ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঘুমন্ত প্রিয়তমা

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: Ayesha Ahmed
#ঘুমন্ত_প্রিয়তমা 
#লিয়ানা_লিয়া 
#পর্ব_9
ধরনী যেন রঙ্গমঞ্চ, তার একেক সময় একেক রূপে তাল মেলায় প্রকৃতি। নিশ্চুপ থমথমে পরিবেশ জানান দিচ্ছে প্রকৃতির আজ বেজায় অভিমান। ধরিত্রী জুড়ে এই অসীম নিস্তব্ধতার মাঝেও কেউ গগন কাঁপিয়ে গর্জন করে চলেছে যন্ত্রণায়, তারই সম্মুখে প্রিয়তমার ব্যাথায় দিশেহারা হয়ে ছটফট করছে গভীর প্রণয়ে আসক্ত এক পুরুষ। বিশাল অরণ্য ছেয়ে গেছে তাদের আত্মচিৎকারে। 
লিয়ানার শরীরে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে মায়াবী জাল, মরন যন্ত্রণা দিচ্ছে তার প্রতিটি শিরায় । যতই ছাড়ানোর চেষ্টা করা হয় ততই গেঁথে যায় তার শরীরে। এ জাল যেন আজ ভাম্পায়ার নিধন না করে ছাড়বে না। 
সম্মুখে ছটফট করছে অনুভব, হাজার বার চেষ্টা করেও সে মায়াবী জাল ছাড়াতে ব্যর্থ, হাত ছোয়াতেই ছিটকে পড়ে সে। প্রিয়তমার প্রতিটি যন্ত্রণাময় চিৎকারে সে তিরবিদ্ধ হরিনের মতো ছটফট করতে থাকে।
একপর্যায়ে চেতনা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে লিয়ানা। অনুভব আবারো উন্মাদের ন্যায় ছুটে গিয়ে প্রিয়তমাকে স্পর্শ করতে চাইলে পুনরায় তাকে সিটকে ফেলে সেই মায়াবী জাল। বারংবার ব্যর্থ অনুভব অজস্র কান্নায় ভেঙে পড়ে।
আচমকা কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে নেত্র তুলে তাকিয়ে হতবাক হওয়ার সীমা থাকেনা তার।
" এ যে স্বয়ং তার জননী, আর বুঝতে বাকি থাকেনা এই মায়াবী জালের সৃষ্টিকারী তারই প্রিয় মাতা "
মায়ের সামনে হাঁটু ভেঙে বসে তার হাত দুটো আকড়ে জানতে চায়  " এতো পাষান তুমি কিভাবে হলে মা ?"
ইলি কঠোর স্বরে বলে "তুমি অবুজ অনুভব, জানোনা এই ভাম্পায়াররা কতোটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। ছলনা করে মানুষের রক্ত শুষে নেওয়ায় এদের ধর্ম"
উন্মাদের ন্যায় চিৎকার করে ওঠে অনুভব। মাতার কথার প্রতিবাদ করে বলে  
" ভাম্পায়ার রাজ্যে মানুষের রক্ত পান করা নিষিদ্ধ এ ব্যাপারে জ্ঞাত তুমি তবুও কেনো মূর্খের প্রলাপ বকছো ? কোন অপরাধের শাস্তি দিচ্ছ তাকে ? তোমার পুত্রকে প্রনয়ে আবদ্ধ করাই যদি তার অপরাধ হয় তবে সেই অপরাধের প্রধান আসামী তোমার পুত্র নিজে, নিক্ষেপ করো ঐ জাল আমার শরীরে।"
ছেলের কথার প্রত্যুত্তরে কিছুই বলার থাকেনা ইলির, কারন অনুভবের বলা একটি বাক্যও মিথ্যা নয়। নিজ পুত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে বিনা অপরাধে সে প্রহার করেছে ভাম্পায়ার কন্যাকে। তবে এই হিংস্র কন্যা তার অনুভবের জন্য সঠিক নয়।
মাতাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে সে ব্যাকুল স্বরে বলে
"এতো নিষ্ঠুর তুমি হয়োনা, ওর ভীষন কষ্ট হচ্ছে মা, মুক্ত করো ওকে।"
ছেলের আকুলতা দেখে বিস্মিত হয় ইলি " একজন হিংস্র ভাম্পায়ার কন্যা কিভাবে তার পুত্রের হৃদয়ে এমন নিবিড় প্রনয় সৃষ্টি করতে পারে ?"
পুনরায় শুনতে পায় ছেলের আকুলতা ভরা কন্ঠ
" তুলে নাও তোমার মায়াবী জাল, ঐ কন্যার কিছু হলে আমি মরে যাবো মা। তোমার অনুভবের প্রাণভোমরা যে ঐ ভাম্পায়ার কন্যা "
ছেলের এহেন কথায় আতকে ওঠে ইলি, দ্রুততার সহিত তুলে নেয় মায়াবী জাল। যাদু দ্বারা বিলীন করে দেয় মায়াবী জাল দ্বারা সৃষ্টি হওয়া সমস্ত যখম।
অনুভব দ্রুত উঠে গিয়ে লিয়ানার পাশে হাটু ভেঙে বসে তাকে আগলে নেয় দু'হাতে। কোলের উপর শুইয়ে আলতো ভাবে দু'গালে চাপড় দিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে ডাকে
"ওঠো প্রিয়তমা, আর কেউ কষ্ট দেবেনা তোমাকে, চোখ মেলে দেখো একটিবার "
ধীরে ধীরে চোখ খোলে লিয়ানা, ঝাপসা চোখে নিজের মুখের ওপরে দেখতে পায় প্রিয় পুরুষের মুখশ্রী। দু'হাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করে তার বাহু, মুখ গুজে দেয় অনুভবের বক্ষদেশে। সকল যন্ত্রণা ভুলে যায় প্রিয় পুরুষের সান্নিধ্যে।
ঈষৎ দুরে দাঁড়িয়ে তাদের কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করছে ইলি, কাশি দিয়ে জানান দেয় নিজের উপস্থিতি।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রমনীটিকে এতক্ষণে দেখতে পায়নি লিয়ানা, হটাৎ তার উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত সরে আসতে চায়লে তাকে আরোও নিজের সাথে আকড়ে নেয় অনুভব। ধমক দিয়ে বলে   
" এতো কিলবিল করছো কেন ? এই সুন্দরী দেবী আমার মাতা "
আহাম্মকের মতো চেয়ে থাকে লিয়ানা  " নিজের মাতার সম্মুখে আমাকে এভাবে আকড়ে ধরে রেখে আবার বলছে কিলবিল করছো কেন, কতোটা অসভ্য নির্লজ্জ এই পুরুষ"
তার কটমটে চাহনি দেখে অনুভব ভ্রু কুচকে শুধায় 
" আমাকে গালি দিচ্ছো নাকি মনে মনে? অবিচার করেছে বিধি; তুমি আমার মনের সব কথা শুনতে পাও অথচ আমি তোমার মনের কথা শুনতে পাইনা।"
লিয়ানা আর সহ্য করতে না পেরে উচ্চস্বরে বলে 
"ছাড়ো আমাকে"
দুজনের আজব কর্মকাণ্ডে ইলির কপাল চাপড়াতে মন চাইলেও নিজেকে সামলে গম্ভীর কন্ঠে অনুভব'কে বলে 
" ওকে ভবনের ভেতরে নিয়ে আসো "
বলতে দেরি কিন্তু অনুভবের লিয়ানাকে কোলে তুলতে দেরি হয়না। লিয়ানার মনে হয় এর থেকে বড় লজ্জার আর কিছু হতে পারে না। সে কোল থেকে নামার চেষ্টা করতেই চোখ রাঙায় অনুভব।
হটাৎ প্রবেশ দ্বাড়ের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় সে, মনে পরে সুরক্ষা রেখার কথা। তার জননী মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করলে প্রবেশ দ্বাড়ে পা রাখে সে, কিছুক্ষণ পেড়িয়ে গেলেও কিছু হয়না দেখে সস্তির শ্বাস ছেড়ে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে।
 
নিজের কক্ষে গিয়ে তাকে বিছানায় নামিয়ে দিলেও লিয়ানা লজ্জায় দু'হাতে নেত্রপল্লব ঢেকে রাখে।
ইলি এগিয়ে এসে বিছানার এক কোনায় বসে অনুভবের উদ্দেশ্যে বলে  " তুমি কক্ষের বাহিরে গিয়ে অপেক্ষা করো আমার কথা আছে রাজকন্যার সাথে"
মুখ চুপসে যায় অনুভবের "কি এমন কথা যে আমার সামনে বলা যায়না ? তুমি আবার ওকে বকা দেওয়ার ফন্দি আটো নি তো ?"
ইলি অনুভবের দিকে তেড়ে গিয়ে কিঞ্চিত উচ্চস্বরে বলে
"গেলি হতচ্ছাড়া" 
ওমনি অনুভব দ্রুতবেগে বেরিয়ে পরে, কক্ষের বাহিরে গিয়ে তাদের কথোপকথন শুনতে না পেয়ে হাঁসফাঁস করতে থাকে। 
লিয়ানা মাথা নিচু করে বসে আছে, অনুভবের মাতা কি কথা বলবে তা ভেবে কিছুটা ভয় ভয় করছে।
ইলি গম্ভীর মুখে শুধাই "তুমি কি ভালোবাসো আমার পুত্রকে ? ভুলে যেওনা তুমি একজন শক্তিশালী ভাম্পায়ার আর অনুভব সাধারন এক মানব"
লিয়ানা কিছুটা নড়েচড়ে বসে। অতঃপর মাথা তুলে বলে "সে মানব জাতি বলে তাকে ভালোবাসাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই আমার। আমার শুধু অনুভব লাগবে তার জন্য সমস্ত বাধা অতিক্রম করতে প্রস্তুত আমি"
ইলি এই জবাবে সন্তুষ্ট হলেও আবারো গম্ভীর স্বরে বলে
" মানব প্রেমে পাগল হইয়ো না কন্যা, এই প্রনয় তোমাকে মায়াবী জালের চেয়েও অধিক যন্ত্রণা দেবে"
লিয়ানা মুসকি হেসে জবাব দেয় "তাই যদি হয় তবে আমি লক্ষবার সেচ্ছাই বরণ করে নিবো সেই যন্ত্রণা"
এমন ঠাসঠাস জবাবে টাসকি খেয়ে যায় ইলি  "এই কন্যা তো প্রণয়ে উন্মাদ একেবারে"
মুসকি হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে "এমন কাউকেই তো চাইছিলাম আমার পুত্রের জন্য, যে তাকে আগলে রাখবে আমার মতো করে। তোমার ভেতরে অনুভবের জন্য সেই উন্মাদনা দেখেছি আমি "
আনন্দে লাফিয়ে ওঠে লিয়ানা, উত্তেজনাই জাপটে ধরে  তাকে। তখনই হুরমুর করে কক্ষে প্রবেশ করে অনুভব। তার মাতা এবং প্রিয়তমাকে একসাথে জড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে চোখ বড়বড় করে চেয়ে থাকে তাদের দিকে। ভাবে "এ কেমন যাদু করেছে তার প্রিয়তমা"
আকস্মাৎ বেজে ওঠে শেষ প্রহরের ঘন্টা, যাওয়ার সময় হয়ে যায় লিয়ানার। মাতাকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে যেতে নিয়ে আবার থমকে দাঁড়িয়ে পরে। ইলি তার জড়তা বুঝতে পেরে মুসকি হেসে বলে
"তোমার জন্য এই সুরক্ষা দ্বাড় উন্মুক্ত কন্যা, নিশ্চিন্তে পা রাখতে পারো প্রবেশ দ্বাড়ে"
সস্তি পায় লিয়ানা, হাসিমুখে বেরিয়ে যায় সে। ভবন থেকে বেরোবে এমন সময় পেছন থেকে কেউ তাকে টেনে নিয়ে নিজের বক্ষের সাথে আগলে ধরে। 
আকস্মিক ঘটনায় চমকে তাকায় লিয়ানা অতঃপর প্রিয় পুরুষের শরীরের ঘ্রান পেয়ে নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে নেয় তাকে। 
_______________________________
নেকড়ে রাজা আসিফ হন্তদন্ত হয়ে নিজের কক্ষে প্রবেশ করে। তার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছে আহত রঙ্গণ, সঙ্গে রয়েছে এক মুখোশধারী ভাম্পায়ার, যে কি না আহত রঙ্গণকে ভাম্পায়ার প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিয়ে এসেছে এই নেকড়ে রাজ্যে। আসিফ নিজের পুত্রের এহেন দশা দেখে রাগে বিকট স্বরে গর্জন করে ওঠে প্রাসাদ কাঁপিয়ে। প্রাসাদের সকল নেকড়ে কর্মচারীর শরীরে কাঁপন ধরেছে সেই গর্জনে।
রঙ্গণ ব্যাথায় কাতরাতে কাতরাতে পিতাকে কিছু বলার চেষ্টা করে। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা এতোটায় শোচনীয় যে কিছু বলার শক্তি তার অবশিষ্ট নেই।
আসিফ দ্রুত এক প্রহরীকে বলে নেকড়ে বৈদ্যকে ডেকে পাঠাও। মূহুর্তেই হাজির হয় নেকড়ে বৈদ্য, সে হরেক রকম ওষধি-পথ্য ব্যবহার করেও ক্ষত বিলীন করতে ব্যর্থ হয়।
বৈদ্যকে হতাশ হতে দেখে রাগে তার গলা চেপে শূন্যে ছুড়ে ফেলে আসিফ। চিৎকার করে বলে
"কোনো কাজের নস তোরা, নিকর্মা, জঞ্জাল কোথাকার।"
বৈদ্য কোনোভাবে উঠে বসে কাশতে কাশতে বলে 
"উপায় আছে মহারাজ, এই ক্ষত কোনো শক্তিশালী ভাম্পায়ার দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে যার কোনো ওষধি-পথ্য নেই। এই ক্ষত একমাত্র বিলীন হবে ভাম্পায়ারদের হিলিং পাওয়ার দ্বারা।
তার কথাতে শয়তানি হাসি হাসে মুখোশধারী ভাম্পায়ার, এগিয়ে এসে নিজের হাত ছোয়ায় রঙ্গণের শরীরে।
চলবে ????

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন