ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক তোমাতে আসক্ত

১৮তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া শিমু

#এক_তোমাতে_আসক্ত

#সুমাইয়া_শিমু

#পর্ব_১৮

_________________________

কর্মব্যস্ততা এবং সুখ-দুঃখ পাশাপাশি মিলিয়ে দুইটি বছর কোথা দিয়ে যেন হারিয়ে গেল। এই দুই বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। সেই সাথে অনেক কিছু নতুন করে যোগ হয়েছে। বদলে গেছে অনেক মানুষের জীবন। কিন্তু ভালোবাসোময় অনুভূতিগুলো এখনো একই রকম আছে কিছু মানুষের জীবনে।

আয়ান আর সুমি দুই বছর আগেই বিয়ে করে ফেলেছে। আয়ান এখন বড় কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। তার সততা, নিষ্ঠা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমেই সে এত কিছু অর্জন করতে পেরেছে। আর সুমি এখন একজন নামকরা জার্নালিস্ট হয়ে গিয়েছে। শ্রেয়সীর সাথে সে " মুক্তির আলো" এবং নিউজ টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স -এর একজন নিউজ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছে। তাদের দুজনেরই অনেক খ্যাতি অর্জন হয়েছে ইতিমধ্যেই। দেশের মানুষ জন তাদেরকে এক নামেই চেনে।

" কালোবাজারি এবং অপরাধচক্রের তৎপরতা দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। হিউম্যান ট্রাফিকিং, অর্গান ট্রাফিকিং, নারী ও শিশু পাচার, কালোবাজারি, স্মাগলিং, ড্রাগস পাচার, অবৈধ ব্যবসা, খুনখারাবি, ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিগত ১০ বছরে অপরাধ কর্মকান্ড প্রায় দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসবের পেছনে রয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড় বড় মাফিয়া, অসৎ এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। যার ফলে অপরাধ চক্র দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে আঙ্গুল উঠানোর কেউ নেই। প্রতিবাদ করতে গেলেই গুম, হত্যা এবং ধর্ষণ করা হয়। ভিকটিমের পরিবার কেও ছাড় দেওয়া হয় না। এসবের বিরুদ্ধে দেশের সরকার, প্রশাসন, মিডিয়া এবং আপামর জনসাধারণকে রুখে দাঁড়াতে হবে। তবেই সমাজ এবং দেশ থেকে অপরাধ চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব হবে। "

নিউজ টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স - এর নিউজ রিপোর্টার শ্রেয়সী আহমেদ চৌধুরী সদ্য গ্রেফতার হওয়া ঢাকা শহরের অন্যতম ভয়ঙ্কর এবং শক্তিশালী মাফিয়া সোহেল রানাকে নিয়ে পুলিশের একটি প্রেস ব্রিফিং এর অনুষ্ঠানে কথাগুলো লাইভ টেলিকাস্ট এ বলল। মূলত সোহেল রানা এবং তার অপরাধচক্র কে ধরার পেছনে তার ভূমিকা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া "মুক্তির আলো" সংবাদপত্রেও সে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

নিউজ ২৪ আওয়ার্স-এর সংবাদ উপস্থাপিকা সাবরিনা শায়লা লাইভ থেকে ফিরে এসে পুনরায় সংবাদ উপস্থাপন করতে শুরু করলেন। মূলত সোহেল রানার বিষয়েই আজকের নিউজ চ্যানেল জুড়ে আলোচনা হবে। তাদের চ্যানেলে সর্বপ্রথম এই নিউজগুলো পাবলিশড করেছে। তাই এটা নিয়ে বেশি বেশি তথ্য দিতে পারলে তাদের চ্যানেলের টিআরপি খুব দ্রুতই বেড়ে যাবে।

ইদানিং তাদের চ্যানেলের টিআরপি দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ জার্নালিস্ট শ্রেয়সী আহমেদ চৌধুরী এবং তার টিম বিভিন্ন অপরাধ চকলেট গোপন তথ্য ফাঁস করে নিউজ চ্যানেলে প্রচার করছে। ফলে টিআরপি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক উপকার হচ্ছে। বর্তমানে প্রশাসন এবং সরকারের সুনজরে আছে তাদের চ্যানেলটি। কিন্তু আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়া এবং অপরাধীদের চোখে এই এই চ্যানেলটি এবং এর সাথে জড়িত সকল সাংবাদিকরা চোখের বিষ। তারা বিভিন্নভাবে এই চ্যানেল এবং জার্নালিস্টদের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে। তবে প্রতিবারই প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য তারা সফল হতে পারেনি। তবুও যথাযথ সতর্ক থাকার চেষ্টা করছে তারা।

লাইভ টেলিকাস্ট বন্ধ করে ক্যামেরা অফ করলো শ্রেয়সীর ক্যামেরাম্যান আব্দুর রেজা। সুমি এতক্ষণ অন্যদিকে নিউজ প্রচার করছিল। শ্রেয়সীর লাইভ টেলিকাস্ট বন্ধ হতেই সে দ্রুত তার কাছে ছুটে আসলো।

- কিরে শেষ হলো তোর লাইভ টেলিকাস্ট?

শ্রেয়সী ঢকঢক করে এক বোতল পানি শেষ করে কয়েকটা জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলল। মাথায় কিছুটা পানি দিল।প্রচন্ড গরম পড়েছে। এই গরমের মধ্যে কাজ করাটা আসলেই অনেক কষ্টসাধ্য। অনেকবার অসুস্থ হয়ে পড়ে গিয়েছিল সে। তবুও কাজের প্রতি সম্মান এবং ভালোবাসায় অনেক কষ্টের মধ্যেও সে নিজের কাজ সম্পন্ন করে।

সুমি শ্রেয়সীকে ধরে ব্যস্ত কন্ঠে বলল, কিরে খারাপ লাগছে তোর? বলেছিলাম এই গরমের মধ্যে কাজে আসার দরকার নেই। আমি না হয় তোর কাজটা করে দিতাম। আরো তো অনেক সাংবাদিক ছিল। কেন শুধু শুধু তোকে কষ্ট করেই কাজগুলো করতে হবে? সব দায়িত্ব কেন তোকেই নিতে হবে? নিজের দিকেও তো একটু নজর দে।

সুমির মৃদু শ্রেয়সী মুচকি হাসলো। তারপর খুব সুন্দর করে বলল, সাংবাদিকতা পেশাটা অনেক মহান একটি পেশা। সত্য এবং ন্যায়ের জন্য লড়তে হয় আমাদের। অসত্য এবং অন্যায়কে প্রতিহত করতে হয়। দেশের আপামর জনসাধারণকে তাদের ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতে হয়। আর এই দায়িত্বটা খুব বড়। যা আমাদেরকে খুব দায়িতের সাথে পালন করতে হয়। এজন্য আমি আমার কাজ খুব নিষ্ঠা এবং সততার সাথে পালন করার চেষ্টা করি। আমার কাজ আমার থেকে ভালো আর কে জানবে বল? এজন্য এত কষ্টের মধ্যেও কাজ করি।

সুমি কিছুটা আশঙ্কার সুরে বলল, যেমন মহান একটি পেশা তেমনি খুব ঝুঁকিপূর্ণ। খুব বিপদ আছে এর মধ্যে। অনেক কিছু হারাতে হয়। আমাদের সবাইকে কত হুমকি- ধমকির মধ্যে জীবন কাটাতে হয়। তুই এই পেশার এতটা গভীরে যাস না যাতে তোর কোন ক্ষতি হয়। যদি তোর কিছু হয়ে যায় তখন আমাদের কি হবে?

শ্রেয়সী সুমির মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বলল, আমার কিচ্ছু হবে না রে। তোরা আছিস না? তোরা থাকতে আবার কিসের ভয়? আর তাছাড়া আমার ফারজাদ আমার পাশে সব সময় আছে। সে যতক্ষণ পাশে আছে ততক্ষণ আমি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত। কেউ আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।

সুমি মুগ্ধ হয় শ্রেয়সীকে দেখে। ভাগ্যগুণে এমন একটা বান্ধবী পেয়েছিল। যার ভেতর এবং বাহিরটা পুরোটাই পরোপকারে নিয়োজিত। নিজের পরিবার, কাছের মানুষদের পাশাপাশি অপর মানুষজনদের জন্য কতটা দায়িত্বশীল সে। কারো দুঃখ-কষ্ট সে সহ্য করতে পারে না। সব সময় অন্যের কথা ভাবে। অন্যের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। তার মনটা একদম পবিত্র। কোন হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার কিংবা খারাপ গুণাবলীর রেশমাত্র নেই। সুন্দর চেহারার পাশাপাশি তার একটা সুন্দর মন রয়েছে।

শ্রেয়সী মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, কিরে কোথায় হারিয়ে গেলি তুই?

ভাবনার জগত থেকে ফিরে এসে সময় ব্যস্ত কণ্ঠে বললো, অনেক বেলা হয়ে গেছে। বাসায় ফিরতে হবে চল।

শ্রেয়সী আর সুমি ফিরতে নিলেই পুলিশ ইন্সপেক্টর রাহান মির্জা তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। শ্রেয়সী ও সুমিকে একনজর দেখে নিয়ে হাসিমুখে বললেন, তোমাদের কাজের জন্য তোমাদেরকে অভিনন্দন জানাতে এসেছি। সত্যি তোমরা যা কাজ করেছো তা প্রশংসার দাবিদার। এত দুঃসাহসের কাজ তোমরা কতটা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করেছো। তোমাদের সাহসের প্রশংসা করতেই হয়। তোমাদের জন্য এত বড় একটা মাফিয়াচক্র কে ধরতে পেরেছি আমরা। শুধু আজকে নয় আরো অনেক মাফিয়া চক্রকে ধরিয়ে দিতে তোমরা আমাদের সাহায্য করেছো। এর জন্য ধন্যবাদ দিয়ে তোমাদের ছোট করবো না। তোমাদের যখন যা সাহায্য লাগে আমাকে এসে বলবে। আমি যথাসাধ্য সাহায্য করবো।

শ্রেয়সী সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলল, প্লিজ স্যার এভাবে বলবেন না। এটা আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য ছিল। সাংবাদিকদের কাজই তো ধোঁয়াশার আড়াল থেকে সত্যকে খুঁজে বের করে আনা। আমরা আমাদের সেই দায়িত্বই পালন করেছি। এতে ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। তাছাড়া আপনারা যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে, হয়তো ওই মাফিয়া চক্রটাকে ধরা যেত না। আপনাদের ভূমিকা এখানে মুখ্য।

রাহান মির্জা মৃদু হেসে বললেন, আমাদের ভূমিকাই মুখ্য নয়। তোমাদেরও এতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তোমাদের সাহায্য ছাড়া আমরা কিছুতেই ওই চক্রটাকে ধরতে পারতাম না। বাই দ্যা ওয়ে, মিডিয়ার সামনে তোমাদের কথা প্রকাশ করা হয়েছে। জানি তোমরা নিজেদের প্রশংসা নিজেরা করতে না। তাই আমি অন্য সব নিউজ চ্যানেল গুলোকে তোমাদের কথা বলে দিয়েছি। তারা তোমাদের সাফল্যের কথা ইতোমধ্যে দেশবাসীর কাছে প্রচার করে দিয়েছে।

শ্রেয়সী কিছু একটা বলতে নিলেই সুমি বলল, থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। আসলে আমার বান্ধবী শ্রেয়সী নিজেদের কথা কিছুতেই মিডিয়ার সামনে বলতে চায় না। তার কাছে শো অফ করা পছন্দ না। এর জন্য আমাদের আগের অনেক মিশনের কথা অনেকেই জানতে পারেনি। আপনি বলে দিয়ে ভালই করেছেন।

রাহান মির্জা একটা সুন্দর হাসি দিয়ে তাদেরকে বেস্ট অফ লাক বলে চলে গেলেন।

শ্রেয়সী কপট রাগ দেখিয়ে সুমিকে বলল, তোকে এত কথা বলতে বলেছিল কে? সব সময় বেশি বেশি কথা বলিস।

সুমি ভেংচি কেটে বলল, যা করেছি বেশ করেছি। এখন এখান থেকে তাড়াতাড়ি চল। সারাদিন কি এখানেই পার করবি নাকি?

বলেই শ্রেয়সীকে টানতে টানতে প্রাইভেটকারে উঠে গেল তারা দুজনসহ বাকি সাংবাদিক ও কলাকুশলীরা।

_____________________

খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা মিশনে এসেছে ফারজাদ এবং তাদের পুলিশ ফোর্স। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আজকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ আর জাহিদ চৌধুরী একটি সমাবেশে বক্তব্য দিতে আসবেন। তাই গোটা এরিয়া জুড়ে কড়া সিকিউরিটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারণ ইদানিং জঙ্গি হামলা এবং আত্মঘাতী হামলা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে সেখানে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে এই ধরনের হামলা হচ্ছে। পুলিশ ফোর্স তাদের সর্বোচ্চ সিকিউরিটির মাধ্যমে এসব দুর্ঘটনা প্রতিহত করা যথাযথ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবু কোথাও না কোথাও খাদ থেকে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। ফলে দেশের মানুষ আঙ্গুল তুলছে দেশের পুলিশ ফোর্সের উপর। তাই এবার যেন কোন দুর্ঘটনা না ঘটে সেজন্যে সর্বোচ্চ সিকিউরিটি এবং কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুরো সমাবেশ এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় চেকিং পোস্ট বসানো হয়েছে। কারো কাছে সন্দেহজনক কিছু থাকলে কিংবা সন্দেহজনক কাউকে মনে হলে অতি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পুরো এরিয়া জুড়ে সেনাবাহিনীর সদস্য এবং পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে।সব মিলিয়ে করা নিরাপত্তার ব্যবস্থা বিরাজ করছে চারদিকে।

সমাবেশ শুরু হয়ে গিয়েছে। সমাবেশে আগত অতিথিরা শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখছেন। প্রধান অতিথি এখনো এসে উপস্থিত হননি। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বেন। পুরো উদ্যান লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছে। মানুষের কোলাহল এবং উপস্থিতিতে কোলাহলময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গাড়ি এসে উপস্থিত হলো। তার আগে পেছনে অনেকগুলো একই রংয়ের গাড়ি। কোনটাতে তিনি রয়েছেন তা বোঝা যাচ্ছে না। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় মাঝখানের একটি প্রাইভেটকার থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বের করে নিয়ে আসা হলো। সমাবেশে উপস্থিত লোকজনের কোলাহল দ্বিগুণ হারে বেড়ে গেল। প্রত্যেকে উত্তেজিত হয়ে পড়ল। স্টেজ থেকে উপস্থাপকের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আগমনে চারপাশে উত্তেজনার রেশ ছড়িয়ে গেল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মঞ্চে উঠতে যাবেন ঠিক সেই মুহূর্তেই কয়েকটি ফায়ারিং এর শব্দে চমকে উঠল সমস্ত জনসাধারণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তার লোকজন সেখানেই থেমে গেলেন। মঞ্চে বিভিন্ন অতিথিগণ এবং উপস্থাপকও থেমে গেলেন। সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো ফায়ারিং হওয়ার স্থান থেকে।

দেখা গেল একজন সুদর্শন যুবক অন্য একটি অল্পবয়স্ক তরুণকে ধাওয়া করছে। অল্পবয়স্ক তরুণটির বাম পায়ে দুটি গুলি লেগেছে। তাও সে যতটা সম্ভব প্রাণপণে দৌড়ানোর চেষ্টা করছে। তার পিছনে ফারজাদও পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছে। কারো আর বুঝতে বাকি রইলো না ঘটনা কি ঘটেছে। অল্প বয়স্ক তরুণটি নিশ্চিত আত্মঘাতী হামলা করতে এসেছিল। ফলের সাথে সাথেই মোতায়েন করা আর্মি এবং পুলিশ সদস্যরা তার পিছু ছুটলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হলো।

তখনই অল্পবয়স্ক তরুণটি নিজের গেঞ্জি ছিড়ে তার বুকে বেঁধে রাখা বোমাটি বের করে চারিদিক ঘুরে সবাইকে দেখালো। সবাই প্রচন্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।

অল্প বয়স্ক তরুণটি উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগলো, খবরদার কেউ আমার সামনে আসার চেষ্টা করবে না। কাছে আসলে কেউ বাঁচবে না। একবার এই বোমার বিস্ফোরণ ঘটলে এখানকার কয়েকশো মিটার পর্যন্ত কেউ বাঁচবে না।

উপস্থিত জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। চিৎকার চেঁচামেচি আর কান্নাকাটির রোলে ভরে উঠলো চারপাশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ তার সহকর্মীরাও ভয়ে আতকে উঠলেন। প্রত্যেকে প্রাণভয়ে অস্থির হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই যে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটতে যাচ্ছে, তা ভেবেই সকলের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো।

অল্প বয়স্ক তরুণটি আর কিছু না বলেই যখনই বোমাটা বিস্ফোরণ ঘটাতে যাবে, তখনই আচমকা পেছন থেকে কারো অতর্কিত আক্রমণে সে বেসামাল হয়ে পড়ল। ফারজাদ তাকে একের পর এক আক্রমণে নাস্তানাবুদ করতে লাগলো। কিন্তু খুব সাবধানে আক্রমণ করতে লাগলো যেন বোমার উপর কোন ধরনের আঘাত না পড়ে। তাহলে মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটে সকলে এক্ষুনি পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

ছেলেটিকে নাজেহাল করার পর খুব সন্তর্পনে তার বুক থেকে বোমাটি খুলে ফেলল সে। দেখলো সেখানে আর একটা মিনিট বাকি রয়েছে। সে আর দেরি না করে দ্রুত দৌড়াতে লাগলো। তার পিছু পিছু কেউ যাওয়ার সাহস না করলেও তার কিছু সাহসী সহকর্মী তার পিছু পিছু গেল।

প্রাণপণে দৌড়িয়ে অবশেষে একটা বড় নদীর ধারে আসলো ফারজাদ। তখন আর মাত্র পাঁচ সেকেন্ড বাকি রয়েছে। দেরি না করে সে দ্রুত সেটা নদীর বুকে ছুঁড়ে ফেললো। ছুড়ে ফেলতেই নদীর বুক কাঁপিয়ে প্রচন্ড জোরে একটা বিস্ফোরণ ঘটলো। নদীর উন্মুক্ত জলরাশি সেই প্রচন্ড বিস্ফোরণে আগ্নেয়গিরির মতো ফুলে ফেঁপে উঠলো। থর থর করে ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠলো গোটা এলাকা। চারপাশের যে সমস্ত প্রাণীরা ছিল তারা আহত হয়েছে। ভাগ্যিস কোন মানুষ আশেপাশে ছিল না। না হলে সেখানেই পুড়ে ভস্ম হয়ে যেত।ফারজাদ নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে ছিল। আগুনের তাপের সে সামনের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে ছিটকে পড়লো অনেকটা দূরে। একটা পাথরের সাথে মাথায় আঘাত লেগে তার কপাল কেটে গেল।

ফারজাদের সহকর্মীরা দ্রুত ছুটে এসে এই ভয়ানক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করল। ক্ষণকাল স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থেকে দ্রুত ফারজাদের কাছে ছুটে এলো।

ইন্সপেক্টর মাসুদ রানা ফারজাদকে দ্রুত উঠিয়ে আতঙ্কিত কন্ঠে বলল, তুমি ঠিক আছো ফারজাদ?

ফারজাদের মাথার বাঁ পাশে অনেকটা কেটে গিয়েছে। প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছে তার। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক করে নিম্ন স্বরে বলল, আমি ঠিক আছি।

তার আরো কয়েকজন সহকর্মী ছুটি এলো। তারা ফারজাদের অবস্থা দেখে বুঝতে পারলো তার আঘাতটা মারাত্মক। তাছাড়া এমন একটা ঘটনা কাজ থেকে দেখার ফলে তার মাথার উপরেও চাপ পড়েছে। তাই তাকে যতোদ্রুত সম্ভব ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য তারা তাকে দ্রুত হসপিটালের উদ্দেশ্যে নিয়ে গেল।

__________________

হসপিটালের বেডে আধশোয়া হয়ে বসে রয়েছে ফারজাদ। তার পাশে শ্রেয়সী, মিস্টার আহনাফ চৌধুরী, তার ছেলে এবং ছেলের বউ,সুমি আয়ানসহ তার অসংখ্য সহকর্মী- শুভাকাঙ্ক্ষীরা। সে বর্তমানে বনানী থানার ডিআইজি। তার অসাধারণ দক্ষতা এবং মেধার মাধ্যমে খুব দ্রুততার সাথে তার পদোন্নতি হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া খুব জনপ্রিয় পুলিশ অফিসার সে। তার নিজস্ব থানার পাশাপাশি ঢাকা শহরের বিভিন্ন থানায় তার জনপ্রিয়তা রয়েছে একজন চৌকস এবং বুদ্ধিমান পুলিশ অফিসার হিসেবে। আপামর জনসাধারণের বিশ্বাস এবং ভালোবাসার আরেক নাম ফারজাদ। ফলে একজন সেলিব্রেটির মতোই তার অনেক ফ্যান-ফলোয়ার হয়ে গিয়েছে। তবে সে সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্ট ব্যবহার করে না। তার জনপ্রিয়তা বাস্তবিক।

পুরো হসপিটাল জুড়ে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশাসন এবং মিডিয়ার আনাগোনা হসপিটাল এর বাহিরে। কিন্তু মিডিয়ার কোন লোকজনকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ এই মুহূর্তে ফারজাদের অবস্থা স্বাভাবিক নয়। এত বড় একটা আতঙ্কবাদী হামলা থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ এতগুলো মানুষকে বাঁচানোর জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে আসবেন ফারজাদের সঙ্গে দেখা করতে। এজন্য নিরাপত্তা আরও দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুরো হসপিটাল জুড়ে একটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।

আতঙ্কবাদী হামলার টিভিতে প্রচার হওয়া মাত্রই শ্রেয়সী ছুটে গিয়েছিল সেই সমাবেশে। পুরো দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলো সে। সেখানে গিয়ে যখন জানতে পারলো ফারজাদকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তখন সে সবকিছু ভুলে পাগলের মত ছুটে এসেছেহসপিটালে। কাউকে খবর দেওয়ার মন-মানসিকতায় ছিল না সে। বাকিরা টিভিতে নিউজ দেখে এই হসপিটালে এসেছে।

শ্রেয়সী নিজে একজন সাংবাদিক হলেও সে মিডিয়াকে ফারজাদের কাছে আসতে দেয়নি। কারণ এই অবস্থায় ফারজাদ কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। সুস্থ হলে সে নিজেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে।

কাঁদতে কাঁদতে শ্রেয়সীর অবস্থা কাহিল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ফারজাদ বারবার তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছে, আরে কাঁদছো কেন শ্যালু? আমার তেমন কিছুই হয়নি। শুধু মাথাটা একটু কেটে গেছে।

শ্রেয়সী কাঁদতে কাঁদতেই বলেছে, তুমি কেন একা ওই রিস্ক নিতে গেলে? যদি তোমার কিছু হয়ে যেত? কি হতো আমার?

ফারজাদ শ্রেয়সীর কপালে একটা স্নিগ্ধ চুমু দিয়ে বলেছে, তুমি কি তোমার নিজের পেশাকে ঝুঁকির জন্য ছেড়ে দিবে বা বিপদ আছে বলে ঝুঁকি নিতে মানা করবে?

শ্রেয়সী মাথা দুলিয়ে না বলেছিল। ফারজাদ মৃদু হেসে বলল, তেমনি আমার কাছেও আমার পেশাটা সবার আগে। দায়িত্ব সবার আগে। বিপদ কিংবা ঝুঁকে থাকলেও সেখান থেকে সরে আসতে পারবো না আমি।

শ্রেয়সী কিছু না বলে কেবল ফারজাদের বুকে মাথা লুকিয়ে কেঁদেছিল। ফারজাদও তার প্রিয়তমাকে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল।

এখন ফারজাদ কিছুটা সুস্থ। সবার সাথে কথা বলছে। প্রেসের লোকজনকে ভেতরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সময় খুবই সংক্ষিপ্ত। কারণ কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চলে আসবেন। তাই যার যা প্রশ্ন করা তাড়াতাড়ি করে ফেলল।

- আপনি কি করে বুঝতে পারলেন ওই ছেলেটি আত্মঘাতী হামলা করবে? আর এত সিকিউরিটি ব্যবস্থা থাকতে অন্য কারো নজরে পরলো না কেন?

ফারজাদ কিছুটা দম নিয়ে বলল, আসলে সে পুলিশ ইউনিফর্ম পড়ে প্রবেশ করেছিল। আর তার সাথে একাধিক লোক জড়িত ছিল। তাকে সমাবেশে পৌঁছে দেওয়ার পর তার বুকে বোমাটি বেঁধে তারা কৌশলে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। আর তারা কাজটি করেছিল কৌশলে সেখানকার কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট করে। তাই তারা কারো নজরে আসেনি।

কিন্তু ছেলেটি চালচলন দেখে আমার শুরু থেকে সন্দেহ হয়। কিন্তু সন্দেহের বসে তো কাউকে কিছু বলা যায় না। তাই আমি তার গতিবিধির উপর নজর রাখতে শুরু করি। এক সময় আমার সন্দেহ বিশ্বাসে পরিণত হয়। তখনই আমি তাকে স্যুট করি। তার বডিতে শুট করিনি কারণ আমার সন্দেহ হচ্ছিল তার শরীরে কোথাও টাইম বোম থাকতে পারে।তার বাম পায়ে দুটি গুলি লেগেছিল। ফলে সে পালাতে পারেনি। আর এই সুযোগে আমি তাকে নাজেহাল করে তা থেকে বোমটা ছিনিয়ে নিই। এর পরের ঘটনা তো আপনাদের সবার জানা।

- এত ঝুঁকিপূর্ণ একটা কাজ করছিলেন। আপনার ভয় করেনি?

ফারজাদ মৃদু হেসে বলল, এখানে ভয়ের কিছু নেই। আমাদের কাজ তো ঝুঁকির মধ্যে থেকে জনসাধারণকে নিরাপত্তা দেওয়া। সেখানে ভয় নামক কোন জিনিস থাকা চলে না। আমি কেবল আমার দায়িত্ব আন্তরিকতার সাথে পালন করেছি। আর আমার দেশের জন্য আমি প্রয়োজন বোধে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত।

সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছিল ফারজাদের কথা। এরপর প্রত্যেকে করতালির মাধ্যমে তাকে অভিবাদন জানালো।

___________________

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ আর জাহিদ চৌধুরী হসপিটালে এসে পৌঁছেছেন। তিনি ফারজাদের সাথে বিশেষভাবে দেখা করলেন। তার দুঃসাহসী কাজের প্রশংসা করলেন মিডিয়ার সামনে। এরপর তাকে তার কাজের সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করার আশ্বাস দিলেন। তাকে পদোন্নতি দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন এই আশ্বাসও দিলেন।

কিন্তু ফারজাদ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উন্নতির জন্য সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার কথা বলল। জনসাধারণের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনের সহায়তার কথা জানালো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফারজাদের জনদরদি মনোভাব দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি তার সকল প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন বলে ওয়াদা করলেন।

দেশের মাঝে আরো একবার ছড়িয়ে পড়লো ফারজাদের দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের কথা। এর আগে অসংখ্যবার নিজের জীবনকে বাজি রেখে সে অনেক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেছে। নিজের থানায় ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। সব ধরনের অন্যায়- অবিচার থেকে সমাজকে রক্ষা করার মিশনে সে অনেকটা সফল। আগামী দিনগুলোতে আরো সফল সফল হবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করে সবাই। শুধু বনানী থানা নয়, দেশের সব কয়টা থানায় তার প্রশংসার জোয়ার বইছে। তার মতো পুলিশ অফিসার হওয়ার জন্য সবাইকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

চলবে,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন