#সুঁই_সুতোর_সংসার |৪|
“আপনার সংসার আমি করব না। চোখের দৃষ্টিশক্তি নাই। দুটো অক্ষর চেনেন না। দুই কলম লেখাপড়া শেখেন নাই। খাওয়াবেন কী আমায়? আপনার নিজের বলতে কেউ আছে? হ্যাঁ, আছে? আপনার একাকী জীবনের ভার আমি কেন বইব? কিসের ঠেকা পড়েছে আমার? এখন আমার পড়াশোনা করার বয়স। আমি এখন মাঠে ঘাটে ছুটব। কিন্তু আব্বা আমার পায়ে শিকল পরিয়ে দিলেন। গলায় ঝুলিয়ে দিলেন একটা অপদার্থ। আপনাকে কীভাবে টানব আমি? আমি কাজ করতে অভ্যস্ত নই। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমি। তবুও আমার আম্মা কখনো আমায় থালা ধুয়ে ভাত খেতে দেন নাই। আব্বাকে আমি কখনো ক্ষমা করব না। তিনি আমায় জ্যান্ত দাফন করেছেন। আমার স্বপ্ন ছিল ফারিস ভাইয়ের মতো সুদর্শন কেউ আমার স্বামী হবে। ঘোড়াই চড়ে আমায় বিয়ে করতে আসবে। জীবনটা রুপকথার মতো সুন্দর হবে। কতশত স্বপ্ন ছিল আমার। কিন্তু সব শেষ। সব শেষ। ফারিস ভাই আমায় বলতেন, ওনার মতোই কেউ আমায় বিয়ে করবে। কিন্তু কপালে তো ছিলেন আপনি। আমি এই জীবন পার করতে পারব না। আপনি আমায় মুক্তি দেন। আমার দুচোখ যেদিকে যায় আমি চলে যাব। এখানে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে।”
করুণ সুরে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলে থামল যুহাইরা। জোৎস্না ভেজা সর্বরী। গ্রামের মেঠো পথ চন্দ্রের আলোয় আলোকিত। মাটির ঘরের উঠোনে চন্দ্রমা রুপালি আলো বিছিয়ে দিয়েছে। ক্ষণে ক্ষণে দূরের বাঁশঝড় হতে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। পুকুরের জলে শশীর কাঁপা প্রতিবিম্ব স্পষ্ট। মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে নিশাচর বিহঙ্গের ডাক। কেমন অদ্ভুত শোনাচ্ছে ডাকটা। চারপাশ সুনসান। অদূরের বাড়িগুলো অশরীরীর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। দুয়েকটা বাড়ির খোলা খিড়কির ফাঁক দিয়ে কুপির ক্ষীণ আলো উঁকি দিচ্ছে। বিদ্যুতের আলো তখনও সব গ্রামে পৌঁছায়নি। তাই আকাশের চাঁদটাই যেন ছিল রাতের সবচেয়ে বড়ো বাতি। ঘরের দাওয়ায় পাশাপাশি বসে আছে যুহাইরা এবং ইহতিশাম। নিজের বিরুদ্ধে এত এত অভিযোগ শুনেও ছেলেটা হাসছে। ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে লেপ্টে আছে মৃদু হাসি। যুহাইরা দূরের একটা নারিকেল গাছের দিকে চেয়ে ছিল। গাল বেয়ে নিঃশব্দে বারিধারা নেমে চলেছে। অপরপক্ষের থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে এতক্ষণে পাশ ফিরে চাইল। অমনিই নেত্র যুগলে অবিশ্বাস্যতা ছড়াল। অকস্মাৎ কান্নাটা থেমে গেল। যেই মানুষটাকে ক্ষতবিক্ষত করতে মনের বিরুদ্ধে যেয়ে কতগুলো কটুকথা শোনাল, সেই মানুষটা হাসছে? কী অদ্ভুত! ইহতিশাম বড়ো একটা শ্বাস ফেলল। মুখের হাসি টুকু হারিয়ে যেতে দিল না। ওটুকু ধরে রেখেই একটু কাশল। অপরপক্ষকে হয়ত বোঝাল সে কিছু বলতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটু রয়ে সয়ে শুধাল,
“আমি মুক্তি দিলে তুমি কি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটা হবে? নিশ্চয়তা দিতে পারবে? যদি দিতে পারো তাহলে তোমার মুক্তি নিশ্চিত, কথা দিচ্ছি।”
যুহাইরার ধ্যান ভাঙল। অপরপক্ষের মুখমণ্ডলে এক মনে চেয়ে কিছু একটা ভাবছিল। প্রশ্নগুলো সে শুনেছে। সহজেই এটার উত্তর করা যায়। কিন্তু কেন যেন সে পারল না। নিজের সুখের নিশ্চয়তা দেওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারল না। তৎক্ষণাৎ কিছুই বলল না। নীরবতাকেই প্রাধান্য দিল। চুপচাপ বসে রইল। ইহতিশাম ও নিশ্চুপ। বেশ কিছুক্ষণ সেভাবেই পেরোল। এত পর্যায়ে যুহাইরা একটু নড়েচড়ে বসল। ছোট্ট করে বলল,
“সুখ দেওয়ার মালিক মহান আল্লাহ। এটা আমি কীভাবে বলব?”
ইহতিশামের মুখের হাসি বাড়ল,
“আল্লাহ চাইলে তো এই সংসারেও তোমায় সুখী করতে পারেন। একটাবার কি চেষ্টা করা যায় না? আমি তো জানতাম না তোমার মত নেই এই বিয়েতে। জানলে এমন কাপুরুষের মতো কাজ কখনোই করতাম না।”
যুহাইরা একটু অবাক হলো বৈকি। চোখে মুখে তার রেশ দিব্যি ছড়াল। সত্যিই মানুষটা কিছুই জানত না? নাকি তার মন পেতে মিথ্যা বলছে? তবে এই কয়দিনে এতটুকু বুঝেছে, মিথ্যা শব্দটা অপরপক্ষের সাথে যায় না। কেমন যেন দোটানায় ভুগল যুহাইরা। ইহতিশাম পুনরায় বলল,
“জন্মের সময় আমিও অন্ধ ছিলাম না। তোমাদের মতোই স্বাভাবিক ছিলাম। আব্বা, আম্মা একমাত্র সন্তান ছিলাম আমি। খুবই আদুরে ছিলাম। কিন্তু আমার বয়স যখন দুই বছর তখন ভীষণ জ্বরের কবলে পড়ি। আব্বা গ্রাম ছেড়ে নগরে নিয়ে যান চিকিৎসার জন্য। অতঃপর ভুল চিকিৎসায় নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলি আমি। আমার যখন আড়াই বছর বয়স তখন আব্বা মারা যান। তারপর আমাকে নিয়ে আম্মার বেঁচে থাকার যুদ্ধ শুরু হয়। আমার যখন সাত বছর বয়স তখন আল্লাহ আম্মাকেও আমার থেকে কেড়ে নেন। আমি হয়ে যাই অনাথ। প্রতিবেশীদের চাপে মামা এসে আমায় নিয়ে যান। সেখানে অবশ্য কপালে অত্যাচার জুটলেও সঙ্গে একবেলা দুমুঠো ভাত আর গোয়াল ঘরে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। তারপর এইত এইপর্যন্ত আল্লাহ নিয়ে এলেন। নিজ গ্রামে, আব্বার ভিটেতে ফিরে এসে একাকী জীবন কাটছে আমার। আমি চেয়েছিলাম আমার অর্ধাঙ্গিনী আমায় ভালোবেসে আমার সাথে থাকুক। স্বেচ্ছায় আমার নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী হোক। কিন্তু তোমার বাবার মিথ্যাচার, তোমার চোখে আমায় খারাপ বানিয়ে দিল। আমি দুঃখিত। তবে জোর নেই। তুমি না চাইলে সংসার হবে না আমাদের।”
খুব ধীর গলায় কথাগুলো বলল ইহতিশাম। কণ্ঠস্বরে বিষাদ ঠিকরে পড়ছে। যুহাইরার অভিযোগের চাহনি শীতল হয়ে এসেছে। পুনরায় লোচন জোড়া দিয়ে বর্ষণ নেমেছে। বিয়ের এতদিনে আজ এই প্রথমবারের মতো তার মনটা একটু নরম হলো বৈকি। পলকহীন তাকিয়ে রইল ইহতিশামের দিকে। একটু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। ছেলেটার গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল শ্যাম। পুরুষালী মুখটাতে অদ্ভুত রকমের প্রশান্তি লেপ্টে আছে। তাকালে চোখ দুটোতে কেবল মুগ্ধতা ছড়ায়। ওই দুটো সফেদ রঙা চোখ যেন মুখের সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখে চলল মেয়েটা। পরক্ষণেই নিজের নির্লজ্জতায় নিজেই হতভম্ব হয়ে পড়ল। কী আশ্চর্য! সে কি কোনোভাবে মানুষটার প্রেমে পড়ল? পড়ল কি?
অতীত স্মরণ হতেই নিজের অজান্তেই মৃদু হাসল যুহাইরা। ভালো লাগা আর খারাপ লাগার সংমিশ্রণে অদ্ভুত এক অনুভূতির দোলাচালে পিষ্ট হলো হৃদয়খানা। সেই দিন থেকেই ইহতিশামের প্রতি তার মনোভাব ক্রমশ বদলাতে থাকে। সে পুরোদমে যখন ইহতিশামের আল্লাহ ভীরুতা অনুভব করে, তখন আর ছেড়ে যাওয়ার সাধ্য হয়নি। উলটো নিজেকে তার উত্তম অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। এমনকি প্রতিনিয়ত করছে। নয়ত সে তো ছিল পুরোটাই বিপরীত ধর্মী। সে মাঠে ঘাটে ছুটে চলা কিশোরী। গান বাজনার আসরে তার উপস্থিতি সবসময় ধার্য ছিল। অথচ দ্বীনদার চমৎকার একজনের সংস্পর্শে এসে সে পরিবর্তন হয়েছে। সব ছেড়ে আল্লাহর কাছে নিজেকে চিরতরে সঁপেছে। একজন ভালো মনের মানুষের স্ত্রী হতেও ভাগ্য লাগে। সৌন্দর্য তো ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু কৃতকর্ম স্থায়ী। মানুষ যা কর্ম করবে প্রকৃতি তা দ্বিগুণ রুপে তাকে ফিরিয়ে দেবে। ইহতিশাম নিঃসন্দেহে চমৎকার একজন মানুষ। নয়ত একজন অন্ধ হয়ে গ্রামের ছোট থেকে বড়ো সকলের ভালোবাসা, সম্মান তো সবাই পায় না।
মধ্যিখানে পেরিয়েছে একটা দিন। পরিকল্পনা মোতাবেক আজ সকাল নাগাদ যুহাইরা পরিবার সমেত নিজের গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। বেলা বেশখানিকটা বেড়েছে এখন। তারা সবাই একটা নৌকার ছাউনির নিচে বসে আছে। সঙ্গে আছে আরও অনেক যাত্রী। আর কিছুক্ষণের পথ বাকি। তারপরই বকুলবাড়িয়া ঘাট। তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যস্থল এসে পৌঁছাবে। নৌকার মাঝে বসেই অতীত নিয়ে একমনে ভেবে চলেছে যুহাইরা। কালো বোরকা এবং বড়ো ওড়ানার আড়ালে নিজেকে আবৃত করে রেখেছে। কপালে একটুকরো কাপড় বেঁধে চোখ দুটোও ঢেকে রাখা। এমনকি হাত এবং পা জোড়া ঢাকা আছে কালো মোজার আড়ালে। সম্পূর্ণ শরীর আচ্ছাদিত। দেহের একটা পশম ও দেখার সুযোগ নেই। এই পর্যায়ে পাশ থেকে নূরাইয়া ডাকল,
“মা?”
যুহাইরা নড়েচড়ে বসল। ভাবনা চ্যুত হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশ ফিরল। মুচকি হেসে বলল,
“হ্যাঁ।”
নূরাইয়া জানতে চাইল,
“আর কতক্ষণ লাগবে মা?”
এই প্রশ্নের উত্তর যুহাইরা দিতে নেবে তার আগেই নাভিদ অকপটে বলে বসল,
“আমার পাছুটা ব্যাথা হয়ে গেল একদম। আমার আসলে পাখি হওয়া উচিত ছিল। তাহলে উড়ে উড়ে চলে যেতে পারতাম।”
বাচ্চা দুটোর পাকা পাকা কথায় ইহতিশাম আর যুহাইরা মৃদু হাসল। ইহতিশামের হাসিটা চক্ষু গোচর হলেও যুহাইরার স্নিগ্ধ হাসি টুকু লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেল। যুহাইরা জবাব দিল,
“এইত কিছুটাবাকি। আরেকটু ধৈর্য্য ধর কেমন? জানিস তো আল্লাহ ধৈর্যশীলদের পছন্দ করে।”
নাভিদ এবং নূরাইয়া দুজনেই বুঝদারের মতো মাথা নাড়ল। ভাই-বোনের পাকা পাকা কথায় পাশে বসা একজন মধ্যবয়স্ক নারী মুচকি মুচকি হাসছে। বেশ কিছুক্ষণ থেকে তাদের দেখে চলেছে। এতক্ষণে তিনি প্রশ্ন করে বসলেন। ইহতিশামকে ইশারায় দেখিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“ওইটা কি তোমার স্বামী?”
যুহাইরা বুঝল প্রশ্নটা তার উদ্দেশেই করা হয়েছে। পাশে তাকিয়ে ভদ্রমহিলার দৃষ্টি লক্ষ্য করে উত্তর দিল,
“জি।”
ভদ্রমহিলা ফের জানতে চাইলেন,
“এই বাচ্চা দুটোও তোমার?”
যুহাইরা ভদ্রতার সাথে বলল,
“জি, চাচি।”
ভদ্রমহিলা মাথা নেড়ে আচ্ছা বোঝালেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে পুনরায় শুধালেন,
“এই যে এত গরমেও বোরকা পরে আছ। অস্বস্তি হচ্ছে না তোমার? অসুস্থ হয়ে পড়বে তো।”
যুহাইরা এইবার হেসে ফেলল,
“তাহলে ভাবুন আমরা এই সামান্য গরমই সহ্য করতে পারি না। তাহলে জাহান্নামের আগুনের তাপ কীভাবে সহ্য করব? যার সত্তর ভাগের কেবল একভাগ তাপ মহান আল্লাহ পৃথিবীতে দিয়েছেন। মহান আল্লাহকে খুশি করতে, পাপ থেকে নিজেকে হেফাজতে রাখতে এতটুকু অস্বস্তি হাসিমুখেই গ্রহণ করি, চাচি। এতে তো আমার ক্ষতি নেই।”
ভদ্রমহিলা এমন প্রত্যুত্তরে যে বেশখানিকটা অবাক হয়েছেন সেটা ওনার দৃষ্টিতেই প্রকাশ পাচ্ছে। অন্যরকম ভালোলাগায় ইহতিশামের মনটা ভরে উঠল। এমন একজন অর্ধাঙ্গিনীর স্বপ্নই তো সে যৌবনে দেখেছিল। সে বড্ড স্বল্পভাষী। তাই তো পুরোটা রাস্তা প্রায় চুপচাপ এসেছে। মাঝেমধ্যে নাভিদ, নূরাইয়ার দুয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে এই যা। ভদ্রমহিলা এই মুহূর্তে মুচকি হাসলেন,
“এইবার বুঝলাম, স্বামী অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তোমায় কেন এত চমৎকার সুস্থ দুটো সন্তান দিয়েছেন। স্বামী, সন্তান নিয়ে ভালো থাকো মেয়ে।”
যুহাইরা আর কিছু বলল না। মাথাটা নাড়ল কেবল। কথায় কথায় গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেল তারা। মাঝি নৌকা ঘাটে ভিড়াতেই তারা চারজন নেমে দাঁড়াল। যুহাইরা ভাড়া মিটিয়ে দিল। অকস্মাৎ এক দমকা হাওয়ায় ফেলে যাওয়া সেই পুরোনো শৈশবের গন্ধ এসে ঠেকল যুহাইরার নাসারন্ধ্রে। মেয়েটার আঁখি জোড়া ছলছল করে উঠল।
#চলবে
লেখনীতে: #ইসরাত_তন্বী