#পাগল_তোর_জন্যে_রে
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী
[০৫]
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই মির্জা বাড়ির চারপাশটা আত্মীয়-স্বজনের গমগমে হাসিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। উঠানে রাখা সাউন্ডবক্সের চটুল বিটে পুরো বাড়িটা যেন থরথর করে কাঁপছে। গায়েহলুদের শুভলগ্ন একেবারে দোরগোড়ায় এসে হাজির; নিয়ম অনুযায়ী এবার ছেলের বাড়ি থেকে কুলের ডালা আর হলুদ নিয়ে কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে বরযাত্রী এবং মেহমানদের রওনা হওয়ার পালা।
ওদিকে ঘরের ভেতরে তখন রূপসজ্জার ধুম পড়ে গেছে। তরী, নীলা, নাবিহা আর শর্মিষ্ঠা সবাই ব্যস্ত নিজেদের সাজে নিখুঁত ছোঁয়া দিতে। সবার শরীরেই জড়িয়ে আছে এক ফ্রেমে বাঁধানো কাঁচা হলুদ রঙের সুতি শাড়ি, যার পাড়জুড়ে রয়েছে গাঢ় সবুজের চমৎকার ছোঁয়া। গলার হার থেকে কানের দুল সবেতেই কৃত্রিম সোনার বদলে শোভা পাচ্ছে তাজা গেন্দা ফুল আর লাল গোলাপের পাপড়িতে তৈরি দারুণ সব ফুলেল গয়না। মুখের চর্ম জুড়ে হালকা মেকআপের ছোঁয়া।
সাজগোজ একরকম শেষ করে তরী ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। সে নিজেকে নিয়ে খুব একটা অহংকার করে না, আবার রূপের দিক থেকেও সে কম যায় না। বলা যায় বেশ ভালোই সুন্দরী। তার গায়ের রঙটা দুধ-আলতার মতো ধবধবে ফর্সা, চোখ দুটো হরিণের মতো টানাটানা ও মায়াবী। ভ্রু দুটো খুব বেশি ঘন নয়, বরং বেশ পাতলা ও পরিপাটি। চোখের গভীর মণি দুটো কুচকুচে কালো, আর পিঠ বেয়ে কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে তার ঘন লম্বা চুলগুলো। সব মিলিয়ে তাকে কোনো স্বর্গের পরী বা অপ্সরী বললেও কম বলা হয় না।তরীর এই মোহনীয় রূপ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে মুগ্ধ হয় নাবিহা। সে মিষ্টি হেসে তরীর আরও কাছে এগিয়ে আসে এবং আলতো সুরে বলে ওঠে,
"মাশাআল্লাহ আপু। তোমাকে আজ সত্যি কোনো রাজকন্যার চেয়ে কম লাগছে না, ভীষণ সুন্দর লাগছে তোমায়!"
নাবিহার মুখে এমন প্রশংসাবাণী শুনে তরী মুচকি হেসে চোখ টিপে দুষ্টুমি করে বলে,
"শুধু আমাকে একা একা পাম দিচ্ছো কেন? তোমাকেও তো কম সুন্দর লাগছে না, ম্যাডাম। তা ছাড়া ঋত্বিক ভাইয়ের হবু বউ বলে কথা, গ্লো তো একটু ছড়াবেই।"
তরীর এমন ছিপছিপে দুষ্টু কথার রেশ কাটতে না কাটতেই ঘরের ভেতর উপস্থিত বাকি সব মেয়েরা খিলখিল করে হেসে ওঠে। সবার হাসির শব্দে ঘরটা মুখরিত হয়ে উঠলেও নাবিহার মুখটা লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে মাটিতে মিশে যাওয়ার উপক্রম হয়। সে লজ্জায় মাথাটা নিচু করে ফেলে। কিন্তু সেই লজ্জার আবরণের আড়ালে তার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তার মনের গহীনে কেমন যেন একটা অজানা ভয় ডানা মেলতে শুরু করে। সত্যি কি সে ঋত্বিকের বউ হতে পারবে? ওই মানুষটা কি চিরকালের জন্য তার হবে? কাল থেকে কেন জানি তার মনের কোণে বারবার অবুঝ সংশয় উঁকি দিচ্ছে যে, সে বুঝি শেষ পর্যন্ত ঋত্বিককে পাবে না, নিজের অজান্তেই যেন সে তার ভালোবাসাকে হারিয়ে ফেলছে। বুক চিরে আসা এই অদ্ভুত আতঙ্কে তার গলা শুকিয়ে আসে। সে মনে মনে ভাবে ঋত্বিককে যদি সত্যি কোনোদিন হারাতে হয়, তবে সে বোধহয় আর বেঁচে থাকতে পারবে না।
নাবিহার এই থমথমে ভাবটা অবশ্য কারো চোখ এড়ায় না। নীলা মুচকি হেসে নাবিহার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে এক পলক তাকায়, তারপর সরাসরি তরীর দিকে তাকিয়ে মজার সুরে বলে ওঠে।
"আরে ভালো করে খেয়াল করে দেখ তরী। আমার থেকে বয়সে কম হলেও পাক্কা দুই বছরের ছোট হবে এই নাবিহা। আর সেই আমারই ছোট বোন কি না এক লাফে আমার ভাবি হতে চলেছে।"
নীলার এমন হাসিখুশি ও টিটকিরি ভরা কথা শুনে তরী আর হাসি ধরে রাখতে পারে না, জোরে খিলখিল করে হেসে ওঠে। চারপাশের এই হাসাহাসির হুল্লোড় আর নিজের মনের ভেতর জমে থাকা তীব্র অস্বস্তি ও লজ্জার এক অদ্ভুত মিশ্রণে নাবিহা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সে আর সহ্য করতে না পেরে দ্রুত পায়ে ঘর ছেড়ে এক দৌড়ে বেরিয়ে যায়।
অনেকক্ষণ পর সাজগোজ শেষ করে তরী, নীলাসহ বাকি সব মেয়েরাও একে একে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে আসে। নিচতলার ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তারা দেখতে পায়, কাশিফ মির্জা আর নওশাদ মির্জা বেশ গম্ভীর ও চিন্তিত মুখে সোফায় বসে আছেন, আর তাদের আশপাশে বাকিরাও থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির সবার এমন থমথমে ও চিন্তিত চেহারা দেখে তরীর ভ্রু কুঁচকে যায়। সে একটু আতিপাতি করে তাকিয়ে ফিসফিস করে নীলার কানে কানে বলে,
"কী হয়েছে বল তো সবার? সবাই এমন গম্ভীর মুখে টেনশনে বসে আছে কেন?"
নীলা তরীর দিকে ঝুঁকে এসে চাপা গলায় উত্তর দেয়,
"আরে আর বলিস না! ঋত্বিক ভাইয়া এখনো বাড়ি ফেরেনি। সেই সকালবেলা বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, তারপর আর দেখাই নেই। ফুয়াদ ভাইয়া বারবার ফোনে ট্রাই করছিল, কিন্তু ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।"
কথাটা শোনার পর তরী আর কোনো মন্তব্য করে না, তবে তার মনের ভেতর নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করে। ঋত্বিক মানুষটাকে তার কাছে শুরু থেকেই বেশ অদ্ভুত ঠেকেছে। মির্জা বাড়ির জলহাওয়ায় বড় হওয়া ছেলেটার মাঝে কেমন যেন একটা রহস্যময় ও রহস্যঘেরা ভাব আছে, যা তরীর কাছে বেশ অদ্ভুত লাগে। একটু থেমে তরী আবার নীলার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,
"আচ্ছা নীলা, তোর এই ঋত্বিক ভাইয়াটা না বড্ড অদ্ভুত। সারাক্ষণ কেমন যেন চুপচাপ, গম্ভীর আর রাগী হয়ে থাকে। দেখলে মনে হয় পৃথিবীর সবার ওপর তার রাগ জমে আছে। আর কাল রাতে কী বলছিল জানি। কোনো মেয়েকেই নাকি তার সহ্য হয় না। এটা আবার কেমন কথা?"
নীলা লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদুস্বরে বলে,
"ভাইয়া মিথ্যে বলেনি। ছোটবেলা থেকেই ঋত্বিক ভাইয়া কেমন যেন মেয়েদের থেকে দূরে দূরে থাকতে পছন্দ করে। আমাদের মির্জা বাড়ির ঘরের মেয়েগুলো ছাড়া বাকি দুনিয়ার কোনো মেয়েকেই সে সহ্য করতে পারত না। ছোটবেলার সেই খিটখিটে স্বভাবটা আজও আমার ওই ভাইয়ের মনের ভেতর থেকে গেছে।"
তরী একটু অবাক হয়ে বলে,
"নাবিহা তো দেখতে মায়াবী আর সুন্দর। তাহলে ওকে বিয়ে করতে ভাইয়ার আবার কী সমস্যা?"
কান্নাজড়িত একটু বিরক্ত হয়ে নীলা মাথা নেড়ে বলে,
"ধুর।সেটা আমি কেমন করে বলব বল? ওসব কি আর আমাকে বলে নাকি"
তরী আর নীলার ফিসফিস কথার মাঝেই বাড়ির সদর দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে ঋত্বিক। তাকে দেখলেই বোঝা যায় কী ভীষণ ক্লান্ত সে। সারা শরীরে ক্লান্তি ঝরে পড়ছে, মাথার চুলগুলো একেবারেই এলোমেলো, আর চোখের চাউনি কেমন যেন অস্বাভাবিক ও থমথমে। ঋত্বিক ভেতরে পা রাখতেই ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবার নজর চলে যায় তার দিকে। ঘুরে দাঁড়াতেই তরীর চোখও গিয়ে পড়ে ঋত্বিকের ওপর। আর অমনি ঋত্বিককে দেখা মাত্রই তরীর বুকের ভেতরকার হার্টবিটটা ধক করে কেঁপে ওঠে, পরমুহূর্তেই বুক চিরে সেটা দ্রুত থ্রুব করতে শুরু করে।
ঘাবড়ে গিয়ে তরী দ্রুত নিজের চোখ দুটো নামিয়ে নেয়। নিজের মনের এই অদ্ভুত কান্ডে সে নিজেই যেন থমকে যায় এই ঋত্বিককে দেখলেই তার বুকের ভেতর এমন হুলুস্থুল কাণ্ড কেন বেঁধে যায়? সে তো ভালো করেই জানে, হার্টবিট কেবল তখনই এমন দিশেহারা হয়ে কাঁপে যখন সামনে নিজের প্রিয় মানুষটা থাকে।কিন্তু ঋত্বিক তো তার কেউ নয়? এসব আজেবাজে ও গোলমেলে চিন্তা মাথা থেকে তাড়াতে গিয়ে তরী দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
"নিজের নজর ঠিক কর তরী। ওই ঋত্বিক তোর কেউ হয় না, কিচ্ছু না।ভুলেও আর কোনোদিন ওর দিকে তাকাবি না তুই, একদম দূরে দূরে থাকবি।"
নিজের সাথে নিজে মনে মনে এটুকু কথা বলতে না বলতেই হঠাৎ তরীর খেয়াল হয় যে তার পায়ে নুপুর নেই। তাড়াহুড়োয় সে নুপুর পরতেই ভুলে গেছে। পায়ে নুপুর না থাকার এই কথা মনে পড়তেই সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে নীলাকে কিছু একটা ইশারা করে এক দৌড়ে সোজা ওপরের ঘরের দিকে ছুটে চলে যায়।
চারপাশে এত মানুষের উপস্থিতি আর তাদের গম্ভীর দৃষ্টি সত্ত্বেও ঋত্বিকের মুখে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে সম্পূর্ণ নির্বিকার মুখে নিজের রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবে, ঠিক তখনই গম্ভীর গলায় ডেকে ওঠেন কাশিফ মির্জা,
"দাঁড়া।"
বাবার ডাকে মুহূর্তেই থেমে যায় ঋত্বিক। একদম টানটান হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কাশিফ মির্জা রাগী ও কাঠিন্যভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন,
"সকাল থেকে কোথায় গিয়েছিলি তুই?"
ঋত্বিক শান্ত ও নির্বিকার গলায় উত্তর দেয়,
"জরুরি একটা কাজে বাইরে গিয়েছিলাম, সেখানেই ছিলাম।"
ঋত্বিকের এমন উদাসীন আচরণ দেখে ফুয়াদ আর স্থির থাকতে না পেরে এগিয়ে এসে বলে ওঠে,
"সবাই হলুদ নিয়ে যাওয়ার জন্য একদম রেডি হয়ে গেছে, তুই যাবি না"
বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে ঋত্বিক বলে,
"ভাইয়া, এসব হইচই আমার ভালো লাগে না। আমি কোথাও যাব না, আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।আমি এখন ঘুমাব।"
কাউকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ঋত্বিক সোজা সিঁড়ি দিয়ে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে। দীর্ঘ করিডোর ধরে নিজের রুমের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই থমকে যায় তার পা দুটো। চারপাশের পিনপতন নিস্তব্ধতা চিরে শব্দে কানে আসে কারো পায়ের নুপুরের রিনঝিন আওয়াজ। জীবনে এই প্রথমবার বুকের ভেতরের সমস্ত স্পন্দন এক পলকের জন্য থেমে যায় ঋত্বিকের। তার হৃদপিণ্ডটা অজান্তেই অদ্ভুত এক শিহরণে কেঁপে ওঠে।তক্ষণাৎ চমকে পেছনে ফিরে তাকায় ঋত্বিক। আর তাকাতেই তার চোখ দুটো যেন ওই করিডোরেই আটকে যায়। দেখতে পায়, ঠিক ওপাশ থেকে শাড়ির কুঁচি সামলে মাটির দিকে তাকিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে আসছে তরী। তার প্রতিটা পা ফেলার ছন্দে নুপুরগুলো নিস্তব্ধতা ভেঙে রিনঝিন শব্দ তুলছে, আর সেই মিষ্টি নুপুরের শব্দ ঋত্বিকের কানের পর্দা ভেদ করে সরাসরি গিয়ে আঘাত করছে তার হৃদয়ের গভীরে।
জীবনে শাড়ি পরা মেয়ে কম দেখেনি ঋত্বিক। কিন্তু আজকের এই শাড়ি পরা তরীকে দেখার পর তার চেনা পৃথিবীটা যেন হঠাৎ করেই বদলে গেল। তার মনে হতে লাগল, দুনিয়ার সব মেয়ে হয়তো শাড়িতে সুন্দর লাগে না, কিন্তু শাড়িতে এই মেয়েটাকে একটু বেশিই অপার্থিব সুন্দর লাগছে তার কাছে। ঋত্বিকের বুক চিরে বের হওয়া শ্বাসপ্রশ্বাসগুলো মুহূর্তে অস্বাভাবিক হয়ে আসে। অদ্ভুত এক অচেনা অনুভূতি তাকে চারপাশ থেকে অদৃশ্য জালে জড়িয়ে ধরে। শত চেষ্টা করেও চোখ দুটো ফিরিয়ে নিতে পারছে না, মাথা কাজ করছে না। কেন এই মেয়েটাকে দেখে তার ভেতর এমন তোলপাড় শুরু হলো। জীবনের উনত্রিশটা বছরে এমন কোনো অদ্ভুত অনুভূতির মুখোমুখি তাকে কখনো হতে হয়নি। গরমে বা পিপাসায় নয়, অদ্ভুত এক আকুলতায় তার গলাটা কেমন যেন শুকিয়ে আসছে।
তরী তখনো খেয়াল করেনি সামনে ঋত্বিক দাঁড়িয়ে আছে। সে আনমনে পা ফেলে হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ির কাছে চলে আসে, আর ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে সামনে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ঋত্বিকের ওপর। মুহূর্তেই চমকে ওঠে সে। তার হার্টবিটটা পুনরায় ধক করে লাফিয়ে ওঠে। দেখতে পায়, ঋত্বিকের সেই ধূসর রঙের চোখ দুটো কী ভীষণ তীব্র ও গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই চোখের অগ্নিদৃষ্টি সহ্য করার কোনো ক্ষমতা বা সাহস তরীর থাকে না। দ্রুত পলক নামিয়ে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়, ভয়ে তার শরীরটা কেমন যেন থরথর করে কেঁপে ওঠে। সেখানে এক মুহূর্তও দাঁড়ানোর সাহস পায় না। শাড়ির কুঁচি মুঠোয় শক্ত করে খামচে ধরে এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যেতে থাকে তরী। তরী যখন সিঁড়ি দিয়ে একে একে নিচে নামছে, সেই নামার প্রতিটি তালে তার পায়ের নুপুরের রিনঝিন শব্দটা চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেদ করে বেজে ওঠে। চোখ বন্ধ করে সেই নুপুরের রিনঝিন শব্দ খুব গভীরভাবে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে শুনতে থাকে ঋত্বিক।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। করিডোরের বাতাসে আর নুপুরের সেই রিনঝিন রেশটুকুও নেই।বোঝা গেল, তরী অনেক আগেই নিচে নেমে গেছে। কিন্ত পজিশন বদলাল না ঋত্বিকের। সে আগের মতোই চোখ বন্ধ করে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথার ভেতরে তখনো এক অদ্ভুত চলচ্চিত্র চলছে।তার কল্পনায় হুড়মুড় করে ভেসে উঠছে একটু আগের দৃশ্য। কীভাবে তরী শাড়ির কুঁচি সামলে তার ঠিক পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গেল।হঠাৎ করেই অবচেতন মনে একটা বিদ্যুৎ চমকে উঠল ঋত্বিকের। তার ব্রেইন যেন একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেল।ফট করে তার চোখ দুটো মেলে ধরল। পলকে তার ধূসর চোখের মণি দুটো অস্বাভাবিক রকম বড় হয়ে গেল। তার নিজের মনের ভেতর থেকে একটা আর্তনাদ ফুঁসে উঠল,
"সে একটা মেয়েকে নিয়ে ভাবছে? একটা সাধারণ মেয়ে তাকে এভাবে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলল?"
মুহূর্তের মধ্যে দুই হাতের মুঠো রাগ ও ঘিন্নায় শক্ত হয়ে পাথর হয়ে গেল ঋত্বিকের। চোয়ালের পেশী শক্ত করে, দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলে,
"ওই মেয়েটাকে দেখে আমার বুকের ভেতর এমন ফিলিংস হলো কেন? হোয়াই??"
আর ঠিক রাখতে না পেরে দুই হাত দিয়ে নিজের এলোমেলো চুলগুলো খামচে ধরল ঋত্বিক। বুক চিরে বেরিয়ে আসতে লাগল বড় বড় ভারী শ্বাস। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না, নিজের সত্তার বিরুদ্ধে গিয়ে সে এতক্ষণ একটা মেয়ের আকর্ষণে সম্মোহিত হয়ে পড়েছিল। ক্ষোভে, রাগে আর নিজের ওপর তৈরি হওয়া তীব্র ঘিন্নায় হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের রুমে ঢুকে গেল ঋত্বিক, সজোরে দরজায় একটা ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করে দিল।বন্ধ রুমের ভেতরে ছটফট করতে করতে এদিক-ওদিক পায়চারি করতে শুরু করল আর নিজের সাথে নিজেই ফিসফিস করে বলতে লাগল,
"নো, নো, নো। ইম্পসিবল।এই ঋত্বিক জীবনেও কোনো মেয়ের আকর্ষণে জড়াতে পারে না, কোনোভাবেই না। পৃথিবীর সমস্ত মেয়ে আমার কাছে নিষিদ্ধ, এক ফোঁটা জায়গাও নেই তাদের জন্য"
কথাটা শেষ করেই রাগে আবার চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ঋত্বিক। কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধল ঠিক তখনই। চোখ বুজতেই তরীর সেই মায়াবী মুখখানা তার কল্পনার পর্দায় আরও বেশি জীবন্ত হয়ে, আরও তীব্রভাবে ভেসে উঠল।রাগে দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁটটা এমনভাবে কামড়ে ধরল যে রক্ত আসার উপক্রম হলো। কিছুতেই মাথা থেকে নামাতে পারছে না এই মায়াবী মেয়েটার অবয়ব।
এই অসহ্য ঘোর থেকে বের হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল ঋত্বিক। নিজের মস্তিষ্ককে অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য সে তার সবচেয়ে পরিচিত পথটা বেছে নিল। মনে মনে নেশাগ্রস্ত মাদক অন্ধকার জগতের ছবিগুলো আনল, যা দিয়ে সে সাধারণত নিজের ভেতরের সমস্ত অনুভূতি অবশ করে দেয়। সে ভাবল, ওই নেশার তীব্র কল্পনা দিয়ে বুঝি সে তরীর এই মুখটা মুছে ফেলতে পারবে। কিন্তু না। তার সেই নেশার জগৎ তরীর ওই মায়াবী রূপের কাছে নিমেষে ধুলিসাৎ হয়ে গেল। সে যতবারই ওই নেশাগ্রস্ত মাদকগুলোর কথা কল্পনায় আনতে গেল, তরীর মুখটা যেন ততো বেশি স্পষ্ট, ততো বেশি জীবন্ত হয়ে তার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠতে লাগল।নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না ঋত্বিক। মাথার ভেতর জমে থাকা আগুন দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। রাগে, বিক্ষোভে আর এক অদ্ভুত অসহায়ত্বে ফুঁসে উঠে ঋত্বিক। তার শক্ত হাতের মুঠিটা পাকিয়ে সজোরে এক ঘুসি বসিয়ে দিল শক্ত দেয়ালে।গলা চিরে বেরিয়ে এলো একরাশ চাপা গর্জন।
"ওয়াট দ্য ফাক ইজ হ্যাপেনিং টু মি?"
বড় বড় পা ফেলে ঋত্বিক এগিয়ে গেল টেবিলের ড্রয়ারের দিকে। হাত বাড়িয়ে চাবি বের করল। চাবিটা ঘুরিয়ে তাড়াহুড়োয় খিল খিল করে খুলে ফেলল ড্রয়ার। ভেতর থেকে টেনে বের করল একটা কালো রঙের লেদার ব্যাগ। জিপারটা এক টানে খুলে বের করে আনল সিলগালা করা একটা ছোট প্যাকেট। প্যাকেটের গায়ে উজ্জ্বল হরফে স্পষ্ট লেখা কোকেইন। ঋত্বিকের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় নেশা, এর বাইরে এই পৃথিবীতে তার কাছে অন্য কোনো কিছুর আর কোনো মূল্য নেই। এই নেশার গভীরে ডুবে থাকাই তার জগৎ। আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না ঋত্বিক। দাঁতে দাঁত চেপে কাগজটা টেনে ছিঁড়ে ফেলল। ভেতরের কিছু সাদা কোকেইন পাউডার হাতে তুলে নিয়ে নাকের কাছে ধরে গভীর করে ঘ্রাণ নিতে লাগল। বুক ভরে বড় বড় শ্বাস টেনে সেই মাদকের নেশায় চোখ দুটো বন্ধ করল ঋত্বিক।কিন্তু অমনি ভয়ংকর এক ধাক্কা খেল তার মস্তিষ্ক চোখের পাতা বন্ধ করতেই ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর আবারও সেই জীবন্ত মুখটা ভেসে উঠল তরীর মায়াবী, মোহময় মুখখানা।
নিমেষে চোখ মেলে দিল ঋত্বিক। মাথার ভেতরের সমস্ত রাগ আর উন্মাদনা এবার বিস্ফোরণের রূপ নিল। হাতের কোকেইনের প্যাকেটটা সজোরে আছড়ে ফেলল মেঝেতে। সাদা পাউডার গুলো ধূলিকণার মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ফ্লোরটা সাদা করে দিল। এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের কাছে গিয়ে বসাল প্রচণ্ড একটা ঘুষি। কাচ ভেঙে চুরমার হয়ে তছনছ হয়ে গেল টেবিলের ওপরটা। ছড়িয়ে থাকা সেই ধারালো কাচের টুকরোগুলো এসে গেঁথে বসল ঋত্বিকের হাতের তালু আর আঙুলে। চামড়া কেটে টকটকে রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করল মেঝেতে। কিন্তু হাতের সেই জ্বালা বা রক্তপাতের দিকে ঋত্বিকের বিন্দুমাত্র খেয়াল রইল না তার শরীরের প্রতিটি শিরা তখন শুধু ওই একটা মেয়ের আবেশে আগুনে পুড়ছে।দু'হাতে সেগুন কাঠের টেবিলের কোণ শক্ত করে খামচে ধরে ঋত্বিক। চোখ বন্ধ করে মাথাটা পেছনে এলিয়ে দিয়ে বড় বড় শ্বাস নিতে থাকে। বুকের ভেতরের ঝড়টা একটু শান্ত করতেই কী যেন ভাবে গভীর মনোযোগে, তারপর বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
"তরী, তরী, এই একটা মেয়ের কাছে আমার জীবনের এত বড় নেশা হেরে যাচ্ছে? বাট আই'ল নেভার লেট এনিওয়ান ইনটু মাই লাইফ।"
ঋত্বিকের শুকনো ঠোঁটের কোণে হঠাৎই ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত, রহস্যময় হাসি। চোখ মেলে দিয়ে টেবিলের ওপর রাখা ভাঙা আয়নার টুকরোর দিকে সরাসরি তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,
"ঋত্বিকের লাইফে তোমাকে ওয়েলকাম, তরী। দেখা হচ্ছে খুব শীঘ্রই।"
চলবে...!