ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে

৮ম পর্ব

লেখক: সালমা চৌধুরী

#আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে

#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী

(০৮) (scsalma90)

"মানুষের মন কখনো ক্লান্ত হয় না।"

এই স্লোগান দিতে দিতে নিজেকে শক্ত করলো মেঘ।

আজকে সে ফজরের আজানের সময় উঠেছে৷ রাতে এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছিল। দিন যত যাচ্ছে পরীক্ষা তত কাছে আসছে। যেভাবেই হোক চান্স পেতে হবে। প্রথম টার্গেট মেডিকেল, দ্বিতীয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এজন্য সবই পড়তে হচ্ছে তাকে।

নামাজ পড়ে, পড়তে বসেছে মেঘ। ৭-৭.৩০ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। সকালে খালি পেটে বেশিক্ষণ থাকা কষ্টকর তাছাড়া পড়াশোনা করলে আরও বেশি খুদা পাই। গতকাল সন্ধ্যায় খেয়েছিল সারারাত কিছু খাই নি৷ খিদায় চু চু করছে পেট। দৌড়ে নিচে গেলো মেঘ।

মেঘের দৌড় দেখে ভয় পেয়ে গেলেন হালিমা খান, ওনিও রান্নাঘর থেকে ছুটলেন।

হালিমা খান চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

"কি হয়ছে তোর, এভাবে ছুটছিস কেন?"

মেঘ জবাব দিল,

"আমার খুব খুদা পাইছে আম্মু, তাড়াতাড়ি খেতে দাও।"

হালিমা খান আবারও জিজ্ঞেস করলেন,

"তুই কখন উঠেছিস?"

মেঘের শান্ত জবাব,

"ফজরের সময় উঠেছি তারপর পড়াশোনা করেছি। তাড়াতাড়ি খেতে দাও আমায়।"

হালিমা খান যেনো খুশিতে গদগদ হয়ে গেলেন। ওনার মেয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দিচ্ছেন সাথে খাওয়া দাওয়াতেও। এ তো প্রতিটা মায়ের ই প্রধান স্বপ্ন। ওনি ছুটে গেলেন রান্নাঘরে। মেয়ের পছন্দের সব খাবার হাজির করলেন মেয়ের সামনে।

মেঘ খুদার তাড়নায় ঝটপট খাবার শেষ করে নিজের রুমে চলে গেলো৷ আজকে তার কোচিং, প্রাইভেট কিছু নেই। সন্ধ্যায় শুধু শাহরিয়ার ভাইয়া পড়াতে আসবেন। সারাদিনের একটা রুটিন করে নিলো মেঘ। টার্গেট সেট করে পড়াশোনা করলে পড়াশোনা তাড়াতাড়ি এগোয়৷

এদিকে ৮ টার পর বাড়ির সবাই খেতে বসেছে। আবির একেবারে রেডি হয়ে নেমেছে। চেয়ার টেনে বসতে বসতে নজর পরে, সামনের চেয়ার টা ফাঁকা। নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে, কয়েক সেকেন্ডে স্বাভাবিক হয়ে খাওয়া শুরু করে।

ইকবাল খান জিজ্ঞেস করলেন,

"মেঘ কোথায়, উঠেনি এখনও? "

হালিমা খান প্রফুল্ল মেজাজে উত্তর দিলেন,

"ও নাকি সেই ভোর বেলা উঠেছে। পড়তে পড়তে খুদা লাগছিল তাই কিছুক্ষণ আগেই খেয়ে গেলো। "

আলী আহমদ খান শীতল কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,

"শাহরিয়ার কি গতকাল এসেছিল?"

হালিমা খান পুনরায় উত্তর দিলেন,

"গতকাল আসে নি ভাইজান, মেঘ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছে। "

আলী আহমদ খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,

"হয়তো কোনো সমস্যা, আজ আসবে নিশ্চয়ই।"

কেউ আর কোনো কথা বলল না, চুপচাপ খাওয়াতে ব্যস্ত সকলে।

কিছুক্ষণ পর খাওয়া শেষে উঠে চলে গেলেন বাড়ির কর্তারা, বসে আছে চার ভাই বোন। মীম আর আদি খুনসুটি করে খাওয়াতে ব্যস্ত।

তানভির হঠাৎ আবিরের দিকে তাকিয়ে বললো,

"ভাইয়া তোমার কি কিছু হয়েছে?"

আবির নড়েচড়ে বসলো, মুখ গোমড়া করে উত্তর দিলো, "কিছু হয় নি।"

তানভির আর কথা বাড়ায় নি চুপচাপ নিজের খাওয়া শেষ করলো।নিজের খাবার শেষ করে, ফ্রেশ হয়ে আবিরও অফিসের জন্য বেরিয়ে পরেছে। বাকিরাও নিজেদের কাজে ব্যস্ত হলো।

সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে সকলেই বাড়ি ফিরলো, ফিরলো না কেবল আবির।

আগামী মাস থেকে আবিরের নতুন কোম্পানি শুরু হবে সেই কাজেই ব্যস্ত সে। সারাদিন বাবার কোম্পানির কাজ সামলে সন্ধ্যার পর প্রায় ই দেখতে হয় নিজের অফিসের কাজকর্ম । সাথে তার আরও দুজন বন্ধু আছে। একজন রাকিব আরেকজন রাসেল । আবিরের পরেই তাদের পোস্ট আবিরের অবর্তমানে তারাই সামলাবে কোম্পানি । কয়েক বছর আগে থেকেই আবিরের সাথে প্ল্যান করে রেখেছিল এটারই পূর্ণতা পেতে চলেছে।

এদিকে গতকালের ন্যায় আজও পড়ার রুমে অপেক্ষা করছে মেঘ। কিন্তু শাহরিয়ার ভাইয়া আসার কোনো খবর নেই। এই পৃথিবীতে কারো জন্য অপেক্ষা করার মতো কষ্ট আর কিছুতে নেই। অধৈর্য হয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মেঘ বড় আব্বুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

আলী আহমদ খান সোফায় বসে কফি খেতে খেতে টিভি দেখছিলেন। মেঘ জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো বড় আব্বুর দিকে তারপর আস্তে করে বলল,

"ভাইয়া কি পড়াতে আসবেন না?"

আলী আহমদ খানের মনোযোগ সরলো টিভির দিক থেকে৷ এক পলক তাকালো মেঘের দিকে তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে ডায়েল করলেন শাহরিয়ারের নাম্বারে। প্রথমবার রিসিভ হলো না। দ্বিতীয় বার রিসিভ হলো।আলী আহমদ খান জিজ্ঞেস করলেন,

"তুমি আসছো না কেনো? পড়াবে না? "

শাহরিয়ার শীতল কন্ঠে উত্তর দিল,

"আংকেল আমার জন্য বাসাটা দূরে হয়ে যায়। সময় মেইনটেইন করাও একটু সমস্যা তাই আমি আর আসতে পারবো না। সরি। "

আলী আহমদ খানের জবাব,

"তাহলে তুমি এই কথাটা প্রথম দিন ই জানাতে পারতে।"

শাহরিয়ার গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিলো,

"একটু অসুস্থ ছিলাম আংকেল, হাসপাতাল থেকে আজই ফিরেছি। আপনাকে সময় করে ফোন দিতাম আমি। "

আলী আহমদ খান উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,

"কি হয়েছে তোমার?"

শাহরিয়ার ঠান্ডা কন্ঠে বলল,

"তেমন কিছুটা, হালকা ব্যথা পেয়েছি। দোয়া করবেন আংকেল, আল্লাহ হাফেজ। "

আলী আহমদ খান বললেন,

" সাবধানে থেকো, আল্লাহ হাফেজ। "

আলী আহমদ খান মেঘকে জানালেন, মেঘ কি বলবে বুঝে উঠতে পারলো না ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো সোফার পাশে৷ তখন ই সিঁড়ি দিয়ে নামছিল তানভির, মেঘের কাছে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল,

"এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"

মেঘ মাথা নিচু করে, পাতলা অধর নেড়েচেড়ে বলে,

"শাহরিয়ার ভাইয়া পড়াবেন না আমায়!"

তানভির কপাল গুটিয়ে বলল,

"তাতে মন খারাপ করার কি আছে? মানুষের সমস্যা থাকতেই পারে! "

মেঘ চোখ তুলে তাকালো ভাইয়ের পানে। তানভির বড় আব্বুর দিকে তাকিয়ে পুনরায় বললো,

"আমার একজন পরিচিত আপু আছে, ওনি খুব ভালো পড়ান শুনেছি। আপনি অনুমতি দিলে আমি কি কথা বলে দেখবো?"

আলী আহমদ খান তানভিরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন,

" হয়তো মনে মনে ভাবলেন যেই ছেলে জীবনে পড়াশোনায় করে না সেই ছেলে আবার বোনের জন্য টিউটর খোঁজছে।"

মুখ ফোটে বললেন,

"দেখো তোমার মতো গর্দ*ভ হয় না যেনো"

তানভির হাসি মুখে বলল এবার,

"২-১ দিন পড়ার পর মেঘের যদি মনে হয় পড়বে তাহলেই ফিক্সড করবো।"

আলী আহমদ খান এবার যেন স্বস্তি পেলেন।সহজভাবেই বললেন,

" ঠিক আছে কালকেই আসতে বলো তাহলে।"

তানভির আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বাসা থেকে বের হয়ে গেল। মেঘ ও নিজের মতো বই খাতা নিয়ে রুমে চলে গেলো।

★★★★

আজ মঙ্গলবার, মেঘ রেডি হয়ে একেবারে নিচে নামলো, ক্লাসের টাইম ৩০ মিনিট এগিয়ে দিয়েছে তাই তাড়াতাড়ি যেতে হবে। খাবার টেবিলে বসে তাড়াহুড়োয় খাবার খাচ্ছে মেঘ। সামনের চেয়ার ফাঁকা এতেই যেনো মেঘের স্ব*স্তি কাজ করছে। রবিবারের ধ*মক খাওয়ার পর থেকে মেঘ ইচ্ছে করেই আবিরের থেকে দূরে দূরে থাকতে চাইছে। এদিকে আবির ৮ টার দিকে না খেয়ে অফিসে চলে গেছে। নিজের অফিসে কাজ শেষ করে তারপর বাবার অফিসে যাবে। মেঘও খাওয়া শেষ করে কোচিং এর উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

২ টায় মেঘ কোচিং থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসেছে। ২ লুকমা মুখে তুললেই কারো পায়ের শব্দে ফিরে তাকায় মেঘ। আবির খাবারের টেবিলের দিকে আসছে, ওমনি মেঘের গলায় খাবার আটকে গেছে। খাবার গিলতে পারছে না মেয়েটা। কোনোরকমে পানি দিয়ে খাবার টা গিললো। এদিকে আবির বেসিন থেকে হাত ধৌয়ে এসে মামনিকে খাবার দিতে বলল। বসল মেঘের বিপরীতে রাখা চেয়ারটাতে।

মেঘের চিবুক নামলো গলায়, দৃষ্টি তার প্লেটের দিকে। মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ করছে মেয়েটা, হাত পা কাঁ*পাকাঁ*পি শুরু হয়ে যাচ্ছে। ২ দিন পালিয়ে থেকেও লাভ হলো না। বার বার কানে বাজছে রবিবারের সেই কথাটা

"এমন থা*প্পড় দিব যার দাগ ১ মাসেও যাবে না।"

কে চাই স্বেচ্ছায় মা*ইর খেতে, কোনোরকমে খেয়ে সরে পরলেই বাঁ*চে সে। খাওয়ার গতি বাড়ালো, নাকে মুখে খাচ্ছে মেঘ। আবির ক্ষি*প্ত দৃষ্টিতে তাকালো মেঘের দিকে, কপাল কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,

"কি হয়েছে তোর?"

মেঘের নি*শ্বাস আটকে আছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। সারাশরীরের কম্পনের মাত্রা তীব্র হলো, কথা বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে। কিন্তু আজ তাকে বলতে হবে, হি*টলারের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। নিজেকে নিজে সাহস দিলো।

মেঘের সরল স্বীকারোক্তি,

"কিছু হয় নি আমার।"

আবির কিছু বলতে গিয়েও গিলে ফেলল কথাটা। এরমধ্যে হালিমা খান আবিরের খাবার নিয়ে এসেছেন। আবির খাওয়ায় মনোযোগ দিল। হালিমা খান আবিরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

"সকালে কিছু খেয়েছিলি বাবা?"

আবির গুরুভার কন্ঠে উত্তর দিলো,

"খায় নি"

হালিমা খান কিছুটা চিন্তিত কন্ঠে বললেন,

"সকালে খেয়ে গেলেই পারতিস, একটু দেরি হলে না হয় হতো!"

আবির কোনো উত্তর দিলো না।মেঘ মনে মনে ভাবছে, আমায় যে লোক হু*মকি দেয়,

"ঠিকমতো খেতে হবে"

সে নিজে যখন না খেয়ে থাকে তখন তাকে কেনো কেউ ধম*ক দেয় না। সব দোষ এই মেঘের। থাক*বোই না এই বাড়িতে৷ উঠতে চাইলো টেবিল থেকে তৎক্ষণাৎ চোখ পরে আবির ভাইয়ের দিকে, আবির মাথা নিচু করে খাচ্ছে। এখন উঠতে গেলে নিশ্চয় ধ*মক দিয়ে আবার বসাবেন, কে জানে আবার থা*প্পড় ই মা*রেন কি না। এসব ভেবে মেঘ আবার বসে দ্রু*তগতিতে খাওয়া শুরু করে।

আবির রাগে একপ্রকার চিৎকার দিয়ে উঠল,

"একটা থা*প্পড় দিব তোকে, এভাবে খাচ্ছিস কেন?"

মেঘ সহসা থমকে গেল, ধমক খেয়ে চোখ টলমল করছে তার, মুখের ভাত গুলো কোনোরকমে গিলল।মনে মনে ভাবলো,

"আমাকে থা*প্পড় দেয়ার এত ইচ্ছে আপনার?"

আবিরের থা*প্পড়ের ভয়ে ২ দিন যাবৎ খাবার টেবিলে সবার সাথে খায় না মেয়েটা। কে জানতো এই দুপুর বেলা আবির ভাই অফিস থেকে বাসায় চলে আসবেন। জানলে হয়তো আগে খেয়ে নিতো না হয় আবির ভাই খাওয়ার পর খেতে আসতো। কেনো এই মানুষ টা তার সামনে আসে। কেনোই বা এত রা*গ দেখায় ভেবে পায় না মেঘ। হঠাৎ মনে পরে যায় ঘুম থেকে উঠে বলা স্লোগান টা। মেঘ মনে মনে বিড়বিড় করল,

" আমার মন একমাত্র আমার নিয়ন্ত্রণে চলবে, মেঘ ভয় পাবে না আবিরকে।"

তারপর স্বাভাবিক ভাবে প্লেটের ভাতগুলো শেষ করে হাত ধৌয়ে সিঁড়ি দিকে যেতে নেয়৷ সোফার কাছে পর্যন্ত যেতেই মীম আর আদি দৌড়ে এসে জাপ্টে ধরে মেঘকে৷ আকস্মিক ঘটনায় কিছুটা ঘাবড়ে গেলো মেঘ।তারপর স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,

" কি হয়েছে তোদের?"

মীম ফিসফিস করে মেঘকে বললো,

"আপু প্লিজ আবির ভাইয়াকে বলো না আমাদের নিয়ে বাইকে ঘুরতে, কখনো বাইকে উঠি নি, প্লিজ বলবা!"

মেঘ কোনো কিছু না ভেবেই বললো,

"আমি বলতে পারবো না।"

আদি বলে উঠল,

"প্লিজ প্লিজ প্লিজ আপু। আমরা বলার সাহস পাচ্ছি না। প্লিজ তুমি একটু বলো না "

মেঘ আবারও গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিলো,

" আমি পারবো না বলতে। তোদের ঘুরতে ইচ্ছে করে তোরা বল। "

মেঘ মনে মনে ভাবছে,

"তোরাই সুখে আছিস আমাকে তো উঠতে বসতে থাপ্পড় মা*রার হুম*কি দিচ্ছে! আমি এবার এটা বললে নিশ্চিত এখনই খাবো থাপ্প*ড় টা।"

আবিরের খাওয়া শেষ এদিকে আসতে দেখে মেঘ তাড়াতাড়ি রুমে চলে যেতে চাচ্ছে। কিন্তু আদি আর মীম আরও করুন স্বরে বলছে,

"প্লিজ আপু, তুমি বলো না। "

এবার মেঘ রেগে কটমট করে বলে,

"আমি বললাম তো পারবো না।।"

মীম আর আদি এবার চুপসে গেলো। মেঘ আর এক মুহুর্ত দাঁড়ালো না। সিঁড়ি দিয়ে উঠায় ব্যস্ত। আবির বিষয়টা লক্ষ্য করেছে, আবির আদিকে জিজ্ঞেস করে,

"কাকে কি বলতে বলছিস ওকে?"

মীম শ্বাস টেনে সাহস নিয়ে বললো,

"ভাইয়া আমাদের আপনার বাইকে নিয়ে ঘুরাবেন প্লিজ?"

মেঘ সিঁড়িতে উঠতে উঠতে ফিসফিস করে বলছে, "হিট* লার নিবে বাইকে তোদের? সেগুরে বালি৷"

আবির কন্ঠ তিনগুণ ভারি করে উত্তর দিলো,

"আমার বাইকে কাউকে উঠাবো না,

কিছুদিন পর তানভির কে বাইক কিনে দিব। তখন ও তোদের নিয়ে ঘুরবে। "

আদি অকস্মাৎ প্রশ্ন করে বসলো,

"তুমি তানভির ভাইয়াকে নিয়ে ঘুরো না?"

আবির এবার স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো,

"এখনও তানভির আমার বাইকে উঠে নি! তবে ভবিষ্যতে উঠতে পারে । ওর সাথে তোদের কি সম্পর্ক?"

মীম আর আদি বোবা হয়ে রইলো। মেঘের কথা ফলে যাওয়াতে নিজেকে নিয়ে গর্ব করতে করতে রুমের দিকে যাচ্ছে আর ভাবছে দুই ভাইয়ের গলায় গলায় সম্পর্ক অথচ বাইকে উঠার পারমিশন দেয় নি ছিঃ।

সহসা অভিব্যক্তি পাল্টালো মুখের৷ বিড়বিড় করে বলল,

"হিট*লারের থেকে ভালো আর কি আশা করা যায়?"

রুমে গিয়ে সোজা শুয়ে পরলো। তৎক্ষনাৎ ফোনটা হাতে নিল। এই ২-৩ দিনে একবারের জন্য ও ফে*সবুকে ঢুকে নি সে। মন খারাপ কাটাতে ঢুকলো ফে*সবুকে, কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরির পর একটা পোস্ট সামনে আসছে। ১ দিন আগে আবির ফেসবুক একটা অসম্ভব সুন্দর ছবি আপলোড দিয়েছে সাথে ছোট করে ক্যাপশন লিখেছেন।

"শূন্যতা আমায় ঘিরে আছে,

আর আমি ঘিরে আছি মোহে।"

মেঘ ছবিটা দেখে যতটা খুশি হলো তার থেকে বেশি চিন্তিত হলো ক্যাপশনে কি বুঝিয়েছেন তা ভাবতে। সে ক্যাপশন বুঝার চেষ্টায় মগ্ন হলো। মনে মনে আওড়ালো,

"ওনি কি তাহলে সত্যি কারো সাথে রিলেশনে আছেন? "

তৎক্ষণাৎ মনের ভেতর থেকে জবাব এলো,

"ওনি প্রেম করলে তোর কি? তোরে যে উঠতে বসতে থা*প্পড় দে*য়ার ভ*য় দেখায়, তোর লজ্জা করে না এই হি*টলার কে নিয়ে ভাবতে!"

সঙ্গে সঙ্গে ডাটা অফ করে ফোন রেখে দিলো মেঘ। সত্যিই তো, সে তো আবির ভাইয়ের উপর রেগে আছে তাহলে আবার আবির ভাইকে নিয়ে ভাবছে কেনো..!

এদিকে আবির রুমে এসে ৫-১০ মিনিট রেস্ট নিয়ে নিজের ল্যাপটপ আর কিছু কাগজপত্র নিয়ে বেরিয়ে পরেছে৷

★★★★

সন্ধ্যায় মেঘের নতুন টিউটর এসেছে। বয়স এত বেশি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্সে পড়াশোনা করছেন এবার ৩য় বর্ষে আছেন। দেখতে মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দরী, গোলগাল চেহারা, বোরকা পরে হিজাব পরে এসেছেন। গুছিয়ে কথা বলেন, সুন্দর করে বুঝিয়ে পড়িয়েছেন মেঘকে। মেঘ যেনো পড়ার থেকেও বেশি মুগ্ধ হয়েছে ওনার কথা বলার স্টাইলে।

ওনার নাম জান্নাত। মেঘের ওনাকে এতই ভালো লেগেছে যে দু দিন পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলো না। জান্নাত আপু চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল বড় আব্বুর কাছে। জানালো ওনার কাছেই পড়বে সে।

আলী আহমদ খান যেনো কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেন। তারপরও মেঘকে বললেন,

"কখনো যদি মনে হয় তোমার পড়ার ঘাটতি হচ্ছে তাহলে আমি নতুন টিউটর আনবো, তুমি চিন্তা করো না। পড়াশোনায় মনোযোগ দাও!"

মেঘ "ঠিক আছে" বলে নিজের রুমে চলে গেলো।

রাতে সবাই একসাথে খাওয়া দাওয়া করলো কিন্তু আবির নেই। ইদানীং আবির অফিস শেষ করে নিজের নতুন অফিসে চলে যায়। ওখানে সব গুছানো, প্ল্যানিং করা এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকে। রাত ১১ টার আগে ফিরেই না। কেউ অপেক্ষাও করে না তার জন্য। কারণ আবিরের ক*ড়া নির্দেশ,

"আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করলে আমি আর ফিরবোই না।"

সেই থেকে মা আর মামনি নিজেদের সময় মতো শুয়ে পরে। আবির ১১ টার পরে এসে ফ্রেশ হয়ে নিজের মতো খায়।

★★★★

কেটে গেলো আরও দুদিন। দেখা হলো না মেঘ আর আবিরের। সকালে আবির খেতে আসলেও মেঘ আগে আগেই খেয়ে পা*লায়, সে আবির ভাইয়ের মুখোমুখি হতে চাই না।

মেঘ ছোটবেলা থেকেই খুব আবেগী আর জে*দি৷ অল্পতে কা*ন্না করা তার স্বভাব। আর কোনো বিষয়ে জে*দ করলে তা সহজে কাটে না। যেমন সামান্য থা*প্পড়ের জন্য আবির ভাই এর সাথে ৯ বছরের উপরে কথা বলে নি একটিবার। আবির দেশে আসাতে মনে অন্যরকম অনুভূতি জন্মানো শুরু করেছিল সবেমাত্র। কিন্তু আবির ভাইয়ের হুমকিতে অনুভূতি গুলো চা*পা পরে যাচ্ছে। মেঘ নিজেই যেনো অনুভূতি গুলোকে মাটি চা*পা দিতে ব্যস্ত।

কথায় আছে,

"চোখের আড়াল হয়ে গেলে,

মনের আড়াল হতে বেশি সময় লাগে না"

এজন্য মেঘ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে যেনো আবির ভাইয়ের সামনে সে না পরে৷ সবাই টেবিলে বসার আগেই সে খেয়ে নিজের রুমে চলে যায়, আবির ভাই অফিসে গেলে সে কোচিং এর জন্য বের হয়, দুপুরে আবির থাকে না বলে একটু রিলাক্সে খেতে পারে৷ রাতে জান্নাত আপু পড়িয়ে যায় ৭.৩০ নাগাদ তখন ই খেয়ে রুমে চলে যায়। তখন তো আবির ভাই ফিরেই না, দেখা হবে কি ভাবে..!!

★★★★

সেই রবিবার থেকে মেঘ পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার রাত, মেঘ নিজের পড়া শেষ করে শুয়ে মোবাইল টা হাতে নিয়েছে। আবিরের কথা খুব মনে হচ্ছে তার, তাই আবিরের আইডি তে ঢুকলো কিন্তু কোনো আপডেট নেই। মনের ভেতরটা কেমন জানি মোচড় দিলো মেঘের। মঙ্গলবার দুপুরে খেতে বসেছিল একসাথে তারপর আর দেখেই নি সে।

মেঘের খুব ইচ্ছে করছে আবির ভাইকে দেখার। মনকে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছে না। মনের জোর গুলোও নিস্তেজ হয়ে পরেছে। অনেকক্ষণ মনকে বুঝিয়ে ব্যর্থ হলো তাই রুম থেকে বের হয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়েছে আবির ভাইয়ের রুমের দিকে। রাত তখন ১১ টার উপরে। ড্রয়িং রুমে একটা হালকা আলোর বাল্ব জ্বলছে, পুরো বাড়ি অন্ধকার। মেঘ আবিরের রুমের সামনে দাঁড়ালো। দরজা চাপানো, আস্তে করে ধাক্কা দিলো মেঘ। চেক করতে চাইছিলো খোলা কি বন্ধ। মেঘের হালকা ধাক্কাতেই খুলে গেলো দরজা। কিছুটা ঘাবড়ে গেল মেঘ। যদি আবির ভাই রুমে থাকেন তাহলে আজ থা*প্পড় নিশ্চিত। তাই দুগালে হাত দিয়ে আস্তে করে উঁকি দিলো রুমে৷

রুমের বারান্দায় বাল্ব জ্বলছে । সেটার আলোয় রুমে আসছে। মোটামুটি আলোকিত হয়ে আছে রুমটা। আবির কোথাও নেই। বিছানা টানটান করে পাতানো। টেবিলে বই, খাতা, কাগজপত্র এলোমেলো সাথে একটা ল্যাপটপের আলো জ্ব*লছে। চেয়ারের উপর ২-৩ টা কাপড় এলোমেলো পরে আছে। ছেলেদের রুম সচরাচর যেমন হয়।

মেঘ মনে মনে ভাবছে,

"আবির ভাই কি এখনও বাসায় ফিরে নি?"

নিজের রুমের দিকে ফিরে ১ কদম এগুতেই কানে ভেসে আসে গানের সুর । দাঁড়িয়ে পরলো মেঘ, মনে মনে ভাবছে,

"গান কে গাইছে, আবির ভাই নয় তো?"

আবারও ঘুরে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেলো সিঁড়ির কাছে। মেঘ এই জীবনে কোনোদিন সন্ধ্যার পর ছাদে যায় নি৷ সবাই গেলেও যায় না, ওর ভ*য় লাগে, সন্ধ্যা বেলা নাকি ছাদে তাঁনারা ঘুরে বেড়ায়। সারারাত ছাদেই থাকেন এ ভয়ে ছাদে পা বাড়ায় না সেদিকে। সিঁড়ি কাছে এসে থমকে দাঁড়ালো মেঘ,

"এই গান কি তাঁনারা গাইতেছেন? আমাকে আকৃষ্ট করে নেয়ার জন্য? "

যাবে কি যাবে না এটায় ভাবছে মেঘ, বুকে সাহস নিয়ে দু কদম এগিয়েছে মেঘ, একটু উঁকি দিয়ে দেখলো ছাদের দিকে৷ ছাদের গেইট খোলা। এটা দেখে মনে সা*হস পেলো মেয়েটা৷ তাঁনারা গান গাইলে গেইট খুলার কি দরকার। তারপরও আল্লাহ আল্লাহ করে এগুচ্ছে মেঘ৷

গেইটের কাছে এসে বুকে হাত রেখে উঁকি দিলো ছাদের দিকে। ছাদের এক কর্ণারে নজর পরলো, সিঙ্গেল সোফার উপর হেলান দিয়ে বসে আছে একজন৷ চাঁদের উপর থেকে মেঘ সরে যেতেই স্পষ্ট বুঝা গেলো এটা আবির ভাই৷ মেঘ নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পরলো, এত রাতে আবির ভাই ছাদে কি করেন, কৌতুহল হলো মেঘের।আগে কি গান গেয়েছে তা মেঘ বুঝতে পারে নি,

নিচ থেকে শুধু সুর টায় শুনেছে। এখন আবির ভাই নিরব। কয়েক মুহুর্ত পর আবির ভাই আবার শুরু করলো,

"ছোট্ট বুকে মেঘ জমিয়ে ক্যানরে কাঁদিস পাখি?

তুই ফিরবি বলে আমি কেমন সন্ধ্যা নামায় রাখি

ছোট্ট তোর ওই ওমের ডানায় নাক ঘষতে দিবি কি?

বুকের ভেতর ঘুলঘুলিতে একলা পাখি হবি?

তুই বুকের ভেতর ঘুলঘুলিতে একলা পাখি হবি?"

মেঘ উদ্বিগ্ন নয়নে তাকিয়ে আছে আবির ভাইয়ের দিকে। ছেলেদের গান শিখতে হয় না, তারা খালি গলাতে গান গাইলেও যেনো অসম্ভব সুন্দর লাগে। মেঘ মুগ্ধ হয়ে আবিরের গান শুনছে। আবির ভাই একই লিরিক্স বার বার গাওয়াতে গানে মনোযোগ দিলো মেঘ,

নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলো মেঘ,

"এই গান কাকে উদ্দেশ্য করে গাইছেন ওনি? আমাকে নিয়ে নয়তো? এটুকু বলতেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো মেঘের, তৎক্ষনাৎ মনে হলো ওনি আমাকে নিয়ে কেনো গান গাইবেন, আমি কে! তানভির ভাই তো সেদিন বললো আবির ভাইয়ের জীবনে কেউ আছে তাহলে কি তার কথা ভেবেই গাইতেছেন?"

সঙ্গে সঙ্গে হাসি গায়েব হয়ে গেল ৷ নিস্তব্ধ আঁখিতে তাকিয়ে আছে সে, বুকের বা পাশে হালকা ব্যথা অনুভব হলো, ওনার মনে সত্যি অনেক দুঃখ না হয় এমন গান কেউ গায়..!

এরমধ্যে আবির ভাইয়ের গান থেমে গেলো, কিছুক্ষণ নিরব থেকে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে ধরলো, আ*গুন দিয়ে জ্বা*লালো সেই সিগা*রেট। এদিকে মেঘের মাথায় আকাশ ভে*ঙে পরেছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে ক*ষ্ট হচ্ছে, আবির ভাই সিগারেট খান.? দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকু পাচ্ছে না মেয়েটা । অকস্মাৎ দরজার এখানেই বসে পরেছে সে৷মেঘের জাত শ*ত্রু হলো সিগারেট। যেখানে সিগারেটের গ*ন্ধ মেঘ সহ্য করতে পারে না, সিগারেটের গ*ন্ধে তার শ্বা*সকষ্ট হয়ে যায়। সেখানে আবির সিগারেট খাচ্ছে। এটা যেনো মেঘ মানতেই পারছে না৷ ওষ্ঠদ্বয় উল্টে নিরবে চোখের জল ফেলছে, যাকে সে মিস করছিল, এতক্ষণ তাকে দেখার জন্য উদ্বেগ ছিল তাকে খোঁজে এসে এরকম একটা দৃশ্য দেখবে তা সে কল্পনাও করে নি। অষ্টাদশীর মনটা নির্ম*মভাবে হ*ত্যা করেছে আবির। আবির ভাই অষ্টাদশীর মনে বসন্তের ফুলের মতো আর ফুটবে না । আবিরের প্রতি খুব রা*গ হলো মেঘের। রাগের সাথে কান্নার মাত্রাও বাড়তে লাগলো। ছাদের দরজার পাশে বসেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেঘ। নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার কোনো ভাষায় খোঁজে পাচ্ছে না সে। আচমকা আবির মেঘের সামনে হাজির হলো। মেঘ তখনও কা*ন্নায় ব্যস্ত৷

আবির গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,

"এখানে কি করছিস?"

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন