বিয়ের শুভক্ষণে ঘোমটার আড়াল থেকে যদি কোনো মেয়ে দেখে, যাকে স্বামী রূপে গ্রহণ করতে চলেছে, সে একজন মানসিক সমস্যায় ভোগা। তবে সেই মেয়ের মনের অবস্থা ঠিক কীরূপ হয়ে ওঠে?
চোখের সামনেই যার সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, তারই দু’হাত আবদ্ধ লোহার শিকলে!
- -
লাল বেনারসি শাড়িতে সজ্জিত হয়ে ফুলসজ্জার ঘরে, নিঃশব্দে বসে আছে নীলাদ্রিতা তালুকদার। ঘোমটার আড়াল থেকে সে ক্ষোভে ফুঁসে উঠছে এই ভেবে তাকে মামী একজন মানসিক রোগীর সাথে জোর করে বিয়ে দিলো। দুইদিন হয়ে গেলো এখনো লোকটির চেহারা পর্যন্ত দেখতে পেলো না।
হঠাৎ করে রুমটা ঘুটঘুটে ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায়। বোধহয় বিদ্যুৎ চলে গেলো।নীলাদ্রিতা ঘোমটার আড়ালে হচকচিয়ে উঠে চারিদিকে ভয়ার্ত দৃষ্টি বুলায়। সে প্রচন্ড রকমের অন্ধকার কে ভয় পায় তাই ভয় এড়াতে হাঁটুতে মুখ গুঁজে দেয় সঙ্গে সঙ্গে।
আর ঠিক তখনি জানালার ফাঁক গলে নিভু নিভু আলো রুমের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। মূহুর্তেই রুমের চারিপাশ আলোয় ভরে উঠেছে।
খানিকটা আলো গাঁয়ের উপর পড়তেই নীলাদ্রিতা ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাতেই বিস্ময়ে অবাক হয়ে যাই।
কেননা তার শরীরের চারপাশে উজ্জ্বল জোনাকি পোকারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। জোনাকি পোকার আলোয় পুরো অন্ধকার ঘরটি আলোকিত হয়ে জ্বল জ্বল করছে। জানালা খোলা থাকায় চাঁদের আলোর ছটাও ধীরে ধীরে রুমে ঢুকছে।
এসব দেখেই নীলাদ্রিতার ঠোঁট কোনে ফুটে উঠলো মৃদু হাসি। কিন্তু তার হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। সেই মুহূর্তেই ঘর ভেদ করে ভেসে এলো এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
"এই মেয়ে! কে তুমি? আমার রুমে কী করছো?”
কথাটা শুনেই নীলাদ্রিতার বুক ধড়ফড় করে উঠলো। ঠের জানে তার বিয়ে করা বর এসেছে, পাশাপাশি সদ্য বিয়ে করা স্বামীর মুখে এমন কথা শুনে সে পুরোই স্তব্ধ হয়ে গেলো।
মানলো সে, লোকটার বয়স বেশি। এটাও মানলো যে লোকটার মানসিক সমস্যা রয়েছে কিন্তু তা বলে সদ্য বিয়ে করা বউকে ভুলে যাবে?এটা কেমন ছেলেরে বাবা!
গ্ৰামীণ পরিবেশে বেড়ে উঠা নীলাদ্রিতার জীবন। ছোট্ট বেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছি।
পরিবারের সদস্য বলতে তার আর কেউ ছিলো না। তাই মামা-মামির সংসারে বড় হয়েছে সে।
গরীব ঘরের হওয়ায় মামী এইচএসসি পরীক্ষার পর পর'ই নীলাদ্রিতার মতামত না নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিয়েছে। এমনকি বিয়ের সময় ছেলের চেহারাটা পর্যন্ত দেখে নি। রীতিমতো তার উপর এক জুলুম করে ছাড়লো।
সে মাথা উঁচিয়ে দরজার পানে ঘোমটার আড়াল থেকে তাকালো। চাঁদের আলোয় লোকটাকে আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে।
" কানে শোনো না তুমি? অস'ভ্য মেয়ে আমার বিছানা থেকে নামো , নামো বলছি!"
নক্ষত্রের বজ্রকণ্ঠে নীলাদ্রিতা মূহূর্তেই লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ে। তারপর সে ধীরে ধীরে নক্ষত্রের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
ঘোমটার আড়াল থেকে আস্তে করে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলো সদ্য বিয়ে করা তার বরটাকে। লোকটা বেশ লম্বা হওয়ায় তাকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তবুও সে, চাঁদের ছটা আলোয় একদম আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো যেনো।
দীর্ঘ লম্বা এক উজ্জ্বল বর্ণের ছেলে, চোয়ালে ক্লিন সেভ না তবে ছোট ছোট দাড়ি রয়েছে। আর ঠোঁটের উপরে লম্বা একটা গোঁফ।
অস্পষ্ট হলেও নীলাদ্রিতা ঠিকই দেখতে পেলো লোকটার চুল গুলো বাবরি ওয়ালা। ঘাড় ছুঁই ছুঁই সমান সোজা চুল।
স্পষ্ট দেখতে না পাওয়ায় সে আলতো হাতে ঘোমটা টা একটু উপরে তুললো, তারপর এক চোখ বন্ধ করে অন্য চোখ দিয়ে গাঢ় দৃষ্টিতে পরখ করে এবার , যাকে বলে কানা চোখে।
ঘাড়ের দিকে ছোট্ট করে কী একটা চিহ্ন তাও সবুজ রঙের, গলায় কিসের এক রুপালি একটি চেইন।যা ভীষণ চক চক করছে।
চোখ গুলো কেমন যেনো তা ঠিক বুঝতে পারছে না,কারণ কপালের উপর লেপ্টে থাকা ছোট ছোট চুলের কারণে চোখ গুলো ঢেকে আছে।
নক্ষত্র কে দেখা শেষ হয়ে গেলে সে মনে মনে বিড়বিড় করে নিজেকে প্রশ্ন করে,
" এ্যা মা, এটা কী হলো? মামি তো বলেছিলো বুড়ো লোক, পেটের ভুঁড়ি ও তো নাই দেখছি।কিন্তু উনি তো একেবারে জোয়ান ছেলে-পুলে।"
নীলাদ্রিতা এখনো নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবতে থাকে।
আর তখনি নক্ষত্র নিচু হয়ে তাকায় তার দিকে। দেখতে পায় একটি ছোট্ট খাটো মেয়ে যে ঘোমটার আড়ালে রয়েছে।
কিন্তু আবারো তাদের চারি পাশে জোনাকি পোকারা ঘুরঘুর করছে তাদের আলোয় আলোকিত করার জন্য। মুহূর্তটা বোধহয় কিছু সময়ের জন্য এইভাবেই থেমে গেলো। ভাবুন তো একবার নব দম্পতি; চাঁদের আলোর ছটায় তাদের চারিপাশ জোনাকিরা ঘুরঘুর করছে।
ব্যাপারটা নীলাদ্রিতার ভালো লাগলেও রগচটা নক্ষত্রের মোটেও পছন্দ নয়।
জোনাকি পোকা দেখার সাথে সাথে নক্ষত্রের কিছু পুরানো অস্পষ্ট স্মৃতি মনে পড়তেই সে মাথা চেপে ধরলো তীব্র যন্ত্রণায়।
কিছু স্মৃতি, কিছু ভয়ঙ্কর অতীত চোখের সামনে ভাসতেই শরীরের প্রতিটি রগ ভীষণ রকমের ফুলে ফেঁপে উঠেছে।
পরক্ষণেই তার রক্তিম চোখজোড়া গেঁথে গেলো নীলাদ্রিতার দিকে। সে কেমন যেনো মুহুর্তের মধ্যেই পাল্টে যায়। ঠিক যেভাবে গিরগিটি তার রং পাল্টায়।
নক্ষত্র দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এগিয়ে এলো নীলাদ্রিতার দিকে।
আচমকা নক্ষত্রের এমন ভয়ঙ্কর রুপ এবং কাছে আসতে দেখে নীলাদ্রিতা পিছু হটতে থাকে। হটতে হটতে সে শক্ত দেয়ালে গিয়ে ঠেকলো।
দেয়ালে ঠেকার সাথে সাথে তার শরীরে লেগে থাকা জোনাকি পোকা গুলো আবারো চারিদিকে উড়ে বেড়াচ্ছে।
নক্ষত্র হিংস্র হায়েনার মতো সব জোনাকি পোকা গুলোকে এক এক করে হাতের তালুতে চেপে ধরে মে"রে ফেলে।
কিছুক্ষণ আগেই আলোকিত হওয়া রুমটা ধীরে ধীরে আবারো ঘন অন্ধকারে নেমে এসেছে।
নিষ্পাপ জোনাকি পোকা গুলোর অবস্থা দেখে নীলাদ্রিতা ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে আওয়াজ করলো,
"ওদের মেরে"ছেন কেনো? "
চাঁদের আলোও কমে আসার কারণে ততক্ষনে চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেছে।
নীলাদ্রিতা ভয়ে আবারো দেয়ালের সাথে লেগে যায়। এক পা এক পা করে নক্ষত্র এগিয়ে আসলো তার সন্নিকটে। ভ্রূক্ষেপ ছাড়াই এক ঝটকায় নীলাদ্রিতার কোমর আঁকড়ে ধরে, নখ দাবিয়ে দিলো তার উন্মুক্ত কোমড়ের নরম মাংসে।
এবং অন্য হাত দিয়ে তার গলা শক্ত করে চেপে ধরলো।
" আমার রুমে জোনাকি পোকা কে এনেছে? আনসার মি।"
নক্ষত্র নীলাদ্রিতার গলা এমন ভাবে চেপে ধরেছে যে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হলো। গলা কাটা মুরগীর মতো নীলাদ্রিতা ছটফট করতে থাকে ছাড়া পাওয়ার জন্য। কিন্তু নক্ষত্র তাকে ছাড়ে না, বরং সমানে'ই গলা চেপে ধরে রেখেছে।
" আমার রুমে জোনাকি পোকা কে এনেছে বলো নাহলে আজ তোমাকে এখানেই মেরে ফেলবো।"
নীলাদ্রিতা একহাত দিয়ে নক্ষত্রের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং বহু কষ্ট করে বলে উঠলো
" জানা..লা খোলা ছিলো....।"কিন্তু দম বন্ধ হয়ে আসার কারণে আর বলতে পারলো না। কিন্তু না পাগল লোকটা নীলাদ্রিতা'কে ছাড়ছে না কিছুতেই। এমনিতেই তার অন্ধকারে প্যানিক এ্যাটাক হয় তার উপর আবার এই জলহস্তী এসে জুটেছে।
" হাতি'রে আমি আপনার বিয়ে করা বউ,ছাড়েন আমাকে।"
নক্ষত্র যেনো আরো ক্ষেপে গিয়ে আরেকটু জোর দিয়ে নীলাদ্রিতার গলা চেপে ধরলো। ততক্ষনে বিদ্যুৎ ও আসলো আর বাড়ির অন্য সদস্যরা চলে আসলো। কিন্তু তারা আসতেই হতভম্ব হয়ে যাই। নক্ষত্রের দিদা সাথী চোধুরী ততক্ষনাৎ নীলাদ্রিতা কে ছাড়াতে গেলেই নক্ষত্র এক ধাক্কায় সাথী চৌধুরীকে ফেলে দেন।
নীলাদ্রিতা শ্বাস নিতে না পেরে চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে নিজেকে বাঁচানোর জন্য চারিদিকে চোখ বুলায় হঠাৎ পাশেই সে একটি ফুল-দানি দেখতে পায়। এবং কোনো আগ পিছ না ভেবে হাত বাড়িয়ে বহু কষ্টে ফুলদানি তুলে নিয়ে সোজা নক্ষত্রের মাথায় জোরে আঘাত করে বসলো।
সাথে সাথে নক্ষত্র দূরে ছিটকে যাই এবং মাথা চেপে ধরে। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ওদের দুজনের দিকে। নীলাদ্রিতা ছাড়া পেয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে রাগে তার মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। লোকটার সাহস কতো নীলাদ্রিতার গলা চেপে ধরেছে নীলাদ্রিতার?
এইদিকে নক্ষত্র ধীরে ধীরে সেন্সলেস হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তার কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সবাই ভয়ার্ত হয়ে তড়িঘড়ি করে নক্ষত্রের কাছে ছুটে যাই। ঘটনাটা এতো তাড়াতাড়ি হয়ে গেলো যে কেউ কিছু্ই বুঝে উঠতেই পারলো না।
———————
তখন মধ্যরাত বাইরে হালকা তৌফান হচ্ছে হয়তো কিছুক্ষণ এর মধ্যে বৃষ্টি নামবে। ডাক্তার এসে নক্ষত্রের মাথায় ব্যান্ডেজ করে দেয়, ধীরে ধীরে নক্ষত্র চোখ খুললো ।সে মাথা চেপে ধরে চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে। তার চারপাশে সবাইকে দেখে সে কিঞ্চিত আশ্চর্য হয়। সে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করে,
" তোমরা সবাই মিলে আমার রুমে কী করছো?"
কথাটি বলতে বলতে সে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। মাথা টা ব্যাথায় টনটন করছে।
" আমার রুমে আসার সাহস হলো কী করে তোমাদের?"
নক্ষত্রের হঠাৎ নজরে আসে দরজা পাশে একটা ছোট্ট মেয়ে নিজেকে ঘোমটার আড়ালে ঢেকে রেখেছে। নক্ষত্রের মনে পড়লো দিদার জোরাজুরিতে এই মেয়েকে বিয়ে করতে বাধ্য হলো সে কিন্তু মাথায় আঘাত পেলো কী করে?
সাথী চৌধুরী চিন্তিত হয়ে নক্ষত্রের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করতে থাকে
" দাদুভাই এখন কেমন লাগছে তোর?"
নক্ষত্র মাথা দুলিয়ে বলল " ঠিক আছি, তুমি এদের সবাইকে রুম থেকে যেতে বলো ।"
কিন্তু হঠাৎ করে কোথা থেকে যেনো নক্ষত্রের সৎ মা এসে নীলাদ্রিতার চুলের মুঠি ধরে নক্ষত্রের সামনে এনে রুষ্ট কন্ঠে বললো,
" অসভ্য মেয়ে শ্বশুড় বাড়িতে আসতে না আসতেই অলক্ষীর মতো কাজ করে ফেলেছে। ফুল সজ্জার রাতেই স্বামীর গায়ে হাত তুলে দিলো। "
কথাটি বলে জোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয় নীলাদ্রিতার গালে। এইদিকে সাথী চৌধুরী রেগে গিয়ে সাবধান বাণী ছুড়লেন,
"পারমিতা!.... তুমি মেয়েটাকে এইভাবে মারছো কেনো ওর দোষ কোথায়?"
নক্ষত্র রেগে গিয়ে জোরে চিৎকার করে উঠলো,
" সাট আপ ...আমি আগেও বলেছি এখনো বলছি আমি এই বিয়ে মানবো না।এই মেয়েকে আমার সহ্য হবে না তুমি ওকে পাঠিয়ে দাও ওর বাড়িতে।"
নীলাদ্রিতা বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে থর থর করে কেঁপে উঠলো। মামার বাড়িতে গেলে তো মামী তাকে আস্ত রাখবে না। আবারো দিনরাত অত্যচার করবে।
সাথী চৌধুরী তীক্ষ্ণ চাহনি নক্ষত্রের উপর নিক্ষেপ করে বলে উঠেন,
" নক্ষত্র তুমি আমাদের এগ্ৰিমেন্ট এর কথা ভুলে যাচ্ছো বোধহয়?"
নক্ষত্র পেন্ট এর পকেটে হাত গুজে ঠোঁট নাড়িয়ে বলে, " সো হোয়াট? বিয়ে করেছি তো। মেয়েটাকে এখানে রাখার দরকার নেই ওর বাড়িতে দিয়ে আসো। এগ্ৰিমেন্ট এর তারিখ শেষ হলে সোজা ডিভোর্স। আপাতত ওকে এই বাড়ি থেকে বের করে দাও, রাইট নাও।"
" নক্ষত্র ও এখান থেকে কোথাও যাবে না।"
" ঠিক আছে দিদা তুমি যখন পারবে না তখন আমি এই গায়ে মেয়েটাকে বাইরে ফেলে দিয়ে আসছি।"
কথাটি বলে এক ঝটকায় নীলাদ্রিতার হাত তার হাতের মুঠোয় বন্দি করে নেয় এবং টান দিয়ে ওকে সোজা টেনে নিয়ে যেতে থাকে। নীলাদ্রিতা কান্না করার বদলে মনে মনে বিরবির করে,
" ফুলদানি না দিয়ে পাথর দিয়ে আঘাত করা উচিত ছিলো, পাষান্ড লোক একটা।"
নক্ষত্র চৌধুরী নিবাসের গেইট পেরিয়ে বাইরে ধাক্কা মেরে ছুড়ে ফেলে দেয় নীলাদ্রিতাকে। নক্ষত্রের ধাক্কাতে নীলাদ্রিতা সোজা রাস্তায় গিয়ে পড়ে এবং তার হাত ছিলে যাই।
" এখান থেকে চলে যাও মেয়ে। এই বাড়ি তোমার জন্য নয়।"
কথাটি বলে নক্ষত্র আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে না থেকে সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। তখন ঝুম ঝুম করে বৃষ্টি নেমে আসে ধরণীতে। নীলাদ্রিতা ঘুমটা তুলে একবার চারিদিকে চোখ বুলায়।সে এখন কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে?এখানে যে কেউ তার নেই।
নক্ষত্র রুমে মাথা চেপে ধরে বসে থাকলো। এই বাংলাদেশের মাটি তাকে কিছু দিতে পারি নি শুধু কেড়ে নিয়েছে। সে আসতে চায় নি তবুও সেই কালো অতীত যে তাকে বারবার এই মাটিতেই টেনে আনে।
এইভাবে অনেকক্ষন কেটে গেছে, বৃষ্টি যেনো আরো বেড়ে গেলো। সাথী চৌধুরী শেষ বার এর মতো নক্ষত্রের রুমে এসে দরজায় টুকা দেয়। নক্ষত্র তখন সোফায় হেলান দিয়ে বসে ছিলো। কিন্তু বারবার দরজায় টুকা পড়ার কারণে বিরক্তিতে দরজা খুলে দেয়।
" কী হয়েছে দিদা?"
সাথী চৌধুরী কাতর কন্ঠে বলতে থাকে,
" মেয়েটা ছোটো এখনো ট্রাই টু আন্ডার স্টেন্ড, এতো বৃষ্টির মাঝে ও কোথায় যাবে?"
নক্ষত্র টাউজার এ পকেটে হাত গুজে দিয়ে ভাবলেশহীন ভাবে জবাব দেয়,
" যেখানে যাক তাতে আমার কী?"
সাথী চৌধুরীর হয়তো এখন একটু রাগ হচ্ছে তাই তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন,
" এগ্ৰিমেন্ট এ লেখা ছিলো তুমি মেয়েটাকে এই বাড়িতে থাকতে দিবে। অন্যথায়....!!"
বাকী কথা না বলে সাথী চৌধুরী ভ্রু উচিয়ে নক্ষত্রকে কিছু মনে করিয়ে দিতে থাকে।
সাথী চৌধুরী আর দরজায় দাঁড়ালেন না কারণ তার কাজ হয়ে গেছে। যেতে যেতে তিনি নিশানায় আর একটু ঢিল ছুড়ে বললেন,
" আর যাই হোক এতোটাও কঠোর হয়ো না নক্ষত্র।"
তিনি আবারো একবার নক্ষত্রকে পিছু ফিরে দেখলেন এবং মুচকি হেসে মনে মনে বললেন,
" মেয়েটাকে যে আমাদের ভীষণ প্রয়োজন নক্ষত্র।"
এইদিকে নক্ষত্রের রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে। সে ফুঁসতে ফুঁসতে রুমের সব জিনিস পত্র তৎনচ করে দিতে থাকে।
" বেইমান, সবাই বেইমান।"
রাগান্বিত দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে নিজেকে সংযত করতে থাকে।প্রায় অনেকক্ষণ রুমে পায়চারি করার পর রুম থেকে বেরিয়ে যায় ছাতা নিয়ে। গটগট পায়ে গেইট খুলে রাস্তার চারপাশে খুঁজতে থাকে নীলাদ্রিতাকে।
কিন্তু মেয়েটাকে কোথাও নজরে আসছে না। হঠাৎ নক্ষত্রের চোখ যায় বাড়ির বাইরের কর্ণারে একটা ছাউনিতে মেয়েটা গুটিশুটি হয়ে বসে আছে। নক্ষত্র আর কোনো কথা না ভেবেই সেদিকে অগ্ৰসর হয়।
অপরদিকে নীলাদ্রিতা শীতে কাপাকাপি করছে আর বিরবির করে মনে মনে নক্ষত্র কে গালি দিচ্ছে,
" শা'লা হাতি একবার বাড়িতে ঢুকতে পারলে তোর সব হাড্ডি আমি এক এক করে ভাঙবো দেখে নিস।"
ততক্ষনে নক্ষত্র নীলাদ্রিতার কাছে চলে আসে। কাঁপতে থাকা মেয়েটির দিকে ছাতা বাড়িয়ে দিয়ে তার গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে রুষ্ট কন্ঠে বলে,
" উঠো।"
নীলাদ্রিতা কাঁপতে কাঁপতে চোখ তুলে তাকায়। লোকটা এতো লম্বা যে তাকিয়ে থাকতেও তার ঘাড় মট মট করে উঠে ব্যাথা পর্যন্ত হয়ে যায়। নক্ষত্র পকেটে হাত গুজে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে আর নীলাদ্রিতার এতোক্ষণে জমে রাখা রাগ সব যেনো ফুঁসে উঠলো। তার তেজ এর পরিসীমা যেনো অনেক উর্ধ্বে সে কিছুতেই উঠবে না, বসে থাকবে সারারাত এখানে।
নক্ষত্র কপালে গুনে গুনে তিনটে ভাঁজ পড়ে সে এইবার বিরক্ত ভঙ্গিতে নীলাদ্রিতার দিকে তাকায়।
" কানে শুনতে পাও না? উঠো।"
" কী উঠো করছেন তখন থেকেই। আপনার কোলে উঠবো,উঠি?"
নক্ষত্র চোখ লাল করে নীলাদ্রিতার দিকে তাকায়। তখনি হঠাৎ আকাশ চিরে কোথাও বিকট শব্দে এক বাজ পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে নীলাদ্রিতা এক দৌড়ে উঠে বসে নক্ষত্রের গা ঘেঁষে দাঁড়ালো।
নক্ষত্র এইবার তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভয়ার্ত মেয়েটাকে আপাদমস্তক দেখছে।
দুধে আলতা গায়ের রঙ, নাকটা সুরু চিকন, ঠোঁট গুলো একদম টকটকে লাল। নক্ষত্রের দৃষ্টি আটকে গেলো নীলাদ্রিতার থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে। মেয়েটার ঠোঁট কোনে একটি কুচকুচে কালো তিল। বৃষ্টির পানির ফোঁটায় তিলটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠছে।
নক্ষত্র চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে, " চলো "
নীলাদ্রিতা এইবার কিছুটা শান্ত হয় । আস্তে আস্তে নক্ষত্রের থেকে দূরে সরে গিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়ালো। তবুও যেনো তার এক বিন্দু জেদ কমলো না।
" আমি যাবো না।"
" এই মেয়ে আমার রাগ বাড়ছে কিন্তু এইবার। এমন এক থাপ্পর দিবো না কান ফেটে রক্ত গলগলিয়ে পড়বে।"
নীলাদ্রিতা মুখ বেকিয়ে বলে উঠে,
" হু? কী বললেন আমাকে মারবেন? এই নীলাদ্রিতাকে! এই যে হাম্বা, আমাকে মারা এতো সহজ না। আমাকে মারতে এলে না আপনাকে ডান্ডা দিয়ে মেরে ঠান্ডা করে দিবো একদম।"
নক্ষত্র পরেছে এক মুশকিল এ কি জন্য এসেছে এই বিয়াদপ মেয়েকে আনতে কে জানে। অতঃপর সে কিছু না ভেবে এক ঝটকায় নীলাদ্রিতাকে কাঁধে তুলে নেয় এবং বড় বড় পা ফেলে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে।
এইদিকে নীলাদ্রিতা ছটফট করতে থাকে আর নক্ষত্রকে অনবরত কিল ঘুষি মারতে থাকে।
" ছাড়ুন বলছি।"
কিন্তু নক্ষত্র থামে না সে সোজা রুমে গিয়ে ধপাস করে ফ্লোরে নীলাদ্রিতাকে ফেলে দেয়।নীলাদ্রিতা বেশি না হলেও একটু ব্যাথা পেয়েছে কোমড়ে। কিন্তু সে কী বসে থাকার মেয়ে এক ঝটকায় উঠে হামলা করে বসলো নক্ষত্রের ঘাড়ে। নরম মাংস সব গজগজে দাঁত বসিয়ে দেয়।
" আহ্, এই ডাকিনী ছাড় আমায়"
নীলাদ্রিতা একদম একটা শক্ত পোক্ত কামড় বসিয়ে তারপরই যেনো ক্ষ্যান্ত হয়।
নক্ষত্র ও কম কিসে সে ফটাফট এক জোরদার থাপ্পড় বসিয়ে দেয় নীলাদ্রিতার নরম তুলতুলে গালে। নীলাদ্রিতা ও পিছপা হয় না সে এক ঘুসি বসিয়ে দেয় নক্ষত্রের চোখে।
" কী লাগলো তো এইবার জয়েন্টে জয়েন্টে-পয়েন্টে পয়েন্টে।"
নক্ষত্র চোখ চেপে ধরে বহু কষ্টে উচ্চারণ করে,
" বোইন মাফ চাই তোর কাছে, আমার থেকে দূরে থাক"
নীলাদ্রিতা বুক ফুলিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নেয় " শা'লা উগান্ডা প্রথমে তো আমাকে গলা টিপে ধরলেন তারপর আবার থাপ্পড় ও দিলেন। আপনার সব পাগল'পনা আমি ছুটিয়ে দিবো একদম।"
নক্ষত্র মুখ দেখার মতো সে মনে মনে বিরবির করে,
" দিদা এই তুমি কোন ধানী লঙ্কা কে নিয়ে আসছো। এই মেয়ের সাথে বেশি না একদিন থাকলে আমি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাবো, কী মেয়েরে বাবা।"
কিন্তু নজর আটকে গেলো নীলাদ্রিতার ভেজা শরীরে। শাড়িটা একদম লেপ্টে আছে শরীরের সাথে তাই শরীরের প্রতিটি ভাঁজ এখন নক্ষত্রের সামনে স্পষ্ট। নীলাদ্রিতার কোঁকড়া কোঁকড়া লম্বা চুল গুলো ওদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে।
নক্ষত্র অন্য দিকে চোখ ঘুরিয়ে মনে মনে আওড়ায়, " হটি কোঁকড়ালি।"
কিন্তু গলা খাঁকরি দিয়ে বলল, " নিজেকে সামলে রেখো, পুরুষ মানুষের নজর কিন্তু ভালো না।"
নীলাদ্রিতা এক পলক নিজের দিকে তাকিয়ে অন্য দিকে ঘুরে যায়। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে আওড়ায়,
" বেহায়া পুরুষ, কী লুচ্চারে বাবা।"
#নীলাক্ষত্র
#প্রিয়ন্তিকা_প্রিয়ন্তী
#সূচনা_পর্ব
#চলবে__