ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আমার নীল নেশা

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: ফাতেমা ফারিয়াল

#তুমি_আমার_নীল_নেশা 💙

#পর্ব_৬
#লেখনিতে_ফাতেমা_ফারিয়াল 
রাত অনেকটাই গড়িয়েছে। দূরে কোথাও হালকা বাতাস বইছে, আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, ঝংকার তুলছে নীরবতার বুকে। মাঝে মাঝে সেই শব্দ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পিহু ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। তার পদচারণা নিঃশব্দ। এতক্ষণ সে আসতে পারেনি, কারণ কুহু জেগে ছিল। এপাশ-ওপাশ করছিল। কিন্তু এখন কুহুর নিদ্রা নেমে আসতেই পিহু এই সুযোগটা লুফে নিয়েছে। চুপিচুপি পা টিপে টিপে সে এগিয়ে গেল সামিরের ঘরের সামনে। দরজা খানিকটা ফাঁকাই ছিল। পিহু সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ দেখে নিয়ে উঁকি দিল ভেতরে। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার আধো আলোয় ডুবে আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সামির কোথাও নেই!
“এত রাতে ঘরে নাই? আবার কি চুরি করতে গেছে কে জানে!” 
সাবধানে দরজা ঠেলে সে ভেতরে ঢুকে পড়ল। চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো, সামির সত্যিই নেই। আর তখনই তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধিরা ঝড়ের মতো এসে ভিড় করল। সে ঠোঁট কামড়ে নিজের সাথেই ফিসফিস করে বলল,
“আমার সাথে পাঙ্গা নেওয়া না? আমারে খাটানো? আমি আপনার এমন হালত করুম, আপনি পিহুর নাম শুনলেও বাপ বাপ করে পালাইবেন! এই পিহুর কাছে ইবলিশ শয়তানও হার মানে, আর আপনি তো সাধারন একজন পুরুষ!”
প্রতিশোধের আনন্দে তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সামির পরদিন অফিসে যাওয়ার জন্য স্যুট-বুট সব গুছিয়ে রেখে গেছে। পিহু গিয়ে ওয়াশরুম থেকে এক মগ পানি এনে জুতার ভেতর ঢালতে শুরু করল। শুধু পানি নয়, শেম্পুও ঢেলে দিল। যেন সকালে পা ঢুকালেই একদম চমক! তারপর চোখ পড়ল ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা চুল শুকানোর যন্ত্রটার দিকে। দুপুরে সে দেখেছিল, সামির কীভাবে যত্ন করে চুল শুকাচ্ছিল সেটা দিয়ে। পিহু পাউডারের কৌটা থেকে পুরোটা যন্ত্রটার ভেতরে ঢেলে দিল। তারপর খুব যত্ন করে আবার আগের জায়গায় রেখে দিল, যেন কিছুই হয়নি। তাতেই শেষ নয়, সামির যে ব্লেজারটা ঝুলিয়ে রেখেছিল, সেটার দুটো বোতামই টেনে ছিঁড়ে ফেলল। এরপর আবার সুন্দর করে রেখে দিল। সব কাজ শেষে কোমরে হাত রেখে সে একটা লম্বা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ঠোঁট বাঁকিয়ে শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
“হাহ! পিহুর সাথে পাঙ্গা নেওয়া? পিহু যে কি মাল, সেটা বুঝবেন আগামীকাল!”
কিন্তু তার দুষ্টুমি এখানেই শেষ হলো না। সে আবার চারপাশে তাকাতে লাগল আর কি করা যায়! ঠিক তখনই বাইরে থেকে পায়ের শব্দ! পিহুর বুক ধক করে উঠল। সামির! সে বাইরে ছিল, এখন ফিরে আসছে। হাতে কিছু কাগজপত্র। মুহূর্তের মধ্যে পিহুর মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল। কোথায় যাবে, কি করবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। দিশাবিশা না পেয়ে এক দৌড়ে গিয়ে আলমারির ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঠিক তখনই সামির ঘরে ঢুকল। দরজা বন্ধ করে দিল। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ফাইলগুলো টেবিলে রেখে সে ফ্রেশ হয়ে নিল। রাত অনেক হয়েছে। ঘুমাতে হবে। কাল ভোরেই আবার তাকে সাইটে যেতে হবে। নতুন বিল্ডিংয়ের কাজ চলছে। সে বিছানার দিকেই এগোচ্ছিল, এমন সময় তার চোখে পড়ল আলমারির দরজাটা একটু খোলা। সে ভ্রু কুঁচকে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। পিহু নিঃশ্বাস আটকে রাখল। তার বুকের ধুকপুকানি যেন বাইরে পর্যন্ত শোনা না যায়। সে এসেছিল এই সুদর্শন চোরটাকে শায়েস্তা করতে। কিন্তু তাকে না পেয়ে নিজের মতো করেই পরিকল্পনা বদলে নিয়েছে।
এদিকে সামির ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়ল। আজ সারাদিন সে দস্যি মেয়েটাকে ভালোই জব্দ করেছে। এই ভাবনাতেই তার ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। চোখ দুটো বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলল,
“সবে তো শুরু দস্যিমেয়ে।তুমি ভুল মানুষের হৃদয়ে ডাকাতি করতে এসেছো! এর শাস্তি তুমি হাড়ে হাড়ে টের পাবে। যতই দস্যিপনা করো না কেন, তুমি আমার কাছে চুনোপুঁটি মাত্র! একবার যখন হানা দিয়েই ফেলেছো, শেষটা তোমাকে দেখিয়েই ছাড়বো।”
তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ, নিরবধি… আর সেই বৃষ্টির সুরের ভেতরেই, অজান্তে, দুজন মানুষের এই দুষ্টুমি-ভরা লড়াই ধীরে ধীরে অন্য এক গল্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
--------------
সকালের আলোটা আজ কোমল। বৃষ্টির ধুয়ে দেওয়া আকাশ থেকে নেমে আসা স্নিগ্ধ রোদে খন্দকার মহলের অন্দরমহলটা এক অন্যরকম প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে। ডাইনিং টেবিলের চারপাশে সবাই বসে আছে। শুধু অনুপস্থিত দুজন, সামির এবং কুহু। কুহুর শরীর-মন দুটোই ভালো নেই। ক্লান্তি আর অস্বস্তিতে সে নিজের ঘরেই থেকে গেছে। আর সামির সম্ভবত এখনো তৈরি হচ্ছে। তাহের খন্দকার চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন,
“সৈকত, তুই কয়দিনের ছুটি এনেছিস?”
সৈকত খাওয়া থামিয়ে মাথা তুলে তাকাল বাবার দিকে। চোখে একটুখানি অনাগ্রহ। ঠোঁটে চাপা বিরক্তি,
“নির্দিষ্ট কোনো সময় নিয়ে আসি নাই। যতদিন তোমরা থাকতে দিবে, ততদিন থাকব।”
এই উত্তরে আইরিন খন্দকার কপাল কুঁচকে বললেন,
“এটা আবার কেমন কথা সৈকত! এমনভাবে বলছো, যেন আমরা তোমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছি!”
 “আমি আপনাদের কথা বলি নাই চাচি আম্মা! আমি আমার বাবা-মায়ের উদ্দেশ্যে বলেছি। তারা যদি সেই একগুঁয়ে বিয়ের কথা না তোলে, তাহলে কিছুদিন থাকব। নয়তো চলে যাব।”
এই কথাটা বাতাসে এক অস্বস্তিকর কম্পন ছড়িয়ে দিল। তাহমিদ খন্দকার এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। কিন্তু তার রাগী স্বভাবটা হঠাৎই মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
 “সৈকত! ভদ্রতার সাথে কথা বলো। এই বাড়িতে থাকো না বলে এই বাড়ির আদব-কায়দা ভুলে গেছো?”
তার কণ্ঠে ছিল কঠোরতা। সৈকত চোখ নামাল না। বরং সরাসরি তাকিয়ে বলল,
“আমি কি এমন বেয়াদবি করেছি দাদু? জাস্ট বলেছি, আমার জীবন নিয়ে কাউকে নাক গলাতে না। দ্যাটস ইট!”
এই নির্ভীক জবাব পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলল।
তাহের খন্দকার এবার খেঁকিয়ে উঠলেন,
“সৈকত! তোমার দাদুর সাথে কীভাবে কথা বলছো?”
সৈকত থেমে গেল। ঠোঁট কামড়ে সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“আই’ম সরি… সরি!”
কিন্তু তার এই ‘সরি’-তে অনুশোচনার চেয়ে বিরক্তিই বেশি স্পষ্ট। সে আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতে চায় না। খাবারের প্লেটটা ঠেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। জাবেদা খন্দকার তাড়াতাড়ি উঠে এসে ছেলের হাত ধরে বললেন,
“কোথায় যাচ্ছিস বাবা! খাবারটা তো খেয়ে যা!”
সৈকত চারপাশে তাকাল। একটা ঠাণ্ডা, অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে। শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বলল,
“আমার খিদে মরে গেছে মা। পারলে এক কাপ চা পাঠিয়ে দিও ঘরে।”
আর কোনো কথা না বলে সে হনহনিয়ে ভোজন কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। জাবেদা খন্দকার আক্ষেপ ভরা চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“দিলে তো, দিলে তো ছেলেটার মেজাজ খারাপ করে। সকাল সকাল কি প্রয়োজন ছিল এসব কথা তোলার! কতদিন পর ছেলেটা বাড়ি ফিরেছে। একটু শান্তিতে নাস্তাটা ও করতে দিলে না।”
তার কণ্ঠে অভিযোগ। এতক্ষণ নীরব থাকা খাইরুল খন্দকার মুখ তুললেন। তিনি এমনিতেই কম কথা বলেন, কিন্তু যখন বলেন সেটা ভেবেচিন্তেই বলেন। এই এখনই শান্ত, স্থির স্বরে বললেন,
“আহ ভাবি, শুধু শুধু চিন্তা করবেন না। তরুণ বয়সের র'ক্ত তো, একটু গরম থাকবেই। কিছুক্ষণ পর দেখবেন ঠিক হয়ে যাবে।”
তার কথায় যুক্তি ছিল, কিন্তু পরিস্থিতির ভারী আবহাওয়া পুরোপুরি কাটল না। পিহু এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। বাধ্য মেয়ের মতো মায়ের পাশে বসে নাস্তা করছিল। কিন্তু এই তর্ক-বিতর্কের মাঝে তার হাতও থেমে গেছে। পুরো ঘরজুড়ে তখন এক পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছে। ঠিক সেই সময় উপরতলা থেকে হঠাৎ সামিরের গর্জন ভেসে এল,
“মুন্নি! হাফসা! এসব কি? কে করেছে এসব?”
সামিরের গর্জনময় কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই সবাই অবাক হয়ে তাকাল। কিন্তু চাঞ্চল্যের মাঝেও একমাত্র পিহুর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে দুষ্টু হাসি। গতরাতের সেই গোপন অভিযান আবার মনে পড়ে যাচ্ছে। সামির ঘুমিয়ে পড়ার পর সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। সব পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করে তবেই ফিরেছে। আর সেই কারণেই সারারাত তার ঠিকঠাক ঘুম হয়নি। উত্তেজনা আর কৌতূহল মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করেছে তার ভেতরে। তাই সে সকাল সকাল একদম বাধ্য মেয়ের মতো মায়ের পাশে এসে বসেছে।রাবেয়া বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেললেন। এই ভেজা বেড়াল রূপটা তার অজানা নয়। তিনি মেয়েকে খুব ভালো করেই চেনেন। কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি হয়েছে পিহু? তুই কোনো গণ্ডগোল করিস নাই তো?”
পিহু এমন ভান করল যেন সে কিছুই বোঝে না। চোখ বড় বড় করে নিষ্পাপ মুখ করে শুধু মাথা নাড়ল, না। সে কিছুই করেনি। ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে আবার ভেসে এল সামিরের চিৎকার, 
“মুন্নি! মুন্নি!”
আইরিন খন্দকার বিরক্ত হয়ে মুন্নিকে ডাকলেন,
“মুন্নি, দেখতো তোর সামির ভাই এমন ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছে কেন? সকাল সকাল কি ডাকাত পড়েছে ওর ঘরে?”
মুন্নি তড়িঘড়ি করে ছুটে গেল। এই কোলাহলের কারনে কুহুর ও ঘুম ভেঙে গেল। কিছুটা ক্লান্ত, কিছুটা বিমর্ষ মুখে সেও এসে মায়ের পাশে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ পর নেমে এল সামির। স্যুট-বুট পরে অফিসের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে। কিন্তু তার চোখেমুখে রাগের ছাপ স্পষ্ট। চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি কটমট। তাকে দেখেই শিরিন উঠে দাঁড়াল,
 “আমি গেলাম। বাবা, চলো। আর সামির, তুই আগে মিটিং অ্যাটেন্ড করবি, তারপর সাইটে যাবি। কালকের মিটিং হুট করে পিছিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। আমি নিহানের সাথে কথা বলেছি। ওকে, বাই!”
কথা শেষ করেই সে তার বাবাকে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
সামির এগিয়ে এসে পিহুর পাশে গিয়ে বসে পড়ল। তার চোখ সরাসরি পিহুর দিকে। দৃষ্টি জ্বলন্ত। মুন্নির কাছ থেকে শোনা কথা আর নিজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে সে বুঝে গেছে, এইসব কাণ্ডের পেছনে কে আছে। এই দস্যিমেয়েটা। আজ তাকে একটা শিক্ষা দিতেই হবে। এক এক করে সবাই খাওয়া শেষ করে উঠে যেতে লাগল। পিহুও তার খাওয়া শেষ করে উঠতে গেল। ঠিক তখনই, তার চুলে হেচকা টান লাগল।
“আহ!” 
কিছু বুঝে ওঠার আগেই সামির উঠে দরজার দিকে হাঁটা দিল। আর তার সাথে সাথে।পিহুকেও বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে! কারণ তার লম্বা চুল সামিরের হাতঘড়িতে আটকে গেছে। না, বরং আটকে দেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ আগেই সুযোগ বুঝে সামির নিজেই তার ঘড়ির সাথে চুলটা গিট দিয়েছে। এবার সে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। বুঝিয়ে দেবে, কত ধানে কত চাল! পিহু ব্যথায় ছটফট করতে করতে বলল,
“আহ! কি করছেন? লাগছে আমার! দাঁড়ান, দাঁড়ান বলছি! আমার চুল!”
সামির গাড়ির দরজায় হাত রেখে থামল। কিছুই জানে না এমন ভান করে ভ্রু তুলে বলল,
“সমস্যা কি তোমার? আমার পিছু নিয়েছো কেন? আবার আজগুবি কিছু করার ধান্ধায় আছো?”
পিহু রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
 “দেখেন, একদম ভালো সাজার চেষ্টা করবেন না! আমার চুল আপনি ইচ্ছা করে গিট দিছেন, না? কি মনে করছেন, আমি বুঝি না?”
সামির ঠোঁট বাঁকিয়ে শীতল স্বরে বলল,
 “একদম তেজ দেখাবে না। তোমার এত লম্বা চুল, শাঁকচুন্নিদের মতো খুলে রেখেছো কেন? এখন কিন্তু কেটে দিব!”
এই কথা শুনে পিহুর চোখ কপালে উঠে গেল,
“না, না! দয়া করে কাটবেন না! এত বড় চুল কাটতে আপনার একটুও মায়া লাগবে না, বলুন?”
“না, লাগবে না।” নির্লিপ্ত উত্তর সামিরের। 
“তোমার চুল কাটতে আমার মায়া লাগবে কেন? শোন মেয়ে, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। যা করার, তাড়াতাড়ি করো।”
পিহু হতভম্ব হয়ে গেল। চুল এমনভাবে আটকে আছে যে খুলতে সময় লাগবে। মাথা কাজ করছে না। সে চুপ করে আছে দেখে সামির কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“ওকে, ফাইন। কেটেই ফেলছি।”
প্রায় চিৎকার করে উঠল পিহু। 
“না! কাটবেন না! আমি খুলতেছি। আপনি বরং গাড়ি চালান। আমি আস্তে আস্তে খুলতেছি।”
সামির শেষমেশ পিহুর কথায় রাজি হলো। পরিস্থিতি এমন, না মানারও উপায় নেই। তার সত্যিই দেরি হয়ে গেছে। সময় আজ ইচ্ছা করে তার বিপক্ষে দৌড়াচ্ছে। সে গাড়ি চালাতে চালাতেই কল করল নিহানকে। নিহান তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। পার্টনার। একরকম ভরসার জায়গা। কল ধরতেই সামির এক নিঃশ্বাসে বলল,
“নিহান! আমার দেরি হবে। আমি মিটিং এটেন্ড করতে পারব না। তুই সামলে নে, নয়তো আবার পিছিয়ে দে। আমাকে সাইটে যেতে হবে। মিটিং পিছিয়ে গেলে তুইও চলে আয়।”
ওপাশ থেকে একটু বিরক্ত গলা ভেসে এল,
“ভাই, আবার পিছাবি? ওদের কি জবাব দিব?”
“সামলে নে না। আমি ড্রাইভ করছি, ফোন রাখ।”
কথা শেষ করে ফোন রাখতে নিলে সঙ্গে সঙ্গেই আবার বেজে উঠল। সামির ভ্রু কুঁচকালেও এক সেকেন্ড দেরি করল না কল রিসিভ করতে। ওপাশ থেকে কি বলা হচ্ছে, পিহু শুনতে পেল না। কিন্তু সামিরের মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে গেল। চোখে আতঙ্ক, কপালে টান। তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল,
“জোসনা খালা, আপনি ওর সাথেই থাকেন। আমি আসছি। এখনই আসছি। ওর খেয়াল রাখেন, খালা। জ্বর মাপেন, আর মাথায় পানি দেন।”
একটু থেমে দ্রুত যোগ করল,
“আমি এসে হাসপাতালে নিয়ে যাব। খালা, আমার পাঁচ মিনিট লাগবে আসতে! জাস্ট পাঁচ মিনিট!”
পিহু এতটুকু বুঝতে পারল, এটা কোনো মজা না। সামির সত্যিই ভ'য় পেয়ে আছে। সে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল, কার কি হয়েছে? কিন্তু সামির যেভাবে গাড়ি চালাতে শুরু করল, তাতে পিহুর মুখের সব কথা আটকে গেল। মাথা ঘুরতে শুরু করল। পেটে কেমন কেমন করছে। সে এসব গাড়িতে উঠতে একদম অভ্যস্ত না। হাত তুলে ইশারায় জানালা খুলতে বলল। সামির জানালা খুলে দিল। আর তার পরেই পিহু ওয়াক ওয়াক করে একটানা বমি করতে শুরু করল।
সময় কেটে গেল দশ… হয়তো পনেরো মিনিট। অবশেষে গাড়ি এসে থামল একটা নির্জন, সবুজে ঘেরা একতলা বাড়ির সামনে। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। যেন এই জায়গাটা শহরের বাইরে আলাদা এক জগৎ। গাড়ি থামতেই সামির এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। দরজা খুলে প্রায় দৌড়ে ভিতরে ঢুকে গেল। পিহু এখনো বসে আছে। শরীরটা একদম ঢিলে হয়ে গেছে। মাথা তুলতেও কষ্ট হচ্ছে। এই গাড়ির ভেতরে আর দুই মিনিট থাকলে হয়তো সে জ্ঞান হারাবে। তাই ধীরে ধীরে নামে পরল। কোনোভাবে নিজেকে সামলে ভিতরের দিকে গেল। আর তখনই চোখে পড়ল বিস্ময়কর দৃশ্যটা। একটা ছোট্ট মেয়ে। বয়স তিন কি চার হবে। কিন্তু মেয়ে বলাটা ভুল হবে। একদম মোম দিয়ে বানানো কোনো পুতুল মনে হচ্ছে। আকাশি রঙের ফ্রক পরা। মাথায় সাদা একটা হেলমেটের মতো কিছু। আকারে একটু বড় হলেও, তাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। বড্ড মায়াবী মুখটা। আর সেই মেয়েটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে সামির। তার দুই হাত দিয়ে মেয়েটার তুলতুলে গাল ধরে রেখেছে। কিছু একটা বিড়বিড় করে বলছে। পিহুর কৌতূহল তাকে আরেকটু কাছে টেনে নিল। এবার সে পরিষ্কার শুনতে পেল,
“তুমি… তুমি ঠিক আছো, মাম্মা? তোমার শরীর ঠিক আছে? দেখি জ্বর… জ্বর তো নেই! তাহলে?”
মেয়েটা হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসি পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সামিরের গলার স্বর বদলে গেল। রাগ মিশে গেল চিন্তার সাথে,
“আর ইউ লাইং?”
হাসিটা সঙ্গে সঙ্গেই থেমে গেল। বাচ্চাটা মাথা নিচু করে নিল একদম অপরাধীর মতো। সামির একবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবয়সী মহিলার দিকে তাকাল। তারপর আবার বাচ্চাটার দিকে,
“আনসার মি! আর ইউ লাইং? বাট হোয়াই?”
“স… সরি পাপা।”
“ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া? আমি কীভাবে এসেছি তুমি জানো? পাপা কতটা টেনশন করেছি তোমাকে নিয়ে, জানো? কেন মিথ্যে বললে?”
মেয়েটা মাথা নিচু করেই বিড়বিড় করে বলল,
“তুমাকে মিস করছিলাম… কাল আসনি কেন? তাই তু মিথ্যে বলেছি।”
সামিরের চোখের কঠোরতা একটু নরম হলো।
“চেরি! ইউ নো না? মিথ্যা বলা মহা পাপ।”
“সরি পাপা। আর বলবু না।”
“পাপা?”
পিহুর মুখ ফসকে শব্দটা বেরিয়ে এল অবিশ্বাস আর বিস্ময়ে। সামির ঘুরে তাকাল তার দিকে। মুখের রঙ পাল্টে গেল। কপাল চেপে ধরল। 
“সিট!”
চেরির অসুস্থতার খবর শুনে তার মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পিহু তার সাথে ছিল, এই কথাটা সে বেফাঁস ভুলেই গেছে। এই দস্যিমেয়েটা এমনিতেই তার পিছু লেগে থাকে। এখন এমন একটা জায়গায় এসে পড়েছে, যেখানে সামির কাউকে আনতে চায়নি। চেরি তার সবচেয়ে বড় গোপন সত্য। এত বছরের লুকানো বাস্তবতা। যদি পিহু এটা সবাইকে বলে দেয়? যদি এই খবর ছড়িয়ে যায়? তাহলে সে কীভাবে সামলাবে সবকিছু?
চলবে.....
(কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ 🚫, চাইলে লিংক শেয়ার করতে পারেন।)
নোট: গঠনমূলক মন্তব্য আশা করছি! পরের পর্ব দেড়ি করে আসবে নয়তো! 😐
হ্যাপি রিডিং 🫶🏻

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন