ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক তোমাতে আসক্ত

১৩তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া শিমু

#এক_তোমাতে_আসক্ত

#সুমাইয়া_শিমু

#পর্ব_১৩

__________________________

শুভ্র প্রাচীর ঘেরা কবরের মাটি খামছে ধরে গগণবিদারী আর্তনাদ করে কান্না করে যাচ্ছে ফারজাদ। ওকে সামলানো দায় হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত ওকে সবাই শান্ত করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু এখন কেউ ওকে বাধা দিচ্ছে না। বরং ইচ্ছেমতো কান্না করতে দিচ্ছে। কান্না করলে বুকের ভেতরের জমা চাপা কষ্ট গুলো হালকা হয়ে যাবে। রৌদ্রজ্জ্বল আকাশে যেমন মেঘ করলে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়লে আকাশ পরিস্কার হয়ে যায়। তেমনি মনের ভেতরে দুঃখ-কষ্ট জমা হয়ে থাকলে, কান্না করলে মনটা তেমনি হালকা হয়ে যায়।

শ্রেয়সী, ফাইজা, আয়ান, সুমি, শান্ত প্রত্যেকের নীরব নিস্তব্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেন তাদের কোন অস্তিত্বই নেই এখানে। কেবল সবার চোখ থেকে টুপ টুপ করে অশ্রু ঝরে যাচ্ছে।

একদিন না একদিন সবাইকেই এই কবরে যেতে হবে। নশ্বর দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে এক অবিনশ্বর জগতে প্রবেশ করতে হবে। কেউ আমাদের আগে যাবে, কেউবা আমাদের পরে যাবে। কিন্তু যেতে আমাদের সবাইকেই হবে। মৃত্যু এক অমোঘ সত্য। নিয়তির নিষ্ঠুরতম সত্যি। কিছুদিনের জন্য দুনিয়ার মেহমান হয়ে এসেছে সবাই। কিন্তু সময় ফুরিয়ে গেলে একদিন ঠিকই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে ফিরে যেতে হবে। ফিরে যেতে হবে সেই অবিনশ্বর, অনন্তকালের জীবনে।

প্রায় ঘন্টাখানেক ফারজাদ সেখানেই বসে কান্না করলো। ছেলেদের চোখ দিয়ে নাকি সহজে অশ্রু ঝরে না। কিন্তু ছেলেরাও তো মানুষ। প্রিয়জনের মৃত্যুতে তাদেরও অশ্রুর বাঁধ ফেটে যায়। যেমনটা ফারজাদের বাঁধ ভাঙ্গা কান্নার ক্ষেত্রে হচ্ছে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে কোনদিন কান্না না করা ছেলেটা, আজ প্রবল আর্তনাদ করে কাঁদছে। প্রিয় মানুষের মৃত্যু আসলেই কতটা হৃদয়বিদারক হয়, সেটা শুধু যাদের প্রিয় মানুষ হারিয়েছে তারাই বুঝতে পারে।

এক সময় কান্না থামিয়া নীরব নিস্তব্ধ হয়ে রইল ফারজাদ। কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়েও সে ফিরে তাকালো না। সে জানে এটা কার স্পর্শ। প্রত্যেকটা আপন জনের স্পর্শ সে আলাদা আলাদা ভাবে চিনে।

শ্রেয়সী অশ্রুসজল চোখে পাশে বসে পড়ল। এরপর অন্যরাও ফারজাদকে ঘিরে বসে পড়লো। কিন্তু ফারজাদের কোন প্রতিক্রিয়া নেই। সে নীরব, নির্বিকার, নিস্তব্ধ, অনুভূতিহীন।

- ঘরে ফিরে চলো ফারজাদ। আন্টি উপর থেকে সব দেখছেন। তুমি যদি তার কবরের পাশে বসে এভাবে কান্না করো, তাহলে তিনি ভালো থাকতে পারবেন বলো? তোমার কান্না যে তিনি সহ্য করতে পারছেন না।

শ্রেয়সীর বেদনা ভরা কন্ঠেও ফারজাদ নির্বিকার।

- আমি আম্মুকে হারিয়েছি। তোকে আমি হারাতে পারবো না ভাইয়া। প্লিজ তুই এমন করিস না। তাহলে আমি কিন্তু একদম মরে যাব।

ফাইজা কান্না করতে করতে কথাগুলো বলল।ফারজাদ ফিরে তাকালো তার দিকে। ফাইজার স্নিগ্ধ, মায়াবী মুখটা আজ বিষাক্ত বেদনায় পরিপূর্ণ। যে মুখে সব সময় হাসি লেগে থাকতো,সে মুখ আজ প্রচন্ড ব্যথায় কাতর।

- আমি আমার এক মাকে ছোটবেলায় হারিয়েছি। তোর সাথেবন্ধুত্ব হওয়ার পর, আমি আমার আরেক মাকে ফিরে পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি এতটাই হতভাগা যে, আমার কপালে এই মায়ের আদরও সইলো না।

চোখের পানি মুছে আয়ান আবার বলল, কিন্তু তোকে এবার শক্ত হতে হবে। ফাইজার প্রতি দায়িত্ব নিতে হবে। তোর ভালোবাসার মানুষকে সুখী করতে হবে। তোকে এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না।

- হ্যাঁ ভাইয়া আপনাকে আরো শক্ত হতে হবে। আমরা সবাই আছি আপনার পাশে। এভাবে কান্না করলে আন্টির রুহ কষ্ট পাবেন। তার জন্য নামাজ পড়ে বেশি বেশি করে দোয়া করুন। সন্তানের দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয় সবচেয়ে আগে।

সুমি ধীর কন্ঠে কথাগুলো বলল।

শান্ত ফারজাদের গলা জড়িয়ে ধরে ভেজা কন্ঠে বলল, তোমাকে কান্না করতে দেখলে আমার ভীষণ কষ্ট হয় ভাইয়া। প্লিজ তুমি এভাবে আর কান্না করো না। তাহলে আমার যখন মন খারাপ হবে, তখন কে আমার মন ভালো করবে? কে আমাকে আর ফাইজা আপুকে আদর করবে?

শান্তর চোখ দিয়ে অবিরত পানি ঝরে পড়ছে। সে বারবার তার ছোট হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল, বড় আম্মু আমাকে কত আদর করতো। কত ভালো ছিল আমার বড় আম্মু। কিন্তু সে-ও আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেল। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে জানো? মনে হচ্ছে আমার জীবনের সবচেয়ে দামি একজন মানুষ আমার জীবন থেকে সারা জীবনের জন্য হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি বড় আম্মু আমাদের আশে পাশেই আছে। সে সব সময় আমাদের সবাইকে দেখছে। তাই আমি আর কষ্ট পাবো না। কারণ আমি জানি আমার বড় আম্মু আমার আশেপাশেই আছে। আমি কাঁদলে সেও কষ্ট পাবে। তুমি কাঁদলে সে আরো বেশি কষ্ট পাবে। তোমাকে আর ফাইজা আপুকে সে কতটা ভালোবাসতো। তাই প্লিজ তুমি আর ফাইজা আপু কেঁদো না।

ফারজাদ শান্তকে বুকের মাঝে চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। এই ক্ষত যে কখনো শুকাবার নয়। তীব্র ঘা হয়ে সারা জীবন বুকের মধ্যে জ্বালা দিয়ে যাবে। তবুও তীব্র কষ্টকে সহ্য করে সামনে এগিয়ে চলতে হবে। অনেক মানুষের দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের ভালো রাখার, ভালোবাসার দায়িত্ব।

জীবন থেমে থাকে না। সময়ের পরিক্রমায়, আর জীবন স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায় মানুষের জীবনকে। সেই স্রোতে মানুষকে অবিরাম পথ চলতে হয় শত কষ্টের পাহাড় নিয়েও। এরই নাম জীবন। সুখ-দুঃখের পরিক্রমায় জীবনে স্রোত বারবার পরিবর্তিত হয়।

_________________

এই ঘটনার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। সবাই কিছুটা স্বাভাবিক হলেও, মন থেকে সেই দুর্ঘটনার রেশ এখনো কমেনি। বরং সেই তীব্র কষ্টকে চাপা দিয়ে চলতে হচ্ছে। ফারজাদ মেনশন এর হাসিখুশি পরিবারটা যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফারজাদ আর ফাইজা নিজেদের মতো করে থাকে। নুসরাত নবীনকে নিয়ে আরমান চৌধুরীর সেই ঘটনার পর থেকেই তার ফ্ল্যাটে চলে গেছে। অবশ্য সব ধ্বংস করে গিয়ে তবেই গিয়েছে। আরমান চৌধুরী জীবন্ত লাশের মতো ঘরে পড়ে থাকেন। রহমান মিয়া আর মার্জিয়া তার খেয়াল রাখেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি তার উদাসীন অবস্থা। তাদের ম্যানেজাররা সব কিছু দেখাশোনা করছেন এখন।একজন মানুষের মৃত্যু সবার জীবন কতটা বদলে দিতে পারে।

ফারজাদ শ্রেয়সীকে অনেকটা জোর করেই তার বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। শ্রেয়সী কিছুতেই এই দূরাবস্থায় তাদেরকে ছেড়ে যেতে চায়নি।কিন্তু ফারজাদ বুঝতে পেরেছিল, এখানে থাকলে তার পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারের ক্ষতি হবে। আর সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, কখনো শ্রেয়সীর স্বপ্নকে অপূর্ণ রাখতে দিবেনা। নিজের সম্পূর্ণটা দিয়ে সে শ্রেয়সীর স্বপ্নকে পূরণ করবে।

বাসায় উদাস ভাবে বসে আছে শ্রেয়সী। কোন কিছুতেই মন বসছে না তার। পড়াশোনাতেও মন বসাতে পারছে না। সারাক্ষণ ফারজাদ আর ফাইজার চিন্তায় মন পড়ে থাকে। কেমন একটা অস্থিরতা কাজ করে সারাক্ষণ।

শরতের তীব্র দুপুরে চারপাশটা কেমন সব থম মেরে আছে। নীল আকাশে শুভ্র বাদলের ছড়াছড়ি। দুপুরে তীব্র রোদেও এক অপরিসীম স্নিগ্ধতা বিরাজ করছে। কিন্তু শ্রেয়সীর কাছে এই দুপুরটাকেও কেমন অসহ্য লাগছে। মন ভালো না থাকলে সবকিছুই কেমন অসহ্য লাগে।

মিসেস সালমা শ্রেয়সীর রুমে এসে ওকে কোথাও না পেয়ে বারান্দার দিকে গেলেন। সেখানে বারান্দার রেলিং ঘেঁষে এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলেন। মেয়েটা আজকাল বড্ড চুপচাপ হয়ে গেছে তার। আগের মত প্রাণচঞ্চলতা নেই। কেমন যেন নিভু নিভু প্রদীপের মতো সারাক্ষণ চুপ করে থাকে। এর কারণও তিনি জানেন। কিন্তু তার একার চাইলেই তো আর হবে না। বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার।

শ্রেয়সীর কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে মিসেস সালমা বললেন, মন খারাপ তোর?

মিসেস সালমার ডাকে চমক ভাঙলো শ্রেয়সীর। নিজের চোখের পানি দ্রুত আড়াল করে মায়ের দিকে হাসিমুখে তাকালো সে।

- কই আম্মু কিছু হয়নি তো।

- আমার চোখকে ফাঁকি দিসনা শ্রেয়া। মায়ের চোখ সবকিছু দেখতে পারে।

- তাহলে কেন আমার খুশিটা কে তোমরা মেনে নিচ্ছ না আম্মু? কিসের এত সমস্যা তোমাদের?

মিসেস সালমা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আমার একার সিদ্ধান্তেই কি সবকিছু হবে? তোর বাবার মতামতটাও তো জরুরী।

শ্রেয়সী আর কোন কথা না বলে রুমে এসে পড়ল। তার পেছন পেছন মিসেস সালমা এসে পড়লেন। এর পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, তোর বাবা তোর সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চান।

শ্রেয়সী প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকালো।

মিসেস সালমা বাইরে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, ড্রয়িং রুমে তোর বাবা আর ভাই অপেক্ষা করছেন তোর জন্য। তাড়াতাড়ি নিচে চলে আয়।

ড্রয়িং রুমে বেশ গম্ভীর ভাবে বসে আছেন আহনাফ চৌধুরী। তার পাশেই শ্রেয়ান আর শ্রাবণী বসে আছে।মিসেস সালমা একটি সিঙ্গেল সোফায় বসে আছেন। শ্রেয়সী আসতেই তিনি সেখান থেকে উঠে মিস্টার আহনাফ চৌধুরীর কাছে গিয়ে বসলেন।

শ্রেয়সী নির্বিকার চিত্তে সোফায় গিয়ে বসলো।

নীরবতা ভেঙে মিস্টার আহনাফ চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ফারজাদের পরিবারের সাথে যা হয়েছে তা খুবই দুঃখজনক। কিন্তু নিয়তিকে চাইলেই আমরা বদলাতে পারবো না। কারণ ভাগ্য আমাদের হাতে নেই। ভাগ্যে যা থাকবে তাই হবে।

প্রত্যুত্তরে শ্রেয়সী কিছু বলল না।

আহনাফ চৌধুরী আবার বলতে শুরু করলেন, আমি তোমাকে আমার একটি সিদ্ধান্তের কথা বলতে চাই শ্রেয়া। শুধু তোমাকে নয় এই পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যকে বলতে চাই। তাই সবাইকে এখানে একসাথে ডেকেছি।

শ্রেয়সী আগ্রহভরা দৃষ্টি নিয়ে আহনাফ চৌধুরীর দিকে তাকালো। প্রত্যেকে দৃষ্টি আহনাফ চৌধুরীর উপর নিবদ্ধ।

আহনাফ চৌধুরী গম্ভীর চেহারায় কিছুটা হাসিয়ে এনে বললেন, আমার অফিসে সানজিদ রেহমান নামে একটি ছেলে কিছু মাস হলো জয়েন করেছে। খুবই ভালো পোস্টে তার জয়েনিং হয়েছে। আমার আন্ডারেই কাজ করে সে। তাই তাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। ছেলেটা দেখতে শুনতে মাশাল্লাহ। অনেক ট্যালেন্টেড একটা ছেলে।আচার ব্যবহার খুব ভালো। ভদ্র এবং বিনয়ী। আমাকে খুব সম্মান করে। আমিও তাকে খুবই স্নেহ করি।

বলে আহনাফ চৌধুরী একটু থামলেন। শ্রেয়সী অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো, এসব কথা তাকে কেন বলছে তার বাবা?

কৌতুহলী দৃষ্টিতে শ্রেয়সী জিজ্ঞাসা করল, এসব কথা আমাকে কেন বলছো বাবা?

- বলছি এই কারণে যে, সেই ছেলেটির সাথে আমি তোমার বিয়ে দিতে চাই। আশা করি তুমি কোন আপত্তি করবে না। আর বাকিদেরও কোন আপত্তি থাকবে বলে আমার মনে হচ্ছে না।

আহানাফ চৌধুরীর কথায় শ্রেয়সী যেন আকাশ থেকে পড়লো। এসব কি বলছে তার বাবা?

শ্রেয়সী উঠে দাঁড়িয়ে তীব্র কণ্ঠে বললো, এসব তুমি কি বলছো বাবা? তুমি কি করে আমার বিয়ে অন্য একটা ছেলের সাথে ঠিক করতে পারো? তুমি ফারজাদ এবং তার মা মরহুমা মিসেস ফারজানা চৌধুরীকে কথা দিয়েছিলে, তাদের পরিবারে আমাকে বউ করে পাঠাবে। এখন তুমি এসব কি কথা বলছো?

আহনাফ চৌধুরী গম্ভীরতা বজায় রেখেই বললেন, আমি তাদেরকে কথা দেইনি। বরং বলেছিলাম ব্যাপারটা ভেবে দেখব। আর যাকে কথা দিয়েছিলাম সে তো এই পৃথিবীতে নেই। তাই সেই কথা রাখার আমি কোন প্রয়োজন মনে করি না। আর তাছাড়া এমন একটা পরিবারে আমি আমার মেয়েকে তুলে দিতে পারি না, যে পরিবারটা এখন বিক্ষিপ্ত আর বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। সেখানে তুমি সুখী হতে পারবে না শ্রেয়া।

শ্রেয়সী অবাক হয়ে শুনছে আহানাফ চৌধুরীর কথা। তার বাবা এতটা বদলে গেল কি করে? ছোটবেলা থেকে কোন সিদ্ধান্ত তার ওপর চাপিয়ে দেননি তিনি। সব সময় শ্রেয়সীর মতামতকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আর আজ কি এমন হলো যে মৃত একজন মানুষের সে ইচ্ছাটাকেও তিনি পূরণ করতে চাইছেন না।

শ্রেয়সী দৃঢ় কন্ঠে বলল, আমি ভাবতাম আমার বাবা কথা দিয়ে সব সময় কথার মর্যাদা রক্ষা করেন। আমার মতামত কি সবচেয়ে বেশি মূল্য দেন। কিন্তু আজকে আমি আমার নিজের বাবাকে চিনতে পারছিনা। তিনি কি করে এমন টা করতে পারলেন? কি করে মৃত একজন মানুষের শেষ ইচ্ছাকে পূরণ করতে চাইছেন না? কি করে নিজের মেয়ের ইচ্ছা আর সুখকে বিসর্জন দিতে চাচ্ছেন।

আহনাফ চৌধুরীর শান্ত অথচ চাপা কন্ঠে বললেন, আমি যা করছি তোমার ভালোর জন্য করছি শ্রেয়া। ফারজাদের সাথে হয়তো তুমি সুখী হতে পারবে, সেই বিশ্বাস আমার আছে। কিন্তু ওই পরিবারে তুমি কিছুতেই সুখী হতে পারবেনা। কারণ মিস্টার আরমান আবরার চৌধুরী তোমাকে শুরুতেই অস্বীকার করেছিলেন। তোমাকে পুত্রবধূ হিসেবে তিনি কখনোই তার পরিবারে মেনে নিবেন না। এতে তুমি আর ফারজাদ কেউই সুখী হতে পারবেনা।

শ্রেয়সী ফিচেল হেসে বলল, আমি ধন দৌলত আর সম্পত্তি দেখে সুখী হতে চাই না বাবা। এগুলো মানুষকে কখনোই প্রকৃত অর্থে সুখ দেয় না। মিস্টার আরমান চৌধুরীর সম্মতি কিংবা অসম্মতির উপর আমাদের সম্পর্ক তৈরি হয়নি আর হবেও না। আমাদের সম্পর্ক মন থেকে তৈরি হয়েছে। যা এত সহজে ভাঙবে না। আমি আর ফারজাদ যদি এক হয়ে যাই, তাহলে পৃথিবীর কোন শক্তি আমাদেরকে আলাদা করতে পারবে না। আমি ফারজাদ কে পেলেই সুখী হব বাবা। আমার আর অন্য কিছুর প্রয়োজন নেই। আবরার পরিবারে পুত্রবধূ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার ও প্রয়োজন নেই।

মিস্টার আহনাফ চৌধুরী এবার কিছুটা রেগে উঠে বললেন, ছোটবেলা থেকে তোমাকে স্বাধীনতা দিয়েছে বলে এটা ভেবো না যে, তোমার যা ইচ্ছা তুমি তাই করবে। আমরা তোমার বাবা-মা। আমরা যা সিদ্ধান্ত নিব তোমার ভালোর জন্যই নিবো। সন্তান হিসেবে তোমার উচিত আমাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করা।

শ্রেয়সীও দৃঢ় কন্ঠে বলল, এটা তোমার একার সিদ্ধান্ত বাবা। মায়ের সিদ্ধান্ত কোনভাবেই হতে পারে না। তুমি তোমার একার সিদ্ধান্ত তোমার মেয়ের উপর চাপিয়ে দিতে চাইছো। যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অন্যায়।

শ্রেয়সী একটু থেমে নরম কন্ঠে বলল, তুমি আমার বাবা। জীবনের সবথেকে বেশি যদি কিছু মানুষকে ভালবেসে থাকি, তুমি তাদের মধ্যে অন্যতম। তোমাকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসি এবং শ্রদ্ধা করি। তোমার কোন সিদ্ধান্তকেই আমি কখনো অসম্মান করিনি আর করবোও না। যে ভালোবাসা আর আদর দিয়ে তুমি আমাকে বড় করেছো, তা আর কেউ কখনো দিতে পারবে না। কিন্তু একটা কথা ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো বাবা, আজ তুমি আমার ভালোর কথা ভেবে অন্য একটি ছেলের সাথে আমাকে বিয়ে দিতে চাচ্ছো। কিন্তু আদতেও কি আমি সুখী হবো বাবা? সুখ কখনো ভালোলাগা, ধনসম্পত্তি কিংবা ব্যক্তিত্ব দেখে হয় না। ভালোবাসা আসে সম্পূর্ণ মন থেকে। মনের উপর কারো জোর চলে না। জোর করে সুখীও হওয়া যায় না। তুমি হয়তো আমাকে ওই ছেলেটার সাথে বিয়ে দেওয়ার পরে আমি জোর করে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করব। কিন্তু তাতে আমি সত্যিকার অর্থে সুখী হবো না বাবা। তুমি কি চাও তোমার মেয়ে অসুখী হোক?

মিস্টার আহনাফ চৌধুরী কোন কথা বললেন না। শান্ত দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মিসেস সালমা, শ্রেয়ান আর শ্রাবণী শ্রেয়সীর কথা গুলোর মর্ম বুঝতে পারলো। তারা মনে মনে শ্রেয়সীর সাথে সম্মত হল। কিন্তু আহনাফ চৌধুরীর মতামতের অপেক্ষায় তারা আগ্রহ ভরে বসে রইল।

শ্রেয়সী আহনাফ চৌধুরীর কাছে গিয়ে তার হাত দুটো ধরে তার পাশে বসে মায়াভরা কন্ঠে বলতে লাগলো, আমার সুখের কথা বাদই দাও বাবা। কিন্তু একটা বার তুমি মিসেস ফারজানার কথা ভাবো। যিনি নিজের ছেলের সুখের জন্য নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন। নিজের স্বামীর পক্ষ ত্যাগ করে ন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন করে তোমাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার একমাত্র কারণ ছিল আমাকে তার ছেলের বউ হিসেবে গ্রহণ করে নেওয়া। তিনি নিজের ছেলে সুখের জন্য সবকিছুকে উপেক্ষা করে আমাকে চেয়েছিলেন। আজ সেই মানুষটা বেঁচে নেই। তার শেষ ইচ্ছা ছিল আমাকে তার পুত্রবধূ করে নেওয়া। সহানুভূতির দিক থেকে না হোক, মানবতার দিক থেকে একজন মানুষের শেষ ইচ্ছে পূরণ করা কতটা জরুরী তা তুমি আমাদেরকে শিখিয়েছিলে বাবা। আজ তুমিই কেন সেই কথা থেকে সরে আসছো? উত্তর দাও বাবা?

একটা বিক্ষিপ্ত পরিবারে তুমি তোমার মেয়েকে দিতে চাইছো না। সময় তো সবার সমান যায় না বাবা। কার কখন খারাপ সময় আছে তা কেউ বলতে পারে না। এখন ফারজাদের পরিবারে খারাপ সময় চলছে। এমনও হতে পারে আমাদের পরিবারেও খারাপ সময় চলে আসলো। তখন কি আমাকেও তুমি আমার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে মানা করবে বাবা?

আমি জানি তুমি এমন নও। তুমি একজন আদর্শ বাবা, আদর্শ স্বামী আর একজন আদর্শ মানুষ। তোমাকে আমি প্রচন্ডভাবে বিশ্বাস করি। সঠিক কাজটাই তুমি করবে বলে আমার বিশ্বাস।

শ্রেয়সীর কথাগুলো শুনে মনটা ভরে গেল মিসেস সালমার। আজকে সত্যিই তার নিজের মেয়ের উপর গর্ব হচ্ছে। মেয়েকে তিনি সঠিক শিক্ষা দিতে পেরেছেন এই ভেবে তার চোখে পানি চলে আসলো। তার মেয়ে ভুল কিছু করতে পারেনা, অন্যায় কিছু করতে পারে না এই বিশ্বাস তার মনে আরও বদ্ধমূল হলো।

মিস্টার আহনাফ চৌধুরী শ্রেয়সীর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। শ্রেয়সীর কথাগুলো তার মনে বারবার ধাক্কা দিচ্ছে। সবগুলো কথাই সম্পূর্ণ এবং যৌক্তিক। কিন্তু তবুও মনের এক কোণে কিছু একটা তাকে বারবার বাধা দিচ্ছে।

আহনাফ চৌধুরী শ্রেয়সীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে স্নিগ্ধ কন্ঠে বললেন, আমার মেয়ে অসুখী হয় এমন কোন কাজ আমি করবো না। আমার মেয়ে সুখের জন্য নিজের ইচ্ছাকে ত্যাগ করে তার পাশে দাঁড়াবো। তবুও আমি আমার মেয়ের মুখে হাসি দেখতে চাই।

শ্রেয়সীর মুখটা হাসিতে ঝলমল করে উঠলো। প্রাণবন্ত হাসিতে ভরে উঠলো তার মুখ। বাবাকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ লুকালো সে। মিসেস সালমা চৌধুরীর মুখেও অকৃত্রিম হাসি। শ্রেয়ান আর শ্রাবণীও সিদ্ধান্তকে সম্মান জানালো।

____________________

ফারজাদের মনটা অনেকদিন ধরে ভালো নেই। ঘর থেকে বের হয় না, কারো সাথে কথাও বলে না। কেমন যেন মনমরা হয়ে গেছে সে। তবে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন তার মধ্যে ঘটেছে। ইদানিং সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করেছে। নামাজ পড়ে সেজদায় গিয়ে মায়ের জন্য চোখের অশ্রু বিসর্জন দেয়। ছোটবেলায় শেখা কোরআন শরীফ এখনো তার স্পষ্ট মনে আছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সাথে সাথে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করে সে। ইতোমধ্যে কয়েকটি খতম দিয়ে ফেলেছে।

শ্রেয়সী প্রতি ওয়াক্তে জায়নামাজের দোয়াতে ফারজাদের সুস্থ এবং হাসিখুশি জীবন কামনা করে। ফারজাদকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্য অকাতরে মোনাজাত করে। নিজের পরিবার এবং কাছের মানুষদের জন্য দোয়া করে। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্যও দোয়া করে।

এভাবে কোথা দিয়ে যেন তিনটি মাস কেটে গেল। ফারজাদ এখন আগের তুলনায় অনেকটা স্বাভাবিক। সবার সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করলেও মিস্টার আরমান চৌধুরীর সাথে এসে কথা বলা একদম বন্ধ করে দিয়েছে। নুসরাতের এ বাড়িতে আসা একদম নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।

আজ অনেকদিন পর সব বন্ধুরা একত্রিত হয়েছে। ফারজাদ, শ্রেয়সী, আয়ান, সুমি, ফাইজা আর ফারজাদের সব বন্ধুরা মিলে একটা জায়গাতে ঘুরতে গিয়েছে। শহর থেকে অনেক দূরে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে গিয়েছে সবাই। সমুদ্রের বিশালতা আর নীল সাগরের স্নিগ্ধতায় সকলের মনের সব বিষণ্ণতা দুর হয়ে গেছে নিমেষেই। এতদিনের দম আটকে থাকা গলায় এবার যেন প্রাণ ভরে নিঃশাস নিতে পারছে সবাই।

সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে খালি পায়ে হাঁটছে শ্রেয়সী আর ফারজাদ। দুজনের হাতে দুজনের হাত। হাতে হাত রেখে তারা এগিয়ে চলছে। শেষ বিকেলের ম্লান আলোয় এগিয়ে যাচ্ছে দুজন। সাগরকন্যার উত্তাল ঢেউ বারবার তীরে এসেছে আছড়ে পড়ে এক অপরূপ সৌন্দর্যের সৃষ্টি করছে। মুখে তাদের কোনো কথা নেই। যেন মনে মনে আর চোখে চোখে সব কথা বলে নিচ্ছে একে অপরে। সাগরের পানি বারবার তাদের পা ভিজিয়ে দিচ্ছে। আবার সরে যাচ্ছে।

- জানো শ্যালু, ছোটবেলা থেকেই এই নীল আকাশ, নীল সমুদ্র আমাকে খুব করে টানে। ইচ্ছে করে এদের সাথে মিশে যেতে। কোনো একটা অজানা আকর্ষণে বিলীন হয়ে যেতে ইচ্ছে করে।

তারপর শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে ফারজাদ বলল, দিগন্তের শেষে যেখানে আকাশ গিয়ে মিশেছে, সেখানে তোমাকে নিয়ে বারবার হারিয়ে যেতে ইচ্ছা হয় শ্যালু। তোমাকে মিশিয়ে নিতে ইচ্ছে করে নিজের সত্তায়।

শ্রেয়সী মুচকি হাসলো। ফারজাদ অপলক সেদিকে তাকিয়ে রইল।একটা মেয়ের মুচকি হাসিতেও কতটা মায়া থাকতে পারে সেটা শ্রেয়সীকে না দেখলে ফারজাদ বুঝতেই পারত না। আর শ্রেয়সী হাসলে ওর বাম গালেড় টোলটা ফারজাদকে ভীষণ রকম ভাবে মুগ্ধ করে।

শ্রেয়সী স্নিগ্ধ কন্ঠে বলতে লাগলো, দূর অজানায় তোমাকে নিয়ে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা হয় ফারজাদ। যেখানে থাকবে শুধু তুমি আর আমি। আমরা দুজন মিলে আমাদের নতুন পৃথিবী সাজাবো। যেখানে সুখের কোন কমতি থাকবে না। থাকবে শুধু ভালোবাসা আর অপার মায়া।

দুজন দুজনের দিকে অনেক্ষন এক দৃষ্টিতে। তাকিয়ে থাকে। ঘোর লাগানো নিষ্পলক সেই দৃষ্টি। ফারজাদ স্বভাববশত শ্রেয়সীর কপালে চলে আসা উড়ন্ত চুলগুলোকে কানের পিঠে গুঁজে দিলো। তার হাসিমাখা গালের টোলটা আলতো করে ছুঁয়ে দিলো।

হঠাৎই শ্রেয়সী সাগরে পারে অনেকগুলো ঝিনুকের খোলস দেখতে পেল। ছোট থেকেই ওর ঝিনুক খুবই পছন্দের। ঝিনুকের ভেতরের মুক্তা আরো ভীষণ পছন্দের। দৌড়ে গিয়ে ঝিনুক গুলো দেখতে লাগলো আর কোনটাতে মুক্তা আছে খুঁজতে লাগলো।

শ্রেয়সীর বাচ্চামো দেখে ফারজাদ খুব খুশি হলো। মেয়েটা আসলেই অল্পতেই ভীষণ খুশি হয়ে যায়। ও সবকিছু থেকে সুখ খুঁজে নিতে পারে। আর যারা অল্পতেই খুশি হয়ে যায়, সবকিছু থেকে সুখ খুঁজে নিতে পারে, তারাই প্রকৃত অর্থ সুখী হয়। তারা নিজেরা সুখী থাকতে জানে, আর অন্য কেও সুখী রাখতে পারে।

ফারজাদ সাগরের কিনারায় বালুর মধ্যে বড় করে একটি লাভ শেপ আঁকলো। তার মধ্যে তীর চিহ্ন দিয়ে একপাশে তার নাম এবং অপর পাশের শ্রেয়সীর নাম লিখলো। শ্রেয়সী দৌড়ে এসে ফারজাদকে তার সংগ্রহ করা ঝিনুক এবং মুক্তা দেখালো। ফারজাদ এগুলো দেখে খুব খুশি হলো। শ্রেয়সীর ফারজাদের আঁকা লাভ শেপের দিকে নজর পড়তেই সে আরো বেশি খুশি হয়ে গেল। পড়ন্ত বিকেলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো তারা। সমুদ্রের অস্তগামি সূর্যকে সাক্ষী রেখে দুজন নর-নারী পরম ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছে। সূর্যের লাল রশ্মি সমুদ্রের পানিতে পড়ে এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। তীব্র বাতাস তার সাক্ষী হয়ে তাদেরকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। এক অভূতপূর্ণ সুন্দর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে সেখানে।

চলবে,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন