আদ্রের হৃদয়ের প্রেয়সী
লেখক: তাসনিয়া ফাইজা
শরতের স্নিগ্ধতা না থাকলেও, ভোরের হাওয়াটায় আজ যেন এক অদ্ভুত আলস্য মাখানো। চৌধুরীর ভিলার চারতলার ঘরটায় জানালার পর্দা ভেদ করে আসা হালকা রোদ প্রেয়সীর চোখের পাতায় এসে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু সে ওঠার নামগন্ধ নেই। স্বপ্নের ঘোরেও তার ক্লান্তি যেন পিছু ছাড়ছে না।
তানিয়া ঘরে ঢুকে দেখল, লেপের ভেতর গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে প্রেয়সী। তানিয়া তার কাঁধ ধরে কয়েকবার ঝাঁকাল, কিন্তু প্রেয়সীর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
— "কিরে প্রেয়সী? ওঠ! আটটা বেজে গেছে। কলেজের অনুষ্ঠানে যেতে হবে না?"
প্রেয়সী বালিশে মুখ গুঁজে অস্পষ্ট স্বরে গোঙাল, "প্লিজ তানিয়া, আমাকে একটু ঘুমাতে দে। আজ কোনো কিছুতেই উঠতে ইচ্ছা করছে না।"
তানিয়া হাল ছাড়ার পাত্রী নয়। সে খাটের পাশে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "দেখ, আমি শেষবারের মতো বলছি, ওঠ। তুই যদি না যাস, আমি একা চলে যাব। পরে কিন্তু আমাকে বকিস না। আর শোন, তোকে যেতেই হবে—তোর ইচ্ছা বা অনিচ্ছার কোনো দাম নেই। চিফ গেস্টকে তোকে দিয়েই ওয়েলকাম করাবো, কলেজের স্কাউট লিডার হিসেবে এটাই তোর দায়িত্ব। তুই না থাকলে পুরো অ্যারেঞ্জমেন্ট মাটি হয়ে যাবে।"
প্রেয়সী এক ঝটকায় বালিশটা তানিয়ার দিকে ছুঁড়ে মারল। তানিয়া খুব দক্ষ হাতে বালিশটা লুফে নিল। প্রেয়সী চোখ না খুলেই বিরক্ত মুখে বলল, "বেয়াদব মেয়ে! কেন আমাকে মনে করিয়ে দিলি? আজ কি মরে যেতে ইচ্ছা করছে না আমার?"
তানিয়া বালিশটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে মুচকি হাসল। "আহারে, আমার মহারানি! তোমার তো এসব মনে থাকার কথা নয়, তাই দায়িত্বটা আমাকেই নিতে হলো।"
প্রেয়সী চোখ মেলে তাকাল, চোখের কোণে ঘুমের আড়ষ্টতা। "আচ্ছা, মনে করিয়ে দিলিই যখন, উঠছি।"
প্রেয়সীর অভ্যাস অনুযায়ী, খুব ভোরে স্নান না করলে তার দিনের শুরু হয় না। স্নানের তোড়জোড় সেরে সে যখন বাথরুমে ঢুকল, তানিয়া আলমারি থেকে বের করল জামদানি শাড়িটা। নীল রঙের জমিনে সোনালী সুতোর কারুকাজ করা সেই শাড়ি।
স্নানের পর প্রেয়সী যখন আয়নার সামনে দাঁড়াল, তার রূপ যেন নতুন করে ধরা দিল। উরুর নিচ পর্যন্ত নেমে আসা লম্বা ঘন কালো চুলগুলোকে সে যত্ন করে পিঠের ওপর আলগা খোঁপা করে বেঁধেছে। চোখে গাঢ় কাজল, যা তার মায়াবী চোখজোড়াকে আরও গভীর করে তুলেছে। ঠোঁটে হালকা লাল রঙের লিপস্টিক—সব মিলিয়ে তাকে এক মূর্তিমতী শান্ত অথচ প্রাণবন্ত অপ্সরী মনে হচ্ছে।
তানিয়া পরেছে গাঢ় সবুজ রঙের একটি শাড়ি। দুজনের সাজের সংমিশ্রণে যেন একখণ্ড প্রকৃতি ধরা দিয়েছে ঘরে। আয়নায় নিজেদের দিকে তাকিয়ে তানিয়া উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, "দেখ, আজকে আমাদের কলেজের সব নজর কিন্তু আমাদের দিকেই থাকবে।"
প্রেয়সী স্নান সিক্ত চুলগুলো ঝেড়ে মৃদু হাসল। সে জানে না, এই সাজগোজ বা আজকের অনুষ্ঠান কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তার অগোচরে নিয়তি তাকে কীসের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চলেছে তা প্রেয়সীর জানা নেই।
কলেজের উদ্দেশ্যে বেরোনোর সময় তারা একটা রিকশা ধরল। কিন্তু এই রোদ আর ভ্যাপসা গরমে রিকশা পাওয়া যেন সোনার হরিণ পাওয়ার সমান। ঢাকার রাজপথে এখন জ্যামের রাজত্ব। রিকশাচালক অনেক কসরত করে রিকশা বের করলেন। কড়া রোদে পিচ গলা রাস্তা থেকে যেন উত্তাপ ঠিকরে বেরোচ্ছে। প্রেয়সী রিকশায় বসে অস্থির হয়ে উঠল। তার নীল জামদানির আঁচলটা বাতাসের ঝাপটায় উড়ছে, আর রোদ লেগে শাড়ি থেকে চিকমিক করে ওঠা সুতোর কাজগুলো যেন আগুনের শিখার মতো জ্বলছে।
রিকশায় বসে প্রেয়সী ভাবল, জীবনটা ঠিক এই রিকশাটার মতোই—কখনও ধীরগতিতে, কখনও বা যানজটের ভিড়ে আটকে যাওয়া। কিন্তু সে জানে না, এই পথ তাকে আজ কোনো অন্ধকার গলির রাজপুত্রের সামনে নিয়ে যাবে না। কলেজের গেটে পৌঁছাতেই দেখা গেল বিশাল তোরণ। সব স্টুডেন্টদের কোলাহল, শিক্ষকদের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
প্রেয়সী তার দায়িত্বের কথা স্মরণ করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। আজ সে চিফ গেস্টকে বরণ করে নেবে।
কলেজ ক্যাম্পাসে পা রেখেই প্রেয়সীর দম ফেলার সময় নেই। তার নীল জামদানির আঁচলটা কোমরে ভালো করে গুঁজে নিয়ে সে এমাথা-ওমাথা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। স্টেজ সাজানো থেকে শুরু করে গেস্টদের বসার জায়গা—সবকিছুর তদারকি তার কাঁধে। তানিয়াও তার পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে। দুই বান্ধবী যেন আজ একখণ্ড কর্মযজ্ঞ। প্রিন্সিপাল মোশাররফ চৌধুরীকে দূর থেকে দেখা গেল বারবার ঘড়ি দেখছেন আর পুরো আয়োজনের খুঁটিনাটি তদারকি করছেন। সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না, তা যাচাই করতেই তিনি মঞ্চের দিকে এগোচ্ছেন।
ঠিক এমন সময় প্রেয়সীর ক্লাস টিচার রেহানা বেগম তাকে পেছন থেকে ডাক দিলেন। রেহানা ম্যাম মানুষ হিসেবে অত্যন্ত অমায়িক, ছাত্রীদের প্রতি তার অগাধ স্নেহ। প্রেয়সীকে দেখলেই তিনি নিজের মেয়ের মতো আগলে রাখেন। ম্যামকে দেখেই প্রেয়সীর দৌড়ানোর গতি থমকে গেল, সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল ম্যামের দিকে।
— "ম্যাম, আপনি?"
রেহানা বেগম প্রেয়সীর মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তার স্পর্শে প্রেয়সীর সকালের ক্লান্তি অনেকটাই যেন মিলিয়ে গেল।
— "কেমন আছো মা? তোমাকে তো একদমই জিরোতে দেখছি না আজ। চিফ গেস্ট আসছেন, খুব মনোযোগ দিয়ে ওয়েলকাম করবে। আমি জানি, একজন দক্ষ স্কাউট লিডার হিসেবে তুমি সবকিছুই নিখুঁতভাবে করবে। আমার বিশ্বাস, এই অনুষ্ঠান তোমাদের এই পরিশ্রমের কারণেই সফল হবে।"
প্রেয়সী ম্যামের দিকে তাকিয়ে শান্ত, মিষ্টি একটা হাসি দিল। তার স্নিগ্ধ হাসিতে ম্যামের মনটা ভরে গেল।
— "ঠিক আছে ম্যাম, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি সব গুছিয়ে নিচ্ছি।"
ম্যামকে বিদায় জানিয়ে প্রেয়সী আবার কাজে ডুব দিল। ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁই ছুঁই। কিন্তু চিফ গেস্টের আসার কোনো নামগন্ধ নেই। প্রোগ্রামের সময় ছিল এগারোটা, এখন বারোটা বাজে—অথচ গেস্টের কোনো খবরই নেই। প্রেয়সী বিরক্তিতে গুম হয়ে মঞ্চের এক কোণায় থাকা একটা চেয়ারে গিয়ে বসল। মনে মনে সে অস্থির হয়ে গজরাচ্ছে। তার কপালে ঘামের চিকচিক বিন্দু, নীল জামদানিটা গরমে শরীরের সাথে লেপ্টে যাচ্ছে।
তানিয়া তাকে ঐ অবস্থায় দেখে এগিয়ে এল। প্রেয়সীর মুখটা দেখে তানিয়া বুঝতে পারল একটা ঝড় ধেয়ে আসছে।
— "কিরে, এমন মুখ করে বসে আছিস কেন? কী হয়েছে?"
প্রেয়সী যেন জ্বলন্ত কয়লা। চোখের অগ্নিশর্মা চাহনি নিয়ে তানিয়ার দিকে তাকাল।
— "কী হয়েছে মানে? দেখছিস না গরমে আমাদের অবস্থা কী! এক ঘণ্টা পার হয়ে গেল, অথচ আমাদের মহারাজের দেখা নেই। এমন অশিক্ষিত অতিথি আসার চেয়ে না আসাই ভালো ছিল।"
তানিয়া দ্রুত প্রেয়সীর হাতটা চেপে ধরে চারপাশটা একবার দেখে নিল। নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
— "তুই প্লিজ একটু শান্ত হ! মানুষজন সব আশপাশে, একটু ভদ্রতা বজায় রাখ।"
প্রেয়সী ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল। তার মেজাজ এখন তুঙ্গে।
— "কীসের ভদ্রতা? তুই জানিস না, একবার আমার রাগ উঠলে আমি ভদ্রতা-অভদ্রতা কিছুই বুঝি না। এক ঘণ্টা ধরে রোদে রোদে ঘামছি, আর তিনি মহারাজার মতো বসে আছেন! অসহ্য!"
তানিয়ার মুখটা ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে জানে, প্রেয়সী রেগে গেলে তাকে থামানো কঠিন। কিন্তু পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সে প্রেয়সীকে বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগল।
ক্যাম্পাসের গরম বাতাস আর প্রতীক্ষার তিক্ততা যেন প্রেয়সীর নীল জামদানির মতো গাঢ় নীল বিষাদ হয়ে তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। সে হাত-পা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল, রাগে তার ঠোঁট কাঁপছে। আয়নায় দেখা সেই শান্ত অপ্সরীটা এখন যেন রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করতে চাইছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই কলেজের গেটের বাইরে একটা কালো বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামল। পুরো ক্যাম্পাসে যেন স্তব্ধতা নেমে এল। প্রিন্সিপাল আর শিক্ষকদের ছুটাছুটি শুরু হয়ে গেল। প্রেয়সী তড়িঘড়ি করে ফুলের তোড়াটা হাতে তুলে নিল। তার শাড়ির কুঁচিটা একটু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল, সে তা ঠিক করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এল আদ্রর শাহরিয়ার আদ্র। ব্যক্তিত্বের ভারে চারপাশের বাতাস যেন থমকে আছে। গেটের সামনে কুঁচি ঠিক করতে থাকা মেয়েটিকে দেখেই আদ্রর কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। তার কাছে মেয়েমানুষের এই চঞ্চলতা বা অগোছালো ভাব বড্ড অসহ্য। শৈশবের কিছু তিক্ত স্মৃতির কারণে নারীদের প্রতি তার এক ধরণের সহজাত অনীহা কাজ করে। আদ্র খুব নিচু স্বরে, কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় প্রেয়সীকে বলল,
— "কুঁচি ঠিক করবেন ম্যাম, নাকি ফুলের তোড়া দিয়ে কাজটাই শেষ করবেন? কোনটা আগে জরুরি, একটু ভেবে দেখবেন কি?"
প্রেয়সী এমন গম্ভীর ও রুক্ষ পুরুষালি কণ্ঠস্বরে চমকে গেল। সে তড়িঘড়ি কুঁচি ছেড়ে মাথা তুলে তাকাল। আদ্রকে সামনাসামনি দেখেই তার গলার কাছে কী যেন আটকে গেল। চিফ গেস্ট হিসেবে এই লোক! তানিয়া পাশে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা দেখছিল, সে-ও যেন পাথরের মতো জমে গেল। কিন্তু আদ্রর কথা ও আচরণে তানিয়া প্রেয়সীকে চোখের ইশারায় ফিসফিস করে ধমকাল, "ফুলের তোড়াটা দে, এভাবে হা করে তাকিয়ে আছিস কেন!"
প্রেয়সীর হাত তখন কাঁপছে। সে কোনোমতে তোড়াটা বাড়িয়ে ধরল, "ওয়েলকাম, স্যার।"
আদ্র এক মুহূর্তের জন্য তাকাল না, যেন প্রেয়সী তার সামনে অস্তিত্বহীন কেউ। আদ্র তোড়াটা নিয়ে অবহেলার ভঙ্গিতে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট শুভর হাতে ধরিয়ে দিল।
প্রিন্সিপাল ব্যস্ত হয়ে বললেন, "আদ্র স্যার, ভেতরে চলুন। সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।" আদ্র কোনো কথা না বলে প্রিন্সিপালের সাথে ভেতরে চলে গেল।
প্রেয়সী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। রাগে তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। তানিয়া পাশে এসে চেপে ধরল, "কী হয়েছে বল তো? প্লিজ প্রেয়সী, এখন আর পুরনো রাগ টেনে আনবি না। উনি হয়তো তোকে চেনেনও না। চিনলে হয়তো এতক্ষণে তোকে কাঁচা চিবিয়ে খেত!"
প্রেয়সী দাঁতে দাঁত চেপে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
— "বালের চিফ গেস্ট! এটার জন্যই এতক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলাম? অসহ্য!"
তানিয়া আতঙ্কিত হয়ে প্রেয়সীর মুখ চেপে ধরল, "আল্লাহ! তুই কি মরবি? তোর গলাটা কত উঁচুতে শুনিস! উনি যদি শুনে ফেলেন..."
তানিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রেয়সী ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল, "শুনলে শুনুক! শুনলে কী করবে? আমিও শুনি, দেখি তো কী বলে!"
হঠাৎ তাদের পেছনে থেকে একটা গভীর, হিমশীতল কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
— "বড় জোর কী হবে? দশটা থাপ্পড় পড়বে। আর চাইলে সঙ্গে একটা গুলিও ফ্রিতে নিতে পারো। যদিও তুমি চাইলে আরো অনেক কিছুই নিতে পারো, যেমন—সবকিছু হারানো।"
পেছন ফিরতেই প্রেয়সীর বুক ধক করে উঠল। আদ্র দাঁড়িয়ে আছে—চোখ দুটো যেন শিকারি বাঘের মতো স্থির। তার প্রতিটি শব্দে এমন এক বিষাক্ত হুমকি ছিল যে প্রেয়সীর পায়ের তলার মাটি সরে গেল। আজ আর নিস্তার নেই, সে নিশ্চিত।
প্রেয়সী ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে বোকার মতো হাসার চেষ্টা করল, "অ... মানে, না! আমি... আমি তো কিছুই বলিনি!"
আদ্র একটু এগিয়ে এল, তার ছায়া প্রেয়সীর ওপর লম্বা হয়ে পড়ল। সে নিস্পৃহ গলায় বলল, "আমি কি বলেছি তুমি কিছু বলেছ? আমি শুধু সম্ভাবনার কথা বলছি, ম্যাডাম।"
প্রেয়সী আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। তানিয়ার হাতটা সজোরে টেনে সে প্রায় দৌড়ে সেখান থেকে সরে এল। যাওয়ার সময় আদ্রর কান এলিয়ে এল প্রেয়সীর কাঁপা কণ্ঠের অস্পষ্ট আর্তনাদ। আদ্র তাদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিভরা কণ্ঠে বিড়বিড় করল, "ম্যানারলেস গার্ল।"
প্যান্ডেলের এক কোণে তানিয়ার পাশে বসে আছে প্রেয়সী। তার বুকের ভেতরটা যেন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে। সামনে মঞ্চের দিকে তাকানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই তার; আদ্র নামের সেই 'অভিশপ্ত' মানুষের মুখটা দেখলেই তার সমস্ত ধৈর্য যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়।
ঠিক তখনই রেহানা বেগম ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে এলেন। প্রেয়সী ম্যামকে দেখেই দ্রুত চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, "জি ম্যাম, বলুন?"
রেহানা বেগম চিন্তিত মুখে বললেন, "প্রেয়সী, আদ্র স্যার কি কোনো অস্বস্তিতে আছেন? উনার কি কোনো কিছুর দরকার? তুই একটু স্টেজে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আয় তো মা। চিফ গেস্ট, কোনো অসুবিধা হওয়া ঠিক হবে না।"
রেহানা বেগম চলে গেলেন, কিন্তু প্রেয়সীর পায়ের নিচে যেন মাটি সরে গেল। কান্না করার মতো অবস্থা তার। কিছুক্ষণ আগেই লোকটা তাকে অপদস্থ করেছে, আর এখন আবার তারই সামনে যেতে হবে? কিন্তু ম্যামের আদেশ অমান্য করার উপায় নেই। প্রেয়সী নিজের চোখের জল গিলে, দুবার 'বিপদমুক্তির দোয়া' পড়ে ধীর পায়ে স্টেজের দিকে এগোতে লাগল।
স্টেজে আদ্রর শাহরিয়ার আদ্র নিজের ফোনের স্ক্রিনে মগ্ন। প্রেয়সী সামনে গিয়ে কয়েকবার গলা খাঁকারি দিল। আদ্র কোনো সাড়া না দেওয়ায় সে আরেকটু জোরে আওয়াজ করল। আদ্র বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে মাথা তুলল। প্রেয়সীকে দেখেই আদ্রর চোখ দুটো ছোট হয়ে এল—এক মুহূর্ত আগের সেই রাগী মেয়েটি আবার তার সামনে! আদ্র মনে মনে অবাক হলো মেয়েটির সাহস দেখে, কিন্তু বাইরের অভিব্যক্তিতে রইল বরফের মতো শীতলতা।
আদ্র গম্ভীর স্বরে বলল, "গলা খাঁকারি দেওয়ার কি অন্য কোনো জায়গা নেই? আমার সামনে কাশতে হবে কেন?"
প্রেয়সীর মনে হলো, আদ্রর গালে এক চড় বসিয়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়। সে দাঁত চেপে, মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল, "দুঃখিত স্যার। আমি শুধু জানতে এসেছিলাম, আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না?"
আদ্র ফোনের দিকে আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, "সমস্যা হলে কী করবেন?"
প্রেয়সী নিজের রাগকে পাথরচাপা দিয়ে বলল, "আমি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব, স্যার।" (আর মনে মনে ভাবল, ‘সমাধান তো করবই, সুযোগ পেলে তিনটা থাপ্পড় মেরে আছাড় মারব!’)
আদ্র তার ফোনের দিকে তাকিয়েই খুব ধীর এবং তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, "আপনার মতো মানুষ আশেপাশে থাকলে সমস্যা তো এমনিতেই তৈরি হয়। If you know, you know. তাই দয়া করে দূরে থাকুন। তা না হলে আমার সমস্যা আর আপনার বিপদ—দুটোই নিশ্চিত।"
প্রেয়সী আর কথা বাড়াল না। রাগে তার সারা শরীর রি রি করছে। এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সে মঞ্চ থেকে নেমে এল। আদ্রর সেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথার আঘাত তার নীল শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে যেন বিষ ছড়িয়ে দিল।
কলেজের বিশাল প্যান্ডেলে যেন আগুনের কুণ্ডলী। ভ্যাপসা গরমে হাজারো মানুষের ভিড়ে দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। প্রিন্সিপাল মোশাররফ চৌধুরী মাইক্রোফোনে ক্লান্তিকর দীর্ঘ ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু প্যান্ডেলের নিচের পরিবেশটা যেন অন্য কোনো গ্রহে। কেউ তাঁর কথা শুনছে না, বরং নতুন চিফ গেস্ট আদ্র শাহরিয়ারের রূপ আর ব্যক্তিত্ব নিয়ে মেয়েদের মধ্যে এক ধরণের উন্মাদনা কাজ করছে। তাদের চোখেমুখে যেন মধু ঝরছে!
প্রেয়সী এসব দেখে ঘেন্নায় নাক সিঁটকে তানিয়াকে খোঁচা দিল।
— "তানিয়া, দেখছিস এদের কাণ্ড? চিফ গেস্ট তো নয়, যেন এদের জামাই আসছে! কতটুকু চরিত্রহীন হলে মানুষ একটা মানুষের রূপ দেখে এভাবে গলে যায়, বল তো?"
তানিয়া ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে তখন নিজের ফোনে সেলফি তোলায় ব্যস্ত। প্রেয়সী কোনো উত্তর না পেয়ে বিরক্ত হয়ে মঞ্চের দিকে তাকাতেই দেখল, আদ্র একদৃষ্টে ওর দিকেই চেয়ে আছে। সেই শীতল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে যেন কোনো অন্ধকারাচ্ছন্ন সুড়ঙ্গ আছে। প্রেয়সী সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিল, বুকটা ভয়ে ধক করে উঠল। ঠিক তখনই মঞ্চে ঘোষণা এলো, আদ্র শাহরিয়ার এবার বক্তব্য রাখবেন।
আদ্র মাইকের সামনে এসে দাঁড়াতেই প্যান্ডেলে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। কিন্তু প্রেয়সী তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল। সে কোনোভাবেই লোকটার গলার আওয়াজ আর সহ্য করতে পারছে না।
তানিয়া অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "কিরে, কোথায় যাচ্ছিস তুই?"
প্রেয়সী কপাল কুঁচকে, রাগে ফেটে পড়া গলায় বলল, "কোথায় আর যাব? তোর ওই জামাইয়ের বাড়িতেই যাচ্ছি!"
তানিয়া খিলখিল করে হেসে ফেলে বলল, "জামাই তো আমার না, জামাই তো তোরই! কিন্তু তার বাড়ির ঠিকানা তো তুই জানিস না, যাবি কীভাবে?"
প্রেয়সী তানিয়ার গায়ে চিমটি কেটে বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে বলল, "উফ! থামবি তুই? আর ফাজলামি করিস না তো! তোর ওই মহারাজার একটা কথাও আমি শুনতে চাই না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, পানি খেতে যাচ্ছি—অস্বস্তি লাগছে খুব।"
তানিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "একলা যাস না, আমিও তোর সাথে যাব। চল।"
প্রেয়সী আর তানিয়া—দুজন মিলে কলেজের প্যান্ডেল ছেড়ে ক্যান্টিনের দিকে পা বাড়াল।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর কলেজের মাঠ জনশূন্য হয়ে এসেছে। বিকেলের ম্লান আলোয় ক্যাম্পাসটা এখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ঢাকা। প্রেয়সী আর তানিয়ার হাঁটার গতি ধীর, তানিয়ার পায়ের ব্যাথাটা আজ যেন একটু বেশিই ভোগাচ্ছে।
— "তানিয়া, তুই এখানে দাঁড়া। রেহানা ম্যাম বলেছিলেন কাজ শেষ করে যাওয়ার সময় যেন একবার দেখা করে যাই। আমি ম্যামের রুম থেকে ঘুরে আসছি, তুই একটু ধৈর্য ধর।" প্রেয়সী তানিয়াকে এক জায়গায় বসিয়ে টিচার্স রুমের দিকে রওনা দিল।
টিচার্স রুমে তখন রেহানা বেগম খাতা দেখায় ব্যস্ত। প্রেয়সীকে দেখে তিনি হেসে বললেন, "সব শেষ হয়েছে তো মা?"
— "জ্বি ম্যাম, সব গুছিয়ে এসেছি। এখন কি আমরা যেতে পারি?"
রেহানা বেগম প্রেয়সীর মাথায় হাত রেখে বললেন, "অবশ্যই পারো। আজ অনেক পরিশ্রম করেছ তোমরা। সাবধানে বাড়ি যেও।"
— "জ্বি ম্যাম, ধন্যবাদ। আসছি তাহলে।"
প্রেয়সী রুম থেকে বের হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ম্যামের স্নেহ তাকে সবসময়ই মুগ্ধ করে। সে মাঠের দিকে হাঁটা দিল। মাঠের মাঝখানে হাঁটতে হাঁটতে সে নিজের শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে গিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল। হুট করেই একটা ভারী শরীরে ধাক্কা খেল সে। ভারসাম্য হারিয়ে সে যখন পড়ে যেতে লাগল, তখন এক জোড়া শক্ত হাত তাকে ধরে ফেলল। কিন্তু ধাক্কায় প্রেয়সীর কপাল আদ্রর কাঁধে সজোরে বাড়ি খেল, আর তার হাত ছিটকে গিয়ে আদ্রর কব্জি আঁকড়ে ধরল। ঝটকা লাগায় আদ্রর হাতের সেই দামী রলেক্স ঘড়িটি খুলে মাটিতে পড়ে গেল।
প্রেয়সী মাথা নিচু করে মাটিতে ঘড়িটার দিকে তাকাতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। এটা রলেক্স! সেই দামী রলেক্স! প্রেয়সীর মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না, সে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা— ইয়া আল্লাহ, এই ঘড়ির দাম দিয়ে তো আমার তিন জেনারেশনের সংসার চলে যাবে! আমি কি করলাম! রাস্তার পরে আজ আবার এই কাণ্ড! আমার দুইটা কিডনি বেচলেও তো এই ঘড়ির দাম হবে না! আল্লাহ, আমাকে এই যাত্রা রক্ষা করো!
আদ্র মেঝেতে ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়েও দেখল না। সে তার কপাল হাত দিয়ে ডলতে ডলতে গম্ভীর, কর্কশ গলায় বলল, "হয়েছে? গায়ে পড়ার আর জায়গা পাওনি? মাঝ রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে থাকো যেখানে সেখানে গায়ের উপর পড়ো তোমার দেখি সমস্যা কি সমস্যা । চোখ কোথায় থাকে তোমার?"
প্রেয়সী ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে তাকাতেই দেখল আদ্রর চোখের সেই শীতল চাহনি। আজকে সেই গুলি করার হুমকির কথা মনে পড়ে তার বুকটা ধক করে উঠল। সে জানে, এই লোকটা কতটা খারাপ হতে পারে। আদ্রর দিকে তাকিয়ে সে কুঁকড়ে গেল, মনে মনে ভাবছে, এই লোক নিশ্চয়ই তাকে এবার আস্ত রাখবে না। হয় ঠকাবে, নয়তো চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে!
আদ্র দাঁড়িয়ে নিজের ব্লেজার ঝাড়ল। তারপর প্রেয়সীর দিকে এমনভাবে তাকাল যেন সে কোনো তুচ্ছ পোকা এই মুহূর্তে তাকে পায় পিছিয়ে দিবে ।
মেয়ের মাথায় নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে, নইলে এভাবে অকারণে কেউ কাঁদে?
গত কয়েকদিন হলো লাক্সামবার্গ থেকে দেশে এসেছে রাজনীতির হাল ধরতে, তার ওপর ব্যবসার বিশাল চাপ—তার ওপর এই মেয়েটা!এমনিও তার কোন ইচ্ছা ছিল না রাজনীতিতে । বাবা নিখিল শাহারিয়ার এর জন্য রাজনীতিতে থাকতে হয়। তাই ভেবেছিল নিজেও রাজনীতির মাঠে নামবে। কিন্তু এসেই দেখে এই মেয়ে রাস্তার মাঝে সিনক্রেট করছে, এরপর আবার কলেজে গায়ের উপর পড়া পরি শুরু করছে । নিশ্চয়ই মেয়েটার মাথায় কোন সমস্যা আছে। ভদ্রই বা কেন এই মেয়ের কথা ভাবছে তাই মাথা থেকে তার ভাবনা ঝড়ে
আদ্র গম্ভীর স্বরে বলল, "উঠে দাঁড়াও, এভাবে মেঝেতে বসে আছ কেন?"
প্রেয়সী শুকনোকি এক ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "ইয়ে... মানে... ইয়ে... কি যে বলছিলাম? "
-"তোমার এই অদ্ভুত ভাষা আমি কিছু বুঝিনা। সুস্থ মস্তিষ্ক মানুষের মতো কথা বল।"
ঠোঁট ফুলিয়ে প্রেয়সী ওঠার চেষ্টা করেও পারল না, পায়ের গোড়ালিতে মোচড় লেগেছে। আদ্র এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে অকস্মাৎ প্রেয়সীকে কোলে তুলে নিল। প্রেয়সী তো স্তম্ভিত!
— "আরেহ! এটা কী করছেন? ছাড়ুন আমাকে!" সে প্রায় আর্তনাদ করে উঠল।
— "কী করছি? চোখে দেখতে পাচ্ছ না?" আদ্র নির্বিকার মুখে বলল।
— "দেখছি! কিন্তু ছাড়ুন বলছি!"
— "ছাড়লাম না, কিছুই করলাম না। আর তুমি এখন ছাড়তে বলছ? অদ্ভুত মেয়ে তো তুমি!"
কথা শেষ করে আদ্র তাকে মাটি থেকে অনেকটা ওপরে তুলে ধরে একরকম ছুঁড়েই আবার নিচে নামিয়ে দিল—তবে সাবধানেই। প্রেয়সী মাটিতে পড়ে গেলেও আদ্রর স্পর্শে তার সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে। আদ্রর এই অদ্ভুত ব্যবহার প্রেয়সীকে বাকরুদ্ধ করে দিল। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল, মুখে কুলুপ এঁটে। সবকিছু মাঝেই নীরব দর্শক হিসাবে আছে তানিয়া। কি বলবে কিছু বুঝতে পারছে না যদি কিছু করতে গেলে আরো কিছু হয়ে যায় । আদ্রর ভ্রু এখনো কুঁচকানো।
কলেজের করিডোর এখন প্রায় জনশূন্য। নিস্তব্ধতার মধ্যে প্রেয়সী মাটিতে বসে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিল, আর ঠিক তখনই দোতলার বারান্দা থেকে কিছু গ্লাস এবং অন্যান্য সরঞ্জাম নামানোর সময় একজন কর্মচারী পিচ্ছিল মেঝেতে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। গ্লাসগুলো সরাসরি নিচে প্রেয়সীর মাথার দিকে ধেয়ে এল।
প্রেয়সী চিৎকার করে চোখ বুজে ফেলল, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে এক জোড়া শক্তিশালী হাত তাকে টেনে আড়াল করল। কাঁচের টুকরোগুলো প্রেয়সীর গায়ে না লেগে আদ্রর হাতের ওপর ঝনঝন করে আছড়ে পড়ল। আদ্রর হাতের কব্জি আর তালু থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরতে শুরু করল।
প্রেয়সী চোখ খুলে দেখল, আদ্র তাকে বাঁচানোর জন্য তার হাতটি পেতে দিয়েছিল, আর এখন সেই হাত দিয়ে টাটকা রক্ত ঝরছে। আদ্রর চোখে কোনো যন্ত্রণার ছাপ নেই, যেন এটা তার নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু প্রেয়সীর চিৎকার আর আদ্রর হাতের অবস্থা দেখে সে দিশেহারা হয়ে পড়ল।
— "আপনি... আপনার হাত থেকে রক্ত পড়ছে!" প্রেয়সী আদ্রর হাত টেনে ধরে পাশের একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল।
দ্রুত পায়ে প্রেয়সী কলেজের সিক-বে (Sick Bay) বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছুটে গেল। ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে যখন সে ফিরে এল, আদ্র তখনো সেই শীতল দৃষ্টিতে প্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে আছে। প্রেয়সীর হাত কাঁপছে। সে একটা চেয়ার টেনে আদ্রর মুখোমুখি বসল। তুলোয় স্যাভলন লাগিয়ে খুব সাবধানে সে আদ্রর ক্ষত পরিষ্কার করতে শুরু করল। আদ্রর ব্যক্তিত্বের কঠোরতা যেন প্রেয়সীর হাতের মৃদু স্পর্শে কিছুটা স্তিমিত।
ঠিক সেই মুহূর্তে আদ্রর ব্যক্তিগত অ্যাসিস্ট্যান্ট শুভ হাতে কিছু ফাইল নিয়ে ঘরে ঢুকল। আদ্রর হাতের রক্তমাখা অবস্থা দেখে সে এক পা এগোতেই আদ্র হাত তুলে ইশারায় তাকে থামিয়ে দিল। শুভ বুঝতে পারল এখন আদ্র একা থাকতে চায়, সে নিঃশব্দে এক কোণায় সরে দাঁড়াল।
প্রেয়সী নিচু স্বরে, খুব শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, — "জ্বলছে?"
আদ্র এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর যেন শান্ত জলের মতো। — "না।"
প্রেয়সীর মনোযোগ এখন শুধু ব্যান্ডেজ বাঁধার দিকে। কাজ করার সময় প্রেয়সীর কপালে ঝুলে পড়া কিছু অবাধ্য চুল তার চোখের সামনে চলে এল। আদ্র অদ্ভুত এক আবেগে নিজের আঙুল দিয়ে প্রেয়সীর সেই চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে কানের পেছনে গুজে দিল।
আদ্রর হৃদপিণ্ড তখন অন্য কোনো গতিতে ছুটছে। এমনটা কখনো হয়নি। মা ছাড়া আজ পর্যন্ত কোনো নারী তার এত কাছে আসেনি, এত যত্ন করেনি। বছরের পর বছর সে নারীদের শুধু বিশ্বাসঘাতকতার চোখেই দেখেছে—যার মূলে ছিল তার মায়ের কাজের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি আর অবহেলা। সেই আদ্র শাহরিয়ার আজ প্রেয়সীর হাতের ছোঁয়ায় নিজের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ট্রেন যখন স্টেশনে আসার আগে যেমন গতি পায়, আদ্রর বুকের ভেতরটাও ঠিক তেমন একটা উত্তেজনার ঢেউ খেলে যাচ্ছে।
কেন এই মেয়েটি তার জীবনের সব হিসেব ওলটপালট করে দিচ্ছে? কেন এই দংশিত হৃদয়ে আজ একটু শান্তির হাওয়া? আদ্রর কাছে কোনো উত্তর নেই। সে শুধু দেখল, প্রেয়সী এখনো মাথা নিচু করে খুব যত্ন নিয়ে তার হাতটা ব্যান্ডেজ করছে। এই মায়াবী স্পর্শে যেন আদ্রর ভেতরকার সমস্ত বিষাক্ত অভিমানগুলো একমুহূর্তে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে।
চলবে....