#তেরি_দেওয়ানি (পর্ব ০১)
#লেখিকা_মাইমুনা_আক্তার_আফনাজ
#পর্ব_০১
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
০১
কেমন অন্ধকার। সামান্য একটা জানালা খোলা। ঝি ঝি পোকা ডাকছে। খোলা জানালাটা দিয়ে হালকা আলো প্রবেশ করেছে। হয়তোবা আজ পূর্ণিমার রাত। তাই হালকা চাঁদের আলো। রাত হলো গরম আছে। চারপাঁশটা ভীষণ ভুতুড়ে মনে হচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। পরিবেশটা কেমন মনে হচ্ছে!
আসলে আমি কোথায় তা আমি নিজেও জানিনা। আমি একটা চেয়ারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছি। চিৎকার করব তার ও কোনো সুযোগ নেই। মুখে টেপ লাগানো। অনেক গরম লাগছে। লাগবে না বা কেন? আজ চৈত্র মাসের ৩ তারিখ। আরও পড়ে আছি বোরকা। গায়ে ডার্ক গ্রিন একটা বোরকা। অনেক ঘামাচ্ছি।অনেক ক্লান্ত লাগছে শরীর। জায়গাটা অনেক নির্জন। জনমানবহিণ। কুকুররা ঘেউ ঘেউ করছে।হাত ঘড়িটাও দেখতে পারছি না। হাত পিছনে নিয়ে বাঁধা।তবে মনে হচ্ছে রাত অনেক গভীর হবে। আমার মনে হচ্ছে কেউ আমাকে কিডন্যাপ করেছে। আমিতো প্রাইভেট পড়ে বাসায় যাচ্ছিলাম। পিছন থেকে মনে হয় কেউ আমার মুখ চেপে ধরেছিল। তারপর!তারপর আর কিছু মনে নেই। আর এখন আমি এ কোথায়? আমাদের ওই রাস্তা তার জনমানবীন ছিল । তাই এত সহজে। কিন্তু আমাকে কেন করেছে? আমি তো কোনো ক্ষতি করিনি কারো? আমি তো কোটিপতি বাবার মেয়েও না তাহলে? হঠাৎ আমার মাথায় আরেকটা চিন্তা আসে। 'ধর্ষণ'! 'ধর্ষণ'! ধর্ষন করার জন্য আনেনি তো আমাকে? ভয়ে আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। যদি ধর্ষণ করে আমাকে নির্মমভাবে হত্যা করে? আমার মা বাবার সম্মান? আমার সম্মান? আমাকে তো চিল শকুনের মত ছিলে ছিলে খাবে! আমার আর্তনাদ! আমার আর্তনাদ কেউ শুনতে পাবে না। ভয়ে আমি আরো ঘামাচ্ছি।শুকনো ঢোক গিলছি। আমি মনে হয় শেষ। আজকে মনে হয় আমার জীবনের শেষ দিন। জানোয়াররা আমাকে নিয়ে ফুর্তি করবে, তাদের লালসা মিটাবে। আমার চোখে শুধু ভয় কাজ করতে থাকে। এদিকে সেদিকে কয়েকবার তাকালাম চোখের সামনে দেয়াল আর ভাঙ্গা কাঠের টুকরো ছাড়া আর কিছুই নেই। গলা শুকিয়ে এসেছে। সে সকাল থেকে এখন পর্যন্ত কিছু খাইনি। পেটে খিদা পেয়েছে। কিন্তু এখন সকল খিদা দূর হয়ে গিয়েছে দর্শনের কথা মাথায় এসে। গায়ে কলঙ্কের বোঝা বইতে হবে। সমাজের সবাই আঙ্গুল দেখিয়ে বলবে "নষ্টা মেয়ে কোথাকার"যদি বাঁচিয়ে রাখে আরকি। আবার মিডিয়াতে উঠাবে। তখন সবাই জানবে আমি ধর্ষিতা। কলঙ্কের বোঝা সারা জীবনের জন্য গায়ে মাখতে হবে। আমার আর কোনো মূল্য থাকবে না । আপনারাই বলেন ধর্ষিতা মেয়েদের মূল্য থাকে?থাকে না তো! কোথাও থাকেনা! পরিবারের কাছেও বিষের মতো লাগে। আর লাগবে না বা কেন? তারা এই মেয়ের জন্য তাদের মান সম্মান হারিয়েছে? আর এই দেশের ধর্ষকের বিচার হয় না।কিছুদিন যাওয়ার পর জামিন নিয়ে মুক্তি হয়ে যায়। আবার ধর্ষকের বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলে ধর্ষণের শিকারকারীর পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়। নাহলে ওই মেয়েকে আর বাঁচতে দিবে না। নয়তোবা এসিড নিক্ষেপ করবে। আবার ধর্ষক যদি কোটিপতি বাবার সন্তান হয় তাহলে তার কথাই নেই , পুরো আইন বিভাগ তাদের হাতে। এটাই নিয়ম। এটাই বাস্তবতা, এটাই দেশের আইন, এটাই বর্তমান সমাজ।
এগুলো ভাবতে ভাবতে আমার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। জানিনা কোন ভুলের শাস্তি আজ আমাকে পেতে হবে। আমার বাবা মা কি আমাকে খুঁজছে না? খুঁজছে তো! হয়তোবা এতক্ষণ থানা পুলিশ হয়ে গিয়েছে। হবে না বা কেন? সে সকাল প্রায় ৮ঃ২৫ থেকে আমি নিখোঁজ।মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকি। দোয়া দরুদ পড়তে থাকলাম । আজ এক আল্লাহ ছাড়া আমাকে আর কেউ এই বিপদ থেকে বাঁচাতে পারবে না।
....
মাথাটা অনেক ব্যথা করছে, অনেক। চোখ বন্ধ করে কল্পনা করতে থাকি আমার সাথে পরবর্তীতে কি হবে। হঠাৎ চোখের উপর লাইটের আলো পড়েছে এমন অনুভব হচ্ছে।তবুও মনের ভুল ভেবে চোখ বন্ধ করে রাখলাম। হঠাৎ কানে আসলো ছেলেদের বুট জুতার আওয়াজ। কোনোভাবে ক্লান্ত শরীর নিয়ে চোখ খুলে সামনের দিকে তাকালাম। লাইট শুধু আমার মুখের উপর বিদ্যমান। আর চারপাশ পর্যন্ত যতটুকু আলো যায় আর কি। চোখ বড় বড় করে ভালো করে তাকালাম। কিছু কালো পোশাকধারী লোকের মাঝে একজন লোক যে কিনা অফিসিয়াল গেটাপে। চেহারাটা এখনো বুঝে উঠতে পারলাম না। ওই লোকটা এক পা দুই পা করে আমার বরাবরের এসে দাঁড়ালো। সাথে আরেকজন কালো পোশাকধারী লোক।আমি লোকটার দিকে ভালো করে তাকালাম। ওই লোকটার পাশে কালো পোশাকধারী লোকটা একটা চেয়ার এগিয়ে দেয় বসার জন্য। লোকটাও এক পায়ের উপর এক পা তুলে বসে। যতটুকু মনে হচ্ছে অনেক বড় কেউ হবে। আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
এদের দেখে আমার আরো ভয় লাগল। এতগুলো মানুষ একসাথে আমাকে......! ভাবতেই ভয় লাগছে। আমি শুধু লোকটার দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলছি । আর মনে মনে আল্লাহকে ডাকছি। আল্লাহ যেন আমাকে শেষ রক্ষাটুকু
করে।
ও আপনাদেরকে তো লোকটার বর্ণনা দেয়া হয়নি। লোকটা মনে হয় লম্বা 6 ফুট হবে। গায়ের রং অনেক ফর্সা। চেহারা মায়াবী। চোখের মনিগুলো কালো। প্রথমে লাইটের আলোতে মনে হতে পারে গাঢ় ধূসর কিন্তু গাঢ় ধূসর না কালোই। বডি সেই লেভেলের। চুলগুলো অনেক সুন্দর। আমি কেমন তাই না। কিছুক্ষণ পর এই লোক আমাকে ধর্ষন করবে আর আমি এই লোকের বর্ণনা দিচ্ছি। এগুলো ভাবতে ভাবতে আমার চোখ থেকে টুপটুপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। পাষণ্ড মানুষগুলো এত পাষণ্ড আমার মুখের টেপ টা খুলে দিচ্ছে না। আর না খুলে দিচ্ছে হাত পায়ের বাঁধন।লোকটা আমার কাছাকাছি চেয়ারটা আরেকটু টেনে বসলো। কিছু ভেবে আমার দিকে তার এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
—হ্যালো, ওহ সরি! তোমার হাত বাধা। থাক হাত মিলানোর কোনো প্রয়োজন মনে করছি না '
লোকটা হাত সরিয়ে নেয়। লোকটার এই কথাগুলো আমার কাছে হেঁয়ালি কন্ঠের মনে হলো।লোকটাই এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
—আমি কে তা এখন জানানোর প্রয়োজন মনে করছি না। বাট তোমাকে আমি খুব ভালো করে চিনি। এন্ড তোমার সকল ইনফরমেশন আমার কাছে আছে। তোমার মাথায় অনেক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।তুমি এখানে কিভাবে আসলে? এটা কোথায়? আদার্স।
লোকটা এ কথা বলে দাঁড়িয়ে যায়। আর ছোট রুমটার মধ্যে আমার আশেপাশে পায়চারি করতে করতে বলল,
—তোমাকে আমার অনেক প্রয়োজন! মূলত আমাকে তোমার হেল্প করতে হবে। খুব করে করতে হবে। না করলে মারা পড়বে। আর করলে অনেক অনেক টাকা পাবে। অল্প বয়সে তুমি আর তোমার পরিবার অনেক টাকার মালিক হবে। সারা জীবন অনায়াসে চলে যাবে।
মনে হয় কাউকে কিছু ইশারা করলেন। কালো পোষাকধারী দুজন মেয়ে এগিয়ে এসে আমার মুখের টেপ খুলে দেয়। মেয়েগুলোকে দেখে দেহ রক্ষিতা মনে হলো।মুখের বাঁধন খোলার সাথে সাথে আমি কোন ভাবে মুখ থেকে বের করে বললাম,
—পা...নি,পানি।
একজন ছেলে দেহরক্ষী আমাকে পানি খাইয়ে দেয় । কিন্তু আমার হাত-পায়ের বাধন খুলে না। কত নিষ্ঠুর। আমি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস পেলি। শরীর একটু শক্তি এসেছে। এখন গলা ফাটিয়ে কথা বলতে পারব। আমি লোকটার উদ্দেশ্যে চেতে গিয়ে বললাম,
—আপনি কি আমাকে লোভী মনে করেছেন? মধ্যবিত্ত পরিবারের হতে পারি কিন্তু লোভী না। মোটামুটি টাকা-পয়সা আমাদের কাছেও আছে। আপনাদের মতো হারাম পথের টাকা না । আপনার তোর নারী পাচার করে দিনে দিনে টাকার পাহাড় বানান। আমার বাবা মাকে কল দিয়ে মুক্তিপণ চান দিয়ে দিবে। নিজের রক্ত বিক্রি করা হলো দিয়ে দিবে।
লোকটা আমার মুখের উপর ঝুঁকে রাগে কটমট করে বলল,
—সেটাপ, ইডিয়েট!
আমি একটু ভয় পেলাম।
সেদিনের ওই ঘটনা মনে পড়লে আমার গা শিউরে উঠে।কি জঘন্য একটা লোক রে বাবা।
আজ ওই ঘটনার তিন বছর পর।
আমি ওই সময় সবেমাত্র অষ্টম শ্রেণীতে উঠেছিলাম। অষ্টম শ্রেণীতে থাকলেও আমার বয়স অনেক কম ছিল। আপনারও তো পরবর্তী কাহিনীটা আর জানেন না। শুনুন তাহলে,
লোকটা সেটাপ ইডিয়েট বলার পর। নিজের রাগ কন্ট্রোল করে আর কিছু বলেনি। আমার হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিয়েছিল। এবং আমাকে বার্গার খাইয়ে ছিল। আমার মতে সেদিন লোকটা আমাকে ধর্ষনই করত। লোকটার রুমে সবাইকে বের করে নিজে আর আমাকে রাখে। আর কিছু লেকচার দিতে থাকে। তারপর আমার দিকে কেমন ভাবে তাকায়। আর তারপর আবার লেকচার দিতে শুরু করে। আমি তার একটা লেকচার ও কানে দিচ্ছিলাম না। আমি সুযোগ বুঝে লোকটার মাথায় ওই ভাঙ্গা কাঠ দিয়ে আঘাত করি। যত পেরেছি তত দিয়েছি। লোকটা এক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। এসব আওয়াজ শুনে বাহির থেকে বডিগার্ড যা চলে আসে। আমি জানতাম বডিগার্ডরা আসবে। তাই আমি আমার ব্যাগ থেকে আগ থেকেই হ্যান্ড স্যানিটাইজার বের করে রেখেছিলাম। লোকগুলো রুমে প্রবেশ করার সাথে সাথে আমি তাদের চোখে হ্যান্ড স্যানিটাইজার স্প্রে করে দিই।লোকগুলোর চোখ জ্বালাপোড়া করতে থাকে। এরা এটার মধ্যেও আমাকে ধরতে চেষ্টা করতে থাকে। আমি কাঠের টুকরো দিয়ে তাদেরকেও আঘাত করি। তারপর একজন বডিগার্ডের পকেট থেকে একটা বাটন ফোন নিয়ে ওই ঘর থেকে বের হয়। যাওয়ার আগে ওই লোকটার দিকে একবার তাকালাম। আমার চোখে ঘৃনাই ভরে ওঠে। আমি কোনো ভাবে বের হয়ে রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সকল কিছু অচেনা। হাঁটতে গিয়ে ইটের সাথে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। হাঁটুতে অনেক ব্যথা পাই। মনে হয় ছিলে গিয়েছে। কেমন জ্বালাপোড়া করছে। কোনোভাবে বাটন ফোনের লাইট জ্বালায়।হঠাৎ পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওই লোকটার আরো বডিগার্ড আমার পিছু করছে। আমি আর কোনো দিকে না তাকিয়ে প্রাণে পড়ে দৌড়াতে থাকলাম। তারপর কোনোভাবে একটা ঘাসের ঝাপঝারের এর মধ্যে লুকিয়ে পড়লাম। লোকগুলো আমাকে অনেক খুঁজে ছিল আমি ঝাপঝরের ফাঁক দিয়ে দেখেছিলাম। তাদের চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। হয়তোবা সেদিন এক মহান আল্লাহতালার দয়ায় আমি শেষ রক্ষা পেয়েছিলাম। আমি কিছুক্ষণ বসে থাকার পর দেখলাম অনেকগুলো অ্যাম্বুলেন্স এসেছে।আর আহত লোকগুলোকে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্সে তুলছে। তারপর অ্যাম্বুলেন্স গুলো চলে যায় এবং বডিগার্ডগুলো। আমি আমার বাবাকে কল করি। আমি তো জানি না আমি কোথায়? আমার রাহাত ভাই আমার নাম্বার অনুযায়ী আমার লোকেশন ট্র্যাক করে। আমাকে কুমিল্লা থেকে ওনারা উদ্ধার করে।
আমি আর কোনোদিন ওই লোকটাকে দেখিনি । আর দেখতেও চাই না। কত খারাপ লোক। আমি আল্লাহকে কতগুলো ধন্যবাদ দিয়েছিলাম আমার ইজ্জত হেফাজত করার জন্য তা একমাত্র আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। লোকটার চেহারা আমি খুব ভালো করে মনে রেখেছি। খুব ভালো করে। কিন্তু নাম, ঠিকানা, পরিচয় কিছুই জানা নেই।সব অজানা।
#চলিত
(আপনাদের মতামত এবং একটা রিয়েক্ট দিবেন)