#আষাঢ়গগণে_প্রণয়াসক্তা
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[৫]
" নিজেগো মুরোদ নাই বইলা এহন চুরিচামারি আরম্ভ কইরা দিছো? "
থমকে গেলেন সাফিয়া, শামীমা। নিজস্ব আলাপণ ভঙ্গ করে তাকালেন বড় জা'য়ের দিকে। ওনাদের মুখভঙ্গি জানান দিচ্ছে কতটা হতবিহ্বল ওনারা! মেজো জা সাফিয়া বলে উঠলেন,
" কি হয়েছে ভাবী? কি চু'রির কথা বলছেন? কিছু হারিয়ে গেছে কি? "
" একদম ন্যাকামি করবা না মেজো বউ। তোমরা কী ভাবছো? আমি ঘাসে মুখ দিয়া চলি? কিচ্ছু বুঝি না? "
একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন সাফিয়া, শামীমা। উঠে দাঁড়ালেন ওনারা। এখনো বোধগম্য হচ্ছে না, হুটহাট কোন বিষয়ে অপমানিত হচ্ছেন তারা। শামীমা শান্ত স্বরে প্রশ্ন করে উঠলেন,
" বড় ভাবী, কি হয়েছে? স্পষ্ট করে বলুন। এভাবে হুটহাট অপমান করা শুরু করলে আমরা বুঝবো কি করে, আসলে হয়েছেটা কি? পুরো বিষয়টা একটু খোলাসা করে বললে, ভালো হতো না? "
ধমকে উঠলেন আফরোজা,
" চুপ করো তুমি। ছোডো, ছোডোর মতোই থাহো। "
শামীমা আলতো হেসে বললেন,
" ছোটকে যখন কথা শোনাতে পারছেন, ছোট পাল্টা প্রশ্ন করতে পারবে না? "
আর'ক্ত চাহনিতে তাকিয়ে আফরোজা। র'ক্তকণিকা টগবগ করে ফুটে চলেছে। নৈঃশব্দ্য বুদবুদ হচ্ছে বুকের ভেতরে। সাফিয়া ছোট জা'কে ইশারায় চুপ করতে বললেন। বড় জা'কে কোমল স্বরে প্রশ্ন করলেন,
" কি চুরির কথা বলছেন ভাবী? কিছু হারিয়ে গেছে?"
শামীমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সাফিয়ার দিকে তাকালেন আফরোজা,
" হ গেছে। বাড়িতে তোমাগো মতন ছোডোলোক থাকলে চুরি হইব না? "
শামীমা অধৈর্য হয়ে বলে উঠলেন,
" ভাবী কি খোয়া গেছে দয়া করে একটু বলবেন? তাহলে খুঁজতে সুবিধা হতো। "
দাঁতে দাঁত পিষে আফরোজা প্রশ্নবিদ্ধ করলেন দুই জা'কে,
" ব্যালেনডার। আমার ব্যালেনডার কই? "
" ব্যালেনডার! এটা আবার কি? "
চমকিত চোখে তাকিয়ে মেজো বউ সাফিয়া! শামীমা খানিকক্ষণ ভেবে নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করলেন,
" ব্লেন্ডার? "
আফরোজা অনম্র গলায় বললেন,
" হ, ওইডাই। কই রাখছো, হাচা কইরা কও। "
" আশ্চর্য! আপনার ব্লেন্ডার কোথায় রেখেছেন আমরা কি করে জানবো? "
শামীমা কথাটি বলতে না বলতেই তেঁতে উঠলেন আফরোজা,
" চুপ! মুহে মুহে বড় কথা কও কোন সাহসে? জীবনে কোনোদিন ওইসব দামী জিনিস দেহছো নি? যেই দেহলা, অমনি লোভ সামলাইতে পারলা না? চুপিচুপি সরাইয়া হালাইলা? "
" ভাবী! " অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠলেন আশ্চর্যান্বিত সাফিয়া!
" হাচা কইরা কও, আমার ব্যালেনডার কই রাখছো? কও। "
অভব্য স্বরে জানতে চাইলেন আফরোজা। শামীমা অপমানে র'ক্তিম হয়ে উঠছেন। দৃঢ় স্বরে বললেন,
" বড় ভাবী, আমরা হয়তো আপনার মতো দামী দামী জিনিসপত্র ব্যবহার করি না। কখনো দেখিনিও। দেখবো কি করে? আমাদের স্বামী তো আর শহর থেকে ভুড়িভুড়ি দামী জিনিসপত্র পাঠায় না! তাই বলে আমরা এত ছোটলোক নই যে, ঘরের লোকের দামী জিনিসটা চুরি করে নেবো। নিজের হিসেবে ব্যবহার করবো। আমরা হয়তো আপনার মতো উচ্চবিলাসী নই। তাই বলে মন থেকে ছোটলোকও নই। মনটা আমাদের আজও বড়। স্বাভাবিক। আশা করি পরেরবার থেকে নিজের দামী দামী জিনিসপত্র ভালোমতো সামলে রাখবেন। তাহলে আর কাউকে অহেতুক চোর অপবাদ দিতে হবে না। "
গা জ্বালানো এক সুমিষ্ট হাসি উপহার দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়ালেন শামীমা। পিঁড়িতে বসে নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে আফরোজা। মুষ্টিমেয় হয়ে বসেছে দু হাত। চক্ষুদ্বয়ে অ'গ্নুৎপাত। ভ'স্ম করে দিতে মরিয়া সব। আস্তে করে দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন সাফিয়া। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজ কর্মে মনোনিবেশ করলেন। অকল্পনীয় এমন অবজ্ঞা সহ্য করতে ব্যর্থ হলেন আফরোজা। অত্যধিক হিসহিসিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন।
•
" আরে হচ্ছে না। আরেকটু ভালো করে। হ্যাঁ হ্যাঁ হচ্ছে। আরে না গাঁ'ধী। এভাবে না। হ্যাঁ! এবার হচ্ছে। করতে থাক। "
মধ্যাহ্নের শেষ প্রহর। সূর্যের উষ্ণ তেজ অনেকটাই ম্লান হয়ে গিয়েছে। ভাতঘুমে তলিয়ে গ্রামবাসী। শুধু ঘুম নেই তিন প্রাণীর চোখে। আম গাছতলায় দাঁড়িয়ে মাস্টার দ্য 'তাবারিক তৌকির আষাঢ়'। গাছে ওঠার চেষ্টায় লিপ্ত তার বাধ্যগত শিষ্যা 'তোহ্ফা তৌকির সুবহা'। এতদিন নিজে গাছ বেয়ে বেয়ে 'বান্দর' উপাধি পেয়েছে। এখন শিষ্যকেও সে পথে চালিত করছে আষাঢ়। শাসন মিশ্রিত সে চোখ দু'টো দেখে দমে গেল সুবহা। মৃদু কৌতূহল আর ব্যাপক শাসনের ফলস্বরূপ আজ এ মুহূর্তে গাছে ওঠা শিখছে সুবহা। ওকে যথার্থভাবে নির্দেশনা দিয়ে চলেছে গুরু আষাঢ়। ভাইয়ের থেকে সামান্য পেছনে দাঁড়িয়ে অষ্টাদশী আয়ানা। মুখে লেপ্টে মুচকি হাসির রেখা। তার ছোট ভাইটা আসলেই পা'গল। দুপুরবেলায় কোথায় খেয়েদেয়ে শান্তিতে ঘুম দেবে, তা নয় পুরো গ্রামে টো টো করে বেড়াচ্ছে। একটুও স্থির নেই। সঙ্গিনী রূপে এখন সুবহাটা'কেও বগলদাবা করে ঘুরছে। হাহ্! তপ্ত শ্বাস ফেললো মেয়েটা। তখনই শুনতে পেল তীব্র শাসনের সুর,
" ওরে হলদি ক্ষেতের ব'লদি! এখনই তো হাত-পা ভেঙ্গে চিৎপটাং হতি। সাবধান। "
কোমল দু হাত, পায়ে বৃক্ষদেহ জড়িয়ে সুবহা। ভীতসন্ত্রস্ত মায়াবী স্বরে বললো,
" আষু ভাইয়া! নামবো। ভয় করছে। "
তর্জনী তাক করে শাসিয়ে দিলো আষাঢ়,
" খবরদার নামবি না। আমি জানি তুই পারবি। আর একটুখানি বাকি। চেষ্টা কর। হয়ে যাবে। "
ধীরলয়ে করতালির ধ্বনি ভেসে বেড়াচ্ছে আশপাশে। আষাঢ় করতালি দিয়ে ওকে জোরালো উৎসাহ প্রদান করছে,
" হব্বে হব্বে। আরেকটুখানি। সাব্বাশ! এই তো। ওঠ ওঠ। "
ভয়ে ভয়ে ছোটোখাটো গাছ বেয়ে উর্ধ্বমুখী চলেছে বালিকা। হাত দু'টো চেপে বসে গাছের শরীর। হাত ও পায়ের পারদর্শিতায় সফলতা আসছে ধীরে ধীরে। একটু একটু করে অনেকখানি উঠতে সক্ষম হলো সুবহা। করতালির ধ্বনিতে মুখরিত পরিবেশ।
" সাব্বাশ সাবুদানা। আর না। আজ এতটুকু থাক। কালকে আবার বাকিটা। "
ভয়ালু স্বরে বলে উঠলো সুবহা,
" নামবো। "
আয়ানা গাছের দিকে এগিয়ে এলো। আদুরে ছোট বোনটাকে ভরসাযোগ্য স্বরে বললো,
" ভয় পায় না বোন। আমরা আছি তো। তুই আস্তে ধীরে নেমে আয়। "
" ভয় লাগে তো আপা। " কেঁদে দেবে এমন অবস্থা মেয়েটির।
" কিচ্ছু হবে না বনু। আমরা আছি তো। তুই না সাহসী বাচ্চা? আয় নেমে আয়। "
আষাঢ় এসে দাঁড়ালো বড় বোনের পাশে। ওকে সাহস জুগিয়ে বললো,
" সাবুদানা, আমি জানি তুই পারবি। গত দিনগুলো যেমন করে নেমেছিস ওভাবেই নেমে আয়। ধীরে সুস্থে। আস্তে। "
হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে ওকে নেমে আসার নির্দেশনা দিয়ে চলেছে আষাঢ়। চোখে ভরসার হাতছানি। এমন ভরসায় ভীত ভাব কিছুটা হলেও লাঘব হলো। ভীতসন্ত্রস্ত বালিকার বুক হতে নেমে গেল ভয়ার্ত-কম্পিত কয়েক মণ ওজনের বোঝা। বুক ফুলিয়ে গোলাকার ঠোঁট দিয়ে শ্বাস প্রশ্বাস ছাড়লো। ' আল্লাহ্ ' ডেকে উঠে জোরালো শ্বাস ফেললো। আষাঢ় তখন তার বাধ্যগত শিষ্যা'কে নির্দেশনা প্রদানে ব্যস্ত। আষু ভাইয়ের সে নির্ভয়, সাহসী, ভরসার নির্দেশনা মোতাবেক আস্তে ধীরে নেমে আসছে সুবহা। আয়ানা চাপা স্বরে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভাইকে বললো,
" তুই কি যে করিস না ভাই! শুধু শুধু বাচ্চা মেয়েটাকে ভয়ের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছিস! "
আষাঢ় আশ্চর্যান্বিত হয়ে ত্যাছড়া হাসলো,
" বাচ্চা মেয়ে আর সাবুদানা! কক্ষনোই নয়। ওটা আস্ত এক পাকনা বুড়ি। "
কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে হচ্ছে আয়ানা'র। তার ভাই হয়েছে একপিস বটে! পুরো ফ্রেমে বন্দী করে রাখার মতো।
•
আঁধারে তলিয়ে দুনিয়া। বিছানায় বসে আফরোজা। হাতে পিরিচ। তাতে চার পাঁচটি বিস্কুট। শহর হতে ওনার স্বামী পাঠিয়েছেন এগুলো। বাড়ির সকলের জন্য। যদিওবা এই বিস্কুট সম্পর্কে বাড়ির কেউই অবগত নয়। শুধু উনি এবং ওনার একমাত্র পুত্র জানেন। সকলের অগোচরে লুকিয়ে লুকিয়ে ছেলেকে এই বিস্কুট খাইয়ে দেন। দুরন্ত আষাঢ় কোনোমতে নাকেমুখে খেয়েই বাড়ির বাইরে ছোটে। সে জানেও না তার মা সকলের জন্য পাঠানো খাবারগুলো এভাবে আড়ালে-আবডালে রাখে। তার জানামতে বাড়ির সকলেই এ খাবারের সমান ভাগ পায়। তাছাড়া তার ওত সময়টাই বা কোথায় এসমস্ত গৃহস্থালি ঝুট ঝামেলায় থাকার? সারাদিন রাত কতশত কাজই না করতে হয়! তাই সেভাবে কেউই জানে না যে, ফারুক সাহেব শহর থেকে মুখরোচক দামী বিস্কুট এবং আরো কিছু খাদ্যদ্রব্য পাঠিয়েছেন। মনে বিদ্বেষ পুষে রাখা আফরোজা, সকল কিছুই লুকিয়ে রাখেন। যেগুলো লুকানো সম্ভব হয় না, আকারে বড় শুধুমাত্র সেগুলোই প্রকাশ্যে আনেন। এত বছরে ওনার এই নিচু মানসিকতার সঙ্গে কম-বেশি বাড়ির সকলের পরিচয় ঘটেছে। তাই আজ আর কেউ অবাক হয় না। স্বাভাবিক মনে করে মেনে নেয়। আফরোজা এমনই এক মা, যে কিনা প্রায়শ বড় মেয়েকেও এসব খাবার খেতে দেন না। ওনার ভাষ্যে মেয়েমানুষের এত খেয়ে কি কাজ? ছেলে ওনার বড় হচ্ছে। এখন কিশোর। বছর কয়েক পরে প্রাপ্তবয়স্ক হবে। সারাদিন খেলাধুলা করে, পড়াশোনা করে, ভবিষ্যতে অর্থ উপার্জন করে বাড়ির হাল ধরবে.. স্বাভাবিকভাবেই ওর বেশি বেশি খাওয়া উচিত। পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। মেয়ে আয়ানা তো ঘরে বসে বসেই দিন পার করে। কিইবা পরিশ্রম করে! ও শুধু শুধু খাবারগুলো অপচয় করবে। তারচেয়ে ওনার আদরের বাপজান খাক। কাজে দেবে।
তৃতীয় বিস্কুটে কা'মড় বসালেন আফরোজা। মচমচ ধ্বনিতে ভাঙলো বিস্কুটের এক কোনা। প্রবেশ করলো মুখে। বালিশের পাশে রাখা ওনার বাটন মোবাইল। এই নিয়ে চতুর্থবারের মতো রিংটোন বেজে চলেছে। শহর হতে ফোন করছে ওনার স্বামী ফারুক সাহেব। রাতের এই অবসর সময়ে ওই রষকষহীন পুরুষের সঙ্গে কথা বলার কোনোরকম মনমানসিকতা নেই আফরোজা'র। উনি তৃপ্তি করে বিস্কুট খেতে ব্যস্ত। আজ রাতের খাওয়া অতটাও ভালো হয়নি। রাঁধতে ইচ্ছে করছিল না। কোনোরকম হালকা পাতলা রেঁধেছেন। নাহলে ওনার ছেলেমেয়েরা, উনি খাবেন কি? বুড়ো শ্বশুর তো বাকিদের সঙ্গে খায়। বেঁচে গেলেন উনি। একজনের খাবার অপচয় হতে রক্ষা পেল। পিরিচে অবশিষ্ট বিস্কুট খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন আফরোজা। উঠে দাঁড়ালেন। এগিয়ে গেলেন ঘরে অবস্থিত কাঠের টেবিলের ধারে। সেখানে পিরিচ রেখে দিলেন। নীলাভ প্লাস্টিকের জগ হতে কাঁচের গ্লাসে পানি ঢেলে নিলেন। জগ রাখলেন পূর্বের স্থানে। পুরো এক গ্লাস পানি পান করলেন উনি। আহ্! শান্তি। এবার রাতে ঠিকমতো ঘুম হবে। ঘরের আলো নিভিয়ে, খুশিমনে বিছানায় এগিয়ে গেলেন উনি। বালিশ ঠিক করে শুয়ে পড়লেন। ধীরে ধীরে তন্দ্রা জড়িয়ে ধরলো চোখ জোড়া। সময় এখন ঘুমানোর।
•
রৌদ্রতপ্ত ঝকঝকে এক মিষ্টি সকাল। বাড়ির চারিদিকে সারি সারি হরেকরকম গাছপালা। মৃদুমন্দ বাতাসের পরশ তাদের সমহিমা উপস্থিতির জানান দিচ্ছে। কখনো সখনো শুকনো পাতার দল উড়ে উড়ে আলতো ভাবে ধেয়ে আসছে বাড়ির প্রাঙ্গনে। মাঝেমধ্যে বাড়ির ডান পাশে অবস্থিত পুকুর সংলগ্ন গোয়ালঘর হতে ভেসে আসছে দু'টো গাভীর জোড়ালো-ভারিক্কি 'হাম্বা' ধ্বনি। কখনো আবার পাশের 'হিন্দু বাড়ি' থেকে চাপকল চাপার ক্যাচক্যাচ ধ্বনি কানে পৌঁছাচ্ছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে রান্নার ফলে লাকড়ি নির্গত ধোঁয়া। নাকে ঠেকছে তারই পোড়া পোড়া গন্ধ। এ যে বাংলার দৈনিক গ্ৰামীণ পরিবেশের চিত্র।
হাতে মাটির তৈরি মোবাইল। কানে ঠেকিয়ে রাখা সেটা। মিথ্যেমিথ্যে ফোনালাপে লিপ্ত বালিকা। একাকী হাসছে, হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে। পড়নে তার সাদা লাল মিশেলের নকশা করা ফ্রক। কথা বলতে বলতে কাঁচারি ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সুবহা। পথিমধ্যে লম্বা চওড়া এক শক্তপোক্ত বাঁধা। ফট করে মাটির তৈরি মোবাইলটি ছিনিয়ে নিলো সে আগন্তুক। আঁতকে উঠলো সুবহা!
" আমার মোবাইল! "
" ইহ্ মোবাইল! মাটিমুটি দিয়ে বানালেই মোবাইল হয়ে গেল? এটা তো আস্ত এক মাটির দলা। মোবাইল কোথায়? "
বুকে ভর করলো কয়েক মণসম দুঃখ! তার ছোট দু হাতের তৈরি মোবাইল এটা। ফুপির বানানো মোবাইল দেখে নিজে থেকে চেষ্টা করেছে সে। হ্যাঁ, পুরোপুরি মোবাইলের আকার হয়নি। একটু অসুন্দর। তাই বলে আষু ভাইয়া মাটির দলা বলে অপমান করবে!
" আষু ভাইয়া, মোবাইলটা দাও না। "
নম্র-আকুল স্বরে মোবাইল চাইলো মেয়েটা। আষাঢ় দাঁত বের করে হাসলো। উঁচুতে তুললো মোবাইল ধরা ডান হাতটি। রসিকতা করে বললো,
" পারলে নিজে নে। "
সন্নিকটে এলো সুবহা। জমিন হতে উঁচু হলো পা। পাঁচ আঙ্গুলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে সে। দু'হাত উঁচুতে তুলে ছটফট করে চলেছে মোবাইলটি আয়ত্ত্বে নেয়ার জন্য। তাতে পানি ঢেলে দুষ্টুমি করে চলেছে আষাঢ়। এমনিতেই উচ্চতায় এতখানি লম্বা। তার ওপর হাতটা ইচ্ছাকৃতভাবে আরো উঁচু করে ফেলছে। ফলস্বরূপ মোবাইল ধরতে চরমভাবে ব্যর্থ সুবহা। সে তো উচ্চতায় ছোট। আষু ভাইয়ার কোমর বরাবর। অত উঁচু থেকে মোবাইল নেবে কি করে? বারকয়েক বৃথা চেষ্টা করে দমে গেল মেয়েটা। নিজ ছোট ছোট দাঁত বা হাতের নখ দিয়েও যে প্রতিবাদ করবে তারও উপায় নেই। আষু ভাইয়ার মাংসল হাত দুটি যে উর্ধ্বে! এক হাতে মোবাইল। আরেক হাত বর্তমানে বুদ্ধি করে উপরে তুলে রাখা। আষু ভাইয়ার জানা সাবুদানা'র দৌড় কতদূর! কয়েক পা পিছপা হলো ব্যর্থ মেয়েটি। উল্টে যাচ্ছে ছোট ছোট ঠোঁট দুটো। লালাভ রঙ মেখে মুখশ্রীতে। এই বুঝি কেঁদে দেবে। এমন রূপ দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললো আষাঢ়। নিচুতে নামালো দুই হাত।
" তুই না আস্ত ছিঁচকাদুনে। কিছু হলেই খালি কাঁদে। ভ্যাঁ ভ্যাঁ।"
" আষু ভাইয়া! " করুণ সে স্বর।
ধমকে উঠলো আষাঢ়,
" আষু ভাইয়া কি রে? হ্যাঁ? আমার নাম আষাঢ়। তাবারিক তৌকির আষাঢ়। মা বাবা কত্ত সুন্দর একটা নাম রেখেছে। আর তুই আষু আষু ডেকে নামটা বাসি বানিয়ে ফেলছিস! এখন থেকে সুন্দর করে ডাকবি আমায়। আষাঢ় ভাইয়া কিংবা শুধু ভাইয়া। কোনো আষু টাষু নয়, ঠিক আছে? "
ধীরলয়ে মাথা নাড়লো সুবহা। শৈশবের সে-ই পুরনো অভ্যাস তো। সে পরিবর্তন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। ওকে ইতিবাচক মাথা নাড়াতে দেখে মিলিমিটার মায়া হলো ছেলেটার। তাই স্বেচ্ছায় মাটির তৈরি মোবাইলটি ফেরত দিলো। মোবাইল বাড়িয়ে,
" এই নে তোর মোবাইল। ছিঁচকাদুনে কোথাকার। কিছু হওয়ার আগেই চোখে পুষ্করিণী। "
শখের মোবাইল ফেরত পেয়ে ঝলমলে হাসলো সুবহা। শীতের কুয়াশামাখা ভোরে গাছের পাতায় লেপ্টে থাকা আহ্লাদে শিশিরবিন্দুর ন্যায়.. নজরকাড়া-নির্মল সে হাসি! সে হাস্য উজ্জ্বলতা দেখে মুচকি হাসলো আষাঢ়। তখনই ফিসফিসিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলাপণ করতে করতে, বাড়িতে প্রবেশ করলো কাজিনমহল। তাদের লক্ষ্য করলো আষাঢ়, সুবহা। ওদের দু'টিকে লক্ষ্য করে থেমে গেল বাকিরাও। পলাশ ও ইখফা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। ইশারায় একে অপরকে কোনো গুপ্ত অনুরোধ জানাচ্ছে। দু'জনেই নেতিবাচক মাথা নাড়ছে। পলাশ চাইছে এই বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষা তার ছোট বোন ইখফা-ই পেশ করুক। এদিকে ইখফা নিজের ওপর ভরসা করতে পারছে না। সে চাইছে ভাইয়া এগিয়ে আসুক। সে ই লুকোচুরি বাক্যগুলো সুন্দরভাবে শব্দমালায় গুছিয়ে বলুক। ওদের এই ইশারায় ইশারায় গোপন আলাপ লক্ষ্য করে এগিয়ে এলো সুবহা। দাঁড়ালো ইখফা পাশে। ফুফাতো ভাই পলাশ'কে কৌতূহলী স্বরে প্রশ্ন করলো,
" ভাইয়া কি হয়েছে? তুমি অমন করে ইশারায় কি বলছো? "
পলাশের ঠিক ডান পাশেই দাঁড়িয়ে হাসনা, হেনা। এ বাড়ির কনিষ্ঠ পুত্র ফজল সাহেব তাদের জন্মদাতা পিতা। সম্পর্কে তারা আষাঢ়, সুবহা'র জমজ চাচাতো বোন। বয়স মাত্র চার। জমজ দু'টিতে একই রঙা পোশাক পড়ে দাঁড়িয়ে। মাথার ঠিক মাঝ বরাবর ছোট্ট ঝুঁটি। চেহারায় বেশ মিল তাদের। হাসনা একটু স্বাস্থ্যবান, আর সেই তুলনায় হেনা কিছুটা শুকনো। এ-ই পার্থক্য। হাসনাহেনা ফুলের নামানুসারে তাফাজ্জল সাহেব কনিষ্ঠ এই জমজ নাতনিদ্বয়ের নামকরণ করেছেন। সুবহা আপার প্রশ্ন শুনে চুপ থাকতে পারলো না হেনা। আধো আধো কণ্ঠে বলে উঠলো,
" আমলা খাবো। "
আধো বাক্য কানে পৌঁছাতেই কুঞ্চিত হলো ভ্রু। এগিয়ে এলো আষাঢ়। দাঁড়ালো সুবহা'র বাম পাশে।
" কি? খাবি? এ অবেলায় কি খাবি? "
এ-ই মোক্ষম সুযোগ। চোখের পলকে স্থান পরিবর্তন হলো সুবহা'র। ইখফা তার হাত ধরে কিছুটা দূরে নিয়ে গেল। কানের কাছে ঠেকালো ঠোঁট। ফিসফিসিয়ে যথাসম্ভব সংক্ষেপে জানালো তাদের গোপন অভিলাষ। সবটা শুনলো সুবহা। চমকালো বেশ! গোল গোল চোখে তাকিয়ে ইখফার দিকে। ইখফা আস্তে ধীরে মাথা ওপরনিচ করলো। অর্থাৎ বিষয়টা সত্য। সুবহা শুকনো ঢোক গিলে বললো,
" আ আমি? "
" হ্যাঁ রে, তুই। একটু বল না। "
কণ্ঠস্বর যথেষ্ঠ খাদে নামিয়ে সুবহা নেতিবাচক কথা বললো,
" হবে না রে। আষু ভাইয়া মানবে না। "
" মানবে মানবে। তুই একটু দয়া করে বলে দেখ না। তুই না আমাদের বনু? ভালো বনু? "
সুবহাকে মানানোর জন্য ঘ্যানঘ্যান করে চলেছে ইখফা। উপায় নেই। আবার অন্তরে জেঁকে বসেছে ইচ্ছে। নিঃসন্দেহে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অফুরন্ত আনন্দ হবে। চমৎকার এক বিনোদন! এমন সুযোগ হাতছাড়া করা বোকামি বৈ অন্য কিছু নয়। কতদিন এমন করা হয় না! ফলস্বরূপ বুকে জমালো সাহস। উঁচু হলো মাথা। আষু ভাইয়ের দিকে এগিয়ে গেল সুবহা। দাঁড়ালো পাশে। ক্ষণিকের জন্য পিনপতন নীরবতা। থমকে পরিবেশ! পলাশ ইশারায় ছোট বোনের কাছে জানতে চাইলো, 'কদ্দূর'? ইখফা পটু ভাবে চোখ টিপে দিলো। তাতেই কাঙ্ক্ষিত জবাব মিলে গেল। স্বস্তি পেল পলাশ। উপস্থিত চারজন তাকিয়ে সুবহা আর আষাঢ়ে। আষাঢ় ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো সাবুদানা'কে,
" কি রে? কি পাকাচ্ছিস ভেতরে ভেতরে? সরাসরি উগড়ে দে।"
সুবহা বোকা হাসলো। আষু ভাইয়া ঠিক টের পেয়ে গেছে। মেয়েটা আস্তে ধীরে কোমল স্বরে বললো,
" আষু ভাইয়া! আমরা না.. "
" তোরা কি? "
" আমরা.. ওই মানে.. "
" প্যানপ্যান না করে সরাসরি বল তো। নইলো ফোট। "
ফট করে বলে উঠলো সুবহা,
" আমরা চড়ুইভাতি করতে চাই। "
" ওহ্ আচ্ছা। কি?! "
প্রথমে ঠিক লক্ষ্য করেনি আষাঢ়। এবার মস্তিষ্কে কড়া নাড়লো বিষয়টি। চড়ুইভাতি করতে চায় এরা! কবে কখন কেন?
" কবে? "
সাহসিকতা এলো ফিরে। জবাব দিলো পলাশ,
" আজকে করতে চাই। দুপুরবেলায়। তুমি দয়া করে রাজি হয়ে যাও ভাইয়া! প্লিজ। তোমাকে ছাড়া একটুও মজা হবে না। "
আলাদাই এক ভাব নিয়ে গেঞ্জির কলার ঠিক করতে ব্যস্ত হলো আষাঢ়। এমতাবস্থায় বললো,
" মজা হবে না নাকি ঠিকমতো কাজ হবে না? "
ফ্যাকাশে মুখে তাকিয়ে পলাশ। ভাইয়া বেশ চালু আছে। সব বুঝে যায়। আসলেই তো। ভাইয়া যেভাবে দক্ষতার সাথে সবকিছু সামলাতে জানে, ওরা তা জানে না। পারেও না। সঠিক নির্দেশনা আর পরিকল্পনার অভাবে দেখা গেল চড়ুইভাতি শেষমেষ কাকভাতি হয়ে গেল! অসম্ভব। মাথা ঝাঁকিয়ে কু চিন্তা দূরীকরণ করলো পলাশ। জোরপূর্বক আলতো হেসে একদম মাখন মাখিয়ে বলতে লাগলো,
" ভাইয়া। আমার সোনা ভাইয়া। বড় ভাইয়া। রাজি হয়ে যাও না। "
হাসনা, হেনা একে অপরের দিকে তাকিয়ে। ওরাও একসাথে বললো,
" লাজি হও নাআআ। "
এতবড় সুযোগ, সাথে ফ্রি'তে মধ্যাহ্নভোজ। উঁহু কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। নিজ মহিমা বজায় রেখে আষাঢ় মাথা নাড়লো। মাছি তাড়ানোর মতো করে হাত ঝাড়া দিলো।
" আচ্ছা আচ্ছা। বাব্বাহ্! এতবার করে বলতে হবে না। আরেকটু হলে তো পায়েই পড়ে যাবি। ঠিক আছে। এত করে বলছিস যখন, আমি.. "
চরম কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে বাকিরা। কি হবে আষাঢ় ভাইয়ের অন্তিম জবাব? ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক? লাব ডাব লাব ডাব নৃত্য চলছে বক্ষমাঝে। পলক ঝাপটাতে ভুলে সব। অবশেষে নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ কিশোরটি বললো,
" আমি রাজি। "
হৈহৈ করে উঠলো সব। সীমাহীন উচ্ছ্বাস চুয়ে চুয়ে পড়ছে উঠোনের নরম মাটিতে। ছেলেবেলার এই তো অকৃত্রিম আনন্দ, সুখানুভব! উজ্জ্বল মুখে তাকিয়ে আষাঢ়। তাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে পলাশ। সে-ই দেখে ছোট ছোট হাতে আষাঢ় ভাইয়ের দু'পা জড়িয়ে ধরলো হাসনা, হেনা। সশব্দে হেসে উঠলো ইখফা, সুবহা।
চলবে।
[ চড়ুইভাতিতে নিমন্ত্রণ রইলো বন্ধুরা। নিজ নিজ বাড়ি থেকে কে কি নিয়ে আসবেন, কমেন্টে জানাবেন কিন্তু। ]
📌 আমাদের গল্প গ্রুপে জয়েন হতে পারেন পাঠকবৃন্দ। ঔসেখানে আমার লেখা গল্প-উপন্যাস সম্পর্কিত ছোট-বড় অনুভূতি ব্যক্তকরণ, গল্প নিয়ে আলোচনা, ভুলত্রুটি শুধরে দেয়া, রিভিউ প্রদান এবং গল্পের চরিত্র-দৃশ্য নিয়ে নিজস্ব মতামত পেশ করতে পারেন। এজন্য আর বিলম্ব না করে জয়েন করুন আমাদের গল্প সংক্রান্ত গ্রুপে...
▪️গ্রুপ লিংক -
https://facebook.com/groups/499389245208190/