ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক তোমাতে আসক্ত

১০ম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া শিমু

#এক_তোমাতে_আসক্ত

#সুমাইয়া_শিমু

#পর্ব_১০

__________________________

ফাইজা ফারজাদকে খোঁচা দিয়ে বলল, এভাবে আর কতক্ষণ তাকিয়ে থাকবি ভাইয়া? চোখের পলক তো ফেল! বিয়ের আগে সব দেখা শেষ করে নিলে বিয়ের পরে কি করবি?

বলেই মুখ টিপে হাসতে লাগলো সে। ফারজাদ নড়ে চড়ে উঠে স্বাভাবিক হয়ে বসল। ফাইজার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, বেশি পাকা কথা শিখে গেছিস তাই না?

পাশ থেকে আয়ান টিপ্পনি কেটে বলল, ঠিকই তো বলেছে ফাইজা। এভাবে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকলে তো স্ট্যাচু হয়ে যাবি। তখন আমাদের ভাবির কি হবে?

শ্রেয়সী ওদের কান্ড দেখে অনেক আগেই চোখ নামিয়ে ফেলেছে। বেশ লজ্জা পাচ্ছে আর ইতস্তত বোধ করছে সে।

ফারজাদ দাঁতে দাঁত চেপে আয়ান কে বলল, মজা নিচ্ছিস তো? আচ্ছা নে। আমার যেদিন সময় আসবে সেদিন আমিও বুঝিয়ে দিবো।

আয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, সেই দিন আর কোনদিন আসবেনা বোধহয়। আমার কপালে আবার মেয়ে!

তখনই শ্রেয়সীদের বাড়ির কলিংবেলটা আবার বেজে ওঠে। শ্রেয়সী নিজেই উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। সুমী এসেছে। আজকে ওদের একসাথে ভার্সিটি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শ্রেয়সী আসছে না দেখে সে নিজেই বাড়ি চলে এসেছে। শ্রেয়সী তাকে দেখতে আসার ব্যাপারে সুমিকে কিছুই জানায়নি। তাই বেচারি কিছুই জানেনা।

ড্রয়িং রুমের দিকে আসতে আসতে কোনো দিকে না তাকিয়েই সুমী বলতে লাগলো, তোকে কতক্ষণ যাবৎ কল করে যাচ্ছি কোন রেসপন্সই পাচ্ছিনা। কত চিন্তা হচ্ছিলো আমার জানিস? এখন তো কল রিসিভ করবিই না। আমি তো পর হয়ে গেছি তাই না? এখন তো আমাকে আর প্রয়োজন নেই। এখন তোর ধ্যান জ্ঞান সব জুড়েই ফারজাদ ভাইয়া। তার কথায় নিশ্চয়ই ভাবছিলি এতক্ষণ? তার সাথে কথা বলতে বলতে তো আমার সাথে কথা বলার সময়ই পাস না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এবার সুমী সামনের দিকে তাকালো। তাকাতেই যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠল সে। ড্রয়িং রুম ভর্তি সব মানুষ তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। শ্রেয়সী তাকে অনেকক্ষণ যাবৎ থামানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু সুমি তার কোন কথা না শুনেই নিজের মতো করে বকবক চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন এতগুলো মানুষকে একসাথে দেখে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ফারজাদ আর ফাইজাকে দেখে নিশ্চিত হলো যে সবাই ফারজাদের পরিবারের সদস্য। একটা শুকনো ঢোক গিলে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল সবার দিকে।

পরক্ষণেই সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। যেন খুব মজার কিছু একটা দেখেছে সবাই এমন ভাব সবার মধ্যে।

ফারজাদ মজা করে বলল, তোমার বান্ধবী তোমাকে একটুও ভুলে যায়নি সুমী। ও তোমার কথা এত বেশি পরিমাণে আমার কাছে বলে যে, ও যে তোমাকে কতটা ভালোবাসে সেটা বোঝাই যায়। তুমি ওকে ভুল বুঝোনা।

সুমী হাসার চেষ্টা করলো। তারপর শ্রেয়সীর দিকে অপরাধীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে চোখে চোখে ক্ষমা চাইল। শ্রেয়সী চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিল সে তাকে ক্ষমা করেছে। সুমি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

ওদিকে আয়ান সুমিকে দেখামাত্রই তার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো। তার দিন দুনিয়া যেন সব ভুলে গেছে সে। সুমীকে দেখা মাত্রই তার অবচেতন মনে একটা সূক্ষ্ম অনুভূতি নাড়া দিয়ে উঠলো। হৃদস্পন্দন জোরে জোরে বাড়তে লাগলো।

ফারজাদ সেটা লক্ষ্য করে আয়ানকে খোঁচা দিয়ে বলল, এভাবে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলে কিন্তু মুখে মশা ঢুকে যাবে। তখন তোর মত মশাখোর একটা বন্ধুর সাথে আমাকে চলতে হবে। আর বেশিক্ষণ এভাবে স্ট্যাচুর মত থাকলে তুই তো স্ট্যাচু অফ লিবার্টি হয়ে যাবি।

বলে হাসতে হাসতে আয়ানের দিকে তাকিয়ে একটা টিপ্পনী মারল ফারজাদ। আয়ান কপট রাগ দেখিয়ে মাথা নিচু করে নিল।

সুমী সোফায় বসতে বসতে অবাক হয়ে শ্রেয়সীকে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, এখানে কি হচ্ছে রে শ্রেয়া?

শ্রেয়সী নিচু কন্ঠে বলল, ফারজাদের পরিবারের লোকজন আমাকে দেখতে এসেছে বিয়ের পাকা ডেট ফাইনাল করতে।

সুমী বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল শ্রেয়সীর দিকে। তার চোখে মুখে চাপা অভিমান। অভিমানী কন্ঠে শ্রেয়সী কে জিজ্ঞেস করল, তুই আমাকে এই কথাটা বললি না?

- আরে ফারজাদ আমাকে কাউকে জানাতে নিষেধ করেছিল। এমনকি আমার বাবা-মাকেও না। তাই কাউকে জানাইনি।

সুমী কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, তাই বলে তুই নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড এর কাছ থেকেও লুকাবি? দুলাভাইকে পেয়ে তুই আমাকে ভুলেই গেছিস। এত বছরের ফ্রেন্ডশিপ আমাদের। কেউ কারো কাছ থেকে কোন কথা লুকাই না। আর তুই কিনা এমনটি করলি?

শ্রেয়সী দুঃখিত ভাব নিয়ে বলল, সরি রে। আসলে আমি চেয়েছিলাম একেবারে বিয়ের ডেট ফাইনাল হলেই তোকে জানাবো। তোর জন্য সারপ্রাইজ রাখতে চেয়েছিলাম। তুই রাগ করিস না প্লিজ?

সুমী উপর দিয়ে রাগ দেখালেও ভেতরে ভেতরে সে গলে গেছে। আসলে মেয়েটা এমনই। ওকে কেউ একটু ভালোমতো বোঝালেই সে একদম বুঝে যায়। অন্যদের মতো রাগ-অভিমান করে থাকে না।

এদিকে মিসেস সালমা মিস্টার আহনাফ চৌধুরীকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলেন। রুমে গিয়ে তিনি তাকে বুঝিয়ে সব বলেছেন। তাই কিছুটা সময় লেগেছে।

আহনাফ চৌধুরীর শরীরটা বেশ ভালো না। ড্রয়িং রুম অবধি আসতেই তার কেমন যেন লেগেছে। ধীরপায়ে ড্রয়িং রুমে এসে একটি সোফায় বসলেন তিনি। তার পাশেই মিসেস সালমা বসলেন।

আরমান আব্রার চৌধুরী তো আহনাফ চৌধুরীকে দেখেই চমকে গেলেন। উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। ততক্ষণে মিস্টার আহনাফ চৌধুরীও আরমান চৌধুরীকে দেখলেন। তিনিও বেশ অবাক হলেন।

আরমান চৌধুরীকে সোফা ছেড়ে উঠে যেতে দেখে সবাই বেশ অবাক হয়ে গেল। কেউ কিছু বলার আগেই আরমান চৌধুরী আহনাফ চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনি মিস্টার আহনাফ আহমেদ চৌধুরী। এম আই রাইট?

আহনাফ চৌধুরী গম্ভীর ভাবে মাথা নেড়ে নিজের সম্মতি জানালেন।

আরমান চৌধুরী তার পরিবারের সবাইকে উদ্দেশ্য করে রাসভারি কন্ঠে বললেন, এ বিয়ে হবে না। সবাই ফিরে চলো।

উপস্থিত সবাই ভীষণ অবাক হয়ে গেল। বিশেষ করে ফারজাদের অবস্থা তো খুবই করুণ। বেচারার কলিজাটা যেন কেউ কেটে খন্ড-বিখন্ড করছে এমন মনে হচ্ছে তার। শ্রেয়সীর দিকে তাকাতেই দেখল তার চোখেও পানি টলমল করছে।

মিসেস ফারজানা কিছুটা রাগী কন্ঠে বললেন, এসবের মানে কি আরমান? তুমি নিজে বাসা থেকে রাজি হয়ে এখানে সম্বন্ধ নিয়ে এসেছো। এখন কোন কারণ ছাড়াই বিয়ে ভেঙে দিবে কেন?

আরমান চৌধুরী বেশ অহংকারের সাথে বললেন, যার তার ঘরের মেয়েকে আমি আমার বাড়ির বউ করে নিয়ে যাব না।

আহনাফ চৌধুরী এতক্ষণ চুপ থাকলেও এবার তিনি বেশ রেগে গেলেন। উত্তেজিত হয়ে অসুস্থ শরীর নিয়ে আরমান চৌধুরীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাগী কন্ঠে বলতে লাগলেন, অনেকক্ষণ ধরে আপনার অনেক অপমানজনক কথাবার্তা আমি সহ্য করছি। কেননা নিজের বাড়িতে মেহমানকে অপমান করার রীতি আমাদের নেই। না হলে এতক্ষণ আপনি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন না। আর যার তার ঘরের মেয়ে বলছেন কাকে? আমার মেয়ে লাখে একটা। আমাদের ফ্যামিলি অত্যন্ত সম্মানিত একটি ফ্যামিলি। বহু বছর আগের থেকে সম্মানের সাথে আমরা বসবাস করে আসছি। আপনার মত কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করতে না পারলেও সম্মানে আপনার থেকে বহুগুণ আগে আমি। আর আপনাকে বলিনি আমার বাড়িতে বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসতে। আপনি নিজে থেকেই এসেছেন। আর আগে যদি জানতাম আপনি আসবেন, তাহলে এবারে চৌকাঠ পার হতে দিতাম না আপনাকে। ভদ্র ভাষায় বলছি, আপনার পরিবারকে নিয়ে এখান থেকে চলে যান।

আরমান চৌধুরী রাগে গজগজ করতে লাগলেন। রেগে গেলে তিনি কি করেন না করেন নি তার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। প্রচন্ড রেগে চিৎকার করে মিসেস ফারজানাকে বললেন, চলো এখান থেকে। আর এক মুহূর্তও এখানে থাকবো না। আমার ছেলেকে এর থেকেও বড় ঘরে বিয়ে করাবো আমি। এই মেয়ে থেকেও হাজার গুন ভালো মেয়ে আমি নিয়ে আসবো ওর জন্য।

ফারজাদ এবার চুপ করে না থাকতে পেরে শক্ত কণ্ঠে বলল, বাবা আমি জানিনা তোমার আর মিস্টার আহনাফ চৌধুরীর মাঝে কি হয়েছে। আর জানতেও চাই না। তোমাদের পার্সোনাল ব্যাপার যাই থাক না কেন, এর মধ্যে আমাকে আর শ্রেয়সীকে জড়াবে না দয়া করে। আর তুমি ওর সম্পর্কে না জেনে, ওর পরিবার সম্পর্কে ভালোভাবে না জেনে, ওকে যার তার ঘরের মেয়ে বলতে পারো না। শ্রেয়সী খুবই মেধাবী আর ভালো একটা মেয়ে। ওর থেকে হাজারগুন ভালো মেয়ে আমি আশা করি না। বিয়ে যদি করতেই হয় কোন বড় ঘরের মেয়েকে করব না। যাকে ভালবেসেছি তাকেই করব।

আরমান চৌধুরী প্রচন্ড রেগে ধমকে উঠে বললেন, ফারজাদ!! কত বড় সাহস তোমার তুমি তোমার বাবার মুখের উপর কথা বলো। এই শিক্ষা দিয়েছি আমি তোমাকে? যে তোমার বাবাকে অপমান করেছে তুমি তার পক্ষ নিয়েই কথা বলছো?

ফারজাদ কিছু বলার আগেই মিসেস ফারজানা বললেন,ফারজাদ তো ভুল কিছু বলেনি আরমান। বরং একদম ঠিক কথাই বলেছে। আমার এটা ভেবে ভালো লাগছে যে, আমি ওকে সঠিক শিক্ষা দিতে পেরেছি। সঠিক জায়গায় সঠিক কথা বলার শিক্ষাটা দিতে পেরেছি। আর মিস্টার আহনাফ চৌধুরী তোমাকে প্রথমে অপমান করেননি। বরং তুমি তাকে এবং তার মেয়েকে ছোট করে কথা বলেছো। সেজন্যই তিনি প্রতিবাদ করে ভদ্রভাবে কথাগুলো বলেছেন। এখানে আমি তার দোষের কিছু দেখছি না।

মিস্টার আরমান চৌধুরী অবাক হয়ে মিসেস ফারজানার দিকে তাকিয়ে রইলেন। শেষ পর্যন্ত কিনা তার স্ত্রী আর ছেলে তার বিপক্ষে চলে গেল? তাও কিনা সম্পূর্ণ অপরিচিত কিছু মানুষের সামনে? জীবনে কোনদিন কারো কাছ থেকে অপমানিত হননি আরমান চৌধুরী। তার কথাকেই তিনি সঠিক ভেবে এসেছেন সব সময়। অন্যের কথা কে কখনোই মূল্যায়ন করেননি। কারো সামনে মাথাও নিচু করেননি। আজকে না তার পরিবারের জন্যই অন্য মানুষের সামনে তাকে মাথা নিচু করতে হচ্ছে। এসব ভাবতেই নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন তিনি।

কোন কথা না বলে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন মিস্টার আরমান চৌধুরী। কিন্তু কেউই তার পেছনে গেল না। কারণ আরমান চৌধুরীর রাগ উঠলে সহজে তা ভাঙ্গে না। কিছুদিন সময় লাগে রাগ ভাঙতে। তখন আপনাআপনিই সবার সাথে মিশে যান তিনি। কিন্তু সবার অগোচরে নুসরাত তার পিছু পিছু গেল। এই ঘটনা আর কেউ খুশি হোক বা না হোক, সে তো অত্যন্ত খুশি হয়েছে। মনে মনে সে এমন কিছু একটাই চাইছিল।

মিসেস ফারজানা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। কিছুক্ষণ আগের গমগম করা পরিবেশটা এখন কেমন থমথমে হয়ে গেছে। সবার চোখে মুখে বিষাদ আর মলিনতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে।

পরিবেশটা স্বাভাবিক করতে তিনি মিস্টার আহনাফ চৌধুরী আর মিসেস সালমার কাছে গিয়ে মিসেস ফারজানা বিনীত কন্ঠে বললেন, আমি আমার স্বামীর পক্ষ থেকে আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। জানিনা মিস্টার আহনাফ চৌধুরীর সাথে তার কি ঝামেলা হয়েছে। তবে এতোটুকু জানি আমার স্বামীর দোষই হয়তো বেশি ছিল। কারণ আমি তাকে অনেক বছর ধরে চিনি। তার বিজনেস পার্টনারও ছিলাম আমি। তাই তার স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে আমার চেয়ে ভালো আর বেশি কেউ জানে না। দয়া করে স্বামীর জন্য ফারজাদ আর শ্রেয়সীর সম্পর্কে কোনো ভাঙ্গন ধরাবেন না আপনারা?

মিসেস সালমা মিসেস ফারজানার কথায় কিছুটা সন্তুষ্ট হলেন। কিন্তু আহনাফ চৌধুরী বিনয়ের সাথে বললেন, মিস্টার আরমান চৌধুরীর জন্য আপনাকে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে না মিসেস চৌধুরী। আমি জানি এতে আপনাদের কোন দোষ নেই। আর একজনের দোষ আমি অন্যকে কখনো দিই না। কিন্তু বিয়ের ব্যাপারটা খুবই সেনসিটিভ একটা ইস্যু। কারন আমি যদি ফারজাদের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিই, তখন কিন্তু তাকে আপনাদের সাথেই থাকতে হবে। মিস্টার আরমান চৌধুরীও তো আপনাদের পরিবারেরই একটা অংশ। তার সাথেও তাকে মানিয়ে নিতে হবে। কিন্তু তার ব্যবহারে যা বুঝলাম, তিনি আমার মেয়েকে কখনোই মেনে নিবেন না। আর এতে করে আমার মেয়ে কখনো সুখী হবে না। আর আমার মেয়ে অসুখী হবে এমন কোন পরিবারে আমি আমার মেয়েকে দিতে পারব না। আমাকে ক্ষমা করবেন দয়া করে।

ফারজাদ আর শ্রেয়সী দুজনের হৃদয়টাই যেন ধারালো ছুরি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে কেউ। এভাবে তাদের ভালবাসার করুণ পরিণতি তারা কিছুতেই দেখতে পারবে না। শ্রেয়সী করুণ চোখে ফারজাদের দিকে তাকালো।

ফারজাদ মিস্টার আহনাফ চৌধুরী কাছে গিয়ে বিনীতভাবে বলল, প্রথমেই আমার বাবার ব্যবহারের জন্য আমি আবারও ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আপনার কাছে। কিন্তু দেখুন বিয়েটা হবে আমার আর শ্রেয়সীর। আমাদের দুজনের মধ্যে ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকলে কেউ আমাদের অসুখী করতে পারবেনা। আমাদের একে অপরের প্রতি বিশ্বাস থাকলে, আমাদের সম্পর্কে কেউ ফাটল ধরাতে পারবেনা। সেখানে আমার বাবা হয়তো এখন অনেকটা রেগে আছেন। কিন্তু সবকিছুর উর্ধ্বে সে একজন বাবা। আর সে কিছুতেই চাইবে না তার সন্তানের ক্ষতি হোক। একবার বিয়েটা হয়ে যাক, আমার বিশ্বাস তিনি আমাদেরকে মেনে নিবেন। বেশিদিন রাগ করে থাকতে পারবেন না আমাদের উপর। আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। আপনার মেয়েকে কখনোই অসুখী করব না আমি। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানিও ঝরতে দিব না। সব সময় খুব ভালো রাখবো তাকে।

বলে ফারজাদ শ্রেয়সীর দিকে তাকালো। শ্রেয়সীর চোখ থেকে তখনো অশ্রু ঝরছে। কিন্তু এবারের অশ্রুটা আনন্দঅশ্রু।

মিস্টার আহনাফ চৌধুরী চুপ করে থাকলেন। মিসেস সালমা, শ্রেয়ান আর শ্রাবণী সবাই চুপ করে রইল। আর ওদিকে ফারজাদ, শ্রেয়সী, ফাইজা, মিসেস ফারজানা, আয়ান, সুমী, ছোট শান্ত সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে রইল তাদের মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য।

অনেকক্ষণের নীরবতা ভেঙ্গে মিস্টার আহনাফ চৌধুরী বললেন, আমি ভেবে দেখতে চাই। কিছুদিন সময় দিন আমাকে। আপাতত এই বিয়ের কথা এখানেই শেষ করলাম।

সবার মাঝে কিছুটা স্বস্তি দেখা দিলেও ফারজাদ আর শ্রেয়সীর মাঝে অস্বস্তি দ্বিগুণ বেড়ে গেল। একে অপরের দিকে চাতক পাখির ন্যায় চেয়ে রইলো দুজন।

মিসেস ফারজানা নিশ্চিন্ত হতে বললেন, তাহলে কি ধরে নিবো আপনার মেয়েকে আমার বাড়ির বউ বানাতে আপনি রাজি?

মিসেস সালমা বললেন, আপনারা এই ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আপনার ছেলে আর আমাদের মেয়ের ভালো হবে এমন সিদ্ধান্তই আমরা জানাবো। তাদের কষ্ট হবে বা তারা অসুখী হবে এমন কোন কিছু আমরা করব না।

মিসেস সালমার মুখে এমন কথা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন মিসেস ফারজানা। তারপর বিনয়ের সাথে বললেন, এবার তাহলে আমরা আসি। এমন একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা আমরা আশা করিনি। ভেবেছিলাম একেবারে বিয়ের ডেট এর ফাইনাল করি যাবো এখান থেকে। কিন্তু যা হয়েছে আমাদের পরিবারের জন্যই হয়েছে। তার জন্য আমাদেরকে ক্ষমা করবেন।

মিসেস সালমা বললেন, না আপা বারবার ক্ষমা চেয়ে আমাদেরকে ছোট করবেন না। এতে আপনাদের কোন দোষ নেই। আপনি আমাদেরকে এভাবে ফিরে যেতে হচ্ছে সেজন্য আমরাও আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

সব কথাবার্তা শেষ করে সবাই রওনা হলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে কান্নারত শ্রেয়সীর দুহাত ধরে আশ্বাসের বাণী দিয়ে গেল ফারজাদ। শ্রেয়সীর চোখের পানি মুছে দিয়ে পরম মমতায় বলল, কান্না করো না শ্যালু। আমার থেকে তোমাকে কেউ আলাদা করতে পারবেনা। আমি তোমাকেই বিয়ে করব। আল্লাহ ব্যতীত কোন শক্তিই আমাদেরকে আলাদা করতে পারবেনা। আমি আবার আসব তোমাকে নিয়ে যেতে। তোমাকে বউ করে নিয়ে যাব আমি।

______________________

মারাত্মক গতিতে ড্রাইভ করছেন মিস্টার আরমান চৌধুরী। ইতোমধ্যে কয়েকটি গাড়িকে বেশ জোরে ধাক্কা দিয়েছেন তিনি। ট্রাফিক রুলস ভেঙে গাড়ি চালাচ্ছেন দ্রুত গতিতে। ট্রাফিক পুলিশ তাকে তাড়া করলেও তার গতির কাছে হার মানতে হয়। রাগে চোখমুখ লাল হয়ে গেছে আরমান চৌধুরীর। তার পাশের সিটে বসে নুসরাত ভয়ে কাঁপাকাঁপি করছে। আরমান চৌধুরী গাড়িতে ওঠার সময় সে তাড়াতাড়ি তার পাশের সিটে বসে পড়ে। গাড়িতে ওঠার পর থেকেই মিসেস ফারজানা আর ফারজাদের নামে যত ধরনের কুমন্ত্রণা দেওয়া যায় সবই দিয়েছে সে। যত ধরনের বিষ ঢালা যায় সবই ঢেলেছে। আর এতেই রাগে বোম হয়ে গেছেন আরমান চৌধুরী।

নুসরাত ভয় জড়িত কন্ঠে বলল, আস্তে গাড়ি চালান দুলাভাই। পরে এক্সিডেন্ট করবেন তো।

নুসরাতের কথায় কাজ হলো না আরমান চৌধুরীর। সে তার মতো করে আগের মতই দ্রুতগতিতে ড্রাইভ করতে লাগলো। প্রায় অনেকক্ষণ পরে একটা শুনশান জায়গায় গাড়ি থামালেন তিনি। নুসরাত কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। গাড়ি থেকে নেমে বাইরে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস নিলেন আরমান চৌধুরী। নুসরাত তার পিছু পিছু গিয়ে তার পাশে দাঁড়ালো।

অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর নুসরাত বলতে লাগলো, আপনাকে বলেছিলাম না দুলাভাই? আপনি যাদেরকে সবচেয়ে আপন ভাবেন তারাই আপনাকে আপন ভাবে না। আপনার কথাকে আর মতামতকে কোন মূল্যই দিল না ফারজাদ আর আপা? কতগুলো অপরিচিত মানুষের সামনে আপনাকে এভাবে অপমান করলো? এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আপনি কারো সামনে অপমানিত হয়েছেন এভাবে? অথচ আজ আপনারই আপনজন গুলো আপনাকে সাপোর্ট করার পরিবর্তে সেই অপরিচিত মানুষগুলোকে সাপোর্ট করল। আপনাকে কতটা অবজ্ঞা করলো ভেবে দেখেছেন?

মিস্টার আরমান চৌধুরী সরু চোখে তাকিয়ে রইলেন নুসরাতের দিকে। এই মেয়েটাকে তার কখনোই ভালো লাগেনি। সব সময় এড়িয়ে চলেছেন তাকে। তবে আজ কেন জানি তার কথাগুলো তাকে ভাবাচ্ছে। আসলেই তাঁর আপন মানুষ গুলো তাকে কিভাবে এতটা পর করে দিলো? কিভাবেই বা তাকে সাপোর্ট করলো না? যাদের জন্য সে পুরোটা জীবন ব্যয় করেছে?

কিন্তু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে হয়তো আরমান চৌধুরী সঠিক ব্যাপারটা বুঝতে পারতেন। কিন্তু রাগ এমন একটা জিনিস যা মানুষকে ঠিক ভুলের ব্যবধান ভুলিয়ে দেয়। তখন ভুল কথাও মানুষের কাছে সঠিক মনে হয়। আর কোনো সুবিধাবাদী, অসৎ মানুষ যদি কুমন্ত্রণা দেয় তাহলে আপনজনদেরও শত্রু হয়ে ওঠা যায়। মিস্টার আরমান চৌধুরী ক্ষেত্রেও তেমনটি হয়েছে। তিনি ঠিক ভুলের ব্যবধানটি ভুলে গিয়েছেন। একটা লোভী, খারাপ মেয়ের কথায় তিনি তার আপনজনদের ভুল বুঝছেন। যা অনেক সুন্দর সম্পর্ককেও নষ্ট করে দেয়।

মিস্টার আরমান চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন, তুমি হয়তো ঠিক বলেছো নুসরাত। অথচ এই তোমাকেই আমি একটা সময় পছন্দ করতাম না। ভাবতাম তোমার আপাই বুঝি সঠিক, আর তুমি সব সময় তার এবং আমাদের ক্ষতি চাও। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। তুমি সব সময় সঠিক ছিলে। এজন্যই হয়তো তোমার আপা এবং ফারজাদ তোমাকে পছন্দ করে না।

আজকে আমার আপনজনরা আমাকে বুঝলো না। আমার পক্ষ না নিয়ে অন্য আরেকজনের পক্ষ নিল। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমার জায়গাটা তাদের মনে কোথায়। যাদেরকে আমি আপন ভাবতাম তারাই আমাকে আপন ভাবতো না। অথচ তোমাকে আমি কখনো তেমন একটা পাত্তা দিতাম না, অথচ তুমি আমাকে বুঝলে। সত্যিই অনেক বড় ভুল করেছি আমি। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।

নুসরাত মনে মনে একটা শয়তানি হাসি দিল। এতদিনে তার উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও সফল হয়েছে। এবার মিস্টার আরমান চৌধুরীকে দাবার গুটি বানিয়ে সে তার চাল চালবে। মিসেস ফারজানা আর ফারজাদ কে বুঝিয়ে দেবে তাকে অপমান করার পরিণতি। তার আকাঙ্ক্ষিত সবকিছু সে আদায় করে নিবে। এজন্য যা করার প্রয়োজন হয় তার সবই সে করবে।

কিন্তু মুখে একটা দরদী ভাব ফুটিয়ে বলল,ছি ছি এসব কি বলছেন দুলাভাই? আপনি আমার গুরুজন। আপনি কেন আমার কাছে ক্ষমা চাইবেন? আপনি যে আমাকে বুঝতে পেরেছেন এটাই অনেক। আমাকে ভুল বুঝলেও আমি জানতাম একদিন না একদিন আমাকে আপনি ঠিকই বুঝবেন। দেখুন আজ আপনি আমাকে বুঝতে পেরেছেন। এটাই আমার এটাই আমার কাছে পরমপ্রাপ্তি।

বলে মিস্টার আরমান চৌধুরীর একটা হাত দুহাত দিয়ে চেপে ধরল নুসরাত। মিস্টার আরমান চৌধুরী অবাক হয়ে হাতের দিকে একবার তাকিয়ে নুসরাতের মুখের দিকে তাকালো। আগেও এরকম অনেক বার করেছে নুসরাত। কিন্তু আরমান চৌধুরী ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিয়েছেন বারবার। কিন্তু আজ অবাক করা বিষয় হলো, তিনি হাত সরালেন না। বরং নিজের অন্য হাত দিয়ে তার হাত দুটি চেপে ধরলেন।

চলবে,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন