#এক_বনে_দুই_বাঘ
‘নক্ষত্রদের মৃত্যু নেই’
১৭.
®রোজা রহমান নাঈমা
‘
২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩;
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার আগেই টেলিভিশনের পর্দাজুড়ে প্রচার হতে লাগল দিনের অপ্রত্যাশিত আবার কারও কারও কাছে বহু প্রতীক্ষিত খবর। একের পর এক চ্যানেলের শিরোনাম ও সংবাদে মুখর হতে লাগল পর্দা। নিউজ প্রেজেন্টারদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের খবর,
“জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। বিশটি অভিযোগের মধ্যে আটটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে দুটি অভিযোগে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড।”
নিউজ প্রেজেন্টারের কথা শেষ হলে, টিভির পর্দায় দেখা গেল দেশের বিভিন্ন স্থানের সংঘর্ষ। কোথাও জামায়াত-শিবিরের মিছিল পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে, কোথাও রাস্তা অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রংপুর, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসতে লাগল অস্থিরতার খবর। কোথাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও বিস্ফোরক ছোড়ার খবর, কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ।
দুপুরের খবরকে ছাপিয়ে গেল বিকেলের খবর। আরেক বুলেটিনে নিউজ প্রেজেন্টারের গম্ভীর কণ্ঠে শোনা গেল,
“সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। কয়েকটি এলাকায় যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।”
সন্ধ্যার দিকে খবরের পরিধি আরও বড় হয়ে উঠল। চট্টগ্রামে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, সিলেটে পুলিশ ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, গাইবান্ধায় পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার খবর। দেশের নানা প্রান্ত একই দিনে অস্থির হয়ে উঠেছে যেন। কোথাও পুলিশ, কোথাও বিক্ষোভকারী, কোথাও আবার সাধারণ মানুষও সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে আহত হচ্ছিল।
রাতের সংবাদ মাধ্যমে দিনের হিসাব আরও ভয়াবহ হয়ে উঠল। টিভির সামনেই রাত নেমে এসেছে যেন। টিভির সংবাদে নিউজ প্রেজেন্টার পড়ছেন,
“সারা দেশে সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কোথাও কোথাও বিজিবি ও র্যাবও মাঠে নেমেছে।”
এরপর টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেল পোড়া যানবাহন, ধোঁয়ায় ঢেকে থাকা সড়ক, ছত্রভঙ্গ মানুষ আর পুলিশের ব্যারিকেড। একদিকে শাহবাগে রায়ের পক্ষে উল্লাস ও সমাবেশ, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রায়ের প্রতিবাদে সংঘর্ষ। একই দিনে বাংলাদেশ যেন দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে।
জাকির মালিথা নির্বিকার মুখে পর্দার দিকে অস্বাভাবিক রকমের স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। টেলিভিশনের পর্দায় একের পর এক সংবাদ বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে সংবাদ পাঠকের কণ্ঠ, শিরোনাম। কিন্তু জাকির মালিথার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। সেই অনড় মুখের আড়ালে কী চলছে, তা বোঝা দায়। তাঁর নীরবতাটুকু স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না। মুখের গভীরে যেন দ্বিধা। চোখের তলায় অদৃশ্য এক অন্তর্দ্বন্দ্ব। হঠাৎই তখন পাশে বসে থাকা সহধর্মিণী জাকিয়াকে বললেন,
“ একটা জিনিস লক্ষ্য করো, কিয়া!”
জাকির মালিথা টেলিভিশনের পর্দা থেকে চোখ সরালেন না মনে হয়। তাই জাকিয়া ওঁনার কথা শুনছেন কিনা সেটা লক্ষ্য না করেই বললেন
“একজন মানুষের বিরুদ্ধে এতগুলো ভয়াবহ অভিযোগ আনা হলো। গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুটতরাজ— একটা দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অভিযোগ এগুলো। অথচ আজ দেশের পরিস্থিতিটা দেখো। মানুষটা অপরাধী কি না, তার বিচার আলাদা বিষয়। সবাই নিজের নিজের জায়গা থেকে বিচার করছে না তাঁকে, বিচার করছে সে কার পক্ষে অথবা কার বিপক্ষে। কিন্তু তাকে কেন্দ্র করে আজ যারা পথে নেমেছে, তাদের সবার রাজনীতি এক নয়। স্বার্থ এক নয়। উদ্দেশ্যও এক নয়।”
জাকিয়া দেখেন। তবে টিভি নয়, ওঁনার পাশে বসে থাকা জাকির মালিথাকে দেখেন। এখানে জাকির মালিথাকে দেখার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ থাকতে পারে। রাজনৈতিক দিকগুলিতে একজন নির্লিপ্ত, উদাসীন মানুষ? নাকি এমন একজন মানুষ, যিনি সবকিছু দেখে, বুঝেও সর্বতোভাবে নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করেন?
জাকিয়া জামানের কাছে জাকির মালিথার এই নির্বিকার ও উদাসীনতার একটি পরোক্ষ ব্যাখ্যা আছে। ইতিহাসখ্যাত কূটনীতিক ও রাষ্ট্রচিন্তক কৌটিল্যের বিখ্যাত গ্রন্থ অর্থশাস্ত্র-এ উপস্থাপিত ছয়টি তত্ত্বের মধ্যে কৌটিল্যর তৃতীয় তত্ত্বটির সঙ্গে জাকির মালিথার রাজনৈতিক বিষয়ে মতামত রাখার অবস্থানকে লক্ষ্য করা যেতে পারে,
“ উদাসীন থাকার নামই নিরপেক্ষতা।”
অর্থাৎ উদাসীনতাও কখনো কখনো নিরপেক্ষতার একটি বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। শত্রু বা মিত্র কোনো পক্ষের সাথেই যুদ্ধ বা সন্ধি না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিরপেক্ষ থাকা।
জাকিয়া স্বামীর রাজনৈতিক উদাসীনতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চাণক্যের সেই নীতির সাথেই পরোক্ষভাবে মেলালেন বোধহয়। জাকির মালিথাকে তিনি চরম কূটিল ব্যক্তি বলেই জানেন। রাজনৈতিক বিষয়াবলীতে তাঁর এই নির্বিকার ভাব আসলে অজ্ঞতা বা অনাগ্রহের প্রকাশ নয়, বরং রাজনীতির খুঁটিনাটি সম্পর্কে জ্ঞান রেখেও নিজের অবস্থান প্রকাশ না করার এক সচেতন নিরপেক্ষতা। যেন সবকিছু দেখেন, সবকিছু বোঝেন, অথচ কোনো পক্ষের হয়ে কথা বলেন না।
অথচ এখানে জায়ান থাকলে কিছু কি বলতেন না? জায়ান তো বড় ভাইয়ের মতো কখনো নিরপেক্ষতাকে প্রশ্রয় দেননি। দেশ ও দেশের রাজনৈতিক অবস্থা, ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর কাছে বিভিন্ন সঙ্গা, ব্যাখ্যা পাওয়া যেত৷ তার দার্শনিক মনস্ক বড়ই সমালোচক ছিল। জাকিয়া তখন ভাবলেন, জায়ান থাকলে নিশ্চয়ই তার স্বভাবসুলভ ব্যঙ্গাত্মক হেসে দার্শনিক চরিত্র ফুটিয়ে বলতেন,
“ সাম্রাজ্যবাদ সবসময় বন্দুক হাতে নিয়ে আসে না, বিগ ব্রাদার। কখনো সে মুক্তির যুদ্ধে অস্ত্র দেয়, কখনো ক্ষুধার সময়ে খাদ্য দেয়, কখনো বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়। তারপর একদিন দেখা যায়, তোমার দেশের মাটিতে তোমার পতাকা উড়ছে তো ঠিকই, কিন্তু তোমার সিদ্ধান্তের ওপর আর তোমার অধিকার নেই।”
জাকিয়ার মনে হলো জায়ানই কথা বলছেন। ঠোঁটে সেই হাসির পরিধি চওড়া করে বলে চললেন,
“ ব্যাপারটাকে এমনও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, একটা বাড়িতে আগুন লাগল, পাশের বাড়ির লোকটা ছুটে এসে বলল, আমি সাহায্য করব। পানি দিল, আগুনও নেভাল। তারপর চলে যাওয়ার আগে বাড়িটার অর্ধেক জমি নিজের নামে লিখে রেখে গেল। কারণ তার যুক্তি, আগুন না নেভালে বাড়িটা তো থাকতই না! কেয়া বাত হ্যা!”
শরীর দুলিয়ে বিদ্রূপের হাসি হাসতেন না তখন? হাসতেন।
“ ও হো! তোমার দেশ তো…. দ্যা পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ, ব্রাদার? আছে তো ঠিকঠাক? নাকি গণতন্ত্রহীনতায় ভুগছ?”
জাকিয়া চমকে উঠলেন। তার অবচেতন মন জায়ানের ভাবনাকে নিজের মাঝে কেন ধারণ করলেন? যার অস্তিত্বই এখানে নেই! তার স্বভাব, তার চিন্তা, তার কটাক্ষ— এসব তাঁর নিজের মস্তিষ্কের ভেতরে এভাবে জায়গা করল কীভাবে?
দেশটা কি সত্যিই ধীরে ধীরে গণতন্ত্রহীনতার দিকে যাচ্ছে না? জাকিয়া রাজনীতি বোঝেন না। তাই হয়তো জায়ানের কথাগুলো তার কাছে সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা হয়ে এলো না। তবে যেটুকু তিনি বুঝেলেন, তার ভাবনাতেই বুঝলেন।
জাকিয়ার অন্যমনস্কতার মাঝে জাকির মালিথা কেমন স্থির কিন্তু অদ্ভুত টানে বললেন,
“ নায়েবে আমির দেলায়ার হোসেন সাঈদী লাখো জনতার সামনে বলেছিলেন— বিড়ালের মতো পাঁচশ বছর বেঁচে লাভ নাই, সিংহের মতো এক ঘণ্টা বাঁচতে চাই।”
জাকিয়া জাকির মালিথার মুখপানে চোখ রাখেন। কথাগুলোতে মনোযোগ দেন। বিশেষভাবে তিনি স্বামীর মনোযোগী শ্রোতা। জাকির মালিথা স্থির দৃষ্টিতে কেমন রহস্য মিশিয়ে পুনরায় বলেন,
“ সিংহ হওয়ার ইচ্ছেটা বিপজ্জনক, কিয়া। বিশেষ করে যখন রাষ্ট্র তোমাকে সিংহ হিসেবে দেখতে শুরু করে।”
থামলেন না তিনি, বলে চললেন,
“ রাষ্ট্র কখনো কখনো মানুষকে অপরাধী হওয়ার আগেই বিপজ্জনক মনে করে। আবার কখনো প্রকৃত অপরাধীকেও তার প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে।…. একটা রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি কি জানো, কিয়া?”
শেষে বাক্যের পূর্বে একটু দম ছেড়ে প্রশ্নটা করেও তাকালেন না তিনি। যেন তিনি কী বলছেন জানেন৷ শুধু জাকিয়াকে শোনাচ্ছেন। তাই স্থির দৃষ্টি পূর্বের মতো রেখেই কথা সম্পূর্ণ করতে বললেন,
“ একটা মানুষকে শুধু পরাজিত করা নয়। তার নামের সঙ্গে এমন একটা ভয় জুড়ে দেওয়া, যাতে তাকে ভালোবাসাও চরম অপরাধের কাজ বলে মনে হয়।”
জাকির মালিথা কী বলছেন এসব! জাকিয়ার বুঝতে সমস্যা হচ্ছে নাকি? নাকি অনেককিছু বুঝতে পারছেন? ওভাবেই তাকিয়ে থাকেন জাকিয়া। জাকির মালিথা বলেন,
“ আজ সিংহের মতো বাঁচতে চাওয়া মানুষটার অবস্থান দেখো কোথায়। রাষ্ট্র তাকে ভয় পেয়েছে কি না, সেটা বড় কথা নয়; রাষ্ট্র কখন একজন মানুষকে খাঁচায় পুরে রাখে, সেটা বুঝতে পারা কঠিন বিষয়ও নয়। খাঁচায় বন্দি একটা সিংহকে মানুষ ভয় পায় না, কিয়া। ভয় পায় সেই সিংহটাকে, যেটা খাঁচার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ সিংহ হাজার হিংস্র হলেও খাঁচায় পুরে সিংহকে শাসন করা যায়, শাস্তিও দেয়া যায়।”
জাকিয়ার তখন মনে পড়ে আজকের মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত সাঈদী সাহেব বলেছিলেন,
“ আমি দেখতে পারছি, বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে, উত্তর গগনে কালো মেঘ জমা হয়েছে। ঝড়ের পূর্বাভাস লক্ষ্য করছি। যদি মুকাবলা না করতে পারেন সক্ষমভাবে, এমন অন্ধকার কালো আমাবস্যার রাত আসতে পারে, যার সুবেহ-সাদিক হওয়া প্রায় অসম্ভব।”
“ আজকের পরিণতি দেখে একটা কথাই মনে হচ্ছে। কেউ সিংহ হয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। আর রাষ্ট্র তাকে খাঁচার ভেতর আটকে ফেলেছে।”
“ তোমাকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হতে দেখিনি কখনো। কোনো দলের প্রতিও আগ্রহ দেখাতে দেখিনি। কিন্তু আজ…”
“ উঁহুঁ!”
জাকিয়াকে সম্পূর্ণ করতে দিলেন না কথা। জাকির মালিথা তার পূর্বেই থামিয়ে দিলেন৷ এরপর পুনরায় বললেন,
“ রাজনীতির সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার জানো? একসময় মানুষ ঘটনা দেখে না। দেখে, ঘটনাটা তার পক্ষে গেছে, নাকি বিপক্ষে। তুমি আমি আম জনতা।”
তিনি নিজের পরিচয় দিলেন নাকি অবস্থান?
“ আমি শুধু দেখছি, একটা মানুষকে নিয়ে কেউ শোক করছে, কেউ উল্লাস করছে, কেউ প্রতিবাদ করছে, কেউ ভয় পাচ্ছে। কিন্তু এই বিশাল দৃশ্যের মাঝখানে সবাই নিজের সত্যটা খুঁজছে। সত্যিটাকে তো নয়।”
এর চেয়ে গভীর কথা জাকির মালিথা বোধহয় আর বললেন না। হয়তো তিনি বলতে চাইলেন না। কিছু কথা বলারও একটা সময় থাকে। সময় পার হয়ে গেলে কথাগুলো আর প্রতিবাদ হয়ে ওঠে না। আফসোস হয়ে যায় তখন। আর আফসোসের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো, সে কাউকে বদলায় না। শুধুই দিন গোনে।
জাকির মালিথা যখন উঠে গেলেন তখন প্রতিক্রিয়াশূন্য হয়ে বসে রইলেন জাকিয়া। এখানে উপস্থিত যে ছিলেন আজমীরা তা বোঝাই যায়নি। তিনি নিজের অস্তিত্ব এভাবেই বিলিন করছেন, নাকি অস্তিত্বহীনা হতে চাইছেন? বড় প্রশ্ন হয়ে আছে।
‘
আম্বিয়া লিভিং থেকে তখনই চলে এসেছেন কক্ষে, যখন বড় ভাশুর আর বড় জা টিভির সামনে বসে দেশের পরিস্থিতি আলোচনা করছিলেন৷ কক্ষে এসে জাহিদ মালিথাকে বেশ কয়েকবার ফোনে মিসডকল দিয়েছেন তিনি। জাহিদ মালিথা রিসিভ করেননি। এমনই হচ্ছে বিগত কয়েক বছর। ফোনকল রিসিভের সময়টাও তাঁর কাছে নেই বলে মনে হয় আম্বিয়া হকের। যেন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এক প্রাণী৷
আম্বিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। মাঝেমধ্যে মনে হয় এমন সংসার তার প্রাপ্য ছিল না। আবার মনে হয়, যা পেয়েছেন, তা-ই প্রাপ্য ছিল ওঁনার৷ তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, চাকরির জীবন থেকে অবসর নেবেন দ্রুতই। বড় ক্লান্ত লাগে আজকাল।
‘
নীহার রাতের আঁধারে নক্ষত্রভরা মহাকাশে চেয়ে আছে৷ কানে তার ফোন। কক্ষের বারান্দায় তার অবস্থান৷ ফোনের ওপাশে মেধার কণ্ঠ৷ নীহারের আইএসএসবি-এর সময় পিছিয়েছে৷ দেশের এমন অবস্থাতে সবটা একজায়গায় স্থির হয়ে আছে যেন।
কথা শেষে নীহার যখন ফোন রাখল, তখন তার মস্তিষ্কে পুনরায় একটা ব্যাপার চড়ে বসল। ১৩ তারিখ ১লা ফাল্গুনের দিন মেধা তাকে জানিয়েছিল— তার বাবা অর্থাৎ মাহিন প্রধান, তাকে বাইরে বের হতে মানা করেছিলেন। কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না, এমনকি এক সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ ছাড়া আর কোথাও যেন বা থাকে সেই বিষয়েও সতর্ক করেছিলেন। অথচ তারা অবাধ্যের মতো রেস্তোরাঁ সহ পার্কেও ঘুরতে গিয়েছিল। এবং সেদিনই তো পার্কে জঙ্গি হামলা হলো! সময়টাও মাহিন প্রধান মেধাকে নিশ্চিত করে দিয়েছিলেন। সেই সময়ের পূর্বেই মেধাকে ফেরার জন্য আদেশ জারি করেছিলেন৷
বিষয়টা নিয়ে নীহারের মাঝে বিশাল দ্বন্দ্ব চলছে। বিশেষত মাহিন প্রধান জঙ্গি হামলার কথা জানতেন? নাকি জঙ্গি হামলাও নিছকই কোনো রাজনৈতিক চাল ছিল! যা নীহার সন্দেহ করছে তা-ই কী তবে? যদি তা-ই হয় ব্যাপারটাতে মেধাই বা কতখানি জানে?
নীহারের কেন যেন মনে হচ্ছে এখানে তাদের সম্পর্কে টান পড়ছে৷ কোথাও ন্যায়-অন্যায়ের মাঝে তারা ফেঁসে যাচ্ছে। কিন্তু নীহার তো মেধাতে বাজেভাবে ডুবে গেছে, এর পথ মৃত্যু ছাড়া বাঁচার উপায় আছে কি?
…
গত ৫ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার, জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলে একই দিন থেকেই শুরু হয় শাহবাগ আন্দোলন। রায়কে আরও কঠোর করার দাবিতে শাহবাগে শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি ছিল, আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড এবং জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা।
রায়ের পরপরই জামায়াত হরতাল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করে। দেশজুড়ে তখন রাজনৈতিক উত্তেজনা ও তোলপাড়।
১৩ ফেব্রুয়ারি, পহেলা ফাল্গুনের দিন, কুষ্টিয়া ইসলামী কলেজ প্রাঙ্গণে বিক্ষোভকারীদের একটি সমাবেশ চলছিল। দুপুর গড়িয়ে যেতেই সেই সমাবেশকে কেন্দ্র করে শুরু হয় সংঘর্ষ। বিক্ষোভকারীরা জামায়াত-শিবিরের কর্মী, এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়তেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হতাহতের খবরের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দও শোনা যেতে থাকে।
এরই মধ্যে—বিস্ফোরণ! মুহূর্তের মধ্যেই বসন্তের আমেজে ভাটা পড়ল। মজমপুর থেকে বড়বাজার পর্যন্ত এন.এস. রোডজুড়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ চলছিল। এরই মধ্যে শহরের কয়েকটি জায়গায় বিস্ফোরণের খবর। কোথায় কোথায় বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা তৎক্ষণাৎ জানা না গেলেও নীহার ও মেধা যে পার্কটিতে ছিল, তার এক পাশে অবস্থিত জেনারেটর হাউস থেকে তখন দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছিল। চারদিকে দৌড়াদৌড়ি। চিৎকার-চেঁচামেচি। কেউ একজন দৌড়াতে দৌড়াতে বলছিল,
“ বোমা মেরেছে জেনারেটর হাউসে!”
আরেকজনের আতঙ্কিত কণ্ঠে সতর্কবার্তা শোনা যায়,
“ পার্ক থেকে বের হন! সবাই বের হন!”
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মানুষের মুখে মুখে আরও ভয়ংকর একটি কথা ছড়িয়ে পড়ে,
পার্কে জঙ্গি হামলা হয়েছে। চারপাশের মানুষ তখন আর সত্য-মিথ্যা যাচাই করার অবস্থায় নেই। আতঙ্কই দ্রুততম সংবাদ। মানুষ ছুটছে। কেউ সন্তানকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ অন্যের হাত ধরে দৌড়াচ্ছে। কেউ পেছনে তাকাচ্ছে না। অথচ নীহার ও মেধা তখনও স্থির। মেধার আচমকা বাবার বলা সকালের কথাটা মনে হয়। আজ বের হতে মানা করেছিলেন মাহিন প্রধান। এক মুহূর্তের জন্য তাঁর বুকের ভেতর কেমন একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। তবে কি বাবার জানা ছিল? আজ এমন কিছু ঘটতে পারে, সেটা কি তিনি আগে থেকেই জানতেন?
নীহারের হাতে টান পড়ে, মেধা হাত ধরে তাকে টানছে। স্থান থেকে বের হতে হবে। নীহার তখন আশেপাশে দৃষ্টি নাড়িয়ে দেখে কোনদিক দিয়ে বের হলে নিরাপদে বের হওয়া সম্ভব হতে পারে। সামনে দিয়ে বের হতে পারবে না। এরমাঝে আবার জানা গেল, এন.এস রোডে ভয়াবহ সংঘর্ষ চলছে। মজমপুর থেকে বড়বাজার অবধি সম্পূর্ণ রোড ব্লক।
নীহারের তখন চট করে কুয়াশার কথা মাথায় আসে। আজ কুয়াশা তার স্কুলে আছে৷ এখনও প্রোগ্রাম চলছে হয়তো। আর তার স্কুলটাও মার্কেট প্লেসে। কী করছে তার বোন? নীহার মেধার হাত তখনও শক্ত করে ধরে আছে। তারা তখনও নিরাপদ স্থানেই অবস্থান নিয়ে আছে। নীহার ফোন বের করে দ্রুত শিশিরের কাছে ফোনকল লাগায়। শিশির কোথায় সেটাও জানা প্রয়োজন। শিশির কল ধরে না। নীহার পুনরায় দিলে, তখনও ধরল না। তিনবারেও ধরল না শিশির। নীহার মাটিতে পা বাড়ি দিয়ে বলে উঠল,
“ ড্যাম ইট!”
“ চলো, নীহার৷ বের হতে হবে আমাদের এখান থেকে।”
নীহার ফোন হাতে ধরেই মেধার দিকে কেমন করে তাকায় যেন। এরপর ক্ষণকাল তাকিয়ে থেকে মেধার হাত শক্ত করে ধরে উল্টো দিকে ছুটল। উদ্দেশ্য মেধাকে নিরাপদে বের করে সে কুয়াশার কাছে ছুটবে। শিশিরের খোঁজ নেওয়াটাও জরুরি।
অথচ নীহার তখনও জানল না, কুয়াশার সুরক্ষার জন্য আরো একটি বান্দা মালিথা ভিলায় মজুদ আছে। সম্পর্কে কুয়াশার ভাই হয়। যদিও ভাই সে মানে না। তবে সেই ভাইয়ের আবার কুয়াশার বিপদে মানবতাবোধ খুবই বাজেভাবে জেগে ওঠে৷
সেই মানবতাবোধ থেকে সে যখন সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বসন্তের উল্লাস করছে, তার কাছে তখন নীহারের ফোনকলের পূর্বেই খবর পৌঁছেছে এন.এস রোডের ভয়াবহ সংঘর্ষ চলছে। সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ তখন সম্পূর্ণ নিরাপদ। শিশির শোনা মাত্রই বন্ধুদের ছেড়ে বের হতে গেলে তার হাতে টান পড়ে। একটি অসম্ভব সুন্দর সাজে বাসন্তী-হলুদ ও সাদা রঙের সংমিশ্রণে শাড়ি পরিহিত অসম্ভব সুন্দরী মেয়ে শিশিরের হাত চেপে ধরেছে। মেয়েটি অন্বেষা। চরম অধিকার নিয়ে, আকুতিভরা চোখে তাকিয়ে কেঁদে ফেলার আগমুহূর্তে যেমন দেখায়, ঠিক তেমনই মুখে অন্বেষা বলল,
“ যাস না ওদিকে, শিশির। তোর ক্ষতি হতে পারে।”
শিশিরের মাথায় তখন নিজের ক্ষতির চিন্তা নেই। মাথায় ঘুরছে, কুয়াশা এখনও স্কুলে আছে। আর সেখানেই তাকে যেতে হবে৷ যে-কোনো ভাবে। শিশির অন্বেষার দিকে চরম ক্রোধে তাকায়। সবসময় এমন অধিকার দেখায়, যেন শিশির তার লিখিতভাবে কিছু একটা হয় সম্পর্কে। শিশিরের বেজায় রাগ ওঠে। তার সময় যাচ্ছে। শিশির অন্বেষার ধরে রাখা হাতের দিকে একপল তাকিয়ে পুনরায় ভ্রু বাঁকিয়ে মুখের দিকে স্থির দৃষ্টি ফেলে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“ ছাড়, অন্বেষা! আই সোয়্যার, এই হাতেই খুন হয়ে যাবি নয়তো!”
অন্বেষা ছাড়ে না। শিশির অন্বেষাকে এইধরনের কথাও বলতে পারে। শিশির তাকে বন্ধু মানে কি মানে না, সেটা একমাত্র শিশিরই ভালো বলতে পারবে। তার কাছে কিছু সম্পর্কের ধরণ আবার আলদা। কিছু সম্পর্ক তার কাছে ভীষণ অদ্ভুত ভাবে জায়গা পায়৷ যার মধ্যে উল্লেখ্য একটি— অন্বেষা ও তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক৷
অন্বেষা তখন শিশিরের হাত আরো শক্ত করে ধরে। যেন শিশির ওকে মেরে পুঁতে ফেললেও সে ছাড়বে না এমন ভঙ্গিমাই দেখা গেল তার মাঝে। কিছু বলতে যাচ্ছিল অন্বেষা। শিশির তা শোনে না৷ অন্বেষাকে ছাড়তেও আর দ্বিতীয়বার বলে না। বৃথা হবে সে কথা৷ শিশির তার কথা বৃথা যাক সেটা বোধহয় চাইল না। ঝারা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অন্বেষাকে কাঁদিয়ে ছেড়ে বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। শিশিরের পেছনে রিজভী ও আরো দু'জন ফ্রেন্ড দৌড় দেয়৷
অন্বেষা মূল্যহীন হয়ে পড়ে থাকে ওখানেই। আজ সে শিশিরকে প্রেম নিবেদনের আশা নিয়ে এসেছিল বড়। তার জন্য পরিকল্পনাও ছিল বেশ কিছু৷ সন্ধ্যার পর তো তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে, অথচ তার পূর্বেই সব ধ্বসে পড়ে গেল! অন্বেষা ভীষণ কাঁদল বসে পড়ে। তার চোখের পানিগুলো বসন্তের সবুজ ঘাসে শিশিরবিন্দুর মতো ফোটা ফোটা হয়ে পড়ল।
সে পূর্বের চেয়ে অনেকটা শিশিরের মনমতো হবার চেষ্টা করছে। তবুও শিশিরের দৃষ্টি সীমায় অন্বেষা কোথাও জায়গা পায় না। অন্বেষার কিসের কমতি, অন্বেষা জানেনা৷ ওর মতো উদ্ভিন্নযৌবনা মেয়েও যদি শিশিরের মতো সদ্য যুবকের কাছে গুরুত্ব পেয়ে না ওঠে, তাহলে দোষটা আসলে কার? তার যৌবনের নাকি শিশিরের ব্যক্তিত্বের! বোধহয় শিশিরের ব্যক্তিত্বের। ছেলেটার উচিত ছিল— এই বয়সে অন্বেষাদের নিয়ে এনজয় করার৷ শিশিরটা এত গর্দভ!
‘
যখন কুয়াশা দিশেহারা, তখন কুয়াশার সাহারা হয়ে ছুটে আসতে দেখা যায় শিশিরকে। শিশির কাউকে খুঁজছে৷ ওর চোখজোড়ায় বড় তৃষ্ণা। তৃষ্ণার্ত চোখজোড়া ভিড়ের মাঝে অস্বাভাবিক ভাবে ছুটছে। কিন্তু লক্ষ্য অবধি পৌঁছাতে পারছে না।
কুয়াশা তখন শিশিরকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠল বোধহয়। কিন্তু সে কী! কুয়াশা শিশিরকে ডাকছে, অথচ তার শব্দ শিশির অবধি পৌঁছাচ্ছে না? শিশির শুনছে না তাকে? কুয়াশা শরীর ঘেমে উঠেছে আরো বেশি। কিশোরীর হলুদাভ মুখখানি হয়ে উঠেছে বিকেল বেলার সূর্য অস্ত যাবার আগ মুহুর্তের মতো লালাভ। পাতলা শরীরটা শাড়ি আর সামলাতে পারছে না এমন অবস্থায়। নয়তো শিশিরের নজরে পৌঁছাতে দৌড় দেওয়া যেত। শাড়ির হালে পা-জোড়াও স্থিরতা পেয়েছে। ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মাঝে কুয়াশা চরম পর্যায়ে ভীতিগ্রস্ত।
কুয়াশা অনেক চেষ্টা করছে শিশিরকে ডাকার জন্য। সম্বোধনটা ‘ভাইয়া’। অথচ কুয়াশার উচ্চারণ ধ্বনিটা শিশির অবধি তখনও পৌঁছাল না! শুধু মুখ খুলে ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়াচ্ছে। যাতে করে মনে হতে পারে কুয়াশা বোবা৷ তার নিজস্ব কোনো উচ্চারণ ধ্বনি নেই। অথচ কুয়াশার মনে হচ্ছে— সে চিৎকার করে করে শিশিরকে ডাকছে, শিশির তাকে শুনছেই না! কুয়াশার এই পর্যায়ে এসে ভীষণ কান্না পেল। সে ভেতরের আর্তনাদ করা কান্নাটাকে শাসিয়ে ঠোঁট চেপে ধরল। কেন শিশির তাকে দেখছে না? সে এখানে দাঁড়িয়ে আছে। শিশির দ্রুত আসতে পারছে না? সেই মুহূর্তে কুয়াশার বোধহয় উচ্চারণ ধ্বনিতে জোর এলো, সে চিৎকার করে ডেকে উঠল,
“ ভাইয়া!”
আর সেই সময়তেই ভাইয়া ডাক শুনেই শিশিরের তৃষ্ণার্ত চোখজোড়া ঘুরে কুয়াশার দেখা পেল। শিশির মনে হলো সিংহের দৌড়ের গতি বেগে কুয়াশার কাছে এসে পৌঁছাল। দিশেহারা কুয়াশা তখন একহাতে শাড়ি ধরে অপর হাতে চোখের পানি মুছছে। ক্ষণিকের মধ্যে দিশাহীন ভীতগ্রস্ত কুয়াশা শিশিরের গুহা পেতেই ঢুকে পড়ল এই বাইরের ভয়ঙ্কর দৃশ্য থেকে বাঁচতে। গুহায় ঢুকে পড়তেই কুয়াশা সে-সব আর কিছুই দেখতে পেল না৷ সে শুধু অনুভব করল একটা হাত, যা ওকে আঁকড়ে নিয়ে আগলে ধরেছে বুকের সাথে। সেই একটা হাতই তার জন্য গুহা হয়ে উঠেছে। যেখানের মালিক হলো একটি সিংহ৷ আর সেই সিংহটি হলো তার— জান-এ-দুশমন। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে তার গুহাতেই মিলেছে তার আশ্রয়।
শিশির কুয়াশাকে বাঁ-পাজরের সাথে আগলে ধরেছে। বাঁ-হাতটা একদম কুয়াশার মাথার চুলের ভেতর। যার ভরে সে কুয়াশার মুখটা নিজের বাঁ-পাজরের সাথে চেপে ধরে আছে। যেন সামনের ভয়াবহ কোনো কিছুই কুয়াশার নজরে না পড়তে পারে। এসব ভয়াবহতা কুয়াশার জন্য নয়।
শিশির যখন কুয়াশার নজর লুকিয়ে রেখে স্থান থেকে বের হবার পথ খুঁজছে তখন ছুটে এলো রিজভী আর আরো দু'জন বন্ধু। শিশিরকে রিজভী হাঁপানো কণ্ঠে বলল,
“ তুই কুয়াশাকে নিয়ে বেরিয়ে যা৷ আমরা সামলাচ্ছি বাকিটা।”
শিশির টের পাচ্ছে কুয়াশা অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে। প্যানিক অ্যাটাক হবার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। কুয়াশাকে এখান থেকে সরানো উচিত৷ কলেজ পড়ুয়া ছাত্রগুলো মেয়েদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। শিশির কুয়াশাকে নিয়ে সরে যাওয়া শ্রেয় মনে করল বাকিটা রিজভীরা সামলে নেবে। রিজভী কুয়াশার অবস্থা টের পেল বোধহয়। ঝটপট বলল,
“ এক কাজ কর..”
থেমে ফটাফট নিজের পকেট থেকে চাবির রিং বের করে দিয়ে বলল,
“ আমার ফ্ল্যাটে চলে যা। সিঙ্গারমোর ক্রোস করা কঠিন হবে। চাবি নে, আপা না থাকলে খুলে নিস।”
চাবিটা ফটাফট হাতেও ধরিয়ে দিল। শিশিরের বাহুতে দুইটা চাপড় দিয়ে বলল,
“ যাহ্, দ্রুত যা!”
শিশির রিজভীর কথাটা ফেলল না হয়তো। চাবিটা নিয়ে কুশাকে শক্ত করে ধরে নিয়ে চলে আসতে গেলে কুয়াশা কাঁপা শরীরে অস্পষ্টে বলল,
“ স্মৃতি, ইশাও…”
শিশির চটজলদি রিজভীর দিকে তাকাল। রিজভী শুনে বলল,
“ আমি দেখছি। কিছু হবে না। যা ওকে নিয়ে তুই। কুইক!”
শিশির আর থামল না। যান চলাচল বন্ধ। বাইকও এখানে নিতে পারেনি। তাই ওভাবেই যেতে হবে। রিজভীদের বাড়ি একতারা মোড় সংলগ্নে। বেশি দূর না হওয়াতে চলে যেতে পারবে। কিন্তু এরমাঝে কোনো ক্ষতি না হলেই হলো৷
খুবই সাবধানে শিশির কুয়াশাকে নিয়ে সাবধানে এক প্রকার দৌড়েই ছুটেছে। কুয়াশা তার শাড়ি নিয়ে কিছুইতেই পেরে উঠছে না। কখন জানি শাড়ি খুলে যাবে ভাব। বারবার শাড়িতে বাঁধা পড়ছে মেয়েটা। শিশিরের এমন পরিস্থিতির মাঝেও মনে হলো, কুয়াশাকে তুলে খ্যাঁক করে আছাড় মারা ফরজ কাজের মাঝে একটা। শাড়ি শুধু কুয়াশার নয়, তার জন্যও বিশাল ঝামেলা হয়ে দাড়িয়েছে। টান দিয়ে খুলে ফেলার মতো ভয়ঙ্কর ভাবনাও কয়েকবার মাথা চাড়া দিয়েছে।
কুয়াশা প্রায় অসাড়। তার পায়ে আর শক্তিও নেই। তবে একতারা মোড় পেয়ে গেছে ওরা। একতারা মোড়ের উত্তরে কিছুটা যেয়ে পূর্ব পাশে রিজভীদের দুইতালা পাটোয়ারী ভিলা৷ নিচতলা ভাড়া দেওয়া আর উপরতলায় রিজভীরা থাকে। বাড়ি তো যেমন-তেমন ভাবে পেল, কিন্তু কুয়াশা আর চলতে পারল না। তার শরীর নিশ্চল রূপে পড়ে যাবে কখন। এক কদমও আর সামনে ফেলতে পারবে না। বহু কষ্টে শাড়ি বাঁচিয়ে রেখেছে নিজের গায়ের সাথে। ভাগ্যিস পায়ে ফ্লাট জুতো পরেছিল। নয়তো হাল আরো খারাপ হতো বলা যায়।
কুয়াশা নিশ্চল রূপে ওভাবেই পা ভেঙে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে নিলে, কোনোমতে কুয়াশার বাহু চেপে ধরে শিশির আঁটকে দিল পড়া থেকে। বেজায় রেগে আছে কুয়াশার ওপর সে। অবশ্য কুয়াশার চেয়ে কুয়াশার শাড়ির ওপর তার আরো বেশি ক্ষোভ। কোনোভাবে শাড়ি সহ কুয়াশাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলতে পারলে শান্তি পাওয়া যেত।
শিশির নিচের ফ্লোর থেকে উপরের ফ্লোরে পৌঁছানোর জন্য সিঁড়ির দিকে তাকাল। তাদের সামনে ও ক্রোস করে মোট বিশটা সিঁড়ি, কুয়াশার পক্ষে সম্ভব নয় ওঠা। সে সেখানেই গড়িয়ে পড়তে পারলে বাঁচতো। কুয়াশা কোনো কথা বলছে না। শুধু কাঁপছে আর হাঁপাচ্ছে। পানি তেষ্টা পেয়েছে বড়। উপায়হীন শিশির মুমূর্ষু কুয়াশাকে ঝটকা দিয়ে কোলে তুলে নেয়ার আগমুহূর্তে শুধু বলল,
“ চেঁচাবি না একদম!”
অবাধ্য কুয়াশা তাই করতে যাচ্ছিল। তার আগেই শিশির আবার বলে উঠল,
“ খ্যাঁক করে আছাড় দিয়ে এখানেই পুঁতে রেখে যাব। তখন মনভরে চেঁচাস।”
শিশির বেজায় রেগে। দাঁতে দাঁত ঠেকে চোয়ালদ্বয় শক্ত হয়েছে। কুয়াশা সে মুখে চেয়ে আর চেঁচাল না। তবে বুঝল তাকে কোলে নিয়ে বড় অস্বস্তিতে ভুগছে শিশির। এছাড়া শিশিরের জন্যও একটু কঠিন হলো কুয়াশাকে কোলে নিয়ে বিশটি সিঁড়ি বেয়ে ওঠা। শক্তিতে হিমসিম খেল। বয়সটার সাথে শক্তিও সন্ধি করে শিশিরকে শক্তিতে দুর্বল প্রমাণ করল। তবে যথাসাধ্য শিশির চেষ্টা করে সফলতার দিকে এগোতে লাগল। আজ বোধহয় শক্তি বৃদ্ধি করেই ছাড়বে ছেলেটা৷
সিঁড়ি বইতে গিয়ে শিশিরের বিরক্তির শেষ নেই। কুয়াশা আরামেই আছে বলা যায়। সেই আরাম শিশিরের সইল না। দাঁতে দাঁত ঠেকে থাকলেও উচ্চারণ করল,
“সুবিধাবাদি।”
এই মেয়েটা আজ তাকে কতকিছু করিয়ে ছাড়ল! কবে কুয়াশাকে এভাবেই তুলে আছাড় দিয়ে মেরে ফেলে সে দুনিয়ার সকল শান্তি একসাথে উপভোগ করবে বলে আশায় বুঁক বাঁধে। বড় সাধ শিশিরের।
বিকেলের আলোটা বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলার সিঁড়িগুলোতে খুবই সামান্য ছড়িয়ে রেখেছে৷ সিঁড়ির বাল্ব জ্বালানো নেই। সেই সামান্য আলোয় শিশির কুয়াশাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে দ্বিতীয় তলার মেইন ডোরের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। শিশির বুঝল না ভেতরে কেউ আছে কিনা। তবে একবার চেক করতে শিশির কুয়াশাকে কোলে রেখেই বলল,
“ বেল চাপ।”
কুয়াশা তখন আরামে শিশিরের কাঁধের কাছে মাথা ফেলে রেখে জিরচ্ছিল। শত্রুর কাঁধে মাথা রেখে আজকাল জিরানোও লাগে! বড়ই অদ্ভুত দিন এসেছে তাদের। কুয়াশা হাত বাড়িয়ে বেল চাপলে শিশির একটু অপেক্ষা করল। তবে অপেক্ষা বেশিক্ষণ করতে হলো না। ভেতর থেকে দরজা খুলল কেউ। দরজার কপাট সরে যেতেই শিশির চটকে করে কুয়াশার নজর লুকিয়ে ফেলল। ব্যাপারটায় কুয়াশা আশ্চর্য হলো চরম। সে বিষয়টা বুঝতে পারল না কেন তাকে নিয়ে সরে দাঁড়াল শিশির। ওপাশ থেকেও নারী কণ্ঠে আঁৎকে ওঠার মতো কেউ একজন বলে উঠেছে,
“ ওহ, খোদা!”
এরপর কিছুটা সময় পার হলে শিশির পুনরায় দরজার সামনে দাঁড়াল। তখন একটি যুবতী মেয়েকে ওড়না দিয়ে নিজেকে আবৃত ও আড়াল করে সামনে আসতে দেখা গেল৷ মেয়েটি বলল,
“ আয়, ভেতরে আয় দ্রুত!”
কণ্ঠটা কেমন অদ্ভুত। কুয়াশা লক্ষ্য করল সবটা৷ মেয়েটার মুখ সে সামান্যও দেখতে পেল না৷ পরনে সুতির আনারকলি স্টাইলের গাউন। যেটা হাঁটুর একটু নিচে শোভা পেয়েছে এবং সুতির ধুতি সালওয়ার৷ গাউনের হাতাটা হাতের কব্জা অবধি আবৃত করে ঢেকে রেখেছে৷ তবে আঙুলগুলো ডাকতে সক্ষম হয়নি। কুয়াশা খেয়াল করল মেয়েটির হাতের আঙুলগুলোর মাঝে কয়েকটা আঙুল পোড়া পোড়া মতো। পুড়ে জড়িয়ে আছে এবং, সেসব জায়গায় মাংসর অভাব। অনেকটা পুড়ে মাংস ঝলসে গেলে অথবা সেখানের মাংস ছড়ে গেলে যেমনটা হয় তেমন৷ যুবতীটি কে কুয়াশা জানে না।
শিশির কুয়াশাকে নিয়ে প্রবেশ করে বলল,
“ আপা, একটু খাবার পানি লাগবে৷”
যুবতীকে তখনই ছুটতে দেখা গেল৷ শিশির কুয়াশাকে ড্রয়িংয়ের সোফায় বসিয়ে দিয়ে নিজেও বসে পড়ল ধুপ করে। বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে শরীর এলিয়ে দিল সোফায়৷ কুয়াশাও শরীর সোজা রাখেনি। সোফায় এলিয়ে দিতেই যুবতী পানি নিয়ে ছুটে এলো। মুখ দেখা যাচ্ছে না। কুয়াশা দেখার চেষ্টা করছে। সেই চেষ্টা করতে গিয়ে মনে হলো মেয়েটির মুখটাও পোড়া আছে। কেননা একটা চোখের সামন্য নিচটা দেখতে পেল কুয়াশা৷ আর সেই চোখেই শুধু চেয়ে আছে সে৷ বাকিটাতে দেখছে না। দেখার প্রয়োজনও মনে করছে না মনে হলো।
কুয়াশা ঘুরে তাকিয়ে শিশিরকে দেখল। যুবতী তখন পানি নিয়ে কুয়াশার সামনে ধরে বলল,
“ তুমি কুয়াশা, পানি পান করো আগে, বোনু।”
কুয়াশার প্রচুর তেষ্টা পেয়েছে। সে পানি পান করে গলা ভিজিয়ে শরীর এলিয়ে বলল,
“ আমাকে চিনেন আপনি?”
“ রুহানি আপা, রিজভীর বোন৷ তোকে চিনে আমার বোন বলে৷”
শিশিরের শেষ কথা শুনে কুয়াশা নাক ছিটকাল। মনে হলো শিশিরের বোন বলে পরিচিত হতে তার অহমে বিশাল বড় ধাক্কা লাগল। শিশির চোখজোড়া বন্ধ করে রেখেছে, তাই কুয়াশার প্রতিক্রিয়া টুকু দেখতে পেল না। রুহানি সামান্য হাসল বলে মনে হলো। বলল,
“ হ্যাঁ, তোমাকে আমি চিনি৷ আজ সামনা-সামনি আমাদের দেখা হলেও আগে ছবিতে দেখেছি। তোমাদের অনেক গল্প শুনি আমি। রিজভী বলে।”
কেমন কণ্ঠ যেন রুহানির। কুয়াশা রুহানির এমন বেশের কারণ বুঝে উঠতে না পেরে অস্বস্তিতে জিজ্ঞেস করল,
“ আপনাকে আপা ডাকব?”
“ অবশ্যই, আপা ডাকবে। কিছু প্রশ্ন করার প্রয়োজন নেই। তোমরা বসো, আসছি আমি।”
কুয়াশা তবুও রুহানিকে আঁটকে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ আপনি মুখ ঢেকে আছেন কেন, আপা?”
কুয়াশার কণ্ঠে ক্লান্তি। খুবই সামান্য সুরে জিজ্ঞেস করল। রুহানি থেমে পেছন ফিরল। শিশির তখন চোখ খুলে তাকাল সরাসরি রুহানির দিকে। রুহানিও শিশিরের দিকে তাকিয়েছে। দু'জনের দৃষ্টি বিনিময়ের পর রুহানি বলল,
“ পরে জেনো বরং৷ এখন রেস্ট করো। তোমরা ক্লান্ত অনেক।”
রুহানির কথা বলার ভঙ্গিমাটা অদ্ভুত ঠেকল কুয়াশার কাছে। সচারাচর কুয়াশা এমন কথা বলতে দেখেনি কাউকে। তার পরিবারের কেউ এভাবে কথা বলে না। রুহানি চলে গেলে, শিশির কুয়াশাকে একপলক দেখে নিয়ে পুনরায় চোখ বুজল।
কুয়াশা সেই বুজে যাওয়া চোখে একবার দেখে শরীর ছাড়ল সোফায়৷ সেখানে বসেই কিছুক্ষণ আগেও কোন পরিস্থিতিতে ছিল তা কল্পনা করতে লাগল সে। কী ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হলো আজ! স্মৃতি, ইশা এরা ভালো আছে তো? মনে হতেই শিশিরের নীরব ও ভাবান্তর মুখের দিকে তাকাল কুয়াশা। দ্বিধাহীনে জিজ্ঞেস করল,
“ স্মৃতি আর ইশা কেমন আছে একটু জানো তো।”
মনে হলো শিশিরকে আদেশ করা হলো। তবে শিশির কথাটা ধরল না এখন। অন্যসময় হলে ঝগড়া বাঁধত৷ এই দু’টো আবার বাইরে ভীষণ ভদ্র সাজার অভিনয় করে।
“ সেফ আছে ওরা।”
কুয়াশার বিরক্তি লাগল। এমন ভাবলেশহীন মানুষের সাথে কথা বলা যায়? তাকে বাঁচিয়ে এনে যেন দুনিয়া উদ্ধার করে ফেলেছে৷ সেই অহংকারে আর মাটিতে পা নাও পড়তে পারে তার। কুয়াশা ঘাড় কাত করে শিশিরের সাথে কথা বলছে৷
“ তুমি না জেনেই কীভাবে বলছ, সেফ আছে ওরা?”
“ মেসেজ পেয়েছি।”
কুয়াশা বড় শ্বাস নিল এবার। পরনের শাড়ি তাকে খুবই অস্বস্তি দিচ্ছে। মন চাইল খুলে ফেলতে। কুয়াশা খসখস করে নড়ছে সাথে ওর হাতের চুড়ি ও পায়ে নূপুরজোড়া তাল মিলিয়ে রিনঝিন করে বাজছে।
নূপুরজোড়া জাকিয়া স্বর্ণকারের কাছ থেকে বানিয়ে এনে সেদিন পরিয়ে দিয়েছে তাকে। চেইন বিশিষ্ট সামান্য স্বর্ণকারের হাতে নিপুণ নকশা করা নূপুরটি সামান্য বাজে। কিশোরী বয়সের মেয়েরা নিজেদের নানান ভাবে শখ করে সাজাতে ভীষণ ভালোবাসে৷ তেমনই নূপুর কিশোরীদের একটি শখের অলঙ্কার বলা যায়। যদিও কুয়াশার এসবের প্রতি আগ্রহ কম, তবে জাকিয়ার জন্য তার সাজতে হয়। কানে সবসময়ের জন্য স্বর্ণের ছোট ঝুমকো দেয়া বালি-দুল থাকে তার। গলায় মাঝেমধ্যে চেইন দিতে হয় আবার এখন নূপুর। জাকিয়া মেয়েটাকে সাজিয়ে রাখেন বলতে হয়। নিঃস্ব আজমীরার মেয়েটার শখগুলো পূরণ করাতে কোনো অভাব নেই।
শিশির কুয়াশার শাড়ি, চুড়ি, নূপুরের শব্দে বিরক্ত হয়ে উঠল। ঘাড়টা কুয়াশার পানে রাগে আগ্রাসী ভঙ্গিতে কাত করে বলে বসল,
“ তুই চুপচাপ বোস, নয়তো এগুলো তোর শরীরে আর শোভা পাবে না।”
…
সেদিনের পর কুয়াশা জানতে পারল রিজভীর বোন রুহানি কেন ওভাবে নিজেকে আড়াল করেছিল। কুয়াশাকে শুধু জানানো হয়েছিল, রুহানির মুখে এসিড ছোড়া হয়েছিল। এর বেশি কুয়াশাকে আর কিছুই বলা হয়নি।
মূলত শিশির চায়নি কুয়াশাকে জানাতে। কারণ কুয়াশাও রাস্তা-ঘাটে চলাচল করে। আর এই বয়সে এই দুনিয়ার নৃশংসতা কুয়াশা উপলব্ধি করতে পারলে ওর মানসিক বিকাশে বাঁধা সৃষ্টি করবে। বাস্তবতা কখনো কখনো একজন মানুষকে নিংড়ে খেয়ে নিতেও সক্ষম হয়।
কুয়াশার সময়টা হচ্ছে দুনিয়ার রঙিন রূপ দেখে বড় হবার সময়, এই সময়ে সে দুনিয়ার কঠিক বাস্তবতাগুলো টের পেলে বড় সমস্যা। যদিও কুয়াশার বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া কম হয়নি৷ বাবাকে হারিয়ে দুনিয়ার অনেক কিছুই সে চিনে নিয়েছে।
ওইদিন রাতে কুয়াশা পুনরায় বাবাকে নিয়ে ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখল৷ অস্বাভাবিক কিছু নয়৷ ওইদিনের সম্মুখ পরিস্থিতি তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল৷ ফলে রাতে বাবাকে নিয়ে ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখে প্যানিক অ্যাটাক হলো।
| চলবে |
নোট-১ঃ গত পর্ব অর্থাৎ ১৬ নং পর্ব এডিট হবে। সেখানে পহেলা ফাল্গুন ১৪ তারিখে উল্লেখ করা হয়েছিল। সঠিক হলো— ২০২০ সালের আগে বাংলা ফাল্গুন মাস ইংরেজি ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ তারিখে পড়ত। এটা আমার মনে ছিল না। বাংলা ক্যালেন্ডার সংশোন করা হলে ১৪ তারিখে ফাল্গুন মাস পড়ে।
[চলবে]