ফন্ট সাইজ:
থিম:
মধ‍্যরাতের আগন্তুক

৩য় পর্ব

লেখক: শ্রেয়সী রহমান

#মধ্যরাতের_আগন্তুক #শ্রেয়সী_রহমান #পর্ব৩

লিখনীতে:শ্রেয়সী রহমান।
গুমোট আকাশে মেঘের ঘনঘটা, যে কোনো মুহূর্তে ঝরে পড়তে পারে শ্রাবণের অবিরাম ধারা। ভেজা বাতাসে ভাসে এক স্নিগ্ধ অলসতা, ঠিক যেন হৃদয়ের গভীর কোনো না-বলা অনুভূতির অপেক্ষা।
​বিকেল ৪:৪৫ মিনিট। সেজুতির আসার কথা এই তো এখনই। তার এক পলক দেখার জন্য অভ্রর মনটা তখন থেকেই ভীষণ ব্যাকুল হয়ে উঠেছে, কিন্তু এত দেরি কেন করছে সে? এই সুযোগে অভ্র ফুল বিক্রেতার কাছ থেকে কিনে নেয় সেজুতির সবচেয়ে পছন্দের এক গুচ্ছ তাজা কদম ফুল।
​ঠিক তখনই দূর থেকে নজরে পড়ল, নীল শাড়ি পরা, খোলা চুলে এক তরুণী হেঁটে আসছে তার দিকেই। অভ্রর দৃষ্টি পলকের জন্য থমকে গেল।
​হঠাৎ করেই মেয়েটি অভ্রর সামনে এসে মিষ্টি হেসে বলে উঠল,
— "আপনি অভ্র ভাই না?"
​অভ্র হতভম্বের মতো কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে আমতা আমতা করে জবাব দিল,
— "জি... তুমি কি আমার সেজুতি?"
​অভ্রর এমন হুট করে 'আমার সেজুতি' বলাটা শুনে মুহূর্তেই সুজতির দুই গাল লজ্জায় লাল হয়ে গেল। নিজের ওপর নিজেই বিরক্ত হয়ে অভ্র ফিসফিস করে বলে উঠল,
— "সরি! কী বলতে কী বলে ফেললাম!"
​নিজের মাথায় নিজেই একটা থাপ্পড় মেরে সে মনে মনে বলতে লাগল, ",ছি! মুখ ফসকে এত জলদি বলে দিলি কেন? একটু ধৈর্য ধরা যেত না ব্যাটা!"
​ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশ ভেঙে ঝুমঝুম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। আর ঠিক এই রোমাঞ্চকর ক্ষণটার জন্যই তো সে অপেক্ষা করছিল!লুকিয়ে রাখা ভেজা কদম ফুলের তোড়াটি সেজুতির সামনে বাড়িয়ে দিয়ে অভ্র হাঁটু গেড়ে বসল বৃষ্টির মাঝেই, আর গেয়ে উঠল জয় শাহরিয়ারের সেই চেনা গানটি—
"এক গুচ্ছ কদম হাতে... ভিজতে চাই তোমার সাথে..."
বৃষ্টির ছাঁট আর স্নিগ্ধ বাতাসে চারপাশের প্রকৃতি তখন এক মায়াবী রূপ নিয়েছে। অভ্রর একের পর এক এমন সব কাণ্ডকারখানা দেখে সেজুতি একেবারে বোকা বনে গেল। অপ্রস্তুত হয়ে শুধু তার কর্মকাণ্ডগুলো অবাক হয়ে দেখে যাওয়া ছাড়া যেন আর কিছু করার ছিল না তার। আচমকা পেছনে কদম ফুল পেয়ে তার খুশির আর সীমা রইল না; অভ্রর কাছ থেকে পাওয়া একের পর এক মিষ্টি সব সারপ্রাইজ তাকে যেন মোহিত করে তুলল। এই বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরলে তো জ্বর বাঁধাবে দুজনেই!—বলেই সেজুতি নিজের ছাতাটা বাড়িয়ে দিল অভ্রর দিকে। কিন্তু অভ্র মৃদু হেসে ছাতাটা ঠেলে সরিয়ে দিল, চোখের দৃষ্টিতে তখন অন্যরকম এক ভালোলাগা।
​—"না, আজ এই বৃষ্টিতে ছাতা ব্যবহার করতে ইচ্ছে করছে না,"—অভ্র ফিসফিস করে বলল।—"সব বৃষ্টি কি আর গায়ে লাগার ভাগ্য হয়?"
​রাস্তার দুপাশের কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো থেকে বৃষ্টির ফোঁটা টুপটাপ ঝরে পড়ছে পিচঢালা পথে। ভেজা বাতাসে তখনো কদম ফুলের মিষ্টি সোঁদা গন্ধ। অভ্র মুচকি হেসে নিজের ভেজা পাঞ্জাবির হাতাটা একটু গুটিয়ে নিল, তারপর খেয়াল করল সেজুতির শাড়িটা বেশ ভিজে গেছে। বৃষ্টিতে ভিজে লেপ্টে থাকা কাপড়ের আড়ালে তার শরীরের লাবণ্যময় নারী অবয়ব আর কোমর আলতোভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
​অভ্রর চোখ হঠাৎ সেদিকে পড়তেই তার বুকটা এক অদ্ভুত ভালোলাগায় কেঁপে উঠল। দৃষ্টিতে মুগ্ধতা মাখিয়ে সে একটু আড়াল করার ভঙ্গি করে নিজের শরীর দিয়ে কিছুটা ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করল, যেন অন্য কারও নজর না পড়ে।এরপর দুজনে কিছুক্ষণ বৃষ্টিবিলাস করে সোজা গিয়ে হাজির হলো তাদের চেনা সেই ক্যাফেতে—যেখানে বসে গল্প করার কথা আগেই ঠিক করা ছিল।
​ক্যাফের উষ্ণ আলো আর জানালার বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টির শব্দের মাঝে তারা এক কোনার টেবিলে বসল। গরম কফির কাপে চুমুক দেওয়ার ফাঁকে অভ্র সেজতির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। অভ্র কফি কাপটা টেবিলে রেখে দুষ্টু হেসে বলল, "আচ্ছা সেজুতি, তোমার কি সেই দিনগুলোর কথা মনে আছে? যখন আমাদের মোলাকাত হতো শুধু মেসেঞ্জার কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাটে। সারারাত অনলাইন থেকে টিক চিহ্ন আসত, আর তুমি টেনশনে ঘুমাতে পারতে না যে আমি কখন মেসেজ দিই!"
​সেজতি লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়ার উপক্রম। গালের চামড়া যেন উত্তাপে চুঁইয়ে পড়ছিল, সে কফির কাপে চোখ রেখেই ফিসফিস করে বলে উঠল, "ইস! কি সব পাত্তারি খুলছ তো! তখন তো কত কিই না আলতু-ফালতু টেক্সট পাঠাতে রাত-বিরাতে। ডিলিট করার অপশন থাকলে তো সেদিনই সব ডিলিট করে দিতাম!"
​অভ্র খিলখিল করে হেসে উঠল। ক্যাফেতে বসে গল্প করার সেই মিষ্টি বাহানায় দুজনে ফোনের চ্যাট বক্সের পুরোনো সেই মিষ্টি ঝগড়া আর কাটানো দিনগুলো রোমন্থন করতে লাগল। চোখের ভাষায় জমে থাকা ভালোবাসার উষ্ণতা তখন বাইরের বৃষ্টির ঠান্ডাকেও হার মানাচ্ছিল।
​বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দেওয়ার পর বাইরে বৃষ্টি একটু কমতেই বাড়ি ফেরার পালা এল। কিন্তু অভ্র তো নাছোড়বান্দা ছেলে; সেজুতিকে একা ছাড়বে না—নিরাপদে তাকে একেবারে বাসার দরজায় পৌঁছে দিয়েই তবে সে দমবে। যেই কথা, সেই কাজ! সেজুতিকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে অভ্র যখন নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল, ঠিক তখনই ঘটে আসল ঘটনা। 
বাইরে তখন প্রকৃতির মন বড়ই করুণ। কদমফুল ছড়ানো ভেজা পিচঢালা পথ, বাতাসে সোঁদা মাটির মদির গন্ধ আর শ্রাবণের ভারী মেঘে ঢাকা আকাশ—সব মিলিয়ে চারপাশটা এক অদ্ভুত বিষণ্নতায় মোড়ানো। কৃষ্ণচূড়ার লাল পাপড়িগুলো বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে চ্যাপ্টা হয়ে লেপ্টে আছে ভেজা পিচে। ঠিক এমন এক গোধূলিলগ্নে আনমনে রিকশা থেকে নামল অভ্র। গায়ে তার ভেজা শার্ট, চুল দিয়ে টপচে টপচে পড়ছে বৃষ্টির পানি।
বৃষ্টিতে ভিজলে যে তোর শ্বাসকষ্টটা বেড়ে যায়, তা কি ভুলে গেছিস? তাছাড়া তুই তো এমনিতেই বৃষ্টিতে ভিজিস না, আজকে হঠাৎ এমন করে ভিজে ফিরলি কী করে রে বাবা?"
​মায়ের একরত্তি প্রশ্রয়ভরা অথচ চিন্তিত ধমকে অবরো একটু হাসার চেষ্টা করল। ক্লান্ত মুখে সে বলল—
​"মা, তুমি তো একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে মারছ, জবাব দেওয়ার সুযোগই তো দিচ্ছ না!"
"কই গেছিলি রে বাপ, এত ভিজে গেলি কীভাবে?"
"আহ মা, এত প্রশ্ন করো না তো! সব বলব, আগে একটু ফ্রেশ হয়ে আসতে তো দাও।"
​ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রাহিলি বেগম আর কথা বাড়ালেন না। শুধু নরম গলায় বললেন, "অনেকটা পথ হেঁটেছিস, শরীরটা এমনিতেই খারাপ করছে। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আয়, টেবিলে খাবার দিচ্ছি।"বাড়িতে ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে বসে মায়ের কাছে নিজের বাইরে যাওয়ার সব গল্প একে একে খুলে বলল অভ্র। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ ভেজা শরীরে থাকার খেসারত দিতে হলো তৎক্ষণাৎ। রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথেই অবরোর কপালের তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করল। ১০২ ডিগ্রি পেরিয়ে তা যখন ১০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কোঠায় পৌঁছাল, তখন পুরো শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। বৃষ্টির পানি অভ্ররোর শরীরে কখনোই সয় না; এক ফোঁটা জলও যেন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। আজ এই মাঝরাতে, ছোট্ট বাড়িটায় মা আর ছোট ভাই ছাড়া এই মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোর মতো আর কেউ নেই। চারপাশের এই নিস্তব্ধ অন্ধকার আর জ্বরের ঘোরে অভ্রোর ক্লান্ত চোখ দুটো যেন শুধু একটা চেনা আশ্বাসের অপেক্ষায় বুজে আসতে লাগল।
ওদিকে ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ৯:০০ টার ঘরে স্থির, শহরের আরেক প্রান্তে তখন অন্য এক অস্বস্তি। সেজুতি বারবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছটফট করছে। অভ্রর কাছ থেকে দীর্ঘক্ষণ কোনো টেক্সট বা সাড়া না পেয়ে তার বুকটা অজানা আশঙ্কায় দুলে উঠল। মোবাইল কি সুইচড অফ করে রেখেছে? নাকি কোনো বিপদ হলো? 
মনে মনে একরাশ অভিমান আর দুশ্চিন্তা নিয়ে সে ভাবতে লাগল—লোকটা কি সত্যিই তাকে ভুলে গেল, নাকি অন্য কোনো কারণ?
 সেজুতি বুঝতেই পারছে না, এই নীরবতার আড়ালে অভ্র নিজেই তখন এক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
(চলবে....)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন