ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

২য় পর্ব

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল 

#নূপুর_ইসলাম 
#পর্ব_০২
নোভা নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এলো বিরক্ত মুখে। ঘড়ির কাটায় সময় এখন দশটার উপরে। শহরের বুকে এমন কোন রাত না, তবে অক্টোবর মাসের সাড়ে পাঁচটায় সন্ধ্যার হিসেবে মধ্যরাতে পৌঁছে গেছে। আর এই মধ্যরাতেই ভূতের মতো তাকে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে।
অথচ এমন ঘুরে বেড়ানোর স্বভাব তার আপার। বাদুড়ের মতো জেগে বসে বসে বই পড়বে, বারান্দায় ঝিম মেরে বসে থাকবে। বাড়ির এ মাথা থেকে ও মাথা নিজের মতো ঘুরে বেড়াবে। 
আসমানি খালার সব কাজ গোছানো হলেও, সন্ধ্যা পর তিনি ঘুমে চোখে দেখেন না। আটটার মধ্যে সবাই, খাইলে খাও, না খাইলে না খাও। তিনি নিজের মতো বিছানায় চলে যান। সেই যাওয়াও বড়ই কঠিন। যা'ই হয়ে যাক, সে সকাল হওয়ার আগে আর বিছানা ছাড়বেন না। 
আর কেউ যদি এই বিষয়ে ভুলেও কিছু বলে, - সে আঁচলে মুখ চেপে, অসন্তুষ্ট কণ্ঠ বলবে " দিনভর গাধার খাটুনি খাটি। রাত হলে মরার মত ঘুমাই। এইডা কি আমার দোষ। সবাই সময় অসময় বিছানায় গড়াগড়ি খায়, সে কি পারে? তাই যে তার ঘুম নিয়ে কথা বলব,তার উপরে আল্লাহর নানত পড়ব। 
আল্লাহর নানতের ভয় হোক, আর যাই হোক। এই বিষয় নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামায় না। তাছাড়া শহরে বিশ্বস্ত কাজের লোক পাওয়া মুশকিল। তা না হলে, মা এতদিনে আউট ঠিক করে ফেলত। তবে তার সেই কাজগুলোই আপা করে, সুন্দর করে গুছিয়ে। এত যত্ন করে করবে, দেখতেও ভালো লাগে। মাঝে মাঝে মন ভালো হলে, টুকটাক রান্নাও করে ফেলে । 
সবাই যখন ঘুমিয়ে যায়, তখন সে নিজের মত থাকে। বড় চাচা মাঝে মাঝে বাতি জ্বালিয়েই ঘুমিয়ে পড়েন, সে গিয়ে আস্তে করে বাতি নেভাবে। এসির পাওয়ার বেশি হলে, যত্ন করে গায়ে চাদর টেনে দেবে। বাবার এলোমেলো লুঙ্গি, গামছা ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখবে। নাবিল ঘুমায় অনেক রাতে। চুপ করে তার জন্য চা কফি করে দেবে । তবে সব কিছুই শুধু রাতে। দিনের বেলা অতি প্রয়োজন ছাড়া সে রুম থেকে বেরই হবে না।
এই বাড়িতে এইসব, সবই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তবে আগে আপা এমন ছিল না। ছিল রাগী, বদমেজাজী, ঘাড়ত্যাড়া। একবার বলেছে তো বলেছে, সেটা থেকে আর সরানো যেত না। একেবারে যেন মায়ের কার্বন কপি। বরং বলতে গেলে মায়ের চেয়েও বেশি। 
কেননা, ছোট্ট একটা কারণ ধরে, বাবা মায়ের উপর রাগ, অভিমান এমনকি জেদ করে, এই বাড়িতে এত বছর পা'ই রাখেনি। মায়ের রাগ, জেদ, ভয়, ডরও সেই জেদ থেকে তাকে সরাতে পারেনি। অবশ্য তার সব জেদের আশকারা ছিল নানু। তবুও তাকে একচুলও নাড়ানো যায় নি। সেই জেদের কি হয়েছে সে জানে না, তবে এই বাড়িতে এসেছে এই তো বছর চারেক হবে। এক ক্লান্তিময় বিকেলে বড় মামা সাথে করে নিয়ে এলেন। নিস্তেজ, বিধ্বস্ত, যেন কত রাত নির্ঘুম, কালি পড়া দুটো চোখ, ভাঙা চাপা, শুষ্ক ঠোঁট, শুকনো শরীরের শান্ত এক মুখ।
যেই মুখ হাসে, তবে সেই হাসি চোখ পর্যন্ত পৌঁছায় না। যে সবার কথা নিশ্চুপ শোনে, তবে সেই কথা মন ছোঁয় না। সবকিছু দেখে, কিন্তু সেই দেখায় মুগ্ধতা থাকে না। এই সব কিছু যেমন তেমন, ভয় ডরও নেই । দুনিয়ায় ভয় মানুষ উপেক্ষা করতেই পারে, তবে মৃত্যুর ভয় নাই করতে, কয়জনে পারে? 
একবার তারা ঘুরতে গিয়েছিল। তখনো তাদের গাড়িটা কেনা হয়নি। তাই ভাড়া মাইক্রোতে গেল। সকাল সকাল সবাই রওনা দিল। শীতের দিন, কুয়াশায় সামনে থেকে আসা বাস, তাদের ড্রাইভার বেচারার চোখেই পড়েনি। লাগল এক ধাক্কা। সেই এক ধাক্কয়ই মাইক্রো উল্টে গেল।
না, কারো তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে ভয়ে সবাই আধমরা। তার এতো তেজি মা, সেও হতভম্ব হয়ে আছে। সেই ভয়, হতভম্বের মাঝেই, ভাঙা জানালা দিয়ে সে দিব্যি মুচড়ে মাচড়ে বেরোল। বেরিয়ে সেই জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে তার স্বভাব মতো শান্ত ভাবে বলল, - ড্রাইভারের মাথা ফেটেছে। এই নোভা, দেখ তো, কারো মোবাইল পাওয়া যায় কি না। অ্যাম্বুলেন্স ফোন করতে হবে।
নানু মারা গেলেন বছর দুই এক আগে, রাতে। সকাল হওয়ার আগে তো আর দাফন করা যাবে না। তারা সবাই খবর শুনেই দৌড়ে গেল। রাতে লাশ আর বাইরে বের করা হলো না। তবে পাটি বিছিয়ে নিচে রাখা হলো। সেই রাখার মাঝেই কারেন্ট চলে গেল।
মরা বাড়ি, লাইট কোথায়, মোবাইল কোথায়? পুরো বাড়িতে হুলস্থুল লেগে গেল। সেই লাগার মাঝেই ভয়ে সবাই লাশের ঘর থেকে এক ফাঁকে বেরিয়েও গেল। তবে লাইট জ্বালাতেই দেখল, আপা আগের মতোই বসে, নানুর হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।
আপার বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে সবকিছুই ছিল এই নানু আর নানুবাড়ি। তবুও মৃত্যু সব মানুষকেই ভয়ংকর করে তোলে। করে বলেই একদিকে নিঃশ্বাস বের হয়, আরেকদিকে ভয়ের রাজত্ব শুরু হয়। সেটা মহব্বতের স্বামী-স্ত্রী হোক, বাবা-মা হোক, কিংবা প্রিয় কেউ। একটা অজানা ভয় ঠিক কাবু করে ফেলে। তবে তার আপার সেই কাবুও নেই।
কেন নেই? সেটাই একবার নোভা মাকে জিজ্ঞেস করল। মা রেগেমেগে আগুন হয়ে তিন কেজির এক থাপ্পড় তার গালে বসিয়ে বলল,-- কোন দিক দিয়ে তোর অস্বাভাবিক মনে হয়? ছোটবেলা থেকে তোরা একসাথে বড় হয়েছিস? তুই দেখেছিস ও কেমন? 
থাপ্পড় খেয়ে নোভা তখন চোখে হলুদ হলুদ সরিষা ফুল দেখছে। মাথার উপর দিয়ে চড়ুই পাখি ঘুরে ঘুরে কিচিরমিচির করছে। তাই ধরেই নিয়েছে, আসলে আপা ঠিক, সে নিজেই বেঠিক।
যাই হোক, মেয়ে বড় হচ্ছে, বয়স তো আর কম নয়। তাই মা বাবা বিয়ের চেষ্টা করছে। করাই স্বাভাবিক, সারা জীবন তো আর এভাবে বসিয়ে রাখবেন না। তবে কোনো কারণে বিয়ে হচ্ছে না। এমন না যে মায়ের মতো কালো বলে কেউ পছন্দ করছে না। বরং গায়ের রং শ্যামলা হলেও, তার আপার বড়ই মিষ্টি একটা মুখ। যেই মুখখানির দিকে তাকালে, চট করেই মায়ার এক ঘোর লেগে যায়।
তাই পছন্দ করে এক দেখায়। একবার তো দিন তারিখও পড়ে গিয়েছিল। তবে কোনো কারণে সেই বিয়েগুলো আর হয় না। তারা অতি কৌশলে, ইনিয়ে বিনিয়ে সুন্দর করে ফোনে নিষেধ জানিয়ে দেয়।
দিক, বিয়ে তো আর চাট্টিখানি কথা না। ব্যাটে বলে সব মিলবে, উপরওয়ালা উপর থেকে ঘণ্টা বাজাবেন, তবেই ঘটনা ঘটবে। এটা অবশ্য তার বাণী না, আসমানি খালার বাণী। তবে মায়ের জন্য অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে। তিনি এমনভাবে শোক শুরু করেন, যেন মরা বাড়ি।
সেই মরা বাড়ির নীরবতা ভেঙে নোভা মায়ের রুমের দিকে এগোল। গায়ে তার নাইটসুট, মুখে ফেসিয়াল মাস্ক। সে সবসময় চেষ্টা করে টেনশন ফ্রি থাকতে, তবে এমন এক বাড়িতে পয়দা হয়েছে। যেখানে টেনশনের মালা গেঁথে গলায় ঝুলিয়ে বসে থাকতে হয়। একতো গায়ের রং শ্যামলা, তার মধ্যে ঊনিশ-বিশ হলেই পাহাড় সাইজের একেকটা পিম্পল উঁকি মারা শুরু করে । তাই যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না।
সেই যন্ত্রণা থেকেই সে, খেয়ে দেয়ে আরামছে বাবাকে ফোন দিল। ভিডিও কল, হোয়াটসঅ্যাপে। ফোন দেওয়ার দুটো কারণ - এক.বাবার অবস্থা জানা, দুই. আরেক আপদ যে ঘাড়ের উপর এসে বসেছে, সে সম্পর্কে বলা।
কিন্তু বাবা ধরল না। নোভার তো সন্দেহ চান্দিফুঁড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়! ফোন ধরবে না কেন? কোন বন্ধুদের সাথে সে, যে মেয়ের ফোনও ধরা যায় না। 
তাই সে তাড়াতাড়ি আবার ফোন দিল। এবার অবশ্য রিসিভ হলো। আর হতেই এক ঝটকা খেলো। ফোন রিসিভ করেছে খালিদ ভাই! ফোনের ওয়ালে গোঁফ, দাড়িওয়ালা বিশাল মুখটা নিয়ে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে। 
নোভা হতভম্ব হয়ে নিজেও হা করে তাকিয়ে রইল। তার মুখে মাস্ক, চুল চান্দির উপর কাটা দিয়ে উঠানো, আর সবচেয়ে বড় কথা, গায়ে নাইটসুট। হচ্ছে কি রে ভাই! 
খালিদ সব সময়ের মতো মোমের মতো গলে, ব্যাক ক্যামেরা বাবার দিকে নিয়ে বলল,-- চাচা ঘুমিয়ে পড়েছে।
নোভার হতভম্ব কাটতে লাগল মিনি সেকেন্ড। এই ভন্ডের গলে যাওয়ার দেখে মরা মানুষও লাফিয়ে উঠবে। বিশাল মুখের, বিশাল সাইজের মানুষ। এমন ভাবে গলে যাওয়া দেখলে কে ঠিক থাকে। অথচ এলাকা তার ভয়ে কাঁপে। 
তাই নিজের মতো বলল, - ঘুমিয়েছে তো কী হয়েছে? তাই বলে আপনি, কারো ব্যক্তিগত ফোন ধরবেন?
সে আরও গলে গেল। খালিদ ভাই তাদের সাত নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের ভাতিজা। ভাতিজার চেয়ে ডান হাত বেশি। ভয়ংকর লোক। আর এই ভয়ংকর লোকই কোনো কারণে তাদের দেখলেই গলে যায়। এই যে তাদের ভূতনি আপা নাবিলা, তাকে দেখলেই চোখ নামিয়ে নেয়।
আগে অবশ্য এমন ছিল না। বরং তাদের সঙ্গে ছিল চুলাচুলির সম্পর্ক। মা গোনায় ধরে কাকে? তাই তৃতীয় বাড়িটা করার সময় ছেলেপেলে লেলিয়ে ভেজাল লাগিয়ে দিল। তারা চা পানির খরচ না দিলে বাড়ি তুলতে দেবে না। আর এদের চা পানি ভাই লাখ টাকায়ও কুলোয় না। 
মা তো মা'ই। সেও দেবে না। এই নিয়ে দুনিয়ার গণ্ডগোল। তারা ভয়ে কলেজ তো ভালোই, ঘর থেকেই বেরোতে পারে না। বাবা দোকান খুলতে পারে না। সেই না খোলার মাঝেই একদিন আপা বের হলো। তাকে নিয়ে সোজা পার্টি অফিসে গেল। তাকে গাড়ি থেকে নামতে দিল না। একা নিজেই ভেতরে গেল। গিয়ে কী গুটুরগু করল কে জানে! সেই দিন থেকেই সব ঠান্ডা। ঠান্ডা মানে একেবারে ঠান্ডা। ঠান্ডা তো ভালো, সেই দিনের পর থেকেই শুরু হলো এই দানব বাবার মোমের মতো গলে যাওয়া, বাবা মাকে আসতে যেতে সালাম দেওয়া, হাসি মুখে কুশল জিজ্ঞেস করা। মা ফিরেও তাকায় না, তবে বাবার সাথে খুব ভাব হয়ে গেল। তাদের বাড়ির সবকিছুতে সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়া শুরু হলো। নাবিলের সাথে গলাগলি হলো।
নোভার তো এটাই মাথায় আসে না, আসলে কাহিনি কী? আপার বেড়ে উঠা নানু বাড়িতে। এখানে আসেইনি। তো তাদের এলাকার এই রকম মানুষের সাথে তার কাজ কী?
এই কথাও সে সাদা মনে মাকে জানালো। মাও তার মতো, সেই একই সাইজের আরেকটা থাপ্পড় তার গালে ফেলল। ফেলে বলল, -- সবকিছুতে তোর এত মাথাব্যথা কেন? ফাজিলের ফাজিল! নিজের বড় বোনকে নিয়ে হাবিজাবি চিন্তা। চিপে মাথার ঘিলু বের করে ফেলব।
তার মাথার ঘিলু মাথায় থাক। তাই এই ছোট্ট জীবনে আর আপাকে নিয়ে মাথা ঘামায়নি। যা খুশি করুক।
তাই সে আগের মতোই বলল,-- আপনি আমার বাবার সাথে কী করছেন?
খালিদ ভাই ক্যামেরা আর সামনে আনলেন না। তখনো বাবার দিকে রাখা। বাবা লুঙ্গি পরে, পা ছড়িয়ে, নাক ডেকে ডেকে আরাম করে ঘুমাচ্ছে। অচেনা কোন বাড়ি। হয়ত তাদের এক রুমে থাকতে দিয়েছে। 
নোভা মনে মনে মুখ বাঁকালো। যে না চেহারা, তার নাম আবার পেয়ারা! এই জামানায় এসে রাখে ডাকাতের মতো গোঁফ! আবার ঢং! নোভা এই ঢং দেখার জন্য তো মরে যাচ্ছে।
-- এক কাজে এদিকে আসব। পার্টি অফিস থেকে বের হতেই চাচার সাথে দেখা। ধরে বেঁধে গাড়িতে তুলে নিলেন।
-- কেউ তুলতে চাইলেই যেতে হবে? গাড়ি ভাড়া বাঁচানোর ধান্দা। তাছাড়া কাজে এসেছেন, এখনো চিপকে আছেন কেন? নাকি বাবা এখনো ধরে বেঁধে রেখেছে?
আসলে নাবিলার বাবা বলতে গেলে খালিদকে সত্যিই ধরে বেঁধে রেখেছে, খালিদ নিষেধ করতে পারেনি। তবে আগের মতোই বলল, -- না, এমন কিছু না। ভাবলাম কাজটাজ তেমন নেই, চাচার সাথেই ফিরি।
-- জানি তো! সবার জাত চেনা। এখন বাবার কাছে দিন।
-- ঘুমিয়ে আছেন।
-- তো? কোন আইনে লেখা আছে, ঘুমালে জাগানো যাবে না? আর আমার বাবা, আমি জাগাবো না ঘুম পাড়িয়ে রাখব তাতে আপনার কি?
খালিদ ভাই আর কথা বাড়ায়নি। বাবাকে ঘুম থেকে আস্তে করে ডেকে তুলেছে। ঘুম থেকে উঠতেই, সে বাড়িতে আসা আপদের কথা বলল। আর বলতেই খেল আরেক ঝটকা। বড় চাচার আসল নাম নাকি আসাদুজ্জামান! দেখো কান্ড! মানুষের নাম হবে নাম, আসল নকল আবার কী রে ভাই। 
বাবা শুনেই ঘুমঘুম চোখে বলল, -- ছেলেটার নাম কি?
নোভা ঢোক গিলল। এই বান্দাকে নিয়েই তো করে রেখেছে আরেক কাহিনি! পান খাইয়ে, আপার যে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে, তা আপার চোখমুখ দেখেই বুঝেছে। বুঝে রুম থেকে বেরিয়ে খালাকে দিল এক ঝাড়ি। এসেছে মহাঔষধের পানওয়ালা। ঝাড়ি মেরে সোজা এলো নিচে। মোড়ে এক ফার্মেসির দোকান আছে। দুপুরে খোলা থাকে না, তবুও বেরোল। যদি কিছু একটা করা যায়।
আর বেরুতেই এক ভ্যান এসে হাজির। ভ্যানে এই বান্দা পা ঝুলিয়ে বসে আসছে। পায়ে কালো কেডস, কালো জিন্স, গায়ে কালো টি-শার্ট। সেই টি-শার্টের উপর ধূসর রঙের শার্ট, বুক খোলা, হাতা গুটানো। মুখে মাস্ক, চোখে সানগ্লাস।
নোভা দেখে হা করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। এমন চিজ এই গলিতে এলো কোথা থেকে? তার মাথায়ই তো কুলালো না। তাও আবার ভ্যানে! রিকশা, অটো, সিএনজির যুগে ভ্যানে চড়ে আসারও মানুষ এই যুগে আছে, তার তো ধারণাও ছিল না।
তার তাকানোর মাঝেই লোকটা বলল, -- হ্যালো ম্যাডাম, একটু সাহায্য করতে পারবেন?
নোভার এক ইঞ্চি হা করা মুখ, দু'ইঞ্চি হয়ে গেল। বলে কী রে, পচা পুকুরের মাথামোটা টাকি মাছ। কোন অ্যাঙ্গেল দিয়ে তাকে ম্যাডাম মনে হয়? সবে মাত্র ভার্সিটিতে পা রাখল। পিচ্চি পাচ্ছি খুকি বলবে, তা না। ডাইরেক্ট ম্যাডাম? এতটাই বুঝি বুড়ি মনে হয়! 
-- আসাদুজ্জামানের বাড়ি কোনটা বলতে পারেন?
-- জি না, পারি না।
 -- ওহ!
তখনই কোন শয়তান মাথায় নাড়া দিল কে জানে, একটু হেসে আবার বলল,-- আমাদের গলির পরে আরও দুটো গলি আছে। তারপরের গলিতে এই নামের একজন আছে। আপনি চাইলে খোঁজ নিতে পারেন। অবশ্য আমি জানি না, আপনি যাকে খুঁজছেন সে কি না। 
-- অসংখ্য ধন্যবাদ, আপু। আমি দেখছি। 
-- আপু, শুনে নোভার মন আরও ভেঙে গেল। সেই ভাঙা মন নিয়ে গিয়ে দেখে, ঔষধের দোকান বন্ধ। থাকারই কথা। ভেবেছিল, কাউকে পাঠিয়ে খোলার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু মনের দুঃখে ফিরে এলো। আহারে, বয়সের আগেই চাচি, খালাম্মা হয়ে যাচ্ছে। ভাবা যায়!
তবে ঘরে এসে বসতেও পারেনি। আসমানি খালার কাছে শুনল, কে যেন নিচে এসে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ি ওয়ালাদের খুঁজছে। যত জ্বালা তো তার। তাই ভারী মন নিয়েই আবার নিচে গেল। গিয়ে দেখে, সেই ভ্যানওয়ালা। তবে, এখন আর চোখে সানগ্লাস, মুখে মাস্ক কিছুই নেই। আর নেই বলেই নোভা ধাক্কা খেল। এই ছেলের তো রূপের বাহার! যেমন নাক-মুখ, তেমনি গায়ের রং। ফিল্মের নায়ক টায়ক নাকি?
নোভা হা করেই এগিয়ে গিয়ে বলল, -- ব্যাপার কী?
লোকটাও আগের মতো বলল, -- আপনার একটু ভুল হয়েছে। সেখানে এই নামের কেউ নেই। বরং এটাই আসাদুজ্জামানের বাড়ি। 
-- একদম না।
-- আমাকে তো এই ঠিকানাই বলা হয়েছে। এই যে দেখুন। এই ঠিকানা আমাকে দেওয়া হয়েছে। 
নোভা মোবাইলের মেসেজ দেখল। মা নামের কেউ সেন্ড করেছে। দেখে বলল,-- কেউ বললেই তো আর হয়ে যাবে না। এটা আমার বাবার বাড়ি।
-- আপনার বাবাকে একটু আসতে বলুন। প্লিজ! 
-- তিনি বাসায় নেই।
-- তাহলে মাকে বলুন।
-- মাও নেই।
-- তাহলে যে আছে, তাকে বলুন।
-- সেটা আমি নিজেই।
লোকটা হাল ছেড়ে বলল, -- আপনি ছাড়া আর কেউ কি নেই?
-- আছে, আসমানি খালা। তিনি আমাদের কাজের লোক। আর আছে আপা। তার দাঁতের ব্যথা, কই মাছের মতো কাতরাচ্ছে।
-- কেন?
-- ওষুধ নেই তাই।
লোকটা চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর হেসে ফেলল। হাসি দেখে নোভার মাথা ঘুরে গেল। এত সুন্দরও বুঝি কারো হাসি হয়? 
তারপর ব্যাগ থেকে ওষুধ বের করে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-- এটা খেতে বলুন। আশা করি ব্যথা কমে যাবে।
-- আপনি ডাক্তার?
-- না।
-- তাহলে রিস্ক নিতে পারছি না। আপনার আগে একজন মহাঔষধ দিল, খেয়ে ব্যথার সাথে মাথা ঘুরানি শুরু হয়ে গেছে। 
-- কিসের মহাঔষধ? 
-- পান। 
লোকটা আবারো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর আরেকটা ওষুধ বের করে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, -- আমি এখানেই আছি, কারো সাথে কথা না বলে আমি যাচ্ছি না। তাই নিশ্চিন্তে খাইয়ে দিতে পারেন। যদি কিছু হয়। শাস্তি তোলা রইল। 
নোভা ঔষধ নিয়ে চলে এসেছে। এসে আপার কাছে গেছে। ঔষধ দিয়ে, সব বলল। সব সময়ের মতো আপার হেলদোল নেই। তাই আপার রুম থেকে এসে আবার আসমানি খালাকে পাঠালো। খালা তো তার চেয়েও দু'ডিগ্রি উপরে। সোজা গ্যারেজের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছে। না থাকবে বাঁশ, না বাজবে বাঁশি। 
বাবা ঘুম ঘুম চোখে বিরক্ত মুখে বলল, -- কী হলো, কথা বলছিস কেন?
-- নাম জানি না, বাবা।
-- তোরা যা করিস না। একটা মানুষ এসেছে, নাম ঠিকানা অন্তত জিজ্ঞেস করবি না? 
নোভা মুখ ভোঁতা করল। তার বাবার মেয়েরা আবার প্রিয়। তাই ভোঁতা মুখ দেখে বলল, -- আচ্ছা, এতো চিন্তার কিছু নাই। মনে হয় ভাইয়ের পরিচিত। আমি ভাইকে জানাচ্ছি। আর ধুলোবালির মধ্যে গ্যারেজে বসিয়েছিস কেন? ভেতরে নিয়ে আয়।
সেই ভেতরে আনার জন্যই রুম থেকে বিরক্ত মুখে বেরিয়ে এলো। এতো টেনশন আর নেওয়া যাচ্ছে না। এতো টেনশনে বয়সের আগেই বুড়ি হয়ে যাচ্ছে। জানু, মানু, ডাকার বয়সে আপু, ম্যাডাম শুনতে হচ্ছে। ধুর! বলেই এগুলো। বাড়িতে ঢোকার আগে মাকে জানানো দরকার। পরে কিছু হলে, মন্দিরের ঘণ্টার মতো তাকে বাজাবে। তাই মায়ের রুমের দিকে যেতে গিয়েও সে থমকে দাঁড়াল।
আপার ঘুম কখন ভেঙেছে সে জানে না। রুম থেকে বেরিয়েছে কখন খেয়ালই করেনি। তবে আবাক হয়ে দেখল, ড্রয়িংরুমে মনিটরের সামনে তার আপা পড়ে আছে। জ্ঞান নেই। দাঁতে দাঁত লেগে মনে হয় জিভও কেটেছে। গাল মুখ রক্তে মাখামাখি।
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন