ফন্ট সাইজ:
থিম:
আষাঢ়গগনে প্রনয়সক্তা

১ম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ ইরাজ

" সাবুদানা! বউ হবি আমার? "

উপস্থিত চার কন্যা বিস্মিত চোখে তাকালো আষাঢ়ের দিকে! দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে সে।

.

শ্রাবণের থমথমে এক বিকেল। আকাশের কোণে দল বেঁধেছে মেঘেরা। ধূসরাভ মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়ে সূর্য। চারপাশে আবছা মায়াবী আলো। মাঝে মাঝে একঝলক ঠাণ্ডা বাতাস এসে দুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে উঠোনের একপাশে আম, কাঁঠাল গাছের পাতাগুলো। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বৃষ্টির আগমনী গন্ধ। ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামবে বোধহয়। বাড়ির উঠোনের একপাশে শিশুদের কলতান। চার বছরের ছোট্ট সুবহা। শুকনো শরীরে পড়েছে রঙিন ফ্রক। ছোট ছোট চুলগুলো সুন্দর করে সিঁথি দিয়ে আঁচড়ে রাখা। সঙ্গে সমবয়সী ফুফাতো বোন ইখফা এবং পাড়াতো দু'জন খেলার সখী। আজ তাদের বেশ আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন। পুতুলের বিয়ে। উঠোনের নরম মাটিতে চট বিছিয়ে তারা সাজিয়েছে বিয়ের আসর। চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট মাটির হাঁড়ি-পাতিল, ভাঙা চুড়ির টুকরো। রান্নার অভিনয়ে ব্যবহৃত নানারকম গাছের পাতা। লাল, নীল রঙিন কাপড়ের টুকরো দিয়ে বর-বউ পুতুল দুটোকে চমৎকার করে সাজানো হয়েছে। পুতুলের পোশাক ঠিক করতে করতে সুবহা আধো শব্দে বলে উঠলো,

" ইফু। বাতাছ। পোছাক নত্ত হয়। "

বাতাসে বর পুতুলের পোশাক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বারবার। ইখফা সমবয়সী। তবে বেশ স্পষ্ট কথা বলতে পারে। সুবহার মতো অস্পষ্ট নয় শব্দভাণ্ডার।

" দেখি। "

সুবহা পুতুল এগিয়ে দেয়। ইখফা সেটা হাতে নেয়। বাতাস সত্ত্বেও পুতুলের পোশাক আঁটসাঁট করে দেহে জড়িয়ে দেয়। খুশিতে একগাল হাসে সুবহা।

" এই নে। "

" ইয়ে! "

ছোট ছোট হাতে তালি দেয় সুবহা। খুশিতে আত্মহারা হয়ে পুতুল হাতে নেয়। ইখফা বিয়ের সরঞ্জাম ঠিক করতে করতে প্রশ্ন করে,

" বর কখন আসবে? "

" একুনি চলি আছবে। "

সহসা সেখানে উপস্থিত হলো ধূলোময় ঝড়। আষাঢ়। বারো বছর বয়সী স্বাস্থ্যবান জুনিয়র গোপাল ভাঁড় সে। পায়ের আগে হাঁটে পেটু। হাফ হাতা গেঞ্জি, হাফ প্যান্ট পড়নে তার। ধূলোয় মাখানো পোশাক। উসকোখুসকো চুল। কোমড়ে দুই হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আষাঢ়। একটুখানি ঝুঁকে রসিকতা করে উঠলো,

" কিরেই! কি করছিস তোরা? ম'রা পুতুলের বিয়ে? "

এতবড় অলুক্ষণে কথা! নাকের পাটা ফুলে উঠলো শিশু সুবহার। তবুও কিছু বললো না সে। বরং ইখফাকে বললো,

" ইফু! তোমাল বর পাতাও। আমাল বউ রিডি। "

হঠাৎ থমকে গেল পরিবেশ।‌ কানে পৌঁছালো,

" অ্যাই সাবুদানা! বউ হবি আমার? "

উপস্থিত চার শিশু কন্যা বিস্মিত চোখে তাকালো আষাঢ়ের দিকে! আষাঢ় দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে।

" আমিও খেলবো তোদের সঙ্গে। জামাইটা আমার। "

" না না। তুমায় নিবো না। বিয়ে কববো না আমি। "

" কেন? কেন করবি না বিয়ে? তোর জামাই পুতুল আমার হাতে বেশি মানাবে। ইফু বাদ। আমিই তোর জামাই। "

বলতে বলতে ইখফার হাত থেকে বর পুতুল কেড়ে নিলো আষাঢ়।‌ ভারী শরীর নিয়ে ধপ করে বসলো সুবহার বিপরীতে। এমন কাণ্ডে ইখফা হতবাক! সুবহা কাঁদো কাঁদো চোখে তাকিয়ে।

" তুমি পতা। এত্তু ভালো না। "

এক ফুটিয়া সাবুদানা জনসম্মুখে অগ্রাহ্য করছে তাকে! মোটেও পছন্দ হলো না আষাঢ়ের।

" ওই! কি করেছি আমি? তোর চুল ধরে টেনেছি? না থা'প্পড় মে'রেছি? আমাকে শুধু শুধু পচা বলছিস কেন? "

অশ্রুবিন্দুতে ভিজে গিয়েছে চোখ। অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো সুবহা,

" পুতুল দাও। "

" দেবো না। বল আমার জামাই পুতুলের সঙ্গে তোর মেয়ে পুতুলের বিয়ে দিবি? "

কণ্ঠস্বর কড়া।

" ইফু! "

অসহায় কণ্ঠে ডেকে উঠলো সুবহা। ইখফা করুণ চোখে তাকালো আষাঢ়ের দিকে।‌ অনুরোধ করলো,

" ভাইয়া। পুতুল আমার।‌ "

" তারমানে খেলায় নিবি না আমাকে? "

" দাও না। সুবহা কান্না করে।‌ "

" কেন কান্না করে? আমি বকছি ওকে? না পুতুল নষ্ট করছি? "

বলতে বলতে পুতুলের পরিহিত রঙিন কাপড় টান লেগে ছিঁড়ে গেল। অল্প খানিকটা বেরিয়ে এলো ভেতরের খড়, তুলা। ইচ্ছাকৃত ভাবে এমনটা করেনি আষাঢ়। তবুও বুক ফেটে কান্না পেল সুবহার। সশব্দে উচ্চ স্বরে কেঁদে উঠলো মেয়েটা। মনে মনে বেশ ভড়কে গেল আষাঢ়। এই রে! না চাইতেই ক্ষেপে গেছে পা'গলীটা। বড়রা চৌদ্দগুষ্টি নিয়ে এই তেড়ে এলো বলে। এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো আষাঢ়।

" খালি কাঁদে। এ্যাঁ এ্যাঁ এ্যাঁ! "

দু'কান টেনে, জিভ বের করে ভেংচি কাটলো আষাঢ়। নিজের দোষ স্বীকার না করে এমন কাণ্ড! আরো জোরে কেঁদে উঠলো সুবহা। ব্যাস তাকে আর পায় কে? বাড়ির ভেতর থেকে মেজোমা'র কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। এক ভোঁ দৌড়ে উঠোনের সীমানা পেরিয়ে গেল আষাঢ়। চলে গেল দৃষ্টি সীমার বাইরে। মনের কষ্টে তখনো কেঁদে চলেছে সুবহা। ইখফা ওকে শান্ত করতে ব্যস্ত।

•

সন্ধ্যা নেমেছে। চারপাশ নিমজ্জিত আঁধারে। শ্রাবণের মেঘলা আকাশ। ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। ঘরে জ্বলছে লো পাওয়ারের লাইট। বিছানায় বসে আছেন আফরোজা। কোলে মাথা রেখে শুয়ে আষাঢ়। ছেলের মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে চলেছেন উনি।

" বাপজান! তোমারে আগেও কইছি। এহনও কইতাছি। ওই মাইয়ার থেইকা দূরে দূরে থাহবা। "

" কার কথা বলো মা? "

অবুঝ চোখে তাকিয়ে আষাঢ়। দাঁত খিটমিট করে উঠলো মায়ের। তবুও উনি মিষ্টি করে বললেন,

" কার কথা কই বুঝো না? "

" না। আমি তো ছোট। অত বুঝি না। "

" ওই সুবহার থেইকা দূরে দূরে থাহবা তুমি। ওই মাইয়া ভালা না। "

" কেন? ও কি আমার মতো গাছের থেকে ফল চুরি করছে?"

" চুপপ! একদম চুপ। ওই মাইয়া ভালা না। আমি কইছি যহন অ ভালা না, তহন ভালা না। সবসময় তোমারে ফাঁসাইতে ধান্দা করে। "

" ধান্দা? এটা কি মা? "

আফরোজা ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লেন। বাপজান ওনার এত সরল কেন? আজকের দুনিয়ায় সরলের বেঁচে থাকা বড় মুশকিল যে।

" তোমার অত বুঝনের কাম নাই। অর থেইকা দূরে থাহবা। সন্ধ্যাবেলা হুদাই অর লেইগা বকা খাইলা। "

তড়াক করে মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে ফেললো আষাঢ়। সোজা হয়ে বসলো।

" ও তো ছোট মা। এক ফুটিয়া। এত্তটুকুন। খালি কান্না করে। এ্যাঁ এ্যাঁ এ্যাঁ। "

হাসতে হাসতে এক ফুটের সুবহার কান্নার ভঙ্গিমা অনুকরণ করে দেখালো আষাঢ়। বিষয়টা মোটেও পছন্দ হলো না আফরোজার।

" তোমারে কইছি না অর থেইকা দূরে থাহবা? "

" ও ছোট মা। ভালো। বিকেলে আমি ওর পুতুল ছিঁড়ে ফেলছিলাম তো। তাই কান্না করছে। নাহলে ও কাঁদে না। এত্তটুকুন শান্ত পুতুল একটা। "

হতবিহ্বল আফরোজা! ছেলেকে ইনিয়েবিনিয়ে এত করে বোঝানোর পরেও ছেলে ওনার ওই মেয়ের পক্ষপাতীত্ব করছে? বুঝতে চাইছে না?

" তুমি.. "

আর বলা হলো না মায়ের। স্বাস্থ্যবান শরীর নিয়ে বিছানা থেকে স্লিপ খেয়ে নেমে পড়েছে আষাঢ়। হাফপ্যান্ট কিছুটা নেমে গিয়েছে। একটুখানি দৃশ্যমান ভারী নিতম্ব। টেনেহিঁচড়ে প্যান্ট উঁচুতে তুললো ছেলেটা। অতঃপর হেলেদুলে ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেল ঘরের বাইরে। মুখ কালো করে বসা আফরোজা।

•

মৃদু তপ্ত দুপুর। অনড় গাছের পাতা। সূর্যের আলো ছুঁয়ে রয়েছে টিনের আবরণ। রৌদ্রে করছে চিকচিক। বড় আকারের দোতলা টিনের ঘর। ঘরের দেয়াল তৈরি সবুজাভ নীলচে রঙা টিনের। দোতলার অংশটি কাঠের তৈরি। পুরো বাড়ির দরজা-জানালা কাঠের তৈরি। নিচতলায় স্বল্প দূরত্বে পাশাপাশি অবস্থিত তিনটে দরজা। মূল দরজার দুই পাশে তুলনামূলক ছোট দু'টো দরজা। তিনটে দরজাই ঘরে আসা-যাওয়া করতে ব্যবহৃত হয়। বেশ বড় জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই বাড়িটি। বাড়ির মালিক জনাব তাফাজ্জল সাহেব। সম্পর্কে আষাঢ়ের দাদাজান উনি। রাশভারী গোছের মানুষ। আষাঢ় দুষ্টুমি করলে শাসক অবতারে অবতীর্ণ হন। আবার নাতি প্রশংসনীয় কোনো কাণ্ড করলে বাহবা দিতে কার্পণ্য করেন না। যদিওবা নাতি ওনার প্রশংসনীয় কাজ সারা মাসে হাতেগোনা কয়েকবারই করে। বড় চঞ্চল ডানপিটে স্বভাবের কিনা! সারাক্ষণ গ্রামের এ প্রান্ত হতে ও প্রান্ত টইটই করে বেড়াবে। একদণ্ড স্থির নেই।

বাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে হৃষ্টপুষ্ট শরীরের অধিকারী আষাঢ়। দু চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে 'তাকে'। দুপুরবেলা এখন। স্বাভাবিক ভাবেই অন্যরা সবাই নিজ নিজ কর্মে ব্যস্ত। তাহলে ওই সাবু'টা গেল কোথায়? একাকী বিড়বিড় করতে করতে বাড়ির মূল দরজা পেরিয়ে বাইরে এলো আষাঢ়। লহমায় চকচক করে উঠলো দু'চোখ। ওই তো তার শিকার বসে। চিকনা সাবু। মিটিমিটি হাসতে হাসতে এগোচ্ছে আষাঢ়। তার আগে আগে হাঁটছে ভারী পেট। পড়নে হাফ হাতার গেঞ্জি। একটা ধূসর বর্ণের হাফ প্যান্ট। হাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে গোপল ভাঁড় জুনিয়র হেঁটে চলেছে একা পথে। বাড়ির বাহিরে এসে দাঁড়ালো ছেলেটা। দৃষ্টি নিবদ্ধ সাবু'তে। আষাঢ়ের ভাষ্যে সাবু। কিন্তু নাম তার সুবহা। সম্পর্কে আষাঢ়ের বোন। চাচাতো বোন। ওদের বাবারা আপন ভাই। তাফাজ্জল সাহেবের বড় ও মেজো ছেলে। বড়জন ফারুক সাহেব। আষাঢ়ের বাবা। আর মেজো জন ফিরোজ সাহেব। সুবহা'র বাবা।

ঘরের মূল দরজা সংলগ্ন অবস্থিত ইট, সিমেন্টের তৈরি দু'টো পাকা বৈঠক। বিপরীতমুখী দু'টো বৈঠক। ডান পাশের বৈঠকে বসে ছোট্ট মিষ্টি মেয়ে সুবহা। পড়নে তার হাতাকাটা রঙিন ফ্রক। স্বাস্থ্যগত দিক থেকে সে আষাঢ় হতে বেশ পিছিয়ে। জীর্ণশীর্ণ দেহের অধিকারী মেয়েটা। শরীরের হাড়গোড় যেন বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান। গাল দুটোও কেমন শুকনো। পুরো আষাঢ়ের বিপরীত। এ মুহূর্তে পাকা বৈঠকে বসে সুবহা। লাল টুকটুকে মুখখানি। হালকা ভেজা গাল। কিছুক্ষণ আগে কান্নার ফলে এমন দশা হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আবারো আষু ভাইয়ার জন্য কষ্ট পেয়েছে সে। কষ্টে ভিজে যাচ্ছে চোখ মুখ। মাঝেমধ্যে ছোট্ট শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। দু পা দুই দিকে ছড়িয়ে বসে সুবহা। পায়ের মাঝখানে রাখা সিরামিকের পিরিচ। তাতে ছোট ছোট করে আপেলের টুকরো রাখা। চার বছরের সুবহা আপেল খেতে বেশ পছন্দ করে। তাই তো মেয়ের কান্না থামাতে ওকে আপেল দিয়ে বসিয়ে রেখে গেলেন মা সাফিয়া। অনেক কাজ বাকি রয়েছে ওনার। মেয়েকে নিয়ে ঘুরোঘুরি করার সময় নেই। তারচেয়ে বরং মেয়ে ওনার আপেল নিয়ে শান্ত থাকুক। এই ফাঁকে উনি কাজকর্ম সেরে ফেলবেন। তবে ওনার সে-ই চিন্তায় বাগড়া দিতে হাজির দুষ্টু আষাঢ়।

সুবহা ছোটখাটো ডান হাতে একটা করে আপেল তুলছে। মুখে নিয়ে ছোট্ট ছোট্ট দাঁত দিয়ে একটু একটু করে কা'মড় দিচ্ছে। খাচ্ছে। তাকিয়ে বাড়ির বিশালাকার উঠোনে। দেখছে মা হাঁস ও তার বাচ্চাদের খুনসুটি। উঠোন জুড়ে কেমন ছোটাছুটি করছে ওরা। সে খুনসুটি দেখে বাচ্চা মেয়েটার খুশি আর ধরে না। মুখে আপেলের টুকরো নিয়েই হাসছে। খিলখিল করে হাসছে। কিছুক্ষণ আগেই যে আষাঢ়ের দুষ্টুমির জন্য কাঁদলো সে যেন ভুলেই গেছে। ওর এমনতর প্রাণবন্ত হাসি যে আষাঢ় বাবুর সহ্য হলো না।

' হুহ্। আমাকে বকা খাইয়ে হাসা হচ্ছে? আপেল খাওয়া হচ্ছে? দাঁড়া। দেখ, কি করি আমি। '

একাকী বিড়বিড় করে ধুপধাপ পা ফেলে বৈঠক সংলগ্ন দাঁড়ালো আষাঢ়। সুবহা অবশ্য তা লক্ষ্য করেনি। সে ব্যস্ত আপেল মুখে নিয়ে হাঁসদের খুনসুটি দেখতে। সে সুযোগে ওর পাশে ধপ করে বসে পড়লো আষাঢ়। তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে আপেল ভর্তি পিরিচে। কত্ত বড় সাহস! কয় টাকার আপেলের জন্য তাকে অবজ্ঞা করছে এই সাবুদানা? তার দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত! হুঁ? দু হাত ভরে ছোট ছোট আপেলের টুকরো নিলো আষাঢ়। লহমায় সব কয়টি আপেলের টুকরো পুরে নিলো মুখে। প্রায় ছয় সাত টুকরা আপেল ছিল। ক্ষুদ্রাকৃতির। সব কয়টা একসাথে মুখে পুরে নিয়েছে। হালুম হুলুম করে চিবোচ্ছে। যেন ঘাস চিবোচ্ছে। ফুলো গাল দুটো ইয়া ফুলে গিয়েছে। ফুলকো লুচির মতো। সুবহা হাঁসের বাচ্চাদের দেখে হাসতে হাসতে পিরিচে ছোট্ট হাত রাখলো। দৃষ্টি নিবদ্ধ বাচ্চা হাঁসে। ফলস্বরূপ আপেল হাতের নাগালে না পেয়ে কেমন চমকে গেল! গোল গোল চোখে তাকালো পিরিচে। কোথায় তার আপেল? পিরিচ তো সম্পূর্ণ খালি। এতক্ষণে হুঁশ ফিরলো। পাশে কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে বামে ঘুরে তাকালো সুবহা। লহমায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো গৌর বর্ণের মুখশ্রীতে। আষাঢ়ের মুখ ভর্তি আপেলের টুকরো। ফুলো ফুলো গাল। দেখতে কেমন ভ'য়ঙ্কর লাগছে! ভীত সুবহা কেঁপে উঠলো। উল্টে যাচ্ছে পাতলা ঠোঁট। এই বুঝি কেঁদে দেবে! ওর ভীতসন্ত্রস্ত মুখখানি দেখে বেশ মজা পাচ্ছে দুষ্টু আষাঢ়। আরো জোরে জোরে মুখের ভেতরে থাকা ফল চিবোতে লাগলো। কিছু থুথু ছিটকে পড়লো মেয়েটার মুখে। এতক্ষণে কান্নার বি'স্ফোরণ ঘটলো। সশব্দে কেঁদে উঠলো সুবহা।

সুবহা'র কান্না দেখে চরম বিনোদন পাচ্ছে আষাঢ়। আপেলের শেষ অংশ চিবিয়ে খেল। দাঁত বের করে হাসলো। বেশ মজা পাচ্ছে ছেলেটা। তার দিকে ধ্যান না দিয়ে হাঁসের বাচ্চা দেখা হচ্ছিল! একেবারে ঠিক আছে। কিন্তু সুবহা তখনো কেঁদে চলেছে। ফট করে আষাঢ় দিলো এক ধমক। আঙ্গুল তাক করে শাসনের স্বরে বললো,

" চুউপ।‌ ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদবি না। তুই কি ছোট বাচ্চা? "

সুবহা কম্পিত হাতে শূন্য পিরিচ দেখালো। অস্ফুট স্বরে বললো,

" আপিল। "

" হ্যাঁ আপেল। আমি সবগুলো খেয়ে ফেলছি। সকালে তুই আমার চানাচুর খেয়ে ফেলেছিলি না? তোকে কিছু বলার আগেই বাবা আমাকে বকলো। এখন আমি তোর আপেল খেয়ে ফেললাম। অঙ্ক শেষ। "

কাঁদছে সুবহা। আঙ্গুল তাক করে পিরিচে।

" আপিল! "

" ইশ্। তুই কি পেটুক রে সাবু! এত খাস সব যায় কোথায়? এত্তুটু একটা পেট। "

সুবহা'র ছোটখাটো সমতল পেটে টোকা দিয়ে বললো আষাঢ়। অতঃপর নিজের ভারী বড়সড় পেটে হাত বুলাতে বুলাতে, বেশ ভাব নিয়ে বললো,

" আমাকে দেখ। কত্ত সুন্দর পেটু। সব খাবার এখানে জমা রাখি। তোর গুলো তো খালি হাগু হয়ে বের হয়ে যায়। ইশ্! ছিঃ! "

আষাঢ় এমন মুখভঙ্গিতে বলছে যেন পৃথিবীতে একমাত্র সুবহা ই টয়লেট নামক স্থানে যায়। বাকিরা সব টয়লেট হতে শত মাইল দূরে। বাচ্চা সুবহা কি বুঝলো কে জানে। আরো উঁচু স্বরে কেঁদে উঠলো। ব্যাস। এবার বাড়ির অন্দরমহলে টনক নড়লো। বাড়ির পেছনদিকে অবস্থিত রসুইঘর। সেথা হতে হাঁক ছেড়ে ডেকে উঠলেন ছোটমা শামীমা,

" অ্যাই আষাঢ়! সুবহা কাঁদে কেন? তুই কিছু বলেছিস নাকি? "

সুবহা সশব্দে কাঁদছে। আর হাসছে আষাঢ়। ওকে ব্যাঙ্গ করে কানের কাছে দুই হাত নিয়ে ভেংচি কেটে দিলো। নাচিয়ে চলেছে জিভ। লাল টুকটুকে মুখে পাকা বৈঠক বেয়ে ছড়ছড়িয়ে নেমে গেল সুবহা। কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ করলো বাড়ির অন্দরে। ক্রন্দনরত স্বরে ডেকে চলেছে,

" মা! "

আষাঢ় হাসছে। বেশ বিনোদন হলো। এবার যাওয়া যাক। দাদাভাই টের পেলে আচ্ছামতো বকবে। সে তো ভালো বাচ্চা। শুধু শুধু বকা শুনবে কেন? হুঁ! বৈঠক হতে নেমে এলো আষাঢ়। ভারী শরীর নিয়ে হেলেদুলে যাচ্ছে বাড়ির বাহিরে। জিভে এখনো লেগে আপেলের স্বাদ। বেশ মজা ছিল কিন্তু! শুধু আকারে ছোট। সমস্যা নেই। পেট ভরে গেছে। আবার আধঘন্টা পরে খাবে নে।

•

তমসাচ্ছন্ন রজনী। উন্মুক্ত ঘরের জানালা। চাঁদের আলো লেপ্টে রয়েছে ঘরের অভ্যন্তরে। জ্ব'লছে মাঝারি ভোল্টেজের বাতি। বিছানায় বসে আয়ানা। দু পা ডান দিকে ছড়িয়ে রাখা। স্বল্প ঝুঁকে বসে চতুর্দশী মেয়েটি। মন দিয়ে অঙ্কের সমাধান করে চলেছে। কলমের কুচকুচে কালো রঙা কালি ব্যস্ত সাদা কাগজে সমাধান কষতে। চোখ জোড়া বারবার নিবদ্ধ হচ্ছে বইয়ের পাতায়। মনোযোগ সহকারে অঙ্ক করছে মেয়েটা। এমনই ব্যস্ত মুহূর্তে ঘরে প্রবেশ করলেন আফরোজা। থমথমে মুখশ্রী। ধীরপায়ে এগিয়ে গেলেন বিছানায়। বড় সন্তান অঙ্ক সমাধানে লিপ্ত। ফট করে একটানে খাতাটা ছিনিয়ে নিলেন উনি। হতবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকালো আয়ানা!

" মা! "

" সময়জ্ঞান সব লোপ পাইছে নি? ওইদিকে সবাই খাওন রাইখা বইয়া আছে, আর তুমি পড়াল্যাহা দেহাইতাছো? খুব শিক্ষিত হইয়া গ্যাছো বুঝি? "

আফরোজা অত্যন্ত অনম্র গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন। আয়ানা অবাক! মা এসব কি বলছে! সে তো শেষ অঙ্কটার সমাধান করে এখনই খেতে যেতো।

" মা আমি.. এখনই যেতাম। "

আফরোজা নিজ ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে ওকে চুপ করার আদেশ করলেন।

" হুশশ্। আর একখানও বাজে কথা না। চুপচাপ খাইতে যাও। তোমার লাইগা দাদার পরাণ কানতাছে। যাও। "

শেষোক্ত শব্দে প্রকাশ পেল ধমক। নিঃশব্দে বই বন্ধ করে ফেললো আয়ানা। আফরোজা হাতে থাকা খাতাটা একপ্রকার ছুঁড়ে ফেললেন বিছানায়। খাতাটা ঠিকঠাক করে নাখুশ মনে বিছানা ছেড়ে নেমে এলো চতুর্দশী কিশোরী। বড় বড় পা ফেলে বেরিয়ে গেল ঘর হতে। বিড়বিড় করে উঠলেন আফরোজা,

" সব কয়ডা আমারে জ্বালাইয়া খাইলো। "

•

রাতের খাবারের আয়োজন করা হয়েছে বাড়ির বড় ঘরটিতে। মেঝেতে মুখোমুখি বিছানো বড়সড় দু'টো মাদুর। সে মাদুরে বসে পরিবারের সদস্যরা। নৈশভোজের জন্য রয়েছে দুই পদের তরকারি। এছাড়া ডিম ভুনা। কৈ মাছ ভুনা। আষাঢ় বসে রয়েছে তার বাবা ফারুক সাহেবের বাম পাশে। হৃষ্টপুষ্ট শরীরটা নিয়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে অর্ধেক উঠে পড়েছে ছেলেটা। চক্ষু জোড়া ঘুরে ঘুরে খাবারের পদ দেখছে। তরকারি! ইশ্! নাক ছিটকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। কৈ মাছের ঝোল! সুস্বাদু লাগছে তো! ফট করে কৈ মাছের ঝোলে তর্জনী ডুবিয়ে দিলো আষাঢ়। চেটে খেল আঙ্গুল।

" হুম। মজা আছে। "

তাফাজ্জল সাহেব তা খেয়াল করলেন। তৎক্ষণাৎ নরম স্বরে নাতীর ভুল শুধরে দিলেন। বললেন,

" দাদুভাই। এভাবে খাবারের মধ্যে হাত দিতে নেই। সবাই খাবে। "

আষাঢ় বোকা হাসলো। স্বপক্ষে বললো,

" আমি তো হাত দিইনি। আঙ্গুল দিয়েছি। এই দ্যাখো। "

নিজের ছোট আঙ্গুলটা ঘুরিয়ে দেখালো আষাঢ়। তাতে মৃদু লেপ্টে মাছের ঝোল। বাকিটা চেটেপুটে খেয়েছে কিনা! সুবহা ওর ঝোলমাখা আঙ্গুল দেখে মজা পেল। গা কাঁপিয়ে নিঃশব্দে হাসছে মেয়েটা। আফরোজা তাতে চরম অসন্তুষ্ট। কিছুটা বিরক্তিকর স্বরে শ্বশুরের উদ্দেশ্যে বললেন,

" আব্বা! ও ছোট বাচ্চা। বুঝবার পারে নাই। "

তাফাজ্জল সাহেব পানি ভর্তি স্টিলের বাটিতে হাত ধোয়ার ফাঁকে জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূকে বললেন,

" এই ছোট বয়সটাই শেখার জন্য আদর্শ সময়। এসময় যা শিখবে, জানবে ভবিষ্যতে তা-ই করবে। "

দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন আফরোজা। এত জ্ঞান ওনার গায়ে সয় না। গা জ্বা'লা করে রীতিমতো। উনি নিজের ছেলেকে খাবার পরিবেশন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বাড়ির মেজো বউ সাফিয়া, শ্বশুরের খাবার পরিবেশন করে দিচ্ছে। ছোট বউ শামীমা ব্যস্ত ভাসুরদের খাবার পরিবেশন করতে। তন্মধ্যে আষাঢ় মা'কে বলে উঠলো,

" মা। আমি আস্ত ডিম খাবো। "

" আচ্ছা বাপজান। এইতো দিতাছি। "

আফরোজা খুশিমনে ডিম ভুনার বাটি হাতে নিলেন। আস্ত একটা ডিম উঠালেন চামচে। তুলে দিলেন ছেলের প্লেটে। আষাঢ় দাঁত বের করে সন্তোষজনক হাসি উপহার দিলো। আষু ভাইকে আস্ত ডিম খেতে দেখে ছোট সুবহা'র মনেও ডিম খাওয়ার বাসনা জাগলো। আস্ত ডিম খাবে সে। তাই সে-ও বলে উঠলো,

" আমিও দিম কাবো। "

ওর অস্পষ্ট আবদার উচ্চারিত হবা মাত্রই ধমকে উঠলেন আফরোজা। চমকালো উপস্থিত সকলে! এ কেমন ধরনের বিরূপ আচরণ! আফরোজা বলে উঠলেন..

#আষাঢ়গগণে_প্রণয়াসক্তা

#তাহিরাহ্_ইরাজ

| সূচনা পর্ব |

[ আসসালামু আলাইকুম পাঠকবৃন্দ। হাজির এলাম নতুন কাহিনী, এক নয়া জুটিকে নিয়ে। প্রথমবারের মতো শৈশবের ঘটনা হতে কাহিনী আরম্ভ করলাম। কাহিনীর স্বার্থে অল্প কয়েকটি পর্ব ওদের ছোটবেলার হতে চলেছে। কয়েকটি লেয়ারে সাজানো এই রোমান্টিক ঘরানার গল্পটির মূল প্লট। ধাপে ধাপে কাহিনীতে পরিবর্তন আসবে। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।

২০২৩ সালের শেষের দিকে গল্পটি আরম্ভ করেছিলাম। ৭/৮ পর্ব শেষে আর কনটিনিউ করা হয়নি। তাই তো ২৬ সালে নতুন আঙ্গিকে হাজির হলাম আষু ভাইয়া এবং তার সাবুদানা'কে নিয়ে। কাহিনীতে বেশ পরিবর্তন থাকবে। কিছু চরিত্র বদলেছে। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে এই নতুন জার্নি।

তো বন্ধুগণ! চলবে কি ' আষাঢ়গগনে প্রণয়াসক্তা? ' মূল্যবান মতামত জানাতে ভুলবেন না যেন।

📌 পাঠক বন্ধুরা....

তাহিরাহ্'র লেখা গল্প-উপন্যাস সম্পর্কিত ছোট-বড় অনুভূতি ব্যক্তকরণ, গল্প নিয়ে আলোচনা, ভুলত্রুটি শুধরে দেয়া, রিভিউ প্রদান এবং গল্পের চরিত্র-দৃশ্য নিয়ে মতামত পেশ করতে জয়েন করুন আমাদের গল্প সংক্রান্ত গ্রুপে...

গ্রুপ লিংক 🍁

https://www.facebook.com/groups/499389245208190/?ref=share ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন