ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক তোমাতে আসক্ত

১ম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া শিমু

#এক_তোমাতে_আসক্ত

#সুমাইয়া_শিমু

#পর্ব_১

__________________________

- এই শ্রেয়া ঘুম থেকে ওঠ। আর কত ঘুমাবি? ভার্সিটিতে যাবি না? লেট হয়ে যাচ্ছে তো।

খাটে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা একটি মেয়েকে ডাকতে ডাকতে কথাগুলো বললেন সালমা আহমেদ। কিন্তু মেয়েটির কানে কথা যেন ঢুকছেই না। তার মতো করে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।

- আজকে না তোর এক্সাম আছে? দেখ পরে দেরি হয়ে গেলে কিন্তু আমার দোষ দিতে পারবি না।

বলে চলে গেলেন সালমা আহমেদ। মেয়েটি তৎক্ষণাৎ চাদর সরিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকালো। আজ তার এক্সাম আছে । সে ঢাকা ভার্সিটিতে জার্নালিজম নিয়ে পড়াশোনা করছে।

তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে উঠে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিল সে। ঘড়িতে সময় দেখে নিল তাড়াতাড়ি। এক্সামের আর মাত্র এক ঘন্টা আছে। এখান থেকে ভার্সিটিতে যেতে সময় লাগবে ৪০/৪৫ মিনিটের মতো। কোনোমতে রেডি হয়ে ফাইল সহ বের হয়ে যাচ্ছিল শ্রেয়া। তখনই ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা করছিল শ্রেয়সীর বাবা আহনাফ আহমেদ, ভাই শ্রেয়ান আহমেদ । সালমা আহমেদ তাদের নাস্তা পরিবেশন করছিলেন। শ্রেয়াকে বেরিয়ে যেতে দেখে তাড়াতাড়ি করে বললেন, নাস্তা না করে কোথায় যাচ্ছিস? নাস্তা খেয়ে যা।

- আম্মু এখন আমার একটুও সময় নেই। আমি ক্যান্টিন থেকে নাস্তা করে নিব।

ব্যস্ত হয়ে বলল শ্রেয়সী।

- আমি কোন কথা শুনবো না। রাত জেগে পড়াশোনা করে সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে পারিস না।

বলেই একটি রুটি নিয়ে তার মধ্যে ডিম ভাজি ভরে রোল করে নিলেন তিনি। এরকম দুইটা একটা টিফিন বক্সে ভরে দিলেন। শ্রেয়সীর হাতে দিয়ে মমতা ভরা কন্ঠে বললেন, ভালোমতো পরীক্ষা দিস মা। আর রিকশায় যেতে যেতে এগুলো খেয়ে নিবি। একদম না খেয়ে পরীক্ষা দিবি না।

মায়ের আদর ভরা ভালবাসায় শ্রেয়সী মুচকি হাসলো। বাবা আর ভাইয়ের থেকে দোয়া নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ভার্সিটির উদ্দেশ্যে।

শ্রেয়সী আজ একটা সাদা রংয়ের থ্রি পিস পড়েছে। লম্বা চুলগুলো উঁচু করে ঝুঁটি বাধা। কোন রকমের সাজ ছাড়াই তাকে দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। মুখে হালকা পাউডার আর চোখে চিকন করে কাজল আঁকা। এতেই যেন তার সৌন্দর্য উপচে পড়ছে। মেয়েটা আসলে অসম্ভব মায়াবী। টকটকে ফর্সা গায়ের রং।

রাস্তায় এসে একটা রিক্সা ডেকে তাতে উঠে পড়ল। কাকে যেন ফোন করে কি বলল। একটু সামনে যেতেই অপর একটা মেয়ে তার রিক্সায় উঠে বসলো। মেয়েটি হলো শ্রেয়সীর বান্ধবীর সুমি। ওরা দুইজন বেস্ট ফ্রেন্ড। পরীক্ষার আগে রিক্সা কিংবা বাসের মধ্যে পড়ার অভ্যাস নেই শ্রেয়সীর। কেননা আগে থেকেই সব প্রিপারেশন নিয়ে রাখে সে। তাই পরীক্ষার আগে বাড়তি কোন টেনশন নেয় না। সুমিও তেমনি। দুই বান্ধবী না পড়ে গল্প আর হাসাহাসিতে মেতে উঠেছে। ওদের দুজনই জার্নালিজম নিয়ে পড়ছে। ওদের ইচ্ছে খুব ভালো সাংবাদিক হওয়ার। সেজন্য কলেজ লাইফ থেকে দুই বান্ধবী সেই অনুযায়ী প্রিপারেশন নিয়ে রেখেছে।

___________________

সারারাত বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সকালবেলা বাড়িতে ফিরছে ফারজাদ আব্রার চৌধুরী। অবশ্য বাজে ছেলেদের মত কোন অভ্যাস নেই তার। মদ ড্রিংকস দূরে থাক, সিগারেট পর্যন্ত খায় না। অবশ্য কলেজ লাইফের শুরু থেকে এসব অভ্যাস ছিল তার। কিন্তু তার মা ফারজানা আব্রার চৌধুরীর জন্য এসব বদভ্যাস তাকে ত্যাগ করতে হয়েছে। মাকে সে অসম্ভব ভালোবাসে। মায়ের কোন কথাই সে ফেলতে পারেনা।

মিসেস ফারজানা ডাইনিং রুমে বসে ফারজাদের অপেক্ষা করছিলেন। আরমান আবরার চৌধুরী নাস্তা করে অফিসে চলে গিয়েছেন। ফাইজাও কলেজে চলে গিয়েছে। এখন একমাত্র তিনিই বাড়িতে আছেন।অবশ্য তিনি তার হাজবেন্ডের বিজনেস পার্টনার ছিলেন একসময়। সেখান থেকেই তাদের পরিচয়, প্রেম তারপর বিয়ে। ফারজাদ আর ফাইজা হওয়ার পর থেকে তিনি বিজনেসের কাজে তেমন একটা সময় দিতে পারেন না। কেননা আরমান আবরার চৌধুরী তার কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকেন। ছেলেমেয়েদের একদমই সময় দিতে পারেন না। এখন তিনিও যদি তার মতো ব্যস্ত হয়ে যান তাহলে ছেলে মেয়েগুলো তাদের থেকে অনেক দূরে চলে যাবে। মানুষ হবে ঠিকই, কিন্তু পরিবারের সাথে একটা শক্ত বন্ডিং তৈরি হবে না। তাই বর্তমান সময়ের আধুনিক মায়েদের মতো কেবলমাত্র নিজের ক্যারিয়ারের চিন্তা না করে তিনি সন্তানদের ভবিষ্যতের কথাও চিন্তা করেন। অবশ্য শুধু মেয়েদেরই যে এরকম ত্যাগ স্বীকার করতে হবে তেমনটা হওয়া উচিত নয়। বাবাদেরও তাদের সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিতে হবে। স্যাক্রিফাইস করতে হবে। কিন্তু আরমান আব্রার চৌধুরী তার কাজে অত্যন্ত দায়িত্বশীল এবং একরোখা। অনেকবার বুঝিয়েও আরমান আব্রার চৌধুরীকে বোঝাতে পারেননি মিসেস ফারজানা। তাই বাধ্য হয়ে তাকেই এই দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়েছে। অবশ্য তিনি মন থেকে তার সন্তানদেরকে ভালবাসেন। প্রত্যেকটা মা-ই তাদের সন্তানদেরকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন।

ডাইনিং টেবিলে মিসেস ফারজানাকে তার জন্য অপেক্ষা করতে দেখে মুচকি হাসলো ফারজাদ। মায়ের কাছে গিয়ে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেলো সে। মিসেস ফারজানা ছেলের উপস্থিতি টের পেয়ে তাকে সামনে এনে কিছুটা বকুনি দিয়ে সস্নেহে খেতে বসতে বললেন। এখন বাজে সকাল সাড়ে ১১ টা। এই সময়ে ফারজাদের খেতে মোটেও ইচ্ছা করছে না। তাছাড়া বন্ধুর বাসা থেকেও খেয়ে এসেছে। এই কথা বললেও তার মা শুনবে না, বরং তাকে জোর করে খাইয়ে দেবে এটা ফারজাদ ভালো করেই জানে। তাই আর কোন কথা না বলে চুপচাপ খেতে বসে পড়ে। কিন্তু অল্প করে খাবার দিতে বলল মিসেস ফারজানাকে।

মিসেস ফারজানা ফারজাদের প্লেটে নিজের বানানো কাচ্চি বিরিয়ানি বেড়ে দিলেন। ফারজাদ অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকালো। মিসেস ফারজানা মুচকি হাসলেন।

- তুমি কি করে জানলে আম্মু আজকে আমার বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছে করছে?

- তুই কালকে রাতে বলেছিলি মনে নেই? তখনই রান্না করে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছিল না। আজ একেবারে সকালবেলা সার্ভেন্টকে বাজারে পাঠিয়ে সব জিনিসপত্র এনে তোর জন্য রান্না করলাম।

ফারজাদ মনে করলো যে কালকে রাত আড়াইটার সময় সে মাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বিরিয়ানি খাওয়ার কথা বলেছিল। ফারজাদের বাহিরের বিরিয়ানি একদমই পছন্দ নয়। মায়ের হাতের রান্না ছাড়া সে একদমই খেতে পারে না। আর তার যখন যেটা খেতে ইচ্ছে করে তখন সেটা না খেলে তার কেমন অশান্তি অশান্তি লাগে। এই অভ্যাসটা তার ছোটবেলা থেকেই। বাবা মায়ের আদরের ছেলে হওয়াতে যখন যা চেয়েছে তাই পেয়ে গিয়েছে। তাই কখনো সময় কিংবা সুবিধা-অসুবিধার কথা চিন্তা করেনি সে। সেজন্য রাত আড়াইটার সময়ও মিসেস ফারজানাকে বিরিয়ানি খাওয়ার কথা বলে ফেলল নির্দ্বিধায়। মিসেস ফারজানা হাসিমুখে কিচেনে গিয়ে দেখেন সেখানে সকালের ব্রেকফাস্ট বানানোর জন্য সবজি রাখা। কাচ্চি বিরিয়ানি রান্নার কোন উপকরণ নেই। তাই তিনি মলিন মুখে ফিরে আসলেন। ফারজাদ সেটা বুঝতে পেরে হাসিমুখে বলেছিল, কোন ব্যাপার না ডিয়ার আম্মু। তুমি বরং কালকে রান্না করে দিও। এখন তোমার হাসি মুখটা দেখেই আমার পেটের ক্ষুধা চলে গিয়েছে।

বলে মিসেস ফারজানার কপালে একটা চুমু খেয়ে চলে গিয়েছিল সে। কালকে রাতের ঘটনা মনে পড়তেই ফারযাদের ঠোঁটের কোনণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। উঠে গিয়ে মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার সো সো কিউট আম্মুটা। তুমি ওয়ার্ল্ডের বেস্ট আম্মু। লাভ ইউ সো মাচ আম্মু।

মিসেস ফারজানা মুচকি হেসে ছেলের কপালে চুমু খেলেন।

- হয়েছে হয়েছে এখন বিরিয়ানি খা। পরে ঠান্ডা হয়ে গেলে আর মজা লাগবে না। তোর জন্য সেই কখন থেকে বসে আছি আমি।

ফারজাদ আর কোনো কথা না বলে বিরিয়ানি খেতে লাগলো। মিসেস ফারজানা স্নেহের দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন।

- তুই বড় হয়েছিস ফারজাদ। এখনো ছোটবেলার মতো বন্ধুদের সাথে শুধু আড্ডা দিলে হবে? তোর বাবা একা হাতে সব বিজনেস সামলায়। আমিও সংসারের জন্য তেমন একটা সময় দিতে পারি না। গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে ফেলেছিস। এখন তো তোর বাবাকে বিজনেসের কাজে হেল্প করতে পারিস।

ফারজাদ খেতে খেতে বলল, বাবা শুরু থেকে যেমন এক হাতে সব সামলিয়েছে, এখনো তেমনি সামলাতে পারবে আম্মু। আর তার যখন মনে হবে আমাকে সব কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে, তখন সে নিজে থেকেই আমাকে বলবে। আমাকে আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে হবেনা।

- ও মা, বাবার কাছে হেল্প করবে এটাকে বুঝি আগ বাড়িয়ে বলা বলে? এখন থেকেই তার বিশ্বস্ত হয়ে উঠলেই তোর জন্য ভালো হবে। আর ভবিষ্যতের জন্য কাজ করতেও সুবিধা হবে।

ফারজাদ আর কোন কথা না বলে চুপচাপ খেতে লাগলো আর মায়ের হাতের রান্নার প্রশংসা করতে লাগলো। মিসেস ফারজানা একটা দীর্ঘশ্বাস নিলেন। এই ছেলেকে বিজনেসের কথা বললেই অন্যদিকে কথা ঘুরিয়ে নেয়। তাদের মতো কাজ পাগল বাবা-মায়ের ঘরে এমন একটা কাজের প্রতি উদাসীন ছেলে কি করে হলো সেটাই তিনি বুঝতে পারেন না। কিন্তু সবশেষে তিনি ছেলের ইচ্ছাকেই গুরুত্ব দেন বেশি। কোন সিদ্ধান্তকে তার ওপর চাপিয়ে দিতে চান না তিনি।

- আজকে বাসায় তোর খালা আসবে। দয়া করে তার সাথে কোন রকম সিনক্রিয়েট করিস না। ভালোভাবে কথা বলিস।

ফারজাদের হাসি হাসি মুখটা কালো হয়ে গেল। মিসেস ফারজানার ছোট সৎ বোন নুসরাত আফরিন। ফারজাদের থেকে কেবলমাত্র ৭ বছরের বড়। ফারজাদ এই নুসরাতকে একদমই সহ্য করতে পারে না। তার নানাজান অর্থাৎ ফারজানা আব্রার চৌধুরীর বাবা তার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর আরেকটা বিয়ে করেছিলেন। সেই ঘরেরই মেয়ে নুসরাত। তার একটা প্রতিবন্ধী ছোট ভাইও আছে। ছোট থেকেই সৎ মায়ের সংসারে অনেক নির্যাতন আর নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন মিসেস ফারজানা। তবুও বাবা থাকার জন্য প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন তিনি। তার বাবাও যদি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতো তাহলে তার অবস্থা হতো খুবই করুণ। মায়ের মতো নুসরাতও তার বড় সৎ বোন ফারজানাকে একদমই সহ্য করতে পারতো না। মিসেস ফারজানা বরাবরই চুপচাপ আর শান্ত স্বভাবের ছিলেন। তাই সৎ মা আর সৎ বোনের শত অত্যাচারের পরেও তিনি চুপচাপ সব কিছু মুখ বুঝে সহ্য করে নিতেন। নুসরাত মিসেস ফারজানাকে অনেক জ্বালিয়েছে। সুন্দরী আর প্রচন্ড মেধা সম্পন্ন হওয়ায় তাকে বেশ হিংসে করতো নুসরাত। আর তাই সব দিক থেকেই তাকে নিগৃহীত করতো। মায়ের সাথে মিলে বাবার অগোচরে অনেকবার মিসেস ফারজানাকে শারীরিক ভাবে অত্যাচার করেছে সে। যার দাগ আজও আছে মিসেস ফারজানার গায়ে। তবুও সব কষ্ট মুখ বুঝে সহ্য করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েচেন তিনি। বাবার সাহায্যে নিজের আলাদা বিজনেস শুরু করেন। সেখানেই তার পরিচয় হয় আরমান আবরার চৌধুরীর সাথে। আরমান আবরার চৌধুরী বেশ উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে হয়েও নিজের যোগ্যতায় কিছু করতে চেয়েছিলেন। তাই মিসেস ফারজানার সাথে বিজনেস পার্টনার হিসেবে কাজ শুরু করেন। খুব দ্রুতই তাদের বিজনেসে সফলতা চলে আসে আর তাড়াতাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান। এরপরে আর মিসেস ফারজানার সাথে তার সৎ মা কিংবা নুসরাত খারাপ ব্যবহার করার সাহস পায়নি। বরং তাকে মাথায় করে রাখে এমন ভাব দেখাতো। মিসেস ফারজানা সবটাই বুঝতেন। স্বার্থের জন্য মানুষ সব করতে পারে এমনকি অন্যের সামনে নিজেকে নিচুও দেখাতে পারে। এসব ভেবে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতেন মিসেস ফারজানা।

ফারজাদ মিসেস ফারজানার অতীতের সব কিছুই জানতো। মিসেস ফারজানা ফারজাদ কে একটু বেশিই ভালোবাসতেন। তাই নিজের স্বামীর সাথেও না বলা কষ্টের কথা গুলো ফারজাদের সাথে শেয়ার করতেন। তাই মিসেস ফারজানার অতীতের ব্যাপারে সবকিছুই জানতো ফারজাদ। সবকিছু জেনে তার সৎ নানী আর সৎ খালামণির উপর প্রচন্ড ঘৃণা জন্মে। তবে মিসেস ফারজানা তার বিকলাঙ্গ ছোট সৎ ভাইকে স্নেহ করেন। আর ছেলেটি প্রতিবন্ধী হওয়াতে ফারজাদও তাকে স্নেহ করে। তার সৎ নানি মারা গেছে দুই বছর হবে।

নুসরাত এমনিতে প্রচন্ড লোভী আর ক্যারেক্টারলেস একটি মেয়ে। অসংখ্য ছেলের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে। এমন কি বড় ভাইয়ের মতো দুলাভাইয়ের দিকেও সে অন্যরকম দৃষ্টিতে তাকায়। প্রথম প্রথম মিসেস ফারজানা এগুলো ইগনোর করলেও, পরবর্তীতে নুসরাতকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন তিনি। নুসরাতও সতর্ক হয়ে যায়। কিন্তু সে এখনো মিসেস ফারজানাকে প্রচন্ড ঘৃণা করে। কিন্তু ফারজাদকে সে যমের মতো ভয় পায়। কেননা ফারজাদ তাকে দেখলেই চরমভাবে অপমান করে দেয়। অনেকবার অনেকের সামনে অপমান অপদস্থ করেছে। এজন্য মনে মনে ফারজাদের প্রতি রাগ পুষে রাখলেও, মুখে কোন কিছু প্রকাশ করতো না নুসরাত।

ফারজাদ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল, আসুক আমার কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমার সামনে যেন না পড়ে। আমার সামনে পড়লে তো জানোই আমি কি করবো।

বলে ফারজাদ একটা বাঁকা হাসলো।

মিসেস ফারজানা বিরক্ত হয়ে বললেন, মেয়েটা এখন ভালো হয়ে গেছে রে। ওর সাথে আর এমন করিস না।

ফারজাদ জ্ঞানীর মত একটা ভাব নিয়ে বলল, কুকুরের লেজ কোনদিন সোজা হয় না আম্মু। তুমি যতই তাকে ভালো ভাবছো সে কোনদিনই ভালো হবে না। বরং আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। এখন আমাদের ক্ষমতা আছে বলে, টাকা আছে বলে আমাদের সাথে কিছু করার সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু সুযোগ পেলে ঠিকই বিষাক্ত নাগিনীর মতো ছোবল মারবে। সে মনে মনে এখনো তোমাকে ঘৃণা করে। কিন্তু আজ তোমার টাকা আছে বলে তোমাকে সমীহ করে চলে। মানুষ স্বার্থের জন্য সবকিছু করতে পারে। কিন্তু স্বার্থ ফুরিয়ে গেলেই আবার আগের রূপে ফিরে আসে।

ফারজাদের কথাগুলো অত্যন্ত যুক্তিসম্মত। মিসেস ফারজানাও সেগুলো বুঝতে পারেন। কিন্তু তবুও তিনি চান সবকিছু ঠিক হয়ে যাক। নুসরাত যতই খারাপ হোক না কেন তারই তো একমাত্র ছোট বোন। বাবা মারা যাওয়ার আগে তার হাতেই তো তুলে দিয়েছিলেন তাকে। সেই দায়িত্ব পূরণ করতেই তিনি সবকিছু স্বাভাবিক করতে চাচ্ছেন। কিন্তু নুসরাতকে এই বাড়ির কেউই পছন্দ করে না। তাই তিনি নুসরাতকে আর তার প্রতিবন্ধী ভাইকে একটি আলাদা ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছেন। সেখানে তারা এখন থাকে। আর মাঝে মাঝে আবরার ম্যানশনে এসে ঘুরে যায়।

খাওয়ার মাঝে হঠাৎই ফারজাদের ফোনে একটা কল আসে। ফারজাদ কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কিছু একটা বলে ফোন কেটে দেয় তার বাবা। ফারজাদ একটা দীর্ঘশ্বাস নেয়।

- কে ফোন করেছিল ফারজাদ?

- বাবা।

- কি বলল সে?

- বলল যে বিজনেসের কাজে তিনি আজিমপুরে আটকে গেছেন। কিছু ইম্পরট্যান্ট ফাইল তিনি বাড়িতে রেখে গেছেন। সেগুলি তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

- তোকে যেতে বলেছে?

-হুম। এখনই রওনা দিতে হবে। বিকেলের মধ্যে মিটিং শুরু হয়ে যাবে। তার আগে ফাইলগুলো বাবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

ফারজাদ খেয়েদেয়ে উঠে পড়ল। যাবার আগে আরেকবার মায়ের কপালে চুমু খেয়ে নিল।

মিসেস ফারজানা মুচকি হাসি বিড়বিড় করে বললেন, পাগল ছেলে!

ফারজাদ একেবারে রেডি হয়ে সিড়ি বেয়ে। পরনে সাদা টি-শার্ট, তার ওপর নীল রঙের ব্লেজার, কালো রঙের জিন্স। টানা টানা ঘন ভ্রু-যুগল, মায়াবী চোখ, খাড়া নাক। সিল্কি চুলগুলো স্পাইক করে রাখা, ফর্সা মায়াবী মুখটাতে ট্রিম করে রাখা চাপ দাড়ি। চোখে কালো সানগ্লাস, হাতে দামি ঘড়ি। খুবই সুদর্শন দেখতে লাগছে তাকে। টকটকে লাল ফর্সা গায়ের রং। ফারজাদের চোখগুলো একদম ওর মায়ের মত মায়াবী আর টানা টানা। যে কেউ প্রথম দেখাতেই ক্রাশ খেয়ে যাবে।

ফারজাদকে দেখে মিসেস ফারজানা অবাক হয়ে গেলেন। বাসায় অগোছালো থাকলেও কোথাও গেলে ফারজাদ একদম পরিপাটি হয়ে যায়। তখন তাকে একেবারে চেনাই যায় না।

মিসেস ফারজানা এগিয়ে এসে ফারজাদের কপালের কিনারে নিজের চোখ থেকে অল্প একটু খানি কাজল নিয়ে তার চুলের পাশে লাগিয়ে দিলেন। এমন ভাবে লাগালেন যাতে দেখা না যায়। না হলে ফারজাদ আবার রাগ করবে।

মিষ্টি হেসে মিসেস ফারজানা বললেন, আমার ছেলেটার যেন কারো নজর না লাগে।

ফারজাদ মিসেস ফারজানাকে জড়িয়ে ধরে মিষ্টি করে এসে বলল, আমার লক্ষ্মী মিষ্টি মা-টা। পরে মায়ের কপালে একটা চুমু খেয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল সে।

______________________

আকাশের অবস্থা তেমন একটা ভালো নয়। পুরো সকালটা রৌদ্রজ্জল থাকলেও দুপুরের সময়টাতে কেমন মেঘ মেঘ ভাব করেছে। এজন্যই হয়তো সকালবেলা ভ্যাপসা গরম পড়েছিল। ফারজাদ তার বাবার অফিসের কাছে পৌঁছে গেছে প্রায় তখনই ঝুম বৃষ্টি শুরু হল। প্রচন্ড বিরক্ত হলো সে। এমনিতেই জ্যামের কারণে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে, তার উপর আবার এই বৃষ্টি! বৃষ্টি তার একদমই ভালো লাগেনা। পুরো দিনটাই কেমন বিষন্ন মনে হয় তার কাছে। তার উপর রাস্তাঘাটে চলাচল করতে গেলে কাদা মাটিতে একাকার হয়ে যায়। ফারজাদ আবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করে। অপরিচ্ছন্নতা তার একদমই পছন্দ নয়।

বিরক্ত হয়ে গাড়ির লুকিং গ্লাস লাগাতে যাবে তখনই কিছু একটাতে তার চোখ আটকে যায়। মুখটা হালকা হাঁ হয়ে যায়। সানগ্লাসের উপর দিয়ে একটা শুভ্র নারীমূর্তির প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। ফারজাদ সানগ্লাসটা আলগোছে নামিয়ে নিয়ে সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখে। সন্ধ্যার আবছা আলোতে বৃষ্টিতে স্নানরত সেই নারীকে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে না। তবুও শুভ্র পোশাকে লম্বা ভেজা চুলে একটা মেয়েকে পরম উচ্ছ্বাসে বৃষ্টি বিলাস করতে দেখা যাচ্ছে। তার সাথে আরও একটা মেয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। ফারজাদ অপলক ভাবে সেই হাস্যজ্জল বৃষ্টিতে স্নানরতা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে মুখে বিরাজ করছে অপরিসীম মুগ্ধতা। হৃদয় জুড়ে বয়ে চলেছে এক অন্যরকম অনুভূতি। এই অনুভূতির সাথে সে পূর্বে পরিচিত ছিল না। একটা অদ্ভুত শিহরণ আর শীতলতা বিরাজ করছে পুরো দেহ মন জুড়ে।

এভাবে কতক্ষণ যে সেদিকে তাকিয়ে রইল ফারজাদ তার হিসেব সে রাখেনি। তার ধ্যান ভাঙলো ফোনের রিংটোন এর আওয়াজে। তার বাবা ফোন করেছে। ফারজাদের এবার মনে হলো সে তো ফাইলের কথা ভুলেই গিয়েছিল। তার বাবার মিটিংয়েরই বা কি হলো কে জানে? এসব ভাবতে ভাবতেই ফোন রিসিভ করলো সে।

- হ্যালো বাবা।

- হ্যালো ফারজাদ কোথায় তুমি? কতক্ষণ ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। তুমি এখনো আসছো না কেন?

- বাবা আমি তোমার অফিসের কাছাকাছিই আছি। আসলে জ্যামের কারণে লেট হয়ে গিয়েছে। তার উপর আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কিন্তু এখন বেশি সময় লাগবে না। তোমার মিটিং কি শুরু হয়ে গিয়েছে?

- না আসলে ক্লায়েন্টরা এসে পৌঁছাতে লেট করেছে। তাই মিটিংও লেট করে স্টার্ট হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে। তুমি তাড়াতাড়ি ফাইলগুলো নিয়ে চলে আসো।

- আচ্ছা বাবা আমি আসছি।

ফারজাদ ফোনটা রেখেই সামনের দিকে তাকালো। তাকাতেই অবাক হয়ে গেল সে। সামনের সেই মেয়েটি নেই। ফারজাদ ব্যস্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে খুঁজতে লাগলো। মুহূর্তেই ভিজে একাকার হয়ে গেল সে। কিন্তু সেদিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে অবিরাম ভাবে মেয়েটাকে আশপাশে খুঁজে চলল। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যে মেয়েটা কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল?

প্রায় অনেকক্ষণ খোঁজার পরও যখন মেয়েটাকে খুঁজে পেল না তখন বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করতে লাগলো ফারজাদ। অদ্ভুত বিষণ্ণতায় মনটা ছেয়ে গেল। আজকে যদি তার বাবাকে ফাইল পৌঁছাতে না হতো তাহলে সে দরকার হলে সারারাত খুঁজতো মেয়েটাকে। কিন্তু তার বাবাকে ফাইলগুলো পৌছে দেওয়া জরুরী। তাই সে বাধ্য হয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়ি চালাতে চালাতে সে প্রতিটা মুহূর্তে আশপাশে নজর বুলাচ্ছিলো। যদি একটিবার মেয়েটিকে দেখতে পাওয়া যায়! কিন্তু তবুও যখন পাওয়া গেল না তখন ফারজাদ একটা বড় দীর্ঘশ্বাস নিল।

ড্রাইভিং করতে করতে ভাবতে লাগলো মেয়েটিকে নিয়ে। এই অল্প সময়ের মধ্যে কেউ বুঝি মনের এত খানি জায়গা দখল করে নিতে পারে? সেটা ফারজাদ আজকে মেয়েটিকে না দেখলে বুঝতেই পারত না। মেয়েটার মধ্যে এমন কি ছিল যার জন্য এতটা টান অনুভূত হচ্ছে মেয়েটার প্রতি? এসবই ভাবছিল ফারজাদ। মনে মনে মেয়েটির একটি নামও দিয়ে দিল সে-শুভ্র পরী।

নিজের অব্যক্ত অনুভূতিগুলো ডাইরির পাতায় লিখে রাখল সে।

" কোনো এক নাম না জানা মায়া কুমারী আজ আমার মনটাকে একদম শূন্য করে দিয়ে চলে গেল। মনের ভিতরে জাগিয়ে দিয়ে গেল এক অপরিসীম অজানা ভালো লাগার অনুভূতি। যার সাথে এর আগে আমি কখনোই পরিচিত ছিলাম না। বৃষ্টি স্নানরতা সেই শুভ্রপরীর মাঝে আজকে আমি এমন কিছু দেখেছি, যা এর আগে আমি কখনোই দেখিনি। মেয়েটার মধ্যে কিছু তো একটা ছিল। যার জন্য এত অল্প সময়ের পরিচয়ে একটা গভীর টান সৃষ্টি হয়েছে তার প্রতি। এই অনুভূতির নাম কি তা আমার জানা নেই। শুধু এতটুকুই জানি, মেয়েটি আমার হৃদয়ের সবখানি দখল করে নিয়েছে। আমার হৃদয় আর আমার নেই। আমার চোখ জোড়া অবিরত তাকেই খুঁজে যাচ্ছে বারংবার।

জানিনা আর কখনো দেখা হবে কিনা। কিন্তু আমি চাই, খুব করে চাই তার সাথে আমার আবার দেখা হোক। তাকে নিজের জীবনের সাথে চিরকালের জন্য জড়িয়ে নিতে চাই। "

( গল্পটা কেমন লাগলো অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। আপনাদের পছন্দ-অপছন্দের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী পার্ট দেওয়া হবে। )

চলবে,,,?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন