#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_০৫
আসাদুজ্জামান যখন কাজী পাড়ায় এসে পৌঁছালেন, তখন সবে মাত্র ভোরের আলো ফুটছে, কোমল নরম স্নিগ্ধ বাতাস, খরখরে শহরের বুকে আদর মেখে জড়িয়ে আছে। সেই আদর মাখা স্নিগ্ধ বাতাসেও কপালে তার বিন্দু বিন্দু ঘাম, গায়ে জড়ানো সাদা কালো চেক শার্টটা ঘামে লেপটে আছে। দেখে বিন্দুমাত্র ও বোঝার উপায় নেই, রিজার্ভ গাড়িতে এসেছে। বরং লাগছে কত শত মাইল, এক রাশ ক্লান্তি নিয়ে দৌড়ে এসেছে।
কিছুক্ষণ আগেই ফজরের আযান পড়েছে। তাই এলাকায় পা রেখেই আগে মসজিদে নামাজের জামাআতে যোগ দিলেন। সবাই নামাজ পড়ে বেরিয়ে গেলেও অনেকক্ষণ সেখানেই চুপচাপ বসে রইলেন।
রাতে রোকেয়া ফোন করে সবই জানালো। জানানো’র পর তিনি অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারেন নি। স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন। এতদিন পর তার ছেলে, তার সাথে দেখা করতে এসেছে। আসতেই পারে, বড় হয়েছে, নিজের মর্জির মালিক হয়েছে। খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তবুও তার ভেতর কাঁপছে।
তিনি তো কখনো এমন ছিলেন না। সাহসী, উদ্যম, শক্ত মনোবল, বাস্তবতাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার সবরকম ক্ষমতা সব সময়ই ছিল তার। তবে বয়সের সাথে সাথে হয়তো সব ক্ষমতাই এক সময় ফিকে হয়ে যায়, ম্লান হয়ে যায় সব বাস্তবিক জ্ঞান।
আফসানার সাথে বিয়ে হয় তার পুরোপুরি পারিবারিকভাবে। বিয়ে নিয়ে আলাদা কোনো ভাবনা তার ছিল না। মায়ের উপরে ছেড়েছে, মা'ই তার পছন্দ মতো সব করেছে।
আফসানা তখনও পড়ছিল। দেখতে যেমন ছিল সুন্দর, মার্জিত, তেমনি ছিল গোছানো। কোনো কিছুতেই তাকে হেলা করার সুযোগ নেই। মধ্যবিত্ত পরিবারের হাসিখুশি মেয়ে। যার স্বপ্ন আছে, ভালোবাসার অসীম ক্ষমতা আছে, আছে সব কিছুতে মুগ্ধ হওয়ার বিশাল আয়োজন।
সেই আয়োজনে সে কখনো সামিল হতে পারে নি। প্রথম প্রথম অভিযোগ, তারপর মান-অভিমান, তারপর সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ মানিয়ে নেওয়া। আর এই মানিয়ে নিতে নিতেই হয়তো সে হয়েছিল ক্লান্ত। সেই ক্লান্তি থেকেই, সুন্দর করে তার কাছ থেকে মুক্তি চেয়েছিল।
তিনি তখন চাইলেই এই ক্লান্তি ভালোবাসায় মুড়িয়ে দূর করতে পারতেন। তবে তখন তো আর এখনের মতো সব ফিকে হয়নি, তাই মুক্তি দিয়েছিলো অনায়াসে। দেখাতে চেয়েছিলো, " যাও, গিয়ে দেখো, জীবন কখনো আবেগে চলে না, চলে বাস্তবতায়।
আফসানা বুঝেছিল কি না, জানে না। তবে তিনি ঠিকই বুঝেছেন। বাস্তবতা দিয়ে জীবন চললেও, সেই চলায় ভালো তো থাকা যায়, তবে শান্তি থাকে না, তৃপ্তি থাকে না, থাকে না আনন্দ। ভালো থাকতে হলে বাস্তবতার সাথে আবেগের সাত রঙ থাকতে হয়। সেই সাত রঙে হাজার বার রঙিন হতে হয়।
আসাদুজ্জামান মসজিদ থেকে বাড়ি ফিরলেন ধীরে ধীরে। কাজী পাড়ার তিন নাম্বার গলির একেবারে শুরুতেই মসজিদ। সেই মসজিদ থেকে বাড়ি ফিরতে সময় লাগে বড়জোড় সাত আট মিনিট। আর আজ লাগল বেশ কিছু সময়। সেই বেশ কিছু সময়ও গেল একপ্রকার ঘোরের মাঝে। সেই ঘোরের মাঝেই আস্তে করে কলিংবেল চাপলেন।
দরজা কে খুলবে, তিনি জানেন। এই বাড়িতে এতো সকালে একজনই জেগে থাকে, সে নাবিলা। মাঝে মাঝে শেষ রাতে একটু ঘুমায়, মাঝে মাঝে একেবারেই না। মেয়েটার কিছু একটা ঠিক নেই। কী নেই, তিনি জানেন না। এক বাড়িতে থাকলেও, রোকেয়ার কিছু কিছু বিষয় একেবারেই নিজের। আর সেই বিষয়ে মাঝে নাবিলা সবার আগে।
তবে এইটুকু তিনি জানেন, নাবিল আর নোভার জন্মের সময় রোকেয়ার অবস্থা খুব নাজুক ছিল। টুইন বেবির সাথে টিউমারের সমস্যা ছিল। সি সেকশন হয়েছিল, সেই সাথে শেষ হয়েছিল তার মা হওয়ার সব ক্ষমতা।
এখানে দেখে রাখা, বা করার মতো কেউ নেই, তার মধ্যে নাবিলার নানির তখন ছেলে, ছেলের বউ, নাতি- নাতনিদের নিয়ে ভরা সংসার। এখানে এসে মেয়ের পাশে থাকবেন, সেটাও সম্ভব ছিল না।
তাই মেয়ে, নাতনিসহ সোজা নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। একমাত্র মেয়ে তার, এমনি এমনি তো আর বসে থাকতে পারেন না।
তবে ঘর সংসার, নাজিম তো নাজিমই। সে কবেই এই জগৎ সংসারের নিয়মে চলেছে। সে চলে তার মতো। কতদিন আর বাপের বাড়ি পড়ে থাকবে! তার মধ্যে তিন সন্তানের দায়িত্ব। তাই বাধ্য হয়েই কিছুদিনের জন্য নাবিলাকে সেখানে রেখে আসে।
নাবিলার তখন বয়স চার পাঁচ বছর হবে। আর এই বয়সে হঠাৎ করে বাবা মা ছাড়া সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ কথা না। তার মধ্যে নাবিলা যেমন মায়ের কলিজা, তেমনি মা ছিল তার পুরো দুনিয়া।
এই দুনিয়া ছাড়া থাকা, এই ছোট্ট মেয়ের জন্য চাট্টি খানি কথা না। তবে তার নানি বুঝিয়ে শুনিয়ে অনেক কষ্টে সেই দুনিয়ায় বাঁধন কেটেছিলেন।
রোকেয়া ভেবেছিল, নিজে একটু সুস্থ হোক, নোভা আর নাবিলা একটু ঝরঝরে হোক, তারপরই নিয়ে আসবে। তবে সেই আসা আর হয়ে উঠেনি।
না, রোকেয়া নাজিম চায়নি। তারা বছর ঘুরতেই ঘরের মেয়ে ঘরে ফেরাতে চেয়েছিল। তবে জেদি নাবিলাকে ফেরানো যায়নি। তার একটাই কথা ছিল, নানুর কাছেই থাকবে। নানুরও তখন জান নাবিলা। সেও ছাড়তে চায়নি।
প্রথম প্রথম কেউ ওতো মাথাই ঘামায়নি। ভেবেছিল, থাকতে চাইছে, থাকুক! একটু বুঝ হলেই নিয়ে আসা যাবে। নিজের বাড়ি ঘর ছেড়ে আর কতদিন থাকবে।
তবে সেই বুঝ নাবিলার কখনো আসেনি, হয়তো ইচ্ছে করেই আনেনি। বাবা, মায়ের উপর তখন তার গাঢ় অভিমান। সেই অভিমানে পাহাড় এতোটাই শক্ত করেছিল যে, ঈদ গেছে, জন্মদিন গেছে, আরো গেছে কত কত অনুষ্ঠান। তবুও সে একদিনের জন্যও এই বাড়িতে পা রাখেনি।
আর যখন রেখেছে, আসাদুজ্জামানের কাছে স্বাভাবিক লাগেনি। তবে কখনো আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেসও করে নি। আজও করে না। কেন মেয়েটাকে নিয়ে হাজার কথা হয়, কেন মেয়েটার বিয়ে বারবার ভাঙে, কেন মেয়েটা আর পাঁচ-দশটা মেয়ের মতো স্বপ্ন বুনে না, কেন খালিদের মতো ছেলে বয়সে বড় হওয়া সত্ত্বেও আস্তে করে চোখ নামিয়ে নেয়। কেন, লেখাপড়ার মাঝা মাঝি সময়ে, হঠাৎ করেই এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল।
প্রথম প্রথম অবশ্য খুব জানতে ইচ্ছে করত। এখন আর করে না। সব কিছু জানতে নেই। তবে মেয়েটা যখন রাতে আস্তে করে এসে গায়ে কাঁথা টানে, বাতি নেভায়, তার গায়ের চাদর, জুতো, চশমা, অগোছালো ঘর গুছিয়ে রাখে। তখন ডেকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, -- তোর কিসের কষ্ট, বল তো মা? তোর এই বড় চাচা সব ঠিক করে দেবে।
তবে বলা হয় না। এত আবেগ তিনি দেখাতে পারেন না। পারে না বলেই, আজ তার সব থেকেও কেউ নেই। এই যে এত এত মানুষ। এই মানুষের মাঝে একেবারে নিঃসঙ্গতার চাদরে মোড়ানো একেবারে নিঃস একটা মানুষ সে।
সেই নিঃসঙ্গতার চাদর জড়িয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়েই দরজার সামনে দাঁড়াল। কলিংবেল দিতে দেরি , তবে নাবিলার দরজা খুলতে দেরি হলো না।
তিনি দেখে হালকা হাসলেন। হেসে ভেতরে এলেন। সব সময়ের মতো কিছুই বললেন না। নিজের মতো রুমে চলে এলেন। এসে আগের মতোই চুপচাপ বসে রইলেন।
নাবিলা এলো তার কিছুক্ষণ পরেই। হাতে তার বরফকুচি মেশানো শরবতের গ্লাস। বড় চাচা চা কফি কম খান, তবে লেবু চিপে এই বরফের হালকা মিষ্টির শরবত। এটা তার ভীষণ পছন্দের। সেই পছন্দের জিনিসটাই নিশ্চুপ পাশে রাখলো।
নাবিলার চোখ মুখ শান্ত। শান্ত হলেও তার অবস্থা খারাপ। দাঁতের ব্যথা আবার শুরু হয়েছে। সেই দুপুরে ঔষুধ খেয়েছিল, সেই ঔষধের কাজ হয়তো শেষ। শেষ হতেই আবার ব্যথার জায়গায় ব্যথা ফিরে এসেছে। তাই আর দাঁড়াল না। শরবতের গ্লাস রেখেই চলে এলো। এসে আগের মতো খাটে শুয়ে পড়ল। জীবনের জ্বালা একদিকে, এই দাঁতের যন্ত্রণা আরেক দিকে।
সেই পড়া থেকে উঠল একেবারে নাবিলের ডাকে। উঠেই আর ডানে বামে কথা নেই। তার এক কথা, এখনই ডাক্তারের কাছে যাবে।
নাবিলা আর কথা বাড়ায়নি। চুপচাপ রেডি হয়ে বেরিয়ে এসেছে। সেই আসার সময় আবার বড় চাচার রুমের দিকে তাকাল। এখনো আগের মতোই দরজা খোলা। সেই খোলা দরজার ভেতর চুপচাপ বসে আছেন তিনি।
এত বছর পর ছেলের মুখোমুখি হওয়া সহজ কথা না। যত বাস্তববাদী মানুষই হোক না কেন? জীবন সব সময় বাস্তবতায় চলে না। এই যে বুকের বা পাশে হৃদয়। এই হৃদয় চলে সম্পূর্ণ তার নীতিতে। আর এই নীতির কাছে, দুনিয়া সব যুক্তি ঘায়েল। অবশ্য তার ছেলেও এখনো ঘুম থেকে উঠেনি। মা সকালে আসমানী খালাকে ডাকতে বলেছিল, তবে চাচা শুনে শান্তভাবে বলেছেন,-- এত দূর থেকে এসেছে, ঘুমাক! ডেকে তোলার প্রয়োজন নেই।
এর পর আর কেউ মাথা ঘামায়নি। বড় চাচার ছেলে নিজের মতো ঘুমাচ্ছে, বাবা এখনো ফেরেনি। মা আছে, মায়ের মাথা ব্যথা নিয়ে। কী করে মেয়ের একটা গতি করবেন। নোভা উঠেই ভার্সিটিতে দৌড়। লেখা পড়া করুক আর না করুক, সেজেগুজে প্রতিদিন তার যাওয়া চাই, চাই। নাবিল অবশ্য ক্লাস করে কম, তার আড্ডা বেশি। আড্ডা বেশি হলেও, এই ছেলে পড়া লেখায় ভালো। রেজাল্ট নোভার চেয়ে হাজার গুণ ভালো। ভালো হলেও আজ পেয়েছে সুযোগ, তাই ভাসির্টিতে যাওয়ার আর কোন নেই তালবাহানা ।
আর এই এত এত কাহিনির মাঝে চাচা এখনো আগের জায়গায় থমকে আছেন। নাবিলা দেখে নাবিলকে বাইক বের করতে বলে, বড় চাচার রুমের দিকে এগিয়ে গেল। গিয়ে পর্দা টানলো, জানালা খুলল। সেই সকালের পানসে শরবতটা হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, -- এত সংকোচ, জড়তার প্রয়োজন নেই তো! সে তোমার ছেলে। হাজার দূরে থাক, হাজার চোখের আড়ালে থাক। দেখেই সোজা জড়িয়ে ধরবে। ধরলেই এই যে আমাদের বুকের বা পাশের হৃদয়। এমনিতেই মিলে যাবে। আর এই অনুভূতির মিলনে কোনো শব্দের প্রয়োজন নেই। উঁহুম, একদম নেই।
......
ঘড়ির কাঁটা তখন দুপুর বারোটার ঘরে। অপূর্ব তার ঘাড়ছোঁয়া ভেজা চুলগুলো পেছনে স্লাইড করতে করতে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। গা খালি, নিচে ফিটিং হয়ে থাকা অফহোয়াইট সুইট প্যান্ট। বিন্দু বিন্দু পানি এখনো পিঠ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
তার হাজারো বদ অভ্যাসের মাঝে এটাও অনায়াসে সামিল হয়ে আছে। গোসল করে তোয়ালে নিচে পেঁচানো ছাড়া, আর তেমন কোনো কাজে লাগায় না। এমনিই কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ায়। তাড়াহুড়ো থাকলে, এই ভেজা শরীরেই টি-শার্ট, প্যান্ট জড়িয়ে বেরিয়ে যায়।
তখন ভেজা কপাল ছোঁয়া চুলগুলো মাথায় এলোমেলো হয়ে দুলতে থাকে। প্যান্ট, টি-শার্ট থাকে ছোপ ছোপ ভেজা হয়ে। সেই ভেজা কাপড় নিয়েই দুনিয়া অনায়াসেই ঘুরে বেড়াতে পারে। লাজ-লজ্জা, সংকোচ, জড়তা তার মধ্যে কম বলাই চলে। ছোটবেলায় ছিল, তবে বড় হতে হতে সবই গায়েব হয়ে গেছে।
আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং সেই ছোপ ছোপ ভেজা প্যান্ট নিয়েই বারান্দার গ্রিলের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল।
ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘরে হলেও, দুপুরের কড়া রোদ নেই। আকাশ মেঘলা। শরৎ, হেমন্তে এমন হুটহাট আকাশের মুড চেঞ্জ হয়। তবে নিয়মের বাইরে গিয়ে মৃদু বাতাস বইছে। এমন মিঠে মিঠে বাতাস হয় বসন্তকালে। এমন সিজনেও হয় কি না, অপূর্ব ঠিক তালগোল মেলাতে পারে না।
না পারাই স্বাভাবিক, একতো এক দেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেক দেশ। তাছাড়া সিজন তার রূপ প্রতিনিয়ত বদলায়, যেমন বদলায় মানুষ।
অবশ্য সময়ে সাথে পরিবর্তন হওয়াই স্বাভাবিক। বরং যারা না বদলায়, তারাই আটকে যায়, পেছনে পরে যায় দুনিয়ার রঙ বদল।
এই যে যেমন বদলেছে সে। ছোটবেলা থেকে ছিল ননীর পুতুল টাইপের। মায়ের আদরের দুলাল। সেই দুলাল মায়ের আঁচল ছেড়ে একা একা পথ চলার জার্নি চলছে তো চলছে। অবশ্য এই চলার সময় ফুরিয়ে এসেছে। তার মা আদরের দুলালকে আবার আঁচলে বাঁধতে চাইছেন। তবে এবার নিজের না, অন্যের।
তাই অপূর্ব শেষ ইচ্ছে হিসেবে, কিছুদিন ঘুরবে ফিরবে। তবে তার সমস্যা হলো, কোন জায়গায় যাওয়ার পর পেছনের কারো সাথে যোগাযোগ রাখে না। যেই কয়দিন ঘুরবে, সব যোগাযোগ বন্ধ।
তাই এবারও তার বাইরে যাওয়ার কথা ছিল না। তবে কাল এতো খোঁজাখুঁজি করেও যখন বাড়ি পাচ্ছিল না, তখন মাকে ফোন দেয়। মা শুনে কিছুসময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
সে সব সময় চাইত, এই পেছনের জীবনের কারো সাথে তার যোগাযোগ না থাকুক। অবশ্য সে ভাবে কখনো নিষেধ করেনি। তবে বাবার সাথে যখন পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করল। তখন তার নাজুক হাত দুটো ধরে বলেছিল, -- এই পৃথিবীতে একেক মানুষ, একেক রকম। আমি এক রকম, তোমার বাবা আরেকরকম। স্বাভাবিক, পৃথিবীতে কেউ কারো মতো হবে না। তবে ভালো মানুষের গুণ কি জানো? তারা তাদের প্রিয় মানুষের জন্য সব করতে পারে। হাজার কষ্টের মাঝেও, মুখে হাসি ফোটাতে পারে। হাজার কাজের মাঝেও পাশে থাকতে পারে, ভরসা দিতে পারে। তবে তোমার বাবার এই গুণ নেই। সে সব কাজে দক্ষ, নিপুণ। তবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড়ই আনাড়ী।
আর সেই বাবার রক্ত তোমার শরীরে। এই দুনিয়ায় সব খন্ডানো যায়, তবে রক্ত না। কিন্ত রক্তে চেয়েও আরেকটা জিনিস বড়। সেটা কি জানো? সেটা ভালোবাসা, যত্ন। যেই ভালোবাসায় যত্নে রক্তের সব দোষ মুছে ফেলা যায়। তাই আমি চাইনা, তোমারা মাঝেও এই গুণ আসুক। তুমি হবে তোমার মায়ের মতো। আর এই হওয়ার প্রথম ধাপ হলো, বাবার কাছ থেকে অনেক অনেক দূরে থাকা। তুমি কি তোমার মায়ের জন্য পারবে বাবা ?
অপূর্বের বাবার প্রতি টান ছিল, তবে বাবার ভালোবাসায় যে কাঙাল হওয়া, সেটা কখনো হওয়ার সুযোগ পায়নি। বাবা ছুটিতে বাড়িতে আসতেন। ছেলে ঠিক মতো পড়ছে কি না, স্কুলে যাচ্ছে কি না। নিয়ম করে খোঁজ খবর নিতেন। কি লাগবে না লাগে সব সময় মতো হাজির করতেন। তবে কখনো টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে মায়ের মতো বলেনি," বাবাটা একটু বুকে আয়তো। তোকে জড়িয়ে না ধরলে, বুকটা কেমন খাঁ খাঁ করে। এই যে এত ব্যস্ত থাকি, তোকে না দেখলে অস্থির লাগে। "
তাবুও সেই দিন মায়ের প্রশ্নের উত্তর সে দিতে পারেনি। মাও আর কখনো কিছু বলেনি। তবে যোগাযোগ ঠিক বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। অবশ্য বিচ্ছিন্ন হওয়ার তার তেমন কিছু আসে যায়নি। তখনও সে ঠিকমতো স্কুলে গিয়েছে, নিয়ম মতো পড়তে বসেছে। যা যা দরকার ঠিকঠাক সব পেয়েছে। বাবা তো শুধু তাকে এগুলোই দিয়েছে, সেগুলো ঠিক মতো পাচ্ছে। তো, ব্যথাটা হবে কোথায়?
তবে রক্ত আসলেই খন্ডানো যায় না। সেই আট বছরের অপূর্ব না বুঝলেও, এই পূর্ণবয়স্ক অপূর্ব ঠিক বুঝে।
তাই মা ভেবেছে, এবারও হয়তো কোথাও ঘুরতে গেছে। তবে যখন শুনল, তখন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কোনো বাড়তি কথা বলেনি, কখনো বলেও না।
তার মা তার কাছে বন্ধুর মতো। যখন যতটুকু দরকার, ঠিক ততটুকুই পাশে দাঁড়িয়ে যায়। এমনকি তার প্রথম ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েওছিল মায়ের জন্য।
কেননা, এই বয়সে এসেও তিনি প্রানোচ্ছ্বল, চঞ্চল। তার বন্ধুদের সাথে মিলে একসাথে ট্রেকিংয়ে গিয়েছিল। মা, ছেলের এই অসম্ভব সুন্দর বন্ডিংটাই সকলের মন ছুঁয়ে গিয়েছিল।
তাই সব সময়ের মতো না চাইতেও, মা কোন রাগ করেন নি, জেদ দেখিয়ে ফোন কেটে দেয়নি, বরং সুন্দর করে বলেছে, "মেসেজে ডিটেইলস পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর হ্যাঁ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করবে না। যদি করেছো, এসে কান মলে দেব। "
অপূর্ব হাসল! হেসে বারান্দা থেকে ভেতরে চলে এলো। আসার আগে এপাশ ওপাশ ভালো করে তাকাল। গলির শেষ মাথায় বাড়ি। দেখার মতো তেমন কিছু নেই। তবে সে দেখার চেষ্টা করেছিল অন্য কিছু।
তার গাঢ় ঘুমের রেশ কেটেছিল টুংটাং মিষ্টি একটা শব্দে। শব্দটা খুবই ক্ষীণ, কিছুক্ষণ পরপর নিজ ছন্দে টুংটাং করে বেজে উঠছে। এই যে কিছুক্ষণ পরপর এখনো বাজছে।
তব ঘুমের মাঝে সেই শব্দটা তার কাছে লেগেছিল ঘোরের মতো। মনে হচ্ছিল, অজানা কোনো রাজ্যের খোলা বারান্দায় হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। গায়ে লাগছে মিষ্টি বাতাস, ফুলের সৌরভ, পাখির কিচিরমিচি আর বারান্দার কোণে উইন্ড চাইমের মিষ্টি সুর।
সেই সুরে বিভোর হয়ে তার চমৎকার একটা ঘুম হয়েছে। অবশ্য নানান জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে জেট লেগ, জার্নির ক্লান্তি, অচেনা জায়গার অস্বস্তি, কখনো তাকে কাবু করতে পারে না। বরং যে কোনো জায়গায়, যে কোন পরিস্থিতিতেই অনায়াসেই ঘুমাতে পারে।
তাই এখানেও না হওয়ার তেমন কারণ নেই। তবে ঘুম আর শান্তি, স্বস্থির মাঝে তফাৎ আছে। আজকের ঘুমটা ছিল অন্যরকম। তাই অন্যরকম হওয়ার কারণটাই খুঁজল।
তবে এক বারান্দা থেকে আরেক বারান্দার কিছুই দেখা যায় না। তবে শব্দ বলেছে, লেফট বা রাইট যে কোনো একটা বারান্দা থেকেই আসছে।
সে আর ভাবল না। এগিয়ে ব্যাগ ঘেটে, ভেজা গায়েই একটা টি-শার্ট জড়ালো। তখনই দরজায় হালকা দুটো টোকা পড়ল। অপূর্ব সাথে সাথেই এগিয়ে দরজা খুললো। আর খুলতেই ঠোঁট ছাড়িয়ে হাসল।
আর এই হাসির দিকেই আসাদুজ্জামান অপলক তাকিয়ে রইল। আর তাকিয়ে রইল, এই যে দেবদূরে মতো সুন্দর দেখতে নিজের সন্তানের দিকে। যে কিনা হুবুহু, দেখতে তার মায়ের মতো। এই যে হাসিটা, এই হাসিটাও।
আর এই হাসিতে নাবিলার বলা সব কথা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গেল। ফিরে এলো সেই আগের জড়তা, সংকোচ, অস্বস্তি।
তবে তাকে অবাক করে, অপূর্ব নিজেই এগিয়ে জড়িয়ে ধরল। ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, -- ভালো আছো, বাবা?
চলবে.....