ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আমার নীল নেশা

১১তম পর্ব

লেখক: ফাতেমা ফারিয়াল

#তুমি_আমার_নীল_নেশা 💙

#পর্ব_১১
#লেখনিতে_ফাতেমা_ফারিয়াল 
তালুকদার বাড়িটা অলিন্দপুরের বহু পুরোনো বনেদি বাড়িগুলোর মধ্যে অন্যতম। লম্বাটে গড়নের বাড়িটা অনেকটা পুরোনো স্কুলঘরের মতো। তিন দিকজুড়ে টানা বারান্দা, মাঝখানে বিশাল এক উঠোন। এই বাড়িকে গ্রামের সবাই এক নামে চেনে, তালুকদার বাড়ি। একসময় পিহুর দাদা চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই সুবাদে এখনো এলাকায় তালুকদারদের আলাদা প্রভাব আছে। লোকজন সামনে সম্মান দেখালেও আড়ালে সমালোচনার শেষ নেই। আর সেই সমালোচনার প্রধান বিষয়বস্তু এখন পিহু নিজেই।
পিহুরা গ্রামে ফিরে এসেছে দুদিন হলো। আর এই দুদিনেই অনেক কিছু বদলে গেছে। বিশেষ করে গতকালের পর থেকে পিহুর ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা জমাট বেঁধে আছে। মায়ের সঙ্গে কুহুর শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল সে। আর সেখানেই আসিফ এমন প্রস্তাব দিয়েছে, যেটা মনে পড়লেই তার সমস্ত শরীর ঘৃণায় রি রি করে উঠে। অবশ্য ওটাকে প্রস্তাব বলা যায় না। ওটা ছিল এক ধরনের নোংরা, বিকৃত মানসিকতার কুৎসিত প্রকাশ। এখনো কাউকে কিছু বলেনি পিহু। শুধু কুহুর কথা ভেবেই চুপ আছে। কিন্তু নিজের ভেতরে এই ঘৃণাটাকে আর কতক্ষণ আটকে রাখতে পারবে, সে নিজেও জানে না।
দুপুরের কাঠফাটা রোদ তখন উঠোনের মাঝ বরাবর এসে পড়েছে। পিহু ছোট্ট কাঠের টুলে বসে বসে ভাত খাচ্ছিল অন্যমনস্কভাবে। ঠিক তখনই বাইরে থেকে তার বাবা মোরশেদ তালুকদারের চিৎকার ভেসে এলো।।তার কণ্ঠে চিরচেনা রুক্ষতা, বিরক্তি আর গালাগালের ঝাঁজ।
“জনমের খাওন খা! গ্রামের মাইনষের ঘুম হারাম কইরা অহন শান্তিতে খা! তোরে তো জন্মই দিছি আমার বদনাম করার লাইগ্গা!”
এ দৃশ্য নতুন কিছু নয়। পিহু ছোটবেলা থেকেই বাবার এই গর্জন শুনে বড় হয়েছে। তাই সে মুখ তুলে তাকালও না। ধীরেসুস্থে ভাত মাখতে লাগল। মেয়ের নির্বিকার ভাবটাই আরো ক্ষেপিয়ে দিল মোরশেদ তালুকদারকে। দরজার ফাঁক গলে উঁকি দিয়ে তিনি আবার চেঁচিয়ে উঠলেন,
“কি রে? কথা কানেও যায় না? নাকি অহন বাপের কথাও তোর গায়ে লাগে না?”
রাবেয়া দ্রুত এগিয়ে এসে স্বামির হাতে একটা শুকনো গামছা ধরিয়ে দিলেন। নিচু গলায় বললেন,
“এমন কইরা কইতেছেন ক্যান? মেয়েটা খাইতে বসছে, খাক না।”
“হ, খাউক! খাইতে কি বারণ করছি? একদিন দেখবি তোর কলিজাডাই খায়া থুইছে!”
কথাটা শুনে পিহুর হাত থেমে গেল। মুখের ভাত আর গলা দিয়ে নামল না। রাবেয়া এবার সত্যিই উদ্বিগ্ন হলেন।
“কি হইছে? এমন করে কথা কইতেছেন ক্যান? কি করছে পিহু?”
মোরশেদ তালুকদার বাজারের ব্যাগটা মেঝেতে ছুড়ে রেখে গজগজ করে উঠলেন,
“কি করছে তোর মাইয়ারে জিগাস কর! আমার কথা তোরা মা-মাইয়া কোনদিন শুনছিস?”
তারপর হাতমুখ মুছতে মুছতেই কড়া স্বরে আবার বললেন,
“আমি শেষবারের মতো কইতেছি কুহুর মা। তোর মাইয়ারে সামলা। নাইলে আমার থেইক্কা খারাপ কেউ হইব না। কতবার কইছি মারামারি থেইক্কা দূরে থাকতে! তাও আবার বাজারের তিন রাস্তার মোড়ে তোর মাইয়া নয়ইন্নারে মারছে! এলাকার মাইনষে বিচার দিছে। লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাইতেছে!”
রাবেয়ার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। 
“পিহু! তুই আবার মারামারি করছিস? আমি না তোরে এসব মারামারি থেকে দূরে থাকতে বলছি!”
পিহু এবার ধপ করে থালাটা সরিয়ে রেখে উঠে পরল। পুরোটা আর খেলো না। বাবার কথায় পেট ভরে গেছে। বেশি গেলে আবার হজম হবে না। কল পারে এসে হাত ধুতে ধুতে বলল,
“আমি এমনি এমনি মারি নাই আম্মা। নয়ইন্না আমারে আজেবাজে কথা কইছে। আমি ওরে ছাইড়া দিমু ক্যান?”
বারান্দার কোণে পা ছড়িয়ে বসে পান চিবোচ্ছিলেন পিহুর দাদি হরমুজা বেগম। তিনি ঠোঁট বাঁকিয়ে পিক ফেলতে ফেলতে বললেন,
“তুই মাইয়া মানুষ হইয়া সারাদিন ঠ্যাং ঠ্যাং কইরা বাইর ঘুরবি ক্যান? বেডা মাইনষের নজরে পড়লে বাজে কতা তো কইবই! ঘরের লক্ষী তুই ঘরে থাকবি। তোর আবার পাড়া-মহল্লা দাপায়া বেড়ানোর কি কাম?”
পিহুর চোখ দুটো মুহূর্তেই জ্বলে উঠল।
“আমি কোনো লক্ষী পক্ষি না দাদি। আর এসব কইয়া আমারে ঘরে বসাইয়া রাখতে পারবা না।”
রাবেয়ার ধমক এবার বেশ কড়া হলো।
“পিহু! মুখে মুখে তর্ক করবি না। যা, ঘরে যা!”
কিন্তু পিহু বরাবরই অবাধ্য। ছোটবেলা থেকেই তার স্বভাবটা অদ্ভুত ত্যাড়া। ডানে যেতে বললে বামে যাবে। নিতে বললে নেবে না। দিতে বললে দিবে না। বসতে বললে উঠে দাঁড়াবে। যেন সমস্ত পৃথিবীর নিয়মের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত শত্রুতা। এই জেদটা সে পেয়েছে বাবার থেকেই। তবে এখন সে জেদে মোরশেদ তালুকদারকেও ছাড়িয়ে গেছে।পিহু রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উঠোন পেরিয়ে বাড়ির বাইরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। রাবেয়া পেছন থেকে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন,
“পিহু! এক পা বাড়ির বাইরে দিবি না! নইলে আমার থেকে খারাপ কেউ হইব না!”
কিন্তু দস্যিমেয়ে কি আর এসব বারণ-শাসন কানে তোলে? সে তো জন্মগতভাবেই বাঁধন ছাড়া এক পাখি। নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে লাফাতে লাফাতে উঠোন পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। মোরশেদ তালুকদার গামছাটা কাঁধে ফেলে ধপ করে এসে মায়ের পাশে বসলেন। মুখজুড়ে বিরক্তি আর অপমানের ছাপ। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
“খুব শোনে তোর মাইয়া তোর কথা! এই হইলো তোর শাসনের নমুনা। মাইয়া মাথার উপরে উঠাইয়া রাখছস, এখন সামলাও।”
রাবেয়া এতক্ষণ নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু স্বামীর কথায় জমে থাকা ক্ষোভ হঠাৎ বিস্ফোরিত হলো। চোখ-মুখ লাল করে তিনি বলে উঠলেন,
“মাইয়া কি আমার একার? আপনার মাইয়া না? সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপাইলে হইবো? আমি একা জন্ম দিছি ওরে? আপনার রক্ত নাই ওর শরীরে? পিহু তো আপনার মতোই হইছে। আপনি যেমন একরোখা, জেদি। আপনার মাইয়াও তেমন। এখন উল্টা আমারে দোষ দেন ক্যান? আপনার কোনো দায়িত্ববোধ নাই? সব আমার একার?”
মোরশেদ তালুকদার গলা চড়িয়ে বললেন,
“আমি শাসন করতে যাই কেমনে? কিছু কইলেই তুই সামনে ঢাল হইয়া দাঁড়াস। তুই-ই তো মাথায় তুলছস!”
রাবেয়া ব্যথিত চোখে তাকালেন স্বামীর দিকে।
“ঢাল হইয়া দাঁড়াই কারণ আপনি কথায় কথায় গায়ে হাত তোলেন। গায়ে হাত তুললেই শাসন হয় না। ভয় দেখাইয়া সন্তান মানুষ করা যায় না।”
“তাইলে তুই শাসন কইরা কি বাগে আনছস? দিন দিন আরো বেহায়া হইতাছে মাইয়া। বেশি জ্ঞান আমার সামনে ঝাড়বি না।”
রাবেয়া এবার থেমে গেলেন। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, এই মানুষটার রাগের কোনো ঠিকঠিকানা নেই। কখন কথা থেকে হাত উঠে যায় তার নিশ্চয়তা নেই। তাই আর তর্ক না বাড়িয়ে রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস পানি এনে স্বামীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে অন্দরমহলে চলে এলেন। বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। আজকাল প্রায়ই এমন হয়। অকারণে বুক ধড়ফড় করে, নিঃশ্বাস আটকে আসে। চিন্তা যেন তাকে ভিতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। মেয়েদুটোর কথা ভাবলেই তার বুক কেঁপে ওঠে। একটা সংসার আঁকড়ে বাঁচার তাগিদে কুহুটা শুকিয়ে যাচ্ছে। মুখে হাসি থাকলেও চোখে শান্তি নেই। আরেকটা আগুনের গোলা, পিহু। যে নিজের ইচ্ছেমতো বাঁচতে চায়, কিন্তু এই সমাজ কি তাকে বাঁচতে দেবে?
রাবেয়া সেলাই মেশিনের সামনে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
কখনো কখনো তার সত্যিই মনে হয়, সময় বুঝি ফুরিয়ে আসছে। শরীরটাও আগের মতো সাড়া দেয় না। যদি হঠাৎ করেই তার কিছু হয়ে যায়? তখন মেয়েদুটোকে কে আগলে রাখবে? কে বুঝবে তাদের? মরার আগে অন্তত মেয়েদুটোর একটা ব্যবস্থা করতে পারলে হয়তো চোখটা শান্তিতে বন্ধ করতে পারতেন। কিন্তু সেই শান্তিটুকুও যেন তার ভাগ্যে নেই।
-------------
অফিস ভবনের পাশেই ছোট্ট অভিজাত একটা ক্যাফেটেরিয়া। দুপুরের ব্যস্ত সময় পেরিয়ে যাওয়ায় ভিড়টা এখন কিছুটা কম। কাঁচঘেরা দেয়াল দিয়ে বাইরের রোদ এসে মেঝেতে হালকা সোনালি আভা ফেলেছে। চারপাশে মৃদু শব্দে ইংরেজি গান বাজছে। অথচ এত সুন্দর পরিবেশও শিরিনের বিরক্তি একটুও কমাতে পারছে না। সে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে বসে আছে। এই দেড় ঘণ্টায় তিন কাপ কফি শেষ করেছে। এখন চতুর্থ কাপের শেষ চুমুকটাও প্রায় ঠান্ডা হয়ে এসেছে। কিন্তু যার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা, সেই তথাকথিত সুপাত্র এর কোনো খবরই নেই।।শিরিন বিরক্ত মুখে কফির মগটা নামিয়ে রাখল।
“হাহ! সুপাত্র!”
মনে মনে শব্দটা উচ্চারণ করেই ঠোঁট বেঁকে গেল তার।
তার মায়ের ভাষায় ছেলেটা নাকি ভীষণ ভদ্র, শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত। এক কথায় আদর্শ পাত্র। কিন্তু শিরিনের কাছে সে এখন শুধুই রামছাগল। কারণ কোনো ভদ্রলোক কাউকে দেড় ঘণ্টা বসিয়ে রাখে না। আজ অফিসে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল। সেটা শেষ করেই ব্রেক টাইমে তাড়াহুড়ো করে এখানে এসেছে শুধু তার মায়ের জোরাজুরি আর দিব্যির কারণে। অথচ এখন মনে হচ্ছে, না এলেই ভালো হতো। সে বিরক্ত দৃষ্টিতে হাতঘড়ির দিকে তাকাল। দুপুর দুইটা পঁয়ত্রিশ। মানে আরো পাঁচ মিনিট পার হয়েছে। তার ধৈর্যের বাঁধ এবার সত্যিই ভাঙতে শুরু করল। সে ফোনটা হাতে নিয়ে মায়ের দেওয়া নাম্বারে কল দিল। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশে ভেসে এলো ভারী, শান্ত একটা পুরুষালী কণ্ঠস্বর,
“জি মিস শিরিন। বলুন, কী বলবেন?”
শিরিন কপাল কুঁচকে গেল। মনে হলো লোকটা তার নাম্বার চিনেছে। অবশ্য এর আগে একবার ফোনে লোকেশন পাঠিয়েছিল সে। কিন্তু ছেলেটার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলা এই মুহূর্তে তার মোটেও ভালো লাগল না। সে ঝাঁজালো গলায় বলল,
“কী বলবো মানে?”
ওপাশে এক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর শান্ত স্বরেই উত্তর এল, “আপনি কল দিয়েছেন। নিশ্চয়ই কিছু বলার জন্যই কল দিয়েছেন, রাইট?”
শিরিন এবার সত্যিই ক্ষেপে উঠল।
“মি. জিসান, আপনার কি কোনো মনভোলা রোগ আছে? নাকি কাণ্ডজ্ঞানের অভাব? না কি আমার সাথে মজা করছেন? কোনটা?”
“কোনোটাই না, মিস শিরিন। আর মজা আমি করছি না। মজা আপনারা করছেন। বিশেষ করে আপনি।”
শিরিন অবিশ্বাসে ফোস করে হেসে উঠল।
“ওয়াও! সিরিয়াসলি? আপনি আমাকে এক ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট বসিয়ে রেখে বলছেন আমি মজা করছি?”
“জি, অবশ্যই। কারণ একদিকে আপনি আমাকে আসতে বললেন, আর অন্যদিকে আপনার প্রেমিক আর ভাইকে আমার অফিসে পাঠিয়ে দিলেন কেন?”
শিরিন যেন মুহূর্তে জমে গেল। তার মুখের বিরক্তি মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিল বিস্ময়।
“এক্সকিউজ মি? আমার প্রেমিক? মি. জিসান, আপনার মাথা ঠিক আছে? আমার যদি প্রেমিকই থাকত তাহলে আপনার সাথে দেখা করতে আসতাম কেন?”
“দেখুন মিস শিরিন, আপনার মনে কী চলছে সেটা আপনি ভালো জানেন। কিন্তু আপনার ভাই আর আপনার তথাকথিত প্রেমিক এসে আমার অফিসে যা করেছে, সেটা ভদ্রতা ছিল না।”
শিরিনের ভ্রু কুঁচকে গেল। ওপাশ থেকে জিসান আবার বলল, “আপনার সেই প্রেমিক ভদ্রলোক তো সরাসরি আমাকে থ্রেট পর্যন্ত দিয়ে গেছে।”
শিরিন চেয়ার ছেড়ে প্রায় সোজা হয়ে বসল।
“হোয়াট!”
লোকটার গলায় এবার স্পষ্ট অপমানবোধ।
“জি। আর আমারও একটা সম্মান আছে মিস শিরিন। আমি চাই না এই বিষয়টা নিয়ে আর কোনো ঝামেলা হোক। আপনি ভালো থাকবেন। এটাই কামনা করি। আর সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।”
বলেই ওপাশ থেকে কলটা শিরিনের মুখের উপর কেটে দিল মায়ের সেই তথাকথিত সুপাত্র। ফোনের স্ক্রিনের দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে রইল শিরিন। অদ্ভুতভাবে তার বিরক্তিটা এবার আর আগের জায়গায় রইল না। বরং ভেতরে ভেতরে অন্যরকম একটা অস্বস্তি কাজ করতে লাগল। লোকটাকে প্রথমে রামছাগল মনে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এখন কথাবার্তায় তা মোটেও মনে হলো না। বরং বেশ ভদ্র, সংযত আর ম্যাচিউরই মনে হলো। মানে মায়ের ভাষায় সত্যিই সুপাত্র টাইপেরই মানুষ। 
এই মূহুর্তে শিরিনের মাথার ভেতর আগুন জ্বলছে। আর এই পুরো কাণ্ডটা যে নিহান আর সামিরের কারসাজি, সেটা বুঝতে শিরিনের একটুও বাকি রইল না।সে চেয়ার ঠেলে চলে যেতে নিলেই পিছন থেকে ওয়েটার ভদ্রভাবে ডেকে উঠল,
“ম্যাম… আপনার পাঁচ নাম্বার কফি।”
শিরিন ঘুরে তাকাল কফিটার দিকে। যেহেতু কোল্ড কফি ছিল, তাই নিজেকে ঠাণ্ডা করতে আর মাথার ভেতরের আগুন নিভানোর জন্যই জায়গায় দাঁড়িয়ে কফিটা এক চুমুকেই সাবার করল। ওয়েটারের হাতে বিলটা ধরিয়ে দিয়ে হনহন করে বেড়িয়ে আসল ক্যাফেটেরিয়া থেকে। জীবনে প্রথমবার কোনো পাত্রের সামনে বসতে রাজি হয়েছিল সে। আর সেই প্রথম অভিজ্ঞতাটাই অপমান আর তামাশায় পরিণত হলো!
প্রায় দশ-পনেরো মিনিট পর অফিসে পৌঁছাল সে।
কনফারেন্স রুমে সামির আর নিহান একটা নতুন প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করছিল। তখনই ঝড়ের বেগে ভিতরে ঢুকল শিরিন। তার চোখ-মুখ রাগে লালনহয়ে আছে। সামির আর নিহান কিছু বোঝার আগেই শিরিন হাতের ব্যাগটা তুলে এলোপাতাড়ি পেটাতে শুরু করল দুজনকে।
“আউচ! এই কি করছিস তুই!”
সামির চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে নিজেকে বাঁচাতে লাগল।
“সমস্যা কি তোর? মারছিস কেন? সবাই দেখছে!”
শিরিন আরো জোরে হাত চালিয়ে বলল,
“দেখুক! সবাইকে দেখিয়েই মারছি!”
নিহান টেবিলের একপাশে দাঁড়িয়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। পুরো ব্যাপারটা ভীষণ উপভোগ করছে সে।
সামির প্রাণ বাঁচাতে বাঁচাতে বলল,
“আরে আগে বলবি তো কি হইছে!”
শিরিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কি হইছে? কি হইছে জিজ্ঞেস করছিস? মি. জিসানের অফিসে গেছিস কেন তোরা?”
সামির দ্রুত দুই হাত তুলে মএমন ভঙ্গি করল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নির্দোষ মানুষ সে।
“দেখ আপা, আমি যেতে চাইনি। নিহান আমাকে জোর করে নিয়ে গেছে। আমি এসবের মধ্যে নাই!”
কথা শেষ করেই সুযোগ বুঝে দরজার দিকে সটকে পড়ল সে। এক দৌড়ে কনফারেন্স রুম থেকে উধাও। শিরিন ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে এবার তাকাল নিহানের দিকে। নিহান ঠোঁটে সেই বিখ্যাত চওড়া হাসিটা টেনে হাত নাড়ল।
“হাই মিস সিনিয়র! আই লাভ ইউউ।”
“নিহান!”
“ইয়েস জান? বলেন, আমি শুনতেছি।”
শিরিন তেড়ে আসতেই নিহান দ্রুত টেবিলের অন্য পাশে চলে গেল। এবার শুরু হলো পুরো কনফারেন্স রুমজুড়ে দৌড়াদৌড়ি। টেবিলের এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরছে দুজন।
শিরিন একদিকে গেলেই নিহান অন্যদিকে সরে যাচ্ছে।
তবুও মুখে তার সেই নির্লজ্জ হাসি।
“আপনি রাগলে কিন্তু আপনাকে আগুনের মতো সুন্দর লাগে মিস সিনিয়র।”
“চুপ! একদম চুপ!”
“ইচ্ছে করছে আপনার নাকের ঢগায় শক্ত করে একটা চুমু খেতে।”
“নিহান!”
“ইয়েস জান!”
উপায় না পেয়ে শিরিন নিজের ব্যাগটাই ছুড়ে মারল নিহানের দিকে। নিহান সেটা ক্রিকেটারের মতো নিখুঁত ক্যাচ ধরে নিয়ে দাঁত বত্রিশটা বের করে বলল,
“গুড ওয়ার্ক! বাট… আপনি আউট হয়ে গেছেন মিস সিনিয়র। আরেকটু প্র্যাকটিস করতে হবে।”
“নিহান! আই কিল ইউ!”
“এভাবে কেন বলছেন? আমি মরে গেলে আপনাকে কে ভালোবাসবে? কে চুমু খাবে?”
“আরেকবার এসব ছ্যাবলামি মার্কা কথাবার্তা বললে আমি সত্যি সত্যি তোমাকে মেরে ফেলব!”
নিহান বুকের উপর হাত রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“আই লাভ ইউ্যু জান… তবুও মাইরেন না।”
“নিহান!”
“ওরে বাপরে!”
শিরিন আবার তেড়ে যেতেই নিহান এবার সত্যি সত্যি ভয় পাওয়ার ভান করে এক দৌড়ে কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে গেল। পুরো অফিসে যেন ছোটখাটো বিনোদনের আয়োজন হয়েছে। অফিস স্টাফরা ইতোমধ্যে কাঁচের দেয়ালের ওপাশ থেকে সেইন দৃশ্যটাই উপভোগ করছিল।
নিহান চারদিকে তাকিয়ে দেখল সামির কোথায় নেই। শালা বদের হাড্ডি! এভাবেই বন্ধুকে ফেলে পালায় মানুষ? এই তার বন্ধুত্বের নমুনা! বেইমান কোথাকার! 
-------------
আজ সন্ধ্যার পর থেকেই খন্দকার ভিলার অন্দরমহলটা অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশিই জমজমাট। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা সবাই একত্র হয়েছে বিশেষ এক আলোচনায়। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুও সামির আর পিহুর বিয়ে। তাই তাহমিদ খন্দকার নিজেই সবাইকে ডেকে পাঠিয়েছেন। এখন সবাই অপেক্ষা করছে, তিনি কী বলেন সেটা শোনার জন্য। নিজের নির্দিষ্ট আরাম কেদারায় বসে আছেন তাহমিদ খন্দকার। সামনে রাখা চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে শেষ চুমুক দিয়ে একবার দৃষ্টি বুলালেন সবার দিকে। এরপর গলা পরিষ্কার করে গুরুগম্ভীর স্বরে বললেন,
“আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী সপ্তাহে গ্রামে যাবো। অনেকদিন ধরেই তোমার চাচারা আর চাচাত ভাইয়েরা ডাকছে। জমিজমা নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে। তাছাড়া... সামির আর পিহুর বিয়েটাও গ্রামের বাড়িতেই দেওয়ার কথা ভাবছি। তোমরা কী বলো?”
তাহের খন্দকার অবশ্য এ বিষয়ে খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। কারন তিনি আগেই অনুমান করেছিলেন। কিন্তু খাইরুল খন্দকারের কপালে সঙ্গে সঙ্গে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তিনি কিছুটা নড়েচড়ে বসে বললেন,
“সে বুঝলাম বাবা। কিন্তু সামির তো সেদিন পরিষ্কার বলেছে, সে পিহুকে বিয়ে করবে না। এত ঝামেলাও করল। তাহলে আবার এসব কথা উঠছে কেন?”
আইরিন খন্দকার পাশে বসেই ছিলেন। শান্ত স্বরে বললেন,
“ওসব তোমার ছেলের ঢং ছিল।”
“মানে?”
“মানে, রাতে খুব নাটক করে বলেছে বিয়ে করবে না। আর পরেরদিন সকালে আমার কলেজে গিয়ে পা ধরে বসে ছিল।”
কথাটা শুনে ঘরে চাপা হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়ল। খাইরুল খন্দকার বিরক্ত মুখে বললেন,
“এই ছেলের পা ধরার বদঅভ্যাস এখনো গেল না!”
শিরিন এতক্ষণ গম্ভীর হয়েই বসেছিল। কিন্তু এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হো হো করে হাসতে হাসতে প্রায় সোফার উপর গড়িয়ে পড়ল।
“সামির পা ধরছে? ইশশ! আমি এই দৃশ্যটা কেন মিস করলাম আল্লাহ!”
