ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্তঃসমর

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: মোহনা আক্তার মাহিয়া

#অন্তঃসমর ( পর্ব—০৬ )

#লেখনীতে_মোহনা_আক্তার_মাহিয়া

.

সময় নদীর স্রোতের মতোই বয়ে চলে। কেটে গেল দু'টো দিন। নূর এখন পুরোপুরি সুস্থ হলেও শরীর সামান্য দুর্বল। দু'দিন ধরে জামিলা বানু মেয়েটার সাথেই থেকেছেন। নূর নিজের কথা মতো আর কান্নাকাটি করেনি। ঠিকমতো ঘুমানোর চেষ্টা করেছে, খাবার খেয়েছে। ওসমান নূরের মানসিক অবস্থা নিয়ে একটু চিন্তিত ছিল।‌ যখন দেখল নূর স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে তখন একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলেছিল।

ওসমান নিজের রুমে বসে আড়তের কিছু হিসাব করছিল।‌হঠাৎ দরজায় কেউ কড়া নাড়ায় হিসাবের কাজে বিঘ্ন ঘটে। সে বিরক্ত হলো না। বরং ব্যস্ত গলায় গলা উঁচিয়ে বলল,

“কে? ভেতরে আসুন।”

নূর দরজা ঠেলে ভেতরে এলো। এই প্রথমবার নূর ওসমানের রুমে পা রেখেছে। সন্ধ্যা নামতেই আজাদ কাশ্মীরের বাতাসে হালকা শীতের আমেজ নেমেছে। তাই নূর গায়ে পাতলা চাদর জড়িয়েছে। কে এসেছে দেখতে ওসমান চকিতে তাকাল। নূরকে একপলক দেখে হাতের খাতা কলম রেখে দিল। তারপর জিজ্ঞেস করল,

“কি ব্যাপার মারিয়াম? কিছু বলবেন? ”

নূর উপর-নিচ মাথা নাড়ায়। ওসমান উঠে এসে দরজার বাইরে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখল কেউ আছে কি-না। তারপর ফিরে এসে নূরকে বলল, “বসে কথা বলুন। ”

নূর সোফায় বসল। ওসমান তার মুখোমুখি হয়ে খাটের কোণায় বসে সাবলীল ভঙ্গিতে। নূর শুকনো ঢোঁক গিলে বলল,

“ভাইজানের ল্যাপটপটা কোথাও পাননি? ”

ওসমানের ভ্রু কুঁচকে যায়। ল্যাপটপের কথা নূর আগেও একবার বলেছিল। সে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“ল্যাপটপ তো কোথাও পাইনি। কি আছে ল্যাপটপে?”

নূর কিছু বলবে নাকি দ্বিধায় পড়ল। এই কয়দিনে সে এটা নিশ্চিত যে সর্দার ওসমান শাহ তৈয়ব নামক লোকটা মন্দ নয়, বরং ভরসা করা যায়। তবুও মেয়েটা সাহস করতে পারছে না। তাই কথা ঘুরিয়ে বলল,

“না মানে ভাইজানের সাথে প্রতিটা সুন্দর মুহূর্ত ক্যাপচার করা হয়েছিল। সব ছবি, ভিডিও ভাইজানের ল্যাপটপে ছিল। সে তো এখন নেই, তাই যদি ল্যাপটপটা পাওয়া যেত তাহলে স্মৃতিগুলো দেখতে পারতাম। ”

কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা নয়। নূর আর আহান যখনই কোনো সুন্দর মুহূর্ত কাটাত তখন দুই ভাই-বোন মিলে পুরো মুহূর্তটা ক্যামেরা বন্দি করত। সেসব ফাইল বানিয়ে আহান নিজের ল্যাপটপে রেখে দিয়েছিল। ওসমানও জানে নূর মিথ্যা বলেনি। বন্ধুর জানপ্রাণ ছিল ছোট বোনটা। ওসমান কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বলল,

“আপনার কথা অনুযায়ী সেদিন আমি আবার লোক পাঠিয়েছিলাম ওই বাড়িতে। কিন্তু কোথাও কোনো ল্যাপটপ বা মোবাইল পাওয়া যায়নি। ”

ওসমানের কথায় নূর চিন্তিত হলো। সে দেখেছিল তার ভাইজান খুবই সিরিয়াস হয়ে ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিল, তারপর কারোর সাথে ফোনে কথাও বলেছিল। কার সাথে কি কথা বলেছে তা নূর শোনেনি। আহান কথা শেষ করে নূরকে নিজের রুমে ডেকেছিল কিছু বলার জন্য। নূর রান্নাঘরে একটু কাজ করছিল তখন, হাতের কাজটা শেষ করতে কিছুক্ষণ সময় লেগে যায়। তারপর সে আহানের রুমে গিয়ে দেখল, বিছানায় বসে আহান ল্যাপটপ চালাচ্ছে। নূরকে দেখেই বোনু বলে কাছে ডাকল। মেয়েটা এক কদম এগিয়ে যেতেই বাড়ির কলিং বেল বেজে উঠল। কোনো কথা ছাড়াই আহান ছুটে গেল নিচে। ফিরে আসল দুই মিনিট পরই। এসেই উদ্বিগ্ন হয়ে নূরকে লুকাতে ব্যস্ত হয়। মেয়েটা এতবার প্রশ্ন করল অথচ আহান একটা উত্তরও দেয়নি। শুধু বলেছিল, দুনিয়াতে যেমন খারাপ মানুষ আছে তেমনি ভালো মানুষও আছে, আর ওসমান আমার শেষ ভরসা। এই বলে আলমারির কপাট লাগিয়ে তালাবদ্ধ করে দেয় আহান। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটেছিল যে নূর কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসেছিল।‌ যখন একাধিক পায়ের শব্দ পেল তখনই আলমারির ফাঁকফোকর দিয়ে রুমের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করেছিল।

“মারিয়াম?”

নূরের ধ্যান ভেঙে চমকে উঠে বলল, “জ্বি? ”

ওসমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ঠিক আছেন আপনি? ”

নূর এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে দৃঢ় গলায় বলল, “জ্বি ঠিক আছি। ”

“আপনি সেদিন...! কে? কে বাইরে?”

কথার মাঝে ওসমানের কণ্ঠস্বর পাল্টে গেল।‌ সে দ্রুত রুমের পেছনের দরজার দিকে চলে গেল। কারণ এই মুহূর্তে দু'জনই স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে কেউ দৌড়ে পালিয়েছে। কাঠের ফ্রেমে বসানো কাঁচের দরজার ছিটকিনি খুলে ওসমান বারান্দায় বেরিয়ে এলো। তার পেছনে নূরও বেরিয়ে আসে। নীলম নদীর দিক থেকে বয়ে আসা শীতল বাতাস দু'জনকে এক ঝলক ছুঁয়ে গেল।‌ নূর আশেপাশে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল কে ছিল আর কোথায় গেল।‌ ওসমান দরজায় ডান দিকে দুই কদম এগিয়ে গিয়ে থেমে গেল। নিঃশ্বাস নিল জোরে জোরে। ভেতরে ভেতরে যেমন অবাক হলো তেমনি ক্ষুব্ধ হলো। নূর চিন্তিত গলায় বলল,

“কে ছিল বলুন তো! আড়ি পেতে আমাদের কথা কেন শুনবে কেউ? ”

ওসমানের ক্ষীণ জবাব ভেসে এলো তৎক্ষণাৎ, “খুব কাছের একজন মানুষ ছিল।‌”

“কি বললেন শুনতে পাইনি। ”

ওসমান বাঁ হাতের দুই আঙুল দিয়ে কয়েকবার থুতনি ঘষল। তারপর নূরের উদ্দেশ্যে বলল, “আপনি ঘরে যান, বাকি কথা পরে হবে। ”

নূর মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। যেহেতু এটা বাড়ির পেছনের দিক, তাই সচরাচর মানুষ এখানে তেমন দেখা যায় না। বিশেষ করে বিকেলের পর থেকে। ওসমান বেশ কিছুক্ষণ পায়চারি করে রুমে ফিরে আসে।

রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষে যে যার রুমে গেলেও ওসমান চলে যায় আয়াজের রুমে। দরজায় টোকা দিতেই আয়াজ ফিরে তাকায়। ওসমানকে দেখে এক গাল হেসে বলল,

“মেজো ভাইজান ভেতরে আসুন। ”

ওসমান ভেতরে এসে কেদারায় পায়ের উপর পা তুলে বসে। আয়াজ তার মেজো ভাইজানের সামনে সাবলীলভাবে দাঁড়াল। ওসমান তাকে ইশারায় বসতে বললে আয়াজ উত্তর দিল, “সমস্যা নেই মেজো ভাইজান। আপনি বলুন আমি শুনছি।”

“বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কি হয়, আয়াজ? ”

আয়াজের ভ্রু কুঁচকে গেল। কথাটা ঠিক বুঝতে না পেরে ফের প্রশ্ন করল, “ঠিক বুঝলাম না মেজো ভাইজান।”

ওসমান হঠাৎ হেসে উঠল মৃদু শব্দ করে। আয়াজ একটু ভড়কে গেল বোধহয়। সে আমতা আমতা করে বলল,

“হাসছেন কেন? আমি কী কোনো ভুল করেছি?”

ওসমানের হাসি থেমে গেল।‌ সে উঠে এসে আয়াজের সামনে দাঁড়ায়। তারপর মুখটা ছোট ভাইয়ের কানের কাছে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

“তুমি যেই পথে প্রশিক্ষণ নিচ্ছ, সেই পথের পথ প্রদর্শক আমি। ”

আয়াজের মাথাটা নিচু হয়ে গেল। দৃষ্টি এলোমেলো হয়ে সময় লাগল না। ওসমান এবার এক পা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে ছোট ভাইকে পরখ করল। তারপর তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

“তোমার নাড়ি নক্ষত্র বের করতে আমার সময় লাগবে না, আয়াজ। তাই সাবধান করতে এলাম। পরেরবার যেন এসব না দেখি। ”

“ভুল হয়ে গেছে মেজো ভাইজান। কিন্তু আমি কিছুই শুনিনি। ”

ওসমান আবারও হেসে উঠল। অতিরিক্ত উত্তেজনায় ছেলেটা নিজের ফাঁদে নিজেই পা দিয়েছে। ওসমান বলল, “আমি কখন বললাম তুমি কিছু শুনেছো? আমি তো সেই প্রসঙ্গ তুলিই নি। যাক নিজ মুখে স্বীকার করেছো আমি খুশি হলাম। নিজের ঈমান ধরে রাখো। সৃষ্টিকর্তা অপকর্ম সইবেন না। ”

ওসমান কথাগুলো প্রথমে হেসে বললেও শেষের দুটো বাক্য কাঠিন্য গলায় বলল। সে আর দাঁড়াল না একটা মুহূর্তও। গটগট পায়ে চলে গেল রুম থেকে। ওসমান যেতেই রুমে প্রবেশ করল ওমর। সে এগিয়ে এসে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখল।‌ আয়াজ ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে ওমরের হাত সরিয়ে দেয়। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“আমাকে অপমান করে গেল!”

“বদলা নিতে চাও তো? ”

আয়াজ তাকাল ওমরের দিকে। ওমর গিয়ে কেদারায় বসে আয়েশ করে। তারপর বাঁকা হেসে বলল,

“তুমি সর্বদা বাড়ির ছোট পুত্র। তোমাকে কেউ অপমান করার সাহস রাখে না। এই আজাদ কাশ্মীরের কুন্দল শাহী গ্রামের ভবিষ্যত সর্দার তুমি, তোমাকে হতে হবে আরো সাহসী।‌ ”

ওমরের কথাগুলো আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করল। আয়াজ ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠল। ওমর বিরক্তিতে 'চ' সূচক শব্দ করে বলল,

“আহা মেরা ভাই! তুমি এত পেরেশান হচ্ছো কেন? আমি আছি তো তোমার পাশে! আচ্ছা, কেন তোমাকে এসব বলে গেল ওসমান? ”

আয়াজ দরজা লাগিয়ে দিয়ে এসে ওমরের পাশের কেদারায় বসল। তারপর নিচু গলায় বলল,

“ওই মেয়েটা কোনো একটা ল্যাপটপের খোঁজ করছিল।‌”

ওমরের কপালে ভাঁজ পড়ল, “কোন মেয়েটা? মারিয়াম নাম বোধহয়, সে? ”

আয়াজ উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়। ওমরের কপালের ভাঁজ বিস্তার লাভ করল।‌ মনে মনে কিছু সূত্র মেলাতে ব্যস্ত হয়।‌ আয়াজ পাশ থেকে বলল,

“আমি আপনার কথা মতোই চলব, বড় ভাইজান। ”

ওমর ভাবনা থেকে বেরিয়ে তার দিকে তাকাল।‌ আয়াজের পিঠ চাপড়ে বাহবা দিল, “ সাব্বাস আমার ভাই! আমি তোমার সাথে আছি সব সময়। ”

ওমর আর আয়াজ দু'জনেই হেসে উঠল।‌ কিছু সময় মানুষ প্রতিহিংসার কারণে ভুল পথে চলে যায়। সেই ভুলের ভবিষ্যৎ আদৌও ভালো হয় তো?

আজ আর জামিলা বানুকে নূরের সাথে ঘুমাতে হলো না। নূর নিজেই বলেছে সে একা থাকতে পারবে। গত দুইদিন মেয়েটা নিজ চোখে দেখেছে জামিলা বানু সারারাত জেগে ছিল। বয়স্ক মানুষ এভাবে না ঘুমিয়ে রাত কাটানোর কোনো মানেই হয় না।

রাত এগারোটা বেজে পাঁচ মিনিট। ঘুম না আসার নূর নামাজে দাঁড়িয়েছে। দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে মোনাজাত ধরে। সৃষ্টিকর্তার কাছে চোখের পানি ফেলে প্রার্থনা করে। বেশ কিছুক্ষণ সময় পেরিয়ে গেলে নূর মোনাজাত শেষ করে বসে রইল ওভাবেই। অস্থির মনটা ধীরে ধীরে স্থির হয়ে এলো। তারপর সে জায়নামাজ ভাঁজ করে যথাস্থানে রেখে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল। চোখদুটো বন্ধ করার কিছুক্ষণ পরই তন্দ্রায় ডুবে যায় নূর।

রাত তখন নিশুতি। সর্দার বাড়ির চারপাশে প্রাচীর নির্মাণ করা। বাইরে লাইট জ্বলছে কিছু কিছু জায়গায়। সেই আলোয় নূরের জানালায় একটা কালো লম্বাটে ছায়া পড়ল। ঘুমন্ত নূরকে আবছা দেখাচ্ছে বাহির থেকে। কারোর কুদৃষ্টি নূরকে পরখ করতে গিয়ে বিরক্ত হলো। চাদর মুড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা।‌ নূর এপাশ থেকে ওপাশ ফিরতেই ছায়াটা সরে গেল।

—

ভোরের তীব্র কুয়াশাই জানান দিচ্ছে শীতের আগমন। শীতের আগমন উপলক্ষে সর্দার বাড়িতে আজ সন্ধ্যায় ছোটখাটো একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এই অনুষ্ঠান পূর্ব থেকেই হয়ে আসছে শাহ বংশে। ফজরের নামাজ নিজের রুমেই আদায় করল ওসমান। হাতে তাসবিহ নিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। বাইরে পাখিদের টুকটাক কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসতেই সে উঠে গেল। পেছনের দরজা খুলে দিলে একটা শীতল হাওয়া এসে সর্বাঙ্গ ছুঁয়ে যায়। ওসমানের পুরোনো অভ্যাস এটা, ভোরের সময়টা প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার। গায়ে সফেদ রঙের পাঞ্জাবি পাজামা ব্যতীত আর কিছুই নেই তার গায়ে। বাগানের পাইন গাছগুলোর ফাঁকফোকরে কুয়াশা লেপ্টে রয়েছে। ওসমান নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। সামনে কাঠের বেড়া না থাকলে হয়তো ওসমান নদীতে নামত। তার মনে পড়ল বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা।

আহান বন্ধুর সাথে সর্দার বাড়িতে এসেছিল। তাকে দেখে জামিলা বানু ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। আহান সারাদিন সময় কাটিয়েছিল। যাওয়ার আগে ওসমান আর সে বাগানে দাঁড়িয়ে ছিল পাশাপাশি। ঠিক এখন যেখানে ওসমান একা দাঁড়িয়ে আছে! আহান তাকে সবসময় একটা কথা বলত, 'সব বন্ধু এক নয় এটা তুই একদিন প্রমাণ করে দিবি ওসমান।' একথা শুনে ওসমান শুধু হাসত। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে কথাটার মূল্য কতটা ভারী! আহানের বন্ধু হয়ে তার রেখে যাওয়া আমানতের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই হয়তো এই কথাটা পূর্ণতা পাবে। কিন্তু ওসমান নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারবে তো?

কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে ওসমান পিছু ফিরল।‌ ওমরকে দেখে শান্ত গলায় সালাম দিল, “আসসালামু আলাইকুম ভাইজান। ”

“ওয়া আলাইকুম আসসালাম। কি করছো এখানে? ”

“কিছু করছি না, এমনিই দাঁড়িয়ে আছি। ”

“চিন্তিত? ”

“না তো! ”

“আয়াজ আড়তে বসতে চাচ্ছে। এই বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত নিলে? ”

ওসমান এবার মৃদু স্বরে বলল, “পৈতৃক সূত্রে আমরা তিন ভাই আড়তের সমান ভাগীদার। আয়াজ বসতে চাইলে আমার কোনো আপত্তি নেই। আর কিছুদিন পরেই আড়তে নতুন ভুট্টা উঠবে। আপনি যেহেতু আপেলের হিসাব রাখেন, তাই আয়াজকে ভুট্টার হিসাব রাখার দায়িত্ব দিলে ভালো হবে। আমি এতদিন ভুট্টার হিসাব যা করেছি আয়াজকে বুঝিয়ে দেব। আখরোটের সমস্ত হিসেব না হয় আমি দেখলাম। ”

ওমর বোধহয় সন্তুষ্ট হলো। সে ওসমানের কাঁধ চাপড়ে দিল। সিজনাল ফসল উৎপাদন করা এবং তা রপ্তানি করাই হলো সর্দার বাড়ির পারিবারিক মূল ব্যবসা। ওমর আরো কিছু আলোচনা করল ব্যবসায়িক বিষয়ে।

আজ খাসি জবাই হবে সর্দার বাড়ির আঙিনায়। সেই তোড়জোড় চলছে সকাল থেকে। গ্রামের মুরব্বিদের দাওয়াত করা হয়েছে। প্রতিবেশীদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গুলবাহারের দেখা মিলল আজ দুপুরে। এসেই আগে ওসমানের সাথে দেখা করেছিল। এখন অবশ্য বেরিয়ে পড়েছে খাসি নিয়ে আসার জন্য। উঠোনে প্রতিবেশী বাচ্চাগুলো ছোটাছুটি করছে। কয়েকজন মহিলা শিলপাটায় মসলা বাটার কাজ করছে। জামিলা বানু তাদের সাথে বসে খোশগল্প করছেন। আরাবিয়া বাড়ির ভেতরে রান্নার কাজে ব্যস্ত। আজ তাকে সাহায্য করছে নূর। বলাবাহুল্য দুপুরের খাবার আজ নূর নিজ হাতে রান্না করার দায়িত্ব নিয়েছে। আরাবিয়া শুধু পাশে দাঁড়িয়ে টুকটাক দেখিয়ে দিচ্ছে। হাতে গোনা কয়েকবার নূর রান্নাবান্না করেছিল। ওসমানরা কেউই বাড়িতে নেই। রান্নাঘর ম ম করছে ট্রাউট মাছ ভুনার ঘ্রাণে। আরাবিয়া প্রশংসা করে বলল,

“মাশাআল্লাহ মারিয়াম। তোমার হাতের রান্না দারুণ হচ্ছে।”

নূর মৃদু হেসে বলল, “শুকরিয়া ভাবীজান।”

দু'জনের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তা চলমান রইল। হাতে হাতে রান্না শেষ করল তারা। যোহরের আজান পড়েছে মসজিদে। মুসল্লিরা একে একে নামাজ আদায় করে বাড়ি ফিরছে। ওসমান, ওমর আর আয়াজ একসাথে নামাজ শেষে বাড়ি ফিরল। বাগানে যেই মহিলারা মসলা বাটার কাজ করছিল তারা কাজ শেষ করে এখন বাড়ি গিয়েছে। জামিলা বানু তাসবিহ হাতে উপস্থিত হলেন ড্রয়িং রুমে। এমন সময়ই সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করল তিন ভাই। তিন ছেলেকে একত্রে দেখে জামিলা বানু মুচকি হাসলেন। চোখদুটো জুড়িয়ে গেল। আয়াজ মাকে দেখে আগে এগিয়ে এলো। টুকটাক কথাবার্তা বলতে বলতে সবাই ডাইনিং রুমে উপস্থিত হয়। টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখছে মালা সহ আরও দু'জন মেয়ে। একে একে সবাই উপস্থিত হয়। নূর এসে জামিলা বানুর পাশে বসল। খাওয়া-দাওয়া শুরু হলো টেবিলে। ওসমান খাবার মুখে দিয়ে একটু থমকায়। দৃষ্টি ঘুরিয়ে সবার দিকে তাকাল। সবারই একই অবস্থা, খাবার মুখে নিয়ে একেঅপরের দিকে তাকাচ্ছে। আরাবিয়া শুধু মুচকি মুচকি হাসছে। জামিলা বানু অবাক হয়ে বললেন,

“আজকের রান্না কে করেছে?”

নূর চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল, “ভালো হয়নি আম্মি?”

জামিলা বানু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন নূরের দিকে। নূর মনে মনে একটু চিন্তিত হলো। খাবার ভালো হয়নি নাকি! কিন্তু তার চিন্তার অবসান ঘটিয়ে জামিলা বানু হেসে উঠলেন। বললেন,

“আজকের রান্নার মতো সুস্বাদু স্বাদ আমি আগে পাইনি কোনো খাবারে। আরাবিয়ার হাতের রান্নাও এমন মজা হয়, কিন্তু আমি জানি এটা আরাবিয়ার হাতের রান্না নয়। তাহলে কে রান্না করল? ”

নূর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসল। আরাবিয়া খেতে খেতে বলল,

“আম্মাজান, আজকের রান্না আমাদের মেহমান করেছে।”

ওসমান অবাক হয়ে তাকাল নূরের দিকে। জামিলা বানু সরু চোখে তাকিয়ে বললেন, “মাশাআল্লাহ, খুব ভালো হয়েছে মারিয়াম। ”

নূর মুচকি হেসে জবাব দিল, “শুকরিয়া আম্মি।”

“তবে খবরদার! আর কিন্তু রান্নাঘরে যাবে না। ”

নূর কিছু বলার আগে আয়াজ বলে উঠল, “কেন আম্মাজান? খাবার কিন্তু খুব ভালো হয়েছে। আমাকে যদি সারাদিন দেওয়া হয় আমি তো সারাদিনই খাব। ”

জামিলা বানু ছেলেকে চোখ রাঙালেন। আয়াজ কথাটা মজা করে বলেছে তা মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। বলাবাহুল্য ছেলেটার খাবারের প্রতি বেশ টান। খেতে খেতে স্বাস্থ্যটাও বাড়িয়েছে। নূর মৃদু স্বরে বলল,

“এখন থেকে রান্নাটা আমি করলে কোনো সমস্যা হবে, আম্মি? ”

জামিলা বানু কিছু বলতে যাবেন তার আগেই এতক্ষণ নীরব থাকা ওসমানের কণ্ঠস্বর শোনা গেল,

“অবশ্যই সমস্যা হবে। আমাদের বাড়ির মেহমান আমাদের রান্না করে খাওয়াবে এটা বেমানান। একদিন রান্না করাটা ঠিক আছে কিন্তু প্রতিদিন নয়। ”

নূরের মুখটা একটুখানি হয়ে গেল। জামিলা বানু ছেলেকে সমর্থন করলেন। তিনিও একই কথা বলতে চেয়েছিলেন। নূর নিজেও জানে সে রান্নায় পরিপক্ক নয়। সবকিছু সে রাঁধতে পারে না। তবুও শখের বশে করতে চেয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা তার ভাইজান এখন নেই, তাকে শহরেও যেতে দেওয়া হচ্ছে না। এমতাবস্থায় কারোর বাড়িতে শুয়ে বসে খাওয়ার চেয়ে একটু কাজ করা ভালো, এটা ভেবেই নূর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তে পানি ঢেলে দিল ওসমান। নূর মুখ ভার করে খাবার খাওয়ায় মনোযোগী হলো। ওসমান মনে মনে মুচকি হাসল। রান্নার তারিফ করতে ইচ্ছে করলেও তা প্রকাশ করল না। সে জানে আহান কখনোই বোনকে বাড়িতে কোনো কাজ করতে দিত না। সেখানে বাড়ির এতগুলো মানুষের জন্য রান্নাবান্না করাটা মেয়েটার পক্ষে একটু জুলুম হয়ে যায়। ওসমান জেনেবুঝে কি আর সায় দিতে পারে?

—

চারদিকে কুয়াশা পড়ছে ধীরে ধীরে। সর্দার বাড়ির উঠোনের এক পাশে মহিলাগণ গোল হয়ে বসেছে। অপর পাশে পুরুষ লোকেরা নিজেদের মতো আড্ডা দিচ্ছে। চারটে খাসি জবাই করা হয়েছে বিকেলে। দু'টো খাসি দিয়ে পুরুষদের জন্য আয়োজন, আর দুটো খাসি মহিলাদের জন্য। আজকের এই আয়োজনে শাহ বংশের মানুষ আর গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকে না। প্রতিবেশীদের সাথে হেসে দুলে সময় কাটায় তারা। উঠোনের দুই প্রান্তে আগুন জ্বলছে। উপর-নিচ করে শিকে গেঁথে ধীরে ধীরে খাসিগুলো পোড়ানো হচ্ছে। একটু পরপর শিক ঘুরিয়ে দুপুরে বেটে রাখা মসলা খাসির গায়ে মেখে দেওয়া হচ্ছে। কুয়াশার সাথে ভেসে বেড়াচ্ছে খাবারের সুগন্ধি। আরাবিয়ার সাথে মহিলাদের মাঝে উপস্থিত হলো নূর। গায়ে সাদা শাল, পরিপাটি পোশাক, মাথায় ওড়না দ্বারা ঘোমটা টানা। আরাবিয়ার সাথে সবার ভাব বিনিময় হলেও নূরকে দেখে সবাই চোখাচোখি করল। জামিলা বানু একটা কেদারায় বসে আছেন। তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন,

“আমার মেহমান মারিয়াম। শহর থেকে এসেছে। সবাইকে সালাম দাও বেটি‌। ”

নূর মৃদু স্বরে উপস্থিত মহিলাদের সালাম দিল। সবাই সালামের জবাব দিয়ে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করল। কেউ দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করার সাহস পেল না মেয়েটি জামিলা বানুর কেমন মেহমান! কোনো আত্মীয় নাকি অন্যকিছু? জামিলা বানু তাদের মনোভাব বুঝতে পেরে সূক্ষ্ম হাসলেন। মানুষ খুবই অদ্ভুত। অন্যের বিষয়ে মাতামাতি করাই মানুষ জাতির কাজ।

নূর আর আরাবিয়া জামিলা বানুর দুই পাশের দুটো কেদারায় বসে। এখান থেকে খানিকটা দূরে পুরুষদের হৈ হুল্লোড় শোনা যাচ্ছে। নূর ওড়নার আড়াল থেকে আড়চোখে একবার তাকায় সেদিকে। ওসমানের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা চোখে পড়ল। হাসিঠাট্টা করছে এমনটা নয়, গ্রামবাসীর সাথে মধুর সময়টা উপভোগ করার মতো ক্ষীণ একটা হাসি ঝুলছে অধর জুড়ে। দায়িত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকা মানুষটার মুখেও যে এক ঝিলিক হাসি মানায়, তা নূরের চোখে নতুন লাগল। নূর দৃষ্টি সরিয়ে নিতেই ওসমান তাকায় তার দিকে। যা নূর বুঝতেও পারল না। ভাই-হারা মেয়েটাকে সবার সাথে মিষ্টি করে হেসে কথা বলতে দেখে ওসমান গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওসমান বেশিক্ষণ দৃষ্টি স্থির রাখল না। সরিয়ে নিয়ে সবার সাথে ভোজনে সামিল হলো।

_______________

চলবে...!

ভেবেছিলাম লেখালেখি থেকে বিরতি নিব, কিন্তু রানিং গল্পটা ঝুলিয়ে রাখতে ইচ্ছে করছে না। তাই গল্পটা শেষ করব, ইনশাআল্লাহ। রেসপন্স করুন, লিখতে গেলে আপনাদের একটু ভালোবাসাও অনেক কার্যকর। হ্যাপি রিডিং...!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন