আমায়_দিও_একটুখানি_ছুঁয়ে 🌺
পর্ব_২৫
মিমি_মুসকান ( লেখনিতে )
ক্লাস শেষে অন্তু আর বর্ষণা নামছিলো সিঁড়ি বেয়ে। সিঁড়ির গোড়ায় অরিত্র আর রোহানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু ঘাবড়ে গেলো সে। আচ্ছা তখন তুহিন ভাই আবার কিছু বলেনি তো তাকে। ভাবতেই বুকটা কেঁপে উঠে তার। মাথা নিচু করে চুপচাপ নেমে যাচ্ছিল তখনি তার নাম ধরে ডেকে উঠল কেউ।
অন্তিকা!
অন্তু ফিরে চাইল। অরিত্র দাঁত বের করে হাসছে। হাত নাড়িয়ে বলল, ক্লাস শেষ নাকি?
জি ভাই।
ওহ বাসায় যাচ্ছ?
জি।
আচ্ছা ঠিক আছে যাও।
অন্তু আর বর্ষণা জলদি পা বাড়িয়ে নেমে গেল। পিছন থেকে আবারো ডাকল কেউ। অন্তু ফিরে তাকাল। দেখল এবার রোহান দাঁত নাড়াচ্ছে তাকে দেখে। অন্তু চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে গেল। রোহান আর অরিত্র নেমে আসছে। অরিত্রের কাঁধে রোহানের হাত। দুম করে এসে অন্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, পড়াশোনা কেমন চলে অন্তু?
জি ভালো।
হ্যাঁ কোনো সমস্যা হলে বলো কিন্তু। মানছি তোমার জন্য স্পেশাল কেউ আছে কিন্তু তোমার সমস্যায় তোমার ডিপার্টমেন্ট কিন্তু আগে থাকবে। ঠিক আছে?
অন্তু মাথা দুলিয়ে বলল, জি!
যাও এবার।
অন্তিকা বর্ষণার হাত চেপে দ্রুত হাঁটতে লাগল। বর্ষণা ফিসফিসিয়ে বলল, ব্যাপার কি রে? তারা দু'জন আজ তোর উপর এতো মোহাব্বত দেখাচ্ছে কেন?
জানি না কিছু। জিজ্ঞেস করিস না।
মনে মনে আওড়ালো, ওরা তো কিছুই করেনি। বাসায় গেলে তুহিন ভাই কি করে আল্লাহ মালুম।
তুহিন ঠেসে দাঁড়িয়ে ছিল দেওয়ালের সাথে। ঠিক গেইটের সাথেই একদম। অন্তিকা আর বর্ষণা সেদিক দিয়ে বেরিয়ে হনহন করে চলে গেল। তাদের নজরে পড়েনি তুহিন মির্জাকে । ওদিকে তাদের অনুসরণ করে বেরুলো অরিত্র আর রোহান। তুহিন মির্জাকে নজরে এড়িয়ে গেল তারাও। রোহান নিচু স্বরে গুন গুন করতে লাগল,
তুমি জ্বালাইয়া গেলা মনের আগুন, নিভাইয়া গেলা না!
গানটা কাকে উদ্দেশ্য করে গাওয়া তুহিন সেটা ভালোই বুঝতে পারল। দাঁতে দাঁত চেপে সে বেরিয়ে গেল সেখান থেকে।
_______
রাতের খাবার টেবিলে আজ তারা তিনজন। বড় মামা অন্তুকে ডেকে বললেন, কি ব্যাপার অন্তু? খাচ্ছিস না কেন? খাবার ভালো হয়নি?
হয়েছে মামা।
তাহলে?
খেতে ইচ্ছে করছে না।
কেন? অন্যকিছু খাবি? রহিমা খালাকে বলব নতুন কিন্তু রান্না করে দিতে।
না না, খাবো না।
বলেই আড়চোখে ফিরে তাকাল তুহিন ভাইয়ের দিকে। লোকটা হাপুসহুপুস করে খেয়েই যাচ্ছে। থামবার নাম নেই। চোখ মুখ শক্ত করে কেমন খাবার গিলছে দেখো। এদিকে তার ভ*য়ে আমার পেটে খাবার ঢুকলো না। ধ্যাত!
খেয়েদেয়ে যে যার মতো ঘরে চলে গেল। অন্তু সোফার কোনো চুপচাপ বসে আছে। তুহিন ভাই কিছু বলল না তাকে। কি আশ্চর্য! তাহলে কি ও বেশি বেশি ভাবছে। তাহলে সেদিন কেন তুহিন ভাই বলল, তিনি চায় সে কাছে থাকুক। এসবের মানে কি?
ভাবনায় ছেদ ঘটল। উপর থেকে তুহিন ভাইয়ের তীক্ষ্ণ আওয়াজ ভেসে এলো। তিনি বললেন, এক কাপ গরম কফি নিয়ে আয় অন্তু, মাথা ধরেছে।
অন্তু চোখ মুখ কুঁচকে উপরে তাকাল। দোতলায় করিডোরে তুহিন ভাই বাহু গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই ইশারা করলেন দ্রুত আসতে। অন্তু চিন্তাভাবনায় বসল। যাবে কি যাবে না!
চিন্তা ভাবনার অবসান ঘটিয়ে অন্তু উপরে এলো। হাতে একটা কফির কাপ নয় দুটো। সে নিশ্চিত নির্ঘাত ভাইয়ের ধ*মক শুনে তার মাথা ধরবে। এরপর কফি খেয়ে মাথা ঠান্ডা করবে সে।
নিজের মগটা রুমে রেখে তুহিন ভাইয়ের কফি মগ হাতে নিয়ে তার দরজার সামনে দাঁড়াল। দরজা ভিড়ানো। নক করতেই ভেতর থেকে গম্ভীর স্বরে ভেসে এলো। “ভেতরে আয়!"
অন্তু দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই হাওয়ার বেগে ছুটে এলেন তিনি। এসেই অন্তুর হাতটা ধরল শক্ত করে। ভয়ে আর চাপা উত্তেজনা অন্তু চোখ মুখ বন্ধ করে নিল। হাতের কফি মগ থেকে গরম কফি উপচে পড়ল হাতের উপর। তাদের দুজনের হাতের উপর। কারণ তুহিন ভাই যে হাতটা শক্ত করে ধরে আছে। ব্যা*থায় ঠোঁট কাম*ড়ে চোখ মেলে তাকাল অন্তু। তুহিন তৎক্ষণাৎ তার বাহু ধরে সামনের দেয়ালে তাকে ঠেসে ধরল। কফি মগটা হাত থেকে নিয়ে রাখল টেবিলে। আধ*পোড়া হাতটাই ধরল শক্ত করে। চিরচির করে উঠল পুরো দেহ। ঠোঁট কামড়ে অন্তু বলল, ভাইয়া লাগছে!
গম্ভীর দুটি চোখ, চোয়াল শক্ত, দাঁতে দাঁত আছে, একটু একটু করে ভেতরে জমিয়ে রাখা রাগটা উপচে পড়ছে যেন। তুহিন বলল, তুই আমার থেকে পা*লিয়ে ভাবছিস বেঁচে যাবি অন্তু। কিরে, কথা বলছিস না কেন এখন? কথা বল!
কি বলব?
ওহ, এখন জানিস না কি বলবি?
তীব্র রাগে বা*হুটা চে*পে ধরল আরো জোরে। অন্তু চোখ বুজে মাথা নুইয়ে রইল। ব্যাথায় ছটফ*ট করছে পুরো দেহ।তুহিন ভাই জেনেশুনে আরো ব্যা*থা দিয়ে চলছে তাকে। নিশ্চুপ! দুজনেই নিশ্চুপ! অন্তুর মুখ বুজে ব্যাথা স*হ্য করতে দেখে তুহিন তাকে ছেড়ে দিল। না, অন্তুকে বুঝিয়ে লাভ নেই। ও কিছু বুঝবে না। বোঝার ক্ষমতা হা*রিয়েছে এই মেয়ে। তুহিন চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ফেলল। অন্তু এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে। নিঃশব্দে কেঁদে চলেছে। তুহিন শীতল গলায় বলে উঠলো,
“তাহলে তুই আমাকে কিছু বলবি না অন্তু?”
অন্তু নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছ তবুও। জবাব দিবে না সে। কেন জবাব দিবে? কিসের জবাব দিবে? জে*দ চেপে ধরল তাকে। তুহিন হার মেনে বলে উঠলো, তাহলে চলে যা আমার সামনে থেকে। আর কখনো আসবি না আমার সামনে। বের হ এখুনি।
কথাগুলো শুনে একটু থতমত খেলো অন্তু। হতভম্ব হয়ে ফিরে তাকাল সে। তুহিন চোখ মুখ শক্ত করে তার বাহু টেনে ধরে ঘর থেকে বের করে দিল। শুধু তাই নয়, মুখের উপর দরজাও বন্ধ করে দিল।
পানির কল ছেড়ে তার নিচে হাতটা ধরে আছে অন্তু। এখন আর কান্না পাচ্ছে না। ব্যাথাও লাগছে না। পানির কল বন্ধ করে নিল। লালচে হয়ে গেছে। কালকের মধ্যে কালোও হয়ে যাবে। তুহিন ভাইয়ের হাতটা বুঝি ওভাবে পু*ড়ে গেল। কে জানে? লোকটা আদৌও মলম কিছু লাগাবে কি না। তার ভাবনা যেন চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরল। আবার ভাবল, কেন এতো ভাবছি। এই লোকটার জন্যই তো হাত পু*ড়ে গেছে। তাকে নিয়ে ওতো ভাবার কি আছে? মুখ ভেংচি কাটলো। কি বলল ফটফট করে, আমার সামনে আসবি না অন্তু। যাও আসবো না। বয়ে গেছে অন্তুর যেতে। এক মুখে দশ কথা বলে। দশমুখো সাপ একটা। তুহিন মির্জা হলো দশমুখো সাপ। মনে মনে একশত একবার কথাটা আওড়ালো। তবুও হলো না। একটা সাদা কাগজ নিয়ে তার উপর বারবার করে লিখল। কেবল লিখল তুহিন ভাই! তুহিন ভাই, তুহিন ভাই লিখে পুরো পৃষ্ঠা ভরিয়ে ফেলল। অতঃপর মনে হলো, এই বোকামির মানে কি? লোকটার গম্ভীর কণ্ঠ শুনলেই বুকটা কেঁপে উঠে। কাগজ হাতে মুচরে ডাস্টবিনে ফেলে দিল। দাঁতে দাঁত চেপে আবারো বলল, তুহিন মির্জা একটা দুমু*খো সাপ!
পরদিন তুহিন ভাইয়ের আগে আগেই নাস্তা না সেরে ভার্সিটি এসে পৌঁছাল অন্তিকা। কারণ একটাই, যাতে কোনোভাবেই তুহিন ভাইয়ের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ না হয়। না না, কোনো দরকার নেই ওই লোকটার সঙ্গে দেখা করবার। হিটলারের থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই যেন নিরাপদ। পুরো ক্লাসরুমে সে একা বসে। বর্ষণাকে কল করল। সে আসছে। রাস্তায় আসছে। মোটে আর ১০ মিনিট লাগবে আসতে। এরই মধ্যে দু একজনকেও আসতে দেখা গেল। খিদে পেয়েছে। নাস্তা করার উদ্দেশ্যে ক্যান্টিনে গেল অন্তিকা।
সেখানে একটা গুনগুন শোনা গেল। অন্তিকা কান খাড়া করে শুনছে, একজন বলছে, শুনলি কাল শুনলাম রোহানের নাকি এক্সি*ডেন্ট করেছে?
কোন রোহান? ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের?
হ্যাঁ হ্যাঁ, ওইই তো।
বাইক নিয়ে যা করে? আজকালকার ছেলেরা । বাইক এমনভাবে চালায় যেন মনে হয় উড়োজাহাজের চালাচ্ছে। রাত হলেই এদের রক্ত গর*ম হয়ে যায়। দেখিস নি?
তা তো জানিই। তা বেশি কিছু হয়েছে নাকি?
ভালোই হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি শুনলাম। হাত পা ভেঙ্গে*ছে বোধহয়।
আহারে!
তাদের সংবেদনশীল কথাবার্তা শুনে অন্তিকা ঘাবড়ে গেল। আবার নিস্তার পেল এই শুনে যে আর তাকে সিনিয়র ভাইয়ের কাছে হাজিরা দিতে হবে না। ইশ কি বিচ্ছি*রি জিনিস। পরক্ষণেই অপরা*ধবোধ আঁকড়ে ধরল। ছিঃ ছিঃ! একটা লোক এক্সি*ডেন্টে এভাবে আহত হলো আর সে কি না এসব ভাবছে। না না! এটা তো অ*ন্যায়। ভারা*ক্রান্ত মনে চায়ের কাপ শেষ করে উঠে দাঁড়াল সে। ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে আর ক্লাসে যেতে পারিনি। তার আগেই পথ আটকে দাঁড়াল দর্শনা। তাকে মুখোমুখি দেখে বেশ ভীত হলো সে। দর্শনা বলল, অন্তিকা না তোমার নাম?
অন্তু কিছু বলার পূর্বেই পিছনে অরিত্রকে দেখা গেল। দৌড়াদৌড়ি করেছে বোধহয়। ঘেমে অস্থির সে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, হ্যাঁ ওই অন্তিকা। ইশ কতো খুঁজতে হলো তোমায় বলো তো। এরপর থেকে নাম্বার টা দিয়ে দিবে। বুঝলে?
অন্তিকা এদের কথার আগামাথা কিছু বুঝল না। ওরা তাকে কেন খুঁজছে? সে আবার কি করল?
দর্শনা তৎক্ষণাৎ তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠলো, তুহিনের কাজিন না তুমি!
ব্যস! দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল অন্তিকা। তুহিন ভাইয়ের কাজিন না অভি*শাপ। এ তো যেন পিছুই ছাড়ে না।
ইয়ে মানে…
বিন্দুমাত্র তার কথা না শুনে দর্শনা মূহূর্তে তার হাতটা ধরে বলল, চলো আমার সাথে!
তাকে টেনে নিয়ে চলল দুজন। বেরিয়ে গেল ভার্সিটি ছেড়ে। অথচ অন্তু বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে তাকে ঘিরে!
#চলবে….