#আষাঢ়গগণে_প্রণয়াসক্তা
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[১০]
" রান্না খুব ভালো হয়েছে! আষাঢ়টা খেলে কত খুশি হতো! "
বাতাসে ছড়িয়ে গেল ফজল সাহেবের কথাটি। ঘরে নেমে এলো গুমোট নীরবতা। কারো ভাতের লোকমা থেমে গেল। কারো নড়ল না হাত। মাত্র এক মুহূর্ত। এগারো বছরের পুরোনো শূন্যতা যেন ফিরে এলো এ ঘরে। ঠোঁট কামড়ে চুপ হয়ে গেলেন ফজল সাহেব। বুঝতে পারলেন কি বলে ফেলেছেন তিনি। তাফাজ্জল সাহেব ধীরে ধীরে কাঁচের গ্লাস থেকে পানি পান করলেন। বৃদ্ধ চোখে ভাসমান একফোঁটা বিষন্নতা। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ফিরোজ সাহেব। সাফিয়া মলিন চোখে তাকালেন মেয়ের দিকে। সুবহা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। জমজ হাসনা, হেনা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। বছরের পর বছর ধরে তারা শিখে গিয়েছে। আষাঢ়ের নাম উচ্চারণ মাত্র এ বাড়িতে নেমে আসে অস্বাভাবিক নীরবতা। একটুখানি দীর্ঘশ্বাস। অতঃপর সবাই স্বাভাবিক হয়ে যায়। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। ফিরোজ সাহেব স্বাভাবিক গলায় মেয়েকে বলে উঠলেন,
" সুবু! আমার পাতে একটু ঝোল দাও মা। "
বাবার কণ্ঠে চমকে উঠল সুবহা! পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলো। এগিয়ে এলো বাবার কাছে। ঈষৎ কাঁপছে হাত। মাথা নিচু করে বাবার প্লেটে কয়েক পিস মাংস, ঝোল দিলো সে। ফিরোজ সাহেব বললেন,
" এবার বসে পড়ো তোমরা। খেয়ে নাও। "
হালকা মাথা নাড়ে সুবহা। এগিয়ে যায় নারীগণের কাছে। চুপচাপ বসে। সাফিয়া মেয়ের প্লেটে ভাত, মাংস বেড়ে দিলেন। আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। কানে এখনো যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সে-ই চঞ্চল কণ্ঠস্বর,
' মেজো মা! খুব মজা হয়েছে! আরো দুই পিস গোশত দাও না! '
সাফিয়ার ঠোঁটের কোণে ফিকে হাসি। সময়ের পরিক্রমায় এগারো বছর পেরিয়ে গিয়েছে। আজও যেন এ বাড়িতে কিছু মানুষের জন্য অদেখা আসন খালি পড়ে থাকে।
•
দুপুরের শেষ প্রহর। ঢলে পড়া সূর্যের তাপে ঝলমল করে চলেছে হাইওয়ের পিচঢালা সুদীর্ঘ রাস্তা। রাস্তার দু'পাশে সারি সারি রেইনট্রি, কৃষ্ণচূড়া, শিরীষ গাছ ইত্যাদি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। বাতাসের মৃদু ঝাপটায় গাছের পাতার ছন্দময় নৃত্য। কোথাও বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত, কোথাও জলভরা খাল। কোথাওবা গ্রামের কাঁচা পথ এসে মিলেছে হাইওয়েতে। দূরে দু-একটা দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ব্যতীত রাস্তা প্রায় ফাঁকা। নির্জনতার বুক চিরে নিঃশব্দ গতিতে ছুটে চলেছে কালো রঙের এসইউভি গাড়ি। দক্ষ হাতে গাড়ি চালাচ্ছে রাজিন। মাঝেমধ্যে রিয়ার ভিউ মিররে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। পরপর মনোনিবেশ করছে দীর্ঘ রাস্তায়। পাশের সিটে বসে আছে এক যুবক। পড়নে দুধসাদা রাউন্ড নেক টি-শার্ট। তার ওপর অনায়াস ভঙ্গিতে দেহে জড়ানো আকাশি-নীল রঙের ঢিলেঢালা ফুলহাতা কটন ওভারশার্ট। সামনের বোতামগুলো খোলা। হাতার কাফ দু'ভাঁজ করে কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা। নিচে পরা ঢিলেঢালা সাদা ওয়াইড-ফিট ট্রাউজার। পায়ে সাদা স্নিকার্স। বাঁ হাতে শোভা পাচ্ছে রূপালি স্ট্র্যাপের ব্র্যান্ডেড রিস্টওয়াচ। সিট খানিকটা পেছনে হেলানো। ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়েছে আরামদায়ক ব্যাকরেস্টে।
বাইরে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে। গাছপালা দ্রুতলয়ে পেছনে ছুটে যাচ্ছে। মুহুর্তের ব্যবধানে সবুজ মাঠগুলো একের পর এক বদলে যাচ্ছে। হঠাৎ গাড়ির ঠিক পাশ দিয়ে উড়ে গেল একটা পাখি। যুবকের ঠোঁট হালকা প্রসারিত হলো। কতগুলো বছর.. এভাবে নির্বাক হয়ে গ্রাম্য প্রকৃতিকে নিজের মতো করে দেখা হয়নি তার। কাঁচের ওপাশে দুলতে থাকা গাছপালা, কাঁচা মাটির গন্ধ মেশানো বাতাস, দূরের সবুজাভ মাঠ, পথের ধারে ছুটে বেড়ানো ছেলেদের উচ্ছ্বাস। সবটাই বড় আপন। খুব কাছের। বুকের অতল গভীরে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। গভীর শ্বাস নিলো সে। দীর্ঘকাল বাদে বুক ভরে নির্মল, নিখাদ নিঃশ্বাস নিলো। রাজিন একবার পাশ ফিরে তাকাল বন্ধুর দিকে। তার ঘোরলাগা রূপ দেখে মুচকি হাসল,
" কি রে? এত চুপচাপ? "
বাইরে নিবদ্ধ চাহনি। চোখ না সরিয়ে শান্ত গলায় উত্তর দিলো আষাঢ়,
" এমনিই। "
" টায়ার্ড? "
" কিছুটা। "
কিছুক্ষণ নিচ্ছিদ্র নীরবতা। গাড়ির ভেতরে শুধুমাত্র ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জন, এসির হাওয়া। হঠাৎ রাজিন বলে উঠল,
" এক কাপ চা হলে কেমন হয়? ক্লান্তিভাব ঠিক কেটে যাবে।"
আষাঢ় মাথা ঘুরিয়ে বন্ধুর দিকে তাকায়। চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক। ঠোঁটে হালকা টিপ্পনী,
" প্রতি ঘন্টায় একবার করে চা? ভাই, তুই তো দিন দিন মারাত্মক চা'খোর হয়ে যাচ্ছিস। "
সশব্দে হেসে উঠল রাজিন,
" চায়ের আলাদাই একটা ভাইবস্ আছে বস। ওসব তুই বুঝবি না। "
" অত বোঝার দরকার নাই ভায়া। পরে তোমার মতো ঘন্টায় ঘন্টায় চায়ের কেটলি নিয়ে দৌড়াতে হবে। "
একসঙ্গে হেসে উঠল দু'জনে। রাজিন সামনে তাকিয়ে। কিছুক্ষণ পর স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বলল,
" সামনে একটা ছোট টং দেখতে পাচ্ছি। থামাবো? "
সিটে আরেকটু গা এলিয়ে দেয় আষাঢ়,
" অ্যাজ ইয়্যু উইশ। লাগলে চা খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নে। অবেলায় ম'রতে ইচ্ছুক নই। "
এক হাতে স্টিয়ারিং সামলে অন্য হাতে বন্ধুর বাহুতে ঠাস করে চাপড় দেয় রাজিন। মিথ্যা মিথ্যা বাহু ডলে চোখমুখ কুঁচকে ফেলে আষাঢ়। কঁকিয়ে ওঠে,
" দূর হাট! পাঠার মতো শক্তি। উফ্! "
রাজিন দাঁত কেলিয়ে হাসে। একদম ঠিক আছে। পুনরায় বাইরে তাকায় আষাঢ়। দূরে কোথাও ধোঁয়া উঠছে খড় পোড়ানোর। কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে আকাশে। একজন বৃদ্ধ ধীরে ধীরে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন। মাঠের আইল ধরে কয়েকজন কৃষক কাঁধে কোদাল নিয়ে হাঁটছেন। অতি সাধারণ কিছু জীবনযাত্রার দৃশ্য। তবুও যেন অদ্ভুতুড়ে সুন্দর! বড় আপন। অজান্তেই মুচকি হাসে আষাঢ়। সে হাসিতে নেই কোনো কৃত্রিমতা। নেই কোনো জাগতিক উচ্ছ্বাস। আছে কেবল এক বুক নাম না জানা শান্তির পরশ। রাজিন আড়চোখে বন্ধুর দিকে তাকায়। তৃপ্ত হয় সে। সুখে ভরে ওঠে মন। দীর্ঘদিন বাদে বন্ধুর মুখে এমন প্রশান্ত হাসি ফুটেছে।
•
বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। আমগাছের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে বিছিয়ে আছে উঠোনে। বাড়ির দরজা সংলগ্ন পাকা বৈঠকে পাশাপাশি বসা পঞ্চদশী জমজ বোন। হাসনা, হেনা। হাতে কাঁচের বাটি। তাতে টকঝাল আমের আচার। আচার খেতে খেতে নিজেদের মধ্যে ফুসুরফুসুর গুজুরগুজুর করে চলেছে দুই বোন। নানা রকম গল্পে মশগুল। সে মুহূর্তে উঠোনের সামনে এসে থামল একটা কালো এসইউভি। হঠাৎ গাড়ির ইঞ্জিনের আওয়াজে চকিতে থামল তাদের গল্পগুজব। অপরিচিত, বিলাসবহুল একটা গাড়ি দেখে দু'জনেই বিস্ময়ে থেমে গেল! একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাল। পাশে আচারের বাটি রেখে ফিসফিস করে উঠল হেনা,
" কার গাড়ি রে? "
কাঁধ ঝাঁকাল হাসনা,
" জানি না তো। "
" আজকে কোনো মেহমান আসার কথা নাকি? "
" না তো। মেহমান আসলে মা, মেজো মা ধুমছে আয়োজন করতো না? বাড়িতে তো আজকে কোনো খাস রান্না হয়নি। "
" ঠিক ঠিক। "
দুই বোনের জল্পনা কল্পনার মাঝে আচমকা গাড়ির দরজা খুলে গেল। প্রথমে নামল রাজিন। লম্বা, সুঠাম গড়ন। পরনে কালো জিন্স, সাদা শার্ট। চারপাশে কৌতূহলী চোখ বুলিয়ে চলেছে। ততক্ষণে খুলে গিয়েছে অন্য দরজা। ধীরে ধীরে নেমে এলো অপরজন। আষাঢ়। লম্বাটে দেহ। প্রশস্ত কাঁধ। সুদর্শন পুরুষালি অবয়ব। দৃষ্টিনন্দন বেশভূষা। ক্লিন শেভ। উঠোনের মাটিতে পা রেখে স্থির হয়ে গেল আষাঢ়। চোখ দু'টো ধীরে ধীরে ঘুরে বেড়াতে লাগল চারপাশে। চেনা এই উঠোন.. স্মৃতির পাতায় জড়িয়ে থাকা আমগাছ.. এই টিনের চালা.. সবই তো চেনা। মনের ক্যানভাসে অঙ্কিত পুরনো ফ্রেমের মতো। তবুও কালপরিক্রমায়, সময়ের ছোঁয়ায় কোথায় যেন খানিক বদলে গিয়েছে। কত শত স্মৃতি একসঙ্গে হুড়মুড়িয়ে ফিরে এলো মানসপটে। এই উঠোনেই অগণিত বিকেল ছুটে বেড়িয়েছে সে। ওই তো আমগাছ। ওই আমগাছের নিচেই বন্ধুদের সঙ্গে মার্বেল খেলেছে। আম চুরি করতে গিয়ে বকুনি খেয়েছে। হেসেছে, পুনরায় ছোটাছুটি করেছে। বুকের ভেতর হঠাৎ জমা বাঁধল অজ্ঞাত ভার। দীর্ঘ এগারো বছর! জীবন নামক ক্যালেন্ডার থেকে সত্যিই এতটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে! গ্রামে পা না রাখলে বিশ্বাস হতো না বোধহয়। সময় এতটা নির্দয়ভাবে গড়িয়ে গিয়েছে।
গভীর করে একবার শ্বাস নিলো আষাঢ়। কাঁচা মাটি, শুকনো খড়, গাছের পাতা মিশ্রিত সেই চিরচেনা গন্ধ। ফুসফুস ভরে নিতেই অনাবিল শান্তি ছড়িয়ে পড়ল সারা শরীরে। মনে হলো এতদিন পর যেন জীবনের দীর্ঘ যাত্রায় হারিয়ে যাওয়া নিজের অকৃত্রিম, দামী একটা অংশ ফিরে পেয়েছে। ঠোঁটের কোণে অবচেতনে ফুটে উঠল ম্লান হাসি। আবেগ জড়ানো হাসি। খুব আস্তে, যেন নিজের সঙ্গে নিজেই ফিসফিস করে বলল সে,
' একটুও বদলায়নি.. আমার বান্ধাবাড়ী। '
হাসনা, হেনা ধীরে ধীরে বৈঠক থেকে নেমে এলো। কৌতূহল চেপে রাখতে ব্যর্থ। আচার অবহেলায় পড়ে রয়েছে পাকা বৈঠকে। দু'জনেই অনুসন্ধিৎসু, সন্দেহের চোখে অপরিচিত সুদর্শন যুবকদের দিকে তাকিয়ে। হেনা ধীরপায়ে এগিয়ে এসে মুখোমুখি দাঁড়াল। গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
" কাউকে খুঁজছেন? "
আষাঢ় সরু চোখে তাকিয়ে কিশোরীর দিকে। ওদের হাবভাবে বিস্তৃত হয় হাসি। মুচকি হেসে উত্তর দেয়,
" হ্যাঁ। "
" কাকে খুঁজছেন? "
" এই বাড়ির মানুষদের। "
হাসনা বোনের পাশে এসে দাঁড়াল। ভ্রু কুঁচকে আগন্তুকের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত পরখ করে বলল,
" আপনি কি বাবার পরিচিত? নাকি চাচুর? "
আষাঢ় হালকা হেসে উঠল,
" হয়তো পরিচিত। "
" হয়তো পরিচিত? এটার মানে কি? "
বিভ্রান্তিকর দৃষ্টিতে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল হাসনা, হেনা। ওদের এমন অবস্থা দেখে জাগ্রত হলো আষাঢ়ের দুষ্টুমি। রহস্যময়, মিষ্টি হেসে বলল সে,
" তোমরাই বলো। দেখে তো বেশ ইন্টেলিজেন্ট মনে হচ্ছে। "
দুই বোন ঘোর সন্দেহের চোখে একে অপরের দিকে তাকাল। মনে বিপদের বড় ঘন্টা বেজে চলেছে। হেনা মুখটা একটু কাত করে অতি সাবধানে হাসনার কানে কানে বলল,
" লোকটাকে আমার কাছে মোটেও সুবিধার লাগছে না। "
" আমারও। "
" এরা কারা? "
" আজকাল তো নানা কায়দায় চুরি হয়। এরা কোনো.. চোর নয়তো? "
" হ্যান্ডসাম ওরফে ডিজিটাল চোর? "
ফিসফিসানি আর ফিসফিসানি রইল না। আষাঢ়, রাজিন দু'জনেই শুনতে পেল। রাজিনের চক্ষু চড়কগাছ! প্রথমে বন্ধু তারপর কিশোরী দু'জনের দিকে তাকাল সে। এমন হ্যান্ডু দু'টো ছেলেকে নির্দ্বিধায় এরা চোর বানিয়ে ফেললো? তা-ও আবার ডিজিটাল চোর? আসতাগফিরুল্লাহ্! ছিঃ ছিঃ ছিঃ! নিজ রূপ, গর্বে বড় ধাক্কা লাগে রাজিনের। হাসনা সগর্বে বুক ফুলিয়ে আষাঢ়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখেমুখে নির্ভীক ভাব,
" এই যে, আপনার নামটা বলেন তো। "
উত্তর দিলো না আষাঢ়। বরং অদ্ভুত এক কাজ করল। ঠোঁটে কুটিল, দুর্বোধ্য হাসি। গোল গোল করে ঘুরতে লাগলো ওদের প্রদক্ষিণ করে। সূচালো সে চাহনিতে বেশ ভড়কে গেল জমজ কিশোরী। চোখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। লোকটা এমন গোল গোল করে ঘুরছে কেন? চারপাশে চক্কর কাটছে। সামনে থেকে হঠাৎ রিভলবার দিয়ে গু'লি করবে? নাকি পেছন থেকে আচমকা ছু'রিকাঘাত? ভয়ে, আতঙ্কে জমে বরফ দু'জনে। আষাঢ় ভীতিজনক তেমন কিছুই করল না। প্রদক্ষিণ করতে করতে প্রশ্ন করল শান্ত স্বরে,
" তোমাদের নাম কী? "
" আগে আপনি বলেন। " হাসনার কণ্ঠে ভয়ের কাঁপুনি।।
" কেন? "
" কারণ আমরা আগে কখনো আপনাকে দেখিনি। চিনি না জানি না নামধাম বলবো কেন? "
হেনার শঙ্কামিশ্রিত চটপটে কথা শুনে রাজিন ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। আষাঢ় মুখোমুখি স্থির হয়ে দাঁড়াল। ছোট ছোট চোখে গম্ভীর গলায় বলল,
" তোমরা এই বাড়ির কে হও? "
হাসনা ভয়ের মধ্যেও গর্বভরে বলল,
" আমরা এই বাড়িরই লোক। "
ঠোঁট কামড়ে হাসল যুবক। হালকা ঝুঁকে গেল। স্পষ্ট হলো চোখে থাকা দুষ্টুমির ক্ষীণ শিখা।
" বাবার নাম ফজল? "
জমজ কিশোরী অবাক! বড় বড় চোখ। হেনা বলে ফেলল,
" আপনি আমাদের বাবার নামও জানেন? এই আপনি কে? সত্যি করে বলুন তো। "
আষাঢ় স্বল্প ঝুঁকে দুষ্টুমিভরা চোখে বলল,
" যদি বলি.. আমি ডাকাত? "
এক মুহুর্তের নিস্তব্ধতা। দুই বোনের চোখ একসঙ্গে বড় হয়ে গেল। কোটর থেকে বেরিয়ে আসার জোগার। আতঙ্কে ফ্যাকাশে মুখ। র'ক্তশূন্য। চোখে পানি আসার দশা। ছেঁড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। এই বুঝি কেঁদেই ফেলবে।
" ডা.. ডাকাত! "
রাজিন এবার আর হাসি চাপিয়ে রাখতে পারল না। হো হো করে হেসে উঠল। এমনিতেই ডাকাত শব্দে প্রাণ উড়ে গিয়েছে। তন্মধ্যে রাজিনের ভ'য়ঙ্কর, বিকট সে হাসিতে অন্তরাত্মা ধক করে উঠল দু'বোনের। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সে আশঙ্কায় হাসনা দ্রুত চারপাশে তাকিয়ে ছটফটে ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠল,
" বাবা! চাচু! তোমরা কে কোথায় আছো? বাঁচাও। বাঁচাও। "
সেই চরম উত্তেজনার মুহূর্তে বাড়ির বাইরে থেকে ভেসে এলো অত্যন্ত পরিচিত কণ্ঠস্বর,
" কি হয়েছে? তোরা এভাবে চেঁচামেচি করছিস কেন? "
হাতে টুকটাক মুদি সামগ্রীর ব্যাগ। বাড়ির উঠোনে প্রবেশ করলেন ফজল সাহেব। প্রথমেই দুই মেয়ের দিকে তাকালেন। ওদের হন্তদন্ত ভাব, চেঁচামেচি দেখে অবাক হলেন! ধীরে ধীরে সে চাহনি নিবদ্ধ হলো আগত অতিথিদ্বয়ে। বিশেষ করে আষাঢ়ের দিকে। এক মূহুর্ত। দুই মূহুর্ত। আষাঢ়ের দিকে স্থির হয়ে রইল দৃষ্টি। লহমায় হাতের ব্যাগ কেমন আলগা হয়ে এলো। চোখ জোড়ায় বিস্ময়ের পাহাড়! থরথর করে কেঁপে উঠল ঠোঁট। অবিশ্বাসে ফিসফিসিয়ে উঠলেন ফজল সাহেব,
' আ ষা ঢ়! '
আষাঢ়ের অধরকোণে মুছে গিয়েছে দুষ্টুমি। সেখানে এখন ধীর, আবেগমাখা হাসি। এগিয়ে এলো ছোট চাচুর সামনে। ফজল সাহেব ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে সে-ই কিশোর ভাতিজার দিকে। এতটা বড় হয়ে গেছে সে! লম্বায় বাপ, চাচাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে! বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। অপলক শুধু তাকিয়ে।
" আসসালামু আ'লাইকুম। কেমন আছো চাচু? "
গলা ধরে এলো। কপালে জমে ঘাম। কোনোমতে অস্ফুট স্বরে জবাব দিলেন ফজল সাহেব,
" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম। "
ফজল সাহেব যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না। অলীক স্বপ্ন মনে হচ্ছে। কাঁপা হাতে ভাতিজার শক্ত বাহু ছুঁয়ে দেখলেন তিনি। কল্পনা নয়, ভুল নয়। সত্যি এটা। তিনি বারবার ভাতিজার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। ওর মুখের প্রতিটি খাঁজ, চোখ দেখছেন। অবিশ্বাস্য চোখজোড়া ঘুরে ঘুরে দেখছে লম্বা অবয়ব। হঠাৎ কোনোকিছু না ভেবে আষাঢ়কে টেনে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরলেন তিনি। শক্ত করে। এত বছরের জমানো আবেগে গলা ধরে এলো। শুধু এতটুকু বলতে সক্ষম হলেন তিনি,
" আষাঢ়! তুই এসেছিস বাপ? "
কিছু বলল না আষাঢ়। স্রেফ মাথা নাড়ল। আলতো করে জড়িয়ে ধরল ছোট চাচুকে। অপরদিকে ভ'য়ঙ্কর স্তব্ধ হাসনা, হেনা! একসাথে বিড়বিড় করে উঠল,
' আষাঢ় ভাইয়া? '
-
হঠাৎই অপ্রত্যাশিত উৎসবের রঙে রঙিন হয়েছে পুরো বাড়ি। দীর্ঘ এতগুলো বছরের শূন্যতা কাটিয়ে আষাঢ়ের প্রত্যাবর্তন। বসার ঘরে এলাহী কাণ্ড। সকলের মধ্যমণি হয়ে বসে আছে আষাঢ়। তাকে ঘিরে বসে আছেন তাফাজ্জল সাহেব, ফিরোজ সাহেব, ফজল সাহেব, মাশিয়াত ঘরের প্রায় সকলে। কম-বেশি সকলে ব্যতিব্যস্ত ওকে নিয়ে। কেউ পরম আদরে এটা ওটা প্রশ্ন করছেন। কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। কম-বেশি সকলে আকুল আপ্যায়ন করার জন্য।
" কেমন আছো বাবা? "
" হঠাৎ না বলে কয়ে চলে এলি। তোকে এখন কি খেতে দিই বল তো? "
" এত শুকিয়ে গেছিস কেন? "
" ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস না? "
" নাও বাবা শরবতটা খাও। "
সাফিয়ার কথায় বাধ সাধলেন মাশিয়াত,
" আগে মিষ্টি খা বাবা। এত বছর পর এলি। আগে মিষ্টিমুখ কর। "
টেবিলের ওপর উপচে পড়ছে কত কি! শরবতের গ্লাস, ফলমূল, নুডলস্, মিষ্টি। শামীমা ব্যস্ত পায়ে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন। টেবিলের ওপর রাখলেন মুচমুচে পাকোড়া। আচমকা ছেলেটা আসায় স্বল্প সময়ের মধ্যে এতটুকুই আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছে তারা। অথচ আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই। রাজিন আষাঢ়ের পাশে বসা। বসে বসে ঘরের লোকদের বাঁধভাঙা কাণ্ডকারখানা দেখছে। চোখেমুখে বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট! আস্তে করে আষাঢ়ের কানে কানে বলল,
" দোস্ত.. তুই সত্যিই এই বাড়ির ছেলে? নাকি কোনো দেশের রাষ্ট্রপতি? "
আষাঢ় দুষ্টু হেসে কনুই দিয়ে গুঁতো মা'রল ওকে। রাজিন মাথা নেড়ে চুপচাপ চারপাশে তাকাল। এত ভালোবাসা.. এত আন্তরিকতা.. জীবনে খুব কমই দেখেছে সে। মাশিয়াত পরম স্নেহে আষাঢ়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠলেন,
" কত শুকিয়ে গেছিস রে বাবু! "
" ফুপি! আ'ম ফাইন। আমাকে কোন অ্যাঙ্গেলে শুকনো দেখাচ্ছে? এরচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য হলে লোকে জলহস্তী বলবে।"
একযোগে হেসে উঠল অনেকে। মাশিয়াত নকল চোখ রাঙিয়ে তাকালেন,
" একদম বাজে কথা বলবি না। বেডা মানুষ একটু আধটু স্বাস্থ্য না থাকলে চলে? বেশি চিকনাচাকনা হলে পরে গাঞ্জুটের মতো দেখা যাবে। "
ঘরজুড়ে পুনরায় হাসির জোয়ার বয়ে যায়। সবাই উপস্থিত। ঘরভর্তি মানুষ। হাসিখুশি পরিবেশ। শুধু.. একজন নেই। কোথায় সে? সে কি টের পায়নি ওর উপস্থিতি? অজান্তেই আষাঢ়ের অধীর, চঞ্চল চোখজোড়া এদিক ওদিক চলে যাচ্ছে। আড়ালে আবডালে ঘরের কোণে কোণে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাঝেমধ্যে উঠোনের দিকে তাকাচ্ছে। প্রায় মাগরিবের ওয়াক্ত। অবেলায় কোথায় 'সে'? অস্থির লাগছে ভেতরে ভেতরে। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিতে নারাজ। মুখাবয়বে অস্থিরতার বিন্দুমাত্র আঁচড় নেই। আকস্মিক বাইরে থেকে ভেসে এলো মিহি, মিষ্টি কণ্ঠস্বর। দ্রুত পায়ের শব্দ।
" মা! মা! "
মাথায় ওড়না টানা। হালকা গোলাপী রঙের সালোয়ার কামিজ পরা সুবহা। হাতে তাজা সবজির ছোট ঝুড়ি। উঠোন পেরিয়ে তরতর করে ঘরে ঢুকল সে। মুখে হালকা হাঁপ ধরা ভাব। বেশ তাড়াহুড়ো করে এসেছে। ঘরের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে চঞ্চল স্বরে বলল,
" মা, সাহানা কাকি লাউ আর শিম দিয়েছেন। এগুলো কোথায় রাখবো? "
কথা শেষ করেই থমকে গেল সে। পায়ের গতি থামল মাঝপথে। চোখ পড়ল বসার ঘরে। সবাই একসঙ্গে কেন? কি হয়েছে? মুহূর্তেই কৌতূহল, বিস্ময়ে স্থির হলো চোখ! আকস্মিক এই থমথমে আবহে চাচাতো বোন হেনা নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হলো। উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠল,
" সুবু আপু! সুবু আপু দেখো কে এসেছে! আষাঢ় ভাইয়া। "
আকস্মিক স্তব্ধ হলো সময়। কেঁপে উঠল হাতের ঝুঁড়ি। শিম একটি গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তরুণীর। ধীরে ধীরে.. খুব ধীরে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো আগত যুবকের দিকে। সকলের মধ্যমণি হয়ে সোফায় বসে থাকা লম্বা, সুপুরুষের মুখে। আষাঢ়! প্রথম থেকেই তাকিয়ে তরুণীর মুখাবয়বে। এগারো বছর। পুরো এগারো বসন্ত পর.. সামনাসামনি চোখে চোখ পড়ল দু'জনের। স্মৃতির অ্যালবামে থাকা চঞ্চল, রোগা পটকা সেই আট বছরের সুবহা আগের মতো নেই। তার জায়গায় দাঁড়িয়ে শান্ত, স্নিগ্ধ এক তরুণী। মাথায় সুবিন্যস্ত ওড়না। মায়াবী চোখজোড়া আগের মতোই বড়। তবে সে চোখে আজ শিশুসুলভ দুষ্টুমি নেই। আছে লজ্জারুণ গভীরতা। তরুণীর বক্ষমাঝে হঠাৎ কেঁপে উঠল। তোলপাড় শুরু হলো অলক্ষ্যে। এ.. মানুষটা? আষু ভাইয়া? শৈশবের সেই অতি চেনা আষু ভাইয়া? যে তাকে নিয়ে যখন তখন গাছের ফল পাড়তে যেতো। ঢিল মে'রে আম, কুল পাড়ত। তার সঙ্গে দিবারাত্রি কারণে অকারণে খুনসুটিতে মেতে থাকতো। বিদায়ের বিষাদঘন দিন যে মানুষটা বলেছিল,
' যেতে চাইনি আমি। বিশ্বাস কর। '
অপরদিকে বাকরুদ্ধ আষাঢ়। মনের গহীনে কত শতবার কল্পনা করেছে এই মাহেন্দ্রক্ষণ! কত রাত ভেবেছে কেমন হবে তাদের সাক্ষাৎ। তবুও আজকের এই রূপসী বাস্তব চিত্র এত কঠিন কেন? ভিন্ন রকম? ঠোঁট নড়ল তার। তবে শব্দ বেরোল না। ঘরে উপস্থিত সকলে একে একে ওদের দু'জনের দিকে তাকাল। মাশিয়াত মুচকি হেসে বললেন,
" কি রে সুবু? ভাইয়াকে চিনতে পারছিস না? এই যে, এটা আমাদের আষাঢ়। পাশে তার বন্ধু। "
সুবহা চমকে উঠল সসংকোচে! নিমিষেই কেটে গেল ঘোর। লজ্জায়, দ্বিধায় ঝটপট চোখ নামিয়ে নিলো। কম্পিত লাজুক হাতে ঠিক করল ওড়নার আঁচল। খুব আস্তে করে নম্র স্বরে সালাম দিলো,
" আসসালামু আ'লাইকুম। "
সে-ই চেনা কণ্ঠ! স্মৃতির অতল থেকে সকচিত হয়ে বেরিয়ে এলো আষাঢ়। চোখের কোলে আবেগ মাখানো মুচকি হাসি।
" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম। কেমন আছিস.. সাবুদানা? "
সে-ই নাম। সে-ই বিশেষ সম্ভাষণ! পুনরুজ্জীবিত হলো যেন এগারো বছরের অপেক্ষা, অগণিত স্মৃতি। বুকে পুষে রাখা অপ্রকাশিত অসংখ্য অনুভূতি।
চলবে।
[ টান টানা..! আষাঢ় মহাশয় ইজ ব্যাক। এতগুলো বছর পর দেখা হলো সাবুদানার সঙ্গে। কেমন লেগেছে পর্বটি? জানাতে ভুলবেন না যেন। ]