#তুমি_আমার_নীল_নেশা [পর্ব সংখ্যা - ১৬]
#লেখনিতে_ফাতেমা_ফারিয়াল
পরিস্থিতি এখন কিছুটা স্বাভাবিক। বিয়েবাড়ির বাতাসে যে উটকো উত্তেজনার বারুদ ছড়িয়ে পড়েছিল তা অত্যন্ত চতুরতার সাথে ধামাচাপা দিয়ে সামির, নিহান ও জিহাদ আবার নিজেদের নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে বসল। চারদিকের গুঞ্জন থামতেই মৌলভি সাহেব বড়দের অনুমতি নিয়ে আকদের বাকি নিয়মকানুন সব মিটিয়ে দোয়া-কলমা পড়তে শুরু করলেন। এরপর সামিরের চূড়ান্ত মতামত চেয়ে বললেন,
“আপনি অলিন্দপুরের উপস্থিত সকলের সামনে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে, মোরশেদ তালুকদারের কনিষ্ঠা কন্যা তাসনিয়া তালুকদার পিহুকে পঁচিশ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া নিজের বৈধ স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে সম্মত আছেন? সম্মতি থাকলে আল্লাহর নাম নিয়ে তিনবার বলুন, আলহামদুলিল্লাহ কবুল!”
সামির সোজা হয়ে বসল। তার চোখ জোড়া একবার অলক্ষ্যে আড়চোখে তাকাল অন্দরমহলের দিকে। আজ এই বাড়িতে আসার পর থেকে এক ঝলকের জন্য ও ওই দস্যিমেয়েটাকে দেখার সুযোগ মেলেনি। বধু সাজে তাকে এখন কেমন দেখাচ্ছে তা জানার জন্য সামিরের বুকের ভেতরে এক তীব্র তাণ্ডব আর আকুলতা চলছিল। পাশে বসা সৈকত কনুই দিয়ে হালকা খোঁচা দিতেই সামির নিজের ভাবাবেগ সামলে নিয়ো গলাটা সামান্য পরিষ্কার করে স্পষ্ট ও প্রগাঢ় উচ্চারণে বলল সেই অমোঘ শব্দ,
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল!”
একে একে, পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে তিনবার উচ্চ স্বরে সে এই পবিত্র শব্দ উচ্চারণ করল। বরের সম্মতি আসতেই মজলিসে উপস্থিত সবাই যেন একযোগে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। তবে বড়দের স্বস্তি তখনও পুরোপুরি সম্পূর্ণ হয়নি; কারণ বিয়ের প্রধানতম অংশ অর্থাৎ কনের মতামত নেওয়া এখনও বাকি।মোরশেদ তালুকদার সাথে করে মৌলভি সাহেবকে অন্দরমহলে নিয়ে গেলেন। মৌলভি সাহেব এবার পিহুর ঠিক সামনে গিয়ে খাতা খুলে বসলেন। ঘরজুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা। তিনি মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“মা, আপনি অলিন্দপুরের মুরুব্বিদের উপস্থিতিতে, খাইরুল খন্দকারের একমাত্র পুত্র সামির খন্দকারকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে সম্মত আছেন? সম্মতি থাকলে তিনবার বলুন, আলহামদুলিল্লাহ কবুল!”
সবাই ভেবেছিল পিহু হয়তো এই মুহূর্তে লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকবে, কিংবা উত্তর দিতে কিছুটা সময় নেবে। কিন্তু পিহু তো পিহুই! সে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করল না। কণ্ঠস্বর সামান্য কাঁপল পর্যন্ত না। সে সবার মুখের ওপর একসাথেই পটপট করে স্পষ্ট আওয়াজে বলে দিল,
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল! কবুল! কবুল!”
এই মুহূর্তটা আবার গোপনে ভিডিও করেছে শিরিন। সাথে সাথেই চট করে হোয়াটসআপে পাঠিয়ে দিল সামিরকে। পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠতেই সে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে শিরিনের পাঠানো ভিডিওটা দেখেই তার ঠোঁটের কোণে এক চওড়া হাসি ফুটে উঠল। একবার নয়; সে ভিডিওটা টেনে টেনে বারবার রিওয়াইন্ড করে দেখতে লাগল। মাঝেমাঝে স্ক্রিনটা পজ করে পিহুর মুখের অভিব্যক্তি খুঁটিয়ে দেখছিল। লাল ওড়না আর কপালে চন্দনের ফোঁটার আড়ালে ওই দস্যিমেয়েটাকে আজ সত্যি কোনো এক স্বপ্নলোকের ডানা কাটা পরি মনে হচ্ছিল। সামির মনে মনে ভাবল, এই পরিকে নিজের খাঁচায় বন্দী করার প্রথম ধাপ আজ সফল হলো।
অবশেষে পবিত্র কলমা দ্বারা সম্পন্ন হলো সামির আর পিহুর শুভ আকদ! একযোগে হাত তুলে আল্লাহর দরবারে নবদম্পতির সুখের জন্য মোনাজাত সম্পন্ন করলেন। আকদের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই শুরু হলো দুপুরের ভোজন পর্ব। বিয়েবাড়ির নিয়ম মেনে সবাই তখন নিজ নিজ তাগিদে ব্যস্ততায় মেতে উঠেছে। কেউ খাওয়ার টেবিলে যাচ্ছে, কেউ প্লেট এগিয়ে দিচ্ছে। চারিদিকে কেবল ব্যস্ততার কোলাহল।
কুহু পিহুর জন্য একটা কাঁসার থালায় পোলাও আর মাংসের প্লেট সাজিয়ে সবেমাত্র ঘর থেকে বেরিয়েছে। তখনই একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল সৈকত। আচমকা এমন সামনে পড়ে যাওয়ায় কুহু চমকে উঠল। হাতের প্লেটটা পড়তে পড়তে অল্পের জন্য রক্ষা পেল। আরেকটু হলেই দুজনের মধ্যে একটা বড়সড় মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়ে যেত! কুহু নিজের বুকে থুতু ফেলে ভয়ার্ত স্বরে বলল,
“সৈকত ভাই! আপনি? এভাবে হঠাৎ সামনে এসে আমাকে তো একদম ভয় পাইয়ে দিলেন!”
সৈকত নিজের দুই হাত তুলে অত্যন্ত অপরাধী গলায় বলে উঠল,
“সরি, সরি... আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি কুহু! আসলে... খাবার টেবিলে অসাবধানতাবশত আমার পাঞ্জাবিটা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই একটা আয়না খুঁজে দাগটা মুছতে আসছিলাম। আমি সত্যি তোমাকে খেয়াল করিনি।”
কুহু এবার একটু ভালো করে তাকিয়ে দেখল সৈকতের ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির বুকের বাম পাশে মাংসের ঝোল পড়ে হলুদের একটা বিচ্ছিরি দাগ বসে গেছে। সে হাতের প্লেটটা পাশের একটা কাঠের টুলের ওপর রেখে এক কদম এগিয়ে গেল।
“হায় আল্লাহ! এটা কীভাবে করলেন? পুরো পাঞ্জাবিটাই তো নষ্ট হয়ে গেছে! দেখি!”
কুহু অবচেতন মনেই নিজের ওড়না দিয়ে সৈকতের পাঞ্জাবির দাগটা মুছে দেওয়ার জন্য আন্তরিক উদ্যোগ নিল। কিন্তু সে কাছাকাছি আসতেই সৈকত অপ্রস্তুত অবস্থা এড়াতে চট করে এক পা পিছিয়ে গেল। সৈকতের এই আকস্মিক পিছিয়ে যাওয়া দেখে কুহুও নিজের ভুল বুঝতে পারল। লজ্জিত ও থতমত খেয়ে দ্রুত হাত নামিয়ে এক কদম সেও পিছিয়ে আসল। লোকলজ্জার ভয়ে দৃষ্টি এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে বলল,
“ইয়ে... আ-আম্মার ঘরে বড় আয়না আছে। আপনি ওখানে গিয়ে ভালো করে দেখে মুছে নিতে পারেন।”
“ওহ! থ্যাঙ্ক ইউ!”
ব্যাস! এই দুটো সংক্ষিপ্ত ইংরেজি বাক্য ছুড়ে দিয়েই সৈকত দ্রুতপায়ে রাবেয়ার ঘরের ভেতরে চলে গেল। কুহু একটা ভারী নিশ্বাস ছেড়ে নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল। ওমনি কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিছন থেকে আসিফ এসে বাঘের মতো ঝাপিয়ে পড়ল। প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত ও হিংস্র হয়ে কুহুর কোমল দুই গাল নিজের শক্ত আঙুলের মুঠোয় জাঁতাকলের মতো চেপে ধরল। আসিফের এমন পাশবিক কাণ্ডে কুহুর কলিজার পানি শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম। গাল চেপে ধরায় সে ঠিকমতো নিশ্বাস নিতে পারছিল না। মুখ দিয়ে কেবল এক অস্পষ্ট ফ্যাঁসফ্যাঁসে আওয়াজ বের হলো,
“আ... সি... ফ! কী করছ? ছাড়ো, ছাড়ো আমার খুব লাগছে!”
আসিফ কুহুর চিবুকটা সজোরে ওপরের দিকে তুলে নিজের রাগী মুখের সামনে এনে দাঁতে দাঁত পিষে হিংস্র পশুর মতো বলল,
“আচ্ছা? আমি একটু আদর করে ছুঁইলেই তোর শরীরে ফোস্কা পড়ে, হুহ? আর পরপুরুষের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে প্রেম-আলাপ করতে তোর খুব ভালো লাগে, না? আমার চোখের আড়ালে নোংরামি চড়াচ্ছিস?”
“কী বলছ এসব আসিফ! আমি খুব ব্যথা পাচ্ছি, দোহাই তোমার, ছাড়ো!”
কুহুর দুই চোখ বেয়ে টপটপ করে লোনা অশ্রুর ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল। আসিফ আসলে মনে মনে আগে থেকেই চরম ক্ষেপে ছিল। পিহুর আকদ হয়ে যাওয়ায় তার ভেতরের সেই পরাজয়ের সব ক্ষোভ ও হিংসা এসে আছড়ে পড়ছে বেচারা কুহুর ওপর! সে কুহুর ফর্সা গাল দুটো এমন পাশবিকভাবে চেপে ধরেছে, মনে হচ্ছে চোয়ালের হাড় ভেঙে এপাশেরটা ওপাশে চলে যাবে। কুহু যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে অনুনয় করতে লাগল,
“আসিফ প্লিজ ছাড়ো! খুব লাগছে আমার!”
“আমার চোখের সামনে তুই পরপুরুষের লগে এত আদিখ্যেতা করবি, আর আমি তোরে এমনি এমনি ছাইড়া দিমু?”
“এমন কিছুই না আসিফ! খোদার কসম তুমি ভুল বুঝছ!" কুহু কাঁদতে কাঁদতে কোনোমতে বলল, "আমি... আমি তো পিহুর জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছিলাম। বিশ্বাস করো, তুমি যা ভাবছো তা না!”
কুহুর মুখে পিহুর নামটা উচ্চারণ হতেই আসিফের চোখ থেকে যেন হিংসার আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হওয়ার উপক্রম হলো। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এক ঝটকা মেরে কুহুকে ছেড়ে দিল। কুহু পড়ে যেতে যেতে কোনো রকমে নিজেকে সামলালো। আসিফ তার দিকে চেয়ে এক চরম আদেশের সুরে বলল,
“শোন কুহু, আমি বাইরে আমার বাইকের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দিলাম তোকে। এই পাঁচ মিনিটের মধ্যে যার যার থেকে বিদায় নেয়া দরকার, বিদায় নিয়ে জলদি বাইরে চলে আসবি।আমি আর এক মুহূর্তও থাকুম না!”
কুহু প্রায় হতভম্ব হয়ে আসিফের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। আজ দীর্ঘ আড়াই মাস বাদে আসিফ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছে! তার জন্য এর চেয়ে বড় খুশির খবর আর হতেই পারে না। কিন্তু আসিফ যে সময় আর যে পরিস্থিতিতে এই কথাটা বলল, কুহু বিন্দুমাত্র খুশি হতে পারল না। সে একটু সাহস করে আসিফের কাছে গিয়ে নিচু ও অনুনয়ের স্বরে বলল,
“এখনই চলে যাবে? পিহুকে তো এখনো নিয়ে গেল না। ও চলে যাওয়ার পর বিকেলে আমরা একসাথে যাই?”
আসিফ তার র'ক্ত'চক্ষু জোড়া কুহুর দিকে স্থির করল। তার সেই টগবগে চাউনি দেখে কুহুর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল। আসিফ এবার কুহুর জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা জানিয়ে দেওয়ার মতো কাঠখোট্টা গলায় বলল,
“আজ, এই মুহূর্তেই যদি তুই আমার সাথে সংসার করতে যাইতে চাস, তাইলে আমার কথার ওপর কোনো হঙিতঙি করবি না। আর যদি এখন যাইতে না চাস, তাইলে সারা জীবনের লাইগা তুই তোর এই বাপের বাড়িতেই পইড়া থাকিস। এই জীবনে আমার আর এই মুখ দেখবি না, আমিও তোর কোনো খোঁজ নিমু না! সময় খুব কম আছে। আমি বাইরে আছি, ঘড়ি ধরে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় আছে তোর হাতে। যা করবি ভেবেচিন্তা করিস!”
আসিফ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। হনহন করে বড় বড় পা ফেলে সদর দরজার দিকে হাঁটা দিল। কুহু ছলছল চোখে বোবা পাথরের মতো তাকিয়ে রইল স্বামীর চলে যাওয়ার পথের দিকে। তার হাতে সত্যিই বেশি সময় নেই। একজন বাঙালি মেয়ের কাছে এসব উৎসবের চেয়ে নিজের ভাঙা সংসার বাঁচানোটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি। সে চোখ মুছে কাঁপতে থাকা হাতে খাবারের প্লেটটা তুলে নিয়ে পিহুর ঘরের দিকে পা বাড়াল।
ঠিক তখনই রাবেয়ার ঘরের দরজা ঠেলে সৈকত বাইরে বেরিয়ে আসল। এতক্ষণ আসিফ আর কুহুর মধ্যকার প্রতিটা কথোপকথন সে নিজের কানে শুনেছে। সৈকতের স্বভাবের মধ্যে অন্যের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সংসারে নাক গলানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তাই সে নিজেকে আড়ালেই রেখেছিল। কিন্তু কুহু চলে যাওয়ার পর সেই শূন্য বারান্দার দিকে তাকিয়ে সৈকতের বুকের ভেতরটা এক অজানা যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। এই সহজ-সরল মেয়েটার কিসমত কেন উপরওয়ালা এত খারাপ লিখে দুনিয়ায় পাঠালেন? তা ভেবে তার খুব আফসোস হতে লাগল। সৈকত এতকাল কেবল নিজের ভাঙা কিসমতের জন্য ভাগ্যকে দোষ দিত!। কিন্তু আজ কুহুর এই নীরব আত্মত্যাগ দেখে তার নিজের দুঃখটা খুব ছোট মনে হলো!
উপরওয়ালা মাঝেমধ্যে মানুষের জীবনে এমন কিছু কঠিন ও নির্মম পরিস্থিতি এনে দাঁড় করান, যেখানে মানুষ চাইলেও নিজের ইচ্ছেমতো বাঁচতে পারে না। এমনকি নিজের মুক্তি হিসেবে মৃত্যুটাকেও আপন করে নেওয়ার স্বাধীনতা পায় না। কুহু আর সৈকত, ওদের দুজনের জীবনের কাহীনি আলাদা হলেও যন্ত্রনাটা একই!
★
সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ক্লান্ত হয়ে হেলে পড়েছে। বিদায়ের এই করুণ লগ্নে প্রকৃতি যেন নিজেকে সাজিয়েছে এক অদ্ভুত বিষাদময় মায়ায়; আকাশ জুড়ে ধারণ করেছে লাল আর কমলার মিশ্রিত এক মনোমুগ্ধকর রক্তিম আভা। তালুকদার বাড়ির উঠোনে এতক্ষণ যে উৎসবের শোরগোল ছিল, তা এখন এক থমথমে বিদায়ের সুর ধারণ করেছে। বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা এ পর্যন্ত বেশ ঠিকঠাক আর নির্বিঘ্নেই মেটানো গিয়েছিল কিন্তু আসল বিপত্তিটা বাঁধল পিহুর বিদায়ের শেষ বেলায় এসে। পিহু আচমকা খুঁট ধরে বসেছে, সে কিছুতেই আজ শ্বশুরবাড়ি যাবে না। যাবে না তো যাবেই না!
সবাই ভাবছেন হয়তো বাপের বাড়ির মায়া ত্যাগ করে যেতে কষ্ট হচ্ছে বলেই চঞ্চল মেয়েটা এমন অবুঝের মতো কাঁদছে। কিন্তু কেউ আসল সত্যটা জানে না। পিহুর এই না যেতে চাওয়ার পেছনে মস্ত বড় কারণ 'সামির খন্দকার'!
ঘটনাটা ঘটেছিল মাত্র আধ ঘণ্টা আগে।উঠোনে বিদায়ের তদারকিতে ব্যস্ত ছিল সবাই। লোকচক্ষুর অন্তরালে জিহাদ আর তিয়াসার প্রত্যক্ষ মদদ ও পাহারায় সামির অত্যন্ত চতুরতার সাথে ঢুকে পড়েছিল পিহুর নিভৃত শয়নকক্ষে। পিহু তখন ড্রেসিং টেবিলের রূপালি আয়নায় নিজেকে শেষবারের মতো দেখছিল। তখনই পিহুর কানের ঠিক লতি ঘেঁষে অত্যন্ত নিচু স্বরে ফিসফিস করে সামির বলে উঠল,
“আয়নায় নিজেকে এত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার কী আছে? এত প্রস্তুতি কি সব আজকে রাতের জন্য?”
সহসা চেনা কণ্ঠের এমন তীব্র ও ঘনিষ্ঠ ছোঁয়ায় পুরো শরীর কেঁপে উঠল দস্যিমেয়েটার। সামির যে বিদায়লগ্নে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তার ঘরে এমন অতর্কিত হানা দেবে, তা সে স্বপ্নেও আশা করেনি। সে ঘুরে তীব্র প্রতিবাদ করতে চাইল। কিন্তু সামির তাকে এক চুলও ঘোরার সুযোগ দিল না; তার বলিষ্ঠ হাতে পিহুর দুই নরম বাহু শক্ত করে চেপে ধরে রাখল আয়নার দিকে মুখ করিয়েই। পিহু দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে নিজের ঠোঁটজোড়া শক্ত করে বরাবরের মতোই চিল-চিৎকার করে খেঁকিয়ে উঠল,
“আ... আপনি? আপনি এই সময়ে এইখানে কী করতেছেন? আমার ঘরে এমন চোরের মতো চুপিচুপি আসছেন ক্যান শুনি?”
সামির নিজের ডান ভ্রুটা সামান্য উঁচিয়ে আয়নায় প্রতিফলিত পিহুর অপরূপ রাঙা মুখের পানে চাইল। একটু আগেই কাজীর সামনে তাদের পবিত্র কলমা সাক্ষী রেখে আকদ সম্পন্ন হয়েছে। আইনত আর ধর্মত সে এখন তার বিবাহিতা স্ত্রী। অথচ মেয়েটা এখনও তার সাথে এমন কায়দায় কথা বলছে যেন কোনো পরপুরুষ তার ঘরে অশোভন কাজ করতে এসেছে! সামিরের কোনো উত্তর না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে পিহু দ্বিতীয়বার বলে উঠল,
“কী হইল, কথা বলতেছেন না ক্যান? নাকি এখন শহরের বাবুর মুখ দিয়া কথা বের হয় না, হেহ? দেখেন, সত্যি কইরা বলেন, আমার ঘরে চোরের মতো ক্যান আসছেন?”
আয়নায় পিহুর রাগী ও ডাগর চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে সামির এক অদ্ভুত কুটিল হাসল। নিজের শরীরটা আরও খানিকটা ঝুঁকিয়ে দিয়ে তার চওড়া চিবুকটা পিহুর নরম কাঁধের ওপর আলতো করে নামিয়ে আনল। গলার সুর একদম খাদে নামিয়ে মজার ছলে বলল,
“চোরের মতো চুন্নিটাকে একনজর দেখতে এসেছি! লাল বেনারসিতে চুন্নিটাকে কেমন মানিয়েছে, সেটাই একটু নির্জনে পরখ করতে এলাম! আফটার অল, সে এখন আমার রেজিস্ট্রি করা বউ!”
'চুন্নি' শব্দটা কান দিয়ে ঢোকা মাত্রই পিহু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক ঝটকায় শরীর মুচড়ে সামিরের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। তাকে চোর-চুন্নি বলেছে বলে রেগেমেগে একদম আগুন হয়ে গেছে মেয়েটা। রাগে তার ফর্সা নাকটা লাল হয়ে উঠেছে, যা দেখে সামিরের মনে এখন কামনার কীরূপ তাণ্ডব আর প্রেমের সুনামি চলছে তা বোঝার মতো বিন্দুমাত্র ক্ষমতা এই মেয়ের নেই। তার আছে শুধু অনবরত কথার তুবড়ি ফোটানোর আর পকরপকর করার অভিজ্ঞতা। সে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের তর্জনী আঙুল সামিরের নাক বরাবর তুলে শাসানোর সুরে বলল,
“কী বললেন আপনি? আমি চুন্নি? আপনার এত বড় সাহস, আমার বাপের বাড়িতে দাঁড়িয়ে, আমার ঘরে ঢুকে আমাকেই চুন্নি বলেন! আর দূরে যান... দূরে যান বলতেছি আমার থেইক্কা! একদম কাছে আসার চেষ্টা করবেন না। পিহুর সাথে ফষ্টিনষ্টি করা এত সহজ না কইলাম! কাছে আসার চেষ্টা করলে একেবারে একটা আছাড় মেরে আলুর ভর্তা বানিয়ে রেখে দেব!”
সামির এক মুহূর্তের জন্য অবাক চোখে তাকিয়ে রইল এই রূপসী ত্যাঁদড় মেয়েটার দিকে। এরপর সামির এত বেশি কাছে চলে এল যে, পিহুর নাকের ডগায় এসে আছড়ে পড়ল সামিরের শরীর থেকে নির্গত হওয়া 'ব্লু শ্যানেল' পারফিউমের সেই চিরপরিচিত তীব্র ঘ্রাণটা। এক নিমেষে পিহুর মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ল নেশাল সুগন্ধিটা। এক অজানা মোহে চোখ বন্ধ করে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সেই সুবাস বুকে টেনে নিল। সামির আরও এক কদম এগিয়ে একদম পিহুর শ্বাস-প্রশ্বাসের সীমানায় এসে থামল। তারপর পিহুর তিল জড়ানো নাকের ডগায় নিজের তর্জনী দিয়ে হালকা একটা টোকা মেরে চোখের ইশারায় বলল,
“শোন মেয়ে, যত দাপট দেখানোর এখনি দেখিয়ে নাও! তুমি এখন দাপট দেখাচ্ছ দেখাও, আমি রাতের অন্ধকারে দাপট দেখাব! তখন কিন্তু কান্নাকাটি করেও আমার হাত থেকে এক বিন্দুও ছাড় পাবে না। সো, বি রেডি ফর টু নাইট!”
এই বলেই সে এক বক্র ও রহস্যময় হাসি হেসেো বেরিয়ে গেল। সামির ঠিক কী উদ্দেশ্যে আর কী গভীর অর্থে কথাগুলো বলেছে, তা বুঝতে পিহুর মাথয় কিছুটা সময় লাগলেও পুরোপুরি মানেটা উদ্ধার করতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হলো না। সে গ্রামে বড় হলেও এতটাও কচি বা অবুঝ খুকি নয়। বয়ঃসন্ধির এই সমস্ত ইশারা-ইঙ্গিত সে মোটামুটি ভালোই বোঝে! আর বোঝে বলেই তো এখন সামিরের ওই রাতের 'দাপট' আর 'শাস্তির' ভয়ে তার কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। আর এই ভয়ের চোটেই সে এখন কিছুতেই শ্বশুরবাড়ি যেতে চাইছে না!
★
বাইরে তখন উঠোনে চাঁদের হাট। সবাই মিলে গোল হয়ে কতভাবে বুঝাল পিহুকে। দাদি আদর করলেন, পাশের বাড়ির চাচিরা প্রবোধ দিলেন কিন্তু পিহু নিজের সিদ্ধান্তে অটল। সে কিছুতেই খন্দকার বাড়িতে পা রাখবে না। সবাই ভাবছে, যে মেয়েটা সকাল থেকে নিজের বিয়ে নিয়ে এত হাসিখুশি, নাচ-গানে মেতে ছিল সে বিদায় বেলায় কেনই বা এমন জেদি বাচ্চার মতো আচরণ করবে? অথচ কেউ একটা বারের জন্যও টের পেল না যে আসলে ঘটনাটা সম্পূর্ণ অন্য এবং তার মূল খলনায়ক স্বয়ং বরবাবু বাইরে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছে!
রাবেয়া মেয়ের এমন অশোভন ও একগুঁয়ে আচরণে এবার সত্যি সত্যি ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি একটু চড়া গলায় ধমকের সুরে বলে উঠলেন,
“পিহু! অনেক হয়েছে, এবার কিন্তু আমি খুব রেগে যাচ্ছি! এটা কোনো ছোট বাচ্চাদের পুতুল খেলা না যে যখন যা ইচ্ছা করবি! শ্বশুরবাড়ির মানুষ তোর জন্য আর কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে শুনি? জলদি গাড়িতে ওঠ!”
“না আম্মা, আমি কিছুতেই যাব না!” পিহু মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠে বলল, “তোমারে ছাইড়া অন্য কোথাও যাইতে আমার কষ্ট লাগে আম্মা! আমি ওই বাড়িতে যাব না, তুমি ওদের তাড়িয়ে দাও!”
ছেলের বউয়ের এমন কান্না দেখে আইরিন খন্দকার অত্যন্ত মমতায় এগিয়ে এলেন। তিনি পিহুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে পরম স্নেহে বললেন,
“পিহু মা, লক্ষ্মী সোনা আমার, এমন করে না মা। কেন যাবে না তুমি আমাদের সাথে? ওখানে আমি আছি না? আজ থেকে তুমি আমাকে আম্মা বলে ডাকবে। তোমার যখন যা লাগবে, যা খেতে ইচ্ছে করবে, আমাকেব বলবে কেমন? লক্ষ্মী মা আমার, এবার কেঁদে মুখটা নষ্ট না করে চলো!”
পিহু তাও ঠোঁট ফুলিয়ে জেদ ধরে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে যাবে না বলেছে যখন যাবে না। সামির আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। এভাবে চললে রাত পার হয়ে যাবে, অথচ কনে বিদায় হবে না। সে হুট করে এসে পিহুকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়ে সোজা বাড়ির বাইরের দিকে হাঁটা দিল! আকস্মিক এমন কাণ্ডে পিহু যেমন ভড়কে গিয়ে ভয়ে চোখ গোল গোল করে ফেলল, ঠিক তেমনি উঠোনে উপস্থিত পাড়া-প্রতিবেশী হাঁ করে অবাক চোখে চেয়ে রইল। পিহু সামিরের শক্ত বাহুর বাঁধনে ছটফট করতে করতে দুই পা শূন্যে ছুড়েচিৎকার করে উঠল,
“আম্মাআআ! ও আম্মা, বাঁচাও আমারে! আমি যাব না... ও আম্মা...”
সামিরের লোহার মতো শক্ত পিঠের ওপর অনবরত কিল-ঘুষি মারতে মারতে সে রাগেমেগে চেঁচিয়ে বলল,
“কী করতেছেন কী আপনি? লজ্জা করে না? নামান আমারে! ছাড়েন কইতাছি! বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমি কিন্তু ঘুষি মেরে আপনার ওই সুন্দর নাক এক্কেবারে ফাটায়া দিমু! আপনি এখনও এই পিহুরে চিনেন নাই কইলাম! বেশি ত্যাঁদড়ামি করলে আমি কিন্তু আপনার ঘাড়ে কামড়ায়া র'ক্ত বের করে দিমু! নামান আমারে, আমি যামু না! আম্মা... ও আম্মা... দাদি... আব্বা... কেউ আমারে বাঁচাও!”
সামির আজকে পিহুর তেজকে বিন্দুমাত্র পাত্তাই দিল না। সোজা খন্দকার বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। যেহেতু দুই বাড়ির দূরত্ব খুব বেশি নয়, মাত্র ১০-১২ মিনিটের পথ। তাই হেঁটে যাওয়াই শ্রেয় মনে করল সে। তার পিছন পিছন হাসতে হাসতে হাততালি দিতে দিতে ছুটে চলল নিহান, জিহাদ, মহিদ, শিরিন, তিয়াসাসহ বাকি সব তরুণ-তরুণীর দল।
তাহমিদ খন্দকার তাঁর নাতির এমন বীরত্বপূর্ণ কাণ্ড দেখে গর্বে নিজের চওড়া বুকটা আরও ফুলিয়ে তুললেন। অট্টহাসি হেসে বললেন,
“হা হা হা! এই না হলে আমার খাঁটি র'ক্তে'র নাতি! একদম আমার মতোই এক কোপে শিকার ধরে একবারে তুলে নিয়েছে। খন্দকার বংশের ঐতিহ্য রক্ষা করেছে। সাবাস দাদুভাই, সাবাস!”
★
রাত এখন বারোটার গণ্ডি ছুঁইছুঁই, কিন্তু খন্দকার বাড়ির অন্দরমহলে তার কোনো প্রভাবই পড়েনি। সারা বাড়ির সোনালি আলো আর মানুষের কোলাহলে চারপাশটা হইহুল্লড়ে মেতে আছে। পিহু আর সামিরকে কেন্দ্র করে বাড়ির সব ছেলেমেয়েরা অন্দরমহলের মেঝেতে জম্পেশ আড্ডা জমিয়েছে। শীতলপাটি বিছিয়ে গোল হয়ে বসে দুই দলে ভাগ হয়ে শুরু হয়েছে 'গানের কলি' খেলা। পিহুর দলে যোগ দিয়েছে নিহান, জিহাদ, তিয়াসা, হুমায়রা আর মুন্নি। অন্যদিকে সামিরের দলে আছে শিরিন, মহিদ, তমা, মুন্না আর হাফসা। প্রতি দলে ছয় থেকে সাত জন করে। কিন্তু নিহান আর পিহু মিলে প্রতিবার বিপক্ষ দলকে উড়িয়ে দিচ্ছেো। এই দুইজনের ক্ষিপ্রতার কাছেো দলের বাকিদের থাকা আর না থাকা এখন সমান কথা।
ঘুরেফিরে আবার যখন তাদের দলের টার্ন আসল, তখন নিহান চট করে উঠে শিরিনের দিকে ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিয়ে; তাকেই উদ্দেশ্য করে চড়া গলায় গেয়ে উঠল,
“একখান চুম্মা তে কারেন্ট লাগাইলি
দুইখান চুম্মা তে ভোল্টেজ বাড়াইলি
তিনখান চুম্মা তে আমার...
হাই হলো টেম্পারেচার
চড় গেয়া পেয়ার কা বুখার
চড় গেয়া পেয়ার কা বুখার
হে চড় গেয়া পেয়ার কা বুখা....”
গানের কলিটা সম্পূর্ণ শেষ করার আগেই শিরিন রাগেমেগে লাল হয়ে কুশন ছুড়ে মারল নিহানের মুখ বরাবর। নিহান অবশ্য ডক করে সেটা লুফে নিল। শিরিন দাঁত কিড়মিড় করে তর্জনী উঁচিয়ে কড়া গলায় বলল,
“নিহান! অনেক ফাজলামো হয়েছে! এবার যদি আর একটাও বাজে কথা বলেছ, তবে আমি তোমাকে পিটিয়ে পিঠের চামড়া তুলে ঢুগডুগি বানাবো বলে দিলাম! নির্লজ্জ, বেহায়া একটা!”
নিহান মুখ গোমড়া করে এসে জিহাদ আর পিহুর ঠিক মাঝখোনটায় বসে পড়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“আচ্ছা মিস সিনিয়র হুট করে এমন চণ্ডী রূপ ধারণ করল কেন? আমি কি খারাপ কিছু বলেছি?”
জিহাদ এতক্ষণ নিহানের এসব কাণ্ডে ভীষণ বিরক্ত হচ্ছিল। সে নিজের কপালে একটা চাপড় মেরে চাপা ফিসফিসানিতে বলল,
“রাগবে না তো কি তোর আরতি করবে? খেলা শুরু হওয়ার পর থেকে তুই এই পর্যন্ত যে কয়টা গান গাইছিস, আল্লার কসম, সব কয়ডার মধ্যেই শুধু চুম্মা-চাটি! এসব সস্তা রোমান্স ছাড়া কি তোর পেটে আর কোনো ভদ্র গান নাই? দুনিয়ায় কি গানের অভাব পরছে রে ভাই?”
“আরে, গান তো মেলা আছে!” নিহান ভাব নিয়ে যুক্তি দেওয়ার সুরে বলল, “কিন্তু দুনিয়ায় যা কিছু ঘটে, তা তো ওই একটা চুমুর জন্যই ঘটে! একটা মিষ্টি চুমুতেই তো দুনিয়ার সব রাগ-ক্ষোভ ঠাণ্ডা হয়ে যায়! কিন্তু মিস সিনিয়রকে এতগুলো লাইভ চুমু ফ্রিতে দেব বলার পরও উনি যেভাবে রেগে মেগে ফায়ার হলেন, তার কোনো যৌক্তিক মানে হয় বল?”
তিয়াসা দেখল এদের নিজেদের ভেতরের ফিসফিসানি থামছেই না, ওদিকে বিপক্ষ দল সময় পেয়ে যাচ্ছে। সে হাত উঁচিয়ে নিহানদের থামিয়ে দিয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করল,
“ওকে, ওকে গাইস! নিহান ভাইয়ার দল আউট অব কন্ট্রোল! এবার... এবার সামির ভাইয়াদের টার্ন! আমি এক থেকে তিন পর্যন্ত কাউন্ট করব, এর মধ্যে গান না ধরলে পেনাল্টি! ওয়ান... টু... থ্রীইই...”
তিয়াসার কাউন্টডাউন শেষ হওয়ার আগেই শিরিন দল জিতাতে নিজের বেসুরো গলায় গাইতে শুরু করল,
“আকাশেতে লক্ষ তারা চাঁদ কিন্ত একটারে ইয়াহ
ইয়াহ.. এই জগতে পরান বন্ধু প্রিয় তোমার মুখটারে ইয়াহ
ইয়াহ...”
শিরিনের সেই চটুল গানের সুরের সাথে তাল মিলিয়ে মহিদ, তমা আর হাফসাও তুমুল উৎসাহে হাততালি দিয়ে কোরাস গাইতে শুরু করল। পুরো ঘরে তখন হাসির রোল উঠেছে। তখনই সেই আনন্দঘন পরিবেশটাকে এক নিমেষে চিরে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে প্রবেশ করল সৈকত। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। চোখে-মুখে চরম আতঙ্কের ছাপ। সে মজলিশের মাঝখানে এসে দুই হাত উঁচিয়ে কাঁপানো গলায় বলে উঠল,
“গাইস! গাইস! স্টপ ইট! সবাই গান-বাজনা বন্ধ কর! একটা মস্ত বড় ঝামেলা হয়ে গেছে!”
পরিবেশটা মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। গানের সুর থেমে গেল মাঝপথেই। সামির তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া সৈকতের ফ্যাকাশে মুখের ওপর নিবদ্ধ করে ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল,
“কী হয়েছে সৈকত ভাই? তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কী ঝামেলা হয়েছে?”
সৈকত সামিরের প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর দিল না। পিহুকে হ্যাঁচকা টান দাঁড় করিয়ে হাতটা এনে সামিরের শক্ত হাতের মুঠোয় ধরিয়ে দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“সামির! তোর কাছে কোনো প্রশ্ন করার বা উত্তর খোঁজার সময় এখন নেই। তুই পিহুকে নিয়ে এই মুহূর্তে এই বাড়ি থেকে পালিয়ে যা! তোদের হাতে বেশি সময় নেই!”
জিহাদ আর নিহান একসাথে দাঁড়িয়ে পড়ল। সামির অবাক হয়ে বলল,
“পালাবো মানে? কী বলছিস এসব?”
“এতকিছু বলার সময় নেই। শোন! সামনের রাস্তা দিয়ে তোরা ভুলেও যাবি না। আর জিহাদ, তোকে শরিফ চাচু বলেছেন, সামির আর পিহুকে নিয়ে এখনই বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে নেমে সোজা নদীর ঘাটে চলে যেতে। ওখানে একটা নৌকা ওদের জন্য রেডি রাখা আছে। ওদেরকে নৌকায় তুলে দিয়ে আসবি।”
সৈকতের কথা শুনে পিহুর বুকটা ধক করে উঠল। সৈকত সামিরের কাঁধ দুটো ঝাঁকিয়ে দিয়ে আরও তাগাদা দিল,
“সামির, ভালো করে মাথায় ঢোকা! নদী পার হওয়ার পর ওপারে গেলেই তোরা ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেনটা পেয়ে যাবি। আর একটা কথা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ঢাকায় পৌঁছানোর পর ভুলেও তোরা আমাদের বাড়িতে গিয়ে উঠবি না। কিছুদিন নিজেদের লুকিয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে থাকবি! আমরা এখানে পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই, সকালের দিকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেব। ওখানে গিয়ে আমরা তোদের সাথে যোগাযোগ করে নেব। এখন সময় নষ্ট করিস না, দ্রুত যা! দাদু আর আমরা বাকিরা মিলে এদিকের ঝামেলাটা সামলে নেব। তোরা শুধু এখান থেকে দ্রুত বের হ!”
চলবে.....
(কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ 🚫, চাইলে লিংক শেয়ার করতে পারেন।)
বিদ্র: আমি সত্যিই দুঃখিত এত দেরি করে পর্ব দেয়ার জন্য। আসলে আমি আপনাদের জন্য একটা ইবুক নিয়ে ব্যাস্ত আছি। আশা করা যায় খুব শীঘ্রই পাবেন! আর এই গল্পটায় রেসপন্স করেন না বলেও আগ্রহ পাই না। অথচ আমি এক দিন বা দুই দিন পরপর গল্প দিতাম! শুধু আপনাদের মতামতের কারনে তাল কেটে যায় লেখা-লেখির! যাক গে, সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করুন 🙏🏻
হ্যাপি রিডিং 🫶🏻