#অ্যারেঞ্জ_ম্যারেজ
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_৪
শুভ্র গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। চাবি পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে কলিং বেল চাপলো তুলিদের বাসার। বেশ অনেকসময় বেল দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো শুভ্র। ঘরে কেউ নেই। শুধু তুলি আর জোবায়ের। জোবায়ের টিভিতে কার্টুন দেখছে। তুলি কলেজ থেকে এসে ঘুমাচ্ছে। দরজায় এতবার কলিং বেল বাজতে শুনে একসময় তুলি কাঁচা ঘুম থেকে উঠে খোলা চুল খোপা বাঁধতে বাঁধতে এসে দরজা খুলে দিলো। ওপাশে শুভ্রকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তুলি অবাক হলো। শুভ্রর তো এখন বাসায় যাওয়ার কথা? এখানে কেন? তুলির খোপা করা হাত নেমে আসে নিচে। সঙ্গেসঙ্গে গায়ের ওড়না মাথায় তুলে নিয়ে অপ্রস্তুত কণ্ঠে সালাম দিয়ে বলল,
‘স্যার, ভেতরে আসুন।’
শুভ্র ভেতরে একবার উকি দিয়ে দেখলো। ঘরে তেমন সাড়া-শব্দ নেই। শুধু টিভি দেখছে বসার ঘর থেকে টিভির আওয়াজ আসছে, জোবায়ের সোফায় বসা। শুভ্র ঘরে ঢুকলো না। বাইরে থেকেই বলল,
‘ঘরে কেউ নেই?’
তুলি জবাব দিলো,
‘আম্মু ফার্মেসিতে গেছে। জবুর জন্যে মেডিসিন আনতে। আর কাজের মেয়ে নিচে গেছে কী একটা কাজে।’
শুভ্র ঘরে কেউ নেই শুনে ভেতরে ঢুকতে চাইলো না। তবে ঘরের বাইরে থেকে শুভ্র এভাবে ফেরত যাবে শুনে তুলি জোরপূর্বক শুভ্রকে সোফায় এনে বসালো। শুভ্র জোবায়েরের পাশে বসলো। জোবায়ের শুভ্রকে দেখে সোজা রিমোট রেখে শুভ্রর কাছে ঘেঁষে বসল। শুভ্র এমন কাণ্ডে হেসে উঠলো। জোবায়েরকেকোলে তুলে নিজের হাঁটুর উপর বসালো।শুভ্র কোলে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘কেমন আছে আমাদের জবু ব্যাটা?ভালো না মন্দ?’
জোবায়ের শুভ্রর চুল নাড়তে নাড়তে হেসে হেসে জবাব দিলো,
‘বিন্দাস আছি দুলাভাই।’
প্রথম কারো মুখে ‘দুলাভাই’ সম্বোধন শুনে শুভ্র কেশে উঠলো। আড়চোখে তুলিরো দিকে তাকালে, পাশে ঘুমঘুম চোখে শুভ্রদের দিকে তাকিয়ে থাকা তুলিও শুভ্রর দিকে চাইল। দুজনের চোখাচোখি হতেই তুলি অপ্রস্তুত হয়ে উঠে রান্নাঘরে চলে গেলো। শুভ্র এসেছে, মা ফেরার আগে তাকে কিছু একটা দেওয়া উচিত। তুলি প্রথমে শরবত বানাতে বসলো।
শুভ্র নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো,
‘ওরে বাবা। বিন্দাস আছো? এই ওয়ার্ড শিখলে কোথা থেকে?’
জোবায়ের মাথা নেড়ে নেড়ে উত্তর দিলো,
‘দেবের ছবি থেকে শিখেছি দুলাভাই। তুমি দেবের ছবি দেখেছ? পাগলু, পরাণ যায় জ্বলিয়া রে, এসব দেখেছ?’
শুভ্র হালকা হাসল। আজকালের বাচ্চা এটুকু বয়সে মুভিজ দেখছে। প্রেমে গদগদ মুভি তাদের ভালো লাগছে। এদের ভবিষ্যতে কী যে হবে। শুভ্র উত্তর দিলো,
‘হ্যাঁ কয়েকটা আগে দেখেছি, স্কুলে থাকতে।’
‘তুমি স্কুলে ছিলে? এতবড় মানুষ স্কুলে পড়ে?’
শুভ্র জোবায়েরের বাচ্চামো কথায় হেসে ফেললো,
‘স্কুলে আমি ছোটবেলায় পড়েছি। এখন তো আমি বড় হয়ে গেছি। এখন আমি আর স্কুল পড়ি না।’
জোবায়েরের মাথায় আপাতত এসব ঢুকছে না। দূর থেকে তুলির চোখ রাঙানো দেখে সে আপাতত নিশ্চুপ হয়ে গেছে। জোবায়ের এখুনি এত এত দেবের ছবি দেখেছে শুনলে তুলি জোবায়েরকে আস্ত আস্ত চিবিয়ে খাবে। টিভির ডিশের লাইন কেটে দিবে আব্বুকে বলে। তাই জোবায়ের আর কথা বাড়ালো না। তুলি শরবত এনে শুভ্রর দিকে এগিয়ে দিলো। শুভ্র শরবত হাতে নিলো। খেতে খেতে প্রশ্ন করলো,
‘আন্টি কখন আসবেন?’
তুলি শুভ্রর মুখোমুখি সোফায় বসা। তুলি উত্তর দিলো,
‘ফার্মেসি কাছেই। এখনি চলে আসার কথা।’
বলতে বলতে কলিং বেল বাজল। তুলি উঠে দরজা খুলে দিলো। সোফায় বসা শুভ্রকে দেখে ইয়াসমিন অবাক হয়েছেন। তুলিকে ফিসফিস করে বললেন,
‘শুভ্র কখন এলো?’
তুলি জবাব দিলো,
‘কিছুক্ষণ আগে।’
‘তুই জানতি?’
তুলি মায়ের এমন কথায় বিরক্ত হলো। তাদের সম্পর্ক কী এমন জানিয়ে বাড়িতে আসার মতো? তারা কী একটা প্রেমের সম্পর্কে আছে? মা-ও না। মাঝেমধ্যে অদ্ভুত কথা বলে। তুলি বিরক্ত হয়ে জবাব দিলো,
‘তোমার কী মনে হয়? স্যার আমাকে জানিয়ে আসতে পারেন?’
ইয়াসমিনের হুশ ফিরলো এবার। শুভ্রর দিকে চেয়ে বললেন,
‘ওহ, তুই কিভাবে জানবি। শুভ্র তো তোর সঙ্গে তেমন কথাই বলে না। আচ্ছা, শুভ্রর সঙ্গে বসি গিয়ে। চা বসিয়েছিস?’
‘হ্যাঁ, চা পাতা দিব এখন।’
‘আচ্ছা বানিয়ে নিয়ে আয়। তিনকাপ আনিস। তুই, আমি আর শুভ্র। মজা করে আনিস। শুভ্রর সামনে তোর চা খুব ভালো হয়, এমন প্রমাণ রাখতে হবে। দ্রুত যা।’
ইয়াসমিন কথাটা বলে বোরকা না খুলেই শুভ্রর পাশে গিয়ে বসেন। শুভ্র ইয়াসমিনকে দেখে সোফা থেকে উঠে সালাম করে। ইয়াসমিন শুভ্রর এমন নম্র ব্যবহারেই খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠেন। হাত বাড়িয়ে শুভ্রকে বসতে বললেন। শুভ্র ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলো, ইয়াসমিন উত্তর দিলেন। একপর্যায়ে চা এলো। তুলি চা সার্ভ করল সবাইকে। শুভ্র চা পছন্দ করে খুব। দিনে তিনবেলা চা ম্যান্ডেটরি শুভ্রর জন্যে। এর বেশি হলেও মন্দ হয়না। চায়ের বেলায় শুভ্র খুব চুজি। চায়ে ডুবানো চিনি বা দুধ, লিকার কোনোটাই পছন্দ না। চায়ে তিন উপাদানের পরিমাণ এর একটা রাশিও থাকতে হয়। শুভ্র তখনই চা খেতে পারে। তবে আজকের চা-টাও শুভ্রর বেশ লাগলো। শুভ্রর গা চাঙ্গা হয়েছে। মেডিকেল থেকে আসার পর এই একটা চায়ের খুব দরকার ছিলো। শুভ্রর চা পছব্দ হয়েছে, সেটা তুলি বুঝতে পারলো। তুলি চা খেতে খেতে শুভ্রর দিকে বারবার তাকাচ্ছে। শুভ্র একবার তাকালো, সঙ্গেসঙ্গে তুলি চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ইয়াসমিন শুভ্রকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করছেন। শুভ্র বেশ সুন্দর উত্তর দিচ্ছে। শুভ্রকে একসময় ইয়াসমিন জিজ্ঞেস করলেন,
‘শুভ্র, তুলি পড়া পারে তো ঠিকঠাক মেডিকেলে? না পারলে কিম্তু ধরে পেটাবে ওকে, ঠিকাছে? আমি তোমায় পারমিশন দিচ্ছি।’
ইয়াসমিনের কথায় শুভ্র মাথা নিচু করে হেসে উঠলো। তুলি মায়ের দিকে বড্ড বিরক্তি নিয়ে তাকাল। মা কাকে কী বলছে? শুভ্র এমনিতেই তুলিকে যেমনে পারে বকে। সেখানে তাকে তুলিকে পে টানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। অসহ্য! তুলি মায়ের দিকে রাগ রাগ চোখে তাকাল। ইয়াসমিন মেয়ের তাকানো দেখে শব্দ করে হেসে ফেললেন। শুভ্র চা শেষ করে টেবিলের উপর রাখল। এবার কথা তুললো,
‘আন্টি, আম্মু একটু শপিং-এ যাবেন আজ। তুলিকে নিয়ে যেতে চাইছেন। যদি আপনার অনুমতি থাকে, তাহলে আমি তুলিকে নিয়ে যাবো।’
তুলি অবাক হয়ে শুভ্রর দিকে তাকালো। শুভ্রো স্যার এজন্যে এসেছেন তাহলে? ইয়াসমিন বললেন,
‘আফরোজা যেতে বলেছে, আমি আর এতে কী বলব? নিয়ে যাও। রাত হওয়ার আগেই দিয়ে যেও আবার। আফরোজা আর তুমি নাহয় আজ রাতে আমাদের বাসায় খেয়ে নাও, শুভ্র।’
শুভ্র হালকা স্বরে বলল,
‘অন্যদিন এসে খেয়ে যাব আন্টি। আজ না। রাতের দিকে একটু কাজ আছে। আমি তুলিকে বাসায় পৌঁছে দিবো, চিন্তা করবেন না।’
তুলিকে ইয়াসমিন রেডি হতে বললেন। তুলি রুমে গেলো। ইয়াসমিন খানিক পর শুভ্রকে জোবায়েরের পাশে বসিয়ে রুমে এলেন। তুলি তখন কাপড় বের করছে। ইয়াসমিন এসে গদগদ হয়ে বললেন,
‘এই তুলি, শাড়ি পড়িস না কেন? শুভ্রর ভালো লাগবে।’
তুলি একটা ভালো দেখে সালোয়ার কামিজ বের করতে করতে বললো,
‘তুমি পাগল হয়ে গেছো আম্মু? শুভ্র স্যারের সামনে আমি শাড়ি পড়ে হাঁটব? অসম্ভব।’
ইয়াসমিন শুনলেন না। জোরপূর্বক নিজের একটা শাড়ি এনে তুলিকে পরিয়ে দিলেন।তুলি প্রতিমার মতো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেই নিজেকে দেখে লজ্জা পাচ্ছে। এই অবস্থায় শুভ্রর সামনে দাড়াবে কিভাবে? তুলি লজ্জায় হাপিত্যেশ করে উঠল। হইহই করে বললো,
‘আম্মু আমার অদ্ভুদ লাগছে। শাড়ি পরব না আমি। খুলে ফেলি প্লিজ।’
ইয়াসমিন এ কথা শুনে একটা ভয়ানক ধমক দিলেন তুলিকে। তুলি চুপ হয়ে গেল একদম। ইয়াসমিন তুলির পার্সে কিছু টাকা রেখে পার্স তুলিকে দিলেন। তারপর বসার ঘরে তুলিকে নিয়ে চললেন। শুভ্র বসে আছে সেখানে। শাড়ি পড়ে শুভ্রর সামনে দাঁড়ালে তুলি লজ্জায় মরে যাবে। বুকত কাঁপছে তুলির। কাপুনিতে সোজা হয়ে হাঁটতে পারছে না। কেমন যেন ঘোর ঘোর লাগছে নিজের মধ্যে।
#চলবে
---
#অ্যারেঞ্জ_ম্যারেজ
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_৫
‘শুভ্র, তুলি তৈরি।’
ইয়াসমিনের কথায় জোবায়েরকে কোলে রেখে শুভ্র একটু পাশ ফিরে সামনে তাকালো। শাড়ি পড়া তুলি লজ্জায় অবনত হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তুলির গায়ে শাড়িটা খুব সুন্দর করে জড়ানো। শুভ্র প্রথম দফায় থমকে গেলো। শাড়ি পরিহিত তুলি শুভ্রর কাছে অন্যরকম লাগে। সব মেয়েদেরকেই শাড়ি পরলে সুন্দর লাগে। তাই হয়তো তুলিকেও শুভ্রর কাছে সুন্দর মনে হচ্ছে। শুভ্র ভাবলো। পরপরই মাথা ঝাড়া দিয়ে জোবায়েরকে কোলে তুলে উঠে দাঁড়ালো। শুভ্র নার্ভাস। শাড়ি পরা তুলি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ভাবলেই লজ্জা লাগছে শুভ্রর। তুলির দিকে সেভাবে তাকাতেই পারছে না শুভ্র। বারবার চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। শুভ্র সামলে বললো,
‘আমাদের এখন যাওয়া উচিত। আন্টি আপনিও চলেন আমাদের সাথে নাহয়। ভালো লাগবে আম্মুর।’
তুলি সঙ্গেসঙ্গে মায়ের হাত চেপে ধরলো। ইশারায় কাকুতি মিনতি করে ইয়াসমিনকে সঙ্গে যেতে বললো তাদের। ইয়াসমিন অগোচরে মেয়ের হাতে চেপে ধরে ভরসা দিলেন। তারপর শুভ্রকে বললেন,
‘না বাবা তোমরা যাও। আমি পরে একদিন যাবো তোমার মায়ের সঙ্গে।’
শুভ্র আর জোড়াজোরি করলো না। বুঝতে পারল, এখন ইয়াসমিনকে হাজারবার বললেও তিনি তাদের সঙ্গে যাবেন না। মেয়ে আর মেয়ের হবু জামাইকে প্রাইভেসি দেওয়া দরকার। শুভ্র হাসলো মনেমনে। ওদের আবার প্রাইভেসি। একজন আরেকজনের সঙ্গে দেখা হলে ভালো করে কথাটাই বলতে পারে না। টুকটাক যা কথা হয়, সেসবের জন্যে প্রাইভেসির দরকার নেই কোনো। শুভ্র তুলিকে বললো,
‘চলো তাহলে। আন্টি যাই!’
তুলি সামনে এগুলো। শুভ্র জোবায়েরের গালে চুমু খেয়ে কোল থেকে নামাতে চাইলে জোবায়ের নামে না। শক্ত করে শুভ্রর গলা জড়িয়ে ধরে হঠাৎ-ই বায়না করে বসে,
‘দুলাভাই আমিও যাবো তোমার আর আপুর সঙ্গে। নিয়ে যাও না আমায়।’
আবারও শুভ্রর সামনে ‘দুলাভাই’ কথাটা শুনে থমকে গেলো তুলি। শাড়ির কুচি বেজে আবারও পড়ে যেতে নিলে শুভ্র দ্রুত অপরহাতে ধরে ফেলল ওকে। তুলি সঙ্গেসঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। তারপর রাগ নিয়ে তাকাল জোবায়েরের দিকে। বারবার এই ছেলে শুভ্রকে এভাবে ডাকছে কেন? একবার হাতের কাছে পেলে তুলি ধরে দিবে একটা। বোনের গরম গরম চোখ দেখে জোবায়ের ভয় পেয়ে লেপ্টে গেলো শুভ্রর গায়ের সঙ্গে। সে বুঝতে পারছে না, হুটহাট তার আপু এত রেগে যাচ্ছে কেনো? সে কী বারবার ভুল করছে কিছু? শুভ্র ভাই-বোনের নিরব যুদ্ধ দেখে হালকা হাসলো। তারপর তুলির উদ্দেশ্যে হালকা স্বরে বলল,
‘থাক, বাচ্চা মানুষ। এতকিছু বুঝে ডাকেনি। ওর উপর চোখ রাঙিও না।’
তুলি শুভ্রর কথায় লজ্জা পেয়ে গেলো। শুভ্রর সামনে এমন একটা কারণে রেগে যাওয়া তুলির ঠিক হয়নি। তুলি নিজেকে সামলালো। শুভ্র জোবায়েরের কথা শুনে ইয়াসমিনকে বলল,
‘ওকেও নিয়ে যাই আন্টি। ঘুরে আসুক, ভালো লাগবে।’
ইয়াসমিন সঙ্গেসঙ্গে মানা করলেন। বললেন,
‘না না। ওর হোমওয়ার্ক আছে। তোমরা যাও শুভ্র।’
জোবায়ের মুখ কালো করে ফেললো। শুভ্রর দিকে করুণ চোখে তাকালো। শুভ্র বললো,
‘সকালে হোমওয়ার্ক করে ফেলবে। তাইনা জোবায়ের?’
জোবায়ের দ্রুত দুদিকে মাথা নাড়াল। ইয়াসমিন আর কী বলবেন। তুলির দিকে তাকালেন। তুলিও তাকালো তখন। হয়তো তুলিও চাইছে জোবায়ের যাক ওদের সঙ্গে। মেয়েটা এখনি এত ঘামছে। শুভ্রর সঙ্গে আর কয়েকটা মিনিট থাকলে এখানেই ঢলে পড়বে। ইয়াসমিন তাই সম্মতি দিলেন।
বেরিয়ে যাবার সময় ইয়াসমিন তুলির কানেকানে বললেন,
‘তোর পার্সে কিছু টাকা আছে। এটা দিয়ে শুভ্রকে গিফট কিনে দিবি কিছু। ছেলেরা যা পছন্দ করে তেমন কিছু কিনে দিস।’
___________________________
নিচে নামলে, শুভ্র চলে যায় পার্কিং থেকে গাড়ি বের করতে। জোবায়ের আর তুলি একা গ্যারেজে দাঁড়িয়ে আছে। একা পেয়ে তুলি এবার জোবায়েরের কান টেনে ধরলো। জোবায়ের রীতিমত ব্যথায় কুকিয়ে উঠল। বারবার বললো,
‘কান ছাড়ো আপু, ব্যথা লাগতেসে তো। আপু-‘
তুলি কান ছাড়লো। তারপর রাগ দেখিয়ে বললো,
‘উনাকে বারবার দুলাভাই ডাকছিস কেন? মা ই র দিবো তোরে? আরেকবার যেন আমার সামনে এই নামে না ডাকিস।’
জোবায়ের কান চেপে ধরে উপরে মাথা তুলে তুলির দিকে তাকালো। বললো,
‘দুলাভাইকে তাহলে কী ডাকব আপু?’
তুলি সঙ্গেসঙ্গে জবাব দিলো,
‘ভাইয়া বলে ডাকবি।’
জোবায়ের মাথা নাড়লো। শুভ্র গাড়ি নিয়ে আসলে তুলি শেষবারের মতো জোবায়েরকে চোখ দিয়ে শাসালো। যেন আরেকবার জোবায়ের দুলাভাই বলে ডাকলে তার গ র্দা ন তুলি এসপার ওসপার করে ফেলবে। জোবায়ের পেছনের সিটে বসল। তাকে টেনেও সামনে বসানো যায়নি। তাই না চাইতেও তুলি শুভ্রর পাশের সিটে বসলো।
গাড়ি চলল সামনে। জোবায়ের এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে শুভ্রকে। শুভ্র উত্তর দিচ্ছে। তুলি এখানে নীরব। জ্যাম লাগার পর, জোবায়ের বিরক্ত হয়ে গেলো বসে থাকতে থাকতে। শুভ্রকে বললো,
‘দু- না। ভাইয়া তোমার মোবাইলে গেইম আছে? দিবা আমাকে মোবাইলটা?ভালো লাগতেসে না আমার।’
শুভ্র জোবায়েরের মুখ দুলাভাই না শুনে ভাইয়া ডাক শুনে তুলির দিকে তাকালো। তুলিও তাকাল তখন। শুভ্র দেখছে তুলিকে,সেটা দেখে তুলি মুখ লুকিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে ফেললো।তুলি জানে শুভ্রর মনে এখন কী চলছে। শুভ্র মাথা নিচু করে হালকা হাসলো। তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে লক খুলে জোবায়েরকে দিয়ে দিলো। জোবায়ের গেইম খেলছে। জ্যাম ততক্ষণে ছেড়েও দিয়েছে। শুভ্র একফাঁকে তুলিকে বললো,
‘ওকে ভাইয়া ডাকার জন্যে ফোর্স করলে কেন? বাচ্চা মানুষ। ভালোবেসে ডেকেছিল আমাকে।’
তুলি শাড়ির আঁচল খুটতে খুটতে বললো,
‘বিয়ের আগে এত দুলাভাই ডাকা ঠিক না।’
শুভ্র সঙ্গেসঙ্গে জবাব দেয়,
‘বিয়ে তো হচ্ছেই। আগে থেকে তাহলে ডাকলে সমস্যা কি?’
নিজের প্রশ্নে নিজেই অবাক হয়ে গেলো শুভ্র। সে কবে থেকে এমন প্রশ্ন করা শুরু করলো? তুলিও অবাক চোখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। তুলি তাকিয়ে আছে দেখে শুভ্র আর তুলির দিকে তাকাল না। অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলো।
_____________________
মার্কেটে শুভ্রর পুরোটাসময় জোবায়েরকে কোলে নিয়ে হাঁটতে হলো।মেয়েদের সঙ্গে মার্কেটে আসার ফলাফল জোবায়ের জানে না। কিন্তু শুভ্র জানে। মায়ের সঙ্গে মমার্কেটে এলেই শুভ্রর পা ব্যথা হয় হেঁটে, আর হাত ব্যথা হয় শপিং ব্যাগের বোঝা বয়ে। তবে আজ তেমন হাঁটতে হচ্ছে না। তুলিই মাকে নিয়ে শপিং করছে। তুলিই ব্যাগ বইছে আজ। শুভ্রর কোলে জোবায়ের থাকায় সে এ কাজ করতে পারেনি। শুভ্র একসময় তুলিদের কাছে এগিয়ে এলো। আফরোজাকে জিজ্ঞেস করল,
‘তোমাদের আর কতক্ষণ লাগবে আম্মু?’
আফরোজা একটা হ্যাঙ্গারে শাড়ি দেখতে দেখতে বললেন,
‘লাগবে আরো কিছুসময়। তুই কী বাসায় চলে যাবি?’
শুভ্র বলল,
‘না।’
তারপর তুলিকে শুভ্র বললো,
‘শোনো, আমি খাবারের দিকটায় আছি। তোমাদের শেষ হলে কল করো।’
তুলি মাথা নাড়লো। শুভ্র জোবায়েরকে কোলে নিয়ে খাবারের দিকে চলে গেলো। আসলে জোবায়ের অনেকক্ষণ ধরে ওদের সঙ্গে ঘুরছে। ক্ষুধা লেগেছে হয়তো তার। তবে বলছে না। তুলি বকবে সেজন্য।
শুভ্র জোবায়েরকে খাবার দিয়ে বসিয়ে রাখলো। নিজে ফোনে দরকারি কাজও সারল এসময়ে। তারপর তুলিরা এলে বেরিয়ে গেলো শপিং মল থেকে।
গাড়িতে উঠে শুভ্র দু প্যাকেট খাবার তুলি আর মায়ের দিকে এগিয়ে দিল। বললো,
‘এখানে চিকেন আর ফ্রেন্স ফ্রাইজ আছে। তুমি আর আম্মু খেয়ে নাও।’
তুলি প্যাকেট হাতে নিলো। প্যাকেট নেবার সময় দুজনের আঙুলে আঙুলে ছোয়া লাগলো। তুলি সঙ্গেসঙ্গে ছিটকে প্যাকেট নিয়ে সরে গেলো। শুভ্রও অপ্রস্তুত হয়ে সোজা হয়ে বসলো। দুজনেই তারপর চুপচাপ। শুভ্র লুকিং গ্লাসে একবার তুলির দিকে তাকালো। খানিক চেয়ে থাকার পর, তুলিও তাকাল লুকিং গ্লাসে। দুজনের চোখে চোখ পরে গেলো। লজ্জায় দুজনেই চোখ সরিয়ে নিলো।
শুভ্র তুলিকে বাসায় পৌঁছে দিলো। বাসার নিচে নেমে শুভ্র দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলো তুলিকে। তুলি ভেতরে যাবার আগে কিছুসময় থামলো। হাতে একটা ছোট্ট ব্যাগ। সেটা শুভ্রর জন্যে কিনেছে তুলি। একটা ঘড়ি।
শুভ্রকে কীভাবে দিবে সেটাই ভাবছে। শুভ্র তুলিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো,
‘বাসায় যাবে না?’
তুলি থামল এবার। অন্যদিকে চেয়ে ছোট্ট করে নিশ্বাস ছেড়ে আবার শুভ্রর দিকে তাকালো। শুভ্র প্রশ্নবোধক চোখে চেয়ে আছে তুলির দিকে। তুলি নিজেকে সামলালো। হাতের ব্যাগটা শুভ্রর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
‘এটা নিন। আপনার জন্যে।’
শুভ্র চোখ বড়বড় করে প্যাকেটের দিকে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর হালকা হেসে প্যাকেট হাতে নিলো। জিজ্ঞেস করলো,
‘তুমি কিনেছ?’
তুলি মাথা নাড়ালো,
‘হু।’
শুভ্র এবার হাসল। প্যাকেটটা আঙ্গুলের ভাজে শক্ত করে চেপে ধরলো।মুখে বললো,
‘থ্যাংক ইউ ফর দিস।’
তুলি মৃদু হাসল উত্তর স্বরূপ। তারপর সালাম করে ভেতরে চলে গেলো। তুলি যেতেই শুভ্র আনমনে প্যাকেটের দিকে চেয়ে থাকলো। তারপর কী মনে করে প্যাকেট খুললো। একটা ঘড়ি আছে প্যাকেটে। বেশ সুন্দর ঘড়ি। শুভ্রর পছন্দ হয়েছে। শুভ্র হেসে ঘড়ি আবার প্যাকেটবন্দি করে গাড়িতে উঠে বসলো।তুলি আড়ালে গেইটের গ্রিলের ফাঁকে চেয়ে রইল শুভ্রর যাওয়ার দিকে। শুভ্র যেতেই,তুলি নিজের ডান হাতটা চোখের সামনে ধরলো। আঙুলে যে জায়গায় শুভ্রর ছোয়া লেগেছে, সেই জায়গা আনমনে দেখে গেলো অনেকক্ষণ। বুকটা এখনও কাপছে। মনে হচ্ছে, শুভ্রর আঙুল এখনো তুলির আঙুল ছুয়ে আছে।হুশ ফেরে তুলির খানিক পর। পরপর অস্বস্তিতে জমে গিয়ে হাত সরিয়ে দ্রুত ভেতরে চলে যায় ও।
#চলবে