#এক_বনে_দুই_বাঘ
‘নক্ষত্রদের মৃত্যু নেই’
১৪.
®রোজা রহমান নাঈমা
‘
আজ স্কুল থেকে ফেরার সময় কুয়াশা খুবই বাজে পরিস্থিতির শিকার হলো। বাড়িতে এসে কুয়াশা বড় আম্মুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছে৷ তাকে যেভাবে ননির পুতুল করে রাখা হয় মালিথা ভিলায়, সেই কঠিন দেয়াল ভেঙে সে বড় হচ্ছে বিভিন্ন নোংরা পরিস্থিতির শিকার হয়ে। এমন নিত্য-নতুন ঘটনাগুলো কুয়াশার জন্য বড়ই অপরিচিত। কিশোরী কুয়াশা সবেই বাইরের জগতটা চিনতে শুরু করেছে, সবেই দুনিয়া ও দুনিয়ার নিয়মকানুন বুঝতে শুরু করেছে— আর ঠিক এমন সময়ের কদর্যপূর্ণ পরিস্থিতিগুলো কুয়াশার ওপর প্রবলভাবে প্রভাব ফেলছে৷
কুয়াশা এমন সকল পরিস্থিতি সামলাতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। এগুলো বুঝে উঠতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। সমাজের মানুষ, সমাজের চোখ ও সমাজের নোংরামিগুলো সে মালিথা ভিলার চার দেয়াল ছেড়ে যখনই বের হয়, তখনই দেখতে শুরু করে। অর্থাৎ মালিথা ভিলা তার জন্য একটি রক্ষাকবচ৷ এখানে তাকে অদৃশ্য দেয়ালে রক্ষা করে রাখা হয়। তাকে রক্ষা করার মানুষেরও অভাব নেই। বাইরের জগতে এমন কে আছে?
বাইরের জগতটা সে যখনই উড়ে-ঘুরে দেখতে যাই, তখনই তার ডানা জোড়া কোনো না কোনোভাবে আটকে যায়৷ আর কুয়াশা তখন ছিটকে পড়ে বাজেভাবে ব্যথা পেয়ে যায়। তাকে আবার নতুন করে উড়তে শেখানো হয়। শেখায় মালিথা পরিবার। অর্থাৎ তাকে এমন ভাবে তৈরি করা হচ্ছে যেন, চলার পথে হাজারও বাঁধা বিঘ্নতা সে নিজে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। সমাজ তাকে ভেঙে দিলে, সে ওই সমাজকে পায়ে মাড়িয়ে সামনে এগোয়। তাকে দুঃসাহসী হয়ে উঠতে শেখানো হয়৷ তীব্র, তীক্ষ্ণ ও নির্ভিক হয়ে উঠতে শেখানো হয়। তাকে বুঝতে শেখানো হয়, এ সমাজ সবচেয়ে বেশি নাড়ে— নারীকে।
আজমীরা শুধু স্তব্ধ হয়ে যান৷ মেয়েকে বুঝানো বা শেখানোর মতো ভাষা তিনি হারিয়ে ফেলেন৷ তিনি এখন অবধিও তার খোলস থেকে বেরিয়ে সন্তানদের দুঃসাহসী, নির্ভিক করে গড়ে তোলার মতো পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে পারেননি৷ সেই দায়িত্বটা না চাইতেও জাকিয়া জামান নিজ কাঁধে করে বয়ে দিয়েছেন। কুয়াশার সাহস হয়ে তিনিই কুয়াশাকে সামলেছেন৷
জাকিয়া তখন কুয়াশাকে মমতার পরিচ্ছদ মেলে দিয়ে বুকে টেনে নিজ আদর্শ থেকে বলেন,
“ এই সবিস্তর পৃথিবীটা কখনোই শুধু ফুলের বাগান ছিল না রে, মা। এখানে ফুল আছে, আবার কাঁটাও আছে। অতএব কাঁটা কখনো ফুলের সৌন্দর্য কেড়ে নিতে পারে না, যদি ফুল নিজের সুবাস ভুলে না যায়।”
কুয়াশা তো শোনে। কিন্তু জাকিয়ার দৃঢ় কথাগুলো কতটুকু বুঝতে পারে তা অজানা রয়ে যায়৷ চৌদ্দ বছরের কুয়াশাকে পুরো দুনিয়াটা এক নিমেষে তো চেনানো সম্ভব নয়! তবে তাকে নির্ভিক সাহসী করতে যতটুকু প্রয়োজন তার ব্যবহার জাকিয়া করেন,
“ তোকে আমরা চার দেয়ালের ভেতর লুকিয়ে তো রাখিনি রে, মা। কেবল আগলে রেখেছি। ডানা গজানোর আগে ঝড়ের মধ্যে পাখি ছেড়ে দেওয়া একপ্রকার নিষ্ঠুরতা। আজ তুমি বাইরে গিয়ে প্রথম ঝাপটা খেয়েছ। ব্যথা পেয়েছ। এ ব্যথা তোমাকে ভাঙার জন্য আসেনি, এসেছিল চিনিয়ে দিতে। কারণ এ সমাজে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা দিতে হয় মেয়েদের। তোমার আচার-আচরণ, তোমার পোশাক-আশাক, তোমার কথা-বার্তা, তোমার চলা-ফেরা, এমনকি সম্পূর্ণ তুমিটাকেই— কেউ না কেউ বিচার করবে। কিন্তু তাদের বিচারই তোমার পরিচয় নয়। তোমার পরিচয় হবে, একমাত্র তুমি নিজেই।”
রোদনরত কুয়াশা নিশ্চুপ হয়ে যায় তখন। সে মস্তিষ্ক নাড়িয়ে বড় আম্মুর কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করে৷ ছোট মস্তিষ্ক এত গভীর কথাগুলো বিভিন্ন ভাবে ভেঙে বোঝার চেষ্টা করছে৷
“ জীবনের একেকটি ধাপ বারবার তোমার ডানায় আঘাত করবে। কখনো ঈর্ষা, কখনো লোভ-লালসা, কখনো নোংরা দৃষ্টি, কখনো বা বিশ্বাসঘাতকতা। ডানা ছিঁড়ে গেলে কেঁদে নিও, কিন্তু কখনো উড়তে ভুলে যেও না, মা। কেননা ওড়ার পথ কখনো তোমার জন্য বন্ধ হবে না, যদি না তুমি বারবার পড়ে গিয়েও আবার উড়তে শিখে নাও।”
কুয়াশার ভেতর কী যেন হয় তখন। সে জাকিয়ার বুক থেকে মুখ তোলে। ভাসমান মোটা মোটা চোখজোড়া কান্না করলে অল্পতেই ফুলে ওঠে। উঁচু ব্রিজের ঢালুর মতো নাকটা লাল হয়ে যায়। সুন্দর ঠোঁটজোড়া বারবার ভেঙে যায়। যা থেকে কুয়াশাকে চরম আহ্লাদী ঠেকে। কিন্তু সেই আহ্লাদীর খোলস তাকে পরিবারের বাইরে ছাড়তে হবে। এই একটা ব্যাপারই তার অভ্যন্তরে সঞ্চার হলো। রক্তে অবধি মিশে গেল।
জাকিয়া কুয়াশার দু'চোখ ও গালজোড়া মুছে দিয়ে শেষ বললেন,
“এই পৃথিবী নারীর পথ সহজ করে দেয় না, মা। তাই তোমাকে পথের চেয়ে শক্ত হতে হবে। এমন শক্ত, যার মর্যাদা কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে না; এমন দৃঢ়, যার আত্মসম্মান ভাঙার ক্ষমতা কারও নেই।”
বিকেল গড়িয়ে গেল কুয়াশার জাকিয়ার বুকে লেপ্টে থেকে। আম্বিয়া এদিকে সামলে আবার গেছেন তুহিনকে সামলাতে। শশী খালা আর কুয়াশার সাথেই বসে আছে৷ কুয়াশাকে বোঝানোর মতো সঠিক ভাষা না পেলেও সঙ্গ ছাড়েনি।
সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে জাকির মালিথার পৌঁছানোর আগে পৌঁছাল শিশির আর নীহার। দেখে মনে হলো দুই ভাই একসাথে কোথাও গিয়েছিল। ভেতরে প্রবেশ না করেই হিমের মুখে শুনল,
“ শিশির ভাই, নীহার ভাই, কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?”
“ কেন রে, লিলিপুট? তোকে দেখে মনে হচ্ছে জরুরি বিভাগে এলি?”
শিশিরের কথায় ছোট হিমও একই ভাবে বলার চেষ্টা করল,
“ এলাম তো। তোমরা জানো, বুবু আজ স্কুল থেকে অনেক কান্না করতে করতে বাড়িতে ফিরেছে?”
শিশির আর নীহারের ভ্রু তখন সংকুচিত হয়৷ একবার শিশিরকে দেখে নিয়ে নীহার ওভাবেই প্রশ্ন করে,
“ কেন রে, হিম? কী হয়েছে? কান্না করেছে কেন গুজেল?”
ছোট হিম অতটা জানে না৷ যা দেখেছে সেটাই সে জানিয়েছে৷ বোন কাঁদছিল সে পাশে বসে ফ্যালফ্যাল দেখেছে চুপচাপ। যা যা বলছিল শুনেছে শুধু। এদিকে শিশির হিমের বলা অবধি অপেক্ষা করল না৷ বিষয়টা খটকার মনে হচ্ছে। স্কুলে স্যার-ম্যামের বকা খেয়ে জিন্দেগিতেও ওই একগুয়ে জেদি মেয়ে বাসায় কান্না করতে করতে ফিরবে না— এটা সে জানে৷ মামলা কিছু ভিন্ন ঘটেছে৷
শিশির লিভিংয়ের উদ্দেশ্য এগিয়ে গেলে নীহার হিমের সাথে আসতে আসতে জানতে পারল, কুয়াশাকে রাস্তায় কোনো পচা ছেলেরা পচা পচা কথা বলেছে। হিম এভাবেই বলতে পারল ঘটনাটা। নীহার শুনে দ্রুত পায়ে লিভিংয়ের উদ্দেশ্যে ছুটল।
কুয়াশা তখনও জাকিয়ার বুকের সাথে লেপ্টে আছে। শিশির এসে সেই দৃশ্যই পেল৷ আপাতত নিজের মায়ের বুকের সাথে লেপ্টে থাকা নিয়ে কোনো খোঁচা-টোচা দিল না। তার এখন সত্যিটা জানা প্রয়োজন। ঘটনা না ঘটলে বাড়িতে ঢুকেই কুয়াশাকে খোঁচানো হয়ে যেত৷ শিশির এগিয়ে এসে মুখ গুঁজে থাকা কুয়াশাকে একবার দেখে নিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে দৃঢ় কিন্তু শান্ত স্বরে প্রশ্ন করল,
“ কী হয়েছে, আম্মু?”
জাকিয়া ছেলের পানে তাকান৷ শিশিরের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে কুয়াশাকে একটু চেপে ধরেন। শিশির ব্যাপারটা খেয়াল করে। এটা নতুন নয়৷ জন্ম থেকেই কুয়াশাকে লালন-পালন তার মা-ই করছে। মেয়ে নেই সেই আফসোস তাঁর বুকে৷ সেই মেয়েকে ওমন ভাবে ধরলেন অর্থাৎ কুয়াশাকে আগলে রাখতে তিনি অক্ষম? এটাই কি বোঝালেন? তাঁর যত্নের ত্রুটি হচ্ছে? নজর রাখার ত্রুটি হচ্ছে? শিশির মায়ের ওই আচরণটাকে বোঝার চেষ্টা করল। মা ঠিক কী বোঝালেন বোঝার চেষ্টা করে একই ভাবে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল উত্তরের আশায়৷
জাকিয়া জামান কণ্ঠে কাঠিন্যতা মিশিয়ে বললেন,
“বাড়ির বাইরে যে নোংরা জগতটা আছে, সেই জগতের কদর্য দৃষ্টির সামনে আমার যত্নে লালন করা জিনিসটা পড়তে শুরু করেছে। যত্নে লালন-পালন করে এতটা বড় করে তুললাম— কার জন্য? বাইরের ওই জঘন্য দৃষ্টির সামনে ছুড়ে দেওয়ার জন্য?”
নীহারও শিশিরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। জাকিয়ার বলা কথাগুলো শুনল দু'জনেই। জাকিয়া খুবই বিচক্ষণতার সাথে বুঝিয়ে দিলেন কুয়াশার সাথে ঠিক কী হয়েছে। এরবেশি খোলামেলা বললেন না। ওগুলো সন্তানদের কাছে বলা গেলেও, বোনের বিষয়ে ভাইদের কাছে বলা যায় না৷ লজ্জাজনক! জাকিয়াও বললেন না।
কুয়াশা চুপচাপ মুখ গুঁজে আছে। ওর এমন ভেঙে যাওয়া অবস্থা নীহার কিংবা শিশির কারোরই কেন যেন পছন্দ হলো না। নীহারের না পছন্দ হওয়াটা স্বাভাবিক, কিন্তু শিশিরে না হবার কারণ কী হতে পারে? সে তো কুয়াশাকে বোন বলেই মানে না!
শিশির নীহারের দিকে তাকাল। নীহারও সে-সময় তাকাল। একে অপরের চোখে চোখে কিছু কথা হলো। এরপর নীহার কুয়াশার পাশে গিয়ে বসল৷ জাকিয়ার থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কুয়াশাকে ঘোরাল নিজের দিকে। চোখমুখ ফুলে আছে মেয়েটার। কান্নাটা এখনও আটকে আছে৷ নীহার শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে ডাকল,
“ গুজেল?”
কুয়াশা নজর তুলে তাকাল না। মাথা নিচু করেই রইল। নীহার বলল,
“ কোনদিক দিয়ে ফিরেছিলি রে? ভয় নেই। বলতো আমাকে। কোনদিক দিয়ে?”
নীহারের কণ্ঠ পাল্টে যাচ্ছে। চেষ্টা করেও নরম রাখতে পারছে না। মনে হচ্ছে খুবই বাজে ধৈর্য তার। সে সেই ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে অপারগ। নীহার নিজেকে শান্ত রেখে শুধু জানার কৌশলে পুনরায় বলল,
“ বল, ময়না। কিছু হবে না। তোর ভয় নেই। আমি আছি না? কোনদিক দিয়ে ফিরেছিলি?”
“ মোড় হয়ে।”
কোন মোড় সেটা আর ভেঙে বলতে হলো না। যে মোড়ের কথা কুয়াশা ইঙ্গিত দিল ওই মোড়েই আছে লীগের ক্লাবঘর৷ নীহার শিশিরের দিকে দেখে নিয়ে বলল,
“ বড় আম্মু ওকে ঘরে নিয়ে যাও৷ ছোট আম্মু কোথায়?”
“ কোনো কোনায় বসে কাঁদছে হয়তো৷”
“ ওকে নিয়ে ঘরে যাও৷ ছোট আম্মুকেও ডাকো। বড় চাচু এলে টেনশন করতে মানা কোরো।”
নীহার আর কিছু বলল না। উঠে পড়ল। শিশির কুয়াশার বিবর্ণ মুখের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে পেছন ঘুরে হাঁটা ধরল। নীহার শিশিরের আগেই এগিয়ে যাচ্ছিল। কুয়াশা তখন নজর তুলে নীহারকে ডাকে,
“ ব্রেভ বয়?”
নীহার পেছন ফিরে তাকায়৷ কুয়াশা বলে,
“ লাল-সাদা চেইক শার্ট আর নীল রঙের জিন্স প্যান্ট পরনে ছিল। গলায় P লেটারের সিলভার রঙের চেইন ঝুলছিল। ডান-হাতে লাল রুমালও বাঁধা ছিল।”
নীহার যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল। চোখেমুখে ঠিক ততটাই ঝলমলে ভাব ফুটে উঠতে দেখা গেল। সেই সাথে কুয়াশার ওপর সে গর্বে বুকও ফুলিয়ে ফেলল। এটাই তো চাইছিল সে! এটাই তাদের বোন। চরম বিচক্ষণী! শিশিরের অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটল না। সে কুয়াশার দৃঢ়, জেদি মুখপানে তাকিয়ে ছিল। চোখেমুখে লেপ্টে আছে যেন প্রতিশোধের স্পৃহা। তা দেখে শিশির কেন যেন ঠোঁট বাঁকা করে সামান্য হাসল।
নীহার কুয়াশার দিকে ক্ষণকাল চেয়ে থেকে একটা বিশ্বজয়ের হাসি দিয়ে চোখের পলক ফেলল। কিছু বোঝাল যেন। এরপর আর দাঁড়াল না। তার বোনের সম্ভ্রমের প্রশ্ন, সেখানে সংযত আবার কী? আর আপস? প্রশ্নই তো আসে না!
‘
জাকির মালিথা জাকিয়ার কাছে সম্পূর্ণ বিষয় শুনেছেন৷ খোলামেলা না বললেও যতটুকু বলা যায় ততটুকুই জাকিয়া বলেছেন৷ জাকির মালিথা শান্তভাবে সবরকম পরিস্থিতির কথা শোনেন। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি এও শুনেছেন নীহার আর শিশির এখনও বাড়ি ফেরেনি। এবং কেন, কোথায়, কী করছে সবই বুঝেছেন।
স্কুল ছুটির পর কুয়াশা যখন বাড়ি ফিরছিল তখনকার কথা৷ ফেরার সময় হঠাই রিক্সার চাকার পাম বের হয়ে রিক্সা চালকের পক্ষে আর প্যাডেল মারা সম্ভব না হওয়াতে কুয়াশাকে কিছুটা হাঁটতে হয়েছে৷ চাইলে আলাদা রিক্সা নিতে পারতো, কিন্তু কুয়াশার ইচ্ছে হয়নি। কিছুটা পথ, হেঁটেই ফেরা যাবে ভেবে। কিন্তু তার ধারণাতে ছিল না, এই হাঁটতে চাওয়াটা তার জন্য জঘন্য কিছুর স্বাক্ষী হবে।
কুয়াশা ফিরছিল, সেই মোড় সংলগ্নে ক্লাবঘর পড়ে। কতরকম ছেলের ওঠা-বসা সেখানে। বিশেষত লীগের ছাত্ররা বেশি থাকে। আজ তাদের বখাটে আর বিকৃত মস্তিষ্কের বলে মনে হয়েছে কুয়াশার কাছে। নয়তো ওমন জঘন্য কথাবার্তা বলা ভালো পরিবারের ছেলেদের পক্ষে সম্ভব নয়৷
কিছু ছেলে সেখানে বিকেলে ক্যারাম খেলছিল৷ কুয়াশা তখন পথে একা হাঁটছে৷ আশ-পাশ দিয়ে রিক্সা চললেও চোখ-কান করার মানুষ নেই। ব্যস্ত শহর। আর আশেপাশে দোকান-পাটও কম। খুব একটা মানুষ-জনও নেই। কুয়াশা হাঁটতে গিয়ে যখন ক্লাবঘরে থাকা ছেলেদের নজরে পড়ে তখন একজন পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে যায়। অযথাই এমন পরিস্থিতিতে কুয়াশা ঘাবড়ে যায়। কুয়াশা ভীত কিন্তু স্থির চোখে তাকায়৷ ছেলেটিকে কুয়াশা পরখ করে দেখে। লাল-সাদা চেইক শার্ট, নীল জিন্স প্যান্ট, গলায় P লেটারের সিলভার রঙা মোটা চেইন আর ডান হাতে লাল রঙের রুমাল পেঁচিয়ে রাখা। বয়সটা ঊনিশ+বিশ হবে। কুয়াশার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা থেকে সে পর্যবেক্ষণ করে জিজ্ঞেস করে,
“ পথ আটকালেন কেন? কিছু বলবেন?”
“ উঁহুঁ!, তোমাকে কিছু বলা যায় নাকি? করা যায়।”
কথার মানেটা কুয়াশা বুঝতে পারে না৷ তবে ছেলেটির লক্ষণ খারাপ বুঝতে পারে। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলে ছেলেটি ঝুঁকে এসে বলে,
“ সুন্দরী আছ তো। উফ্! চোখজোড়া তো আমাকে ঘায়েল করে দিল! আবার সাইজ সুন্দর আছে। খুলে-টুলে দেখতে চাইলে দেখাবে নাকি?”
কুয়াশার তখন কান জোড়া ঝা ঝা করে ওঠে। শরীরের ভেতরটা ঝঙ্কার দেয়। ইঙ্গিত বুঝে গেছে সে। কুয়াশা এতটাও তো ছোট নেই আর! আর কী শুনল সে এসব? কুয়াশার গলা শুকোয় ঘেন্নায়। আশেপাশে নজর দেয়। কতজনকে দেখে সে। কিন্তু সবাই সবার কর্মে ব্যস্ত। যেন এদিকে কেউ ভুলেও তাকাচ্ছে না৷ ক্লাবঘরের দিকে আঁড়চোখে দেখে কুয়াশা। সামনের ছেলেটার আশেপাশে বয়সের কতজন ছেলেরা ক্যারাম খেলছে আর এদিকে লক্ষ্য করছে। সাথে কিছু বলাবলি করে দাঁত ক্যালিয়ে হাসাহাসিও করছে। কুয়াশা বুঝে গেল এমন আচরণের কারণ। ইভটিজিং! কুয়াশা এই বিষয়ে জানে। সে এখন ইভটিজারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে!
কুয়াশা ঘাবড়ে যায়। নিঃশ্বাস ঘন হওয়ার সাথে কান্নাও পেয়ে যায়। ভীষণ অসহায় লাগছে। তার ভাইদের কথা মনে পড়ছে। ভাইরা থাকলে তার সাথে এই নোংরা ছেলেগুলো ইভটিজিং করার ক্ষমতা দেখাতে পারত? কুয়াশা কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বাঁধা কণ্ঠে বলে,
“ পথ ছাড়ুন, আমি ফিরব৷”
“ তোমার জন্য তো আমার পথ খোলা, সুইটি। চলে এসো। চলো খুলে দেখি তোমাকে। দেখি তোমার কোমল হাতটা, ধরি।”
ছেলেটি সত্যি সত্যি কুয়াশার হাত ধরতে যায়। কুয়াশা পেছনে সরে যায়। ভীষণ ভয় হয়ে যায় তার। পাশ দিয়েও চলে যেতে দিচ্ছে না। কুয়াশার চোখে পানি এসে যায়। করুচিপূর্ণ কথায় ভীষণ কান্না পায় ওর৷ সে সেটাকে আটকে বলে,
“ পথ ছাড়ুন! আমার ভাইদের জানালে, একদম আস্ত থাকবেন না! সত্যি বলছি!”
কুয়াশা শক্ত কথা বলার চেষ্টা করে। ওর কথা শুনে ছেলেটি আঁতকে ওঠার মতো করে সকৌতুকে বলে ওঠে,
“ আরে! এ তো সুইটি না রে! হট! ঝালে ঝাল? জমে ক্ষীর! চলো বসি একটু। হাতটা ধরতে দাও। একটু টাচ করি তোমাকে।”
খেঁক খেঁক করে হাসি হাসে ছেলেটি। সঙ্গে কুয়াশার সম্পূর্ণ শরীরের নোংরা দৃষ্টির বিচরণ ঘটে। কুয়াশার মুখের দিকে নয়, বারবার বুকের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। নাক টেনে টেনে নাকে ডলা দিচ্ছে। কুয়াশার দম আঁটকে আসে তখন। হাসফাস করে। সে কী চেঁচাবে? তাকে কেউ সাহায্য করতে আসবে চেঁচালে? কেউ কী তাকে চিনছেও না নাকি?
“ বাই দ্যা ওয়ে, কোন ক্লাসে পড়ো, হটি? থাকো কেথায়? তোমাকে ভীষণ পছন্দ হয়ে গেছে আমার৷ যাহ্ শালা! প্রেমে পড়ে গেলাম বোধহয়! আচ্ছা চলো প্রেম করি। এক্সেপ্ট করছ?”
কুয়াশার ঘেন্নায় বমি এসে যায়। এমন ছেলেদের সাথে প্রেম! কুয়াশার ভেতর থেকে উগ্রে আসে সব৷ কুয়াশা ক্লাব ঘরের দিকে তাকাল আবার। সামনে আশে-পাশে ব্যানার ঝুলছে। লেখা দেখে বুঝল— এখানে দুইলীগের দলীয় কর্মীরাই ওঠা-বসা করে।
ছেলেটি একটু এগিয়ে এলে কুয়াশা পিছিয়ে যায়। ছেলেটি আবার প্রশ্ন করে,
“ করছ না এক্সেপ্ট? চলো প্রেম করা লাগবে না। ওটা আবার আমারও পছন্দ না৷ প্রেম করে মা*গী মানুষের সাথে লুতুপুতু করার ভেতর আমি নেই। যা হবে চান্স একবারই।”
কুয়াশা আর সহ্য করতে পারল না। ছেলেটির পায়ের কাছে ঘেন্নায় থুথু ছুঁড়ে দিয়ে বলে উঠল,
“ ছিঃহ!”
এরপর সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো,
“ যেতে দিন আমাকে। নয়তো এখনই লোকজন ডাকব!”
“ ডাকো।”
ছেলেটির তার পায়ের কাছে ঠিক যেখানে কুয়াশা থুথু ছুড়েছে সেখানে তাকিয়ে ছিল। কুয়াশার কথার প্রত্যুত্তরে ভাবলেশে বলল কথাটা। কুয়াশা ঠাণ্ডা মৌসুমেও ঘেমে উঠল মনে হলো। সে এসব থেকে রেহাই পাবে কীভাবে বুঝে উঠল না। শুধু উপরওয়ালাকে ডাকল। ঠিক তখনই একজন মধ্য বয়স্ক লোক, দেখে মনে হলো ভদ্রসভ্য, এগিয়ে এসে কুয়াশাকে একবার দেখে ছেলেটির দিকে তাকায়। এরপর জিজ্ঞেস করে,
“ এই কী রে? কী সমস্যা?”
ছেলেটি উত্তর দেয়ার আগে কুয়াশা বলে,
“ আমাকে নোংরা নোংরা কথা বলছে৷ পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে। কেন?”
লোকটি কুয়াশার দিকে তাকিয়ে দেখে। এরপর বলে,
“ যাও, তুমি। চুপচাপ চলে যাও। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।”
কুয়াশা খুব বেশি কিছু বোঝে না। এই লোকটা কে সে চেনে না। এখানে কী হচ্ছে কিছুই বোঝে না সে৷ তবে মনে হচ্ছে আগত ব্যক্তিটি তাকে শাসাচ্ছেন। নয়তো এমন ভাবে বলতেন না। ছেলেটিকে আরো একবার দেখে সে পাশ কাটিয়ে চলে এসেছে। এরপর কী হয়েছে না হয়েছে কুয়াশা জানে না। তবে যতটুকু পথ সে এসেছে চোখে অন্ধকার দেখেছে। চোখে পানি বাঁধ মানেনি। জঘন্য কথাগুলো তার মস্তিষ্ক ভেদ করে ফেলেছিল৷ সে জীবনেও ওই ধরনের কথাবার্তা শোনেনি।
.
কুয়াশাকে ডাকা হলো। জাকির মালিথা ডেকে কাছে বসালেন কুয়াশাকে। কুয়াশা বড় চাচুর কাছে বসে মাথা ঝুঁকিয়ে রইল। দৃঢ়চেতা জাকির মালিথার অভিব্যক্তি কুয়াশা বুঝল না। গম্ভীর, শান্ত মুখের দিকে তাকালে কোনো অভিব্যক্তি বোঝার কথাও নয়। শান্ত মানুষ আবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে পারে৷ জাকির মালিথা কুয়াশার মাথার ওপর হাতটা রেখে বললেন,
“ আমাদের দেশে কিছু অলিখিত নোংরা নিয়ম আছে। যা দ্বারা প্রায় কিছু জঘন্য পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলতে হয়। আমরা নারীজাতির গর্ভে থেকে জন্ম নিলেও, নারী জাতটাকে সম্মান করতে শিখি না৷ মূলত, আমরা মানুষ হয়ে জন্মালেও, সকলে মানুষ হয়ে উঠতে পারি না।”
জাকির মালিথা থামেন৷ কুয়াশার মাথার ওপর একই রকমভাবে হাতটা রেখে দিয়েছেন। সোফাতে বাড়ির বড় সদস্যরা চুপচাপ শুনছেন। ছোট সদস্যদের মাঝে কেউ উপস্থিত নেই। হিম শশীর সাথে স্টাডি রুমে। তুহিন নিচে নামতে পারবে না। শিশির আর নীহারের খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি।
জাকির মালিথার পানে কুয়াশা তাকালে তিনি কণ্ঠে দৃঢ়তা ছড়িয়ে বললেন,
“সমাজের নোংরামি দেখে ভয় পেলে চলবে না, আম্মা। নোংরার স্বভাব ছড়িয়ে পড়া, আর মর্যাদার স্বভাব মাথা উঁচু করে টিকে থাকা। তুমি কোনটা হবে, সেই সিদ্ধান্তটা আজ থেকে তোমারই।”
কুয়াশা তাকিয়ে থাকে তার বড় চাচুর দিকে। কী অমায়িক মানুষটি! কুয়াশার মনে কেমন যেন শান্তি লাগে। সে অপলক তার বড় চাচুর দিকে তাকিয়ে থেকে—বড় চাচুর দৃঢ়তা, ন্যায়পরায়ণতা, বিচক্ষণতা এবং স্বাধীনচেতা মনোভাব গুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে।
বড় চাচু হলেন সেই ব্যক্তিত্ববান পুরুষ, যে পুরুষকে যে-কোনো নারী চেয়ে বসতে পারেন। এমন পুরুষকে পাবার আশায় তপস্যা করতে পারে। কোনো নারীর সাধনার পুরুষও হয়ে উঠতে পারে। কুয়াশার কিশোরী মন তখনই অদ্ভুত এক ভাবনা ভেবে বসল। তারও তো মাঝেমধ্যে কোনো কোনো ছেলের দিকে নজর আটকায়! ভালো লাগে তখন। বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে কুয়াশা মুগ্ধ হয়। তবে ওই নজর হয় সাময়িকভাবে সৌন্দর্যে আটকানো। কুয়াশা এতকিছু ভেবে না দেখলেও তার মনে হয়— জীবনে একটা প্রেম আসা জরুরি, ভালোবাসা হওয়াটাও জরুরি, এবং সেই প্রেম ভালোবাসার সাথে একজন অসামান্য ব্যক্তিত্ববান পুরুষ পাওয়াটাও জরুরি। কুয়াশা ভেবে নিল, জীবনে কোনো একজন ব্যক্তিত্ববান পুরুষের প্রেমে পড়বে সে। ভালোবাসবে এবং চেয়েও বসবে। আর সেই ব্যক্তিত্ববান পুরুষটির ব্যক্তিত্ব হবে তার বড় চাচুর মতো। যে নারীকে যত্ন করতে পারে, সম্মান করতে পারে, ভালোও বাসতে পারে৷ যার মাঝে অগাধ ধৈর্য, অগাধ দায়িত্ববোধ, অগাধ সততা মিশে আছে। এমন পুরুষকে কুয়াশা চাইবে৷ আজ রাস্তায় যেমন ছেলের সাথে তার পরিচয় ঘটল, ওমন জঘন্য ছেলেকে সে ঘেন্না করবে। ওরা মানুষ রূপের হলেও, মানুষ নয়৷ অন্তত তাদের ভালোবাসা যায় না৷
কুয়াশা তাকিয়ে রইলে জাকির মালিথা শেষ বললেন,
“দুনিয়াতে শক্তিশালী মানুষ সে হতে পারে না, যে কাউকে হারিয়ে দিতে পারে। শক্তিশালী সে, যাকে ভেঙে দেওয়ার শত চেষ্টা করেও কেউ ভেতর থেকে ভাঙতে পারে না। সাহসী হবার সঙ্গে তুমি বিচক্ষণী হও। লক্ষ ঠিক রাখো। অন্যায়কে অন্যায় বলে আঙুল তুলো। যেদিন তুমি অন্যায়ের সামনে মাথা নত করবে, সেদিন তুমি বাজেভাবে হারবে। আর যেদিন নিজের মর্যাদা আঁকড়ে দাঁড়াবে, সেদিন তুমি একা হলেও পরাজিত হতে পারবে না।”
জাকির মালিথার কথা শুনে উপস্থিত আজমীরা আঁতকে ওঠেন। এ কী শেখানো হচ্ছে তার মেয়েকে! বড় ভাইজান এতটুকু মেয়েকে এসব কেন শেখাচ্ছেন! তার জেদি মেয়ে যে এগুলো শিখে নেবে! তখন কী হবে? আজমীরার চোখেমুখে লেপ্টে আছে অসম্ভব ভীত।
কুয়াশাকে দুনিয়ার বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় দেখতে পারবেন না তিনি! এমন মনোভাব তার বাবার দেখেছেন। যার কারিগর ছিল এই বাড়িরই নির্ভিক আদর্শ৷ আর সেই আদর্শ তার জীবনের সময়সীমা করেছিল সামান্য। আজমীরা এমনটা দেখতে পারবেন না৷ তার জন্য নারীজাত ঘরকুনোই ঠিকঠাক আছে৷ আওয়াজ তোলা নারীর জন্য নয়। স্বাধীনচেতা হতে গিয়ে তার ফল কী হয়, তা তো অজানা নয়! আজমীরা ভীষণভাবে কেঁপে কেঁপে ওঠেন তখন৷
‘
রাত তখন অনেকটাই হয়েছে। ঘড়ির কাঁটায় কত বেজেছে সেই সময়টা দেখারও সময় পায়নি শিশির আর নীহার। সন্ধ্যার পর থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নেমেছে মাঘের শীতেও। ফলে প্রকৃতিতে শীতটা অতিমাত্রায় জেঁকে বসেছে।
এমন আবহাওয়ার মাঝে একটি ছেলের হাত-পা সহ মুখটাও অবধি ঢেকে বাঁধা। বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে খোলা আকাশের নিচে। বৃষ্টিতে ভিজছে সে। শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গ নড়াচড়া করা গেলেও, কথা বলা সম্ভব হচ্ছে না। শুধু গুঙিয়ে গুঙিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে। ছেলেটা ছটফট করছে, আর তার সামনে বসে তাকে তৃপ্তি নিয়ে দেখছে শিশির আর নীহার। দুইজনই হাঁটু ভেঙে পায়ে ভর দিয়ে পড়ে থাকা ছেলেটির সামনে বসে আছে। সময়ের হিসাব গননা করলে, এই তো দশ মিনিট হবে! দশ মিনিট যাবৎ ছেলেটি এমন ঠাণ্ডা মৌসুমের মাঝে শুধুমাত্র টিশার্ট আর আন্ডারওয়্যার পরে বৃষ্টিতে ভিজছে৷ হাইপোথারমিয়া হতে সময় নেবে না বোধকরি৷
ছেলেটি কোথায় কীভাবে আছে তা জানে না সে। জানবে কীভাবে? তার তো মুখে কালো কাপড়ের মুখোশ পরানো! ঘণ্টাখানি হবে, তখন সে বাইক নিয়ে বাড়ি ফিরছিল ক্লাবঘর থেকে নেশা-পানি করে। শরীর আর মস্তিষ্কের বেহাল দশা তখন। এরমাঝে রাস্তা রোধ করে দাঁড়ায় দু’জন বাইকার। তাদের চেনা যায় না৷ হুডি জ্যাকেটের হুডি তোলা মাথায় আর চোখজোড়া ছাড়া সম্পূর্ণ মুখ আবৃত করা। আশপাশ ফাঁকা পেয়ে তারও মুখে কালো কাপড় পরিয়ে কিছু একটা পুশ করে দেয় তার ঘাড়ের কাছে। কিছুক্ষণের মাঝেই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এরপর আর কিছু মনে করতে পারল না৷ এখন কিছু দেখতেও পারছে না।
শিশির আর নীহার কোনো কথাই বলছে না৷ যেন কথা না বলাটা তাদের জন্য একটা বিশেষ কারণ৷ শিশির তাকাল নীহারের দিকে। চোখের ইশারায় কিছু বোঝাল। অর্থাৎ,
“ শুরু কর।”
নীহার প্রথমে শুরু করল। ছেলেটার চুলের মুঠো ধরে মুখের ওপর কয়েকটা ঘুষি দিয়ে নিল প্রথমে। এরপর নিজের পাশে থেকে হকিস্টিকটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। ক্ষণকাল দাঁড়িয়ে ছেলেটার ওপর ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে দেখল৷ কুয়াশার ফুলে যাওয়া চোখজোড়া স্মৃতিতে বাড়ি দিতেই, সে হকিস্টিক তুলে সপাটে বাড়ি বসাল ছেলেটির হাঁটুর গাট্টির ওপর। তখনই তার চিৎকার ফাঁকা মাঠের মাঝে ছড়িয়ে এদিক-ওদিকে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনি হতে লাগল। ফাঁকা স্থানে বৃষ্টির শব্দ নেই বললেই চলে৷ খুব একটা জোরেও হচ্ছে না বৃষ্টি৷ তবে যা হচ্ছে তাতে ভিজেছে ওরাও। কালো হুডি জ্যাকেটের হুডি মাথায় তোলা দু'জনেরই।
ছেলেটির দম আটকে আসছিল এতক্ষণ। একেতো মুখে মুখোশ পরানো, তারপর বৃষ্টির পানি পড়ছে। শ্বাস-প্রশ্বাস চালাতে যথেষ্ট সমস্যা হচ্ছিল। এখন এমন আঘাতে জীবন যায় যায় তার৷ মদের নেশা কেটেছে কিনা বলা মুশকিল, তবে জ্ঞান ফেরার পর থেকেই শরীরের শক্তি ক্ষয় বলে মনে হয়েছে। নীহার পরপর বেশ কয়েকটা বাড়ি দিল। হাঁটু, পা, পিঠ, হাত কোনো অংশই বাদ রাখল না। একেকটা বাড়ি যথেষ্ট ভারী। এই সময়গুলোর মাঝে একটা শব্দও শিশির বা নীহার করেনি।
নীহারের যখন হাঁপ ধরে এলো, তখন সে থেমে গেল৷ হাঁপাতে হাঁপাতে ছেলেটির দিকে দেখল৷ তার চিৎকারে ফাঁকা স্থানটা ভারী হয়ে উঠেছে৷ এমন যন্ত্রণা পেতে দেখে নীহার যেন ভীষণ তৃপ্তি পেল৷ মাথা তুলে শিশিরের দিকে তাকাল৷ শিশির নীহারের দিকে তাকালে হকিস্টিকটা শিশিরের দিকে বাড়িয়ে দিল। অর্থাৎ এবার তোর পালা৷ শিশির হকিস্টিকটার দিকে তাকিয়ে দেখে নীহারের দিকে তাকাল৷ এরপর ওর বাড়িয়ে দেয়া হাতটা নামিয়ে দিয়ে হকিস্টিকটা উপেক্ষা করল৷ নীহার ভ্রু কুঁচকালে শিশির খালি হাতেই এগিয়ে এলো৷ নীহার ওর কাঁধ ধরে বাঁধা দিল তখন৷ ইশারায় বোঝাল,
“ একদম না!”
শিশির নীহারের সতর্ককে উপেক্ষা করে কাঁধ থেকে হাতটা সরিয়ে দিয়ে খালি হাতেই এগিয়ে গিয়ে ছিলেটির সামনে হাঁটু ভাজ করে আবার বসল। ছেলেটিকে দেখে নীহারের দিকে তাকাল। হাত দেখিয়ে বোঝাল,
“ হাতই যথেষ্ট।”
শিশিরের হাতের দিকে তাকাল নীহার। গ্লাভস পরা দুইহাতে। যদিও তার হাতেও রয়েছে। নীহার মাস্কের আড়ালে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। শিশির দৃষ্টি সরিয়ে ছেলেটির কাতরানো উপভোগ করল ক্ষণকাল বসে থেকে৷ এরপরই শুরু করল তার মেডিসিন দেয়া। ছেলেটির মুখ থেকে মুখোশ খুলে দিয়ে এলোপাতাড়ি ঘুষি বসাতে লাগল। চোয়ালের হাড়গুলো আস্ত থাকবে কিনা সন্দেহ। এমন ভাবে একেকটা ঘুষি দিচ্ছে, যাতে করে ছেলেটির মুখের মানচিত্রই পাল্টে যায়৷ এই মুখ আর কেউ না চিনতে পারে। ঠোঁটের ওপরও ইচ্ছাকৃতভাবে কয়েকটা ঘুষি বসাল। কেননা ওই ঠোঁট নাড়িয়ে কথা বলে কুয়াশাকে বাজে কথা বলেছে৷ তাতে কুয়াশা কষ্ট পেয়েছে এবং কেঁদেছেও। শিশিরের কী যেন হয়ে গেল। উদভ্রান্তের মতো ঘুষি দিয়েই গেল। ঘুষি দেবার সময়ে মুখে বলল,
“ আমি বিনা অন্য কারো থেকে কষ্ট পায় না ও! আমিই একমাত্র যে, ওকে মারতে পারি, কাঁদাতে পারি এবং কষ্টও দিতে পারি। আমি বিনা কষ্ট পেয়েছে মানে বিশালই ব্যাপার! চরম অন্যায়! বড় মাপের কলিজা দেখিয়ে ফেলেছিস!”
কথাগুলো ভীষণ ভারী শোনাল। যা থেকে শিশিরের কোনো বাক্যই ছেলেটি স্পষ্ট শুনতে পেল না। বৃষ্টির পানিতেই যেন শিশিরের কথাগুলো মিশে গেল। এছাড়া ছেলেটির একেকটা গুঙানির আওয়াজের সাথেও। যেহেতু কাছ থেকে ছেলেটিই শিশিরের বলা কথাগুলো শুনতে বা বুঝতে পারল না, সেখানে নীহারের তো আরোই শুনতে পারার কথা নয়। কারণ সে বেশ দূরে চলে গেছে তখনই, যখন শিশির ছেলেটির মুখ থেকে মুখোশ খুলে ফেলেছে। বলতে গেলে আড়ালে চলে গেছে। শিশিরের শুধুমাত্র চোখজোড়া ছাড়া ছেলেটি আর কিছুই দেখতে পারেনি। এছাড়া স্থানটাতে আলোর পরিমাণ ক্ষীণ। ওদের বাইক দুটোও অনেক দূরে রেখে এসেছে। বাইকের হেডলাইটের আলোও ততটা পৌঁছাতে পারছে না স্থানটায়।
নীহার ছেলেটির পুরো শরীর পিটিয়েছে, আর শিশির পেটাল ওর পুরো মুখে৷ মুখ আর মুখ নেই। দাঁতগুলোও বত্রিশটা আছে কিনা সন্দেহ৷ এছাড়া চোখজোড়াও সুস্থ থাকবে কিনা বলা মুশকিল৷ বলতে গেলে এমন হাল করল, যা থেকে আগামী পাঁচ বছর তাকে বেড রেস্টে থাকতে হবে। এবং ভবিষ্যতেও নিজের পায়ে খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়ে ক্লাবঘর অবধি যেতে পারবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ রইল।
ছেলেটি যখন একেবারেই জ্ঞান হারাবার পথে, তখন নীহার এগিয়ে এলো। দ্রুত শিশিরকে আটকে দিল। মেরে ফেলা তাদের উদ্দেশ্য নয়। মানুষ খুন করার মতো পারিবারিক শিক্ষা তাদের নেই। তবে কথা একটাই— যেখানে কুয়াশা, সেখানে নীতিবোধ ও আদর্শ কিছুটা হলেও তারা সিঁকেয় তুলতে বাধ্য।
উন্মাদ শিশিরকে নীহার টেনে সরিয়ে আনল। ফিসফিস করে বলল,
“ হয়েছে! থাম এবার৷ দরদ উতড়ে পড়ছে বড়!”
শিশির থেমে গেল। নীহারের খোঁচা দেয়া কথাটা হজম করে নিল মুখ বিকৃত করে। যদিও ওর মুখভঙ্গিমা নীহার দেখতে পেল না। এরপর দু'জনই কিছুটা দূরে পড়ে থাকা ছেলেটার দিকে তাকাল। এই মুহূর্তে শিশির আর নীহারকে যে কেউ দেখলে বলবে, মাফিয়া৷
ছেলেটি কাতরাচ্ছে ভীষণ৷ আর নীহার শিশিরের কাঁধ ধরে ইশারায় বোঝাল,
“ চল, ফিরতে হবে৷”
শিশির সে ইশারায় নীহারের সাথে পা মেলাতে গিয়েও কী ভেবে যেন আবারও ছেলেটির দিকে এগিয়ে গেল। নীহার মানা করল না। শিশির এগিয়ে গিয়ে ছেলেটির গলায় পরে থাকা P লেটারের সিলভার রঙের চেইনটা টান দিয়ে ছিঁড়ে নিল। ওটা ছিঁড়তে গিয়েও আঘাত দিয়ে এলো।
নীহারের কাছে এসে চেইনটা ওর হাতের মুঠোয় ধরিয়ে দিল। যেটা বোঝাতে চাইল, সেটা যেন নীহার বুঝেও গেল। মাথা ঝুঁকিয়ে কিছুটা আওয়াজ করে হেসে ফেলল নীহার৷ শিশির তাতে সাঁই দিল কিনা বোঝা গেল না। তবে নীহারের হাত থেকে হকিস্টিকটা কেঁড়ে নিয়ে হাতের মাঝে ঘোরাতে ঘোরাতে হাঁটা আরম্ভ করল৷ নীহারও শিশিরের পেছন থেকে টান পায়ে এগিয়ে এসে ওর কাঁধ জড়িয়ে ধরল। দুই ভাই সন্ধ্যা থেকে যা যা করেছে, তা মনে করে দু'জনই এবার একসাথে হেসে ফেলল।
এই দুটোকে এভাবে একসাথে দেখলে যে কেউ উপাধি দেবে— রংবাজ। তাদের একসাথে রংবাজির শেষ নেই। দুটোর কাজকর্ম এতটা হম্বিতম্বি আর ফন্দি এঁটে হয়, যা থেকে এই নামে তাদের অনায়াসে মানিয়ে যাবে।
.
আজমীরা তাঁর কক্ষের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। আজ তিনি পারেননি মেয়েকে শান্ত করতে। তিনি ভেতরে ভেতরে গুমরে মরে যাচ্ছেন৷ তিনি এসব থেকে কীভাবে বের হবেন কিছুতেই পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। কোনো কী পথ নেই? তার পক্ষে কেন সম্ভব হচ্ছে না স্বাভাবিক হওয়া? এতটা কঠিন কেন সব? যে মানুষটা তাঁর চিন্তা না করে, তাকে একা ফেলে চলে গেল হাজারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও, তার জন্য সে এতটা কেন কষ্ট পায়? ঠিক কেন? কেন তাদের জীবন এভাবে থামিয়ে রেখেছেন? শুধুমাত্র কি মানুষটা নেই বলে? তাঁর শূন্যস্থান আছে বলে?
“আপনার শূন্যস্থান আমার দৃষ্টিসীমায় থেকে যায়, জায়ান৷ পূরণ করার উপায় জানা আছে আপনার?”
আকাশ পানে বাক্য ছুড়ে দিলেও তার যে উত্তর মিলবে না, সেটা তো আজমীরা জানেন৷ অথচ কতশত প্রশ্নের উত্তর তার জানার আছে। সেসব মিলবে কোথায়? ঠিক কোথায়? কীভাবে পাবেন তিনি উত্তর? এমন কি কোনো পথ খোলা আছে?
| চলবে |