ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্তঃসমর

২য় পর্ব

লেখক: মোহনা আক্তার মাহিয়া

#অন্তঃসমর ( পর্ব—০২ )

#লেখনীতে_মোহনা_আক্তার_মাহিয়া

.

আকাশে গুমোট ভাব। যেকোনো সময় মেঘ ভেঙে বৃষ্টি কণা ঝড়ে পড়বে মাটির বুকে। ওসমান তড়িঘড়ি করে বেরিয়েছে গুলবাহারকে নিয়ে। তখন আহান শেষ কথাটা বলেই কল কেটে দিয়েছিল। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ওসমান লাগাতার ফোন করছে কিন্তু ফোন ধরছে না। মনের মধ্যে বেশ সন্দেহ জাগল তার। ছেলেটা ঠিক আছে তো? অতিরিক্ত টেনশনে ওসমান অনবরত থুতনিতে বাঁ হাতের দুই আঙুল ঘষতে থাকে। কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়েছে। গাড়ির জানালা ভেদ করে আসা শীতল বাতাসে তার চুল উড়ছে এলোমেলোভাবে। ওসমানের ফ্ল্যাট থেকে আহানের বাড়ির দূরত্ব গাড়ি দিয়ে চল্লিশ মিনিটের মতো। তারমধ্যে রাস্তায় আরো গাড়ি চলাচল করার ফলে সাবধানে এবং সিগন্যাল মেনে গাড়ি চালাতে হচ্ছে গুলবাহারকে। পেছনে তাদের আরো একটা গাড়ি তাদের অনুসরণ করে আসছে। ওসমান নিজেকে উপরে যতোই শান্ত রাখার চেষ্টা করুক না কেন ভেতরে তার অস্থিরতা তীব্র হচ্ছে। অবশেষে তারা পৌঁছায় আহানের বাড়ির সামনে। ওসমান গাড়ি থেকে নেমে ছুটে গেল বাড়ির ভেতরে। ইট পাথরের দোতলা একটা সাদামাটা বাড়ি। সর্দারকে যেতে দেখে গুলবাহারও বন্দুক হাতে পিছু নিল। ওসমান থমকে দাঁড়ায় সদর দরজার সামনে। দরজা আগে থেকেই খোলা। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে ড্রয়িং রুমে বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে থাকা আসবাবপত্র। দুরুদুরু বুকে এগিয়ে গেল সে।

ড্রয়িং রুমের কোথাও আহানকে দেখা গেল না। ওসমান এবার দৌড়ে গেল দোতলায়। সেখানে প্রথমেই গেল আহানের বেডরুমের দিকে। রুমে ঢোকে তার পা থমকে যায়। র ক্তে রঞ্জিত মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে আহান। তার নিভু নিভু দৃষ্টি দরজার দিকেই স্থির হয়ে আছে। ওসমানের অপেক্ষা করছিল বুঝি? ওসমানের পায়ের তলা কেঁপে উঠল। সামনে এগিয়ে যেতে ভয় করছে তার। এক মুহূর্ত এভাবেই কেটে গেল। যখন ঘটনাটা ঠিক বুঝতে পারল, তখন আর ওসমান নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ছুটে গেল বন্ধুর র-ক্তাক্ত দেহটার দিকে। আহানের মাথাটা ঠাই পেল তার কোলে। সফেদ রঙের পাঞ্জাবি রঞ্জিত হলো ওসমানের। সে চিৎকার করে ডাকল,

“ আহান! ভাই আমার চোখ খোল। আহান! এভাবে তুই ছেড়ে যেতে পারিস না। কে গুলি করল তোকে! ”

তার চিৎকার শুনে গুলবাহার দৌড়ে এলো। সে নিজেও হতবাক হয়ে গেল পরিবেশটা দেখে। মুখ দিয়ে শুধু উচ্চারণ করল,

“ সর্দারজি! ”

ওসমানের দু'চোখ ছাপিয়ে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ সে খেয়াল করল মেঝেতে কিছু লেখা আছে। ওসমান পাঞ্জাবির হাতায় চোখ মুছে স্পষ্টভাবে তাকায়‌। সাদা মেঝেতে র ক্ত দিয়ে কম্পিত হাতে তিনটা অক্ষর লেখা, 'আলমারি, বোনু, হেফাজত' ।

আহত অবস্থায় আহান এই তিনটা শব্দ লিখেছিল। সে তিনটা শব্দ দিয়ে কি বোঝাতে চেয়েছে তা এই মুহূর্তে ওসমানের মাথায় ঢুকছে না। তবে এটুকু বুঝতে পারল আলমারির দিকে কিছু আছে। ওসমান ছুটে যায় আহানের রুমে থাকা বড় আলমারির দিকে। কপাট খুলতে গিয়ে দেখল তালা দেওয়া। চাবি কোথায় আছে ওসমান জানে, কিন্তু এখন সেখানে চাবি নেই। দু'হাতে মাথা চেপে ধরল সে। উপায়ান্তর না পেয়ে ভিন্ন পদ্ধতিতে আলমারির তালা নষ্ট করে খুলে ফেলল। ভেতরের দৃশ্য দেখে ওসমান হতভম্ব হয়ে গেল। এটা আহানের ছোট বোন না? আলমারির ডান দিকের একটা অংশে কাচুমাচু হয়ে দু'হাতে মুখ চেপে বসে আছে সৈয়দা নূর মারিয়াম। মুখের অর্ধেকটা ওড়নার আড়ালে ঢেকে আছে। আলমারির কপাট খোলা দেখে ভড়কে গেল মেয়েটা। ফর্সা মুখখানা রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার মতো হয়ে আছে। মাথার কাপড়টা আরেকটু টেনে নিল। নূর আর ওসমানের এই প্রথম এতটা কাছ থেকে সরাসরি সাক্ষাৎকার হলো। ওসমান তাকে আস্থা দিয়ে বলল,

“ ভয় পাবেন না, আমি ওসমান। বেরিয়ে আসুন।

নূর বেরিয়ে এলো একাই। বড় ভাইয়ের নিথর দেহটা দেখে দৌড়ে গেল। সে আবছা দেখেছিল আলমারির ফাঁকফোকর দিয়ে, এই তো মিনিট পাঁচেক আগে বেশ কয়েকজন লোক রুমে উপস্থিত ছিল। আহানের সাথে বেশ অনেক্ষণ ধস্তাধস্তি হয়। হঠাৎ তাদের মধ্যে একজন লোক তার ভাইকে পরপর দুটো গুলি করে চলে যায়। মুখটা স্পষ্ট না দেখলেও উচ্চতা, দেহের গঠন সব তার মনে আছে। নূর চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। তার হলুদ রঙের থ্রিপিস লাল হয়ে গেল। হঠাৎ বাড়ির পেছনে কয়েক জোড়া পায়ের ধুপধাপ শব্দ ভেসে এলো। ওসমান সতর্ক হয়। নূরের পাশে গিয়ে নিচু স্বরে বলল,

“ আমাদের এখান থেকে যেতে হবে। আপনি আমার সাথে চলুন। ”

নূর কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট গলায় বলল, “ ওরা আমার ভাইজানকে মেরে ফেলেছে, আমি ভাইজানকে রেখে কোথাও যাব না। আপনি চলে যান এখান থেকে। ”

“ দেখুন বিপদ আশেপাশে ঘুরঘুর করছে। প্লিজ আমার সাথে চলুন। আমার কথাটা একটু বোঝার চেষ্টা করেন। আমায় ভরসা করতে পারেন। ”

হঠাৎ একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটল। নূর আর ওসমান দু'জনই ছিটকে সরে গেল আহানের থেকে।

—

রাতের শেষ প্রহর চলমান। সাথে তীব্র বৃষ্টি হচ্ছে ধরণীর বুকে। ওসমানের ফ্লাটে থমকে বসে আছে নূর। গায়ে ওসমানের কালো শাল জড়ানো। ওসমান বারান্দায় আছে। তার দৃষ্টি স্থির বৃষ্টিবহুল প্রকৃতিতে। বৃষ্টি কণা তাকে ছুঁতে পারছে না মাঝে কাঁচের দেয়াল থাকায়। গুলবাহার আপাতত এখানে নেই। তাদের একজন লোককে পাঠানো হয়েছে নূরের জন্য কাপড় নিয়ে আসার জন্য। এত রাতে কোনো শপিং মল খোলা পাওয়া মুশকিল। তাই আহানের বাড়িতেই লোক পাঠিয়েছে ওসমান। সেখান থেকে নূরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তারা ব্যাগে করে নিয়ে আসছে। দশ মিনিট পর ওসমানের রুমের দরজায় কড়া নাড়ল। ওসমান বারান্দা ছেড়ে রুমে আসে। এক পলক তাকায় ডিভানে স্থির হয়ে বসে থাকা মেয়েটার দিকে। সে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে দরজা খুলে দেয়। ফারুক নামের লোকটা একটা ব্যাগ ওসমানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। ওসমান দরজা চাপিয়ে এগিয়ে এসে নূরের সামনে দাঁড়ায় দূরত্ব রেখে। সামনের ছোট টেবিলটায় ব্যাগ রেখে শান্ত গলায় বলল,

“ আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন আমি বাহিরে আছি। ”

নূরের কোনো হেলদোল নেই। ওসমান দৃষ্টি নত রেখেই রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ড্রয়িং রুমে এসে সে ফারুককে ডাকল,

“ফারুক? ”

ডাক শুনে ফারুক ছুটে এলো সর্দারের সামনে। মাথা নিচু করে ধীর গলায় বলল, “ জ্বি সর্দারজি! ”

“ খাবারের ব্যবস্থা করো। ”

বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ফারুক আদেশ অনুযায়ী বেরিয়ে গেল দু'জন লোক নিয়ে। ড্রয়িং রুমে পায়চারি শুরু করল ওসমান। বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। হাত দুটো পেছনে মুষ্টিবদ্ধ করা। চুলগুলো চোখের সামনে আঁচড়ে পড়েছে। গায়ের পাঞ্জাবিতে খয়েরি রং ধারণ করেছে। মনের মধ্যে সূত্র মেলাতে মেলাতে কখন যে সময় পেরিয়ে গেল জানা নেই ওসমানের। তার ধ্যান ভাঙল ফোনের শব্দে। পাঞ্জাবির পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখল গুলবাহার ফোন দিয়েছে। ওসমান রিসিভ করল।‌ ওপাশ থেকে গুলবাহার নিচু স্বরে বলল,

“ আসসালামু আলাইকুম, সর্দারজি। ”

“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম। কি অবস্থা গুলবাহার? ”

“ অবস্থা খুবই শোচনীয়। বলা যাচ্ছে না কি হবে। এখন দোয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই।‌ ”

ওসমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল। তারপর ক্লান্ত গলায় বলল, “ আল্লাহ হেফাজত করুক। সাবধানে থেকো, কি হয় আমায় খবর দিও। ”

কল কেটে গেল। এদিকে ফারুকও এসে হাজির হয়। হাতে খাবারের প্যাকেট নিয়ে রান্নাঘরে চলে যায় সে। এখানে শুধু ওসমান আর নূরের জন্যই খাবার আনা হয়নি, তাদের সাথে আরো লোকজন যারা আছে সবার জন্যই নিয়ে এসেছে। তবে ওসমান আর নূরের জন্য আগে খাবার প্লেটে সাজিয়ে দিল ফারুক। রান্নাঘর থেকে ড্রয়িং রুম স্পষ্ট দেখা যায়। ওসমান বলল,

“ একটা প্লেট নিয়ে এসো। ”

ফারুক কথামতো তাই করল। নূর যেই রুমে আছে সেই রুমের দরজায় ওসমান টোকা দিয়ে বলল, “ আমি কি ভেতরে আসব? ”

ভেতর থেকে তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর এলো না।‌ ওসমান অপেক্ষা করল অনুমতি পাওয়ার। একটু সময় পেরিয়ে নূরের ভাঙা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“ আসুন। ”

ওসমান ফারুকের হাত থেকে বিরিয়ানির প্লেটটা নিজ হাতে নিয়ে রুমের ভেতরে প্রবেশ করল। ফারুক দরজা থেকেই চলে যায়। ওসমান এক পলক তাকাল মেয়েটার দিকে। যেভাবে বসা দেখে গিয়েছিল এখনও ঠিক একইভাবে বসে আছে। সে দৃষ্টি নত করে প্লেট নিয়ে রাখল টেবিলে। গ্লাসে পানি ঢেলে এগিয়ে দিল। নূর গ্লাসের দিকে একবার তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ওসমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে নূরের বরাবর হয়ে বিছানায় বসে। তারপর শান্ত গলায় বলল,

“ এভাবে ভেঙে পড়লে হবে না। ফ্রেশ হয়ে কিছু অন্তত খেয়ে নিন! ”

নূর তাকায় ওসমানের দিকে। যার দৃষ্টি নত। নূর কম্পিত গলায় বলল, “ আমার ভাইজান কখনো কারোর ক্ষতি করেনি। তবে সৃষ্টিকর্তা কেন এমন করল? ”

ডুকরে কেঁদে উঠল নূর। তার মাথার উপর যে মানুষটা ছায়া হয়ে থাকত সেই আজ তার থেকে দূরে। ওসমান তাকায় কান্নারত নূরের দিকে। স্বান্তনার সুরে বলল,

“ আপনি কাঁদবেন না, নূর। আমাকে একটু ভরসা করুন। আমি আছি আপনার পাশে। ”

নূর পাগল প্রায়। দু'হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কাঁদছে। ওসমান দু'হাতে মুখ ঢেকে নিজের চোখের পানি আড়াল করল। একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করে উঠে এসে নূরের পাশে বসে দূরত্ব রেখে। পানির গ্লাসটা ফের হাতে নিয়ে মেয়েটার মুখের সমানে ধরে। ফর্সা মেয়েটার নাকের ডগা টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। ওসমান পাশ থেকে টিস্যু এগিয়ে দেয়। নূর তা নিয়ে চোখ মুখ মুছলে আবার ভরে উঠে। নিজেকে সামলাতে পানির গ্লাস হাতে নেয় সে। তারপর এক ঢোঁক পানি খেয়ে রেখে দেয়। ওসমান গরম গরম বিরিয়ানির প্লেটটা এগিয়ে দেয়। নূর একবার তাকায় প্লেটের দিকে। তার মনে পড়ে, সে যখন ভার্সিটিতে থাকত তখন আহান বিরিয়ানি রান্না করত নিজ হাতে। নূর বাড়ি ফিরলে দুই ভাই-বোন একসাথে খেতে বসতো। আহান নিজ হাতে বোনকে খাইয়ে দিত। আজ সেসব স্মৃতি হয়ে থাকবে। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায় নূর। ক্ষীণ স্বরে বলল,

“ এই খাবার আমি খেতে পারব না। আপনি নিয়ে যান এসব। ”

“ খাওয়া-দাওয়া না করলে অসুস্থ হয়ে যাবেন! ”

“ আমার মনের অসুখের কাছে শারীরিক অসুস্থতা খুবই সামান্য। ”

ওসমান চামচে বিরিয়ানি তুলে নেয়। সে বুঝল মেয়েটা খাবে না। তাই বাধ্য হয়ে চামচ নূরের মুখের সামনে ধরে বলল,

“ আপনার ভাইজান আমার বন্ধু। তারচেয়েও বেশি আমার ভাই ছিল। তার আমানত আপনি। আর আপনাকে হেফাজতে রাখার আবদার করে গিয়েছে আহান। এখন আপনিই বলেন, আমি যদি কথা রাখতে না পারি তাহলে আমার বন্ধুকে কি জবাব দিব? ”

নূর শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় ওসমানের দিকে। ওসমানও এক নজর তাকাল। চোখের মিলন হলো দুজনার। সাথে সাথে দু'জন দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল। নূর খাবার মুখে নিয়ে ওসমানের হাত থেকে চামচ নিজ হাতে নেয়। তারপর নিজেই প্লেট নিয়ে কয়েক চামচ বিরিয়ানি মুখে পুরে দেয়। গলা দিয়ে খাবার নামতে চাইল না। বহু কষ্টে একটু খেল মেয়েটা। তারপর খাবার ওভাবেই রেখে দেয়। ওসমান আর জোর করল না। সে প্লেট নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,

“ আপনি ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিন। আমরা সকালে কাশ্মীরে ফিরব। ”

“ কাশ্মীরে যাব কেন? ”

“ আমার বাড়িতে। এখানে আপনাকে একা রেখে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। তাছাড়া এত বড় ঘটনা ঘটার পর এখনও বুঝতে পারলাম না কে বা কারা এমনটা করল।‌ দেখা গেল পরবর্তী এ্যাটাক আপনার উপর হলো! এই রিস্ক আমি দিতে চাই না। একটু ঘুমানোর চেষ্টা করুন, আসছি। প্রয়োজন হলে ডাকবেন আমি বাহিরেই আছি। ”

ওসমান আর দাঁড়ায় না। চলে গেল দরজা চাপিয়ে।‌ নূর কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে ব্যাগ হাতে নেয়। লোকগুলো তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সবই এনেছে। গায়ের শালটা ডিভানে রেখে ব্যাগ থেকে জামাকাপড় নিয়ে চলে গেল ওয়াশরুমে। তারপর ফ্রেশ হয়ে এলো অনেকটা সময় নিয়ে। মাথাটা টনটন করছে ব্যথায়। সাদা বিছানায় ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে বসতেই নূরের চোখে ঘুমেরা হানা দেয়।

—

মেঘেদের মন এখনও ভালো হয়নি। রাতভর ভারী বর্ষণের পরেও ক্ষ্যান্ত হয়নি ওরা। ঝড়ের তান্ডব বহাল রেখেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছে। যেন মেঘেদের বুকের কষ্টটা এখনও ফুরোয়নি। ঠিক ওসমান আর নূরের মতো!

নূরের ঘুম ভাঙল সকাল দশটায়। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই নিজেকে ভিন্ন জগতে যেন আবিষ্কার করল। এটা তো তার বাড়ি নয়! কিছু মুহূর্ত পর গতকাল রাতের তিক্ত অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কে নাড়াচাড়া দিল।‌ নূর বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। কয়েক পা এগোতেই মুখোমুখি হয় ওসমান। নূর অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বলল,

“ আমাকে বাড়ি দিয়ে আসুন। আমি ভাইজানের রুমে যাব। আমার ভাইজান এখনও ওখানেই আছে। আমায় নিয়ে যাবেন প্লিজ! ”

অস্থির হয়ে উঠল মেয়েটা। ওসমান তাকে শান্ত করতে বলল, “ ওখানে যাওয়া যাবে না। ”

“ কেন? আমাকে যেতে দিন। ”

“ “মিস নূর, আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন—আপনার ভাইজান একজন আইএসআই অফিসার। তাঁর বাড়িতে এমন ঘটনা ঘটেছে। এখন নিশ্চয়ই নিরাপত্তা বাহিনী ও তদন্তকারী দল সেখানে কাজ করছে। এই মুহূর্তে আপনাকে সেখানে যেতে দেওয়া নিরাপদ হবে না। ”

“ আমি এতকিছু জানি না, আমায় যেতে দিন দয়া করে।”

নূর অস্থির হয়ে গেল যাওয়ার জন্য। সে ওসমানকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে ওসমান তার হাত ধরে আটকে ফেলল। এই প্রথমবার ওসমান নূরের হাতে স্পর্শ করল। নূর বেরিয়ে যেতে না চাইলে হয়তো ওসমান দূরেই থাকত। সেসবে ভাবান্তর নেই মেয়েটার। সে ছটফট করল বের হওয়ার জন্য। ওসমান তার লোকদের আদেশ করল মেইন দরজা লাগিয়ে দেওয়ার জন্য। তারাও তাই করল। ওসমান নূরের হাত ধরে টেনেটুনে রুমে নিয়ে যায়। তারপর দরজার উপরের ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। নূর এখনও উথালপাথাল করছে বের হওয়ার জন্য। ওসমান তাকে ডিভানে বসিয়ে পানি এগিয়ে দেয়। নূর কাঁদছে আর কি যেন বিড়বিড় করছে। পানির গ্লাস দেখে ক্ষেপে গেল মেয়েটা,

“ আপনি মানুষ নাকি আর কিছু? ”

নূর যতটা ক্ষিপ্ত, তারচেয়েও বেশি শান্ত হয়ে আছে ওসমান,

“ পানিটা খেয়ে শান্ত হোন। আর আমার কথা শুনুন। ”

নূর অবাক না হয়ে পারল না।‌ এমন পরিস্থিতিতে একটা মানুষ এতটা শান্ত থাকতে পারে কিভাবে? সে নিজেকে সংযত করে পানি খায়। ওসমান সময় দিল নূরকে। মেয়েটা একটু সময় নিয়ে একেবারে শান্ত হয়ে গেল।‌ আর কাঁদল না। ওসমানের দৃষ্টি মেঝেতে। সে শীতল গলায় বলল,

“ এই মুহূর্তে আপনি খুব বিপদে আছেন, নূর। তাই আমাকে বলুন কি হয়েছিল? ”

নূর কিছু বলল না। সে অন্যমনস্ক হয়ে বসে রইল। ওসমান উত্তরের অপেক্ষা করেও যখন উত্তর পেল না তখন ক্ষীণ গলায় ডাকল,

“ নূর? ”

ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে নূর ছোট করে জবাব দিল, “হুম? ”

“ ভয় পাচ্ছেন? ”

“ কেন পাব? ”

“ না পেলেই ভালো। শুনুন, আপনাকে আমি আমার বাড়ি নিয়ে যাব। ওখানে আমার আম্মাজান ব্যতীত কেউই জানে না আপনি আহানের বোন। তবুও নিজের পরিচয়টুকু গোপন রাখবেন। ”

নূরের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে সন্দিহান গলায় বলল, “কেন? ”

“ শত্রু কে আমি জানি না। সেটা জানতে হলে আপনার সাহায্য আমার খুব প্রয়োজন। আপনি যতক্ষণ না আমায় কিছু বলছেন ততক্ষণ আপনাকে গোপন রাখতে হবে আপনি যে আহানের বোন। ”

নূর কিছু বলল না। ওসমান বোঝানোর জন্য আরও বলল,

“ আপনি যদি এখানে থাকেন আর কোনো বিপদে পড়েন তাহলে আমি আপনাকে সেফটি দিতে পারব না। কাজেই এই পরিস্থিতিতে আমার সাথে আপনি যেতে আপত্তি করবেন না। ”

নূর এবারও কিছু বলল না। ওসমান উত্তর না পেয়ে মেয়েটার দিকে চোখ তুলে তাকায়। পাথরের মতো বসে আছে সে। নূর জানে এখানে থাকলে তার বিপদ হবে। এটাও জানে ওসমান কেমন মানুষ। তার ভাইজান আহান সব সময় সর্দার ওসমানের গল্প করত তার সাথে। এছাড়া নূর হাতে গোনা কয়েকবার লোকটাকে দূর থেকে দেখেছে।‌ ওসমান অবশ্য তেমন একটা দেখেনি তাকে সরাসরি। যতদূর দেখেছে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে।‌ হঠাৎ নূরের কিছু মনে পড়তেই সে চট করে তাকায় ওসমানের দিকে। ওসমান আগে থেকেই তার দিকে তাকিয়ে ছিল।‌ নূর বলল,

“ আমার মোবাইল, ভাইজানের ল্যাপটপ এগুলো কোথায়?”

“ আপনার মোবাইল, আহানের ল্যাপটপ কোথাও দেখিনি।”

নূর অবাক হয়ে গেল। আশ্চর্য! আহানের ল্যাপটপ তো বিছানায়ই ছিল। তাহলে পায়নি কেন? নূর ভাবতে শুরু করল। আলমারির ভেতর থেকে আবছা যেই দৃশ্য দেখেছিল তা মানসপটে ভেসে উঠল।‌ কেঁপে উঠল মেয়েটা। হঠাৎ তাকে চমকাতে দেখে ওসমান চিন্তিত গলায় বলল,

“ আপনি ঠিক আছেন? ”

নূর ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিল ডিভানের হাতলে। তারপর চোখ বন্ধ করে ক্লান্ত গলায় বলল, “ আমার জীবনটা এভাবে এলোমেলো না হলেও পারত! ”

“ সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। কিন্তু আমাকে একটা কথা বলুন তো, মোবাইল ল্যাপটপ কেন খুঁজলেন? ”

“ এমনি। ” নূরের ছোট জবাব। ওসমান জানে এমনি এমনি জিজ্ঞেস করেনি। তবে এখন আর পাল্টা প্রশ্ন করল না। মেয়েটা এমনিই ভেঙে পড়েছে। যখন ইচ্ছে হবে তখনই না হয় বলবে। ওসমান সব প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় রইল।

_________________

চলবে...!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন