুজনকে বুঝুক, তারপর ফ্যামিলি প্ল্যানিং করবে ওরা! অনিরূপও এতে সায় দিয়েছে! ধৈর্য্যবান পুরুষ আরো একবার ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিচ্ছে! 
আশাকে হাসতে দেখে দাদি আশার কোমরে গুঁতো দিয়ে বললেন-‘ওরে ছেঁড়ি, লজ্জায় বাচঁস না দেহি। আহারে নাতিনটা আমার, স্বামী সোহাগে হুকায় যাইতাসে।’
আশা লজ্জায় এবার মরেই যাচ্ছে যেন! ও দ্রুত হাত ধুয়ে উঠে একপ্রকার দৌড়ে পালিয়ে গেলো রুম থেকে! যাওয়ার পথে ধাক্কা খেলো অনিরূপের সঙ্গে! থালা সহ পরে যেতে নি লে, অনিরূপ খপ করে আশার কোমরে ধরে ব্যালেন্স করলো! আশা পরে যাওয়ার ভয়ে, চোখ মুখ খিঁচে অনিরুপের দিকে তাকিয়ে আছে! অনিরূপ অবিশ্বাস নিয়ে বললো-‘তোমার মধ্যে ইদানিং একটা উড়ুউড়ু স্বভাব দেখতে পাচ্ছি আমি। হয়েছেটা কী তোমার, আশা?’
আশা বোকা বনে গেলো। সে উড়ছে? কখন উড়লো? আশা উঠে দাঁড়াল! কাঁচুমাচু হয়ে জিজ্ঞেস করলো- ‘উড়লাম কখন আমি?’
অনিরূপ হাসল হালকা! ঘন চুলগুলো হাত দিয়ে ব্রাশ করতে করতে আশেপাশের লোকজন দেখে নিলো একবার! জায়গাটা খালি দেখে শিস্ বাজাতে বাজাতে, আশার কানের কাছে মুখটা এগিয়ে আনল! আশা লজ্জায় আশেপাশে তাকাল। অনিরূপ ফিসফিস করে কানের কাছে শোনাল-‘ই্যয়ু আর ম্যাডলি ইন লাভ, হানি! এন্ড ই্যয়ুর দিজ বিহেইভার মেকিং অ্যা ম্যান ক্রেইজি, মোর মোর ক্রেইজি।’
#চলবে
----
#দীঘির_জলে_কার_ছায়া
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_২৭(১৮+ এলার্ট)
শেখ মহলে,দোতলার সিঁড়ির পাশের রুমটা অরূপের! আজ যেখানে ভীষণ সুন্দর করে বাসর সাজানো হয়েছে। বিছানায় ছড়িয়ে রাখা হয়েছে লাল গোলাপের পাঁপড়ি। মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে বিছানার দুপাশে! এয়ারফ্রেশনারের মিষ্টি গন্ধে চারপাশ মো-মো করছে। 
ফুলে সজ্জিত বিছানার ঠিক মধ্যখানে, হাঁটু ভেঙে গুটিসুটি হয়ে বসে আছে নিধি। দরজার বাইরে অরূপের কথা শোনা যাচ্ছে। হাসাহাসি করছে ভীষণ। অরূপ, নিধির স্বামী। তিন কবুলের স্বামী। যাকে নিধি, একদম আচমকা নিজের এলোমেলো, কাহিল জীবনটায় জড়িয়ে ফেলেছে। 
নিধির হঠাৎ-ই ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কেন পাচ্ছে ও জানে না। বারবার মনে হচ্ছে- এই যে যা হচ্ছে নিধির সঙ্গে; এসব নিধি ডিজার্ভ করে না। ও যা পাচ্ছে, সব কারোর দয়া করেই পেয়ে গেছে। অথচ অরূপ বলেছে, ও নিধির উপর কোনো দয়া করেনি। তাও নিধির অবুঝ, অপরাধবোধে দগ্ন হৃদয় সেটা মেনে নিতে পারছে না। নিধির চোখের কোন বেয়ে জল গড়াবে, এর পূর্বেই শোনা গেলো দরজায় সিটকিনি লাগানোর শব্দ। নিধি কান্না গিলে ফেলল। 
অরূপ দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নিধিকে অনেকক্ষণ দেখলো। নিধি আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বিছানার বসে রইলো। অরূপ হালকা হাসল! পাঞ্জাবির হাত গুটাতে গুটাতে এগিয়ে গেলো বিছানার দিকে। অরূপ বিছানায় বসলো। পালং কাঁপলো, সঙ্গে কাঁপলো নিধির ছোটমোট্ট হৃদয়! অরূপ কিছুক্ষণ ঘোমটার আড়ালে শখের, আদরের বউটাকে দেখল। তারপর হালকা হেসে বউয়ের ঘোমটা তুললো! 
মারহাবা! অরূপ না চাইতেও মনেমনে বলে উঠল! হালকা মেকআপে নিধিকে বড্ড মায়া-মায়া দেখাচ্ছে। চোখ দুটো নামানো,চিকন ঠোঁটদুটো তিরতির করে কাঁপছে, চুলগুলো সিঁথি করে খোঁপা করা। সিথির মধ্যে আটকে আছে, চিকন একটা সোনার গড়ানো টিকলি। অরূপ নিধিকে দেখলো। তারপর নিধির থুতনি আঙুল দিয়ে ধরে মুখটা উঁচু করল। নিধির মুখ উঁচু করা থাকলেও, চোখ বুজে রেখেছে। অরূপ সেটা দেখে হালকা স্বরে বললো- 
‘আমার দিকে তাকান নিধি।’
তার কণ্ঠ, পুরুষ কণ্ঠের আদুরে আবদার! তবুও নিধি তাকাল না। বুকটা অসম্ভব কাঁপছে ওর! ভয়ে নাকি লজ্জায়; ও জানে না। অরূপ আবারো বললো-‘চোখ খুলুন নিধি; আপনার স্বামীকে দেখুন।’
‘স্বামী’ শব্দটা নিধির কানকে আলোড়িত করে তুলল। নিধি ধীরে ধীরে চোখ খুলে দেখলো। অরূপ সামনে বসে আছে। গায়ে সাদা রঙের এক রঙা কুর্তা। কুর্তার বুকের কাছের বোতাম খুলে রাখা, লম্বা হাতা গুটিয়ে রাখা। মুখে একটা মিষ্টি হাসি ঝুলানো। নিধি মনেমনে সদ্য স্বামীর এমন আকর্ষণীয় রূপটার প্রেমে একদম হঠাৎ করে পড়ে গেলো, সেটা নিধি নিজে বুঝতেও পারল না। 
অরূপ থুতনি থেকে হাত সরালো। মোবাইলে ঘড়ি দেখে নিয়ে বললো-‘চেঞ্জ করে ফেলুন, গরম আজকাল বেড়েছে খুব।’
নিধি শুনলো! গায়ের ভারী বেনারসি বদলানো হয়নি। আশা চুলের ক্লিপ খুলে চুল সুন্দর করে আঁচড়ে দিয়েছে। মুখের মেকআপও তুলে দিয়েছে। এখন শুধু একটু গোসল করে, গায়ের শাড়ি বদলানো উচিত। নিধি বাথরুমে যাবে। লাগেজ খুঁজে পাচ্ছে না। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে শুধু। অরূপ বিছানায় বসে নিধিকে দেখছিল। নিধি কী খুঁজছে বুঝতে পেরে ও বললো-‘আপনার শাড়ি, অন্যান্য জিনিস আমাদের আলমারিতে তুলে রেখে গেছেন ভাবি।’
‘আমাদের আলমারি’ নিধি চোখ দুটো বন্ধ করে লম্বা এক নিঃশ্বাস টানল! লোকটা কথায় কথায় নিধিকে এতো হক, এত অধিকার কেন দিচ্ছে? অভ্যাস নষ্ট হয়ে যাবে নিধির। ওভাবে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থেকে নিধি আলমারি থেকে শাড়ি নিয়ে বাথরুমে গেলো। 
নিধি খানিক পর বের হলো! অরূপ তখনও সেভাবেই বসে আছে। নিধি বের হতেই, ওর দিকে চোখ তুললো অরূপ। চুলে গামছা বেঁধে রাখা। সদ্য গোসল করে আসায় ভীষণ সতেজ দেখাচ্ছে ওকে। অরূপ একটু কেশে সোজা হয়ে বসলো। কখনো কোনো মেয়েকে সরাসরি এভাবে দেখে অভ্যস্ত নয় অরুপ। ওর ভীষণ নার্ভাস লাগছে। 
নিধি ফ্রেশ হয়ে অরূপের দিকে কোণা চোখে চেয়ে বিছানার এক কোণে চুপটি করে বসলো। অরূপ অনেকটা দূরে বসে। দুজনেই চুপচাপ। অরূপ খানিক পর এগিয়ে এসে নিধির কাছ ঘেঁষে বসলো। নিধি কেঁপে উঠলো, অস্বস্থি লাগলেও সরলো না জায়গা থেকে। কাঠ হয়ে বসে রইলো। অরূপ নিধির দিকে মাথা তুলে একবার তাকালো। তারপর একটু একটু করে ওর আর রুক্ষ হাতটা দিয়ে নিধির এক হাত আলতো করে ধরলো। নিধি জোরে শ্বাস টানলো। ওর ভীষণ ভয় লাগছে। এমন মূহুর্ত এর আগেও ওর জীবনে এসেছে! সরচরাচর যা হয়, বিয়ের প্রথম রাতেই অচেনা স্বামীকে নিজের সবকিছুই সপে দিতে হয়েছিল। আজ কি হবে কে জানে? নিধি অবশ্য সময় চাইবেও না। স্বামী হয় ওর, হক আছে অরূপের। নিধি ন্যাকামো করে স্বামীকে ফিরিয়ে দিবে না। পুরুষ মানেই তো এই রাতে অস্থির হয়ে স্ত্রীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া। এটাই নিধি জানে। 
কিন্তু বোকা নিধি, এটা জানে না! সব পুরুষ সমান নয়। যেমন অরূপ! অরূপ হাতটা ধরে কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে থাকলো। তারপর একসময় বললো-‘নিধি, আমাকে একটু চিমটি কাটবেন?’
নিধি অবাক হয়ে তাকাল! ওর চোখ দুটো গোলগাল হয়ে গেছে। অরূপ আবারো বললো-‘প্লিজ।’
নিধি কাঁচুমাঁচু হয়ে অরূপের লোমশ বাম হাতে চিমটি কাটল। অরূপ ‘উঁহ’ করে উঠলো। চিমটি দেওয়া স্থান মালিশ করলো চোখ-মুখ কুঁচকে। নিধি ওই লোকের ওমন বোকামো দেখে হাসি আসলেও, গিলে ফেললো।
অরূপ থামলো, নিধির হাতটা অধিকারবোধ দেখিয়ে আরো শক্ত করে চেপে ধরে নিচু আওয়াজে বললো-‘ফাইনালি, আপনি আমার স্বপ্ন নন! আপনি আমার হাকিকাত, আমার নিধি।’
নিধি থমকে তাকাল। এতোকিছু নিধি আশা করেনি। ওর সমস্ত ভয়টাকে এ পুরুষ ধুমধাম ফাইট করে হারিয়ে ফেলছে। নিধির জড়তাগুলো শুষে নিচ্ছে। নিধির মত অভাগারা এতকিছু পায়না, নিধি কিভাবে পেয়ে গেলো? এতবছরের নিঃস্ব নিধি নিজের প্রাপ্তির খাতাটার হিসেব কষে আচমকা কেঁদে উঠল। নিধির কাঁন্নায় ভ্যাব্যাচ্যাকা খেয়ে গেলো অরূপ। ও শশব্যস্ত হয়ে আগলে নিল স্ত্রীকে। অধৈর্য্য গলায় বারবার জিজ্ঞেস করলো-‘কী হয়েছে নিধি? কাঁদছেন কোন? অ্যাই নিধি?আরে!’
নিধি কথা বলছে না। ও কেঁদে কেঁদে আচমকা অরূপের ডান বাহু চেপে ধরে ডান কাঁধে মুখ গুঁজে দিয়ে ফুঁপিয়ে উইহে, বলতে লাগল-
‘আমি এত সুখ ডিজার্ভ করিনা, অরূপ! আপনি কেন এগুলোর লোভ আমাকে দেখাচ্ছেন? আমি করি না, করিনা ডিজার্ভ!’
থমকে গেল অরূপ। ভালোবাসার মানুষর প্রথম এতটা ঘনিষ্ঠ স্পর্শে ওর রূহ-মন কেঁপে উঠলো। বিয়ের আগে অরূপ ভাবত, নিধি মেয়েটা বড্ড শক্ত, কঠোর! অথচ এখন জানতে পেল, মেয়েটা ভীষণ নাজুক! বিয়ে না হলে তো অরূপের এই সত্যটা অজানাই থেকে যেত। 
অরূপ নিজের অনুভূতি শক্ত করে চেপে, নিধির পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম গলায় বুঝালো- ‘আপনি ডিজার্ভ করেন নিধি। এই সুখগুলো আমরা দুজনেই ডিজার্ভ করি।’
নিধি ফুপাচ্ছে! অরূপ নরম কণ্ঠে নিধির ঘন ভিজে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল-‘কাঁদে না আর। হুহ, শান্ত! স্টপ ক্রাইং, নিধি।’
নিধি কেঁদেই গেল শুধু। অরূপও বাধ্য এবং যত্নবান স্বামীর ন্যায় নিজের স্ত্রীকে পুরোটা রাত আগলে ধরে রাখলো! মেয়েটা ভালোবাসা পায়নি কখনো। কেউ ওকে এতটা ভালোবাসছছে, এটুকু যেন সহ্য হচ্ছে না ওর। খুশি, উত্তেজনায় কান্না আসছে শুধু! স্বামী অরুপকে বড্ড বেগ পেতে হলো নিজের আবেগি, সদ্য পরিণত হওয়া ছিচকাদুনে স্ত্রীকে সামলানো। শেষ রাতের দিকে নিধি নিজে থেকেই অরূপের বুকে মুখ লুকিয়ে ক্লান্ত দু চোখ বুজে ফেললো! অরূপও হাসিখুশি ভাবে আগলে নিলো স্ত্রীকে। 
_______________
বাড়ির বড় বউ হিসেবে আজ সন্ধ্যা থেকে অনেক কাজ ছিলো আশার। সকল কাজ শেষ করে রুমে ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা বেজে গেলো। ক্লান্ত আশা রুমে ঢুকতেই চমকে গেলো। পুরো রুমটা বাসর ঘরের মতো করে সাজানো। অরুপের রুমটা যেভাবে আশা নিজের মনমতো সাজিয়েছে, সেভাবেই ওদের নিজেদের বেডরুমটাও সাজানো। আশার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। ও ঠোঁটে মুচকি হাসি টেনে দরজায় সিটকিনি তুলে ধীর পায়ে এগুতে এগুতে ডাকলো-‘এই যে ডাক্তার, আপনি রুমে?নাকি বারান্দায়?’
জবাব এলো না। আশা ঠোঁটে সেভাবেই হাসি ঝুলিয়ে বারান্দায় গেল। বারান্দায় পা রাখতেই অ্যাশার কোমর আগলে ধরলো কেউ। আশা চমকে উঠলো। ও জানে, এই হাতদুটো কার! ও অবলীলায় নিজেকে হারিয়ে দেওয়ার সুযোগ দিলো, চুপ করে দাঁড়িয়ে গেল সেখানেই। ধীরে ধীরে ওই হাত-দুটো আশার কোমর ছুঁয়ে শাড়ি সরিয়ে পেট স্পর্শ করেছে। আবেশে, অনুরাগে আশার চোখ বুজে আসছে। কোমল কিছু মারাত্মক আবেগে ডুবন্ত আশা, ওর কানে একজন ভীষণ সফ্ট কণ্ঠে ফিসফিসালো-‘উড ই্যয়ু ওয়ানা ডাই টুনাইট, মিসেস শেখ?’
আশা হেসে ফেলল। পাগলামির সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে লোকটা। আশা লাই দেখালো, অনিরুপের গালে আলগোছে মাথাটা ঠেকিয়ে দিয়ে বললো-‘ইয়াহ, ইফ হি ওয়ান্টস্।’
অনিরূপও হেসে ফেলল! ও আশাকে একহাতে সেভাবেই জড়িয়ে রেখে অপরহাতে গোলাপের চারা থেকে একটা গোলাপ ছিঁড়লো। গোলাপটা আশার পুরো মুখে একটু একটু করে ছুঁয়ে দিতে দিতে নেশালো কণ্ঠে বলতে লাগল-‘যদি সে তোমার গা এভাবে, ঠিক এভাবে ছুঁয়ে যায়, তবুও সায় আছে?’
আশা কাঁপছে। ওর মুখে সুড়সুড়ি লাগছে। পেটে বাটারফ্লাই উড়াউড়ি করছে খুব।স্বামীর ছোয়ায় দিশেহারা আশা বড়বড় নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো-‘হু।’
অনিরুপ হাসলো। গোলাপটা এবার আশার কোমরে দিতে দিতে বললো-‘যদি সে এভাবে তোমাকে নিজের সঙ্গে সাপের মতো প্যাঁচিয়ে ফেলতে চায়, তবুও সায় আছে?’
আশা কথাই বলতে পারছে না। ওর সারা গা থরথর করে কাঁপছে! সহ্য হচ্ছে না আর এই মিস্টি যন্ত্রণা। ও শুধু অস্ফুট স্বরে এটুকু বললো-‘হু।’
অনিরূপ হাসলো। শেষ ট্রিকসটা কাজে লাগালো ও এবার। গোলাপটা আশার উন্মুক্ত পেটে ছুঁয়ে, চেপে ধরে শেষবারের মতো বললো-‘আর যদি সে তোমার এই নরম পেটে নিজের একটা অংশ রাখতে চায়, তবুও সায় আছে?’
আশা আবেগে ডুবে আছে আকণ্ঠ। অনিরূপের এসব ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে বলা কথা ওর মাথায় নেই। ও শুধু স্বামীর স্পর্শ মন দিয়ে উপভোগ করছে। মাথায় আর কিচ্ছুটি নেই, শুধু রয়ে গেছে স্বামী অনিরূপের করা মারাত্মক একেকটা ছোঁয়া! ও আর নিজেকে সামলাতে না পেরে পেছন ঘুরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল অনিরূপকে। নিচু গলায় বলতে লাগল-‘হু,আছে, আছে।’
অনিরূপ হাসল। গোলাপটা আশার কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে, নিজেও স্ত্রীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যাক মানানো গেছে বউকে। এখন আর বউটা অনিরূপকে দোষ দিতে পারবে না। সম্মতি ও নিজেই দিয়েছে। অনিরূপকে বললে, সরাসরি বলে দিবে অনিরূপ। 
অনিরূপ হালকা হেসে বউকে পাঁজকোলে তুলে নিলো। আশা দুহাতে গলা জড়িয়ে রেখে, অনিরুপের কাঁধে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে রেখেছে। অনিরুপ আশাকে নিয়ে রুমে ঢুকলো। আশার মাথাটায় বালিশ ঠেকতেই আশা অনিরূপের গলা ছেড়ে টলমল চোখে স্বামীর দিকে তাকালো। অনিরুপ আশার কপালে চুমু খেল। আশা আবেশে, সুখে চোখ বুজে উলভোগ করলো। অনিরুপ আশার শাড়ির আঁচলে হাত দিলো। সঙ্গেসঙ্গে আশা লজ্জায় কুকড়ে গেলো একদম। খামচে ধরলো অনিরূপের অসভ্য হাতটা! অনিরূপ লক্ষ্য করে ফিচেল হাসলো। বউকে পুরোপুরি লজ্জায় ফেলল না আর, হাত সরিয়ে ফেললো। আশার চুলগুলো গুছিয়ে দিল ভীষণ যত্নে! অতঃপর আশার বুজে থাকা চোখের দিকে চেয়ে, গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল। আশা সুখের আতিশয্যে দুহাতে আকড়ে ধরলো অনিরুপের বলিষ্ট পিঠ। 
___________
মধ্যরাত এখন। আশা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে অনিরুপের বুকে। শুধু ঘুম নেই অনিরূপের নীলাভ চোখ-দুটোতে। আশার ঘুমন্ত মুখটার দিকে চেয়ে অনিরূপ হালকা হাসলো! আজকের রাতটা অনিরুপের জন্যে অত্যন্ত বিশেষ একটা রাত ছিলো! 
একটা বাচ্চা! একটা বাচ্চা হলে, আশা মন দিয়ে স্বামীর ঘর করবে। কেউ আশাকে উষ্কাতে পারবে না, ভরকাতে পারবে না। আশা সারাজীবনের মতো অনিরুপের কাছে বাধা পড়বে।
আজকে অমিতের রিলিজ ডেইট ছিলো। অমিত হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ পাওয়ার পর থেকেই ভীষণ উড়ছে। হুমকি-ধমকি দিচ্ছে অনিরূপকে। অনিরুপের এসব দেখে মাথা ঠিক নেই একদম। ওই অমিতের বাচ্চারে জানে মেরে ফেললে বেশি ভালো হতো। শুধুশুধু বাঁচিয়ে রেখে উটকো ঝামেলা বাড়িয়ে রেখেছে।
আশাকে সে সবেই পেলো, এখনো ওর মধ্যে আশাকে হারানোর আতঙ্ক এখনো রয়ে গেছো। শকুনেরা ওর সংসারের পিছে হাত ধুয়ে পড়ে গেছে রীতিমত। অনিরূপকে নিজের সংসার বাচানো লাগবে। ও নিজেই নিজের উপর মহা বিরক্ত! কাউকে নিজের জীবনে এতটা মূল্য দিবে না , দিবে না ভাবা অনিরুপ আজ বউ এর প্রেমে রীতিমত পাগল পাগল বোধ করে। ও ভাবেনি, কোন মেয়ে, কেউ ওকে এতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কখনো। কিন্তু পেরেছে, আশা পেরেছে, ওর স্ত্রী! 
অনিরূপ আবারো নিজের বুকের মধ্যে পরে থাকা আশাকে দেখে, ওর ঠোঁটে ক্রূর হাসি ফুটে উঠলো! ও ভেবে নিয়েছে-ওর নিজের সংসার বাঁচাতে যদি নিজেকে সর্বনিম্ন স্তরে নামাতে হয়, দ্বিধা করবে না। অনিরুপ জানে, ওর অবনতি কতটা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ও নিরুপায়! 
এই প্রেমে পরা ওর অনিচ্ছাকৃত! ও চায়নি, তবুও বেহায়া মন প্রেমে পরে গেছে। এখন বেহায়া মনকে ধরে বেঁধে না রেখে অন্য উপায় অবলম্বন করতে হবে। 
অনিরূপ আবারও বউয়ের মুখের দিকে তাকালো। আশার কপালে দীর্ঘ চুমু খেয়ে বড্ড আদুরে ভঙ্গিতে ওকে বুকে আগলে ধরো! আহ্, শান্তি লাগছে ভীষণ! 
#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৬+২৭ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন