#আফসানায়ে_জ্বিনান
#মীরা_রায়াদ
পর্ব-৩
[📍কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]
- তুমি ওদের এখানে কেন নিয়ে এসেছ ইউসুফ? ভুলে গিয়েছ ওই মেয়ের জন্য কি হয়ে ছিল? এতো কিছুর পরও তুমি ওদের এখানে নিয়ে এলে? আমাদের একটা ছোট মেয়ে আছে ইউসুফ।
- আমার কাছে কোনো পথ ছিল না এসমা। আমি তোমাকে সবটা বলতে পারব না। শুধু যেনে রাখো যা করেছি বাধ্য হয়ে করেছি।
- মানে?
- মানে জানার দরকার তোমার নেই এসমা। যতো কম জানবে ততোই তোমার জন্য মঙ্গলজনক।
আমালিয়ার দাদী ইউসুফের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে এসেছিলেন। তখনই এসমা ও ইউসুফের কথা শুনতে পায়। এসমা বৃদ্ধাকে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। বৃদ্ধা এসমার ভয় বুঝতে পেরে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বিছানায় ঘুমন্ত বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
- তোমার মেয়ে খুব মায়াবী হয়েছে এসমা। তোমার মতো হয়নি। শুনেছি বাবা-মায়ের পাপের শাস্তি বাচ্চারা পায়। দোয়া করি তোমার পাপের শাস্তি যেন তোমার মাসুম মেয়েকে না পেতে হয়। নিজের সীমায় থাকবে এরপর থেকে। আমালিয়ার কাছ থেকে দূরে থাকবে। নয়তো কখন কি হয়ে যাবে বুঝতেও পারবে না। আজ যা করেছ আগামীতে এমন ভুল যেন দ্বিতীয় বার না হয়।
বৃদ্ধার কন্ঠে কি ছিল জানা নেই, কিন্তু সেই কথাগুলো কারণে এসমা নামের রমণীর শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল। মনে পড়ে গেলো কিছুক্ষন পূর্বের কথা —
আমালিয়া পানি খেতে তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে ছিল। সেই একই সময় এসমা নিজেদের কক্ষে যাওয়ার জন্য আমালিয়াদের কক্ষের সামনে থেকে যাচ্ছিল। আমালিয়াকে দেখে সে নিজের যাত্রাপথ থামিয়ে আমালিয়ার মুখোমুখি বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আমালিয়াকে পর্যবেক্ষণ করে কিছুটা ব্যঙ্গ করে বলল,
- দেখতে তো মায়ের মতো হওনি, আর না ইউসুফের মতো হয়েছো। তাহলে এলে কোথা থেকে তুমি? আর তোমার ঐ চোখ? দেখে তো দুষ্টু ডাইনিদের মতো লাগে।
কথাগুলো বলে তিনি উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো। আমালিয়ার মাঝে বিশেষ ভাবাবেগ নেই। সে এমন কথা বহুবার শুনেছে। ছোট থেকে এই কথা শুনেই সে বড় হয়েছে। তাই এখন আর খারাপ লাগে না তার। কিন্তু এসমা নামের রমণীর থেমে থাকার নয়। সে আবারও বলল,
- কয়েকদিনের জন্য আশ্রয় দিচ্ছি তার মানে এই নয় যে সারাজীবন আমার ঘাড়ে চেপে বসে থাকবে। যতো দ্রুত সম্ভব এখান থেকে চলে যাবে বুঝেছো মেয়ে?
কথাগুলো আমালিয়ার খারাপ লাগলেও সে ভেঙে পরার মতো মেয়ে নয়। যার তার সামনে এসে কেঁদে ভাসিয়ে দিবে এতটা বোকা সে নয়। চোখমুখ কঠিন করে এসমার চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে আমালিয়া বলল,
- আমি এখানে নিজের ইচ্ছাতে আসিনি। যা বলার আপনি আপনার স্বামীকে বলুন। অযথা আমাকে অপমান করে লাভ নেই। এবার কিছু বলছি না এর মানে সামনেও যে কিছু বলব না ভেবে থাকলে ভুল করবেন। আমার দাদী আমাকে সব রকম পরিস্থিতির সাথে মোকাবেলা করার জন্য সঠিক ভাবে তৈরি করেছে। তাই দুর্বল ভাববেন না।
এসমা আমালিয়ার কথায় ভীষণ রেগে গেলো। এতটুকু মেয়ের সাহস কি করে হয় তার মুখের ওপর কথা বলার? সে নিজের রাগ সামলাতে না পেয়ে এক ভয়াবহ দুঃসাহস দেখিয়ে আমালিয়াকে থাপ্পড় মেরে দেয়। আমালিয়া মোটেও এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। রাগে, অপমানে তার চোখের কোণে পানি এলেও কাদলো না সে। বরং চোখমুখ শক্ত করে এমন ভাবে তাকালো যে এসমা ভয় পেয়ে গেলো। সেই মুহূর্তে এসমার মনে হলো এই মেয়ে মোটেও কোনো সাধারণ মানুষ নয়। ওই চোখ, ওই হিংস্রতা কোনো সাধারণ মানুষের মাঝে থাকতেই পারে না। এসমা সেখানে আর একমুহূর্ত না দাঁড়িয়ে পালিয়ে আসে। কিন্তু পালিয়েও বা লাভ হলো কি? সেই তো সে ধরা পরেই গেলো। কখন কিভাবে এই মহিলা দেখলো বুঝতে পারছে না। এদের দাদী-নাতনিকে তার একদম সুবিধার মনে হয় না।
- ইউসুফ তোমার সাথে আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।
বৃদ্ধা কথাটি বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন। ইউসুফ স্ত্রীকে ভয়ে জর্জরিত অবস্থায় একপলক দেখে তড়িঘড়ি করে বৃদ্ধার পিছু নিল।
_______
- আরদার কাভরালের সাথে তোমার পরিচয় কিভাবে?
- সে আমার বিসনেস পার্টনার।
- কতদিন থেকে চেনো তুমি তাকে?
- কিছু কি হয়েছে?
বৃদ্ধা ভীষণ বিরক্ত হলো প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন শুনে।
- আহ্ ইউসুফ। যা প্রশ্ন করছি তার উত্তর দাও। অতিরিক্ত কথা আমার পছন্দ না।
- ইয়ে মানে গতবছর আমার ব্যবসায় দারুন ভাবে লস্ হয়। সেই সময়ে আরদারই ইনভেস্ট করে এবং লস থেকে আমার কোম্পানিকে বাঁচায়।
- ভালো করে জানো তো তাকে?
ইউসুফ ভীষণ উৎসাহের সাথে বলল,
- হ্যাঁ হ্যাঁ। সে খুব ভালো ছেলে।
বৃদ্ধা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
- তাই নাকি? আমারা যে চামলিহেমশিনে এই খবরটিও নিশ্চয় আরদারই তোমাকে দিয়েছে?
ইউসুফ ধরা পরার মতো মুখ লুকালো। আমালিয়ার দাদীর বুঝতে আর সমস্যা রইলো না।
- মিথ্যে না বলে সব খুলে বলো। আবারও বুঝি জ্বিনদের সাথে সওদা করেছ?
ইউসুফের চোখমুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেলো। এখন কি হবে? কি করবে? বৃদ্ধা ইউসুফের দিকে এগোতে এগোতে বলল,
- তুমি কি ভেবেছো আমালিয়ার সামনে বাবার পরিচয়ে গেলেই ওর সব অধিকার তুমি পেয়ে যাবে? এতটাই সহজ? কি উদ্দেশ্য তোমাদের বলল?
বৃদ্ধার ভয়ানক কন্ঠে ইউসুফ কেঁদে দিয়ে তার পা ধরে বলল,
- আমাকে ক্ষমা করুন। আমি এমনটা করতে চাইনি। বুঝতে পারিনি সে এভাবে আমালিয়াকে টেনে আনবে। আমাকে ক্ষমা করুন।
- কি চায় সে?
-সে আমালিয়াকে বিবাহ করতে চায়।
বৃদ্ধা ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন,
- অসম্ভব।
তারা বর্তমানে ২২ তলা ভবনের ছাদে রয়েছে। শো শো বাতাসের কারণে দাঁড়িয়ে থাকা দুষ্কর। ঠিক সেই মুহূর্তে তৃতীয় কারো কন্ঠস্বর ভেসে এলো।
- অসম্ভব কেন জ্বিন মাতা হাদিজাহ? পাত্র হিসাবে আমাকে পছন্দ হয়নি আপনার? তাছাড়া আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন আমালিয়ার অতীত,ভবিষ্যৎ সব কিছু আমার হাতে।
কালো আলখাল্লা পরিহিত যুবকটি ছাদের রেলিংয়ের ওপর দাড়িয়ে আছে। তীব্র বাতাসে তার পরিহিত পোশাকটি এবড়ো-থেবড়ো ভাবে উড়ে বেড়াচ্ছে। তার উজ্জ্বল গাঢ় নীল চোখ দুটি ছাড়া আর কিছুই দেখে গেলো না। তবুও আমালিয়ার দাদীর বুঝতে কষ্ট হলো না এ কে। সে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
- খবরদার আমাকে এই নামে ডাকবেন না।
আরদার রেলিংয়ের ওপর থেকে লাফিয়ে নামলো। অতঃপর ধীর পায়ে হেঁটে এগিয়ে দাড়ালো তার মুখোমুখি।
- তাহলে আপনাকে কি বলে ডাকবো জ্বিন মাতা হাদিজাহ?
- রাজা আরদার ভুলে যাবেন না আপনি কার সামনে দাড়িয়ে কথা বলছেন।
আরদার এবার নিজের বচন ভঙ্গি পরিবর্তন করে গম্ভীর গলায় বলল,
- আপনিও ভুলে যাবেন না জ্বিন মাতা আপনি কার সামনে দাড়িয়ে কথা বলছেন। সিলা গোত্রেও রাজা আমি। মনুষ্য জাতের সাথে থাকতে থাকতে আপনি নিজের বানানো নিয়ম ভুলে গেলেন জ্বিন মাতা? সন্মান দিয়ে কথা বলুন। তাছাড়া সে আমার। তার ওপর আপনার কোনো অধিকার নেই। তাকে শুধু আপনার কাছে সুরক্ষার জন্য রাখা হয়ে ছিল। আপনার কাছে সে এতোগুলো দিন শুধু আমানত হিসেবে ছিল। ভুলে গেলেন অতীতের সব কিছু?
ইউসুফ হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলো। সিলা গোত্রের রাজা? কিন্তু সেতো ভেবে ছিল সাধারণ কোনো জ্বিন। এ সে কোথায় ফেঁসে গেল?
- আমাকে ক্ষমা করবেন মহারাজ। কিন্তু আপনিও ভুলে যাবেন না আপনার গোত্রের জন্যই আমালিয়া আজ মা হারা।
আরদারের চোখ শান্ত হয়ে এলো। সে জানে অতীতে তার গোত্রের কিছু ভুলের কারণে আজ সব কিছু তার হাতের বাইরে।
- সেটি আমার দূর্ভাগ্য।
হাদিজাহ নরম গলায় বলল,
- তার জীবন পূর্ব হতেই আশঙ্কার মাঝে রয়েছে মহারাজ। আপনার সাথে তাকে জড়িয়ে আরো বিপদের মধ্যে ফেলবেন না অনুরোধ রইলো। সে মানুষদের মাঝে সুরক্ষিত রয়েছে।
আরদারের কপাল কুঁচকে গেল মুহূর্তেই।
- আপনার মনে হয় সে সুরক্ষিত আছে? সেদিন সেই জঙ্গলে আমি সময় মতো না পৌঁছালে কি হতো আপনি জানেন না জ্বিন মাতা? তারা জেনে গিয়েছে সেহজাদির অস্তিত্ব। সে কিছুতেই তাকে ছাড়বে না। সেহজাদিকে বাঁচাতে হলে আমাদের বিয়ে করা জরুরি আপনি জানেন তা। আমার এতোগুলো বছরের অপেক্ষা নয়তো বৃথা হয়ে যাবে জ্বিন মাতা। এতোগুলো জীবনের ত্যাগ, আপনার জ্বিন রাজ্য থেকে দূরে থাকা সব সব বৃথা হয়ে যাবে। সেই শক্তির সূত্রপাত ঘটলে সব নিশ্চিহ্ন করে দিবে।
হাদিজাহ আতঙ্কিত হয়ে পরলেন। অতীতের কিছু ঘটনা তার মনে পরে গেলো। সেই ভয়াবহতা, সেই নিসংস্রতা চাইলেও সে ভুলতে পারবে না। আবারও সেই শক্তির উম্মোচন ঘটলে এবার তাকে কেউ থামাতে পারবে না। কেউ না। কিন্তু আমালিয়াকে জ্বিনদের সাথে ছেড়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক হবে?
- কিন্তু আমালিয়া কি সবটা মেনে নিবে?
- সেই চিন্তা আপনার করতে হবে না জ্বিন মাতা। আপনি শুধু তাকে বুঝাবেন বাকি সব আমি সামলে নিবো। তাছাড়া এটাই আমাদের জ্বিনদের জন্য কল্যাণকর।
কথাগুলো বলে সে যেভাবে এসে ছিল সেভাবেই চলে গেল হাওয়ায় মিলিয়ে।
____________
- আহ্।
ঘুমের মাঝে হঠাৎ আমালিয়া চেঁচিয়ে উঠলো। হাদিজাহ তার পাশেই বসে ছিল। সে বেশির ভাগ রাতে ঘুমায় না। তারা জ্বিন। জ্বিনরা মানুষের মতো রাতে ঘুমায় না।
- লিয়া লিয়া। কি হয়েছে?
আমালিয়া চোখ বন্ধ করে সারা শরীরে হাত দিয়ে লাগাতার কিছু ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। হাদিজাহ বুঝলো আমালিয়া ঘুমের ঘোরে রয়েছে। তাই জোরে জোরে ধাক্কা দিতে লাগলো।
- লিয়া লিয়া। শুনছো আমার কথা? লিয়া।
আমালিয়া চোখ মেলে একদম শান্ত হয়ে গেল। দাদীকে সামনে দেখে অসহায় ভাবে বলল,
- দাদী আগুন।
- কি হয়েছে লিয়া আমাকে খুলে বলো।
আমালিয়া পাগলের মতো নিজের হাত, গলা দেখিয়ে বলল,
- আগুন লেগে ছিল দাদী। খুব জ্বলছিল।
হাদিজাহ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো,
- কিসের আগুন? কোথায় আগুন লিয়া? দেখো কিছু নেই। তুমি স্বপ্ন দেখে ছিলে।
- না না দাদী। সত্যি আগুন ছিল। একটা গাছ ছিল। তার ছোট ছোট পাতা গুলো সোনার মতো জ্বলজ্বল করছিল। আমি সেই গাছ ছোঁয়ার পর সারা শরীরে আগুন লেগে গিয়ে ছিল দাদী।
গাছ! হাদিজাহ ভীষণ আতঙ্কিত হলো। সেই গাছের ব্যাপারে আমালিয়া কি করে জানবে। এটা কি শুধুই একটি ইত্তেফাক নাকি কোনো ভবিতব্য? সে আমালিয়াকে নিজের মনের ভীতি বুঝতে না দিয়ে বলল,
- এমন কোনো গাছ হয় না লিয়া। তুমি স্বপ্ন দেখেছো। হঠাৎ স্থান পরিবর্তন হওয়ায় এমন হয়েছে। চিন্তা করো না। ঘুমাও এখন। কাল আশেপাশে ঘুরে হওয়া লাগিয়ে এলে ঠিক হয়ে যাবে। আমালিয়া ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো দাদীর দিকে। তার দাদীকে অন্যদিনের থেকে আজ অন্যরকম লাগছে। সে কথা বাড়ালো না। চুপ করে শুয়ে পরলো। এর আগে সে এমন অনেক স্বপ্ন দেখেছে কিন্তু এটি ছিল সব থেকে ভয়াবহ।
________
আমালিয়া ইস্তাম্বুল এসেছে আজ তিনদিন হতে চলল। এই তিনদিনে সে তার কক্ষের বাইরে খুব বেশি একটা যায়নি। এখানে তার অস্থির অস্থির লাগে। আরদার নামের ছেলেটি রোজ তাদের সাথে দেখা করতে আসতো। কিন্তু আমালিয়া যথা সম্ভব তাকে এড়িয়ে চলেছে। ভালো লাগে না তার ছেলেটিকে। কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকায় আমালিয়ার দিকে। ভীষণ অস্বস্তি হয় তখন তার। তাছাড়া ছেলেটির চোখ দুটি তার মনে অশান্তি সৃষ্টি করে। তাইতো সে তাকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু আজ আর রক্ষা হলো না। সকাল সকাল গিয়ে হাজির হয়ে দাদীকে রাজি করিয়ে তাকে নিয়ে সেই সকালে বেরিয়েছে আর এখন প্রায় বিকেল। তারা শুরুতে নেজাহাত গ্যোকইইইত বোটানিক্যাল গার্ডেন গিয়ে ছিল। সেখান থেকে তারা একটি বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুপুরের খাবার শেষ করে এখন আতাশেহিরের আশপাশটা ঘুরে দেখছে। আমালিয়া সারাজীবন গ্রামে জীবন কাটিয়েছে, তাই তার জন্য শহুরে রীতিনীতি বুঝে ওঠা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
- আমালিয়া, আমালিয়া।
- হুহ, হুম।
আমালিয়া আকাশ-কুসুম ভাবনায় তলিয়ে ছিল। সে নিজের ভাবনার জগতে এতটাই হারিয়ে গিয়ে ছিল যে আরদার পাশ থেকে তাকে ক্রমাগত ডেকে যাচ্ছিল তা সে শুনতেই পায়নি।
- কি ভাবছিলে এতো? কখন থেকে ডেকে চলেছি।
- দুঃখিত। কিছু বলছিলেন আপনি?
আরদার আমালিয়ার পানে তাকিয়ে রইলো একদৃষ্টিতে। সে সিলা গোত্রের রাজা আরদার কাভরাল। তার মতো শক্তিশালী রাজা এখন আর দ্বিতীয়টি নেই। ছলচাতুরি ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সে কঠিন থেকে কঠিন যুদ্ধ জয় করে নিয়েছে। তার জন্য অসম্ভব বলতে কিছু নেই। কিন্তু তার সামনে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে বোঝা যেন দুষ্কর। সে যতো চেষ্টায় করুক আমালিয়াকে বুঝতে পারে না। সব জ্বিনদের মাঝে কিছু শক্তি থাকে। যেমন হাওয়ার বেগে ছুটতে পারা, মনুষ্য চিন্তা-ভাবনা বুঝতে পারা, সামনের মানুষটির মনের কথা শুনতে পাওয়া, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টেলিপোর্ট হওয়া। এগুলি খুবই স্বাভাবিক শক্তি তাদের। যা সব জ্বিনরাই জন্ম থেকে পেয়ে থাকে। এছাড়াও প্রত্যেকের নিজস্ব কিছু শক্তি থাকে। তার নিজেরও আছে। তবুও সে সামনে থাকা মেয়েটিকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারে না। আমালিয়ার মনের কথা কিছুতেই শুনতে পারে না। যা ভীষণ ভাবে ভাবায় তাকে।
- কি হলো বলুন।
আমালিয়ার কথায় ধ্যান ভাঙলো আরদারের।
- আইসক্রিম খাবে?
- আইসক্রিম?
- হ্যাঁ। খাবে?
আমালিয়া যেখানে বড় হয়েছে সেখানে বাইরের বা শহুরে খাবার খুব একটা পাওয়া যেতো না। একদমই যেতো না বললেই চলে। তবে সে যে আইসক্রিম চেনে না এমনও নয়। শৈশবে সে অনেক আইসক্রিম খেয়েছে। কিন্তু সেই স্বাদ তার মনে নেই। মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলতেই আরদার খুশি মনে আইসক্রিম ভ্যানের কাছাকাছি গিয়ে দুটি আইসক্রিম কিনে একটি আমালিয়ার হাতে দিয়ে খেতে ইশারা করলো। আরদার মূলত আমালিয়ার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইছে। এতে সে আমালিয়ার কাছাকাছি থাকতে পারবে। আইসক্রিম খেয়ে আমালিয়া মুগ্ধ। এখানে আসার পর কিছু ভালো লাগুক আর না লাগুক, এই জিনিসটি তার দারুন লেগেছে।
- কি কেমন?
আমালিয়া চমৎকার একটি হাসি দিয়ে বলল,
- দরুন মজা।
আরদার এতটুকুতেই খুশি হয়ে গেল। তার মনে লোভ হলো আমালিয়ার সাথে কথা বলার, সময় কাটানোর। তারা হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগোতে লাগলো।
- তোমার কি পছন্দ সেহ.. মানে আমালিয়া? কোথাও যেতে চাও? কিংবা কিছু দরকার?
আমালিয়া কিছু পল চুপ করে থেকে ইতস্তত করে বলল,
- এখানে লাইব্রেরি আছে? আমি লাইব্রেরিতে যেতে চাই।
- লাইব্রেরি? তুমি পড়তে পারো?
- হ্যাঁ। দাদী পড়তে শিখিয়েছে। তাছাড়া মেলিসার বাবার কাছে শহুরে পড়া-লেখার শিক্ষা নিয়েছি।
আরদার ভীষণ রকম অবাক হয়েছে। সে এতটা আশা করেনি। হাদিজাহ যে আমালিয়ার দায়িত্ব সঠিকভাবে নিবে তার ধারণা ছিল কিন্তু এতো ভালো ভাবে নিবে সে সত্যিই আশা করেনি।
- দারুণ। বেশ তো তবে চলো যাওয়া যাক। এখানে দুটা ঐতিহাসিক ও বড় লাইব্রেরি রয়েছে। তুমি কোনটাতে যেতে চাও?
- সব থেকে পুরোনোটাতে। যেখানে অনেক অনেক বই থাকবে।
- তাহলে তোমার জন্য বেয়াজিত স্টেট লাইব্রেরি একদম ঠিক থাকবে।
আমালিয়া কিছু বলল না, কিন্তু অধির আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছে সেখানে যাওয়ার জন্য।
________
বেয়াজিত স্টেট লাইব্রেরি ইস্তাম্বুল শহরের প্রাণকেন্দ্রে, ফাতিহ জেলার বেয়াজিত স্কোয়ারে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগার। এটি শুধুমাত্র একটি লাইব্রেরি নয়—বরং তুরস্কের ইতিহাস, সাহিত্য, এবং সংস্কৃতির এক জীবন্ত সাক্ষ্য। ১৮৮৪ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের সময়ে এই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে প্রায় ১ লক্ষেরও বেশি বই ও পান্ডুলিপি রয়েছে।
তারা লাইব্রেরিতে প্রবেশ করেই শুরুতে একটি লাইব্রেরি কার্ড করে নিল আমালিয়ার জন্য। আমালিয়া এতবড় লাইব্রেরি দেখে নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। এতো এতো বইয়ের ঘ্রাণ তাকে পাগল করে দিলো মুহূর্তেই। সে এদিক থেকে ওদিকে বইয়ের তাক গুলোকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে লাগলো। আরদার আমালিয়ার এই উচ্ছ্বাস দেখে ভীষণ খুশি হলো। যাক মেয়েটাকে কিছুটা তো খুশি দেখতে পেরেছে।
- আমালিয়া তুমি এখান থেকে একমাসের জন্য বই নিতে পারো। আজ অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে নয়তো এখানে কিছু সময় বসা যেতো। তুমি রাগ করবে না তো?
আমালিয়া আরদারের বলার ভঙ্গিতে হেসে দিল। মাথা নাড়িয়ে বলল,
- একদম রাগ করব না। অন্য কোনো সময় না হয় আসবো আবার।
- অবশ্যই তোমাকে নিয়ে আবার আসবো।
- উমম, আমি কি যেকোনো বই নিতে পারি?
আরদার আমালিয়ার উচ্ছ্বাস দেখে মৃদু হেসে বলল,
- যেকোনো বই নিতে পারো।
আমালিয়ার আর একমুহূর্ত দাঁড়ালো না। দীর্ঘক্ষণ বুকশেলফ গুলো খুঁজে খুঁজে ঔষুধি বানানোর বেশ কিছু বই হাতে নিয়ে পিছু ফিরে আরদারকে না দেখে ভয় পেয়ে গেলো। আশেপাশে কেউ নেই। বই খুঁজতে খুঁজতে লাইব্রেরির একদম শেষ ভাগে চলে এসেছে। এখানে হয়তো সচরাচর কেউ আসে না বলে কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। নিজেকে শান্ত করে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে আগাতে নিলে কারো সাথে আকস্মিক ধাক্কায় হাতের বইগুলো মেঝেতে পরে গেলো। ঠিক সেই মুহূর্তে মাথার ওপর বাল্বগুলো এক এক করে বন্ধ হয়ে গেলো। যার ফলে আমালিয়া যে অংশে দাঁড়িয়ে ছিল তা আঁধারে তলিয়ে গেল। করিডোরের শেষ মাথায় একটি জানালা থেকে অল্প আলো জোর করে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। যদিও তাতে খুব একটা আলোকিত হলো না কিন্তু তাও ঘুটঘুটে অন্ধকার ভাব কেটেছে একটু। সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তি আলোর বিপরীতে দাঁড়ানোয় আমালিয়া তার চেহারা স্পষ্ট ভাবে দেখতে না পারলেও, ব্যক্তিটির শারিরীক বৈশিষ্ট্য আমালিয়াকে ভীষণ ভাবে অবাক করলো। পরণে লোকটার অদ্ভুত এক পোশাক। না টি-শার্ট না হুডি। এ কেমন পোশাক?
- দুঃখিত। আমি লক্ষ্য করিনি আপনাকে।
লোকটি আমালিয়ার কথায় বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে নিজ উদ্যোগে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে তার বইগুলো তুলতে লাগলো। আমালিয়ার অপরাধবোধ হলো খুব। হয়তো লোকটি তার আচরণে বিরক্তও। সে কথা না বাড়িয়ে নিজেও বই তুলতে বসে গেলে। অতঃপর লোকটি কিছু না বলে নিজের বইগুলো নিয়ে তার সামনে থেকে চলে গেল। আমালিয়া হা করে তাকিয়ে দেখলো। ভারী অসভ্য লোক তো! নূন্যতম ভদ্রতা জানে না। আপন মনে বকতে বলতে আমালীয়া বই তুলতে গিয়ে দেখলো একটি অদ্ভুত রকমের বই। বইয়ের ওপর আরবী হরফে লেখা ‘আফসানায়ে জ্বিনান’। আমালিয়া এই বইটি নেয়নি। তাহলে কি ঐ লোকটির বই? সে কি বইটি দিয়ে আসবে? নাকি রেখে দিবে? দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মাঝে পরে আমালিয়া বার কয়েক বইয়ের ওপর হাত বুলিয়ে বেশ কয়েকবার নিজের মনে নামটি উচ্চরণ করলো। অতঃপর নিজের মনের সাথে যুদ্ধে হেরে গিয়ে বইটি সে নিজের সাথে নিয়ে নিল। একরাশ কৌতূহল তাকে ঘিরে ধরেছে। কি আছে এই অদ্ভুত নামের বইটিতে?
- আমালিয়া তুমি এখানে? আমি সেই কখন থেকে তোমাকে খুঁজছি। এখানে কি করছো?
আমালিয়া চটজলদি বইটি অন্য বইয়ের মাঝে লুকিয়ে নিয়ে বলল,
- দুঃখিত। আমি আসলে বই খুঁজতে খুঁজতে কখন যে এখানে চলে এসেছি বুঝতে পারিনি।
- আচ্ছা আচ্ছা। তোমার হয়েছে?
- হ্যাঁ।
- তাহলে যাওয়া যাক?
আমালিয়া মাথা নাড়িয়ে আরদারের সাথে পা মিলিয়ে আগালো। কিন্তু যেতে যেতে তার নাকে একটি মুগ্ধকরা সুগন্ধি অনুভব করলো। হালকা অথচ বুকে লাগার মতো সুগন্ধি।
#চলবে____