কুহুও এবার মুচকি হাসল। সামিরের মতো ছেলে পা মায়ের পা ধরে বসে থাকে? এটা তার কাছে বেশ উপভোগ্য লেগেছে। তাহমিদ খন্দকার আবার গম্ভীর হলেন।ধীরস্বরে বললেন,
“আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তোমার মায়ের নামে যে জমিটা আছে, সেখানে একটা স্কুল বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। ওই এলাকায় এখনো ভালো স্কুল নেই। গ্রামের বাচ্চাগুলো ঠিকমতো পড়াশোনার সুযোগ পায় না। আমি চাই, তোমাদের মায়ের নামে সেখানে একটা স্কুল হোক।”
একটু থেমে স্বাভাবিক স্বরে যোগ করলেন,
“এই ব্যাপারেও কথা বলতে হবে। তাই বেশ আমাকে কিছুদিন থাকতে হতে পারে গ্রামে।”
এইবার তাহের খন্দকার কিছুটা অবাক হলেন। বাবার মতের আপত্তি তুললেন।
“আপনার শরীর ভালো না বাবা। এতদিন গ্রামের বাড়িতে থাকা আপনার জন্য ঠিক হবে না। আমরা না থাকলে আপনার দেখভাল কে করবে?”
তাহমিদ খন্দকার নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন,
“সেটা পরে দেখা যাবে। আগে তো যাই।”
 
তখনই একসাথে অন্দরমহলের ভিতরে ঢুকল সৈকত, নিহান আর সামির। সৈকত এসে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাদুর পাশেই বসে পড়ল। তারপর কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“কি হচ্ছে এখানে? কোথায় যাবে তোমরা?”
আইরিন খন্দকার জবাব দিলেন,
“গ্রামে যাচ্ছি সবাই। তুমিও চলো। অনেক বছর তো যাও না।”
সৈকত মুখে বিশেষ কোনো আগ্রহ দেখাল না। বরং কেমন অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল,
“দেখি। ভালো লাগলে যাবো। না লাগলে তোমরা গিয়ে ঘুরে আসো।”
কুহু আড়চোখে তাকাল তার দিকে। সৈকতের মুখটা কেমন নিস্তেজ লাগছে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। ভিতরে ভিতরে কোনো অদৃশ্য বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে তা বোঝাই যাচ্ছে। সেদিনও সে দেখেছিল, সৈকত গভীর রাত পর্যন্ত হলঘরে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। কাউকে খুব মন দিয়ে দেখছিল হয়তো! কিন্তু কুহুর স্বভাবই এমন, অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারে না। তাই চুপ ছিল। আজও চুপ করে শুধু দেখে গেল। তবে সন্দেহটা বাড়লো বটে, কমলো না। এদিকে আইরিন খন্দকার এবার নিহানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“নিহান, তুমিও চলো। তেমার বন্ধুর বিয়ে, তুমি না থাকলে হয়?”
নিহানের চোখ সঙ্গে সঙ্গে শিরিনকে খুঁজল। তার ধারণা ছিল, শিরিন নিশ্চয়ই যাবে না। তাই খুব ভদ্র একটা অজুহাত দাঁড় করিয়ে বলল,
“না আন্টি… সবার সাথে আমিও গেলে অফিস সামলাবে কে?”
সামির কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“আমাদের সাথে আপাও কিন্তু যাবে।”
এক মুহূর্তে নিহানের সিদ্বান্ত বদলে গেল। মুখে সেই চিরচেনা চওড়া হাসি ফুটিয়ে কৃত্রিম গাম্ভীর্য এনে বলল,
“যাবো আন্টি! অবশ্যই যাবো!”
আইরিন খন্দকার ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। নিহান হেহে করে হেসে কপাল চুলকে বলল, 
“না মানেয়ে... শুধু কাজ নিয়েই পড়ে থাকলে তো হবে না। মাঝে মাঝে গ্রামের নির্মল হাওয়া-বাতাস খাওয়াও প্রয়োজন। তাই না আন্টি?”
সামির দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,
“শালা বেইমান! মুহূর্তেই কেমন গিরগিটির মতো রং পাল্টে ফেলল!”
চলবে.....
(কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ 🚫, চাইলে লিংক শেয়ার করতে পারেন।)
নোট: আপনাদের গল্পটা ভালো না লাগলে আর কন্টিনিউ করবো না। ঠিকঠাক রেসপন্স করেন না কেন আপনারা? 
কাদের জন্য কষ্ট করে লিখছি! অন্তত ২k লাইকও তো হওয়া উচিত! আমাকে খুবই হতাশ করছেন আপনারা। আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি। দুঃখিত!
হ্যাপি রিডিং 🫶🏻

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন