ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আমার নীল নেশা

৩য় পর্ব

লেখক: ফাতেমা ফারিয়াল

#তুমি_আমার_নীল_নেশা 💙

#পর্ব_৩
#লেখনিতে_ফাতেমা_ফারিয়াল 
বর্ষামুখর দিন। আকাশজুড়ে নিকষ কালো মেঘের ছুটোছুটি। সকাল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে। জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দে একটানা সুর বাজছে। একটা বিষণ্ণ, শীতল সুর। বাতাসে কাঁপুনি ধরানো ঠাণ্ডা। এই আবহাওয়ায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমোনোর আনন্দই আলাদা। আর সেই আনন্দেই ডুবে ছিল পিহু। চাদর মুড়িয়ে, মাথা গুঁজে, শরীরটাকে গোল করে একেবারে আরামে ঘুমাচ্ছিল সে। কিন্তু সেই আরামের ঘুমে হঠাৎই ব্যাঘাত ঘটাল তার প্রিয়, সহজ-সরল বোন কুহু। কুহু বারবার চাদরটা টেনে সরিয়ে দিচ্ছে, আর নরম স্বরে ডাকছে,
“পিহু… এই পিহু! এবার উঠ না। সেই কখন থেকে ডাকছি তোকে! উঠ না বোন।”
পিহু বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে নিল। চাদরটা আবার নিজের গায়ের উপর টেনে নিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে ঘুম ঘুম স্বরে বলল, 
“উফ আপা… একটু শান্তিতে ঘুমাইতে দে না।”
কুহু এবার একটু জোর দিয়ে বলল,
“এখন তো অনেক বেলা হয়েছে। আর আম্মাও তোকে ডাকছে। এবার উঠ, না হলে পরে আম্মা রেগে যাবে।”
মায়ের নাম শুনতেই পিহুর চোখের পাতা কাঁপল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে ধীরে ধীরে উঠে বসল। চুলগুলো এলোমেলো, চোখ আধখোলা, মুখে বিরক্তির ছাপ। “চ” সূচক শব্দ করে বলল,
“আরেকটু ঘুমাই না… কেন এমন করছিস আপা?”
কুহু এবার সত্যিই একটু বিরক্ত হলো। গম্ভীর স্বরে বলল,
“রাতে তো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছিলি! সবার ঘুম নষ্ট করেছিস। এখন নিজে পরে পরে ঘামাচ্ছিস?”
পিহু মুখ গোমড়া করে আড় চোখে তাকাল বোনের দিকে।
কুহু কোনো জবাব না দিয়ে উঠে পরল। ব্যাগের ভেতর কিছু কাগজপত্র গুছাতে লাগল। তার ভঙ্গিতে একধরনের তাড়াহুড়ো, আর চাপা উদ্যেগ।
“আম্মা তোকে ডাকছে। আগে গিয়ে শুনে আয়, তারপর যত খুশি ঘুমা।” 
পিহু একটু থেমে জিজ্ঞেস করল,
“তুই আজকে ও ডাক্তারের কাছে যাবি আপা?”
কুহুর হাত থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে একটা ভারী নিশ্বাস ফেলল সে।
“হুম…”
পিহুর এবার খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলল,
“কেন দেখাচ্ছিস ডাক্তার? ডাক্তার তো বলছে তোর কোনো সমস্যা নাই! তাও বারবার যাচ্ছিস কেন? তোর সেই প্রাণপ্রিয় স্বামীকে বল, ও যাক ডাক্তার দেখাইতে! নিজের বাপ হওয়ার ক্ষমতা নাই, সেটা স্বীকার না কইরা তোরে নিয়া পইরা আছে কেন?”
তার কণ্ঠে রাগ চড়তে লাগল,
“তুই দেখে এসব চুপচাপ সহ্য করছিস আপা! আমি হলে, বেটার ব্যাটারিতে একটা লাথি মাইরা চলে আসতাম! শালা, লম্পট, চরিত্রহী...”
কথা শেষ হওয়ার আগেই পিহুর গালে এসে পড়ল কুহুর হাতের এক জোরালো থাপ্পড়। পিহু হতভম্ব হয়ে গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে রইল কুহুর দিকে। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
“আপা…!”
পিহুর কণ্ঠ কেঁপে উঠল। কুহুর চোখ দুটো টলমল করছে। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু সে কোনোভাবে নিজেকে সামলে রাখল। তারপর আঙুল তুলে কঠিন কণ্ঠে বলল,
“চুপ! একদম চুপ!”
তার কণ্ঠে ছিল জমে থাকা ভারী যন্ত্রণা।
“যেটা বুঝিস না, সেটা নিয়ে কথা বলতে আসবি না। আমি কোন পরিস্থিতির মধ্যে আছি… আমার উপর দিয়ে কি যাচ্ছে… সেটা একমাত্র আমি জানি। মা না হতে পারার যন্ত্রণা, তুই বুঝবি না, পিহু। তোর এখনো সেই বয়স হয়নি তোর গা ভাসিয়ে বেড়ানোর বয়স। তবে সেটাই কর। এসবের মধ্যে কেন পরছিস? আমাকে আর আমার স্বামীকে নিয়ে নাক গলানোর তোর কোনো প্রয়োজন নেই।”
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল কুহু। নিজের বুকের ভেতর জমে থাকা সব কষ্টের ভারটা গিয়ে পড়ল পিহুর উপর। কুহু তো অবুঝ নয়। সবই জানে, বোঝে। তবুও সংসার নামের এই বন্ধন টিকিয়ে রাখতে কত কিছুই না সহ্য করতে হয় তাকে।
যা তার এই ছোট বোন কখনো বুঝবে না। আর কিছু না বলে কুহু ব্যাগ আর ফাইলগুলো তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পিহু বসে রইল একই জায়গায়। নিঃশব্দ। স্তব্ধ। বোনের মুখে এমন কথা শুনতে সে অভ্যস্ত নয়। তার ওপর সকাল সকাল তার নরম, তুলতুলে গালে সেই চড়ের দাগ যেটা এখনো জ্বলছে। চোখের কোণে অজান্তেই ভীর জমাল অশ্রুকনা। সে দ্রুত হাতের আঙুল দিয়ে তা মুছে ফেলল। এখন আর ঘুম আসবে না। শুয়ে থাকলেও লাভ নেই। বরং বাধ্য মেয়ের মতো মায়ের কাছে যাক। এই মুহূর্তে সেটাই সবচেয়ে সহজ পথ। নিচের হলঘরে গিয়ে দেখল, তার মা রাবেয়া বসে আছেন বাড়ির বড়দের সঙ্গে। গম্ভীর আলোচনা চলছে। পিহুকে দেখেই রাবেয়া বেগম ডাকলেন,
“পিহু, এদিকে আয়।”
পিহু ধীর পায়ে এসে মায়ের পাশে বসল, একেবারে বাধ্য মেয়ের মতো। মাথা নিচু, চোখে কোনো দস্যিপনার ঝিলিক নেই আজ। রাবেয়া বেগম মেয়ের দিকে তাকালেন। তার দৃষ্টিতে ছিল কঠোরতা, আর দুশ্চিন্তা। গলা খানিকটা শক্ত করে তিনি বললেন,
“শোন, আমি কুহুকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি। ফিরতে ফিরতে দেরি হবে। তাই তোকে ও নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কুহু বলল, তোকে নেয়ার দরকার নাই। তাই এখানেই রেখে যাচ্ছি।”
একটু থেমে, চোখ কড়া করে তাকালেন,
“কোনো রকম তামাশা করবি না। আমি যেন কিছু না শুনি, পিহু!”
পিহু চুপচাপ মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। অন্য সময় হলে এই কথাগুলো সে এক নিমিষেই উড়িয়ে দিত। দু-চারটা জবাব দিয়ে, মুখ বেঁকিয়ে নিজের মতো করে চলে যেত।
কিন্তু এই মূহুর্তে তার কোনো জবাব দেওয়ার ইচ্ছে হলো না। একটা শব্দও না। আইরিন খন্দকার পাশ থেকে হালকা হেসে বললেন,
“তুই শুধু শুধু মেয়েটাকে কেন শাসাচ্ছিস, রাবেয়া? এই বয়সে একটু দস্যিপনা তো করবেই। আমরাও কি কম করেছি নাকি!”
তার কণ্ঠে ছিল স্নেহ, যেন পিহুর দস্যিপনাটাকেও তিনি আদর করে দেখছেন। রাবেয়া বেগম একটু বিরক্তির সুরে উত্তর দিলেন,
“তুই জানিস না আইরিন। এই মেয়ে এখন আর ছোটবেলার পিহু নেই। এই মেয়ের কর্মকাণ্ডের কথা শুনলে তোর মাথা ঘুরে যাবে! গ্রামের মানুষের ঘুম হারাম করে দেয়!”
ঠিক তখনই পাশে বসে থাকা জাবেদা খন্দকার গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
“তাহলে বিয়ে দিয়ে দিলেই তো পারো, রাবেয়া। সব কিছুর মূলে হলো বিয়ে। বিয়ে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
তার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা, যেন এটাই চূড়ান্ত সমাধান।
রাবেয়া বেগম কিছু বলার আগেই সিঁড়ি বেয়ে নামছিল শিরিন। অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি, পরিপাটি পোশাক, চুল বাঁধা, হাতে ব্যাগ। ভাবছিল এক কাপ কফি খেয়ে বের হবে। কিন্তু নিচে নেমেই কথাগুলো শুনে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। 
“এই বয়সে বিয়ে? মা, তুমিও না… বয়স কত ওর? বাল্যবিবাহের ঘানি টানতে হবে সবাইকে সারাজীবন!”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট আপত্তি। কিন্তু জাবেদা খন্দকারও কম যান না। তিনি তেড়ে উঠে বললেন,
“এই বয়সে বিয়ে করবে না তো কি তোমার মতো ঘরে বসে বসে বুড়ি হবে? গ্রামে এর থেকে ছোট মেয়েরা কোলে বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়! তোমার মতো বসিয়ে রাখে না!”
কথাগুলো সরাসরি গিয়ে বিঁধল শিরিনের গায়ে। সে বুঝে গেল আজ আবার সেই একঘেয়েমি প্রসঙ্গ, তার বিয়ে। তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“সকাল সকাল বিয়ে নিয়ে আমাকে খোঁচা না মারলে তোমার হয় না?” 
রেগে বলল শিরিন। এবার যেন আগুনে ঘি পড়ল। জাবেদা খন্দকার একেবারে ক্ষেপে উঠলেন,
“না, হয় না! তোদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে আমার হয়েছে যত জ্বালা! এক জনের বয়স ত্রিশ ছুঁইছুঁই, আরেকজন তো ত্রিশ পেরিয়ে গেছে দু’বছর আগে! অথচ বিয়ের কথা বললেই গায়ে যেন ফোসকা পড়ে!”
তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,
“আমার যে তোদের চিন্তায় দিন দিন শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাচ্ছে, সেটা নিয়ে তোদের কারো কোনো ভাবনা আছে?”
শিরিন ও আর নিজেকে সামলাতে পারল না।সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,
“তোমাকে চিন্তা করতে কে বলেছে? তোমার ছেলেকে করিয়ে দাও না বিয়ে! আমার পিছনে কেন পড়ে আছো?”
এই কথায় জাবেদা খন্দকার যেন আরও ক্ষিপ্ত হলেন। ব্যঙ্গ করে বললেন,
“হ্যাঁ, খুব করবে আপনার ভাই বিয়ে! বলতে বলতে মুখের ফেনা ছুটে গেছে আমার! এখন তো সে বাড়িতেই আসা বন্ধ করে দিয়েছে! আপনারা দুই ভাইবোন তো একই ঘাটের মাঝি!”
ঘরের পরিবেশ একেবারে ভারী হয়ে উঠল। পিহু চুপচাপ বসে সব দেখছে। এই বাড়ির লোকদের সম্পর্কগুলো তার কাছে নতুন, কিন্তু এই টানাপোড়েন, এই কথার লড়াই সব তার দিক থেকেই ঘুরে গেছে। শিরিন বিরক্তিতে মাথা ঝাঁকাল,
“ধুর! সকাল সকাল মুডটাই খারাপ করে দিলো!”
সে টেবিলের ওপর কফির কাপটা একটু জোরে শব্দ রেখে,
হনহনিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। পেছন থেকে আইরিন খন্দকার ডাকলেন,
“আরে, কফিটা তো খেয়ে যা!”
শিরিন না ঘুরেই উত্তর দিল,
“তোমার আদরের জায়ের কথায় পেট ভরে গেছে! টানা তিন দিন চা-কফি কিচ্ছু লাগবে না!”
কথাটা বলে সে দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। আইরিন খন্দকার হালকা করে মাথা নাড়লেন। তার চোখেমুখে ফুটে উঠল এক ধরনের অভ্যস্ত ক্লান্তি। এই দৃশ্য, এই কথার লড়াই তার কাছে নতুন কিছু নয়। শিরিন আর তার মায়ের এই ঠোকাঠুকি প্রতিদিনের নিয়ম। দিনে অন্তত একবার হলেও বিয়ের প্রসঙ্গ উঠবেই। আর সেই প্রসঙ্গ উঠলেই বাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। জাবেদা খন্দকারের একটাই চিন্তা, ছেলে-মেয়ের বিয়ে। আর সেই চিন্তার জ্বালাতেই তো তার বড় ছেলে সৈকত এখন প্রায় বাড়িমুখোই হয় না। সৈকত, একজন কাস্টম অফিসার। বেনাপোলে তার পোস্টিং। আগে মাসে এক-দুবার হলেও বাড়ি আসত। কিন্তু এখন? ছয় মাস হয়ে গেছে সে বাড়িতে পা রাখেনি। কারণ একটাই, এই বিয়ের চাপ।
এদিকে জাবেদা খন্দকার এখনো বসে বসে নিজের মতো করে বকবক করেই যাচ্ছেন, কখনো ছেলেকে নিয়ে, কখনো মেয়েকে নিয়ে, কখনো নিজের কপালকে দোষ দিচ্ছেন। এই পরিবেশ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলেন আইরিন খন্দকার। তারও আবার কলেজ আছে। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। এক ডাকে সবাই চেনে, “আইরিন ম্যাম”। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে বললেন,
“রাবেয়া, চল। আমি তোদের হাসপাতালে নামিয়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাবো। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। আর ডাক্তার নিলুফারের সাথে আমার কথা হয়েছে, তোদের দশটার মধ্যে থাকতে বলেছে।”
রাবেয়া বেগম তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়ালেন। কুহুও প্রস্তুত ছিল আগেই। বেরিয়ে যাওয়ার আগে রাবেয়া আরেককবার পিহুর দিকে তাকালেন। সেই একই কড়া দৃষ্টি,
“দেখিস, কোনো ঝামেলা করবি না পিহু। আমি যেন কিছু না শুনি!”
পিহু কোনো জবাব দিল না। শুধু মাথা দুলিয়ে কথাটা শুনেছে বোঝাল। তারপর দুলতে দুলতে আবার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, বাড়ি তো ফাঁকা। এবার একটু আরামে ঘুমানো যাবে। ঠিক তখনই পেছন থেকে জাবেদা খন্দকারের ডাক এল,
“এই পিহু! তুই নাস্তা করবি না?”
“এখন?”
“হ্যাঁ, এখন না তো কখন? আজকে আবহাওয়া ঠাণ্ডা, তাই সকাল সকাল খিচুড়ি রান্না করছি।”
“খিচুড়ি” শব্দটা কানে যেতেই পিহুর মুখে পানি চলে এলো। সে সাথে সাথেই ঘুরে দাঁড়াল।
“বাহ! খিচুড়ি! আমার অনেক পছন্দ, কাকিমা!”
চোখ চকচক করে উঠল তার। সে নেমে এসে বলল,
“আপনি একটা প্লেটে করে দেন, আমি উপরে গিয়ে ব্রাশ করে খাবো। আমি এখনো ব্রাশ করি নাই!”
জাবেদা খন্দকার একটু হেসে তার কথা মতো প্লেট সাজিয়ে দিলেন। গরম ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি, তার সাথে গরুর মাংস ভুনা। উফ! দৃশ্যটা দেখেই পিহুর ধৈর্য শেষ। সে প্লেটটা হাতে নিয়ে ধপধপ করে সিঁড়ির দিকে উঠতে লাগল। আর ঠিক তখনই, ঘটল সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনা। সামির পুরো রেডি হয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। এক মুহূর্তে সব ওলটপালট হয়ে গেল। গরম খিচুড়ির প্লেট উল্টে গিয়ে পুরোটা ছিটকে পড়ল সামিরের ওপর। দৃশ্যটা দেখে পিহুর অনুতাপ হওয়ার কথা। কিন্তু না, সে হো হো করে হেসে উঠল! সামির চোখ বন্ধ করে ফেলল। হাত দুটো মুঠো করে নিল শক্ত করে। তার ভেতরের রাগ যেন টগবগ করে ফুটছে। কিন্তু সে কোনোভাবে নিজেকে সামলাল। তারপর ক্ষোভে ভরা কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
“এই মেয়ে! সমস্যা কি তোমার? বান্দরবানের চ্যাংড়ি বান্দরের মতো সারাক্ষণ লাফালাফি করো কেন? চোখ দুটো আছে কিসের জন্য? দেখে চলতে পারো না?”
পিহু ফোস করে একটা নিশ্বাস ছাড়ল। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“না, পারি না। বান্দরেরও তো চোখ থাকে, তাও লাফায়!”
সামির থমকে গেল। সে ভেবেছিল “বান্দর” বলতেই মেয়েটা রেগে আগুন হয়ে যাবে। কিন্তু উল্টো সে যেন সেটা মেনেই নিল!
“আমাকে কাল অজ্ঞান করে শান্তি পাওনি? এখন আবার এসব?”
পিহু অনড় রইল।
“যা করেছি, বেশ করেছি। আপনি আইরিন আন্টির ছেলে বলে বেঁচে গেছেন। নয়তো আরও কয়েকটা কেলানি খাইতেন!”
সামির ভ্রু তুলে তাকাল, “আচ্ছা?”
“হ্যাঁ।”
একটা রহস্যময় বাকা হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। সে ধীরে ধীরে নিজের শার্টের বোতাম খুলতে লাগল। এই সময়ই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন জাবেদা খন্দকার। দৃশ্যটা দেখে তার চোখ কপালে উঠে গেল,
“হায় আল্লাহ! এ কী অবস্থা! সারাঘর নোংরা করে ফেলছো!”
তিনি তড়িঘড়ি করে ডাকলেন,
“হাফসা! হাফসা! তাড়াতাড়ি এসে এগুলো পরিষ্কার কর! বাবা যদি এসব দেখে, তাহলে বাড়ি মাথায় তুলবে।”
হাফসা দৌড়ে এলো। কিন্তু সে এগোতেই সামির বজ্রকণ্ঠে বলে উঠল,
“হাফসা! তোর এসব করতে হবে না। আজকে তোর ছুটি!”
হাফসা থমকে গেল, “ছুটি? কিসের ছুটি, ভাইজান?”
সামির ঠান্ডা গলায় বলল,
“শুধু তোর না। মুন্নি, আসমা খালা, রফিক চাচা, সবার ছুটি। যা, সবাইকে বলে আয়। আর যাওয়ার সময় বাহাদুরের কাছ থেকে এক হাজার টাকা করে নিয়ে যাস। বলবি, সামির ভাই দিতে বলছে।”
হাফসার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে খুশি হয়ে দৌড়ে চলে গেল। জাবেদা খন্দকার হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
“এসব কি সামির? তুই সবাইকে ছুটি দিয়ে দিলি, এখন বাড়ির কাজগুলো করবে কে? জানিসই তো আমার শরীর ভালো না!”
সামির দুষ্টু হাসি দিয়ে পিহুর দিকে তাকাল। চোখ পিটপিট করে বলল,
“আহ কাকিমা… আপনাকে কে করতে বলেছে? আপনি আপনার ঘরে যান। ঠিক সময় মতো আপনার সবকিছু আপনার কাছে পৌঁছে যাবে।”
জাবেদা খন্দকার কিছুই বুঝলেন না। তবুও সামিরের জোড়াজুড়িতে নিজের ঘরে চলে গেলেন। এদিকে সুযোগ বুঝে পিহু হুড়মুড় করে সরে যেতে যাচ্ছিল, তন্মধ্যেই খপ করে সামির তার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। পিহু চমকে তাকাল তার দিকে। সামির ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“কোথায় যাওয়া হচ্ছে, দস্যিমেয়ে?”
তার কণ্ঠে মজা, কিন্তু ভেতরে স্পষ্ট হিসাব।
“ভেবেছেন, সামির খন্দকার এত সহজে আপনাকে ছেড়ে দেবে? উঁহু… ভুল।”
সে একটু ঝুঁকে এল,
“কাল রাতে আপনি যা করেছেন… তার শাস্তি তো আপনাকে পেতেই হবে।”
পিহু সঙ্গে সঙ্গে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। এমনকি রাগে দাঁত বসাতে উদ্যত হলো তার হাতে। ঠিক তখনই সামির ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,
“আমি শুনেছি রাবেয়া আন্টি যাওয়ার আগে তোমাকে কি বলে গেছেন। কোনোরকম চালাকি করার চেষ্টা করলেই, রাবেয়া আন্টিকে কল করে বলবো, তোমার জন্য আমার দেড় কোটি টাকার প্রজেক্টে লস হয়েছে।”
পিহু থেমে গেল। তার চোখ বড় হয়ে গেল অবিশ্বাসে। একটা শুকনো ঢোক গিলে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“দে.. দে-দেড়… ক-কোটি?”
চলবে...
(কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ 🚫, চাইলে লিংক শেয়ার করতে পারেন।)
নোট: আপনারা গল্পটা খুশি খুশি মনে পড়েন, তাই আমিও খুশি খুশি মনে লিখি। কিন্তু আপনারা লাইক, কমেন্ট করেন না কেন? বেশি বেশি রেসপন্স করেন। তাহলে দ্রুত পর্ব দেয়ার চেষ্টা করবো। 😐
হ্যাপি রিডিং 🫶🏻

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন