#এক_বনে_দুই_বাঘ
‘নক্ষত্রদের মৃত্যু নেই’
৭.
®রোজা রহমান নাঈমা
‘
ডিসেম্বর, ২০২১;
ক্ষীণ পরিমাণ আলো ছড়ানো অবরুদ্ধ একটি কক্ষ। সেখানে দিন আর রাতের পার্থক্য বোঝা অসম্ভব একটা ব্যাপার। না আছে কোনো জানালা, না আছে বাইরের পৃথিবীর অস্তিত্ব জানান দেওয়ার কোনো শব্দ। একরকম ভোঁতা পরিবেশ। কক্ষটির একমাত্র সঙ্গী ছাদের কোণে ঝুলে থাকা ম্লান একটি বাল্ব, যা অন্ধকারকে পুরোপুরি দখল করতে পারেনি।
ছাদের লোহার রডের সঙ্গে দড়ি ও শিকলে দুই পা একসঙ্গে বেঁধে উল্টো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে মানুষটিকে। দু'হাত ঝুলন্ত অবস্থায় ঝুলছে। হাতে যে দড়ি বাঁধা ছিল তা খুলে দিয়েছে ঝুলিয়ে বাঁধার পর। এখনও সেভাবেই ঝুলছে সে।
একটা সময় পর পিটপিট করে আহত হওয়া চোখজোড়া খোলার চেষ্টা করল সে। কিন্তু শরীর সাড়া দিল না। শরীর সায় না দেওয়ায় চোখজোড়াও যেন বিদ্রোহ করল। দীর্ঘ সময় উল্টো ঝুলে থাকার ফলে এমন প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। উল্টো ঝোলা অবস্থায় তার জন্য বেঁচে থাকা একটি যুদ্ধক্ষেত্র৷ আর সে সেই যুদ্ধ করেই বেঁচে আছে এখনও। মাথায় রক্তচাপ, শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা, স্নায়বিক জটিলতাকেও সে ছাপিয়ে যেতে রাজি। নিজের সঙ্গে সেই যুদ্ধ অব্যাহত রেখে সময় বোঝার চেষ্টা করল সে৷ ঠিক কতক্ষণ ধরে এভাবে ঝুলছে, তার নির্ভুল হিসাব নেই। তবে এখনও তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক ও পর্যবেক্ষণক্ষমতা একটি অনুমান দাঁড় করিয়েছে— প্রায় চব্বিশ ঘণ্টার এপাড়-ওপাড় হয়েছে হয়তো।
কারণ বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও শরীরের ভেতরে এখনো সচল রয়েছে তার জৈবিক ঘড়ি— সার্কাডিয়ান রিদম।
মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত সুপ্রাকিয়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াস নামের ক্ষুদ্র একগুচ্ছ স্নায়ুকোষ এই চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। আলো-অন্ধকারের সংকেত না পেলেও শরীর পুরোপুরি ক্রিয়া হারায় না। ঘুমের তীব্রতা, ক্ষুধার ব্যবধান, ক্লান্তির স্তর, মনোযোগের ওঠানামা এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সূক্ষ্ম পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে সে সময়ের প্রবাহ আন্দাজ করার চেষ্টা করছে।
তার অনুমান ক্ষমতা থেকে বুঝল শরীর পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজনীয় অনুভব করিয়েছিল একবার। অর্থাৎ মেলাটোনিনের নিঃসরণ তাকে গভীর ঘুমের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। হতে পারে সেটা রাতের ঘুম ছিল৷ আবার কর্টিসোলের স্বাভাবিক ওঠানামা শরীরকে জাগ্রত থাকার সংকেত দিচ্ছে। সেই চক্রগুলোর হিসাব ও প্রভাব এখনো শরীরের ভেতরে রয়েছে। অন্ধকার কক্ষে কোনো ঘড়ি নেই, কোনো সূর্য নেই, কোনো জানালা নেই। তবুও নিজের শরীরের ভেতরে চলতে থাকা সেই জৈবিক সময়গণনাকেই ভরসা করে সে মেলাতে পারল— প্রায় একদিন পেরিয়ে গেছে।
দীর্ঘক্ষণ হাত বেঁধে রাখার ফলে যে রক্তজমাট বেঁধে টনটন করছিল তা কিছুটা কম পড়েছে। তবে কনকনে শীতটা তাকে এখনও আলিঙ্গন করে রেখেছে। কারণ শরীরে শীতের পোশাক নেই। আছে শুধু প্যান্ট ও পাতলা একটি শার্ট। এখন আবার ক্ষুধা টের পাচ্ছে। অর্থাৎ সময়টা সকাল হতে পারে। সকালে তার ক্ষুধার সময় অনুযায়ী আনুমানিক সময় সকাল আটটা থেকে দশটার ভেতর থাকতে পারে। অর্থাৎ কাল সকাল থেকে সে কিছুই খায়নি। পানি টুকুও তাকে দেয়া হয়নি। পুরো একটাদিন না খাইয়ে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় উল্টো বেঁধে তাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
নিজের এমন অবস্থার ওপর তার কোনোরকম দুঃখ, মায়া, করুণা কিছুই এলো না। শুধু হাসি এলো। সেটাও নিজের ওপর নয়৷ এই পরিণত দেয়া ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিদের ওপর। তাকে ঠিক কতটা ভয় পেলে এমন পরিণতি দেয়া যায়!
কতক্ষণ পর যেন লোহার তৈরি দরজাটা ঠেলে দেয়া হলো। হতে পারে ঘণ্টাখানেক পর। কেউ আসবে মনে হচ্ছে। সেটাই হলো। কেউ একজন একটি পাত্রে পানি ও একটি থালায় খাবার নিয়ে ঢুকছে। খাবার? ওগুলো খাবার না। পোড়া রুটি যা খাবার অযোগ্য। সে ওসবে মনোযোগ দিল না। বাইরের দিকে মনোযোগ টেনে নিল। আরো ব্যক্তি ঢুকবে মনে হচ্ছে। তবে প্রবেশের পূর্বে কয়েকজনের কথপোকথনের আওয়াজ পাওয়া গেল। অনুমান অনুযায়ী কণ্ঠের মালিক দুই জন ব্যক্তি হবে। প্রবেশের পূর্বে কিছু আলোচনা হচ্ছে তাদের মাঝে। যা সঠিক শুনতে না পারলেও বুঝতে ঠিকই পারল সে। আর বুঝতে পেরে মস্তিষ্কে তখন আওড়াল,
“ ক্ষমতা কখনও সম্পর্ক মানে না৷”
…
জানুয়ারি, ২০১৩;
মালিথা ভিলায় আজ বহুদিন পর উৎসব উৎসব আমেজ ফিরেছে। যেটা ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসের পর চাপা পড়েছিল বেশ অনেকটাই। বাড়ির ছোট কর্তা জায়ান মালিথার মৃত্যুবার্ষিকী ছিল জানুয়ারির ১০ তারিখে। তিন বছর পূর্তি হয়েছে তাঁর মৃত্যুর। গত সপ্তাহে মালিথা ভিলায় দোয়া-মিলাদের আয়োজন সহ এতিমখানা ও মসজিদে মিলাদ এবং খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সবটা দায়িত্ব নিয়ে করেছেন জাকির মালিথা। সঙ্গ দিয়েছে তুহিন, নীহার ও শিশির। জাহিদ মালিথা আসতে পারেননি। ভাইয়ের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এতিমদের ও ফুটপাতের ছেলে-মেয়েদের তাঁরা দুইভাই শীতের পোশাক বিতরণ করেছেন৷
আগামীকাল বিশেষ একটি দিন মালিথা পরিবারের জন্য। বিশেষ দিন হবার কারণ হলো বাড়ির বড় ছেলে তুষারের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে যাওয়া হবে আগামীকাল। শুধু মেয়ে দেখতে নয়, মেয়ে পছন্দ হলে আঙটিও পরিয়ে রেখে আসা হবে। হুট করেই আয়োজনটা শুরু হয়েছে। তিনদিন আগে বাড়িতে জাকিয়া হঠাৎ জানালেন তিনি তার বড় ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে চান। এবং মেয়ের খোঁজও পাওয়া গেছে। বাড়ি মেহেরপুর জেলায়।
হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তে সবার মাঝে ভাবনা সৃষ্টি করে। হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া মানুষ জাকিয়া নন। কিছু একটা ব্যাপার আছে সেটা বোঝা যাচ্ছিল। কারণ তুষারের জন্য মেয়ে দেখার এতটা তাড়াও বাঁধেনি। সে ট্রেনিং থেকেই ফেরেনি এখনও। যদিও ট্রেনিং শেষ পর্যায়ে আছে। তবুও ব্যাপার একটা ছিল বলে সবাই ধারণা করেন৷ আবার কুষ্টিয়া ছেড়ে মেহেরপুরেই বা কেন? তাই কারণ জানতে চাইলে জাকিয়া বিস্তারিত কারণ জানান৷
সেদিনই বিকেলে তুষার নিয়মমাফিক পরিবারের সাথে কথা বলে বৃষ্টিকে ফোন দেয়। রোজকার মতোই বৃষ্টির সুললিত কণ্ঠ শোনার অপেক্ষা নিয়ে কানে ফোন ধরে সে চিত হয়ে ঘাসের ওপর শুয়ে থাকে। কিন্তু কল ধরতে একটু সময় লাগে বৃষ্টির। তুষার ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাবে। এমন ঘটনা বিরল তুষারের জন্য। বৃষ্টি জানে তুষার কখন ফোন দেয়, আর তুষারের ঠিক কতটুকু সময় হাতে থাকে। তবে মাঝেমধ্যে হয় ভেবে সে অপেক্ষা করে। একবারের জায়গায় দু'বার কল দিতে হলো সেদিন তুষারকে। তুষার কানে ফোন ধরে আবার অপেক্ষা করে। কিছুক্ষণের মাঝে কল ধরে বৃষ্টি। বৃষ্টি সালাম দেওয়ার আগেই তুষার বলে বসে,
“ এনি প্রবলেম, বৃষ্টি? কোথায় ছিলে তুমি?”
বৃষ্টি শুরুতেই কথা বলতে পারে না। কিছুটা সময় লাগে। তবুও যখন কথা বলে কেমন দেবে যাওয়া কণ্ঠ পায় তুষার। বৃষ্টি প্রথমে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“ কেমন আছ?”
“কণ্ঠ ওমন কেন? কী হয়েছে?”
“ ঠাণ্ডা লেগেছে। বলো কেমন আছ?”
তুষার ঠোঁট কামড়ে ধরে আকাশ দেখে দুই সেকেন্ড সময় নিয়ে। এরপর সন্দিহান কণ্ঠে বলে,
“ঠাণ্ডা লাগেনি। লাগলে শুরুতে কথা না বলে থেমে থাকতে না। বলো কী হয়েছে?”
“ পুলিশ অফিসার না হতেই ইনভেস্টিগেটর হয়ে গেলে নাকি?”
“ ধরো তেমনটাই।”
থেমে একটু শক্ত ভাবে বলে,
“ বৃষ্টি আমি শুনতে চাইছি, কী হয়েছে?”
বৃষ্টি তখন ফুঁপিয়ে ওঠে। তুষার তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে আর বোঝে এটা ভেবেই তার ভীষণ কান্না পায়। ওর ফুঁপিয়ে ওঠাতে তুষার লাফিয়ে উঠে বসে অস্থির হয়৷ কথা যেহেতু বৃষ্টি, সেহেতু বিষয়টা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আর তুষারের গুরুত্বপূর্ণ বৃষ্টিকে তুষার ডাকে,
“ এই বৃষ্টি, বৃষ্টি?”
তুষারের ডাকে সাড়া দেয়না বৃষ্টি৷ তুষার অস্থির কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি চাইছ আমি ট্রেনিং বাদ দিয়ে মেহেরপুরে চলে আসি? হ্যাঁ?”
“ না৷”
“ বলছ না কেন কী হয়েছে?”
“ ছোটমা মেরেছেন।”
“ এই বৃষ্টি!”
তুষারের হুংকার দেয়া কণ্ঠে বৃষ্টির কান্না আটকে যায়। তুষার যেন এমন কথা শুনতেও চায় না৷ তবুও বৃষ্টি বলেছে৷ মানে বিশাল অপরাধ করে ফেলেছে। তুষারের চোয়াল শক্ত হয়৷ সে জানে বৃষ্টির সৎমা ঠিক কোন প্রকৃতির মহিলা৷ এটা বৃষ্টি না জানালেও তুষার জেনেছিল কীভাবে যেন৷ বৃষ্টিকে সেটা বলেনি৷ তবে বৃষ্টি অনুমান করে তার ফুপাতো বোন নয়ন বলেছে৷
তুষারের কণ্ঠ দৃঢ় হয় আরো। সেই কণ্ঠে বলে,
“তোমার গায়ে কেন হাত দিয়েছেন? কেন? হ্যাঁ?”
বৃষ্টি চাইছিল না একদমই এ নিয়ে কথা উঠাতে। কিন্তু তার ভেতরেও একটা অজানা আতঙ্ক কাজ করছে। তুষারকে হারানোর আতঙ্ক। সে তুষার বিনা অসম্পূর্ণ বলে দাবি করে নিজেকে। সেখানে বিষয়টা চেপে যাওয়া তার সম্ভব হয় না। তুষারের প্রতি তার ভালোবাসা, বিশ্বাস, ভরসা থেকে বলে,
“পাত্রপক্ষ আসছে আগমী পরশু। আমি মানা করায় ভীষণ কথা শোনান। আমিও সহ্য করতে না পেরে কিছু উত্তর করাতে, উনি হাত তোলেন৷”
তুষারে মেজাজ ওঠে সেকেন্ডে একশ মিটার। এমন একটা খবরে ঠিক কতটা আশ্চর্য হওয়া যায়, সে তখনও বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু আশ্চর্যের চেয়ে বৃষ্টিকে হারানোর চিন্তা গ্রাস করে বেশি। বৃষ্টি তার অনেক সাধনার। বৃষ্টিকে পেতে তার কতটা কসরত করতে হয়েছে একমাত্র সে আর উপরওয়ালা জানে। তুষারের এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়, আসলে বৃষ্টিকে সে এখনও পায়ইনি। এই পাওয়াটা আসল পাওয়া নয়। বৃষ্টিকে পেতে হলে এখনও কসরত করতে হবে তাকে। বৃষ্টিকে হারাবে মানে! ব্যাপারটা এতটাই সহজ? যদি ওই মহিলা জোর-জুলুম করে বৃষ্টির বিয়ে দিয়ে দেন? তুষার জানে বৃষ্টি এখনও তার কথা বাড়িতে কিছু জানতে দেয়নি। এরপরও দিয়েছে কিনা তুষার জানতে জিজ্ঞেস করে,
“ বাড়িতে কিছু বলেছ?”
“না, তুমি চিন্তা কোরো না৷ আমি সামলে নেব। আর দেখতে এলেই তো বিয়ে…”
তখনই খট করে কল কেটে দেয় তুষার৷ বৃষ্টির কথা পুরোটা শুনতে সে রাজি নয়। বৃষ্টি দুয়েকবার চেষ্টা করেও কল ওয়েটিংয়ে পায়৷ এরপর আর চেষ্টা করেনা। সে ডুকরে ওঠে তখন। বুকের ভেতর ভেঙে আসে সব। দুনিয়া কেমন অন্ধকার লাগে। তুষারের কাছে যতোই বলুক সামলে নেবে, আসলে কতটা সামলাতে পারবে তার জানা নেই। সেই এসএসসির পর থেকে বিগত দুইটা বছর সে সামলে এসেছে। তাকে এসএসসির পর থেকেই বিয়ে দেয়ার জন্য উঠে-পড়ে লেগে আছেন বৃষ্টির ছোটমা হাসনাহেনা। এবার মনে হচ্ছে বিয়ে করিয়েই ছাড়বে। বাবাকে দিয়েও তেমনই আয়োজন করাচ্ছেন। বৃষ্টি সবই দেখছে। কিন্তু তুষারের ব্যাপারে কিছুই জানাতে পারছে না৷ কারণ বৃষ্টি জানে তুষার এখনই বিয়ে করতে পারবে না। সময় লাগবে। এখনই কীভাবেই বা বিয়ে করতে পারবে? সব জেনে-বুঝেই তুষারকে বলতে পারল না বিয়ের কথা৷ সে সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করবে, এরপর না হলে মেনে নেবে নিজের নিয়তি। ভেবে নেবে, ছিল না তার অদৃষ্টে তুষার!
বৃষ্টির এসব ভেবে ভীষণ কষ্ট হতে লাগল। হাত-পা কেমন অসাড় হয়ে আসে। ভয়, আতঙ্ক ওকে গ্রাস করে। ওই পুরুষকে সে ভীষণ ভালোবাসে। জীবনে তার বড় একটা আফসোস হলো মা না থাকা। সেই আফসোসে তার শৈশব, কৈশোরে ভালো কাটেনি। সৎমায়ের অত্যাচার সে কম সহ্য করেনি। তাকে কখনও ভালোবাসা দেয়া হয়নি৷ বাবাটাও কেমন পর পর তার৷ এমনই একটা জীবন নিয়ে বড় হচ্ছিল বৃষ্টি। এরপর একটা সময় পর হঠাৎ করেই তার জীবনে আবির্ভাব ঘটল তুষারের। সে বৃষ্টির জীবনে তুষারবৃষ্টি হয়েই এলো। কিশোরী সে প্রেম-ভালোবাসার ব্যাপারে তখনও আনাড়ি। কেবল বুঝতে শিখেছে৷ সেই প্রেম-ভালোবাসা বুঝতে শেখা বয়সেই যদি একটি যুবক প্রবেশ করতে চায়, কেমন লাগে? উত্তেজনা, ধক্ ধক্ আর রাতের ঘুম হারাম?
ঠিক তেমনই অবস্থা বৃষ্টির হয়েছিল৷ সবে নবম শ্রেণির পরীক্ষা দিয়ে দশম শ্রেণিতে পদার্পণ করেছে তখন। সব দুঃখ-কষ্টকে ছাপিয়ে বৃষ্টি নিজেকে ভালো রাখার জন্য চঞ্চলতাকে আঁকড়ে ধরেছিল। তাকে কেউ বুঝতে পারুক এটা বৃষ্টি চাইতো না। বৃষ্টি একা চলতে চলতে যেন কৈশোরেই অতি বুদ্ধিমতি হয়ে গিয়েছিল। আর সেই বুদ্ধিমত্তা থেকেই সে নিজেকে প্রকাশ করত অসামান্য রূপে। যা সহজেই তার ওপর অন্যদের দৃষ্টি পড়তে বাধ্য করত৷
তেমনই বৃষ্টি ফুপাতো বোনের বিয়েতে গিয়ে আগত বরযাত্রির গাদাখানি যুবকের মাঝে একটি সুদর্শন যুবকের নজরে বাজেভাবে পড়ে গেল৷ গেইট ধরে তারা কাজিনরা তর্কাতর্কি করছিল, তখনই তুষারের দৃষ্টিতে এসেছিল ষোড়শী বৃষ্টি রহমান। কেননা বৃষ্টি দশম শ্রেণির ছাত্রী হিসেবে ওর কথাবলার ভঙ্গিমায় একপ্রকার বিশেষত ভঙ্গি ছিল। বুদ্ধিমতী ও ভেবেচিন্তে কথা বলার অসামান্য ক্ষমতা সে ওই বয়সেই রপ্ত করেছিল। আর ভবিষ্যত পুলিশ অফিসার তুষার সেটা সেদিন লক্ষ্য করে। সেদিন দুয়েকটা কথা গেইট ধরার সময় হয় তাদের। এরপর থেকেই বৃষ্টির চঞ্চলতা ও সুন্দর ভঙ্গিমা তুষার পর্যবেক্ষণ করে চলে৷
বিয়ে সম্পন্ন হলেও তুষার তার পিছু ছাড়ল না। তাকে নিয়ে গেল কুষ্টিয়াতে। এসব বৃষ্টি অবশ্য পরে জেনেছিল। ফুপাতো বোন তাকে নিয়ে গিয়েছিল তার শশুরবাড়ি। কিছুদিন থাকতে হয়েছিল তাকে৷ সেখানে প্রায় রোজ তুষারের যাওয়া আসা হয়েছিল৷ তুষার তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে অনার্স তৃতীয় বর্ষে ছিল। সবেই দ্বিতীয় বর্ষের সেমিস্টারে শেষ হয়ে তৃতীয় বর্ষ শুরু হয়েছিল। একুশ বছরের যুবক একটি ষোল বছরের মেয়েতে বাজেভাবে ডুবে পড়াশোনা চাঙ্গে তুলে প্রেমের গাঙ্গে ভাসছিল৷ ব্যাপারটা হাস্যকর হলেও, তুষারের জন্য মোটেও হাস্যকর ছিল না।
তুষার বৃষ্টিকে ওই কদিনে নিজেকে চেনালো, কিছুটা বোঝালো। এরপর ফোন নাম্বার দিল যেন চলে গেলেও যোগাযোগ হয়। বৃষ্টিও তখন কিশোরী বয়সের সাত রঙ নিয়ে চলা মেয়ে। সে-সব টানেই তুষারের ফোন নাম্বার দেওয়া প্রত্যাখ্যান করতে পারেনি। এরপর চলত রোজই মেসেজে কথা বলা। আনলিমিট মেসেজ কিনতে হতো বাটন ফোনে। তুষারই কিনে দিতো৷ ফোন কলে খুব কম কথা বলতে পারতো বৃষ্টি।
এরপর সময় পেরিয়ে বৃষ্টি এসএসসি পরীক্ষা দিল৷ এসএসসি পরীক্ষা পর প্ল্যান করে বৃষ্টি আবার গেল কুষ্টিয়াতে। তুষারই অবশ্য নিয়ে গিয়েছিল। মেহেরপুর বাসস্ট্যান্ডে সে বাইক নিয়ে বসেছিল ওইদিন৷ বৃষ্টির বাবা বাসে তুলে দিয়েছিলেন৷ কুষ্টিয়ায় গিয়ে নামাতো বাস। তাই কারো সঙ্গে যাবার প্রয়োজন পড়ত না৷ কিন্তু বাস কিছুটা চলতে শুরু করলে তুষার বাস থামিয়ে বৃষ্টিকে নামিয়ে নিয়েছিল। ব্যাপারটা বৃষ্টির জানা ছিল না৷ সেদিন প্রচুর হেসেছিল বৃষ্টি। তুষারের বন্ধু মহলও হেসে গড়াগড়ি খেয়েছিল। তুষার সে-সবে পরোয়া করেনি। যেদিন কুষ্টিয়াতে বৃষ্টিকে নেওয়া হলো, সেদিনই তুষার বৃষ্টিকে প্রেম নিবেদন করল৷ একদম সবটা প্ল্যান প্রোগ্রাম করাই ছিল যেন৷ সঙ্গ দিয়েছিল বন্ধুরাও।
বৃষ্টির ফুপাতো বোন নয়ন তুষারকে ভালোভাবেই চিনত তখন৷ তুষার কেমন পরিবারের ছেলে সবই জানা হয়েছিল। আর জেনেই ভরসা নিয়ে তুষারকে সাহায্যও করেছিল। ওমন একটি ছেলে বৃষ্টির জন্য হলে মন্দ হয় নাকি? ভাগ্য খুলে যাবে বৃষ্টির। দেখতে শুনতেও কী সুদর্শন! তুষার ১৯৮৮ সালে জন্ম নেয়া আশির দশকের পুরুষ। বড় হওয়া তার নব্বই দশক ও একবিংশের প্রথম দশক মিলে। সে অনুযায়ী তুষার আইকনিক নব্বই-দশককে নিজের মাঝে লালন করত৷ তুষারের চারপাশে নব্বই দশকের আভিজাত্য যেন ঠিকরে ঠিকরে পড়ত৷ চুলের স্টাইল থেকে শুরু করে পোশাক-পরিচ্ছদের রুচি সবটাতেই জানান দিত ঠিক কেমন রুচিসম্মত ও অভিজাত পরিবারের ছেলে তুষার।
সেদিনই বিকেলে সবাই মিলে শহরের পার্ক ও সিনেমা হলে সিনেমা দেখার জন্য ঘুরতে বের হলো। নয়নও সঙ্গে ছিল৷ তুষার হঠাৎ করেই সেদিন একটু নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল কেন যেন। কোনো এক পুচকে মেয়েকে প্রেম নিবেদন করতে গিয়ে ওই যুবক নার্ভাস, ব্যাপারটা নিয়ে বন্ধুরা মজা বেশ লুটে। বন্ধুরা তখন প্রেম নিবেদনের একের পর এক ভঙ্গিমা, প্রেমবাণী তুষারকে শেখাতে লাগে। কীভাবে বলবে, কী বলবে এসব শেখায়৷ তুষার সেসব সবটাই শোনে৷ বন্ধুদের বলে দেয়া একেকটি বাক্য তাকে মুখস্থ করানো হয়।
যখন তুষার ও বৃষ্টিকে একা রেখে সকলে অন্যদিকে চলে যায়, তুষার তখন সব ভুলে যায়। ওই কিশোরী মেয়েটা তাকে সব ভুলিয়ে দেয় সেদিন। বড়ই জটিল ছিল বিষয়টা। সেদিন কী সুন্দর করে তাকিয়ে ছিল বৃষ্টি! দুধ-বরণ ফর্সা মুখটা তার দিকেই অপলক চেয়ে ছিল। বৃষ্টিকে ওভাবে চেয়ে থাকতে দেখে তুষার ঠোঁট ভেজায়৷ একটু হা করে ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়ে। বন্ধুরা যা শিখিয়েছিল সব ভুলে গেছে ও। ওসব প্রেম নিবেদনের কোনো বার্তাও নয় তুষারের মতে। ওসব দিয়ে প্রেম নিবেদন হয় না। আমি তোমাকে ভালোবাসি, আই লাভ ইউ— এসব দিয়ে আবার প্রেম নিবেদন হয় নাকি? তুষারের কাছে সেদিন এমনই মনে হয়েছিল।
সে বন্ধুদের শিখিয়ে দেয়া বাণীকে কুমন্ত্রণা মনে করে ভুলে গিয়ে বৃষ্টিকে বলে,
“তুমি যদি তুষার-বৃষ্টি হও, খুব বেশি ক্ষতি হবে?”
.
তুষার বৃষ্টির কল কেটে সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কাছে কল দেয়। জাকিয়া পুনরায় ছেলের কল পেয়ে সেদিন একটু আশ্চর্যই হন বটে। আশ্চর্যান্বিতে কল ধরে জিজ্ঞেস করেন,
“ কী হলো, বড় মানিক? আবার কল দিলি যে?”
“ আম্মু, একটা জিনিস চাইব, দেবে?”
জাকিয়া বুঝতে পারেন না কথাটা৷ এভাবে তার বড় মানিক কখনো কোনোদিন কিছু চেয়েছে বলে মনে করতে পারেন না৷ তার বড় ছেলেটা একদমই ভিন্ন ব্যক্তিত্বের। বাড়ির বড় ছেলের ঠিক যতটা দায়িত্ববান, স্বার্থত্যাগী হতে হয়, তুষার ঠিক ততটাই দায়িত্ববান ও স্বার্থত্যাগী ছেলে। জাকিয়ার যত্নে গড়া বড়মানিক। সেই মানিকের কণ্ঠে অস্থিরতা টের পান তিনি। মায়ের মনটা তখন আঁতকে ওঠে। তিনি আতঙ্ক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন,
“ কী হয়েছে, আব্বু? এভাবে কেন বলছিস? এমন কি কিছু আছে যা আমরা তোকে দিই না?”
“ না, আম্মু। এমন কিছুই নেই৷ তোমরা আমার চাহিদা কখনো অপূর্ণ রাখোনি। তবে এই জিনিসটা আলাদা কিছু।”
জাকিয়া ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফেলেন তখন৷ তুষারের কথা না বুঝতে পেরে বলেন,
“ বিষয়টা কী, আব্বু?”
“ কোনো মেয়ে সংক্রান্ত।”
জাকিয়া এবার কিছুটা বুঝতে পারেন৷ হেসে ফেলে বলেন,
“ কে সে? যে আমার আব্বুকে অস্থির করে তুলেছে?”
“ বৃষ্টি, বৃষ্টি রহমান৷”
“ এরপর?”
“ আমারা রিলেশনে আছি, আম্মু৷ ইট'স বিন গোয়িং অন ফর টু ইয়ারস।”
একটু থামে তুষার। অস্থিরতার নিঃশ্বাস ছাড়ে। এরপর বলে,
“ তবে পরিচয় তিন বছর আগে হয়েছিল। সিপনকে তো চিনো? ওর বড় ভাইয়ের শশুরবাড়ির আত্মীয়। ভাবির ফুপাতো বোন। ওদের বিয়েতেই পরিচয় হয়৷”
“সামথিং স্পেশাল?”
“ ভেরি স্পেশাল, আম্মু৷”
“ এরপর?”
“ আম্মু, ওকে এনে দাও।”
“ এভাবে কীভাবে? তুই এখনও ট্রেনিংয়ে!”
“ আমি বলছি, তুমি শোনো সবটা।”
তুষারা মাকে সবটা ভেঙে বলে। বৃষ্টির মা নেই, সৎমা, পরিবার কেমন, বৃষ্টিকে অত্যাচার করে, বৃষ্টির পড়াশোনা, ওকে বিয়ে দেয়া সবকিছুই বলে। এরপর অস্থির হয়ে যায় আবার। জাকিয়া ছেলের অবস্থা অনুমান করতে পারেন। তিনি কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকেন৷ সৎমায়ের কথা শুনে জাকিয়া ভীষণ চিন্তায় পড়েন৷ তবে বৃষ্টির ওপর অত্যাচার করে শুনে বিষয়টাতে মাতৃসত্ত্বা প্রশ্ন তোলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলেন,
“ আমার ছেলের অস্থিরতার কারণ হয়েছে যে মেয়ে, তাকে শাস্তি না দিয়ে থাকি কী করে? এনেই শাস্তি দিই বরং? চলবে?”
“ দৌড়োবে!”
তুষার খুশিতে উত্তেজিত হয়ে যায়। এরপর মা-ছেলে কিছুক্ষণ পরিকল্পনা আঁটে। খুব একটা তুষারের হাতে সময় না থাকায়, জানায় রাতে কল দেবে। এরপর বুঝিয়ে দেবে ব্যাপারটা। তুষার পুনরায় সুযোগ পেলে জাকিয়ার সাথে কথা বলে এরপর তুহিনের সাথে৷ তুহিনই একমাত্র যে বৃষ্টির কথা জানতো শুধু। দুইভাইয়ের মাঝে বয়সের তারতম্য খুব একটা বেশি নয়। দুই বছরের মতো তুহিন ছোট। তাই তুষারের সাথে প্রায় সবরকম কথাবার্তাই লেনদেন হয়।
জাকিয়া বাড়ির সদস্যদের সামলেছেন আর তুহিন সামলেছে বৃষ্টির পরিবার অবধি যাবার ব্যাপারটায়৷ তুহিন তুষারের বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করে ওর ভাবির সাথে কথা বলে৷ এরপর নয়নের মাধ্যমে তার পরেরদিনই বৃষ্টির বাবার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়। যেন এখানে প্রেম নয় পারিবারিক বিষয়টাই আগে স্থান পায়। সেটাকেই মূল্যায়ন করতে ঘটক হয় নয়ন। নয়ন ওর মাকে দিয়ে মামুর সাথে কথা বলায়৷ বৃষ্টির বাবা হঠাৎ এত বড়ঘরের সম্বন্ধ পেয়ে হতবাক হয়ে যান। ব্যাপারটা এখনও অজানাই আছে৷ সবটা রহস্য করেই ঘটানো হচ্ছে। ঘটাচ্ছে তুষারই।
.
বিষয়টা বাড়ির ছোট সদস্যদের মাঝে কুয়াশার ওপর বেশি প্রভাব ফেলেছে। কেননা সে ভীষণ খুশি হয়েছে। তার বড় ভাইয়ার বিয়ে হবে এবং একটি বউ আসবে বাড়িতে। সেটাও আবার একটি অল্প বয়সের মেয়ে। যাকে সে সবসময় বাড়িতে পাবে। এ বাড়িতে তো এমন কেউ নেই যে তার দিন থেকে রাত অবধি সঙ্গী হতে পারে। আর সেই সঙ্গী এখন এনে দিতে চলেছে বড় ভাইয়া! সে প্রচণ্ড খুশিতে এক প্রকার নেচে নেচে বেড়াচ্ছে।
ওর নেচে নেচে বেড়ানোটা আবার একজনের বিরক্তির কারণ হয়েছে। সকালের ঘুম ভেঙে ইস্তক দেখছে কুয়াশা আনন্দে আহ্লাদে গলে গলে পড়ছে। তার আম্মুকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করে জ্বালিয়ে খাচ্ছে। আশ্চর্য! তার বড় ভাই বিয়ে করবে তো ওর এত ফুর্তি করার কী আছে? আর বিয়েও তো না! মেয়ে দেখতে যাওয়া হবে শুধু। লিভিংয়ের সোফায় চিতপাট হয়ে শুয়ে টিভি দেখছে আর কুয়শার কির্তীকলাপই পর্যবেক্ষণ করছে শিশির৷
কুয়াশা আগামীকালের জন্য আজই প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ আগামীকাল সেও যাচ্ছে মেহেরপুরে। প্রস্ততি নিতে গিয়ে সে কাল কেমন পোশাক পরে যাবে সেটাই ঠিক করতে পারছে না। বাড়িতে তার পোশাক-আশাক দেখে দেয় আম্মু নতুবা বড়আম্মু। সে অনুযায়ী ছুটল সে বড় আম্মুর কাছে। নিচে নেমে দেখল জাকিয়া লিভিং ছেড়ে রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছে। জাকিয়ার পেছন পেছন চলতে চলতে জিজ্ঞেস করল,
“বড় আম্মু, আগামীকালের জন্য কী পরা যায় বলো তো?”
“তোমার যেটা পছন্দ সেটা পরে যেও, মা।”
“ না, তুমি বলো। আমি সিলেক্ট করতে পারছি না। সামথিং স্পেশাল হতে হবে কিছু।”
জাকিয়া পেছন ফিরে বললেন,
“ আমার মেয়েটা এমনিতেই সুন্দরী, স্পেশাল দেখানোর প্রয়োজন পড়বে না। তাকে তো প্রতিদিনই স্পেশাল দেখায়৷”
“উঁম, না বড়আম্মু। ব্যাপারটা তুমি বুঝছ না। এটা আসলেই ভিন্ন কিছু। আমাদের বাড়িতে নতুন বউ আসবে। একটা মেম্বার হবে। আমি তার সাথে সময় কাটাব৷ ভীষণ আলাদা ব্যাপার! বলো বলো, বড়আম্মু, আমি ভীষণ এক্সাইটেড।”
“ বউ তো এখনই হয়ে আসছে না, মা৷ এখনও দুয়েক বছর পর।”
“ সে, হোক। তবুও আসবে তো?”
“ আসবে।”
“ আচ্ছা এখন বলো, কী পরা যায়।”
“ গাউনই পোরো। সুন্দর দেখাবে।”
“ ঠিক আছে। তবে তুমি কাজ শেষে চয়েজ করে দেবে কোনটা পরব।”
“ আচ্ছা, দেখা যাবে।”
জাকিয়া কাজে ব্যস্ত। কুয়াশা যে ওভাবে পেছন পেছন ঘুরে জ্বালাচ্ছে, তবুও ওঁনার মাঝে একচুল পরিমাণ বিরক্তির আভাস পাওয়া গেল না৷ বরং চরম ধৈর্য্যের সাথে কুয়াশার একেকটা কথার উত্তর করছেন৷ জাকিয়া এমনই৷ সন্তানগুলোকে ভীষণ যত্ন করেন। যে-কোনো তুচ্ছ বিষয়ে তিনি বিরক্তবোধ হন না৷ তিনি জানেন যে কুয়াশার এসব প্রয়োজনের জন্য মা এবং তিনি ছাড়া এ বাড়িতে আর কোনো সদস্য মজুদ নেই। সেহেতু তাঁকেই করতে হবে৷ আজমীরাকে কুয়াশা কমই জ্বালায়৷ কারণ মা বাবার মৃত্যুর পর একটু বেশিই গুটিয়ে থাকেন৷ সব বিষয়ে কথাবার্তায় মনোযোগ দেখাতে পারেন না৷
কুয়াশা রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে সোফায় গিয়ে বসল। সে-সময় নীহার ফিরল জিম থেকে। কঠোর নিয়মনীতির মধ্যে দিয়ে চলছে এখন সে। নৌবাহিনীর বি-ব্যাচের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল নভেম্বরের শুরুতে। বিজ্ঞপ্তি দেখেই আবেদন করেছিল সে। এরপর ডিসেম্বর থেকে শুরু করে জানুয়ারি পর্যন্ত একে একে প্রাথমিক মেডিকেল, ভাইভা, লিখিত পরীক্ষা এবং ফলাফল— প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করেছে সফলভাবে। এখন সামনে অপেক্ষা করছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়— আইএসএসবি (ISSB)। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে আইএসএসবির জন্য ডাকা হতে পারে। সেই প্রস্তুতিতেই ব্যস্ত সময় কাটছে তার। দীর্ঘদিন ধরে যে স্বপ্নটাকে বুকে ধারণ করে এসেছে, তার শিখরে পৌঁছানোর পথে সবচেয়ে বড় মোড়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
এতদিন পর্যন্ত তাকে খুব একটা চিন্তিত হতে দেখা যায়নি। প্রতিটি ধাপ সে পার করেছে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। নিজের যোগ্যতা ও প্রস্তুতির ওপর তার বিশ্বাস ছিল দৃঢ়। আত্মবিশ্বাস এখনও আছে, তবে একটুখানি জায়গা করে নিয়েছে শঙ্কা। কারণ এখানে যাচাই হবে শুধু তার জ্ঞান নয়, তার ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্বগুণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং একজন ভবিষ্যৎ নৌ-অফিসার হওয়ার সামর্থ্যও।
নীহার এসে সোফায় ধাপ করে বসে বলল,
“ যা তো গুজেল, আমার ড্রিংকস গুলো এনে দে।”
কুয়াশা উঠে গেল সঙ্গে সঙ্গে। শিশির ত্যাড়ছা হয়ে তাকাল সে পথে। সে যদি এই হুকুমটা করত, জিন্দেগীতেও যেত না বেয়াদবটা। উল্টে আগে ঝগড়া করত মিনিট ধরে।
নীহারের শরীরে জিমে পরা এক্টিভওয়্যারের ওপরে আবার হুডি জ্যাকেট পরা ছিল। হুডি জ্যাকেটটা খুলে পাশে রেখে জিমওয়্যার পরা শরীরটা এলিয়ে দিল সোফায়৷ শিশিরের দিকে তাকিয়ে দেখল মনোযোগ দিয়ে টিভি দেখছে। যার এপ্রিলের ১তারিখ থেকেই এইচএসসি পরীক্ষা শুরু, সে কিনা সকাল সকাল উঠে টিভি নিয়ে বসেছে! সেটাও আবার প্যাকেট হয়ে। শরীরে অধিক উষ্ণতা দেয়া জ্যাকেট, ট্রাউজার, পায়ে পা-মোজা ও মাথায় জ্যাকেটের হুডি তোলা। শিশিরকে পর্যবেক্ষণ করে নীহার বলল,
“ তোর না সামনে এইচএসসি এক্সাম?”
“ তো?”
“ তো আবার কী? পড়তে-টরতে তো দেখিনা তোকে?”
“আমি এমনিতেই পাশ। পড়া লাগে না আমার।”
“ ওটা ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ভাইয়া। ওটার পড়া লাগে না।”
“ ওটা আবার কী? এই ওটা কাকে বলছিস?”
“ জ্বী, আপনাকেই বলছি সনামধন্য, গণ্যমান্য ব্যক্তি।”
কুয়াশা ওর মুখাবয়বে মেকি সম্মানের ভাব ফোটায়। কিন্তু চোখ-মুখ বিকৃত করে ফেলে। তা দেখে ও শুনে নীহার ঠোঁট চাপে। শব্দ করে আর হাসল না৷ হাসলে বিপদ বাড়বে। এখন সাংঘাতিক মুহূর্ত চলছে। দুই বাঘ ক্ষেপেছে। শিশির আঁড়চোখে নীহারকে একবার দেখে কুয়াশাকে বলল,
“ তোর মতো পড়তে পড়তে জুতোর তলা ক্ষয় করে A+ পাওয়া ছাত্র আমি? হ্যাঁ?”
“ ওই A+ টাই এনে দেখাও না!”
“ গোল্ড মেডেল জিততে চলেছি। তুই ভাবিস কী আমাকে?”
“ আহা হা গো! গোল্ড… মেডেল…! সিলভার মেডেলও জুটবে না তোমার। রাতদিন চিতপাট হয়ে পোকামাকড় খাওয়া দেখে যে আবার, সে নাকি গোল্ড মেডেল নিবে! হাহ্!”
নীহারের মনে হচ্ছে সে কোনো টক-শো দেখছে সকাল সকাল। টিভিতে যা হচ্ছে তার চেয়ে বেশি বিনোদন দিচ্ছে তার ঘরের দু'টো। হাতে প্রোটিন শেক নিয়ে খাচ্ছে আর ভাই-বোনের ঝগড়া উপভোগ করছে। ভাবে লাগছে তার কাছে ভীষণ উপভোগ্যের জিনিস শিশির-কুয়াশা। থামানোরও কোনো প্রয়োজন মনে করছে না৷ থামায়ও না। কারণ এটা হতে দেয়া হয়।
শিশির কুয়াশার বিদ্রূপ করা কথাগুলো হজম করতে পারল না৷ দাঁতে দাঁত এঁটে বলল,
“ তুলে খ্যাঁক করে একটা আছাড় মারা প্রয়োজন তোকে। এরপর টপকে যাবি। চোখের সামনে আর আসতে হবে না।”
“মেরেই দেখো না, সাহস থাকে তো।”
“ এট্টুখানি লিলিপুট, তুই আমাকে সাহস দেখাস, হ্যাঁ?”
শিশির লাফিয়ে উঠে বসে৷ মাথা থেকে জ্যাকেটের হুডিটা নামিয়ে দেয় ঝাড়া মেরে। এলোমেলো উষ্কখুষ্ক চুল, আর রাতে ঘুমানো ফোলা ফোলা চোখ-মুখ চেহারার কিউটনেস আরো দশগুণ বাড়িয়ে দিল। কুয়াশাকে লিলিপুট বলায় রেগে গেল ভীষণ। মুখ ঝাঁমটিয়ে বলল,
“ তুমি লিলিপুট! তোমার চোদ্দগোষ্ঠিতে আছে আমার মতো কেউ লম্বা, হ্যাঁ?”
“ আয়, দেখি আজ তুই কত বড় লম্বা হয়েছিস৷”
“ তোমার সামনেই তো দাঁড়িয়ে আছি৷ দেখো, নাহ্! দিনকানা একটা!”
“ তোকে তোহ্ আছাড় মারা ফরজ রে!”
কুয়াশার তর্ক করা আর যাচ্ছেতাই বলা শিশিরের পছন্দ হচ্ছে না৷ দিনকানা আবার কী? আর কুয়াশা বার বার আছাড় দেয়া কথাটা নিতে পারছে না। কত বড় সাহস তাকে আছাড় দেবে! কুয়াশা দুই পা এগিয়ে গেল জিদ নিয়ে৷ গিয়ে মাথা তুলে তাকিয়ে ক্রোধ নিয়ে শিশিরকে বলল,
“ এলাম, মার এবার আছাড়!”
আবার তুই-তুকারিও করছে! কলিজা কত বড়? মেপে দেখা উচিত। শিশিরের রাগ উঠল মাথার চাঁদিতে। এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে ওই সাথে কুয়াশাকেও ঝটকা দিয়ে ধরে পাঁজা করে তুলে প্রায় মাথার ওপর তুলে নিল। একেতো আঠারোতে পা দেয়া রক্ত টগবগ করা যুবক হচ্ছে, তার ওপর মনমানসিকতায় এখন রাগের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শরীরে জোরও যুবক হবার সাথে সাথে সমানুপাতিক হারে বাড়ছে। আর কুয়াশা তো সমানে ফু দিয়ে আগুন জ্বালিয়েছেই, সেই আগুনসম রাগ নিয়ে কুয়াশাকে মাথার ওপরেও তুলে ফেলেছে। আছাড় মারবে বলে। শিশির যে একটা তালগাছ, ওই তালগাছ থেকে যদি কুয়াশাকে আছাড় মারা হয়, কুয়াশার এক আছাড়েই টপকে যাবার সম্ভাবনা প্রবল।
নীহার এতক্ষণ চুপচাপ উপভোগ করলেও শিশিরের কাণ্ড দেখে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আঁতকে উঠেছে। হাতের প্রোটিন শেকের কাপ সেন্টার টেবিলের ওপর কোনোমতে রেখে সে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আতঙ্কে বলল,
“ এ ভাই, এই! ফেলিস না, ফেলিস না! ভেঙে যাবে যে সব।”
নীহার দ্রুত শিশিরের কাছে চলে এলো। কুয়াশা চেঁচামেচি তো দূরে থাক, রাগে আরো ফেঁটে পড়ল। নীহার এসে দুইহাত তুলে শিশিরের থেকে কুয়াশাকে নিয়ে নিল। যেন শিশির রাগে কোনো শো-পিচ আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলবে বলে তুলেছে, আর নীহার সেটাকে ভাঙতে না দিয়ে আলগোছে শিশিরের হাত থেকে নিয়ে নিল৷ ব্যাপারটা এমনই মনে হলো৷
শিশিরের থেকে কুয়াশাকে নিয়ে নীহার দূরে সরে গেল। শিশিরকে দেখছে। কী জিনিস এটা আবার? সত্যি সত্যি আছাড় দিতে তুলে ফেলল! নীহার আতঙ্কিত সেটা ভেবে। কুয়াশা এখনো নীহারের কোলে৷ আগেই কুয়াশাকে ছাড়ার মতো ভুল করল না৷ বলা যায় না, ছাড়লে বিপরীতে ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখাতে সময় লাগবে না। শিশিরকে সমানুপাতে তুলে আছাড় মারার মতো তুলতে না পারলেও, সুন্দর করে শিশিরের চুলগুলো ঠিকই তুলতে পারবে এই বাঘিনী।
নীহারের কোল থেকেই কুয়াশা কচলাতে লাগল। হিসহিসিয়ে শাণিত নজরে শিশিরকে দেখতে লাগল। শিশিরও একইভাবে তাকিয়ে থেকে নীহারকে বলল,
“ সভ্যতা শেখা এটাকে।”
বলে মুখ বিকৃত করে বলল,
“ দিন দিন অসভ্য জাতি হচ্ছে। বড়দের সম্মান করতে জানে না। সেটা ওর রক্তে নেই। ওটা এই বাড়িরই, নাকি ড্রেন থেকে তুলে-টুলে আনা হয়েছিল?”
“ তোর জন্মদিনের দিনই তো এসেছিল। ভুলে গেলি কী করে?”
নীহারের দিকে কিড়মিড় করে তাকাল শিশির। ক্রোধে বলল,
“ যাহ্, ওটাকে নিয়ে বিদায় হ।”
“ ছাড়ো, ভাইয়া৷ আজ ওর একদিন কী আমার একদিন!”
“ শালা ভারি মারতে পারে৷”
শিশিরের কথাটা কুয়াশার গায়ে কাটার মতো বিঁধল। নীহার ছাড়ল না কুয়াশাকে। সে কুয়াশাকে নিয়ে চলে গেল উপরে। শিশির সে যাবার পথে তাকিয়েও দেখল না। গা ঝাড়া দিয়ে নিজেও উঠে গেল উপরে। খেয়ে-দেয়ে কলেজে যাবে। গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস ও কাজ আছে। দুইমাস পর থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। সেটার প্রস্তুতি ঠিকই নেয়া হচ্ছে।
.
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার পর শীতটা আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরল প্রকৃতিকে। মাঘ মাসের বাঘ কাঁপা শীত। শীত সহ্য করতে না পেরে নীহার ও শিশির সরকারি কলেজের খেলার মাঠে চলে এলো বাইক নিয়ে। এখানে র্যাকেট খেলবে এখন৷ শরীর গরম করা চাই। শীত সহ্য করা অসম্ভব প্রায়। শিশির ও নীহারের বেশ কিছু বন্ধুরাও উপস্থিত আছে। যাদের বাড়ি শহরের মাঝে বা আশেপাশে।
সন্ধ্যার পর এখানে প্রায় রোজই আসা হয় তাদের। এখানে না এলেও ঈদগাহ মাঠে কিংবা অন্যান্য জায়গায় রাত আটটা-নয়টা অবধি দুই ভাই তাদের বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়। সবাই বেশি সময় মিলেমিশে থাকে৷ বয়সের ফারাক বেশি না হওয়ায় খুব সহজেই সবার মাঝে মিলটা হয়ে গেছে। শিশির নামতেই ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু, তারা একে অপরকে জানে জিগারকা দোস্ত মানে সেই বন্ধু রিজভী পাটোয়ারী এসে শিশিরকে বুকের সঙ্গে ধরে বলল,
“ বন্ধু, আয় তো, একটু বুকে আয়। শীত যে কমে না রে!”
“ তোর বিয়ে করা ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
“ যাহ্ শালা! বিয়ে করে বউ নিয়ে এখন ঘরে কোন শালায় পড়ে থাকবে? তারচেয়ে বরং শীতেই মরি৷ কবুল হে।”
শিশির হেসে ফেলল। নীহার রিজভীর পেটের ওপর ঘুষি বসিয়ে দিয়ে বলল,
“ ফাজিলের কারখানা!”
“ আরেহ্ ভাই… দেখছি যে!”
বলে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ আসো, বুকে আসো একটু৷”
“ দূরে সর! তোর স্বভাব ভালো না৷ শেষে চরিত্রে দাগ লাগবে।”
এক প্রকার অট্টহাসিতে ফেঁটে পড়ল সবাই। নীহারের বন্ধু শান্ত তখন গান গেয়ে উঠল,
“ মুন্নি বদনাম হুয়ি, ডার্লিং তেরে লিয়ে…”
নীহার শান্তর মাথায় চাটি মেরে দিয়ে বলল,
“ গাঁজাখোর, মুন্নি কারে বলছিস?”
“ তোরেই তো বলছি।”
মাথা ডলছে শান্ত।
“ কীহ্!”
নীহার শুনে চেঁচিয়ে উঠেছে। শান্ত জানে এবার ওর পিঠে গুরুম গুরুম করে কিল বসানো হবে। তাই সে আগেভাগেই কেটে পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু নীহারও ওর মনোভাব বুঝে ফেলেছে। তাই শান্ত দৌড় দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে নীহারও ওর পিছে তাড়া করেছে। কলেজের ইয়া বড় মাঠটাতে কমসেকম তিনবার শান্তকে গরুর মতো তাড়া করে ঘুরিয়ে তবেই নীহার থামল। শান্তর হাঁপ ধরে ওভাবেই শিশির জমা ঘাসের ওপর চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়ল। নীহার সেই সুযোগে ওর পাছার ওর একটা লাথি বসাল৷ শান্ত মুখে উচ্চারণ করল,
“উঁহ্, শালা আমার পাছাটা ফাটায়ে দিল রে!”
ওদের কাণ্ড দেখে বাকিরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। চায়ের অর্ডার করে এসেছিল আগেই। তখন একটা ছোট ছেলে চা দিতে এসে শান্তর কথাটা শুনে নিয়েছে। শুনে সে বলল,
“ ভাইজান, গরম চা’র ছ্যাঁকা নেন। আরাম পাবেন৷”
ছেলেটার ওই কথা শুনে কেউ আর থেমে থাকতে পারল না। হা হা করে সেইরকম শব্দ করে হাসতে লাগল। রাতের শহর, আশেপাশে বিল্ডিং, দোকানপাট ও কলেজের হোস্টেল গুলোতে আলো জ্বলছে। মাঠের মাঝে আলো জ্বলছে৷ সেসব আলোয় একে অপরের মুখ দেখাদেখি করে কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যারাতে বেশ কিছুক্ষন ওরা চা খেতে খেতে ইয়ারকি আড্ডা দিল। এরপর প্রত্যেকে শরীর গরম করার জন্য র্যাকেট খেলতে শুরু করল। যার যখন হাঁপ লেগে গরম ধরে যাচ্ছে সে-ই তখন থেমে যাচ্ছে। দু'জন দু'জন করে চারজন এক কোটে খেলছে।
শিশিরের অপরদিকে আছে নীহার আর নীহারের পাশে আছে রিজভী৷ রিজভীর অপরদিকে শান্ত৷ শান্ত আর শিশির পাশাপাশি খেলছে। ওরা চারজন অনেকক্ষণ ধরেই খেলছে। ভাবে বোঝা গেল অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলছে। কেউ ফেদার ফেলতে রাজি না৷
শিশির আর নীহার সমানে চপাট চপাট করে র্যাকেট পেটাচ্ছে। কখনো হাই জাম্প দিচ্ছে, কখনো পেছনে, কখনো সামনে আবার কখনো দুই পায়ের ফাঁকে র্যাকেট নিয়ে ফেদার পেটাচ্ছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে চরম দক্ষ দু'জনই। দু'জনের শরীরেই কালো জ্যাকেট। জ্যাকেটের ভেতর শরীর ঘেমে ঘাম গলে গলে পড়ছে। স্বেদবারিতে মনোযোগ না দিয়ে দুইভাই মনের মতো র্যাকেট পেটাল। এরপরেই দুইজন থামল।
শিশির হাতের মাঝে র্যাকেট নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে একটি আবছায়া আলো ছড়ানো স্থানে গিয়ে বসল। ওকে বসতে দেখে নীহারও ওর পাশে গিয়ে বসল। জানে শিশির কেন এভাবে এখন বসল। নীহার আছেই আর কয়েক মাস। ধরা যায় দুই-তিন মাস। আইএসএসবি-তে ফলাফল রিকম্বিনেন্ড হলেই আর দুইটা ধাপ অতিক্রম করতে হবে এরপরই নেভাল একাডেমিতে যোগদান৷ সেখানে তার দীর্ঘ যাত্রা শুরু হবে। এভাবে আর তাদের মেশা হবে না। ইয়ারকি-আড্ডাও দেয়া হবে না। ভীষণ কষ্ট হয়। তবুও জীবনে যে কিছু পেতে গেলে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে, এটা নীহার মানে। তার স্বপ্ন পূরণ করতে তাকে পরিবারের সঙ্গ ছাড়তেই হবে৷
নীহার শিশিরের পাশে বসতেই শিশির আপনেই নীহারের কাঁধের ওপর মাথাটা ফেলে দিল। ওকে ওভাবে মন খারাপ করতে দেখে নীহারের ভালো লাগল না৷ নীরবতা চলছে দু'জনের মাঝে। নীহার শুধু শিশিরের কাঁধে হাত রেখে জড়িয়ে রাখল৷ তখন নীহারের ফোনে টুং করে মেসেজ আসার শব্দ হলো। নীহার হালকা কাত হয়ে ফোনটা প্যান্টের পকেট থেকে বের করে একটা মেসেজ দেখল। বাংলিশে বার্তা লেখা,
“ কী করছেন?”
নীহার সেকেন্ডের মাঝে রিপ্লাই দিল,
“ব্যস্ত আছি৷”
এরপর আবার ফোনটা পকেটে পুরে রাখল। শিশির সবটাই দেখল। মেসেজটাও দেখেছে নীহারের কাঁধে মাথা রেখে। এবং নামটাও। শিশির স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“মেয়েটা কে?”
“মেধা প্রধান। পৌরসভার চেয়ারম্যান মাহিন প্রধানের মেয়ে।”
“ আমি নামটা দেখেছি ভাই। সম্পর্ক?”
“ একমাস মতো হচ্ছে কথা হয়। তেমন কোনো সম্পর্ক নয়।”
“ পছন্দ করিস?”
“ ভালোই। সুন্দর কথা বলে।”
“ শুধু এই অবধিই?”
“ আপাতত এই অবধিই।”
“ আমি চিনি মেয়েটাকে। দেখতে সুন্দরীই। এগোতে পারিস৷”
“দেখা যাবে। তোরও একটা হিল্লে করা উচিত। যাবার আগে বড় ভাই হিসেবে একটা দায়িত্ব পালন করা উচিত।”
শিশির তা শুনে নীহারের কাঁধ থেকে মাথা তোলে। ভ্রুজোড়া সংকুচিত করে নীহারের দিকে তাকায়। নীহার ঠোঁট কামড়ে হেসে নিয়ে বলল,
“ না, যে হারে মারামারি চুলোচুলি করিস। বোনটাকেই না হয় তোকে দিয়ে যাব। সময় কাটবে ভালো৷”
তখনই শিশির চ্যাঁতে উঠল৷ এই ধরনের কথা নীহার আগেও বলেছে। আর প্রতিবারই যা করেছে এবারও তাই করল। নীহারও বুঝে সরে গিয়ে উঠে দিল দৌড়। শিশিরও ওকে তাড়া করল। তাড়তে তাড়তে বলল,
“ একবার ফাঁসিয়ে দিয়ে শান্তি পাসনি? আবার কুবুদ্ধি আঁটছিস? তোদের দু'টোকেই পৃথিবীর বাইরে পাঠিয়ে, আমি শান্তিতে বসবাস করব৷”
“ তোর শান্তি নাই রে। ওটা ওই বাড়িতে যতদিন আছে ততদিন তো না-ই।”
নীহারও দৌড়াতে দৌড়াতে উত্তর করল। শিশির আরো জোরে তাড়া করল৷ বেশ দৌড়ানো হলো। হাঁপিয়ে গেছে৷ নীহারের আজ অনেক বেশি দৌড়ানো হলো। একবার শান্তকে তাড়া করে, আর এখন তাড়া খেয়ে। হাঁপিয়ে উঠে নীহার মাঠের মাঝে বসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে চিৎপটাং হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়েও পড়ল। শিশিরও হাঁপিয়ে উঠে নীহারের পাশে শুয়ে পড়ল৷ মুখে হাঁপানোর শব্দ করছে দু’জনই। কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশে তারা দেখা যাচ্ছে। সেদিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে দেখে, এরপরএকে অপরের দিকে তাকিয়ে দু'জনেই হেসে দিল। হাসতে হাসতে পেট ব্যথা বানিয়ে ফেলল৷ শিশির নীহারের হাতের পেশিতে মাথা রেখে শুয়েছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ ন্যারা বেল তলায় একবারই যায়।”
“ কিন্তু তোকে বারবার বেল তলায় যেতে হবে৷”
| চলবে |