ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আমার নীল নেশা

১৪তম পর্ব

লেখক: ফাতেমা ফারিয়াল

#তুমি_আমার_নীল_নেশা [পর্ব সংখ্যা - ১৪]

#লেখনীতে_ফাতেমা_ফারিয়াল 
ভোরের স্নিগ্ধতা কাটিয়ে সূর্য তখন মধ্যগগনে আরোহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাতের এক পশলা বৃষ্টির পর ধুয়ে যাওয়া প্রকৃতিতে এখন মিঠে রোদ্দুর। সেই সোনাঝরা রোদ চাদরের মতো গ্রাস করছে অলিন্দপুরের এই ছোট্ট, শান্ত গ্রামটাকে। নদীর পাড় ঘেঁষে মাটির পথ ধরে এক ঝাঁক রাজহাঁস হেলেদুলে, ডানা মেলে হেঁটে চলেছে আপন মনে। ​সবুজ ধানখেতের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সরু আইলপথ। সেখানে পাখির ডানার মতো দুই হাত মেলে, বুকভরে অনাবিল উচ্ছ্বাসে ছুটে চলছে পিহু। বাতাসে উড়ছে তার ওড়নার দুই কোম, আর লাল ফিতে দিয়ে বাঁধা লম্বা বেণিটা পিঠের ওপর তালে তালে নাচছে। তার ঠিক পেছনেই শিরিন আর তিয়াসা। গ্রামের এই উন্মুক্ত প্রকৃতি আর বুকভরে শ্বাস নেওয়ার আদিম স্বাধীনতা শিরিনকে বদলে দিয়েছে। সে যেন নিজের বয়স ভুলে এই বাচ্চাদের সাথে মিশে এখন পুরোপুরি এক চঞ্চল শিশু হয়ে গেছে; ওরা যা করছে, শিরিনও ঠিক তা-ই করার চেষ্টা করছে অবিকল।
​নদীর পাশ ঘেঁষে সারি সারি লম্বা তালগাছ আকাশপানে চেয়ে আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সামিররা। পানিতাল পাড়ার জন্য জিহাদ কোমর বেঁধে স্থানীয় এক দূরন্ত ছেলেকে জোগাড় করেছে। সেই ছেলেটি চটপট গাছে উঠে একের পর এক তালের ছড়া নিচে ফেলছে। আর মহিদ একটা ধারালো দা দিয়ে নিখুঁত কোপে সেগুলো কেটে ভেতরের নরম তালের শাঁস সবাইকে বিলিয়ে দিচ্ছে।
​সামির একটা পশ্যাওলা ধরা গাছের গুঁড়ির ওপর বসে একমনে চেয়ে আছে ওই দস্যিমেয়েটার দিকে। তার চোখে পিহু হলো ডানা ছাড়া এক চঞ্চল পাখি। উপরওয়ালা যদি তাকে সত্যি ডানা দিতেন তবে এই মেয়ে হয়তো কখনোই মানুষের ধরাছোঁয়ার সাধ্যে থাকত না। সীমানা ছাড়িয়ে নীল আকাশে মিলিয়ে যেত। ​এমন সময় সামিরের পাশে এসে ধপ করে বসল জিহাদ। সে বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ সামিরের এই একদৃষ্টে চেয়ে থাকা লক্ষ্য করেছে। এবার কনুই দিয়ে সামিরকে একটা মৃদু গুঁতো দিয়ে নিচু স্বরে বলল, 
“বড্ড দুরন্ত মেয়ে এই পিহু। ওর মতো এমন একটা ছটফটে, ডানপিটে মেয়ে তোর মনে ধরল কীভাবে রে সামির? কী দেখে ওরে নিজের মনটা দিয়ে বসলি?”
​জিহাদের আকস্মিক কথায় সামির কিঞ্চিৎ চমকে উঠল। তবে পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে দৃষ্টি না সরিয়েই বলল, 
“এটা তো আমারও জানা নেই জিহাদ! জলদস্যুদের মতো আচমকা এই দস্যিমেয়েটা এসে আমার বাঁ পাশের হৃদয়ে অতর্কিতে হামলা করল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডাকাতি করে নিল আমার মন। আমি তো এর জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুতও ছিলাম না।”
​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সৈকত একঝলক তাকাল তার ছোট ভাইয়ের মুখপানে। সামিরের চোখের সেই গভীর আকুলতা দেখে সৈকতের ঠোঁটে এক মলিন, বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। একটা দীর্ঘ, ভারী শ্বাস ফেলে সে বলল, 
“তাহলে অবশেষে আমার ভাইটা বন্দি হলো কারও মায়াজালে? তোর এই একাকী জীবনে তাহলে নোঙর পড়ল অবশেষে?”
​সামির জবাবে আর কোনো শব্দ খরচ করল না। শুধু মৃদু হাসল। ক্ষণিক বাদে জিহাদ আবার বলে উঠল, 
“অবশ্য পিহুর কাজই এইডা! গোটা গ্রামের অর্ধেক ছেলেই ওর জন্য পাগল। তবে মতব্বরের পোলা নয়ইন্নার ভয়ে কেউ মুখ ফুটিয়ে কিছু বলার সাহস পায় না। এমনই কিছু শুনছিলাম কদিন আগে!”
​কথাটা শুনতেই সামিরের দুই ভ্রুর মাঝখানে একটা কুঁচকানো ভাঁজ পড়ল। সে তীক্ষ্ণ স্বরে আওড়াল, 
“নয়ন?”
​পরক্ষণেই সামিরের মস্তিষ্কের নিউরনগুলো বিদ্যুতের গতিতে জানান দিল পিহু এই নয়নের ব্যাপরে একবার বলেছিল। তার মানে ওটা পিহুর বানানো কোনো গল্প ছিল না, সত্যি এই নামে কেউ একজন আছে! 
​জিহাদ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, 
“হ, নয়ন। পিহুর ওপর নাকি বহুত নজর হের, বিয়ে করতে চায়। এখন তোর সাথে পিহুর বিয়ের কথা পাকাপাকি শুনলে ওই ত্যাঁদড় পোলা কোন কাণ্ড ঘটায়, কে জানে!”
সামির হালকা নড়েচড়ে বলল,
“এই নয়নের সাথে মিট করিয়ে দিস তো! আমিও তো দেখি বিয়ের কথা শুনে গরু চোরা নয়ন কি রিয়েকশন দেয়।”
“তোর মাথা খারাপ? নয়ন মেলা ভেজাইল্যা পোলা। ঝামেলা করব।”
“আমিও কম ভেজাইল্যা না। ঠ্যাং ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দিব।”
“থাক ভাই, এত ভেজাল করার কাম নাই। ভালোয় ভালোয় বিয়াডা কর, পরে যা করার করিস!”
এই বলে জিহাদ তালের শাঁস নিতে মহিদের দিকে চলে গেল। ​সৈকত তখনো একটা তালগাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে উদাসীন চোখে দাঁড়িয়ে ছিল। সামির এবার ভাইয়ের দিকে ফিরে তীরের মতো একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, 
“তোর নিজের জীবনে কবে নোঙর পড়বে রে সৈকত ভাই? এভাবে আর কতদিন সবার থেকে মুখ লুকিয়ে, নিজেকে আড়াল করে বেড়াবি? এবার তো মেনে নে সবার কথা! এবার তো অন্তত স্বাভাবিক হ!”
​সৈকতের মুখটা এক পলকে কঠোর হয়ে গেল। সে চট করে সামিরের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল, 
“সম্ভব না।”
“​জানতাম তুই এটাই বলবি।”
সামির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ​সৈকত আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সে শুধু সুদূরের শূন্য আকাশের দিকে নিশ্চল, নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে রইল। সামির ভাইয়ের এই নীরবতা সহ্য করতে না পেরে আবারও বলল, 
“সৈকত ভাই, আমি জানি তোর জন্য অতীত ভুলে এভাবে একটা স্বাভাবিক জীবন পার করা কতটা কষ্টের। কিন্তু তাই বলে কি তুই তোর গোটা জীবনটা এভাবেই একটা জ্যান্ত লাশের মতো পার করে দিবি?”
“​হ্যাঁ।” সৈকতের সংক্ষিপ্ত ও চূড়ান্ত উত্তর।
​সামির আরও কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু তার আগেই দূর থেকে মহিদের চড়া গলা ভেসে এল, 
“সৈকত ভাই! এদিকে আসেন, আপনার তালের শাঁস রেডি!”
সৈকত আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।রোবটের মতো হেঁটে চলে গেল সেদিকে। ​সামির আবারও দৃষ্টি ফেরাল খেতের আইলের দিকে। মেয়েটার দস্যিপনা আর ছোটাছুটির যেন কোনো বিরাম নেই, ক্লান্তি নেই। গতকাল দুপুরে যে। পায়ে এত বড় একটা চোট পেল, নখ উপড়ে রক্ত বেরোল আজ তাকে দেখে তা বোঝার বিন্দুমাত্র উপায় নেই। সে যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি।
​সামির নিজের মাথাটা পিছনের গাছের গুঁড়ির সাথে ঠেকাল। একঝলক মুক্ত দখিনা বাতাস এসে তার কপালের অবিন্যস্ত চুলগুলোকে অনবরত দোলাতে লাগল। পিহুর ওই বাঁধনহারা ছোটাছুটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, সামিরের অবচেতন মন থেকে হঠাৎ করেই একটা চেনা গানের সুর গুনগুনিয়ে বেরিয়ে এল। সে নিচু কিন্তু প্রগাঢ় স্বরে গাইতে শুরু করল,
“​যে পাখি ঘর বোঝেনা,
উড়ে বেড়ায় বন বাঁদাড়ে...
ভোলা মন মিছে কেন,
মনের খাঁচায় রাখিস তারে?
​ও পাখি বাঁধনহারা ছন্নছাড়া,
মানেনা প্রেমের শিকল,
ও পাখি দশ দুয়ারে, শত মন করে দখল...
যে পাখি ঘর বোঝেনা...
যে পাখি ঘর বোঝেনাআআ...”
★
দুপুরের সূর্য তখন ঠিক মধ্যগগনে। প্রায় অর্ধেক গ্রাম ঘুরে ক্লান্ত পায়ে সবাই এসে বসল চিত্রা নদীর এক নিভৃত ঘাটে। মাথার ওপর সূর্য খাড়া থাকলেও ভোরের বৃষ্টির রেশ ধরে বাতাসে এক অদ্ভুত শীতল ভাব ছড়ানো। নদীর ওপর অলসভাবে ঝুঁকে পড়া একটা বুনো গাছের ডাল। তারই ওপর জাঁকিয়ে বসে টলটলে নদীর পানিতে পা ডুবিয়ে দোল খাচ্ছিল পিহু। তিয়াসা এই বুনো রোমাঞ্চ দেখে যেমন রোমাঞ্চিত, তেমনই ভীত। সে বেশ ভয় ভয় বুকে, পিহুর কামিজ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ডালটার ওপর গিয়ে বসল। নিচে প্রবহমান নদীর স্রোত দেখে তার বুক কাঁপছে। সে ফিসফিস করে বলল, 
“এই পিহু, আমি কিন্তু একদম সাঁতার জানি না। কোনোভাবে যদি হাত ফসকে পড়ে টড়ে যাই, তখন কী হবে?”
​পিহু অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে তিয়াসার কাঁধে হাত রেখে চওড়া হাসল, 
“আরে নো টেনশন! পিহু হ্যায় না? এই পিহু থাকতে তোমার কিচ্ছু হবে না। তুমি যদি টুস করে পানিতে পড়ো, আমি টাস করে তোমারে টেনে ওপরে তুইলা নিমু। তাছাড়া এই যে জিহাদ ভাইয়া, মহিদ ভাইয়া, তমা, মুন্না, টুম্পা, হুমায়রা আপু, আমরা এখানে যারা আছি সবাই পানির পোকা, খাঁটি সাঁতারু। এত ভয় পাইয়ো না তো!”
​তিয়াসা অবাক হয়ে তমা, মুন্না আর টুম্পার দিকে তাকিয়ে বলল, 
“ওরাও সাঁতার জানে?”
​পাশ থেকে জিহাদ তালের কথা কেড়ে নিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল, 
“আরে মিস তিয়াসা, আমাদের অলিন্দপুর গ্রামে দুধের শিশুও সাঁতার জানে। নদীতে এনে ছেড়ে দিলে এক ডুবে নদীর ওপারে গিয়ে উঠবে!”
​ঠিক তখনই মহিদ ঘাটের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সামির আর নিহানকে টেনে বলল, 
“চল, জামাকাপড় ছাড়। এই রোদে নদীতে একটা ডুব দিই, দেখবি শরীর-মন কেমন জুড়ায়া যাইব।”
​সামির একদণ্ড আড়চোখে তাকাল গাছের ডালে বসা পিহুর দিকে। সে কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে মহিদের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, 
“আরেহ ছাড় তো! আমি সাঁতার জানি না। যদি পা স্লিপ কেটে মাঝনদীতে তলিয়ে যাই?”
​মহিদ গ্রামীণ সরলতায় এত বড় এক 'বিলেতফেরত' ইঞ্জিনিয়ারের সাঁতার না জানার রহস্যটা হজম করতে পারল না। সে বড় বড় চোখ করে উচ্চস্বরে পুরো ঘাট কাঁপিয়ে বলে উঠল, 
“কী বললি তুই? এত বড় ধামড়া পোলা হয়ে তুই আসলেই সাঁতার জানোছ না?”
​কথাটা বাতাসে ভাসতেই গাছের ডালে বসা পিহু খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। সামির মনে মনে নিজের কপাল চাপড়াল। সে জানত এই কথা প্রকাশ পেলে দস্যিমেয়েটা তাকে অবজ্ঞা করার সুযোগ ছাড়বে না; সেই ভয়েই মহিদের কানে ফিসফিসিয়েছিল। কিন্তু মহিদ বোকামি করে পুরো গোপন তথ্য ফাঁস করে দিল।।​পিহু ডাল থেকে পা নাচাতে নাচাতে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলল, 
“হা হা! এত বড় ধামড়া পোলা বলে কি না সাঁতার জানে না! লজ্জাও করে না!”
​সামিরের ফর্সা মুখটা মুহূর্তে লাল হয়ে গেল। তখনই পাশ থেকে হুমায়রা পিহুর মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরে চোখ রাঙাল,
“কী করতেছিস পিহু, চুপ থাক! মুখে লাগাম দে। আর একদিন বাদে এই ছেলের সাথেই তোর বিয়ে। নিজের হবু স্বামীকে এভাবে সবার সামনে ভেংচি কাটে কেউ? মানুষ কী বলবে?”
​পিহু সইতে না পেরে হুমায়রা আপুর হাতের নিচ থেকেই চোখমুখ কুঁচকে সামিরের দিকে তাকিয়ে আরেকবার মুখ ভাঙচিয়ে ডাল থেকে লাফ দিল নদীর বুকে। পিহুর দেখাদেখি মহিদ, জিহাদ, তমা, মুন্না সবাই একে একে টুপুস-টাপুস শব্দে চিল পাখির মতো লাফিয়ে পড়ল নদীর শীতল পানিতে। পুরো ঘাট এক নিমেষে জলকেলির কলতানে মুখরিত হয়ে উঠল।
​তীরের দিকে কোমর সমান পানিতে নেমে দাঁড়িয়ে ছিল শিরিন। বাকিদের এভাবে ডলফিনের মতো ডাইভ দিতে দেখে তারও খুব ইচ্ছে হচ্ছিল একটু গভীর পানিতে যেতে কিন্তু সেও সাঁতারের 'স'-ও জানে না। এদিকে নিহান নিজে সাঁতার না জানলেও তীরে দাঁড়িয়ে শিরিনের জন্য তার উদ্বেগের শেষ নেই। সে ঘাটের সিঁড়িতে পা ডুবিয়ে বসে, দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে কাতর গলায় বলতে লাগল, 
“মিস সিনিয়র, দোহাই আপনার, ওপরে উঠে আসুন প্লিজ! আপনি যদি কোনোভাবে ওই গভীর পানিতে তলিয়ে যান, তবে আমার এই অভাগা জীবনের কী হবে বলুন? আমি কাকে নিয়ে বাঁচব? কাকে প্রতিদিন ওভাবে ভালোবেসে চুমু খাব? প্লিজ জান, লক্ষ্মীটি, ওপরে উঠে আসুন!”
​শিরিন পানির মাঝখানে দাঁড়িয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “তোমার এই সস্তা ন্যাকামি আর প্যানপ্যানানি শোনার চেয়ে এই নদীতে ডুবে মরাও আমার জন্য অনেক ভালো। বেশি বকবক করলে সত্যিই কিন্তু মাঝনদীতে ঝাঁপ দেব আমি!”
“​না, জান! এই নাদান আশিকের মনের অবস্থাটা একটু বুঝুন!" নিহান বুকে হাত দিয়ে কাল্পনিক কান্নার অভিনয় করে বলল, "আপনি এমন করলে আমার বড্ড কষ্ট লাগে। প্লিজ উঠে আসুন। কথা দিচ্ছি, আপনি ওপরে এলে আপনাকে অনেকগুলো চুমু খাব। এই নাগের ডগায় শক্ত করে কামড়ে দেব, তবুও উঠে আসুন। প্লিজ!”
​শিরিনের ধৈর্যের বাঁধ এবার ভাঙল। সে নিহানের এই নির্লজ্জতা থামাতে এক কদম এগিয়ে এসে নিহানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা খপ করে ধরল। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজের দিকে এক হ্যাঁচকা টান দিল। নিহান 'ওরে বাবাগো' বলে একটা আর্তচিৎকার দিয়ে ছলাৎ করে আছড়ে পড়ল নদীর কর্দমাক্ত পানিতে। ​নাক-মুখে পানি ঢুকে নিহান যখন হাঁসফাঁস করতে করতে উঠে দাঁড়াল। ভেজা বিড়ালের মতো মুখ করে বলল, 
“জান! এটা কী করলেন আপনি? আমি যদি এই নদীর তীব্র স্রোতে ভেসে যেতাম, কে আপনাকে এমন পাগলের মতো ভালোবাসত? কে আপনার ওই রাগী মুখে চুমু খেত?”
​শিরিন পানির নিচে নিহানের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল যাতে সে তলিয়ে না যায়। তবে গলার আওয়াজ ও চোখের দৃষ্টি কঠোর করে বলল, 
“নদীতে অনেক কুমির আছে। কুমির এসে চুমু খাবে।”
“এত বড় সাহস? কোন ব্যাটা কুমির আমার সম্পত্তির দিকে নজর দেয়? আসুক দেখি! সেই ব্যাটা কুমিরের ঠোঁট কেটে আমি মাঞ্জা মেরে রোদে শুকোতে দেব!”
​নিহানের এই অসম্ভব রসিকতা শুনে হাসির রোল পড়ে গেল। ​এদিকে সুযোগ বুঝে জিহাদ ও মহিদ দুজনে মিলে টেনেটুনে, জোরাজুরি করে সামিরকেও নামিয়ে আনল বুক সমান পানিতে। সামির পানির ঠান্ডা স্পর্শে প্রথমে একটু আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনই সে খেয়াল করল, একটু দূরে দাঁড়িয়ে পিহু তার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে আর ঠোঁট চেপে মিটিমিটি হাসছে। ​এই মেয়েটা তাকে দেখে এভাবে বিদ্রূপের হাসি হাসছে কেন সামির বুঝতে পারল না। তবে স্পষ্ট টেোর পেল পিহুর ওই সিক্ত অবয়ব আর ঠোঁটের কোণের মিঠে হাসির রেশ সরাসরি এসে তার বক্ষদেশে এক তীব্র তোলপাড় ও তাণ্ডব সৃষ্টি করেছে। সামির নিজের ভেতরের এই ব্যাকুলতা লুকাতে পিহুর দিকে তাকিয়ে নিজের ডান ভ্রুটা হালকা উঁচু করল। ​সামিরের সেই পৌরুষদীপ্ত চাউনি দেখে পিহু হঠাৎ করেই থতমত খেয়ে গেল। বুকের ভেতরটা যেন একটা অজানা কম্পনে কেঁপে উঠল। সে চট করে নিজের চঞ্চল দৃষ্টি সামিরের মুখ থেকে সরিয়ে নদীর পানির দিকে ফিরিয়ে নিল। এটা দেখে ইঞ্চিৎ হাসলো সামির। দস্যিমেয়ে অজান্তেই ধরা দিয়েছে তার বোনা জালে। ​পরক্ষণেই সবাই জল ছিটানোর খেলায় মেতে উঠে। অলিন্দপুরের এই নদীঘাট যেন কিছুক্ষণের জন্য এক টুকরো স্বর্গ হয়ে উঠল।
★
রাবেয়া বেগম সবেমাত্র দুপুরের রান্নাবান্নার ঝক্কি-ঝামেলা শেষ করে ক্লান্ত শরীরে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসলেন। কপালে জমে থাকা ঘামটা আঁচল দিয়ে মুছে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তবে বসার জো নেই। শাশুড়ির গোসল করার সময় হয়ে গেছে। তিনি উঠোনের টিউবওয়েল চেপে বালতি ভরে রেখে অন্দরে গেলেন শাশুড়িকে ডেকে আনতে। তখনই তার নজরে পড়ল জানালার ধারে বসে আছে কুহু। মেয়েটা কেমন এক অদ্ভুত উদাসীনতা আর শূন্যতা নিয়ে তাকিয়ে আছে অদূরের সবুজ গাছপালা আর সুনসান দুপুরের দিকে। রাবেয়ার বুকের ভেতরটা মুহূর্তের মধ্যে চিনচিন করে উঠল। এক মাতৃত্বের সূক্ষ্ম ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল তার হৃদয়ের গহিনে। পিহুর বিয়ে নিয়ে এত হুল্লোড়, এত আনন্দ, অথচ তার বড় মেয়েটার জীবনটা যেন এক নিশ্চল পাথর হয়ে জমে আছে। মেয়েটাকে এখন আর আগের মতো হাসতেই দেখা যায় না, যেন হাসতে ভুলেই গেছে সে।
​রাবেয়া অত্যন্ত ধীর পায়ে গিয়ে মেয়ের পাশে বসলেন। মায়ের গায়ের চেনা শাড়ির সুবাস আর আলতো উপস্থিতি টের পেয়ে কুহু চমকে উঠল। চট করে মুখটা ঘুরিয়ে, চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুটুকু লুকিয়ে মুছে নিল। রাবেয়া মেয়ের পিঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে পরম মমতাময়ী কণ্ঠে ডাকলেন, 
“কুহু।”
​কুহু জোর করে ঠোঁটের কোণে একটা মলিন, কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে মায়ের দিকে চাইল, 
“কিছু বলবা আম্মা? কোনো কাজ করা লাগবে? আমাকে বলো, আমি সব গুছিয়ে করে দিচ্ছি।”
​রাবেয়া মেয়ের দিকে নির্বাক চেয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। এই মেয়েটার ভেতরে যতই ঝড় বয়ে যাক তা সে কখনো মুখে প্রকাশ করে না। ছোটবেলা থেকেই কুহুটা এমন! সব কষ্ট একাই গিলে ফেলে, কাউকে বুঝতেই দেয় না। কিন্তু রাবেয়া তো মা! দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করা মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া কি এতই সহজ? তিনি মেয়ের ভেতরের সবটুকু হাহাকার স্পষ্ট বুঝতে পারেন।
​রাবেয়া কুহুর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন,
“কুহু, আমার মা। একদম মন খারাপ করবি না! আমি বলেছি না সব ঠিক হয়ে যাবে? তোর আম্মা যতদিন এই দুনিয়ায় বেঁচে আছে, ততদিন তোর আম্মার ওপর ভরসা রাখ। মানুষ কি বলে না বলে এসব নিয়ে তুই একদম চিন্তা করবি না মা!”
​মায়ের মুখের এই সান্ত্বনা আর আশ্বাসের বাণী যেন কুহুর ভেতরের বাঁধভাঙা কান্নার দেয়ালটাকে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মায়ের বুকে আছড়ে পড়ে হু হু করে কেঁদে উঠল। কান্নার তীব্র তোড়ে কুহুর সাথে সাথে রাবেয়ার শরীরটাও কেমন দুলতে লাগল। রাবেয়ার নিজের ভেতরটাও যেন মেয়ের যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। ​কুহু মায়ের বুকটা খামচে ধরে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, 
“আম্মা! ও আম্মা! আমি কী দোষ করেছি বলো না? আল্লাহ কেন আমার কপালে এত বড় দুঃখ লিখে রাখল? আমি দিন-রাত এত ফরিয়াদ করি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে এত দোয়া করি, কাঁদি... আল্লাহ কি পারেন না আমার কোলে একটা সন্তান দিতে? কেন তিনি আমার দিক থেকে মুখ ফিরায়া রাখলেন আম্মা? কেন আমাকে একটা বার মা ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত করে রাখলেন? আমি এমন কী পাপ করেছি? কোন পাপের সাজা হিসেবে আমি প্রতিদিন এই বন্ধ্যা নামের কলঙ্ক মাথায় নিয়ে ঘুরছি, আম্মা? আমি আর পারছি না আম্মা আমি সত্যি আর পারছি না!”
​মেয়ের এই বুকফাটা আর্তনাদে রাবেয়ার নিজের বুকটাও খাঁ খাঁ করে উঠল। তিনি মেয়ের পিঠে অস্থিরভাবে হাত বুলাতে লাগলেন, নিজের চোখের পানি চেপে রেখে অবরুদ্ধ গলায় বললেন, 
“কাঁদবি না! একদম কাঁদবি না মা। নিজেকে কেন এত দুর্বল ভাবছিস তুই? তোর আম্মা-আব্বা এখনো বেঁচে আছে কুহু! তোর এখনো গোটা জীবনটা পড়ে আছে। এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। আল্লাহ চাইলে যেকোনো মুহূর্তে তোর এই ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন। একটু ধৈর্য ধর মা, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। সমাজ আর শ্বশুরবাড়ির মানুষের ওইসব কটু কথা নিয়ে তুই একদম ভাববি না।”
​কুহু মায়ের বুকে আরও শক্ত করে লেপ্টে গিয়ে এক করুণ, আহাজারির সুরে বলতে লাগল, 
“আম্মাআআ, ও আম্মা, আম্মা গো! আমার যে আর ধৈর্য ধরার মতো তিল পরিমাণ শক্তি নাই আম্মাআআ... আমিও তো একটু সুখ চাই। বাকি আট-দশটা মেয়ের মতো আমিও একটু সুখী হতে চাই। আমার কপালে কি কোনোদিনই সুখ নাই আম্মা?”
​রাবেয়ার চোখ বেয়ে এবার অজোরে পানি পড়তে লাগল। চোখের লোনা জল মেয়ের চুলে মিশে একাকার হয়ে গেল। তিনি পরম আদরে মেয়েকে বুকে চেপে ধরে তার মাথায়, কপালে, চোখে অজস্র মাতৃত্বের স্নেহচুম্বন এঁকে দিয়ে বললেন, 
“আজকে তোর আব্বা আসিফকে আনতে যাবে। বাড়িতে যখন আসবে, তখন আমরা সবাই মিলে ওকে বুঝায়া বললে আসিফ ঠিক বুঝবে, দেখিস! সব আবার আগের মতো ঠিক হয়ে যাবে।”
​কুহু মায়ের বুক থেকে মাথাটা সামান্য তুলে ভেজা চোখে তাকাল, “কবে ঠিক হবে আম্মা... আর কবে? আমি মরে যাওয়ার পর?”
​রাবেয়া এবার মেয়ের এমন নেতিবাচক কথা শুনে শাসনের সুরে, কিছুটা কঠোর হয়ে বললেন, 
“ছি! ছি! ওমন অলক্ষুণে কথা মুখে আনতে নেই কুহু। দ্বিতীয়বার যদি এমন কথা তোর মুখে শুনেছি, তবে খুব খারাপ হবে বলে দিলাম!”
​কুহু আর কোনো কথার উত্তর দিল না। নিঃশব্দে মায়ের বুকে মুখ গুঁজল। মায়ের চেনা আঁচলের ওমে বুক হালকা করার চেষ্টা করতে করতে কেবল চোখের পানি ফেলতে লাগল। এই আবেগঘন মুহূর্তেই বাইরে উঠোন থেকে কুহুর দাদি হরমুজা বেগমের চড়া এবং ছ্যাঁতছ্যাঁত করা গলার আওয়াজ ভেসে আসল, 
“এই ছ্যারা! তুমি কেডা? কোনো কথা নাই বার্তা নাই, সোজা বাড়ির ভেতরে লদম দেওয়ার সাহস হইলো কেমন কইরা? এত বড় ধামড়া পোলা, একটা গলা ঝাড়া দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে হয়, এই ভদ্রতাটুকুও জানো না?”
​বাইরে থেকে তখন একটি অত্যন্ত সাবলীল, শান্ত অথচ সুমিষ্ট পুরুষালি কণ্ঠস্বর শোনা গেল, 
“আমি আসলে খুবই দুঃখিত দাদি! বুঝতে পারিনি। আমার নাম সৈকত। চিনেছেন হয়তো? আপনি চাইলে আমি আবার বাইরে গিয়ে একটা জোরসে গলা ঝাড়া দিয়ে ভেতরে আসব?”
​হরমুজা বেগম ক্ষণিকের জন্য থতমত খেলেন। তারপর সুর নরম করে বললেন, 
“সৈকত? ও আচ্ছা! তুমি তাহমিদ খন্দকারের নাতি সৈকত? বিলেতফেরত পোলার ভাই?”
সৈকত বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল,
“​জি দাদি! আমিই সে। ভালো আছেন আপনি?”
“​আছি ভালাই! তয় এই ভর দুপুরে কড়া রোদের মধ্যে এই বাড়িতে আইলা যে? কোনো দরকারি কাম আছে?”
বুড়ির কণ্ঠে তীব্র কৌতূহল। ​সৈকত কিছুটা অস্থির ভঙ্গিতে নিজের দুই হাত কচলাল। তারপর চারিদকে কেমন যেন এক অনুসন্ধানী চোখে তাকাল। মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বলল, 
“জি না দাদি! তেমন কোনো কাজ নেই। এমনি... জাস্ট গ্রামটা ঘুরতে ঘুরতে এদিকে এলাম, তাই ভাবলাম একটু দেখে যাই!”
​ততক্ষণে ঘরের ভেতরের করুণ দৃশ্যপট বদলে গেছে। রাবেয়া বেগম নিজের চোখমুখ চটপট আঁচল দিয়ে মুছে অন্দরমহল থেকে তড়িঘড়ি করে বাইরে বেরিয়ে আসলেন। সৈকত রাবেয়াকে দেখেই বিনীতভাবে সালাম দিল। রাবেয়া কিছুটা অস্থির হয়ে তাকে উঠোনের পিঁড়িতে বসতে দিলেন এবং ভেতরে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মেহমানদারির জন্য।​এদিকে অন্দরমহলে জানালার পাশে বসে থাকা কুহু দাদির চিৎকারে বাইরে কী হচ্ছে তা দেখার জন্য জানালার গ্রিল গলে তাকিয়ে রইল। তার কান্নার তোড় এখনো পুরোপুরি কমেনি। বুকটা তখনো কামড়াচ্ছে। কান্নার রেশ ধরে তার ক্লান্ত, শীর্ণ দেহটা হালকা দুলছিল। ​উঠোনে বসে থাকা সৈকতের তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী চোখ জোড়া জানালার ওপাশে থাকা সেই বিষণ্ণ, দোদুল্যমান অবয়বকে ফাঁকি দিতে পারল না।
চলবে......
(কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ 🚫, চাইলে লিংক শেয়ার করতে পারেন।)
হ্যাপি রিডিং 🫶🏻

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন