#নীলাক্ষত্র
#প্রিয়ন্তিকা_প্রিয়ন্তী
পর্ব:৩
নীলাদ্রিতা স্বভাবতই ভীষণ ছটফটে, কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে এসে কোথায় কী করবে তা ভেবে সে একেবারেই দিশেহারা। এতক্ষণে যদি মামীর বাড়িতে থাকত, তবে সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে পানি সবই গুছিয়ে প্রস্তুত করে ফেলতো। অথচ এখানে সে যেন অসহায়; কী করা উচিত, কী করা অনুচিত।কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
হচকচাতে হচকচাতে সে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে। গতকাল ঠিক সন্ধ্যার মুখে এই বাড়িতে প্রবেশ করেছিলো, ফলে বাড়ির রূপ-রস আসলে ভালো করে দেখা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এখন সে বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে চারপাশে তাকিয়ে থাকে।
এ যেন চোখের সামনে বিস্তৃত এক বিশাল অট্টালিকা! তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো ঘুরে ফিরেই সে বারবার একই জায়গায় এসে পড়ছে। এতো বড় বাড়িতে কোথাও যেনো সে স্থির থাকতে পারছে না।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার সামনে দিয়ে একটি মেয়ে হেঁটে যায়। নীলাদ্রিতা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। হাঁটু পর্যন্ত ছোট প্যান্ট, নাভীর ওপর অবধি উঠে আসা পাতলা গেঞ্জি।এই বেশভূষা দেখে নীলাদ্রিতার বিস্ময়ের সীমা থাকে না। সে সোজা মেয়েটির সামনে এসে দাঁড়ায়।
" এ্যাঁ মা আপনার বাকী কাপড় কোথায়? কেউ ছিঁড়ে নিয়ে গেছে নাকী?"
মেয়েটি মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে এইবার নীলাদ্রিতার দিকে চোখ পড়ে। নীলাদ্রিতার পা থেকে মাথা পর্যন্ত আপাদমস্তক পরখ করে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে,
" সামনে থেকে সরে যাও।"
কিন্তু নীলাদ্রিতা সরতে পারে না। বরং কৌতূহলে মেয়েটির চারপাশে গোল গোল ঘুরতে ঘুরতে বলে,
" বলুন না আপনার বাকী অংশ কোথায় গেলো?"
মেয়েটি এইবার বোধহয় কিছুটা রেগে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো " এইটা ফ্যাশন ইডিয়েট।"
আর ঠিক তখনি গোলাপি দৌড়াতে দৌড়াতে তাদের দিকে এগিয়ে আসলো। মেয়েটি গোলাপি কে দেখে নির্বিকার ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করে, "এই মেয়েটা কে? "
গোলাপি তার বেনি দুলাতে দুলাতে বলল,
" আরে এইটা আমাদের নক্ষত্র স্যারের বউ।"
মেয়েটি যেনো এক মুহূর্তের জন্য চমকে গেলো, " ওহ্! তাই নাকী?"
এরপর সে নীলাদ্রিতার চারপাশে ধীরে ধীরে ঘুরে, গাঢ় ও অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকে পর্যবেক্ষণ করে। অতঃপর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি এঁটে কোমর দুলিয়ে সামনে দিকে হেঁটে যায়।
এই স্বল্প সময়েই নীলাদ্রিতা মেয়েটির চলন-বলন ও কথাবার্তার ভঙ্গি গভীরভাবে লক্ষ্য করে। তার কাছে মেয়েটিকে কেমন যেন অস্বস্তিকর ও অদ্ভুত বলে মনে হলো। সে কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে গোলাপির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,
" এই কোমর দোলানি'টা কে?"
গোলাপি জিভের ডগা কামড়ে ধরে বলল,
" ইসস! খাইছে রে কেউ শুনলে খবর আছে তোমার। ওইটা শিলা ম্যাডাম, নক্ষত্র স্যারের সৎ বোন।"
হঠাৎ নীলাদ্রিতা ফিক করে হেসে উঠলো।
" শিলা? হা হা..."
গোলাপি ঠোঁট টেনে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল " হ তাতে কী হয়েছে?"
নীলাদ্রিতা চোখ টিপে দুষ্টু হাসি হেসে বলে,
"কিছু না। আচ্ছা, তোমার নাম কী?"
এইবার গোলাপি কিছুটা খুশি হয়ে নিজেকে ঠিক করতে থাকে। চুলে হাত বুলিয়ে, ওড়না ঠিক করে বলল
" আমি গোলাপি,খাই শুধু জিলাপি।"
নীলাদ্রিতা বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকে। এই বাড়িতে পা রাখার পর থেকেই সে একের পর এক বিচিত্র মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। কিন্তু এই প্রথম বোধহয় নিজের মতোই চঞ্চল, প্রাণচঞ্চল কাউকে খুঁজে পেয়েছে।
কিন্তু ততক্ষনে ওপাশ থেকে গোলাপির ডাক পড়লো এতেই গোলাপি ভয় পেয়ে নীলাদ্রিতার হাত টেনে তাকে নিয়ে যায় যেতে থাকে।
" আরে আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো জিলাপি থুক্কু গোলাপি?"
গোলাপি কোনো কথা না বলে তাকে ড্রয়িং রুমে নিয়ে আসে। যেখানে সবাই উপস্থিত ছিলো। নীলাদ্রিতা পুরোই অবাক এতো বড়ো টেবিল। সে বিস্ময়ে তাকিয়ে তো আছে কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয় ও করছে। সে যতোই দুষ্টু এবং ফাজিল মেয়ে হোক না কোথাও না কোথাও সে একটু ভয়'ই পায়।
সে যাই হোক গোলাপি তাকে ড্রয়িং রুমের পাশে নিয়ে আসে। নীলাদ্রিতার এইদিকে মন নেই তার তো পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। কিছু যদি পেটে না দেয় তাহলে ইঁদুর গুলো শান্ত হবে না যে। নীলাদ্রিতাকে দেখে সাথী চৌধুরী এগিয়ে আসলেন।
" এসো তুমি...."
নীলাদ্রিতা চুপচাপ ওনার পেছন পেছন ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে আসলেন। মস্ত বড় এবং লম্বা টেবিলে শুধু গুটিকয়েক মানুষ ই তার নজরে আসলো। সাথী চৌধুরী নীলাদ্রিতাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। প্রথমেই পারমিতা চৌধুরীর দিকে ইশারা করে বললেন,
" তোমার শাশুড়ি এইটা নিশ্চয় জানো?"
নীলাদ্রিতা দুই হাত জোড় করে একটু মুচকি হাসলো কিন্তু মনে মনে সে বিরবিরায়
, " হুম শাশুড়ি তো না,একটা আস্ত দজ্জাল।"
সাথী চৌধুরী টেবিলে থাকা শিলার দিকে তাকিয়ে বলল " শিলা ও তোমার বয়সে বড় হলেও , তোমার ননদ বুঝলে?"
নীলাদ্রিতা চোখ পিট পিট মাথা নাড়ায়। এরপর সাথী চৌধুরী টেবিলে থাকা আরো দুজনকে দেখিয়ে দিলো।
" ইনি তোমার জেটা শশুড় এবং জেটি শাশুড়ি।"
নীলাদ্রিতা আবারও এক চিলতে হাসি দেয়। সত্যি বলতে এসব পরিচয়ে তার বিশেষ আগ্রহ নেই।। সে তো কখনো মন থেকে এই বিয়ে করেনি আর না কখনো ওই ছেলেটাকে তার স্বামী হিসেবে মানবে।হঠাৎ সাথী চৌধুরী অকপটে এসে নীলাদ্রিতার দিকে গাঢ়ো দৃষ্টিতে তাকালো ,
"এখনো অনেক এর সাথে তোমার পরিচয় করা বাকী। এসে বসো টেবিলে, নাস্তা করো।"
নীলাদ্রিতা প্রথমে একটু হকচকিয়ে উঠে। জীবনে প্রথমবারের এতো এতো সাজানো খাবার দেখছে। ওই যে মামার বাড়িতে হলে তো সকালে পান্তা খেয়েই চলে যেতো তার। কিন্তু এখন এতো এতো খাবার দেখে খাবে কী দেখেই তার মন ভরে গেলো।
গোলাপি হেসে নীলাদ্রিতাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলো। তার প্লেটে এক এক করে সব খাবার গুছিয়ে দিচ্ছে। তার পাশেই সাথী চৌধুরী বসে এক ধ্যানে নীলাদ্রিতার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু নীলাদ্রিতার মুখেই যেনো খাবার তুলছে না সে একপলক সবার দিকে তাকিয়ে প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। সাথী চৌধুরী ভ্র কুঁচকে জিজ্ঞাসা করে,
" নাত-বৌ কী হলো দাঁড়িয়ে গেলে কেনো?"
নীলাদ্রিতা একটা মুচকি হেসে বলে " দিদা আমার টেবিলে খাওয়ার অভ্যাস নেই, আমি এখানে,এই যে মেঝেতে বসে খাই?"
তখনি পারমিতা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে কিন্তু সাথী চৌধুরী রক্তিম চোখ দেখে তিনি হাসিটা গিলে ফেলেন। হঠাৎ সাথী চৌধুরী রেগে গিয়ে গর্জে উঠেন
" নীলাদ্রিতা! তোমাকে আমি যা বলছি তাই করো। তুমি এখানে বসেই খাবে মানে খাবে।"
তারপর আর কী নীলাদ্রিতা নিঃশব্দে টেবিলের একপাশে এসে বসে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করে নক্ষত্র। নক্ষত্রকে নামতে দেখেই সাথী চৌধুরী উচ্চস্বরে বলে ওঠেন,
" নক্ষত্র দাদুভাই,কাম।"
নক্ষত্রের মুখখানা তখন দেখার মতো ছিলো। এগিয়ে এসে সে বিতৃষ্ণায় একটা চেয়ার টেনে টেবিলে গিয়ে বসলো। কিন্তু যখনি তার পাশে নীলাদ্রিতাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে যেনো মাথায় রক্ত চড়ে বসে। সবাই যেনো এক মুহূর্তের জন্য শ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ সবাই ভাবছে নক্ষত্র এখন তার আসল রুপে চলে আসবে। গোলাপি তো সাথী চৌধুরী পেছনে লুকিয়ে পড়ে।
নক্ষত্র অগ্নিদৃষ্টিতে নীলাদ্রিতার দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই দৃষ্টিতে আগুন, ক্রোধ আর হিংস্রতার স্পষ্ট ছাপ। কিন্তু সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই সাথী চৌধুরী সতর্ক স্বরে সাবধানী বাণী ছুড়ে দেন,
" এগ্রিমেন্টের কথা আমি দ্বিতীয়বার মনে করাবো না নক্ষত্র।"
'এগ্রিমেন্ট' শব্দটা কানে যেতেই নক্ষত্র যেন আচমকা সংযত হয়ে পড়ে। সে নিজেকে অস্বাভাবিক রকম শান্ত রেখে নির্বাক হয়ে বসে থাকে। সাথী চৌধুরীর ইশারায় গোলাপি এগিয়ে এসে খাবার পরিবেশন করতে শুরু করে।
এইদিকে নীলাদ্রিতা আপন সুখে খেয়েই যাচ্ছে তো যাচ্ছে তার দিন দুনিয়ার খবর নেই। পেট ভরে খেতে পেয়ে ঢেঁকুর তুলে এইবার নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে যেনো এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে।
লোকটার শরীরে কালো পোশাক ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না। গলা থেকে পা পর্যন্ত কালো রঙের কাপড়ে আবদ্ধ। কালো জ্যাকেট কালো পেন্ট সব কালো আর কালো। আর চোখ গুলো? কী ব্যাপার আজো চোখ দেখা যাচ্ছে না। এলোমেলো চুল গুলোর জন্য চোখ গুলো যেনো ঢেকে গিয়েছে।
নীলাদ্রিতা আরেক দফা অবাক হয় নক্ষত্রের নাস্তার প্লেট দেখে। সে বিস্ময়ে গোলাপি কে কাছে ডেকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করে,
" বেজি টা এইটা কী অখাদ্য খাচ্ছে?
গোলপি একটা হালকা ঢোগ গিলে বললো,
" অখাদ্য না তো, ওই যে গ্লাসে ওইটা জবা ফুলের চা।ওনি এইটা প্রতিদিন সকালে খায়।"
জবা ফুলের চায়ের কথা শুনে নীলাদ্রিতা নাক সিঁটকায় এবং মনে মনে ভাবে
" বাপ রে জবা ফুলের আবার চা হয় নাকী? হা বড়লোক্স বলে কথা।"
সাথী চৌধুরী এইবার নরম স্বরে নক্ষত্র কে বললো,
" রাতে রিসেপশন পার্টি হবে।"
নক্ষত্র এক মূহুর্তের জন্য প্লেটে চামচ নাড়ানো বন্ধ করে দেয়। সে কিছু বলছে না দেখে পারমিতা চৌধুরীর ভীষণ রাগ হয়। তিনি বুঝতে পারছে না নক্ষত্রের মতো বদমেজাজি আর উগ্ৰ ছেলে কী করে এই মেয়েকে টলারেট করছে। নক্ষত্র কে তিনি সারাজীবন একা দেখতে চান একা,তিলে তিলে শেষ করে দিবে তাকে।
এই মেয়েটাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি থেকে বের না করলে, যেসব গোপন রহস্য এতদিন চাপা পড়ে আছে, সেগুলো প্রকাশ্যে চলে এলে যে সর্বনাশ অনিবার্য।সে সর্বনাশ শুধু ধ্বংস ডেকে আনবে।
পারমিতা হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন রুমে যাওয়ার জন্য। এমন ভান করছেন যেনো তার এখন রুমে না গেলেই নয়। যাওয়ার সময় তিনি নীলাদ্রিতার পাশ দিয়ে যাচ্ছেন।যে যার খাওয়াতে ব্যস্ত কিন্তু এইদিকে পারমিতা চৌধুরী মগে রাখা ফুটন্ত গরম পানি আলগোছে সবার চোখের আড়ালে নীলাদ্রিতার হাতে ইচ্ছে করে ঢেলে দিলেন।
" মা..." ব্যাথায় চিৎকার করে উঠে নীলাদ্রিতা।মুহূর্তেই তার হাত টকটকে লাল হয়ে ফুলে ওঠে, চামড়া যেন খসে পড়ছে।।
এইদিকে নক্ষত্র আর শিলা চুপচাপ তাদের নাস্তা খেয়েই যাচ্ছে চারপাশে কী হচ্ছে সেই ধ্যান নেই। বাকীরা নীলাদ্রিতাকে নিয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলো। গোলাপি সবে মাত্র ফুটন্ত গরম পানিটি টেবিলে রেখেছে কিন্তু এমনটা হয়ে যাবে ভাবতে পারি নি।
নক্ষত্র এইবার শুধু একপলক চোখের পলক উল্টিয়ে তাকায় শুধু একবার। এরপর আবার চোখ নামিয়ে খাওয়াতে মনোযোগ দেয়।
নীলাদ্রিতার চোঁখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। সে নিজেকে যথেষ্ট সামলে নিয়ে বলে,
" দিদা চিন্তা করবেন না এসবে আমি অভ্যস্ত। এ তো সামান্য গরম পানি, কতো গরম লোহার ছ্যাঁকা সহ্য করেছি। এসবে আমার সয়ে গেছে আপনারা শান্ত হোন।"
সাথী চৌধুরী গরম চোখে পারমিতার দিকে তাকিয়ে সেখানে থেকে চলে যান। এইদিকে নক্ষত্র ও টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালো। দুই হাতে আড়মোড়া ভেঙে ঘাড় এদিক ওদিক করে সবার চোখের পলকে একটি কাঁটা চামচ তুলে নেয়।
এরপর কোনো ভণিতা ছাড়াই সোজা পারমিতার হাত টেনে তাতে গেঁথে দেয়। পারমিতা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে গগণ ফাটানো একটা চিৎকার যেনো সবার কানের পর্দা ফাটিয়ে ফেলেন।
বিরক্তিতে নক্ষত্র কানে আঙ্গুল গুজে দেয়। পারমিতা চৌধুরী ভাঙ্গা গলায় বলল
" নক্ষত্র আমি তোমার মা। ওই আশ্রিতার কারণে তুমি আমাকে আঘাত করলে?"
নক্ষত্র কাঁটা চামচ টি ঘুরিয়ে আরো জোরালো ভাবে ধরলো। ঠোঁট টেনে মৃদু হেসে ঠোঁট টি পারমিতা চৌধুরী কানের সংস্পর্শে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে,
" প্রথমে তো আপনি আমার মা নন মিসেস চৌধুরী। "। কথাটি বলে নক্ষত্র এক পলক নীলাদ্রিতার দিকে তাকিয়ে আবারো গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে,
" মিসেস.. চৌধুরী, সে আমার আশ্রিতা হোক কিংবা আমার রক্ষিতা। আমারই তো, আ..মা..র! তাই ওকে আঘাত করলে আমি করবো অন্যথায় কেউ নয়। ভুলেও ওকে কেউ আঘাত করার চেষ্টা করলে আমি তার কলিজাটা টেনে ছিঁড়ে একদম কাঁচা খেয়ে ফেলবো কাঁচা, মাইন্ড ইট।"
এই কথা বলেই একটানে চামচটা টেনে বের করে নেয়।। পারমিতা চৌধুরী হাত থেকে ফিনিক ফিনিক রক্ত পড়তে শুরু করে।সঙ্গে সঙ্গে সারা টেবিল জুড়ে রক্তে ফোঁটায় ভরে উঠে। নক্ষত্র চামটি টেবিলে ছুঁড়ে মেরে হাতে কালো গ্লাভস পড়ে নেয়। এবং গলা উঁচিয়ে ঢাকতে থাকে, " রাউডি.. রাউডি।"
সঙ্গে সঙ্গে একটি কুকুর নক্ষত্রের কাছে চলে আসে। কুকুরটির গলার বেল্ট হাতের মুঠোয় নিয়ে নক্ষত্র সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়।
বাকী সবাই ভয়ে গুটিয়ে গেলেও নীলাদ্রিতা কিন্তু খুব খুশি হয়। সে মুচকি মুচকি হাসছে পারমিতার অবস্থা দেখে। শিলা খাবার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর সরে পারমিতার উদ্দেশ্য বলে,
" উচিত জবাব দিতে ভাইয়া,মম এইটাই তোমার সাথে হওয়া উচিত।"
পারমিতা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে রেগে গিয়ে গর্জে উঠলেন, " চুপ করো বিয়াদপ মেয়ে।"
শিলা আর কিছু না নিঃশব্দে চলে যাই।।
-
-
নীলাদ্রিতা এই বিশাল বাড়িটায় ভীষণ একাকিত্ব অনুভব করছে। গ্রামে থাকলে কত আনন্দই না করা যেত বান্ধবীদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, খেলা, গল্পে সময় কেটে যেতো অনায়াসে। অথচ এখন সে নীরবে এক ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে বসে আছে। বাইরে কোথাও যাওয়ার অনুমতি টুকু ও নেই তার। একা একা বসে আর কীই বা করবে সে!
হঠাৎ তার মন খারাপ হয়ে গেলো। চোখ গুলো বোধহয় ভিজে উঠেছে বাবা - মায়ের কথা মনে পড়তেই। আজ যদি তার বাবা- মা বেঁচে থাকতো এই দিন দেখতে হতো না। সে ঠের বুঝতে পারছে তাকে রক্ষিতা হিসেবে এই বাড়িতে আনা হয়েছে। কিন্তু বিয়ের সময় যদি মামু আর তার অভিক ভাই থাকতো তাহলে কখনোই তাকে জোর করে বিয়ে দিতে পারতো না কখনোই না। আদৌও তারা জানে কী নীল পরির বিয়ে হয়ে গেছে। তারা আমাকে নিতে আসবে না এই অন্ধকার নগরী থেকে আমাকে মুক্তি করবে না।
সে এইসব ভাবছেই হঠাৎ করে তার চোখ পড়ে নিচের দিক। ফট করে জানালায় উঁকি দিয়ে যখন কাউকে দেখলো সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় তার গুলো যেনো সব এক এক করে ছিঁড়ে গেলো। কারণ সামনেই দেখতে পাচ্ছে ওই বুড়ো ঘটক কে।
সাদা পাঞ্জাবি পড়া ,পেটে মস্ত বড়ো ভুঁড়ি এবং মুখে পান চিবিয়ে চিবিয়ে চৌধুরী নিবাসের দিকে এগিয়ে আসছে।
" শা'লা বুড়ো আজ তোকে দেখাবো নীলাদ্রিতা কী জিনিস।"
মূহুর্তেই সে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো নিচে নামতেই দেখতে পায় বুড়ো ঘটক কে।যে সাথী চৌধুরী থেকে আলবাম ভর্তি টাকা নিচ্ছে। নীলাদ্রিতা ক্ষিপ্ত গতিতে এগিয়ে আসছে তাদের সামনে। ওই ভুঁড়িওয়ালা লোকের নাম চান্দু ঘটক। তিনি নীলাদ্রিতা কে দেখা মাএই সেখান থেকে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু নীলাদ্রিতা হাত উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠলো
" চান্দুর ঘরের চান্দু, শা'লা বুড়ো ঘটক দাঁড়া।"
নীলাদ্রিতা এদিক ওদিক তাকিয়ে কী যেনো খুঁজছে। তখনি গোলাপি এসে জিজ্ঞাসা করে " কী খুঁজছো তুমি।"
" জিলাপি থুক্কু গোলাপি আমাকে একটা ঝাড়ু এনে দাও।"
গোলাপি নীলাদ্রিতার কথা মতো ঝাড়ু নিতে চলে যায় এবং তাড়াতাড়ি চলেও আসে। নীলাদ্রিতা ঝাড়ুটা নিয়ে একটু একটু করে চান্দু ঘটক এর দিকে এগিয়ে যায়। আর ওমনি ঘটকটি ভৌ দৌড় লাগিয়ে ছুটতে থাকে। নীলাদ্রিতাও ঘটকটির পেছনে পেছনে চলে যায়।
" শা'লা ঘটকালি আর করবি। "
ঘটকটি যেদিকে যাচ্ছে সেদিকে নীলাদ্রিতা তো রয়েছে। পুরো বাড়ি তাদের দুইবার চক্কর কাঁটা হয়ে গেছে তবুও নীলাদ্রিতা তাকে ছাড়ে না।
একসময় ঘটকি লুঙ্গি উপরে তুলে বাড়ির পাইপ বেয়ে টিকটিকির পাইপ আঁকড়ে ধরে থাকে।
নিচ থেকে নীলাদ্রিতা শয়তানি এক হাসি হেসে বলে " ওরে চান্দু আগে মনে ছিলো না আমার মামার বাড়িতে যখন ঘুরঘুর করতি। আজ তোর নিস্তার নেয়।"
চান্দু ঘটক কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে
" আমাকে ছেড়ে দাও গো মা আমি আর ঘটকালি করবো না রে। এইবারের মতন ছেড়ে দাও।"
নীলাদ্রিতা ভয়ঙ্কর ভাবে গর্জে উঠে বলে,
" চান্দু তুই নিচে নামবি নাকী আমি উপরে উঠবো? আমি উঠলে কিন্তু তোর খবর আছে। "
"ছেড়ে দে রে মা।"
চান্দু ঘটক ভয়ে ভয়ে পাইপ থেকে নিচে নেমে যায়। তখনি হুমড়ি খেয়ে নীলাদ্রিতা ঝাড়ু দিয়ে তাকে উত্তম মধ্যম কেলাতে থাকে। চান্দু ঘটক আবারো দৌড় লাগায় পিছু পিছু নীলাদ্রিতা ও। চান্দু ঘটক এক দৌড়ে সে গেইটের কাছে আসতেই পা স্লিপ করে পড়ে যাই।
" ও মা গো কোমর তো গেলো গো।আমি আর ঘটকালি করবো না গোওওও।"
নীলাদ্রিতা তাকে সেই অবস্থাতেই ঝাড়ু দিয়ে আবারো পেটাতে থাকে।
" ছাইড়া দে রে মা আমি আর ঘটকালি করবো না। ও কী ব্যাথা... পুরাই রে।"
চান্দু কোনো রকমে আবারো উঠে দাঁড়িয়ে দৌড় লাগায় কিন্তু এইবার ও তার ভাগ্য সহায় হয় না। গেইটের গ্ৰিল এ তার পাঞ্জাবি আটকে যায়।সে পিছু ফিরে দেখতে নীলাদ্রিতা আসছে তাই পাঞ্জাবিটা শরীর থেকে টেনে হিঁচড়ে খুলে লুঙ্গি ধরে খালি গায়ে দৌড়ে পালিয়ে যেতে থাকে। এই এক দৌড়ানিতে তার পায়ে জোতা জোড়াও যেনো কোথায় উদাও হয়ে গেলো। ভারী ভুঁড়ি টার জন্য বোধহয় দৌড়াতে পারছে না ।তবুও সে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে কোনো মতে নীলাদ্রিলাতার হাত থেকে বেঁচে যায়।
দূর থেকে গোলাপি আর সাথী চৌধুরী এদের এহেম কান্ডে হাসতে থাকে। লালটু আর গোলাপী তো হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে রীতিমতো।
চলবে--