তার আসক্তি
লেখিকা ঃ- মীরা আফরোজ
পর্ব ঃ-০১
নিস্তব্ধ একটি রুমে খাটের মাঝখানে বসে আছে এক রমণী।। পরনে তার ডার্ক চেরি রঙের ভারী লেহেঙ্গা।। হাতে,গলায়, কানে ঝলমল করছে ভারী অলংকার।। চারপাশ থেকে ভেসে আসছে হাজারো গোলাপের মিষ্টি সুঘ্রাণ যা প্রবেশ করছে তার নাসারন্ধ্রে।। সাজসজ্জায় বুঝা যাচ্ছে ভীষণ বড়লোক ঘরের বউ হয়ে এসেছে।।
মেয়েটি মাথা নিচু করে বসে ছিল।। সময় যেন আজ ফুরয় না।।
কিছুক্ষণ পর রুমের দরজায় পাসওয়ার্ড দেওয়া শব্দ ভেসে এলো।। সঙ্গে সঙ্গেই দরজাটা খুলে গেল।। বাইরে থেকে ভেসে এলো বেশ কিছু মানুষের কথাবার্তা শব্দ।। কিন্তু দরজা বন্ধ হতেই আবার সবকিছু নিস্তব্ধ।।
মেয়েটি ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকালো।।
বিশাল রুম খানায় মূল আলো নিভানো,, কেবল ছাদের কার্নিশ আর দেয়ালের কোণজুড়ে জ্বলে থাকা মৃদু ড্রিম লাইটের আলোয় চারপাশটা আচ্ছা দেখা যাচ্ছে।।
ডার্ক চেরি আর কালো রঙের মিশেলে সাজানো পুরো রুমটায় এক অদ্ভুত অভিজাত অথচ গম্ভীর আবহ।। চকচকে কালো কাঠের ফার্নিচার, ভারী কালো পর্দা, দেয়ালের গাঢ় রঙ আর মৃদু সোনালী আলো —সবকিছুতেই যেনো মালিকের রুচির পাশাপাশি তার ব্যাক্তিত্বের কঠোরতাও প্রকাশ পাচ্ছে।।।
রুমের একপাশে বিশাল একটি কিং সাইজ—বেড। ডার্ক চেরি রঙের হেডবোর্ডের পেছনে নরম আলো জ্বলছে। বেডের দুপাশে কালো কাঠের বেডসাইড টেবিল, তার উপর রাখা একটি মিনি ল্যাম্প।।
অন্য পাশে একটি বিশাল ক্লোজেট। কালো কাঠের পালিশ করা দরজায় মৃদু আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। তার পাশেই রয়েছে আলাদা ড্রেসিং স্পেস—বট আয়না। কালো ভ্যানিটি আর সাজানো প্রসাধনীর সারি।।
রুমে একপাশ জুড়ে বিশাল কাঁচের জানালা। ভারী কালো পর্দার ফাঁক দিয়ে দূরের শহরের আলো দেখা যাচ্ছে। জানালার সামনে রাখা কালো লেদারের একটি সোফা আর নিচু কালো সেন্টার টেবিল।।
সবকিছু একটাই পরিপাটি, নিখুঁত এবং দামী যে রুমটাকে সাধারন কোনো শোবার ঘর মনে হচ্ছে না।। বরং মনে হচ্ছে এটা এমন এক মানুষের ব্যক্তিগত রাজ্য,যার জীবনে নিয়মের বাইরে কিছুই চলে না।।
মেয়েটির দৃষ্টি ধীরে ধীরে পুরো রুমটাকে দেখলো।।।
ঠিক তখনি রুমের একপাশে রাখা বিশাল ক্লোজের থেকে কিছু বের করার শব্দ হলো।।
ড্রিম লাইটের আবছা আলোয় মেয়েটি একটি ছায়ামূর্তি দেখতে পেল।।
লোকটি প্রয়োজনীয় জিনিস হাতে নিয়ে কোন রকম কথা না বলে ওয়াশরুমে চলে গেল।।
দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই মেয়েটি আবার চারপাশে তাকাল।এতক্ষণ পর্যন্ত উত্তেজনা খেয়াল না করলেও এখন রুমের প্রতিটি খুঁটিনাটি জিনিস তার চোখে পড়েছে।।
প্রায় ২৫-৩০ মিনিট পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল।। যুবকটি বেরিয়ে এসেই রুমের একপাশে থাকা সুইচবোর্ডে হাত বাড়ালো।।
এক মুহূর্তেই পুরো রুম আলোয় ভেসে উঠলো।।
হঠাৎ তীব্র আলো চোখে পড়ায় মেয়েটি চোখ মুখ কুঁচকে চোখ বন্ধ করে ফেলল।। অনেকক্ষণ অন্ধকারে থাকার পর হঠাৎ আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।।
উত্তর পথ ধীরে ধীরে চোখ মেলল সে। আর তখনি তার চোখ যায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটির উপর।
পুরুষটি বুকের কাছে দুহাত গুঁজে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। পরনে তার ধূসর রঙের টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার।। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাকিয়ে আছে তার দিকেই।।
মেয়েটা খানিক অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।। সেই দৃষ্টির সামনে বেশিক্ষণ স্থির থাকতে না পেরে চোখ সরিয়ে নিল।।
তারপর আবার রুমটা ধীরে ধীরে পরখ করতে লাগলো।।
তবে এইবার আর রুমের বিলাসিতা তার চোখে পড়লো না।।
তার সমস্ত মনোযোগ আটকে রইলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির নীরব উপস্থিতিতে।।।
মেয়েটিকে এমন তাকিয়ে থাকতে দেখে সামনে থাকা লোকটি বলে উঠলো,,
—কিছু বলবে??
লোকটার আকস্মিক কথায় মেয়েটা ভরকে যায়,,
— হ্যাঁ, কি,কই,না তো কি বলবো।।
— তাহলে এইভাবে তাকিয়ে আছো যে?
— না মানে এমনি আর কি।।
লোকটা আর কিছু বললো না, সে পিছন ফিরে বারান্দার দিকে হাটাঁ ধরে তখনি পিছন থেকে একটি কোমল কন্ঠের মেয়েলী স্বর ভেসে আসে,,,
— শুনুন!!
লোকটা যেনো জানত তাকে ডাকা হবে তাই মুখে খানিকটা গাম্ভীর্য ধরে রেখে বলে,,,
—হুম বলো।।
— আপনি কি আমার উপর রেগে আছেন??
— এইসকল কথা বাদ দাও এখন। ভারী লেহেঙ্গা পরে আছো চেঞ্জ করে নাও।।
নিজের মতো বলে লোকটা আবার পা বাড়ায় বারান্দায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে। তখনি পিছন থেকে মেয়েটা মিনমিনে কন্ঠে বলে উঠে,,
— ইয়ে মানে শুনুন।।
— আবার কি হলো?
লোকটার কথা মেয়েটা খানিক অপ্রস্তুত হয়ে পরে। ডানেবামে দৃষ্টি স্থির রেখে,ডান হাতের তালু দিয়ে বাম হাতের তালু ঘস্তে ঘস্তে বলে,
— আমি ছবি তুলবো।।
— মানে?
— মানে আমি আপনার সাথে ছবি তুলবো।
— কেনো? হঠাৎ ছবি তুলার কি হলো?
মেয়েটা এক লাফে বিছানা থেকে নেমে,তড়িৎ বেগে এসে তার সামনে দাঁড়ায়। লোকটা তার থেকে উচ্চতায় লম্বা হওয়ায় মাথা উঁচু করে দৃষ্টি রাখল সমুদ্রের ন্যায় গভীর চোখ দুটোতে।। তারপর আস্তে করে বললো,,
— বিয়ে তো মানুষ জীবনে একবারই করে। তাহলে ছবি তুলবো না। আর ছবি না তুললে আমি ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টিকটকে পোস্ট করবো কিভাবে??
মেয়েটার এমন কথায় লোকটা ভেবাচেকা খেয়ে যায়। তারপর দ্রুত নিজেকে সামলিয়ে এক ভ্রু উঁচু করে বলে
— তাই?
— হুম!!
— বেশ তাহলে।তবে আমারও একটি ইচ্ছে রাখতে হবে।
— কী?
— পরে বলবো, চলো আগে ছবি তুলি।।
মেয়েটার চোখে মুখের হাসি উপচে পরার মতো। বাচ্ছার মতো করে বললো,,
— চলুন।।
বেশ কিছু মিরর সেলফি তুললো। তারপরও মনের মতো হচ্ছে না প্রায় এক ঘন্টা যাবত এমনি করতে থাকে। লোকটা বেশ বিরক্ত হলো তারপর ভারী কন্ঠে বললো
— হয়েছে তো, আর কত ছবি তুলবে?
মেয়েটা মিছেমিছি কান্না মাখা কন্ঠে বললো
— আমার কি দোষ বলুন মনের মতো হচ্ছেই না।।
লোকটা একপাশে ঠোঁট বাকিয়ে হেসে হাস্কি স্বরে বললো,,,
— মিসেস চৌধুরী, আপনার কি পুরো বাসর রাত ছবি তুলে কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে নাকি??
বলেই নিচের ঠোঁট কামরে ধরলো। লোকটার এমন ঠোঁট কাটা কথায় মেয়েটার কান গরম হয়ে গেলো। তারপর দুই আঙ্গুলের সাহায্যে কান ধরে রাখে।।
লোকটা ঠোঁট কামড়ে হেসে উত্তর করল,,
— কেন মিস চৌধুরী বিয়ে যেমন সবার জীবনে একবার আসে বাসর রাতও তেমন সবার জীবনে একবারই আসে। আর এই রাতটা আমি কোন মতেই হাত ছাড়া করবো না।।
বলেই আচমকা তাকে কোলে তুলে নেয়। তারপর ভাড়ী পা ফেলে বিছানার সামনে যায়। আলতো হাতে মেয়েটিকে বিছানায় বসিয়ে আস্তে আস্তে বেশ কোমল হাতে শরীর থেকে এক এক করে সকল ভাড়ী অলংকার গুলো খুলছে।।
বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে যত্ন সহকারে গয়না গুলো খুললো। শেষ গয়নাটা খুলে যখন সেন্টার টেবিলের উপর রাখল তখন মেয়েটার চোখ যায় আর ব্যাক্তিগত পুরুষটির উপর। সেও তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো,দুজনার এমন চোখচোখি তে মেয়েটার কেমন যেনো হাসফাস হতে লাগলো।
লোকটাকে এতটা কাছে দেখে তার হার্টবিট দ্রুত চলতে শুরু করে।
চলবে!!